Home নিষিদ্ধ রংমহল নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৯

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৯

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৯
আতিয়া আদিবা

বাঈজী মহলের দীর্ঘ প্রদক্ষিণ পথ ধরে হেমাঙ্গিনীর ছায়াটি তখন দেয়ালে দেয়ালে লেপ্টে যাচ্ছিল।
লণ্ঠন এবং মশালগুলোর ক্ষণস্থায়ী আলোয় সে ছায়া কখনো দীর্ঘ কিংবা কখনো বিকৃত। এ যেনো কোনো সাধারণ রমণীর ছায়া নয়, বরং এক অদম্য যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি। যার হৃদয়ে জ্বলছে রহস্য উদঘাটনের অনল। চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে লুকায়িত সত্য।

​নতুন বাঈজী সিমরানের অভিষেক তাকে এক গভীর সংকটের সম্মুখে দাঁড় করিয়েছে। হেমাঙ্গিনীর মন বলছে, মায়ের গোপন নৃত্যশৈলী নিয়ে সিমরানের আগমন কোনো সাধারণ কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না।
বিলকিস বানুর খাস কামরার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল হেমাঙ্গিনী। ভেতর থেকে ভেসে আসছে চাপা কান্নার শব্দ। এ শব্দ তার হৃদয়ে এক অজানা শঙ্কা জাগাল।
​হেমাঙ্গিনী নিঃশব্দে দরজার কাছে দাঁড়াল। দরজা সামান্য খোলা ছিল। সে দেখল, তাদের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও কঠোর স্বভাবের উস্তাদনী বিলকিস বানু, আজ নিজের পালঙ্ক ছেড়ে মেঝেতে বসে আছেন। সর্বদা পরিপাটি থাকা তার কেশরাজি আজ এলোমেলো। পরিধানের পোশাকেও দেখা মিলছে সামান্য অসাবধানতার। চোখের কোণে লেপ্টে যাওয়া কাজল যেন অশ্রুর ধারায় অনেকটাই মুছে গেছে। যা প্রকাশ করছিল এক গভীর মানসিক বিপর্যয়।
বিলকিস শূন্য দৃষ্টি মেলে অতীতের কোনো অদেখা স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি ফিসফিস করে স্বগতোক্তি করছেন,

​- অসম্ভব! এ হতেই পারে না। সরলতা আমার সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। তবে কি সে আমায় মিথ্যা বলেছিল? তবে কি সে তার শিল্পের পবিত্রতা রক্ষায় শেষ পর্যন্ত অপারগ হয়েছিল?
​হেমাঙ্গিনীর মনে মুহূর্তের জন্য এক চিলতে সন্দেহের দানা বাঁধল। তবে কি বিলকিস বানু, যিনি তাকে মায়ের মতোই আগলে রেখেছেন এতদিন, তিনিই তার মায়ের শিল্পকে অন্য কাউকে গোপনে শিখিয়েছেন?
​কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজের মনকে শাসন করল সে।
দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে বিলকিস বানু গজনবী এস্টেটের সীমানা পেরোননি। সুদূর দিল্লি থেকে আসা সিমরানকে এত কঠিন মুদ্রার তালিম দেবেন, তাও এত অল্প সময়ে, এ অসম্ভব। এর পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য আছে।
​হেমাঙ্গিনী নিঃশব্দে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। বিলকিস বানুর পাশে বসে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখতেই বিলকিস বানু সামান্য চমকে উঠলেন।
​হেমাঙ্গিনীকে দেখে তিনি নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত দুঃখ যেন বাঁধ ভেঙে দিল। তিনি হেমাঙ্গিনীকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বললেন,

– বেটি! আমি পাপী হলাম রে! তোর মায়ের দেওয়া সেই অমূল্য আমানত, যা আমি বুকের ভেতর বহু বছর ধরে আগলে রেখেছিলাম, আজ তা প্রকাশ্য জনসমক্ষে ধুলোয় মিশে গেল। সিমরান কিভাবে সেই নাচ জানল?
​হেমাঙ্গিনী বিলকিস বানুর পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। যদিও সে নিজেও একই অকুল পাথারে ভাসছে।
তবুও তার দায়িত্ব এখন বিলকিস বানুকে সামলানো। তবে তার মনে আরেকটি প্রশ্ন কাঁটার মতো বিঁধছে। সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে হেমাঙ্গিনী শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

– শান্ত হও, খালা। আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দাও তো! তুমি বলেছিলে এই নাচ আমার মায়ের একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি। তার গোপন শিল্প। তবে মা কেন তোমায় এই নাচ শিখিয়েছিলেন? একজন বাঈজী তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র কেন অন্য আরেকজন বাঈজীকে শেখাবেন? এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর কারণ ছিল?
​বিলকিস বানু কান্না থামিয়ে হেমাঙ্গিনীর দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে তখনো গভীর বিষাদের ছায়া। তিনি চোখ মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,

​- একই প্রশ্ন আমিও তোর মাকে বারবার করেছিলাম। তাকে বারণও করেছিলাম। বলেছিলাম – সরলতা, এই নাচ তোর জীবনের তুরুপের তাস। এটা কাউকে শেখাস না। আমাকেও না। কিন্তু তোর মা আমার কোনো কথা শুনল না।
​বিলকিস বানু তাঁর অতীতের স্মৃতিতে ফিরে গেলেন। তার কণ্ঠস্বর আরও বেদনাপূর্ণ হলো।
​- সরলতা সর্বদা বলত, আমি তার প্রাণের সখী। এই বাঈজী মহলের ষড়যন্ত্র, ঈর্ষা আর হিংসার মাঝে সে একমাত্র আমাকেই বিশ্বাস করত। হয়ত ওর মনে কোনো কুশঙ্কা ছিল। হয়ত সে তার আসন্ন বিপদ আঁচ করতে পেরেছিল! তাই চেয়েছিল, তার অবর্তমানে কেউ যেন অন্তত এই শিল্পকে অবিনশ্বর করে বাঁচিয়ে রাখুক। সরলতা আমায় দিয়ে শপথ করিয়ে নিয়েছিল। বলেছিল,

‘আমি যদি বেঁচে না থাকি, তবে তুই আমার সন্তানকে এই গোপন নৃত্যকলা শিখাবি, বিলকিস।’
তোর মা আমার কাঁধে এই গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছিল, বেটি।
​বিলকিস বানুর কথায় যথেষ্ট আবেগ ছিল বটে কিন্তু তা হেমাঙ্গিনীর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিকে তুষ্ট করতে পারল না। প্রাণের সখী হলেও কেউ নিজের অতি গোপন শিল্প এভাবে অন্যের হাতে তুলে দেয় না। আর যদি তার মা সত্যিই আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরেই বিলকিস বানুকে এই শিল্প শিখিয়ে থাকেন, তবে সুদূর দিল্লি হতে আগত ওই সিমরানের নাচেও কেন একই অবিনশ্বর ভঙ্গিমা বিরাজমান? এই শিল্পের সাথে সিমরানের যোগসূত্র ঠিক কোথায়?
​হেমাঙ্গিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলো। হয় বিলকিস বানু সবটা জেনেশুনেও আত্মরক্ষার জন্য কিছু একটা গোপন করছেন, অথবা তার মায়ের মৃত্যু, এই গোপন নাচ, আর সিমরানের আগমন সবকিছুর মাঝে এক অদৃশ্য, জটিল সুতো বাঁধা আছে। আর এই সুতো কেবল-ই বিপদ ও রহস্যের জাল বিস্তার করছে।
​হেমাঙ্গিনী বিলকিস বানুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল। তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগল।
​সহসা ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা তেলের লণ্ঠনটা তেলের অভাবে দপ করে নিভে গেল। অন্ধকার মুহূর্তের মাঝেই গোটা কক্ষকে গ্রাস করল। যা নিয়ে এলো এক প্রতীকী বার্তা_
হেমাঙ্গিনী, তোমার সম্মুখের অন্ধকার পথটা আরও দীর্ঘ। আরও রহস্যঘেরা। আরও বিপদসংকুল। সত্যের সন্ধানে তোমায় এই অন্ধকার পথ হাতড়ে চলতে হবে।

গজনবীর সুবিশাল মহলের মেহমানখানা – সংলগ্ন প্রশস্ত কক্ষটিতে তখনো উৎসবের রেশ লেগে আছে।
কক্ষের একপাশে রাখা ভারী রুপোর রেকাবিতে থরে থরে সাজানো ছিল ফলমূল, মিষ্টি এবং সুগন্ধি পানীয়। যা সাধারণত জমিদারবাড়িতে সম্মানিত অতিথিদের জন্য পরিবেশন করা হয়।
দিল্লি থেকে আগত বাঈজী সিমরান তার দল নিয়ে সেই কক্ষেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। দলের অন্যান্য বাঈজীরা রাতের খাবারের শেষে হালকা আলোচনায় মগ্ন।
যুবতী ​সিমরান একটি রেশমি গালিচার ওপর হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। তার চোখে-মুখে তখনো লেগে আছে অভাবনীয় সাফল্যের ঘোর। যদিও তার দেহ সামান্য ক্লান্ত। কিন্তু মন ছিল সতর্ক এবং সজাগ। যেন সে অপেক্ষার প্রহর গুনছে এক বিশেষ মুহুর্তের।
​ঠিক তখনই, কক্ষের দ্বারে পদধ্বনি শোনা গেল। দরজায় এসে দাঁড়ালেন জমিদার সিকান্দার গজনবীর প্রধান খিদমতগার, দাউদ।
দাউদের চেহারা ছিল গুরুগম্ভীর। তাকে দেখে উপস্থিত সকলের গুঞ্জন থেমে গেল।
সবাই সতর্ক হয়ে উঠল।
​দাউদ বিনম্রভাবে কক্ষের মাঝখানে দাঁড়ালেন এবং সিমরানের দিকে সামান্য ঝুঁকে অভিবাদন জানালেন।

​- সাহেবা! হুজুর সিকান্দার গজনবীর হুকুম হয়েছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে চান, আজকের রাতের এই শুভক্ষণটি আরও কিছুক্ষণ স্থায়ী হোক।
​সিমরান মৃদু হেসে পানপাত্র হাতে নিল। তার এই শান্ত ভাব দলের অন্যান্যদের মধ্যে কৌতূহল বাড়িয়ে তুলল। তারা জানত, এই আহ্বান কীসের ইঙ্গিত।
​- হুজুরের এই রাজকীয় আমন্ত্রণ আমাকে ধন্য করল, জনাব। তা হুজুর এই অধীনাকে কীসের জন্য স্মরণ করেছেন তা নিয়ে কিছুটা সন্দিহান। পরিষ্কার করে বলা যাবে কি?
​দাউদ এবার সরাসরি আসল কথাটি বলল। তবে অত্যন্ত নম্র ও বিনীতভাবে।
​- হুজুর চেয়েছেন আজকের রাতটি যেন আপনি তার খাস কামরায় অতিবাহিত করেন। তবে তিনি কোনো জবরদস্তি চান না। যদি আপনার কোনো আপত্তি কিংবা অনীহা না থাকে, তবেই তিনি আপনার উপস্থিতি কামনা করেছেন। তিনি আপনার বিনয় এবং সম্মতির জন্য অধীর অপেক্ষায় মগ্ন।
​সিমরান জানে কোনো প্রভাবশালী বাঈজীর সঙ্গে নবাবের সম্পর্ক তৈরি হওয়াটাই যেন এক অলিখিত নিয়ম।
যদিও দাউদের বাক্যবাণে কোনো জবরদস্তি ছিল না, তবে এর পেছনে লুকিয়ে ছিল নবাবের তীব্র বাসনা। যা উপেক্ষা করা অনুচিত।

​সিমরানের দলের অন্যান্য বাঈজীরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। তারাও জানে, উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা মানে জমিদারের বাসনাকে অবজ্ঞা করা। কিন্তু তাদের দলনেত্রী সিমরান পূর্বেও বহু প্রভাবশালী জমিদারকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আজ কি করবেন তা জানার ইচ্ছা জাগল তাদের মনে।
​সিমরান তার পানপাত্রের কিনারা ধরে ধীরে ধীরে ঘোরাতে লাগলেন। তার চোখজোড়া ছিল নিমগ্ন। যেন সে পানীয়ের মধ্যে তার ভবিষ্যতের ছবি দেখছে। অতি দ্রুত নিজ মনে কিছু হিসেব কষে নিল সে।
এই জমিদার বাড়ির মাহফিলে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করবার চেষ্টা তার বহু বছরের। তবে গজনবী জমিদার বাড়ি নিজেদের মহলের বাঈজীদের দিয়েই এতকাল মাহফিল মাতিয়েছেন।
ওদিকে ​প্রতিশোধের তীব্র বাসনা সিমরানকে গড়ে তুলেছে একজন খ্যাতিমান বাঈজী হিসেবে। উদ্দেশ্য একটাই, যদি গজনবী মহল থেকে কোনোদিন আমন্ত্রণ পাঠানো হয়?
এত বছর পর ভাগ্য তার সহায় হয়েছে।
আজ রাতে জমিদারের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া মানে প্রতিশোধের পথে এক অনিবার্য পবিত্র পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এই সান্নিধ্যকে সে গর্বের সহিত মেনে নিবে।
​সিমরানের মুখমণ্ডলে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল প্রসন্ন হাসি। সে গালিচা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মিষ্টি স্বরে বলল,

– হুজুরের এই আহ্বান আমার মতো সামান্য শিল্পীর জন্য পরম সৌভাগ্য। আমি মনে করি, একজন শিল্পীর সর্বোচ্চ প্রাপ্তি হলো তার পৃষ্ঠপোষকের হৃদয়ে স্থান পাওয়া।
পায়চারি করে সামান্য সামনে এগিয়ে আসল সিমরান। দেয়ালে ঝুলতে থাকা দামী লণ্ঠনের মৃদু আলোয় ঝলকিত হল তার রূপ। গালে হাসি ঝুলিয়ে বলল,

– আমার কোনো আপত্তি নেই। বরং আমি কৃতজ্ঞ। আমি হুজুরকে জানাতে চাই, তার এই আমন্ত্রণকে আমি সাদরে গ্রহণ করেছি। আমার পক্ষ হতে এটি তার প্রতি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্মান জানানো নয় বরং তার প্রতি আমার আনুগত্যের প্রমাণ।
​দাউদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটল। সে জানে এই সম্মতি নবাবকে অনেক বেশি খুশি করবে।
-আপনার এই বিনয় ও সম্মতি হুজুরকে অত্যন্ত খুশি করবে, সাহেবা। আমি আপনার জন্য পাল্কির ব্যবস্থা করছি। শুভ হোক আপনার যাত্রা।
​সিমরান হাসিমুখে সম্মতি জানালেন। তার দলের বাঈজীরা ঈর্ষা মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারা সিমরানের ছলচাতুরী সম্পর্কে জ্ঞাত। সে যে এক লম্ফে বাঈজী মহলের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে চাইবে এই বিষয় কারো অজানা নয়।

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৮

​সিমরান দ্রুত নিজেকে প্রস্তুত করল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মত আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিল সে। তার চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠছে রূপের অহং। প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে অন্তরে। ঠোঁটে দেখা মিলছে কূটনৈতিক হাসির। আজকের রজনী হবে ক্ষমতা হাতবদলের।
​পাল্কি এসে অপেক্ষা করছিল মেহমানখানার বাহিরে। প্রতিশোধের যাত্রার প্রথম মাইলফলক অর্জনের মোহে বিমোহিত সিমরান সুসজ্জিত দেহ নিয়ে যাত্রা করল অন্দরমহলের দিকে।

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১০