Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪২

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪২

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪২
বন্যা সিকদার

“বেশি না বউজান‚ জাস্ট দশটা কিস করলেই তোমাকে তোমার বাপের বাড়ি নিয়ে যাবো প্রমিজ।
মূহুর্তেই মৌ তড়িৎ গতিতে এসে উজানে’র চুল টেনে ধরলো। দাঁতে দাঁত পিষে কটমট করে বলে উঠে‚ “নষ্ট পুরুষ সুযোগে সৎ ব্যবহার করছেন?
​“আউচ বউ‚ ছাড়ো প্লিজ। এভাবে কেউ নিজের স্বামী জানকে মাইর দেয়? আচ্ছা এসব রাখো‚ তোমাকে কিসও করতে হবে না আর বাপের বাড়িও যেতে হবে না। ভাবছিলাম দুপুরের লাঞ্চ করেই রওনা হবো‚ যাতে দুই ঘণ্টার মধ্যে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছাতে পারি। কিন্তু যেহেতু শাশুড়ির মেয়ে নিজের বাপের বাড়ি যেতেই চাচ্ছে না‚ তাহলে আজ থাক। আমি বরং আমার কাজেই যাই।

​উজান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। মৌ এতক্ষণ তার ওপর যে চিলতে রাগ ঝাড়ছিল‚ তা ভুলে এক নিমিষে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু এই খিটখিটে মানুষটার মন সহজে গলল না। তবে মনে মনে মৌ’য়ের বেশ খুশিও লাগছিল‚ জাস্ট দশটা কিস করলেই আজকেই সে তার প্রিয় মানুষদের দেখতে পাবে। নিজের চেনা মানুষ‚ চেনা আঙিনায় যাওয়ার তীব্র আকুলতায় সমস্ত লাজলজ্জা এক পাশে সরিয়ে রেখে মৌ ঝট করে উজানে’র হাতটা টেনে ধরল এবং এক হ্যাঁচকা টানে তাকে বিছানায় ফেলে দিল। ​উজান কিছু বুঝে ওঠার আগেই‚ মৌ ঝড়ের গতিতে তার সারা মুখমণ্ডল জুড়ে ভালোবাসার নরম ছোঁয়া এঁকে দিতে লাগল। উজান প্রথমে এই আকস্মিক আক্রমণে থতমত খেয়ে গেলেও‚ পরক্ষণেই তার পুরো বুক এক অনাবিল খুশিতে ভরে উঠল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না‚ এক ঝটকায় মৌ’য়ের ওষ্ঠজোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। ​খুব গভীর ও নিবিড় ভাবে সে মৌ’কে স্পর্শ করল। মৌ এবার আর একটুও ছটফট করল না‚ বরং পরম শান্তিতে উজানে’র বাহুবন্ধনে নিজেকে সঁপে দিল। এতে উজান যেন আরও বেশি তৃপ্ত হলো।
বেশ কিছু সময় পর উজান যখন তাকে আলতো করে ছেড়ে দিল‚ মৌ তখন জোরে জোরে হাঁপাচ্ছিল। লজ্জায় ও আবেশে সে আর উজানে’র চোখের দিকে তাকাতে পারল না। লজ্জার এই তীব্র ঝড় সামলাতে না পেরে সে বিছানা থেকে নেমে এক দৌড়ে কক্ষ ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাইল। ওমনি উজান পেছন থেকে তাকে শক্ত করে টেনে নিজের চওড়া বুকের মাঝে জড়িয়ে নিল।

​মৌ সাথে সাথে আবারও লজ্জায় তার বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফেলল। উজান নিজের পিচ্চি বউ’য়ের এমন পাগলামি দেখে শব্দ করে হেসে উঠল। অতঃপর মেয়েটির চিবুক ধরে মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার কপালে এক দীর্ঘ ভালোবাসার ছোঁয়া এঁকে দিল এবং মৃদু রসালো স্বরে আওড়াল‚
​“ভালোবাসেন‚ আবার লজ্জাও পান। কাছেও থাকতে চান‚ আবারও তাহার সান্নিধ্য পেলে পালিয়েও যান। আপনি বড়ই নাদান‚ মিসেস। এভাবে তো আর আমার থেকে দূরে সরে যাওয়া যায় না।
​মৌ এবার আরও বেশি কুঁকড়ে গিয়ে আবারও উজানে’র বুকে মুখ লুকাল। সে এমনিতেই লজ্জায় নুয়ে যাচ্ছিল‚ তার ওপর এই লোকটা অনবরত শায়েরি শুনিয়ে তাকে আরও বেশি লজ্জায় ফেলছে। ঠিক তখনই তার কানের কাছে প্রফেসরের গলার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো।

​“মির্জা গালিবের মতো উক্তি দিলাম। এটলিস্ট একটা কিস তো এখন এক্সট্রা প্রাপ্য আমার‚ নাকি?
​মৌ বরের বুক থেকে কোনোমতে মুখটা সামান্য তুলে বলল‚ “আ আ আ আমি মেহুর কাছে যাবো।
​মৌ’য়ের মুখে এমন রোমান্স-বিরোধী উত্তর শুনে উজান খুব একটা খুশি না হলেও‚ তাকে চুপচাপ করে ছেড়ে দিল। সে এই মেয়েটাকে নিজের করে চায় খুব আপন করে‚ মনের ভেতর কোনো ভয় বা জোর খাটিয়ে নয়। সে চায় মৌ ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেতে তার কাছে আসুক। মৌ ছাড়া পেয়েই এক ছুটে রুম থেকে পালিয়ে গেল। উজান নিজের ঠোঁটে এক তৃপ্তির হাসি ঝুলিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ​তারপর সে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ফোনে কারও সাথে কথা বলতে বলতে ক্যাবিনেট থেকে ট্রলি ব্যাগটা বের করল। নিজের জন্য হাতে গোনা কয়েকটা জামা নিলেও‚ মৌয়ের জন্য তার প্রিয় সব শাড়ি আর জামাকাপড় বেছে বেছে ব্যাগে ভরল। যদিও সে খুব ভালো করেই জানে যে মেয়েটা এতগুলো জামা রোজ পরেও শেষ করতে পারবে না‚ তবুও উজান সব গুছিয়ে নিল। যদি কখনো সেই বাড়িতে গিয়ে মেয়েটার মনে হয় “ইস এই জামাটা থাকলে আজ পরা যেত” এভাবেই সে তাদের প্রয়োজনীয় টুকটাক সব জিনিসপত্র পরম যত্নে প্যাক করে নিল।

​এদিকে হঠাৎ করে গ্রামে যাওয়ার কথা শুনে ইফাত একদম মুড অফ করে রুমের এক কোণে বসে আছে। গ্রামে যাওয়া বা শ্বশুরবাড়ি যাওয়া নিয়ে তার নিজের কোনো প্রবলেম নেই‚ আসল প্রবলেম হচ্ছে প্রাইভেসি। নতুন বিয়ে করে এমনিতেই সে শান্তিতে দুটো কথা বলতে পারছে না‚ তার ওপর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে যৌথ পরিবারের মাঝে তেমন কোনো প্রাইভেসিই পাওয়া যাবে না। এখানে মেহের তাকে দেখে কিছুটা ভয়ে ভয়ে থাকলেও অন্তত নিজের কাছে তো পাওয়া যায় কিন্তু বাপের বাড়ি গিয়ে সে নিজের চেনা এলাকায় থাকলে ইফাত’কে হয়তো পাত্তাই দেবে না। বড়জোর রাতের ওইটুকু খানি সময় মেহের’কে কাছে পাওয়া যাবে কিন্তু এইটুকু সময়ে ইফাত চৌধুরীর মন কি আর পোষায়? ​তবুও মনে মনে হাজারটা ক্ষোভ নিয়ে সে ট্রলি ব্যাগে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এক এক করে গুছিয়ে নিচ্ছিল। সে যখন মুখ হাঁড়ি করে সব গোছাচ্ছে‚ তখন মেহের বিছানার এক পাশে গুটিসুটি মেরে বসে তার এই দশা দেখে মিটিমিটি হাসছিল।

​বউ’কে ওভাবে হাসতে দেখে ইফাতের মাথার রাগ যেন চট করে চড়ে বসল। সে হাতের জামাটা ব্যাগে গুঁজে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ ​“দেখো ফুলকন্যা একদম ওমন দাঁত কেলিয়ে হাসবে না বলে দিচ্ছি। শালার চব্বিশ ঘণ্টাও হয়নি বিয়ে করেছি‚ এর মাঝেই শালা আমার থেকে আমার বউটাকে আলাদা করে নিয়ে যাওয়ার ফন্দি এঁটে ফেলেছে। আর ভালো করে শুনে রাখো‚:বাপের বাড়ি গিয়ে যেন বেশি পাখনা না গজায়। অল টাইম আমার সাথে সাথে ছায়ার মতো থাকবে‚ নয়তো বাসায় ফিরে এলে এমন মজা বোঝাবো যে টের পাবে‚ হুম।
​মেহের ইফাতে’র এমন ছেলে মানুষি রাগ দেখে একটু হেসে বলল‚ “এমন করছেন কেন আপনি? দুনিয়াতে আপনি ছাড়া আর কোনো পুরুষ কি বিয়ে করেনি জীবনে? পেয়েছেন তো একটা সেকেন্ড হ…
​মেহের তার মুখের বাকি কথাটুকু শেষ করার আগেই ইফাত এক তীব্র ও ভয়ংকর রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করল মেহেরে’র দিকে। ইফাতে’র সেই রুদ্রমূর্তি দেখে মুহূর্তের মধ্যে মেহেরে’র মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তার মুখটা কেমন বেলুনের মতো চুপসে গেল। ​ইফাত হাতের সমস্ত জামাকাপড় মেঝের ওপর সজোরে ছুঁড়ে ফেলে এক লাফে মেহেরে’র সামনে এসে তার গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। মেহের স্তব্ধ ও অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভাবতেই পারেনি যে সামান্য একটা রসিকতার কথায় এই মানুষটা এতটা মারাত্মক ভাবে রেগে যেতে পারে। ইফাত তখন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের দাঁতে দাঁত চেপে চরম গম্ভীর স্বরে বলে উঠল‚
​“প্রিয়তমা কখনো ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ হয় না বুঝেছো? আজ ফার্স্ট টাইম নিজের মুখে এই সস্তা শব্দটা উচ্চারণ করেছো বলে ছেড়ে দিলাম‚ নেক্সট টাইম যদি ভুলেও এই কথা তোমার মুখে এনেছো। তবে আমি তোমাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবো‚ জাস্ট মাইন্ড ইট।

​ইফাতে’র এই ভয়ঙ্কর রুদ্ধমূর্তি আর চোখের ভেতরের আগুন দেখে মেহেরে’র বুকের ভেতরটা কেমন যেন শীতল হয়ে গেল। সে আগে থেকেই জানত যে পুরুষের তীব্র অধিকারবোধ ও ভালোবাসা অনেক সময় ভয়ংকর হয় কিন্তু এই মানুষটার ভালোবাসা যে এতটা তীব্র আর মারাত্মক‚ তা আজ সে প্রথম টের পেল। সে বুঝতে পারল‚ ইফাত তাকে কতটা নিখাদ ও পবিত্র ভাবে নিজের করে মেনে নিয়েছে। যেখানে মেহেরে’র অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনার গ্লানি ইফাত’কে স্পর্শ করতে পারেনি। ​কথাটা শেষ করেই ইফাত রাগে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। তাকে আটকানোর উদ্দেশ্যে মেহের তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নামতে গেল কিন্তু বেডশিটে পা লেগে সে ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল। তার মুখ থেকে এক মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
​”আউচচ…!

​মেহেরে’র সেই ব্যথার চিৎকার শোনা মাত্রই ইফাতে’র ভেতরের সমস্ত রাগ এক সেকেন্ডে উবে গেল। সে এক ঝটকায় পেছনে ফিরে মেহেরে’র কাছে ছুটে এলো এবং তাকে আলতো করে ধরে আবার বিছানায় বসিয়ে দিল। তার কণ্ঠে তখন রাগের বদলে এক বুক উদ্বেগ। ​
“ব্যথা পেয়েছো ফুলকন্যা? আমি তোমাকে কতবার বলেছি যে হুটহাট বেড থেকে নামবে না। তবুও কেন তুমি আমার কোনো কথা শোনো না‚ বল তো?
​মেহের নিজের পায়ে হাত ডলতে ডলতে একটু অভিমানী সুরে বলল‚ “জাস্ট একটুখানি ব্যথা পেয়েছি এর জন্যেও এখন আমাকে ওমন করে বকবেন?
​“হ্যাঁ‚ একশ বার বকবো। চুপচাপ এখন এখানে বসে থাকো। —ইফাত চোখ রাঙাল।
​”আমি যদি বসে থাকি‚ তাহলে আমাদের জামাকাপড় গুলো গোছাবে কে? —মেহের মেঝের কাপড়ের দিকে তাকিয়ে শুধাল।
ইফাত মেহেরের দিকে চেয়ে ধমকের সুরে বলল‚ “কেন‚ আমি কি মরে গেছি? আমি তো এখনো বেঁচে আছি নাকি? তাহলে তুমি চুপচাপ ওখানে বসে থাকো। একবার হোঁচট খেয়ে মেঝেতে পড়ে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছ‚ এখন আবার নতুন করে কোমর ভেঙে রুমে বসে থাকার বাহানা খুঁজো না। তোমার কিচ্ছু করতে হবে না‚ আমি একাই সব গুছিয়ে নিচ্ছি।
​এই বলে ইফাত মেঝে থেকে শাড়ি আর জামাগুলো তুলে ঝেড়ে আবার পরম যত্নে ব্যাগে গোছাতে লাগল। মেহের বিছানায় বসে তার এই কেয়ারিং রূপটার দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই এক পরম শান্তিতে চোখ বন্ধ করল। সে মনে মনে ভাবল‚’এই পুরুষটার ভালোবাসার চাদর সত্যি অনেক গভীর। যা তাকে দুনিয়ার সব ঝড় থেকে আগলে রাখার ক্ষমতা রাখে।

​দীর্ঘ দুই ঘণ্টা জার্নি করে উজান‚ মৌ‚ মেহের‚ ইফাত ও তন্ময় অবশেষে তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে এসে পৌঁছাল। গাড়ি তাদের একদম তালুকদার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল। কিন্তু মূল বাড়িতে ঢোকার জন্য একটা সরু গলির মতো রাস্তার সামনে এসে সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সামনের কাঁচা রাস্তাটিতে বৃষ্টির কারণে প্রায় পায়ের গোড়ালি সমান পানি ও কাদা জমে আছে। ​রাস্তার এই অবস্থা দেখে উজানে’র কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তবে তার পাশে থাকা মৌ নিজের বাপের বাড়ি আসার খুশিতে তখনো উৎফুল্ল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর মাঝেই বাড়ি থেকে মৌ’য়ের বাবা‚ চাচা ও ভাই-বোনসহ সবাই তাদের এগিয়ে নিতে চলে এলেন। তারা উজানদে’র হাতের ব্যাগপত্র নিয়ে আগে আগে পথ দেখাতে লাগলেন। ​মৌ-ও আর তর সইতে না পেরে ওই কাদা-জলের মাঝেই পা বাড়াতে গেল কিন্তু তার আগেই উজান শক্ত করে তার হাত আঁকড়ে ধরল। মৌ একটু ঘাড় বাঁকিয়ে বরের দিকে চাইল।

​”কী হলো‚ বাড়িতে যেতে দেবেন না আমায়?
​“হেঁটে গেলে পায়ে এই নোংরা পানি লাগবে তোমার। সো‚ জাস্ট ওয়েট জান। আমি আছি না।
উজান বেশ আদুরে সুরে বলল। ​এই বলেই উজান নিজের জুতো জোড়া খুলে এক হাতে নিল এবং প্যান্টের নিচের অংশটা খানিকটা উঁচুতে গুটিয়ে নিল। তারপর চোখের পলকে এক ঝটকায় মৌ’কে পাঁজকোলা করে নিজের বুকে তুলে নিল। আচমকা এই কাণ্ডে মৌ কিছুটা চমকে গেলেও তড়িঘড়ি করে দুই হাতে উজানে’র গলা জড়িয়ে ধরল এবং উজানে’র মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। ​উজান মৌ’কে কোলে নিয়ে যেই না কাদা-জলের রাস্তায় দু-কদম এগিয়েছে‚ অমনি তার চোখ গেল সামনের দিকে। দেখল‚ ইফাত ততক্ষণে মেহের’কে কোলে তুলে নিয়ে দিব্যি রাস্তা পার হয়ে ওপাশে পৌঁছে গিয়েছে। ​সেই দৃশ্য দেখে উজানে’র চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। সে রাগে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল‚

​“শালার ভণ্ড। আমি যা-ই ভাবি‚ এই শয়তানটা সেটা আমার আগেই করে ফেলে। বিয়ে করলাম আমি আগে‚ আর ও পরে বিয়ে করেও অলরেডি রোমান্স করে ফেলেছে। এখন বউ’কে কোলে নিয়ে যাওয়ার আইডিয়াটা মাথায় আনলাম আমি কিন্তু ব্যাটা নিজেই আমার আগে চলে গেল। ওহ মাই গড‚না জানি ও আমার আগে বাপও হয়ে যায় কিনা। ওহ শিট‚ এমনটা যদি সত্যি হয় তবে তো আমি সকলের সামনে মুখ দেখাবো কীভাবে? ছিঃ ছিঃ।
​উজান যখন নিজের মনে মনে এই হিসাব কষছিল। ঠিক তখনই ওপার থেকে ইফাত যেন তার মনের কথা টের পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ ​“একদম ঠিকই ভেবেছিস উজান। তোর আগে বাপও আমিই হবো‚ জাস্ট তুই দেখতে থাক।
​উজান পুরো চমকে তাকিয়ে রইল ইফাতে’র দিকে। এই ছেলেটা তার মনের গোপন কথা এভাবে বুঝে ফেলল কীভাবে? সে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ইফাতে’র দিকে। কিন্তু ইফাত সেই রাগকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে এক গাল দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে মেহের’কে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। উজান মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুরো বোকা বনে গেল। অতঃপর সে নিজেও মন খারাপ না করে ধীরে ধীরে মৌ’কে কোলে নিয়ে সাবধানে সামনে এগিয়ে চলল। বাড়ির শুকনো উঠোনের সামনে এসে সে মৌ’কে নিচে নামিয়ে দিল। তবে তার নরম হাতটা নিজের মুঠো থেকে ছাড়ল না।

​এদিকে ​মৌ বাড়িতে এসেছে শুনে রোহন অধীর আগ্রহে রুম থেকে দৌড়ে নিচে নেমে আসছিল। কিন্তু উঠোনের কাছাকাছি আসতেই কিছুটা দূরত্ব থেকে উজানে’র হাতের শক্ত ভাঁজে মৌ’য়ের হাতজোড়া আটকে থাকতে দেখে তার বুকের ভেতরটা যেন এক তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। ​তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় ফুল’টার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আর কেউ নয় তারই নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড উজান। অথচ সে নিজের অজান্তেই এতদিন এই সত্য থেকে দূরে ছিল।
মুহূর্তের মধ্যে রোহনে’র হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল। মনে হলো তার সারা শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চোখের পলকে তার সাজানো মনের দুনিয়াটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। লোকে বলে পুরুষ মানুষ নাকি কাঁদে না‚ অথচ এই মুহূর্তে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে অন্যের হাত ধরে হাসতে দেখে রোহনে’র দু-চোখ বেয়ে আপনা-আপনিই তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ​সে আর এক কদমও সামনে যাওয়ার শক্তি পেল না‚ উল্টো দু-কদম পিছিয়ে গেল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলছিল সে। কোনো রকমে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে সে উল্টো ঘুরে আবার দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেল। ভেতরের দরজার লকটা সজোরে আটকে দিয়ে রুমের টেবিলে থাকা সব জিনিসপত্র মেঝের ওপর আছাড় মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে লাগল।

​“তুই আমার সাথে এমনটা কেন করলি ফুল? তোর বিয়ে হয়ে গেছে শুনেই আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। আর এখন আমার নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডকে বিয়ে করে আবারও আমাকে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ করে দিলি? এই ভয়ংকর যন্ত্রণা আমি কীভাবে সহ্য করব? কাকে দেখাবো আমার এই মনের ক্ষত? কীভাবে পারলি তুই আমাকে এভাবে একা ফেলে অন্য কারও ঘরের বউ হতে? তোর কি একবারের জন্যও বুকটা কাঁপল না?
​সে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল‚ “কী দোষ ছিল আমার‚বল তো? আমি কি খুব খারাপ ছিলাম? আমাকে কি একটুও আপন করে নেওয়া যেত না ফুল?
​ঠিক তখনই বন্ধ দরজার ওপার থেকে হালকা টোকার শব্দ ভেসে এলো। দরজার আওয়াজ পেয়ে রোহন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে নিজের চোখের জল মুছে নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল কিন্তু তার চোখ-মুখের সেই গভীর যন্ত্রণার ছাপ কোনো ভাবেই আড়াল করা গেল না। ​ধীরে ধীরে দরজাটা খুলতেই সে সামনে মৌ’য়ের মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। তিনি রোহনের’ মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত করুণ ও নিচু স্বরে বললেন‚

“বাবা নিচে চলো। সবাই এসেছে।
রোহন একটা শুকনো ও তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে‚ “হুম যাবো তো মা। আপনি আমার মা‚ আপনি যখন বলেছেন নিচে যেতে। আমি যাবো না‚ এমনটা কখনো হয়? আপনি বললে তো আমি আমার এই তুচ্ছ জানটাও দিয়ে দিতে পারি।
আপনার মেয়েকে তো নিজের বউ করে এই ঘরে তুলতে পারলাম না। এখন তার বিরহ-আগুনেই না হয় সারা জীবন জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাই।
​মৌ’য়ের মা ছেলেটার এমন বুকফাটা কথা শুনে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি কাতর স্বরে বললেন‚ “বাবা তুমি চুপ কর এবার। তোমার এই কথা গুলো আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
​রোহন আবারও একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।

“মা ও মা। আপনি আমার এই সামান্য মুখের কথাই সহ্য করতে পারছেন না? অথচ আমি যে নিচে গিয়ে আমার প্রাণের ফুল’কে আমারই নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডের বউ হিসেবে দেখতে যাচ্ছি‚ এটা আমি কীভাবে সহ্য করছি বলুন তো? এই এতিম ছেলের জীবনে কি দুঃখ-কষ্টের খুব কমতি ছিল যে আজ এই দিনটাও চোখ মেলে দেখতে হলো?
​সে নিজের বুকের ভেতরের কান্নার ঝড়কে এক বিশাল পাথরের নিচে চেপে ধরে লম্বা একটা শ্বাস নিল। তারপর বলল‚ “চলুন মা আমার বুকে শত কষ্ট হলেও আমি যাবো। আজ সবার সামনেই গিয়ে দাঁড়াবো।
​যেহেতু সে এই মানুষটিকে নিজের মায়ের মতো শ্রদ্ধা করে এবং ‘মা’ বলে ডাকে‚ তাই তাঁর মুখের কথা সে কিছুতেই অমান্য করতে পারবে না। বুকে এক সমুদ্র কষ্ট নিয়ে রোহন ধীরপায়ে নিচে নামার জন্য পা বাড়াল।
​রোহান ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে‚ আর প্রতিটা কদমে তার মনে হচ্ছে বুকের ভেতরের পাঁজর গুলো ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে‚ উজান মৌ’য়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ একটা সময় সে স্বপ্ন দেখত‚ এই জায়গাটাতে উজান নয় বরং তার নিজের থাকার কথা ছিল। ​উজান সিঁড়ির দিকে তাকাতেই রোহান’কে দেখতে পেয়ে বেশ খুশি হলো এবং দ্রুত এগিয়ে গেল। সে রোহান’কে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে আনন্দের সুরে বলে উঠল‚

“দোস্ত তুই এখানে? কী দারুণ সারপ্রাইজ।
​রোহান উজানে’র বুকের ভেতর থেকেই নিজের কান্না চেপে ধরে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। সে উজান’কে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে ধীর স্বরে বলল‚ “হুম। এটা এই এতিম ছেলেটারই বাড়ি। আর তুই এই এতিম ছেলেটার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনটাকেই আজ নিজের করে নিয়েছিস।
​উজানে’র কানে কথাগুলো স্পষ্ট না পৌঁছানোয় সে ভ্রু কুঁচকে শুধাল‚ “কিছু বললি রোহান? ঠিক শুনতে পাইনি।
​“ওহু কিছু না। তোরা তো অনেকক্ষন জার্নি করে এসেছিস‚ অনেক টায়ার্ড নিশ্চয়ই? তোরা সবাই উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নে‚ বাকি সব কথা না হয় সন্ধ্যার দিকে হবে। এখন আছি আমি। ইফাত‚ তন্ময় তোরাও চল‚ রুমে গিয়ে রেস্ট নে।
​বুকের ভেতর এক হাজার একটা যন্ত্রণার ছাই চাপা দিয়ে রোহান সবার সাথে অত্যন্ত হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল। তার এই হাসির আড়ালের ক্ষত কেউ টেরই পেল না। সবাই এক এক করে যে যার রুমের দিকে চলে গেল। ​সবাই চলে গেলেও মৌ ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। সে বেশ খুশিমনে‚ মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি নিয়ে রোহানে’র সামনে এসে দাঁড়াল। সে আহ্লাদী সুরে জিজ্ঞেস করল‚

“ভাইয়া কেমন আছো তুমি? কতদিন পর দেখা।
​মৌ’য়ের এই নিষ্পাপ প্রশ্নটা রোহানের জ্বলন্ত ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে যেন ফুটন্ত তেল ঢেলে দিল। সে রক্তিম চোখে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অভিমানে বলে উঠল‚
​“আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে এখন জিজ্ঞেস করছিস কেমন আছি আমি? তুই কখনো শুনেছিস ফুল‚ কেউ স্বেচ্ছায় বিষ পান করে আবার সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে চায়?
​রোহানে’র এমন ভয়াবহ কথা শুনে মৌ’য়ের মুখের মিষ্টি হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে একদম চুপ হয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল। তখন আবারও রোহান একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তার চোখের কোণে তখন নোনা জল চিকচিক করছে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাসীন গলায় বলল‚
​“জানিস ফুল? আজ তোদের এই বর-বউ সাজে একসাথে দেখে আমার বুকের ভেতর একটা গান খুব করে বাজছে। একদম আমার এই অভিশপ্ত লাইফটার মতো।
​ঠিক তখনই রোহান সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া গলায়‚ নিজের চোখের জল ছেড়ে দিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠার মতো সুরে মিনমিন করে গেয়ে উঠল:

​❝যখন লাল শাড়ি তুই পড়লি গায়…!! আমায় কি তোর মনে লয়?
কেমনে পারলি ভাঙতে আমার বুক?
হায়রে এত কাছের মানুষ হায়‚ কেমনে রে সব ভুইলা যায়? এক নিমিষেই হৃদয়ে ভাঙচুর…!!
তোর ওই চাঁদ বদনে হলুদও লাগাইয়া‚ কন্যা রে যাবি রে যাবি আমায় ভুইলা…❞
​রোহানে’র মুখের এই আকুল গান আর তার চোখের অবাধ্য অশ্রুধারা দেখে মৌ’য়ের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে সম্পূর্ণ অসহায় চোখে রোহানে’র দিকে তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে এই পাগল ছেলেটাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা বা অধিকার কোনোটাই যে তার কাছে অবশিষ্ট নেই। ​সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় শুধু এটুকু বলতে পারল‚

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪১

“ভাইয়া আ আ আ আমি আসলে…
রোহন তার কথা শেষ করতে না দিয়েই হু হু করে কেঁদে উঠল। নিজেকে আর স্বাভাবিক রাখতে পারছে না কোনো ভাবেই।
“আমি জানি তুই কোনোদিনও আমাকে ওভাবে ভালোবাসিসনি‚ এটাই বলবি তো? কিন্তু…

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here