দাহশয্যা পর্ব ৯৪ (২)
Raiha Zubair Ripti
রাত তখন অনেক গভীর। ঢাকার ব্যস্ততা অনেক আগেই স্তব্ধ হয়ে এসেছে। রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে আছে কেবল হেডলাইটের ঝাপসা আলো আর দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের ডাকার আওয়াজ। একটা কালো গাড়ি তার পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে ফুল স্পিডে চলে গেলো চোখের পলকে।
সোলেমান তাকালো একবার ঐ গাড়ির দিকে। ফাঁকা রাস্তা সেজন্য হয়তো এভাবে ফুল স্পিডে চলছে। তার মস্তিষ্ক আর গাড়িটা নিয়ে ভাবলো না। সে দৌড়ালো। উন্মাদের মতো দৌড়ালো। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন পায়ে এসে জমেছে। বুকটা ধড়ফড় করে উঠছে বারবার। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও থামছে না সে। পেছন থেকে ইব্রাহিম তাকে একাধারে ডেকে চলছে। চিল্লিয়ে থামতে বলছে। জিজ্ঞেস করছে- “ কি হয়েছে? এভাবে দৌড়াচ্ছিস কেনো? কোথায় যাচ্ছিস? ”
কিন্তু সোলেমানের কানে ইব্রাহিমের কথা ঢুকছে না। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে-
“না আল্লাহ, না। ওটা যেন মেহরিন না হয়। ”
তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। হাঁপাতে হাঁপাতে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে একবার। দুই হাত মাথায় দিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠে-
“ আল্লাহ আমায় শেষ করে দিও না এভাবে। আমি সহ্য করতে পারবো না। মেহরিনের কিছু হতে দিও না…”
তারপর আবার ছুটে যায়। কমলাপুর রেলস্টেশনের সামনে তখন পুলিশ, কৌতূহলী মানুষ আর কিছু রেলকর্মীর ছোটখাটো ভিড়। রাস্তা টা এখনও তাজা রক্তে ভেজা।
সোলেমানের বুকটা ধক করে উঠে। তার পা কাঁপতে শুরু করে। সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলে ইব্রাহিম এসে ধরে ফেলে। জিজ্ঞেস করে –
“ এখানে আসলি কেনো তুই? ”
সোলেমান এবারও জবাব দেয় না। চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেছে কান্নায়। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পুলিশের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ তাকে দেখতেই সালাম দেয়। সোলেমান জবাব দেয় না সালামের। সোজা প্রশ্ন তুলে-
“ কোথায়? ”
পুলিশটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মুখের ভাবটাও ভারী হয়ে উঠে।
“লাশ ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানো হইছে।”
সোলেমানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে মেহরিনের একটা ছবি দেখিয়ে বলে-
“ ও ছিলো? হু? উত্তর দে তাড়াতাড়ি। মেহরিন ছিলো ওটা? ”
পুলিশ ছবিটা দেখে বলল-
“ মুখটা রক্তে ভিজে গিয়েছিল। সেভাবে স্পষ্ট দেখা যায় নি। ট্রেনের নিচে পড়ছিলো তো। শরীর দুই টুকরা হয়ে গেছে। পেট ফেটে বাচ্চাটাও মরে গেছে। আপনি যেমন বর্ণনা দিছিলেন আপনার বউয়ের তেমন বর্ননারই মিল পেয়েছি। বয়স অল্প,কালো বোরকা পড়া,সাথে অন্তঃসত্ত্বা। এখন হাসপাতালে গিয়ে দেখলে পুরোপুরি শিওর হওয়া যাবে। ”
সোলেমানের কান ঝাঁ ঝাঁ করতে শুরু করে। চারপাশের শব্দ সব অস্পষ্ট হয়ে যায়। মনে হয় পুরো পৃথিবীটা ঘুরছে। ইব্রাহিম নিজেও স্পিচলেস হয়ে গেছে। এজন্য সোলেমান এভাবে দৌড়ে ছুটে আসলো!
ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে তখনও মানুষের ভিড়। স্ট্রেচার দৌড়াচ্ছে। কারো কান্না, কারো চিৎকার, কোথাও ডাক্তারদের ব্যস্ত কণ্ঠ। সোলেমান কিছুই ঠিকভাবে দেখতে পাচ্ছে না। তার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসছে ক্রমশঃ। ইব্রাহিম তাকে ধরে নিয়ে আসলো। ডক্টরের কাছে জিজ্ঞেস করলো কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আসা সদ্য লাশটা কোথায়। তারা মর্গ দেখিয়ে দিলো। মর্গের নাম শুনেই সোলেমানের বুকের সমস্ত হাড়গোড় ভেঙে যেতে লাগলো।
ইব্রাহিম সোলেমানের হাত ছাড়ছে না। তার বিশ্বাস সে হাত ছেড়ে দিলেই ছেলেটা নিজের ভার সামলাতে না পেরে পড়ে যাবে। এমনিতেই কম ভার তো সে বয়ে বেড়াচ্ছে না। মর্গের সামনে এসে তাদের পা থেমে যায়। ভয় সোলেমান কে গ্রাস করতে থাকে। পুরো শরীর কাঁপতে থাকে। যদি সত্যিই মেহরিন হয় ? সোলেমানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে।
মর্গের ভেতরে ঢুকতেই তার শ্বাস আঁটকে আসলো। লাস্ট মর্গে এসেছিল চার সপ্তাহ আগে। বোনের লাশ নিতে। আর আজকে স্ত্রীর জন্য। একজন কর্মচারী একটা লাশ দেখিয়ে বলল-
“এই যে, এই লাশটা।”
সাদা থান দিয়ে ঢাকা নিথর দেহটার দিকে আঙুল তুলে দেয় সে। পুরো শরীর মুখ ঢাকা। কাপড় সরিয়ে দেখতে হবে! সোলেমানের হাত কাঁপছে। এতটাই কাঁপছে যে ঠিকভাবে কাপড় ধরতেও পারছে না। তার বুক ধড়ফড় করছে প্রচণ্ডভাবে।সে ধীরে ধীরে সাদা কাপড়টার কোণা তুলে আর পরমুহূর্তেই তার শরীর অবশ হয়ে যায়। চোখ বন্ধ হয়ে আসে আপনা-আপনি। তার সাহস নেই দেখার। ইব্রাহিম মৃদু ধাক্কা দেয়। বলে-
“ চোখ মেলে দেখ। কি হলো দেখ না সোলেমান। একবার তাকিয়ে দেখ। ”
কিছু সেকেন্ড সে স্থির হয়ে ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখো। তারপর হঠাৎ করে তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্বস্তির ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায়। হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে। সেই কান্নার ভেতর এবার এক অদ্ভুত স্বস্তি মিশে আছে। সোলেমান কাঁপা কাঁপা হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা মৃত্যুভয়টা যেন এক ঝটকায় বের হয়ে আসে। যেই লাশটা দেখার জন্য তার ছুটে আসা,সেটা মেহরিন না।
কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার তার বুক কেঁপে উঠে। লাশটা তো মেহরিনের না। তাহলে মেহরিন কোথায় ? নওগাঁ চলে গেছে একা? সেটা কি আদোও মেহরিনের পক্ষে সম্ভব? মেয়েটা কখনো কি একা বের হয়েছে বাসা থেকে? সব সময় মোতালেব ভুঁইয়া আর সোলেমানের সাথেই বের হয়েছে।
পকেট থেকে তড়িঘড়ি করে ফোনটা বের করে মোতালেব ভুঁইয়ার নম্বরে কল করে ফোনটা ইব্রাহিম কে দিলো। সোলেমান কথা বলতে পারবে না। । মোতালেব ভুঁইয়া রাত তিনটে বাজ,এখনও পুলিশ স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে কেবল মেয়ের একটা খোঁজ পাওয়ার আশায়। পাশে আছে ইমন, অনিক। ইমন নিজেও পাগল প্রায়। সে তার দলের লোকজনের সাথে কথা বলেছে। সাহায্য চেয়েছে। কিন্তু তারা একটু বাঁকা চোখে দেখলো বিষয় টা। ইমন শিবিরের হয়ে আওয়ামী লীগের এমপির বউয়ের খোঁজ চেয়ে সাহায্য চাওয়া। কিছুটা গোলমেলে লাগলো। তারা কেবল দেখছি বলে ফোন কেটে দিলো। ইমন কে সন্দেহ হতে লাগলো। ও আওয়ামী লীগের কোনো গুপ্ত নয় তো? ছেলেটা তো মেয়র ইব্রাহিম পাশার ড্রাইভার ছিলো।
মোতালেব ভুঁইয়ার পা ফুলে অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেছে। সকল কাজকর্ম বাদ দিয়ে সে মেয়েকে খুঁজে । খোঁজ না পেলে আবার থানায় ছুটে আসে এখন পা ব্যথার জন্য তিনি ঠিক মতো দাঁড়াতেও পারছে না। এরিমধ্যে হুট করে পাঞ্জাবির পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলে সে ফোনটা বের করে। স্কিনে দেখে আননোন নম্বর। তার মনে হলো ফোনটা ঐ কিডন্যাপ করা লোকজনের নয় তো? সেজন্য তাড়াতাড়ি করে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইব্রাহিমের গলা শুনে বললেন-
“ কে…কে? ইব্রাহিম? ”
সোলেমান রা হসপিটাল থেকে বেরিয়ে এসেছে কিছুক্ষণ আগে এখন তারা গাড়িতে।
“ হু আঙ্কেল আমি ইব্রাহিম। ”
মোতালেব ভুঁইয়া এবার কেঁদে দিলেন।
“ আমার মাইয়াটারে কোনো খোঁজ পাইছো তোমরা? আমি খুঁজতেছি আমার মাইয়াটারে। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। তোমরা আমার মাইয়াটারে খুঁজে এনে দাও না বাজান। তোমাদের তো অনেক ক্ষমতা। পারবা না খুঁজে আমার বুকে ফিরায় দিতে? আমার মাইয়াটার শরীর ভালো না। হাসপাতাল থেকে ফিরছে কয়দিন হলো। ডাক্তার বলছে ওরে দেখেশুনে রাখতে। আমি বাপ হয়ে পারলাম না আমার মাইয়াটারে দেখেশুনে রাখতে বাজান। ”
সোলেমান গাড়ির স্টিয়ারিং টায় হাত রাখলো শক্ত করে। তার মানে মেহরিন সেখানেও যায় নি! তাহলে মেয়েটা এখন কোথায়? কোথায় চলে গেলো সে? ইব্রাহিম বলল-
“ আঙ্কেল আপনি চিন্তা করবেন না। মেহরিন কে আমরা ঠিক খুঁজে বের করবো। আপনি নিজের খেয়াল রাখুন। বাসায় যান। থানার সামনে আছেন নিশ্চয়ই এখনো। রাখছি এখন আঙ্কেল। ”
ইব্রাহিম ফোন কে’টে দিলো। সোলেমান এখন কোথায় খুঁজবে? পুরো ঢাকায় সে লোক লাগিয়ে দিয়েছে মেহরিন কে খুঁজতে। কিন্তু কেউ কোনো আপডেট দিচ্ছে না। সে প্রতিটি সিসিটিভি ফুটেজ এবার চেক করার চেষ্টা করলো। তাদের কসাইখানার বাহিরের পুরো রাস্তা তে যতগুলো সিসিটিভি ফুটেজ আছে সেই সব ফুটেজ সে ইব্রাহিম কে আনতে বললো। আনতে কিছুটা সময় ব্যয় হলো। সোলেমান ল্যাপটপে কানেক্ট করে প্রতিটি ফুটেজ চেক করতে শুরু করলো। প্রথম ফুটেজে দেখা গেলো মেহরিন দৌড়ে বাম দিকের রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়ে কিছুটা দূরে চলে যায়। তার কিছুক্ষন পরই সোলেমান বেরিয়ে আসে। সে ডান দিকে চলে যায়। দ্বিতীয় ফুটেজে দেখা যায় একটা ঝোপের পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে মুখ চেপে কাঁদছে। ফুটেজে সোলেমানের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। কারন সোলেমান উল্টো রাস্তায় আছে। তৃতীয় ফুটেজ টাও বের করলো। সোলেমান হাঁটু গেঁড়ে বসে মেহরিন মেহরিন বলে ডাকছে। মেহরিন শুনেছে সেই ডাকটা। উঠে দাঁড়ালো। হয়তো এগিয়েই আসতে চাইছিলো। কিন্তু তার আগেই একটা কালো গাড়ি তার সামনে এসে দাঁড়ালো। ভেতর থেকে তিনজন মুখে কালো কাপড় বাঁধা মেহরিনের মুখ চেপে ধরলো। টেনে হিঁচড়ে গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে ফেললো। মেয়েটা চিৎকার অব্দি করতে পারলো না। হয়তো সোলেমান কে ডাকতে চেয়েছিল খুব জোরে। হাত পা ছোটাছুটি করছিলো। দৃষ্টি বারবার সোলেমান কে খুঁজছিল।
সোলেমান গাড়িটা ভালো মতো খেয়াল করতেই স্মরণে আসলো এই গাড়িটাই তো তখন শাঁ শাঁ করে চলে গেলো। মেহরিনকে তার পাশ দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল! অথচ সোলেমান বুঝলো না!
পুরো ঢাকার সিসিটিভি বের করে এই গাড়ি কোথায় গিয়ে থেমেছে সেটা বের করতে বলল। ঢাকা শহর তো আর কম বড় না। বের করা হলো অনেক গুলো ফুটেজ। গাড়িটা মহাখালী দিয়ে চলে যাওয়ার পর এমন এক রাস্তা দিয়ে চলে গেছে যে যেখানে কোনো সিসিটিভি ফুটেজই নেই।
সোলেমান ভেতর ভেতর শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারা আবার তুলে নিয়ে গেলো মেহরিন কে? কারা! সোলেমান ইব্রাহিম কে বললো-
“ ইব্রাহিম ভাই আমার মাথা কাজ করছে না। কি করবো রে? কোথা থেকে খুঁজে বের করবো আমি আমার মেহরিন কে! কারা নিয়ে গেলো মেহরিন কে। ”
ইব্রাহিম আমতা-আমতা করে বলল-
“ শেখর নয়তো? ”
চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।
“ শেখর দেশে এসেছে খবর পেয়েছি। ”
সোলেমানের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসলো। শেখরই হবে। ওদের সে ভুলে গেলো কি করে! সুবহান কে তো সে নিজের হাতে মেরেছে। সেই কারনেই তুলে নিয়ে গেছে!
মেহরিনের গায়ে জাস্ট একটা আঁচড় লাগলে হয়েছে। শেখরের জীবন শিখা সে চিরতরে নিভিয়ে দিবে এবার।
অন্ধকারে ডুবে থাকা জঙ্গলটা যেন কোনো মৃত শহরের ধ্বংসাবশেষ। চারপাশে ঘন গাছপালা, বাতাসে স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, আর মাঝেমধ্যে শুকনো পাতার উপর কিছু একটা হেঁটে যাওয়ার শব্দ। সেই জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আধাপোড়া একটা বাড়ি। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে, ছাদের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। কালচে পোড়া দাগ এখনও স্পষ্ট। সেই বাড়ির ভেতরের একটা অন্ধকার রুমে হাত বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে মেহরিন। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের উপর লেপ্টে আছে। ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তৃষ্ণায় গলা যেন কাঁটা হয়ে আছে। পেটের ভেতরটায় অস্বস্তিকর একটা ব্যথা ক্রমেই বাড়ছে। ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলার সময়ও আঘাত পেয়েছিল সে। তখন ব্যথাটা হালকা ছিল। কিন্তু এখন সেটা অদ্ভুতভাবে বেড়ে উঠছে। মেয়েটা চোখ মেলে তাকিয়ে আছে নাকি বুজে আছে বলা মুশকিল। শুধু গোঙাতো লাগলো ব্যথায়। তার গলার আওয়াজ শুনে। কেউ একজন দরজা ঠেলে ভেতরে আসলো। মেহরিন কষ্ট করে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। অন্ধকারের ভেতর থেকে কালো পাঞ্জাবি পরা একটা লোক ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তার জুতার শব্দ রুমজুড়ে প্রতিধ্বনি তুলছে। লোকটা এসে হাঁটু গেড়ে বসলো মেহরিনের সামনে। তালি বাজাতেই হঠাৎ করে ঝাপসা হলুদ লাইট জ্বলে উঠলো। আলোটা বারবার দপদপ করছে। সেই আলোয় স্পষ্ট হলো লোকটার মুখ। অপরিচিত লাগলো। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ক… কে আপনি…?”
লোকটা ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হাসলো।
“ আমি শেখর। নাম তো শোনা হি হো গা?”
নামটা শুনেই যেন শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো মেহরিনের। সে চিনে এই নামটাকে। মেহরিন দাঁতে দাঁত চেপে বললো-
“চিনলাম। আপনি সেই অমানুষ। যে নিজের বউকে পতিতালয়ে নিয়ে গিয়েছিল দেহ ব্যবসা করাতে।”
শেখর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর মাথা নিচু করে হেসে উঠলো। সেই হাসিতে বিকৃত আনন্দ ছিল। সে একটু ঝুঁকে বলল-
“আমিও অমানুষ। তোমার স্বামীও অমানুষ। উই আর সেম ক্যারেক্টার। আমার বউকে আমি পতিতালয়ে নিয়ে গেছি। আর তোমার স্বামী? সে তোমাকে পাচার করতে নিয়ে গিয়েছিল। তাহলে বলো, কোথায় তফাৎ রইলো আমার আর সোলেমানের মাঝে? তোমার আর প্রেমার মাঝে? তোমার আর প্রেমার ভাগ্যটাও একই সুতায় গাঁথা।”
মেহরিন কষ্ট করে উঠে বসার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না।
“আমাকে কেন তুলে এনেছেন?”
শেখরের চোখ মুহূর্তে বদলে গেলো। হাসি মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জমলো হিংস্রতা।
“প্রতিশোধ।”
“কিসের প্রতিশোধ?”
“ তোমার স্বামী আমার ভাই সুবহানকে মেরে ফেলছে। সামিরের হাত কেটেছে। আমাকে দেশ ছাড়া করেছে। আমার বাপকে জেলে পাঠিয়েছে। এত হিসাবের দাম দিবে কে?” সে আঙুল তুলে মেহরিনের দিকে দেখালো— “হয় তুমি মরবে। না হয় সোলেমান মরবে। অথবা তোমরা দুজনই মরবে।” একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো— “ সরি এখন তো তিনজন তোমরা।”
কথাটা শুনেই মেহরিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। শেখর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
“চিন্তা করো না। আজকের রাতটা অনেক ইন্টারেস্টিং হবে।”
লোকটা বেরিয়ে গেলো। দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেলো কড়াৎ শব্দে। মেহরিন এবার শব্দ করে কেঁদে উঠলো। বুক ফেটে যাচ্ছে। ভয়, ব্যথা আর অসহায়ত্ব মিলে তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
“আল্লাহ,আমার বাচ্চাটাকে শুধু বাঁচিও তুমি।”
রাত পেরিয়ে তখন ভোর প্রায়। তৃষ্ণা অসহ্য হয়ে উঠলো। গলা দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে। মেয়েটা দুর্বল গলায় ডাকলো-
“পানি। একটু পানি।”
শেখর সম্ভবত কারো দিকে তাকিয়ে বললো-
“যা, পানি দিয়ে আয়।”
কিছুক্ষণ পর একটা যুবক ভেতরে ঢুকলো। হাতে পানিভরা গ্লাস। সে এসে মেহরিনের সামনে গ্লাসটা ধরতেই মেহরিন কষ্ট করে বাঁধা হাতের দিকে তাকালো। ইশারায় বোঝালো,হাত বাঁধা থাকলে পানি খাবে কীভাবে?
ছেলেটা একটু ইতস্তত করে বাইরে তাকিয়ে চিৎকার দিলো-
“ভাই, খুলে দিবো?”
বাইরে থেকে শেখরের গলা এলো-
“দে খুলে।”
ছেলেটা এগিয়ে এসে দড়ি খুলে দিলো। মেহরিনের বুকের ভেতর আশার আলো জ্বলে উঠলো। এই সুযোগে পালাতে হবে। যেভাবেই হোক। তার হাত মুক্ত হতেই সে ধীরে ধীরে গ্লাসটা ধরলো। হাত এত কাঁপছে যে পানি ছলকে জামায় পড়ছে। তবুও পাগলের মতো পানি খেতে লাগলো। এক ঢোক,দুই ঢোক। পুরো গ্লাস শেষ করে ফেললো সে। ছেলেটা এগিয়ে এসে মেহরিনের হাত পূনরায় বাঁধতে নিলে মেহরিন তার বুক বরাবর জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। আকস্মিক ধাক্কায় লোকটা ছিটকে পড়ে গেলো। মেহরিন বসা থেকে উঠে দৌড়ে দরজা সামনে আসতেই সমস্ত শরীর হঠাৎ কেঁপে উঠলো। মনে হলো পেটের ভেতর কেউ যেন ধারালো ছুরি ঘুরিয়ে দিলো। সে দুম করে ফ্লোরে পড়ে গেলো। দুই হাত দিয়ে পেট চেপে ধরলো শক্ত করে। ব্যথাটা এত ভয়ংকর যে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে পেটের ভেতর সবকিছু ছিঁড়ে যাচ্ছে।
ছেলেটা ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলো। ভাই ভাই করে ডাকলো শেখর কে।
মেহরিন কুঁকড়ে যেতে লাগলো মাটিতে। তার মুখ দিয়ে গোঙানি বের হচ্ছে। কপালের রগ ফুলে উঠেছে। পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। হঠাৎ সে অনুভব করলো উষ্ণ কিছু একটা গড়িয়ে পড়ছে তার পায়ের নিচে। মেহরিন থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নিচের দিকে তাকালো। তার সেলোয়ার ভিজে যাচ্ছে রক্তে। লাল রক্ত ফ্লোরে পড়তে শুরু করলো। চোখ বড় হয়ে গেলো আতঙ্কে। ব্যথায় তার গলা ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। চিৎকার করে ডাকতে লাগলো-
“ আমার বাচ্চা..আল্লাহ আমার বাচ্চা। বাঁচান, কেউ আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান!”
শেখর দৌড়ে রুমে আসলো। ফ্লোরে পেট ধরে মেহরিন কে গড়াগড়ি করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসলো। কি হলো এই মেয়ের? ফ্লোরের দিকে তাকাতেই দেখলো ফ্লোর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। শেখর ঐ যুবকের দিকে তেড়ে গিয়ে বলল-
“ এ্যই কি করছিস কি তুই? বল কি করছিস? ”
যুবকটা ভয়ার্ত মুখ করে বলল-
“ কিছুই করি নি ভাই। আমি তো জাস্ট পানি দিলাম। মেয়েটা খেলো। তারপর হাত বাঁধতে গেলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে পালানোর সময় হটাৎ করে পেট ধরে বসে পরলো। আর রক্তে ভিজে যেতে লাগলো ফ্লোর। একটা আঁচ ও তো লাগে নি। ”
শেখরের কপালে দুটো ভাজ তখনো বিদ্যমান। পানি খাওয়ার পরই এমন হলো! কোনো ভাবে পানিতে গর্ভপাত করার পিল মেশানো ছিলো না তো? যেভাবে সে প্রেমার বাচ্চা নষ্ট করেছিল! এমন ভাবেই তো কাতরাতো প্রেমা। এভাবেই তো ব্লিডিং হতো। এটা তো তাদের প্ল্যানের অংশ ছিলো না তাহলে?
বাহির থেকে কয়েকটা পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেলো। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসলো। কে আসলো? দরজার পানে তাকাতেই দেখলো চারজন নার্স এসেছে। শেখর তাদের দেখে পূনরায় ভ্রু কুঁচকালো। নার্স ডেকেছে কে? সে তো ডাকে নি। তারা ভেতরে এসে বলল-
“ গর্ভপাত করানোর জন্য এখানে আসতে বলা হয়েছে আমাদের । মেয়েটা কোথায়? ”
শেখর ঘাড় ঘুরিয়ে মেহরিনের দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে নার্সগুলোও তাকালো। তারপর তারা ভেতরে ঢুকে বলল-
“ বের হোন আপনারা। ”
কথাগুলো কানে আসতেই ভয়ে মেহরিনের শরীর জমে গেলো। তাকে গর্ভপাত করানো হবে! তার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবে তারা! সে আকুতি আহাজারি করে বলতে লাগলো-
“ এটা করো না। আমার বাচ্চাটাকে মেরো না। আল্লাহ আমার বাচ্চাটাকে বাঁচাও। আব্বু, আব্বু দেখো ওরা কি বলছে। ওরা বলছে ওরা তোমার মেয়ের বুক খালি করে দিবে। আব্বু আমার সন্তান টাকে বাঁচাও। সুলতান সাহেব আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান। ওরে মেরে ফেলবে বলছে। কোথায় আপনি। আপনার করা পাপের ফল যে আমার নির্দোষ নিষ্পাপ বাচ্চা টা পেতে যাচ্ছে।
শেখ আর ঐ যুবকটা বেরিয়ে গেলো। দরজা আটকে দেওয়া হলো ভেতর থেকে। শেখর তাড়াতাড়ি করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে ফোন করলো। ওপর পাশ থেকে কল রিসিভ হতেই শেখর অস্থির গলায় বলতে লাগলো-
“ এসব তো আমাদের প্ল্যানের ভেতর ছিলো না। তুমি তো আমাকে বলো নি এসব করবে। ”
ওপাশ থেকে বিরক্তিকর গলায় ভেসে আসলো-
“ কি বলছেন? কি ছিলো না আমাদের প্ল্যানে? ”
“ নার্স কেনো পাঠালে? ভেতরে ওকে গর্ভপাত করানো হচ্ছে। আর মেহরিনের পানিতে কি কিছু মিশিয়ে দিতে বলেছিলে? ব্লিডিং হচ্ছিলো পানিটা খাওয়ার পরই। ”
ওপাশ থেকে সজোরে ভেসে আসলো একটা চিৎকার-
“ হোয়াট! কে করাচ্ছে ওর গর্ভপাত! আটকান,ইমিডিয়েটলি আটকান। আমি কাউকে পাঠাই নি। ওর গর্ভপাত করাতে যাব কেনো আলাদা করে? ও মরলে তো এমনিই পেটের বাচ্চা টা মরে যেত। ”
দাহশয্যা পর্ব ৯৪
শেখর ফোনটা কে’টে দরজায় কড়া নাড়তে লাগলো। আর ডেকে দরজা খুলতে বললো। কিন্তু দরজা খুলছে না। ভেতর থেকে মেহরিনের একের পর এক চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছে শুধু।
“ ছেড়ে দাও,ছেড়ে দাও আমাকে। দয়া করে মেরো না আমার বাচ্চাটাকে। অন্য কারো পাপের সাজা আমার সন্তানটাকে দিও না তোমরা….”
