দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ পর্ব ৬০
রিক্তা ইসলাম মায়া
রাত প্রায় এগারো-টার ঘরে। মেহমানদের ভিড় এতক্ষণে ছাঁদে পড়ে গেলো হলুদের অনুষ্ঠান করা করা নিয়ে। নাচ-গান হৈ-হুল্লোড়ে মাতামাতি। মিউজিক মুখর পরিবেশ। মায়া মাত্রই ছাঁদ থেকে নিচে নেমে যেতে চাইল।। উদ্দেশ্য কিচেনে যাবে। ঠান্ডা পানি পান করবে। জ্বরময় শরীরে তৃষ্ণায় ধুঁকছে গলা। গলা ভেজানো দরকার বলেই হেনা খানের আঁচল ছেড়ে একাই নিচে নামতে চাইল। কিন্তু ছাঁদের সিঁড়ি কাছে আসতেই দেখলো রিদকে ছাঁদের উপর উঠতে। গায়ে তার নরমাল ড্রেসআপ। টি-শার্ট টাউজার। ফিহার হলুদের অনুষ্ঠানের অ্যাটেন্ড করতে যে ছাঁদে আসেনি তা রিদের ড্রেসআপ ও বিরক্তকর ফেসটা দেখেই বুঝতে পারলো মায়া। কপালে সূক্ষ্ম বিরক্তির ভাঁজ। চোখ মুখ কুঁচকে কারও অনুসন্ধানের খুঁজ করে ছাঁদের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে ধুপধাপ পায়ে।
মায়া দেখলো সিঁড়ি ঘরের উপর থেকে রিদকে উঠতে। রিদ মায়াকে দেখা আগেই আস্তে করে সরে গেলো সেখান থেকে। লুকিয়ে পড়লো দরজার পাশে প্যান্ডেলের পিছনে। রিদ তপ্ত বিরক্তি নিয়ে ছাঁদে উঠে আসলো। মন মেজাজ দুটোই বিগড়ে আছে কাল থেকে। অকারণে বউয়ের সাথে ঝামেলা ভালো লাগছে না তার। শত কাজ ফেলে যদি বাড়িতে এসে বউয়ের মুখ দর্শন করাটাই নসীব না হয়। তাহলে মেজাজ এমনই বিগড়ায়। বাসায় এসেছে প্রায় ঘন্টা পেরিয়ে দেড় – ঘন্টা হলো তার। কাজের চাপে সবে গোসল সেরে অর্ধ মাথা মুছেই বের হয়েছে বউ খোঁজার উদ্দেশ্য। আপাতত এই মূহুর্তেই বউ লাগছে। দরকার পড়লে বউকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে রুমে বসে থাকবে সে। সারারাত কারও বের হওয়ার দরকার নেই। দুজন বন্দী হয়ে থাকবে। না খাবে। না বের হবে। সবকিছু কিছু আজ রুমেই চলবে। তারপরও আজকে এর শেষ দেখেই ছাড়বে সে। চুপ থেকে তাকে ইগনোর করাটা আজ বের করবে। ছোট বলে সবকিছুতে যে রিদ ছাড় দিবে সেটাও না। একটা বেহায়া মন তো তারও আছে। সেটা সারাক্ষণ শুধু বউ বউ করে সেটাতো বুঝতে হবে তাই না।
রিদ বিরক্তির দু-কদম আগাতেই হঠাৎই পিছন থেকে কেউ ঝাপটে ধরলো তাঁকে। রিদ থামে। বিগড়ে যাওয়া মেজাজ হুট করেই শান্ত হয়। ভাবলো তার বউ। পিছনের মানুষটিকে চিন্তিতে কয়েক সেকেন্ড দেরি করলো রিদ। সেটাই দ্বিতীয় ভুলের কারণ হলো।
পিছনের নারীটি রিদের পেট জড়িয়ে ধরে পিঠে উপর কপাল ঠেকাতেই রিদ শান্ত মেজাজে বলল…
—” রাগ পড়েছে তোমার!
—” হুমম!
রিদ চমকায়। অপরিচিত কন্ঠস্বর কানে বাজতেই রিদ ঝটকা মেরে নিজের পেট থেকে মেয়েটির হাতের বাঁধন খুলে পিছনে তাকাতেই চোখে পড়লো মেহুর জোরপূর্বক লাজুক হাসি। রিদের শান্ত হওয়া মেজাজটা পুনরায় বিগড়ে গেলো মেহুকে দেখে। রিদের মেহুকে চিন্ততে কয়েক সেকেন্ডের ভুলটা যেন আরও গাঢ় আগুনের ঘর করলো রিদ মায়াও সম্পর্কে। রিদের অজান্তে। মায়ার জানা। প্যান্ডেলের পিছন থেকে সবটাই শান্ত চোখে দেখলো মায়া। রিদের শান্তস্বরে কথা গুলোও শুনলো মেহুর প্রতি। কিন্তু বিষয়টি মায়া সহ্য করতে না পেরে হঠাৎই ফুপিয়ে উঠা কান্নায় দু-হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে শব্দ আটকালো। কাউকে শুনতে দিল না। কতটা ভালোবাসা মিশানো কন্ঠেস্বর ছিল ‘রাগ পড়েছে তোমার ‘ এই কথাটিতে। এতটা শান্ত আচরণ তো মায়ার সাথেও করতো রিদ। অথচ সময়ে ব্যবধানে আজ মেহুর প্রতি তার যত্ন। মায়ার জন্য সামান্য একটু সময় হয়না তার। সকাল নয়টা হতে হতে বাসা ছাড়ে। রাত বারোটা-একটা ছাড়া বাসায় ফিরে না। মায়ার সাথে শুধু রিদের নাস্তার টেবিলে একটু-আধটু দেখা হয় তাও মায়ার ঘুরঘুর করে যায় বলে। নয়তো সেটাও হতো না।
রাতে মায়া ঘুমিয়ে পড়লে বাসায় ফিরে সারাদিন খবর থাকে না। অথচ মেহুর সাথে তার রোজকার চলাফেরা। সারাদিন একসঙ্গে কাটায়। রাতে বাসাও একসঙ্গে ফিরে। ডিনার করে। এখন সবাই সামনেই জড়িয়ে ধরছে। যত্ন সহকারে কথা বলছে। কই দুটো মানুষের সামনেই তো রিদ মায়ার সাথে কথা বলতে চাই না। সবাইকে তাড়িয়ে দিয়ে তারপর লুকিয়ে ভাবে কথা বলে। অথচ আজ প্রকাশে তাদের ভালোবাসা বিনিময়? মেহুকে তো প্রকাশ্যে টানছে। ভালোবাসার মানুষ বলে পরিচয়ও দিচ্ছে। তাহলে মায়ার প্রকাশ্যে স্ত্রী মর্যাদা চাওয়াটা কি অপরাধ ছিল? মায়া তো রিদের সব শর্ত মানতেও প্রস্তুত।
পায়ে শিকল পড়ে হলেও প্রকাশ্যে সংসার করতে ইচ্ছুক তাহলে সে কেন মানতে চাচ্ছে না। মেহু আপুর জন্য? মায়া কি শুধু ছলনা? ছলনা হবে কেন? মায়াকে তো স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে.. সে কখনো মায়াকে ভালোবাসেনি। ভালোবাসবেও না। সে মেহুকে ভালোবাসে। রুম থেকেও সেদিন অপমান করে বের করে দিয়েছিল। আঘাত করেছে। তাহলে মায়া কেন তাদের পিছনে পড়ে থাকবে। মায়ার কি কান্না করাটা উচিত হবে? বড্ড বেহায়ামি লাগছে না দু’জনের সম্পর্কে তৃতীয় জন্য হয়ে। থাক তাদের মতো করে দুজন। আপাতত মায়ার প্রয়োজন কি এখানে? মায়া গুমোট কান্নায় নীরবে নেমে যেতে চাইলো ছাঁদ থেকে। রিদ দাঁতে দাঁত চেপে তেড়ে গেলো মেহুর দিকে। আঙ্গুল উঠিয়ে মেহুকে শাসানোর আগেই চোখ গেলো সামনে। মায়াকে চুপচাপ ছাদের সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে যেতে দেখে রিদ কপাল কুঁচকায়। মায়ার পিছন নিতে গিয়ে তাড়াহুড়োই রিদ আঙ্গুল উঠিয়ে রাগান্বিত স্বরে শাঁসালো মেহুকে। কঠোর বাক্য বলল….
—“ফর দ্য লাস্ট টাইম মেহু। নেক্সট টাইম ভুলেও আমায় ছুঁয়ার চেষ্টা করবি না। আজ ছেড়ে দিলেও কাল কিন্তু ছাড়বো না। শরীরে এসিড ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিব। বারবার বলেছি আমি বিবাহিত। আমার বউ চাই! বউয়ের ভালোবাসা চাই। তাই ডোন্ট প্লে মাইন্ড গেম উইথ মি। স্টে এওয়ে ফ্রম মি!
রাগান্বিত ভঙ্গিতে দুকদম এগোতেই পিছন থেকে পুনরায় শুনা গেল মেহুর কাতর কন্ঠেস্বর…
—” রিদ আমাদের তিন বছরের রিলেশনশিপ ছিল। সেটাকে তুমি এখন ভুলে যেত পারও না। তাও তোমার সো কল্ড দুইদিনের বউয়ের জন্য।
রিদ কপাল কুঁচকে পিছন মেহুর ঘুরে দাঁড়ায়। কপালে আছড়ে পড়া ভেজা চুল গুলো পিছনে ঠেলে দিল। মেহুর দিকে তাকাতেই দেখল তার মোহিত অপলক দৃষ্টি রিদের প্রতি। রিদ বিষয়টিতে তেমন পাত্তা দিল না। মেয়েরা তাকে হা হয়ে গিলে খাবে এমনটা যেনই স্বাভাবিক। রিদ মেহুর দৃষ্টি অপেক্ষা করে গলা ঝেড়ে পরিষ্কার করে শান্তস্বরে হুমকি বার্তাস্বরুপ বলে উঠে…
—” দেখ! প্রথমত্ব তোর এই তিন বছরের রিলেশনশিপ ! ভালোবাসা এইটা নিয়ে সাইড কাট তুই। তুই প্রপোজ করেছিস। আমি উত্তর দেয়নি। তুই আমার নীরবতাকে ভালোবাসা বলে চালিয়েছিস তিন বছর। সেটা তোর সমস্যা। আমার না। আমি তোকে কখনো বলিনি, যে আমি তোকে ভালোবাসি। রুম ডেট করেনি! আর না আমি তোর সাথে কখনো রাতভর ফোনে কথা বলে পার করেছি। অফিসিয়ালি কাজ ছাড়া আমাদের বছরও দেখা হয়নি। তোর আমার নাম, ক্ষমতার দরকার ছিল যেটা তুই প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে এসেছিস আজ পযন্ত। আমি তোকে পারিবারিক লোক বলে এতোদিন ছাড় দিয়েছি এসেছি। আগে দিতে পারি যদি তুই আমার পারসোনাল লাইফে না ঢুকিস। আমি ততক্ষণ তোর সাথে ভালো থাকবো যতক্ষণ পযন্ত আমার মনে হবে সব ঠিকঠাক আছে। কিন্তু যেদিন মনে হবে তোর জন্য আমার পারসোনাল লাইফের সমস্যা হচ্ছে! সেদিন তোর ভালোবাসা, আর তুই! দুটোই নিস্তেজ প্রাণহীন হয়ে পড়বি। ‘ক্ষমা করা’ শব্দটা কিন্তু আমার ডিকশনারিতে নাই! জীবনে কখনো ক্ষমা করি নাই কাউকে বউ ছাড়া। রাগের বশে মাঝেমধ্যে বউকেও আঘাত করে ফেলি। এবার ভাব! আদুরে বউ যদি ছাড় না পাই তুই পাবি কখনো? তাই সাবধান! ভালো হয়ে যাহ। আমার সন্দেহের লিস্টে পড়িস না। নিজের প্রাণ বাঁচা।
রিদের শান্তস্বরের হিম শীতল কথায় মেহুর হাড়সহ ভয়ে কেঁপে উঠে শরীরময়। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যায় তীব্র ভয় কম্পন। রিদ সম্পর্কে একটু বেশিই অবগত মেহু। কালো দুনিয়ায় নতুন নতুন বেতাল বাদশাহ হিসাবে পরিচিত পাচ্ছে সে। ক্ষমতা- পাওয়া, প্রতিপত্তি সবকিছুই যেন তরতর করে দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তার। কি নিদারুণ নিষ্ঠুর মানুষ হিসাবেও পরিচিত সে সেই দুনিয়ায়। যা বলে তাই করে। কথা কাজে এক। নড়চড় কখনোই হয় না। বিচক্ষণ ক্রিমিনাল মাইন্ডের মানুষ। প্রয়োজন ছাড়া কাউকে হুমকিও দিবে না। তারমানে মেহুকে সন্দেহ দৃষ্টিতে দেখছে সে? মেহু আতঙ্কে উঠে ভয়ার্ত চোখে রিদের দিকে তাকাতেই দেখলো রিদ ততক্ষণে ছাঁদে সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে যাচ্ছে। রিদকে চলে যেতে দেখে স্বস্তিরশ্বাস নিল মেহু। ভয়ডর নিয়ে হলেও সূক্ষ্ম ভাবে নিজেদের কার্য সফল করতে হবে। কারণ এর পিছনে অনেক বড় একটা গ্রুপের হাত রয়েছে।
চাইলেও বের হওয়া সম্ভব না। বের হতেও চাই না সে। মেহু ধীর হাতে ফোনের ইনবক্সে গিয়ে গটগট করে কালো অক্ষরের গুটি কয়েকটি বাক্য লিখে মেসেজ পাঠালো কারও উদ্দেশ্যে। তারপর সূচালো দৃষ্টি তুলে চারপাশটা হাল্কা পযবেক্ষণ করে অন্য পাশে গেলো। তাদের আরও অনেক কিছু করা বাকি। রিদ খানের নায়িকাকে বিশেষ কারও হাতে তুলে দেওয়া বাকি। এতো অল্পতে কি ভয় পেলে তাদের চলবে। রিদ খান সবকিছু জানতে পারলে তোহ তাদের জন্য খারাপ হবে। না জানলে হবে কিভাবে? চারপাশ থেকে এতো সূক্ষ্ম ভাবে জাল বুনা হয়েছে যে ছিঁড়ে বের হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া মেহুর তো রিদকে চাই। ভালোবাসার জন্য নাহয় একটু ক্রিমিনাল সেও হলো। এবার দাবার গুটি হিসাবে শুধু মায়াকে নয় তার পরিবারকে ঢানতে হবে। রিদ খানের দূর্বলতা বলে কথা একটু মজা তারাও নিবে। সবকিছুর শুরুটা যখন এতটা নিখুঁত ভাবে হয়েছে তাহলে শেষটা অবশ্যই হৃদয় বিদারক হবে।
মানুষহীন ড্রয়িংরুম পার হয়ে কিচেনের দিকে হাঁটতেই মায়ার লম্বা চুলে হঠাৎই টান পড়ায় অস্পষ্ট স্বরে চিৎকার ‘আহ’ বেরিয়ে আসে মায়ার মুখ থেকে। হাত দিয়ে মাথা পিছনে চেপে ধরে পিছন ঘুরতে গিয়েও ঘুরলো না মায়া। কাঙ্ক্ষিত মানুষটির উপস্থিত বুঝতে পেরে স্থির হলো৷ মাথার পিছন থেকে হাতটা সরিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়লো। প্রতিক্রিয়াও জানালো না আর। রিদের উপস্থিতি বুঝতে পেরেই শান্ত হয়ে গেল মায়া। নড়লো না। শরীর শক্ত করে ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো জেদ ধরে। গুমোট কান্না গুলো চোখ পাকিয়ে নোনাজলে দরদর। কাজল কালো চোখ থেকে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে শাড়ির উপর। দুইজন স্থির। রিদ তপ্ত মেজাজ তো মায়া গুমোট উত্তাপে। নীরব শব্দ বিহীন শ্বাস গুলো যেন দুজনের মধ্যকার মানঅভিমানের বাক্য প্রকাশ করছে একে অপরের হয়ে। দীর্ঘ নীরবতায় দুজনই পার করলো পাঁচটা মিনিট। মায়া না ঘুরে অপেক্ষা করলো রিদের চুল ছেড়ে দেওয়ার জন্য।
কিন্তু রিদ ছাড়লো না। বরং মায়ার জেদে নীরব সম্মতি জানিয়ে সেও দাঁড়িয়ে রইলো চুল ধরে। না রিদ কথা বলছে। আর না মায়াকে যেতে দিচ্ছে। মায়া জেদ দেখিয়ে এবার যেতে চাইল সামনে। দু-কদম হাঁটতেই পুনরায় তার লম্বা চুলে টান পড়তেই সে আবারও দাঁড়িয়ে গেল। বিরক্তি রেশ টেনে চাপা রাগ হলো। কিন্তু সেটা প্রকাশ করলো না। এবারও মায়া শান্ত থাকলো। মনোবল শক্ত করে রিদকে এড়িয়ে পুনরায় সামনে হাঁটল নিঃশব্দে। রিদও মায়ার পিছন পিছন গেল বউয়ের লম্বা চুল ধরে। এই মূহুর্তে বউয়ের সাথে কথা বলাটা সঠিক মনে করলো না রিদ। এই মূহুর্তে রিদের কথা বলা মানেই পুনরায় ঝামেলা সৃষ্টি করা দুজনের মধ্যে। এমনই গত দুইদিনের বিষয়ে ধরে এবং কিছুক্ষণ আগে মেহুর সাথে তার ঘটা ঘটনা নিয়ে এখন কথা বললে আরও ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে। রিদ এই প্রথম বোকা বউয়ের জেদ্দি রাগকে ভয় পেল। দেখা যাবে বউ তার অবুঝতায় রিদকে উল্টাপাল্টা কিছু বলে বসবে। আর রিদ সেই রাগের বশে জোর হাতে আঘাত করে বসবে তাকে। পরিস্থিতি তখন আর বিগড়ে যাবে। সমস্যা তখন তারই হবে। মান-অভিমানে তখন আরও একটা রাত পার হবে তার। তার চেয়ে বরং বউ রাগ করছে করুক। রিদেরি কথা বলাই দরকার নাই। বউ শান্ত হলে নাহয় বুঝানো যাবে সবকিছু। এখন না।
মায়া কিচেনে যেতে যেতে জোরপূর্বক রিদ হাত থেকে নিজের চুল ছাড়িয়ে খোঁপা করে নিল। পিছনে না ঘুরে সোজা কিচেন গেল। রিদও পিছন পিছন দাঁড়ালো।মায়া ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা পানির বোতল হাতে নিতেই রিদ সেটা কেঁড়ে নিলো খাওয়ার জন্য। মায়া বিরক্ত বা হতাশ হলো না। এমন একটা ভাব করলো যেন রিদ এই সময়ে এমনটাই করবে সেটা আগে থেকেই জানতো মায়া। স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ঠান্ডা পানির দ্বিতীয় বোতলটি তুলে নিল হাতে। সেল্ফ থেকে গ্লাস নিয়ে পানি ঢেলে খেতেই রিদ পুনরায় মায়াকে বিরক্ত করলো। ঠাস করে মায়ার হাত খোঁপা করা চুল গুলো ছেড়ে দিল। ঝরঝর করে মায়ার সিল্কি চুল গুলো পিঠ ছড়িয়ে হাঁটুতে গিয়ে ঠেকতেই। রিদ মায়ার মুখ থেকে অর্ধ খাওয়া পানির গ্লাসটি কেঁড়ে নিলো। নিজেও খেতে লাগলো।
কিন্তু মায়া এবারও রিদের সবকিছু শান্ত ভাবে নিল। বিরক্তি বোধ না করে পুনরায় অন্য একটি গ্লাস টানলো নিজের কাছে। বোতল থেকে পানি টালতেই রিদ আবারও বিরক্ত করলো। মায়ার কানের ঝুমকোই টোকা মারল। গাল টেনে দিল। মায়াকে এতেও প্রতিক্রিয়া জানাতে না দেখে রিদ আরও একটি কাজ করলো। ব্লাউজের পিছনের ফিতা ঠাস করে খুলে দিল। মায়া এবার প্রতিক্রিয়া জানালো। চমকে উঠে পিছন না ঘুরে দ্রুত হাতে শাড়ির আঁচল টেনে পিঠ ঘুরে দিতে গিয়ে পুনরায় বাঁধা পেল রিদের থেকে। রিদ মায়ার শাড়ির আঁচল ধরে মায়াকে পিঠ ঘুরতে বাঁধা দিল। মায়া রিদ থেকে শাড়ি আঁচল ছাড়াতে বার কয়েক টানাটানি করলো কিন্তু রিদ ছাড়লো না। তাই বাধ্য হয়েই হাল ছেড়ে দিয়ে বোতলে মুখ লাগিয়ে এবার পানি খেতে চাইল যেহেতু রিদ মায়াকে ঠিকঠাক পানি খেতে দিচ্ছে না তাই। মায়ার পানি খাওয়া মধ্যেই রিদ মায়ার কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস স্বরে একটু করে বলে উঠে…
—” দেশের প্রতি এতো ভালোবাসা তোমার? সোজা লাল সবুজ পতাকা পতাকা হয়ে ঘুরছো?
মায়া কপাল কুঁচকায় রিদের কথায়। লাল সবুজ পতাকা হয়ে ঘুরছে এর মানেটা বুঝতে না। গায়ে তার কলাপাতা রঙ্গা শাড়ি। মানে সবুজ রঙই। কিন্তু লাল রঙ্গের তো সে কিছু পড়লো সারা শরীর জুড়ে তাহলে? লাল সবুজ পতাকা হলো কিভাবে? মায়ার কৌতূহল জাগলেও পিছন ঘুরে প্রশ্ন করলো না রিদকে। মান-অভিমানে চুপ থাকলো। কিন্তু রিদ যেন মায়ার নিশ্চুপ মনের কৌতূহলটা বুঝতে পারলো। মায়ার সর্তকের কান খাঁড়া করলো রিদ কি বলে সেটা শুনার জন্য। কিন্তু তার আগেই মায়াকে প্রচুর চমকে দিয়ে করে বসলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ। মায়ার কাঁধের দৃশ্যমান লাল ফিতা ধরে ‘ঠাস’ শব্দ করতেই মায়া আতঙ্কে উঠে।
রিদ কোন ইঙ্গিত করে তাকে এতক্ষণ লাল সবুজ পতাকা বলছিল বিষয়ে বুঝতে পেরেই লজ্জা সিঁটিয়ে দ্রুত হাতে কাঁধের ব্রাউজ টেনে অবশিষ্ট ফিতাবন্ধনী ঢাকলো কাপড়ের তলে। মায়া ছিঃ লজ্জা জনক পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার আগেই রিদ আরও একটি অপ্রত্যাশিত কাজ করলো মায়ার সাথে। মায়াকে বিরক্ত নাস্তানাবুদ করে করে ‘ঠাস করে মায়ার অপর পাশে কাঁধের শাড়ির পিন খুলে দিতেই আঁচল খুলে দরদর করে পড়লো ফ্লোরে। লজ্জায় আড়ষ্ট মায়া আতঙ্কে উঠলো রিদের এমন অপ্রত্যাশিত কাজে। হাতের বোতলটিও ততক্ষণে জায়গায় পেল পায়ের কাছে ফ্লোরে। আতংকিত হাতে মায়া তৎক্ষনাৎ শাড়ির আঁচল উঠাতে চাইলো ফ্লোর থেকে। কিন্তু তার আগেই রিদ মায়ার বাহু টেনে নিজের দিকে ফিরালো অবশেষে। মায়াকে দু’হাতে ঝাপটায় ধরে নিজের বক্ষতলে ঢেকে নিলো মায়ার ছোট নরম দেহটি। মায়া লজ্জায় অস্তিত্ব হলো ভিষণ। রিদের বাহু বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করতেই রিদের হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় হলো মায়ার প্রতি। মায়া মুখ রিদের বুকের সাথে চেপে যেতেই খানিকটা শান্ত হলো সে। রিদ ছাড়বে না বুঝতে পেরে শান্ত হয়ে আসতেই কানে কর্ণধার হলো জুঁইয়ের চমকানো সুর..
—” রিক্ত.. সরি! সরি! সরি! আ আমি.. আমি কিছু দেখিনি…
কিচেন জুইয়ের হঠাৎ আগমন ছিটকে সরলো মায়া রিদ। রিদ বিরক্তি নিয়ে পিছন ঘুরে তাকাতেই মায়া দ্রুত হাতে ফ্লোর থেকে শাড়ি আঁচল তুলে গায়ে জড়ালো।
পরিস্থিতিতে উত্তাপে লজ্জিত নুইয়ে পড়ে পিছনে ঘুরে যায় মায়া। জুইও হঠাৎ এমন পরিস্থিতির স্বীকার হবে বুঝতে না পেরে থতমত খেয়ে যায়। জুইয়ের আচানক আগমনটা রিদের পছন্দ হলো না। সারাদিন পর বউকে কাছে পেয়েছিল সে। আর সেই মূহুর্তেই জুইয়ের বেটু দেওয়াটা ছিল রিদের মেজাজ বিগড়ে যাওয়া কারণ। রিদ রাগলো কিন্তু প্রকাশ করলো না। পরিস্থিতি বুঝে বিরক্তির চুপ থাকলো। দোষ দিলনা কাউকে। শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে মায়াকে এক পলক দেখে গুমোট শ্বাস ফেলে জুঁইকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল বাহিরের। রিদ যেতেই জুই এগিয়ে আসলো। মায়া পিছনে দাঁড়িয়ে গুঁতো দিল মায়ার কমড়ে। মায়া চমকে উঠে পিছনে তাকাতেই চোখে পড়লো জুঁইয়ের দুষ্ট চেহারাটা। মায়া হালকা চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে রিদ দেখতে না পেয়ে স্বস্তিরশ্বাস ফেললো। নিজেকে শান্ত করে ফ্লোর থেকে শাড়ির পিন নিয়ে আঁচলে গুজাতেই শুনা গেল জুইয়ের দুষ্টুস্বর।
—” কি বোনু কি চলে হুমম??
মায়া তপ্ত মেজাজ দেখিয়ে বলে…
—” প্রতিবন্ধী তুই দেখস না বাড়িতে বিয়ে চলে।
—” উদি! আমি কি তোরে বিয়ের কথা বলছি। নাকি কিচেন কি চলে সেটা বলছি।
—” আপাতত কিচেনের ফ্রিজ চলে শুধু। গ্লাস বন্ধ আছে। চাইলে সেটাও চলাতে পারিস তুই। আর কিছু?
—” মাইয়া মজা লস আমার সাথে। কথা ঘুরাস তুই? এজন্য তুমি বাড়িতে যাও নাই আমাদের এতো বলার পরও। আহ! জামাই পাগল মাইয়া। ভাইয়াও কি রোমান্টিক মানুষ। বউকে সঙ্গ দিতে সোজা কিচেনে উফ! তোর কি সিস্টেম ঠিক হয়ে গেছে রিতু?
মায়া বিরক্তর কপাল কুঁচকে বলে…
—” অন্যের সিস্টেম ঠিক করার মনোযোগ না দিয়ে নিজেরটা ভাব। জামাই কিন্তু একটা তোরও আছে। ডাক্তার মানুষ! সিস্টেম সম্পর্কে নলেজটা মনে হয় তার একটু বেশিই আছে মাথায় সবার থেকে। আমার সাথে লাগলে! তোর সিস্টেমের খবর কিন্তু তার কানে যেতে দেরি হবে না। বেশি কিছু বললো না! সুন্দর সাবলীল ভাষা বললো ‘তোর সিস্টেম বেশি চলে। শুধু একটু টাইট-ফাইট দেওয়ার জন্য। ব্যস!
মায়ার কথায় খানিকটা ভয়ার্ত হলো জুঁই। নরম হয়ে আসা গলায় বললো…
—” তুই এমনটা করতে পারবি আমার সাথে বইন?
—” আমি অনেক কিছু করতে পারি! আমার সাথে লাগতে আসবি সোজা চার লাইন বেশি বানিয়ে বিচার যাবে তোর জামাইর কানে। আমি কিন্তু জানি আপনাদের মধ্যে আজকাল কি চলে। তাই খোঁচা একটা আমিও দিতে পারি মনে রাইখেন!
—” তোরে সবাই যতটা বোকা ভাবে, ততটা বোকা কিন্তু তুই নস। আমি কিন্তু জানি তুই যে কতটা গভীর জলের মাছ।
মায়া জুইয়ের কথায় তৎক্ষনাৎ উত্তর করলো না। বরং ফ্লোরে পড়ে থাকা পানি বোতলটা উঠালো। ব্লাউজের পিছনের ফিতাটাও বাঁধলো। তারপর জুঁইয়ের কুঁচকানো দৃষ্টি সাথে নিজের দৃষ্টি স্থির করে বললো…
—” সবকিছুতে প্রতিবাদ করতে আমি জানি না। বাস্তব সম্পর্কে জ্ঞানও কম। হয়তো অল্পতে মানুষকে ভালোও বেসে ফেলি। কিন্তু এর মানে এই না যে আমি বোকা। অল্প একটু জ্ঞান আমারও আছে। এবার আমার সহজ-সরলতারকে কেউ যদি বোকা ভাবে তাহলে সেটা তার সমস্যা! আমার না। একটা মাথা আমারও আছে। বেশি না হলে অল্প জ্ঞান নিয়ে হলেও চলি।
—” তাহলে তুই মানছিস তুই যে গভীর জলের মাছ।
—” আমি ছাদের যাচ্ছি তুই আয়।
মায়া কয়েক কদম হেঁটে সামনে এগোতেই পিছনে থেকে পুনরায় ডেকে উঠে জুঁই…
—” উত্তরটা দিবি না?
মায়া দাঁড়িয়ে পড়ে পিছনে ঘুরে তাকালো জুঁইয়ের দিকে। বিনা দ্বিধায় নিজ বাক্যে বললো…
—” উত্তরটা আমার কথার মধ্যেই ছিল। তুই ধরতে পারিস নি। আমি বলেছি! আমি মানুষকে অল্পতে ভালোবাসতে জানি। তার মানে এই না যে আমি সবাইকে অল্পতেই বিশ্বাসও করি। মানুষকে ভালোবাসাটা হিউম্যান নেচারের মধ্যে পড়ে। দয়া-মায়া থেকে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়ে ভালোবাসা হয়। কিন্তু বিশ্বাস শব্দটা সবাইকে করা যায় না। কারণ বিশ্বাস শব্দটা মায়া-দয়ার সহানুভূতির মধ্যে পড়ে না। এটা সম্পূর্ণ মাইন্ড জনিত বিষয়। আর্দশ বাবার মেয়ে আমিও হয়। আত্মসম্মান বোধ আমারও আছে। সহজে সবকিছু ছেড়ে দিব না অন্তত।
মায়ার কথা গভীরতা বুঝতে জুই খানিকটা দ্বিধা নিয়ে বললো…
দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ পর্ব ৫৯
—” তুই কি ভাইয়া উপর কোনো বিষয় নিয়ে রেগে আছিস রিতু? আমি লক্ষ করেছি বিষয়টি? কিছু হয়েছে তোদের মধ্যে?
—” কিছু না! তুই আয়। আমি যাচ্ছি ছাঁদে।
মায়া কিচেন থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুম ধরে আগালো সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাওয়ার জন্য। নিচের পরিবেশটায় অনেকটা নিরব। ছাদে মেহমানদের ভিড় জমে আছে। সেখানে ছেলে-মেয়েদের দল বেঁধে নাচ গান হচ্ছে তাই। ছাদের মিউজিক নিচে আসছে তবে ততোটা না। মোটামুটি ঠিকঠাক। মায়া বিষন্ন মনে আরও খানিকটা আগাতেই কারও গোঙ্গানির শব্দ কানে আসতেই থেমে যায়। সর্তকের কান খাঁড়া করে এগিয়ে যায় শব্দের উৎস ধরে নিচে গেস্ট রুমে দিকে। সন্দেহ দিয়ে কৌতূহল বশত হালকা হাতে গেস্ট রুমে দরজায় ধাক্কা দিতেই চোখে পড়লো দুজন মানুষের ধস্তাধস্তি জাবরদস্তি অবস্থা।
