Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৭

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৭

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৭
বন্যা সিকদার

​দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে দীর্ঘ দুটি সপ্তাহ। এই দুই সপ্তাহের পর অবশেষে মৌ এবং মেহেরের সব পরীক্ষা শেষ হলো। পরীক্ষা শেষ হলেও মেহেরে’র মনটা বিষণ্ন‚ মোটামুটি পরীক্ষা দিলেও রেজাল্ট কেমন হবে তা নিয়ে সে ভীষণ টেনশনে ভুগছে। অন্যদিকে মৌ’য়ের সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরীক্ষা কেমন হয়েছে সেটা একমাত্র মৌ আর ওপরওয়ালাই জানেন। দু-একটা প্রশ্ন মেহেরে’র ইশারায় লিখলেও বাকিটা নিজের খেয়াল খুশি মতোই লিখে এসেছে সে। তবে পাস মার্ক উঠবে কিনা তা নিয়ে বিন্দুুমাত্র চিন্তার রেখা নেই তার কপালে। সে মেতে আছে নিজের বিন্দাস দুনিয়ায়। ​গত এক সপ্তাহ উজান ঢাকার বাইরে ছিল অফিশিয়াল ইনভেস্টিগেশনের কাজে। আর এই সুযোগে মৌ পড়াশোনাকে একপ্রকার শিকেয় তুলে রেখে মন যা চেয়েছে‚ ঠিক তাই করেছে।

এর পরিণতি সামনে কী হতে পারে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা ভয় নেই তার মনে।
​সন্ধ্যার দিকে উজান ফিরে এসে মৌ’কে নিয়ে শপিংয়ে বের হলো। বাইরে ঘোরাঘুরি আর খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে তাদের বেশ রাত হবে। মৌ চেয়েছিল মেহের’কেও সাথে নিয়ে যেতে। কিন্তু মেহের অন্য ধাতুতে গড়া। সে কখনোই কারও ব্যক্তিগত সময় বা প্রাইভেসি নষ্ট করতে চায় না। তাই মাথা ব্যথার অজুহাত দিয়ে সে বাসায় থেকে গেল। মেহেরে’র এই পরিপক্বতা ইফাত’কে বারবার মুগ্ধ করে। মেয়েটা অদ্ভুত সুন্দরভাবে বোঝে কখন কাকে কতটা স্পেস বা প্রাইভেসি দেওয়া উচিত। ​এদিকে ইফাতও জরুরি কিছু কাজে উজানদে’র সাথেই বাইরে বের হয়েছে। চারদিকের এই নীরবতায় মেহেরে’র বড্ড একাকী আর একঘেয়ে লাগছিল। নিজেকে একটু হালকা করতে সে এসে বসল ছাদের দোলনাটায়।

​বুকের ভেতরের কালবৈশাখী ​ঠিক তখনই প্রকৃতির রূপ বদলাতে শুরু করল। পুরো আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছে‚ খানিক বাদে বাদেই তীব্র আলোয় বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কিন্তু আকাশের এই রুদ্রমূর্তি মেহের’কে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারছিল না। কারণ প্রকৃতির এই ঝড়ের চেয়েও শতগুণ তীব্র এক কালবৈশাখী ঝড় বয়ে চলছিল তার নিজের ভেতরে। ​আজকে ইফাত’কে তার জীবনের অতীতটা বলতেই হবে। কিন্তু বুকের ভেতর থেকে যেন সমস্ত সাহস উবে যাচ্ছে। একটা অজানা আতঙ্ক তাকে গ্রাস করছে‚ মানুষটা যদি সব সত্য জানার পর তাকে ভুল বোঝে? যদি চিরকালের জন্য তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়?
কথাগুলো ভাবতেই মেহেরে’র দু-চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। মাথাটা ঝিমঝিম করছে‚ কোনো কিছু চিন্তা করার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলছে সে। নিজের জীবনে এর আগে অনেক বড় বড় ঝড় সে একা হাতে সামলে এসেছে কিন্তু আজ সামান্য অতীতটা প্রকাশ করতে গিয়ে তার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। বুকের ভেতর যেন এক প্রলয়ংকরী টর্নেডো আছড়ে পড়ছে।

​এমন সময় হঠাৎ করেই মেহের নিজের কাঁধের ওপর কারও পরিচিত হাতের স্পর্শ পেল। ​ভয়ে ​স্পর্শটা পেতেই মেহের তড়িৎ গতিতে ছিটকে সরে এলো। আতঙ্কে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠলেও সামনে ইফাত’কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার বুক থেকে এক দীর্ঘশ্বাস নেমে গেল‚ খানিকটা স্বস্তি পেল সে। ইফাত মুচকি হেসে মেহেরে’র গা ঘেঁষে দোলনায় বসল। পকেট থেকে একটি কিটক্যাট চকলেট বের করে মেহেরে’র দিকে বাড়িয়ে দিল সে।
​কিন্তু আজ মেহেরের হাত দুটো যেন অবশ। চকলেটটা নেওয়ার মতো সাহস সে সঞ্চয় করতে পারল না। উল্টো সে ইফাতে’র থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে বসল। ইফাত ব্যাপারটা খেয়াল করল। সে নিজেও মেহেরে’র দেওয়া দূরত্বটুকু বজায় রেখে বসল‚ তবে তার মুখে লেগে রইল সেই চেনা এক গাল হাসি। সেই হাসিতে যেন প্রতিধ্বনিত হলো তার গভীর ভালোবাসা।

​“মিস থেকে মিসেস চৌধুরী হতে চলেছেন‚ তবুও এত কিসের ভয়‚ হুম? ইফাত চৌধুরীকে আপনি কেন ভয় পাবেন বলুন তো? বরং ইফাত চৌধুরী নিজেই আপনাকে ভয় পাবে। আপনার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবে। আপনার সকল আবদার পূরণ করবে সে। আপনার হাতের ইশারায় চলবে। ‘আপনি’ থেকে খুব দ্রুতই ‘তুমি’তে আবদ্ধ করবে নিজেকে। আর এখনো যদি এমন পাগলামি করেন‚ তাহলে কীভাবে হয় বলুন তো? আপনাকে তো আগেই বলেছিলাম‚ ইফাত চৌধুরী বড্ড অধৈর্যশীল একজন পুরুষ। সে দুনিয়ার সবার কাছে ধৈর্য ধরে রাখতে পারলেও‚ তার শখের নারীর কাছে বড্ড দুর্বল‚ বড্ড অসহায়।
​মেহের মন্ত্রমুগ্ধের মতো প্রতিটি কথা শুনছিল। মানুষটার প্রতিটি শব্দের ভাঁজে ভাঁজে কত তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। কিন্তু মেহেরে”র বিবেক তাকে দংশন করছে। সে কীভাবে এই মানুষটাকে ঠকাবে? সে তো ইফাত‘কে ভালোবাসে‚ আর ভালোবাসার মানুষকে কখনো ঠকানো যায় না। এই অপরাধবোধ থেকেই গত চারদিন ধরে সে ইফাত’কে এড়িয়ে চলছে। ক্রমাগত এভয়েড করে যাচ্ছে। মেহের ভেবেছিল‚ অবহেলা পেয়ে এবার অন্তত ইফাত নিজে থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে। মেহের নামের কোনো নারী যে তার জীবনে এসেছিল‚ হয়তো তা ভুলেই যাবে। কিন্তু মেহেরে’র সেই ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো। মেহের গত চারদিন কথা না বললেও‚ ইফাতের শেষ বার্তাটা ছিল স্পষ্ট ও ধারালো…..
​”আমাকে এভয়েড করার ফল কী জানো? সোজা বউ বানিয়ে ঘরে তুলব। ইফাত চৌধুরী সব সহ্য করতে পারলেও শখের নারীর অবহেলা সহ্য করতে পারে না। জাস্ট রেডি থাকো পানিশমেন্ট পাওয়ার জন্য। ইফাত চৌধুরী যেমন তার শখের নারীকে উজাড় করে ভালোবাসতে পারে‚ ঠিক তেমন করে আঘাতও করতে পারে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি।

​অভিমানের অবসান ​সেই কথার গভীরতা মেহের বুঝেছিল। কিন্তু পরিস্থিতির কাছে সে ছিল নিরুপায়। দোলনায় বসে মেহের যখন তখনও চকলেটটা হাতে নিচ্ছিল না। তখন ইফাতে’র ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। সে প্রচণ্ড রাগে নিজের ফোন আর হাতের চকলেটটা দূরে ছুঁড়ে মারল। শূন্য ছাদের মাঝে সেই তীব্র শব্দে মেহের হকচকিয়ে উঠল‚ কেঁপে উঠল তার পুরো শরীর। ​পাশে ফিরে ইফাতে’র রাগান্বিত‚ থমথমে মুখটা দেখে মেহেরে’র গলার ভেতরটা শুকিয়ে এলো। সে ঢোক গিলে নিজের ভয়টা আড়াল করার চেষ্টা করল। অতঃপর মুখে একটা জোড়াতালির শুকনো হাসি ঝুলিয়ে দোলনা থেকে নামল। ছিটকে যাওয়া ফোন আর চকলেট দুটো কুড়িয়ে নিয়ে সে এবার ইফাতে’র একদম কাছাকাছি এসে বসল।
​কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা কোনো রকমে ইফাতে’র হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল মেহের। তারপর চকলেটটা ছিঁড়ে খানিকটা নিজের মুখে পুরে দিল‚ আর বাকি অংশটুকু কাঁপতে থাকা আঙুলে ইফাতে’র ঠোঁটের সামনে ধরল।
​ইফাত তখনও ঠিক আগের মতোই রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মেহেরে’র দিকে। তবে মেহেরে’র এই আকুলতা দেখে সে আর ফিরিয়ে দিতে পারল না‚ বাড়িয়ে দেওয়া চকলেটটুকু মুখে পুরে নিল। ইফাত’কে এতটা রাগান্বিত হতে মেহের কখনো দেখেনি। ভয়ে মেহেরের কণ্ঠরোধ হয়ে আসছিল। সে তোতলাতে তোতলাতে কোনোমতে বলল‚
​”চ চ চ চকলেট খেলাম তো‚ তবুও এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন? ভয় লাগে আমার।

​মেহেরে’র কাঁপা কাঁপা কণ্ঠের আকুতির জবাবে ইফাত আর কিছুই বলল না। সে কেবল থমথমে মুখে চুপচাপ বসে রইল। চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। দীর্ঘ সময় পর‚ সেই নীরবতার বুক চিরে ইফাত নিজেই প্রশ্ন করল….
​“ফুলকন্যা চলো বিয়ে করি?
​মেহের চমকে তাকাল। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন লাফাচ্ছে। সে ধড়ফড় করে ইফাতে’র মুখোমুখি হয়ে বসল। ইফাত তখনো তার দিকে একদৃষ্টিতে গভীর‚ মায়াবী চোখ জোড়া নিক্ষেপ করে রেখেছে। মেহের কিছু বলার জন্য ঠোঁট জোড়া নাড়ার আগেই ইফাত বলে উঠল‚ “আমি তোমার কোনো অতীত জানতে চাই না। শুধু তোমাকে আমার বউ করে ঘরে তুলতে চাই‚ ফুলকন্যা।
​মেহেরের চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। সে ইফাতে’র চোখের দিকে নিজের দৃষ্টি স্থির রেখে অত্যন্ত কাঁপা গলায় বলে‚ “পারব না আমি আপনার বউ হতে। পারব না আমি আপনাকে ঠকাতে।
“কী বলতে চাচ্ছো ফুলকন্যা?

​মেহের আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সে ডুকরে কেঁদে উঠল‚ “আমায় মাফ করে দিন। সত্যি আমি পারব না আপনার হতে‚ আর না পারব নিজের অতীত ভুলতে। আমি জানি আমাদের দুজনের পথ ভিন্ন। আমরা কখনোই এক হবার নই। আপনি তো আকাশের চাঁদ‚ সেই চাঁদ কেন নিজে এসে কলঙ্ক গায়ে মাখবে? আমরা এখন যেমন আছি‚ তেমন বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে থাকি প্লিজ।
​ইফাত এক মুহূর্তও দেরি না করে মেহেরে’র কাঁপতে থাকা হাত দুটো নিজের হাতের শক্ত ভাঁজে পুরে নিল। মেহেরে’র চোখের জল আলতো করে মুছে দিয়ে ফিসফিস করে।
“তোমাকে কতবার বলব‚ তোমার কোনো অতীত আমি জানতে চাই না। আমি শুধু তোমাকে আমার বউ করে ঘরে তুলতে চাই‚ ব্যাস। আর কে বলল তুমি আমায় ঠকাচ্ছো? আমি বরং তোমাকে নিজের করে পেয়ে জিতে যাব। প্লিজ ফুলকন্যা‚ এমন করো না। বলো আমি তো এতদিন তোমাকে কোনো জোর করিনি‚ তাহলে আজ কেন তুমি নিজে থেকে এভাবে পিছিয়ে যাচ্ছো?
​“কারণ আমি যে আপনার বউ হবার কোনো যোগ্যতা রাখি না। —মেহেরে’র কণ্ঠ দিয়ে যেন এক বুক হাহাকার বেরিয়ে এলো।

​“লাগবে না তোমার কোনো যোগ্যতা। শুধু তুমি আমারই হও।
​“কেন অবুঝের মতো কথা বলছেন? তাছাড়া আমি অনেক চেষ্টা করেছি এই ‘বিয়ে’ শব্দটা নিয়ে ভাবতে‚ তবে আমার মস্তিষ্ক কোনোভাবেই সায় দিচ্ছে না। আমি সত্যি নিরুপায়। সবকিছু জানার পর আপনি যদি আমার জীবন থেকে চলে যান‚ আমি তা সহ্য করতে পারব না। আপনি বরং অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করে সুখী হোন। আমি দূর থেকেই না হয় আপনাকে দেখবো।
​মেহেরে’র মুখে অন্য নারীর কথা শুনে ইফাতের ভেতর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল কিন্তু নিজেকে শান্ত করল সে। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে মেহেরে’র ভেজা গাল দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে আঁকড়ে ধরল।
​“আমার অন্য কোনো নারী চাই না ফুলকন্যা‚ আমার শুধু তোমাকেই চাই। আই প্রমিজ‚ তোমার লাইফে অতীতে যাই ঘটে থাকুক না কেন আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না।
​ইফাতের এই কথায় মেহের একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। লোকটা কত সহজে কথাটা বলে দিল। কিন্তু বাস্তবতা যে বড্ড কঠিন‚ তা প্রমাণ করা আরও কঠিন।

​“পারবেন না আপনি। আমার অতীত জানার পর কোনোভাবেই আমাকে আপন করতে পারবেন না।
​“প্রমিজ করেছি‚ তবুও বিশ্বাস হচ্ছে না?
ইফাত কিছুটা মরিয়া হয়ে উঠল‚ “আচ্ছা তুমিই বলো কী ছিল তোমার অতীতে? তোমার অতীত যতই ভয়াবহ বা ভয়ংকর হোক না কেন‚ আমি তবুও তোমাকেই আমার বউ বানাবো।
​মেহের কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল‚ “কেন আমাকে এভাবে মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছেন বলুন তো? আমি জানি‚ আমার মতো মেয়েকে কোনো পুরুষ কোনোদিন আপন করতে পারবে না। আর ঠিক সেই ভয় থেকেই আমি সবার থেকে দূরে দূরে থাকতাম। আপনি প্লিজ এখান থেকে চলে যান‚ আমি পারব না আমার সেই বিশ্রী অতীত মুখে আনতে।
​“ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড ফুলকন্যা। প্লিজ বলো না কী ছিল তোমার অতীতে? আমি সবকিছু মেনে নেব।
ইফাতে’র কণ্ঠ জুড়ে তখন আকুল মিনতি। এর মাঝেই ​আকাশ ভাঙা আর্তনাদ ​হঠাৎ করেই মেহের দু-চোখ শক্ত করে বন্ধ করে। বুকের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল‚

​“আমি একজন ধ**র্ষিতা নারী। যাকে ৫ বছর আগে ধ**র্ষণ করা হয়েছিল। যাদেরকে সমাজ নিকৃষ্ট কীট মনে করে। পারবেন এমন ধ**র্ষিতা নারীকে নিজের বউ বানাতে?”
​কথাগুলো বলার সময় মেহেরে’র কণ্ঠস্বর তীব্রভাবে কাঁপছিল। তার সেই গগনবিদারী চিৎকারের শব্দ আর কান্নার রোল যেন আকাশের মেঘের ডাক আর বিদ্যুৎ চমকানির শব্দের সাথে একাকার হয়ে গেল। ​মেহেরে’র মুখ থেকে এই একটা শব্দ শুনে ইফাত পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা যেন কেউ নির্মমভাবে মুচড়ে দিল। হৃদপিণ্ডটা এত দ্রুত গতিতে স্পন্দিত হতে লাগল যে‚ মনে হচ্ছিল বুক চিরে বেরিয়ে আসবে। কলিজাটা যেন কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে। ​ইফাত’কে স্তব্ধ হয়ে যেতে দেখে মেহের আবারও কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে।
“মাত্র বারো বছরের বাচ্চা মেয়েকে ওরা ধ**র্ষন করেছিল। পারবেন এমন একটা নিকৃষ্ট মেয়েকে নিজের বউ করতে? যে মেয়েটার নিজের বলতে আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই‚ সে কীভাবে আপনার বউ হবার স্বপ্ন দেখবে বলুন তো? ওই কাপুরুষ গুলো আমাকে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে রেখে গিয়েছে। আমার জীবনের সবটুকু আলো‚ সবটুকু খুশি ওরা কেড়ে নিয়েছে। এরপরেও কি বলবেন যে আমি আপনার বউ হবার যোগ্যতা রাখি?

ইফাত আর এক মুহূর্তও সেখানে বসলো না‚ ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়াল। মেহেরে’র মুখপানে একবারও না তাকিয়ে‚ সোজা বড় বড় পা ফেলে ছাদ থেকে নেমে চলে গেল। ​মেহের তার চলে যাওয়ার পথের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চরম তাচ্ছিল্যের হাসি। সে ঠিকই আন্দাজ করেছিল। ইফাত কখনোই তাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে না। শুধু ইফাত কেন‚ এই সমাজের কোনো পুরুষই কি স্বেচ্ছায় তার মতো একটা মেয়েকে আপন করতে চাইবে? মেহের চাতক পাখির মতো শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।

বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ করছে‚ হৃদপিণ্ডটা তীব্র বেগে লাফাচ্ছে। ঝড়ের পূর্বাভাস নিয়ে একঝলক শীতল হাওয়া তার গায়ে এসে লাগল। মেহের স্তব্ধ হয়ে গেল। মনের কোনো এক সুপ্ত কোণে এক মুহূর্তের জন্য হলেও তার বিশ্বাস ছিল‚ ইফাত হয়তো বাকিদের মতো নয়। সে হয়তো তাকে এভাবেই মেনে নেবে। কিন্তু আজ তার সেই শেষ বিশ্বাসটুকুও কাচের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তবে কোনো আফসোস হলো না তার‚ ভাগ্যটাই যেখানে পোড়া সেখানে আর কাকে দোষ দেবে?
​মেহের ধীরপায়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। শরীর আর সায় দিচ্ছে না‚ মাথাটা প্রচণ্ড ঘুরছে‚ গা গুলিয়ে আসছে তার। সে চোখের অশ্রু মুছতে মুছতে ছাদ থেকে নিচে নামতে লাগল। নিজের রুমে এসে সশব্দে ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিল সে। বিছানায় ধপাস করে বসে একটা বালিশ বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কিন্তু তার সেই বুকফাটা আর্তনাদ শোনার মতো কেউ ছিল না সেখানে। ​কান্নার বেগ বাড়ার সাথে সাথে তার ভেতরের কষ্টটা উন্মত্ত রাগে রূপ নিল। ক্ষোভে সে পুরো রুম তছনছ করতে শুরু করল। বিছানার চাদর‚ বালিশ‚ টেবিলের সব জিনিসপত্র এক এক করে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। পাশে থাকা কাচের গ্লাসটাও হাত দিয়ে ফেলে দিল সে। ঝনঝন শব্দে মুহূর্তেই সেই কাচ ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল। মেহের হো হো করে কেঁদে উঠে মেঝেতে একপ্রকার আছড়ে পড়ল। ভাঙা কাচের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল।

​”আ আ আমি তো আপনাকে বলেছিলাম‚ আপনি আমায় মেনে নিতে পারবেন না। কিন্তু আপনি শুনলেন না। আমি না হয় এইভাবেই দূর থেকে আপনাকে সারাজীবন একতরফা ভালোবেসে যেতাম। কেন আমার অতীত জানতে চাইলেন আপনি‚ কেন কেন? আমি এখন কোন মুখ নিয়ে আপনার সামনে দাঁড়াবো? কীভাবে এই মুখ আপনাকে দেখাবো? পারব না আমি…সত্যি আমার আর এত যন্ত্রণা সহ্য করার ধৈর্য নেই।
​অন্ধকার অতীতের গ্রাস ​মেহেরে’র দু-চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় নোনা জল ঝরতে লাগল। পাঁচ বছর আগের সেই ভয়ংকর অতীতের কথা মনে পড়তেই তার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে নিজের চুল নিজেই টেনে ধরে পাগলের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল‚

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৬

​”মেহের তুই কেন পারলি না নিজেকে পবিত্র রাখতে? কেন তুই সবার বারণ করা সত্ত্বেও সেদিন একা একা অমন জায়গায় গিয়েছিলি? সেদিন যদি ছোট আম্মুর কথাটুকু শুনতি‚ তবে আজ এই অভিশপ্ত দিনটা তোকে দেখতে হতো না। আমি কীভাবে ওই মানুষটার চোখের ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকব? পারব না আমি…এই মুখ আমি কখনোই আপনাকে দেখাতে পারব না। আমি হারিয়ে যাব‚ অনেক দূরে হারিয়ে যাব। আপনার ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না আমার জীবনে।
​কথাগুলো শেষ করেই মেহেরে’র ভেতর এক অদ্ভুত‚ ভয়ানক শান্ত ভাব চলে এলো। সে নিজের গলা থেকে ওড়নাটা খুলে ফেলল। চটজলদি বিছানার ওপর দাঁড়িয়ে সিলিং ফ্যানের……..

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here