নীরব উন্মাদনা পর্ব ১৮
সুরাইয়া জিয়াসমিন
নুবার চিৎকার শুনে সবাই এগিয়ে আসলো,,
আর এসে যা দেখলো তা দেখার মতো ছিলো না,,সবাই রুমে প্রবেশ করার আগেই আরহাম বেড় হলো,,তার বাম কাঁধে নুবা,,ডান হাতে আয়রা,,,
যা দেখে সবাই হতবাক হয়ে গেলো,,আরহাম কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা সদর দরজার দিকে যেতে লাগলো,,,
ঘুমন্ত নুবাকে উঠিয়ে এনেছে সে শুধু এই কারনে যাতে আবার বিদেশে ফিরে গেলেও যাতে আয়রার দুধের কষ্ট না হয়,,, কারণ সে দেখছে নুবা খুব সুন্দর ভাবে আয়ারকে সামলায়,,সাথে তার মেয়ের যত্ন নেয়,,এর থেকে ভালো সৎ তাও দুধ মা কোথায় পাবে সে,,
সে এটাও বুঝে গেছে বিদেশ মেয়ের ভিতরে এরকম মমত্ববোধ থাকে না যা দেশের মেয়েদের ভিতরে আছে তাই সে নুবাকে সাথে করে নিয়ে যাবে এটাই তার আসল উদ্দেশ্য,,,
নুবা ভয়ে আরহামের পিঠে কিল ঘুষি মারতে লাগলো,ভয়ে কান্না করে তার মাকে ডাকতে লাগলো
_ ছাড়ুন,, ছাড়ুন,,,
আমিনা বেগম দৌড়ে এসে বললো
_ এই কি করছিস তুই নামা ওকে,, বলছি নামা,,আরহাম আরাহাম,,
কে শুনে কার কথা,,আরাফের কলিজা মুখে চলে আসলো এই অবস্থা দেখে তার দেহমকামিনিকে তার বড় ভাই নিয়ে যাচ্ছে,,আরাফ চিৎকার করে উঠলো
_ ওই তুই ওকে কই নিয়া যাস,,
রান্না ঘড় থেকে ছুটে আসলো হাজেরা বেগম,,এই অবস্থা দেখে ভয় পেলো সে,,,,
আরাফ সদর দরজা খুলার আগেই আমিনা বেগম সামনে যেএ দাঁড়ালো,, এদিক দিয়ে নুবা নামার জন্য ছটফট করছে তবে আরহামের সাথে পেরে উঠছে না,,
আমিনা বেগম ভয়ংকর চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো
_ তোকে যেতে বলেছি ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস,,
আরহাম কাঠকাঠ উত্তর দিলো
_ ওকে ছাড়া আমার মেয়ে থাকবে কি করে,,দেখো না বুকের দুধ না পেলে কেমন কান্না করে,,
আমিনা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলো,,এই ছেলেকে সে নিষ্পাপ বলবে নাকি সাইকো বুঝে উঠতে পারলো না,,
আরাফ পিছন থেকে এসে বললো
_ তাই বলে তুই ওকে নিয়ে যাবি,,আমরা যেতে দিবো তুই ভাবলি কি করে,,,ওকে নামা,,না হলে আমি কি করবো তুই নিজেও জানিস না,,,
আরহাম ভয়ংকর চোখে আরাফের দিকে তাকালো,,আরাফ শুকনো ঢোক গিললো,,,তার ভাই যে সুবিধার না সে আগে থেকেই জানে ছোটো বেলায় বেশ মার খেয়েছে তাও সামান্য কারনে তবে আজকে মেহেরিমার মার দেখে আরো টের পেলো,,
নুবা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো,,
_ আমাকে নামান,,আমি আপনার সাথে যাবো না,,নামান বলছি,,
হাজেরা বেগম দৌড়ে এসে বললো
_ আমার মেয়েকে নামাও,,,
তবে কাজ হলো না,,, হুংকার ছেড়ে বললো
_ সামনে থেকে সরো,,,
আমিনা বেগম রেগে বললেন
_ তুই যাবি যা,,তবে আয়ারা আর নুবা কাউকেই তুই পাবি না,,তোর যেখানে ইচ্ছা সেখানে যা
আরহাম ঘ্যাড়ত্যারামো করে বললো
_ আমি ওদের রেখে যাবো আমাকে পাগল কুকুরে কামড়েছে,,,
_ ভালোই ভালোই বলছি নুবাকে নামা,,ও তোর ব্যক্তিগত সম্পদ না যে তোর ইচ্ছে হলো নিয়ে চলে গেলি,,,
তবে কাজ হলো না,,নুবা না পেরে এবার আরাফের পেশিবহুল পিঠে কিছু না ভেবেই কামড়ে দিলো কারন তাকে পাগল কুকুরে কামড়েছে নাকি যে আরহামের সাথে যাবে,,তার কাছে মনে হচ্ছে উদরতা দেখিয়ে সাহায্য করতে যেএ নিজের বিপদ নিজেই টেনে এনেছে,,
হঠাৎ এরকম কামড় দেওয়ার আরহামের ব্যালেন্স বিগড়ে গেলো,,নুবা ঠাস করে ফ্লোলে পড়লো,,ভয়ে নাকে মুখে উঠে দৌড় যেএ আমিনা বেগমের পিছনে লুকালো,, কারণ এই মানুষ ব্যতিত কারো সাহস নেই আরাহামের সাথে তর্ক করার,,
নুবা হাঁপিয়ে উঠেছে এত সময় ধরে,,সে এক পলক আমিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো
_ তোমার পাগল ছেলে আমাকে নিয়ে টানাটানি করছে কেন,,আমি কিন্তু সহ্য করবো না চাচি,, আমার কিন্তু বাঁচার সখ আছে মরার না,,
আরহাম নুবরা দিকে ক্ষেপে তাকালো,,নুবা ভয়ে চাচির হাত চেপে ধরলো,,
আমিনা বেগম ফিসফিস করে বললো
_ ও বললেই হলো,,তোকে নিয়ে যেতে দিবো,, তুই চুপচাপ আমার কাছে থাক,,
আরহাম এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বললো
_ ভালোই ভালোই আমাকে যেতে দেও mom,,
আমিনা বেগম রেগে বললো
_ লজ্জা হয় না তোর,,ছোটো বোনকে অমানুষের মতো মেরেছিস,,পরের মেয়েকে কাঁদে নিয়ে চলে যাচ্ছিস কোনো বিবেক আছে তোর,,,
আরহাম শান্ত কন্ঠে বললো
_ পরের মেয়ে নাকি নিজের মেয়ে দেখে লাভ আছে ও এখন আমার মেয়ের কাজের জিনিস ওকে রেখে গেলে হবে,,,
আমিনা বেগম দুই গালে হাত দিয়ে বললো
_ তওবা তওবা তওবা,,, কুত্তার বাচ্চা বলে কি,,,যা বাপ তুই রুমে যা,,তোর কোথাও যেতে হবে না,,
মারিয়া মির্জা এই কথা শুনে আরো রেগে উঠে বললেন_
_ রুমে যাবে মানে,, তুমি কিছু বলবে না ভাবি,,
আমিনা বেগম মিনতি করে বললো
_ কেন ঝামেলা বাড়াচ্ছিস বোন আমার
_আমি,,আমি ঝামেলা করছি,, আমার মেয়েটাকে কুকুরের মতো মারলো তা তোমার চোখে পড়ে না হ্যাঁ,আর এক মূহুর্ত আমার এই বাড়ি থাকবো না চল মেহেরিমা,,উঠ,
কেউ কিছু বলার আগেই মেহেরিমা উঠে দাঁড়িয়ে বললো
_ বাদ দেও মা,,আসলেই আমি ভুল করেছিলাম তাই বড় ভাই হিসাবে আমাকে শাস্তি দিয়েছে এতটুকুই,,এখন দাওয়া খেতে এসেছো আর ঝামেলা করো না,, ভুল আমারি ছিলো
বলেই মেহেরিমা উপরে চলে গেলো,,
_ মেহেরিমা,,মা আমার,,,
মেয়ের পিছনে ছুটে গেলো সে,,
আমিনা বেগম বিরবির করে বললো
_ যাক মেহেরিমা বাঁচিয়ে দিলো,,
পরপরই ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো
_ কি করেছিলো কি ও ,যে এভাবে মারলি হ্যাঁ,,
আরহাম কটকট করে বললো
_ ওই b**** আমার মেয়েকে ধমকাচ্ছিলো,,গাল চেপে ধরেছিলো,,আর ওর মুখটা বেশ বেশি চলে,,তাই আমি শুধু একটু শাস্তি দিয়েছি
_ এটাকে একটু বলে আরহাম,,
_ জানি না,,,
আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_ বাপ তুই তোর মেয়েকে নিয়ে রুমে যা অনেক তামাশা হয়েছে ,দয়া করে,, দয়া করে এই কয়টা দিন একটু চুপ থাক,,দয়া করে কোনো ঝামেলা করিস না,, আল্লাহর দোহায় লাগে,,,
আরহাম কোনো উত্তর না দিয়ে মেয়েকে নিয়ে রুমে চলে গেলো,,,আরহাম যেতেই নুবা নাক টেনে বললো
_এই বাড়িতে আমার সেফটি কোথায় চাচি,, তুমি তো প্রথম প্রথম খুব বলেছিলে নিজের পাগল ছেলে থেকে আমকে প্রটেক্ট করবে কই গেলো সেই কথা হ্যাঁ,,কেউ না থাকলে আজ আমাকে অন্য দেশে পাচার করে দিতো,,
_ কি করবো বল হঠাৎ করেই সব হলো,,আমি ভাবতেও পারিনি ও আমার কথা এতো গভীর ভাবে নিবে যে শেষ পর্যন্ত এই কাজ করে বসবে,,
নুবা শুকনো ঢোক গিলে বললো,,
_দেখো চাচি তোমার নাতনি আমার পর্যন্ত ঠিক আছে কিন্তু তোমার ছেলেকে আমার থেকে দূরে রাখবা,,আমি এতো তাড়াতাড়ি মরতে চাই না,,না মেহেরিমা আপার মতো মার খেতে চাই,,,
নুবার রাতে জ্বর আরো বেড়ে গেলো,,একে তো চোখের সামনে মেহেরিমার এরকম মার খেতে দেখে তার পর ঘুমের ভিতরে হঠাৎ এরকম আক্রমন,,,
মেহেরিমা রাগে ফুঁসছে,,,সে এই বাড়ি থেকে তখনি বেড় হবে যখন নুবাক শায়েস্তা করবে,,, কারণ তার কাছে মনে হচ্ছে নুবার কারনে এই সব হয়েছে
না নুবা তার সাথে তর্ক করতো,,না সে আয়ারকে কোলে নিয়ে রাগে ধমকাতো মারতো আর না এমন হতো,,,তার উপর নুবার সামনে এরকম কুত্তা পেটানি
আরো রাগ হচ্ছে
মেহেরিমা মনে হচ্ছে তার মার খাওয়া দেখে নুবা অনেক খুশি হয়েছে,,আর সে যেহেতু আরহামের কিছুই করতে পারবে না তাই আরো বেশি রাগ হচ্ছে নুবার উপর,,,সে নুবাকে মার খাওইয়েই ছাড়বে,,,
আয়রার ক্ষতি করবে নুবা মার খাবে,,,আয়রার ক্ষতি হলে আরহাম ধুকে ধুকে মরবে,,,আর এই ক্ষতিতে নাম পড়বে নুবার সবাই এক সাথে শেষ,,,ভেবেই মেহেরিমা হাসলো,,,তার সৌন্দর্য ভরা মুখে যেভাবে আঘাত করেছে আরাহাম সেভাবেই আয়রা আর নুবাকে আঘাত করবে সে,,,
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতেই আয়ারাকে নুবার কাছে ধরিয়ে দেওয়া হলো,,সাথে ফিডার ভরা দুধ,,,
নুবা ঘুম ঘুম চোখে আয়ারার দিকে তাকালো,,, প্রথম ফিডার মুখে দিলো তবে সে নিলো না,,তাই সে তার কিছু দিন ধরে ব্যবহার করা বুদ্ধি প্রয়োগ করলো,,
আয়ারাকে বুকের দুধ দিলো যখন যে চকচক শব্দ তুলে বুক টানতে ব্যস্ত হলো তখনি নুবা আয়ারাকে সরিয়ে মুখে ফিডার ভরে দিলো,,, দুষ্টু আয়রা বুঝেও বুঝতে পারলো না তার সাথে কি হলো,,,তাই পুরো দুধটা ফিনিস করে দিলো,,,
কয় একদিন ধরে আয়ারকে এভাবেই মানে ধোকার ভিতরে রেখে খাওয়ানো হচ্ছে কারণ আয়রাকে ফিড করানোর পর থেকে বুকে কিছু না পেলেও সে ফিডার মুখে নিতে চাইত আ তাই এই পায়েতারা আজমানো হয়েছে,,,
আমিনা বেগম চিন্তিত হয়ে বসে আছে,,,কালকের এই ঘটনা সে ভুলতেও পারছে না,,যদি কোনো ভাবে হারুন মির্জা এই ব্যপার জানতে পারে নির্ঘাত আরহামকে মেরেই ফেলবে,,,
তার উপর কালকে হাজেরা অনেক কথাই বলেছে আমিনাকে তাই নুবাকে নিয়েও চিন্তিত সে
সকালের ওষুধ খাওয়ার পর থেকেই নুবার বুক ব্যথা আবারো শুরু হয়েছে এই কয়দিন কমি ছিলো,,,বুক কেমন ভার হয়ে আছে,,সাথে টানটান অনুভব করছে,, এদিকে পরশু গায়ে হলুদ থাকায় বাড়িতে সাজাতে সকাল থেকেই লোক আসছে,,,সাথে আরো কয় একজন মেহমান এসেছে যার ফলে নুবা রুম থেকে বেড় হচ্ছে না কে কখন কি বলে ফেলেছে,,,তার উপর বাইরে কেচকেচ শব্দে মাথা ধরে যাচ্ছে,,,
নতুন এক ঢংগির উৎপত্তি হয়েছে নাম ইমা,,,আরাফের ফুপাতো বোন,, সুন্দরী তবে ঢংগি,,সাথে কয় একটা পিচ্চি এসেছে আর ৩/৪ টা চাচাতো মামাতো ফুপাতো দামড়া দামড়া ভাই,,এর কারনেই নুবা রুম থেকে আরো বেশি বেড় হচ্ছে না,,,
দুপুর দিকে খেয়ে দেয়ে নুবা চুপচাপ বুকের ব্যথা নিয়ে রুমে বসে ছিলো এমন সময় কোথা থেকে আয়ারাকে নিয়ে আরাহাম চলে আসলো,,আরহামকে আসতে দেখে নুবা চম্কে উঠলো,,বড় বড় চোখ করে বললো
_ আ,,আপনি এখানে কি করছেন,,
আরহাম বিছানায় এসে বসলো,,আয়রাকে এগিয়ে দিয়ে বললো
_ কান্না করছে,,খেতে চাচ্ছে না,,,খাওইয়ে দিলে ভালো হয়,,,
নুবা কান্নারত আয়ারকে কোলে নিলো সাথে ফিডারো,,, পরপরই চোখ ছোটো ছোটো করে বললো
_ আ,,আপনি রুম থেকে বেড় হোন,,
ইদানিং নুবা আরহামকে নিয়ে খুবি আত্মামকে থাকে কখন না আবার কাঁধে উঠে হাঁটা দিলো,,,ঝাড়ু দিয়ে আন্দা গুন্দা মারা শুরু করলো,,,
আরহাম নুবার দিকে এক পরক তাকিয়ে সোজা কন্ঠে বললো
_ ওকে কেউ খাওয়াতে পারে না তুমি কি করে খাওয়াও এটাই দেখবো আমি,,,আমিও শিখে রাখি কাজে দিবে,,,
নুবা হতভম্ব হয়ে গেলো তবে তার হাসিও পেলো,,,তাহলে তো আরহামের দুটো ইয়ে লাগবে,,নুবা তাও হাসলো না,, কারণ সে মোটেও চঢ় থাপ্পর খেতে চায় না এমনিতেই সে দুর্বল,,
নুবা মাথা নিচু করে বললো
_ দেখুন আপনাকে না বলা যবে,না দেখানো যাবে, আপনি বরং যান, আর হুটহাট এখানে আসবেন না বাড়ি ভর্তি মানুষ কেউ গাল মন্দ করতে কম করবে না,,
আরহাম নুবার নিচু মাথার দিকে তাকিয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে বললো
_বাড়ি ভরা মানুষের ভিতরে কয়জন তোমাকে খেতে দেয় যে গালমন্দ করবে,,,করলে এই বাড়ির মানুষে করতে পারে কারণ তুমি তাদের টাকায় বড় হয়েছো,, অন্যদের না,,,
নুবার কথাটা কেমন অদ্ভুত লাগলো তাই বিরবির করে বললো
_ আমি জানি আমি আমার মা আপনাদের টাকায় এখানে আছি বারবার বলে মনে করিয়ে দিতে হবে না ,,এতোবার খোঁটা দিতে হবে না,,সময় হলে চলে যাবো,,আমি ভালো একটা কাজ খুঁজে নিবো তার পর চলে যাবো,,, দরকার পড়লে যা আমাদের পিছনে খরচ করেছেন সব ফিরিয়ে দিবো তাও আমাকে খোঁটা দিবেন না,,,
নীরব উন্মাদনা পর্ব ১৭
নুবা কথা গুলো বলে আরহামের দিকে তাকালো,,তবে খেলায় করলো আরহাম তার কোনো কথাই শুনছে না বরং তার গলার দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,,,
নুবা বেশ ভয় পেলো,,,তবে কিছু বলার আগে আরহায় নুবার উপর হামলে পড়লো,,নুবা তাল সামলাতে না পেরে বিছানায় পড়লো,,,আয়রাকে বুকের সাথে চেপে ধরলো,,,
আরহাম নুবার হালকা লালচে ফর্সা গলায় মুখ ডুবালো,,,
