প্রফেসর উজান চৌধুরী শেষ পর্ব
বন্যা সিকদার
কেটে গিয়েছে দুই-দুইটি মাস। এই দু’মাসে তাদের মেয়ে ‘রিহা’ অনেকটা বড় হয়েছে‚ এখন বাবা-মায়ের কথা কিছুটা বুঝতেও পারে। অথচ এইটুকু একটা পুঁচকে বেবিকে নিয়ে উজান যখন-তখন এদিক-ওদিক চলে যায়। এই নিয়ে মৌ’য়ের অভিযোগের শেষ নেই। এত ছোট একটা মেয়েকে এই সময় বেশি বাইরে রাখা ঠিক নয় কিন্তু উজান যেন কিছুতেই শুনতে নারাজ। মেয়ে হওয়ার পর তার ধৈর্যের পরিমাণ যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। যেখানে অন্য সব পুরুষ বাবা হওয়ার পরও সন্তানের দিকে তেমন মনোযোগ দিতে পারে না‚ রাত-বিরাতে বাচ্চা কাঁদলে বিরক্ত হয় বা চেঁচামেচি করে। সেখানে উজান তার পুরো বিপরীত মেরুর মানুষ। দীর্ঘ আটটি মাস সন্তানকে পেটে নিয়ে কত কষ্টই না সহ্য করেছে মৌ। সেই অসহ্য যন্ত্রণা উজান নিজ চোখে দেখেছে‚ তাই এখন সে মৌ’কে একদম পূর্ণ বিশ্রামে রেখেছে। সারাদিন-রাতে হাতে গোনা মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমায় উজান‚ আর বাকি পুরোটা রাত মেয়েকে নিয়ে জেগে থাকে। মেয়েটাও হয়েছে ঠিক তার বাবার মতো ভীষণ দুষ্টু। সারাটা দিন শান্ত হয়ে ঘুমাবে‚ আর রাত হলেই তার যত দুষ্টুমি শুরু হবে। তবে তার এই জ্বালাতন মৌ’কে সহ্য করতে হয় না‚ সে নিশ্চিন্তে পরম ঘুমে ঢলে পড়ে আর উজান পুরো রাত জেগে মেয়েকে সামলায়।
সারাদিন ভার্সিটির কাজ সামলেও মেয়েকে সামলাতে তার বিন্দুমাত্র বিরক্তি নেই বরং সে আনন্দ পায়। মেয়েকে ফিডিং করানো‚ জামা চেঞ্জ করানো‚ বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রুম জুড়ে হেঁটে বেড়ানো—সব উজান নিজ হাতে করে। মৌ শুধু অবাক চোখে তা তাকিয়ে দেখে। এমনকি দিনেও মৌ’কে তেমন একটা মেয়েকে সামলাতে হয় না‚ সে শুধু খাওয়ায়‚ আর বাকি সময় বাড়ির সবাই রাজকন্যাকে নিয়ে মেতে থাকে। পরিবারের বড় নাতনি বলে কথা‚ তাই তার ওপর ভালোবাসার কোনো সীমা নেই।
তবে দিনে বেশির ভাগ সময়ই সে তুবা’র কোলে থাকে। মৌ দূর থেকে তুবা’র মুখের সেই প্রাণ খোলা হাসি দেখে। সন্তানহীন মায়ের মনের কষ্ট মৌ খুব ভালো করেই বোঝে‚ সেই জন্যই সে কখনো তুবা’কে সন্তান নিয়ে কোনো বিদ্ধমূলক কথা বলেনি। উল্টো সে নিজে যেয়ে রিহা’কে তুবা’র কোলে দিয়ে এসেছে। এদিকে আজ দু’মাস পর উজান ও মৌ তাদের আগের সেই দোতলার রুমে শিফট হচ্ছে। প্রেগন্যান্সির সময়ে মৌ’য়ের সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে কষ্ট হবে ভেবে তার চার মাসের মাথায় তারা নিচে শিফট হয়েছিল। আজ আবার সেই প্রিয় রুমে ফিরে যাওয়ার পালা। পুরো রুম গোছানোর দায়িত্ব উজান একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে‚ কাউকে রুমে ঢুকতেই দেয়নি। সেই জন্য আজ সে ভার্সিটি থেকে অফও নিয়েছে। আজকের পুরোটা দিন সে শুধুই তার ওয়াইফ’কে দিতে চায়।
এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল‚ তবুও উজানে’র রুম গোছানো শেষ হলো না। মৌ নিচে সোফায় বসে ছিল‚ এক জায়গায় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে থাকতে সে বেশ বিরক্ত!ল। ওদিকে তুবা আর আরিয়ান রিহা’কে নিয়ে আনন্দে মেতে আছে‚ তাদের মুখের মিষ্টি হাসি দেখে মৌ’য়ের মনটা শান্তিতে ভরে গেল। অতঃপর সে একঘেয়েমি কাটাতে ধীরে ধীরে ছাদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু ছাদে পা রাখতেই সে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল। সেখানে আগে থেকেই রয়েছে ইফাত আর মেহের। মেহের যেদিকেই যাচ্ছে‚ ইফাত পা টিপে টিপে তার পিছু পিছু সেদিকেই দৌড়াচ্ছে। বারবার মেহের রাগী চোখে তাকাচ্ছে‚ তবুও ইফাতে’র থামার কোনো লক্ষণ নেই। তার মুখে একটাই মিনতি…
“সরি বউ। প্লিজ‚ আজকের মতো মাফ করে দাও। ট্রাস্ট মি. এরপর থেকে দরকার হলে তোমার বোরখা পরে বাইরে বের হব‚ তবুও আজকের মতো ক্ষমা করে দাও।
মেহের তেড়ে এলো ইফাতে’র দিকে। কর্কশ কণ্ঠে গর্জে উঠল‚ “টাচ করবেন না আমায়‚ বললাম না? বাজে লোক একটা। যান না‚ যে আপনাকে রাস্তাঘাটে জড়িয়ে ধরেছিল, তাকেই গিয়ে টাচ করুন।
“ছিঃ‚ নাউযুবিল্লাহ। ঘরে আমার চাঁদের মতো সুন্দর বউ থাকতে আমি ওই জংলিদের কেন টাচ করতে যাব? ওদের দিকে তো আমার রুচিই যায় না।
“রুচি গেলে তো ঠিকই টাচ করতেন। দাদি একদম ঠিক বলতেন‚ পুরুষ মানুষ মানেই খারাপ।
মেহের মুখ ফিরিয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে ছাদের অন্যদিকে গিয়ে দাঁড়াল। ইফাত তার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইদানীং মেয়েটা বড্ড বেশি কথায় কথায় ‘ছ্যাঁদ’ করে ওঠে। অবশ্য প্রেগন্যান্সির সময়ে মেয়েদের এমন ‘মুড সুইং’ হয়‚ ইফাতে’র তা জানা আছে কিন্তু তা বলে একেক সময় একেক অদ্ভুত মুড? গতকাল রাতেই তো ইফাত’কে দেখে মেহের অযথাই চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল। সে নাকি ইফাতে’র সাথে এক বিছানায় ঘুমাবে না‚ অন্য কারও সাথে ঘুমাবে। কিন্তু ইফাতও তো বউ ছাড়া ঘুমাতে পারে না। শেষে মেহের’কে অনেক বুঝিয়ে-শুঝিয়ে ইফাতে’র সাথে ঘুমাতে রাজি করানো হলো ঠিকই কিন্তু শর্ত হিসেবে বেচারা ইফাত’কে সারারাত মেঝেশীলে (মেঝেতে) শুয়ে কাটাতে হয়েছে।
আর আজ উজানে’র সাথে কিছু জরুরি কেনাকাটা করতে গিয়ে ইফাতে’র এক এক্স-গার্লফ্রেন্ড হুট করে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। উজান শয়তানি করে অমনি সেই মুহূর্তের একটা ছবি তুলে মেহেরে’র ফোনে পাঠিয়ে দিয়েছে। ব্যস‚ তারপর থেকেই শুরু হয়েছে এই ধুন্ধুমার কাণ্ড।
“বউ‚ বউ‚ প্লিজ রাগ করো না। আই প্রমিজ‚ তুমি ছাড়া এই ইফাত চৌধুরী আর কারও দিকে তাকায় না।
”আপনাকে আমি বিশ্বাস করব না। আপনি খুব খারাপ। আমি আগের চেয়ে মোটা হয়ে গেছি বলে আমাকে আর আপনার ভালো লাগে না‚ তাই না? আর সেই জন্য অন্য মেয়েকে জরিয়ে ধরতে দেন। আমি সব বুঝি।
মেহের অভিমানী স্বরে কথা গুলো বলল। তীরের মতো কথা গুলো গিয়ে সরাসরি ইফাতে’র বুকে বিধল। সে ততক্ষণাৎ মেহেরে’র সামনে গিয়ে হুট করে তাকে শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। আকুল গলায় বলল‚
“এটা কী বলছো ফুলকন্যা? আমার তোমাকে ভালো লাগে না‚ তুমি এটা বলতে পারলে?
”ছাড়ুন আমাকে। আপনাকে আর বোঝাতে হবে না‚ আমি সব বুঝি।
কিন্তু ইফাত তাকে ছাড়ল না। হঠাৎ মেহের তার কাঁধে শীতল‚ তরল কিছুর স্পর্শ অনুভব করল। মুহূর্তের মধ্যেই সে চমকে উঠল। ইফাত’কে অনেক কষ্টে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দেখে…ইফাতে’র চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তা দেখে মেহের ঠোঁট ফুালালো।
”আপনি কাঁদছেন? আমি তো জাস্ট এমনি এমনি বলেছি। তার জন্য এভাবে কাঁদতে হবে?
ইফাত অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে তাকাল। মেহের পরম যত্নে তার চোখের জল মুছে দিতেই ইফাত তার সেই হাতটিতে ব্যাকুল হয়ে চুমু খেল। এবং আকুল কণ্ঠে বলল‚ “তুমি কেন এমনি এমনি বলতে গেলে? তুমি তো জানো তুমি ছাড়া এই ইফাত চৌধুরী কারও দিকে চোখ তুলে তাকায় না‚ তবুও বললে। তুমি এসব অভিযোগ করলে আমার বড্ড কষ্ট হয়। আমি প্রমিজ করেছিলাম না‚ তোমাকে সবসময় অনেক অনেক ভালোবাসব?
”আচ্ছা‚ আর মুড অফ করবেন না‚ প্লিজ। আর কখনো এমন কথা বলব না।
“তুমি বিশ্বাস করো‚ আমি সত্যিই ওই ডাইনিকে দেখিনি। ও নিজেই হুট করে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল।
আবারও ইফাত তাকে বাহু ডোরে জড়িয়ে ধরল। মেহেরও ইফাতে’র পিঠে আলতো করে হাত বুলালো। অতঃপর মৃদু হাসল।
”আপনাকে বিশ্বাস না করলে মেহেরে’র জীবন এতটা সুন্দর কখনোই হতো না। আপনাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি সত্যি ভাগ্যবতী। আপনি আছেন বলেই মেহের আছে।
মেহেরে’র আশ্বাসে ইফাত কিছুটা শান্ত হলো। সে মেহের’কে এক হাতে বুকের সাথে লেপ্টে ধরে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল। হুট করেই ইফাত মেহেরে’র গালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। মেহের চমকে তাকাল।
”আপনি এটা কী করলেন?
“রুমে চলো‚ বউ।
”রুমে যাব মানে? এই বিকেলে রুমে গিয়ে কী করব?
ইফাত মেহেরে’র চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে নিচু কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল‚ “তোমাকে চাই। এখন‚ এই মুহূর্তেই।
”কীহহহহহহহ? আপনি পাগল হয়ে গেছেন? প্রথমত এখন দিন আর তাছাড়া আমার পেটে বাবু আছে।
মেহেরে’র কথায় ইফাত আলতো করে হাসল। একটু ঝুঁকে মেহেরে’র নাকের সাথে নিজের নাক ছোঁয়াল।
“হুম‚ পাগল তো আমি হয়েইছি। সেটাও আবার আমার এই মিষ্টি বউটার প্রেমে। তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য পাগল হয়েছি। আর দিনে কী আমি আমার বউকে ভালোবাসতে পারব না? ভুলে গেলে‚ আমি কিন্তু আমার বউকে প্রথমবার দিনেই ভালোবেসেছিলাম।
ইফাতে’র কথায় মেহের মারাত্মক লজ্জা পেল। সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেলল সে। ইফাত আবারও ফিসফিসিয়ে আওড়াল‚
“আর আমার সন্তানের কথা বলছো? ইফাত চৌধুরীর সন্তান ইফাত চৌধুরীর মতোই হবে। সে অনেক সাহসী‚ তাই তার বাবার ভালোবাসার মাঝে সে কখনোই হারাবে না। বাকিটা আমি সামলে নেব। এবার চলো তো বউ‚ আমি অধৈর্য হয়ে পারছি।
তারা দুজন পেছনে ফিরতেই চমকে উঠল। দেখে— মৌ তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তাদের বুঝতে বাকি রইল না যে মৌ এতক্ষণ সব কথা শুনে ফেলেছে। মৌ দুষ্টুমির সুরে বলল….
”তা দেবরজি‚ আমার বোনকে কি আমি এখন পাব নাকি……
“নো নো নো। ভাবিজান‚ আপনার দেবর এখন মারাত্মক অসুস্থ। তাকে সুস্থ করতে আপনার এই বোনকেই প্রয়োজন। আপনার দেবর সুস্থ হলেই আপনি আপনার বোনকে ফেরত পাবেন। এবার আসি‚ কেমন?
এই বলে মেহেরে’র হাত ধরে একপ্রকার টেনে নিয়ে যেতে লাগল ইফাত। মৌ কেবল সেদিকে তাকিয়ে হাসল। কিছু কিছু সম্পর্ক কত সুন্দর হয়। সব অতীত জেনেও কত সহজে একে অপরকে আপন করে ভালোবাসতে পারে। এরপর মৌ নিজেই ছাদের এদিক-ওদিক ঘুরে দেখতে লাগল।
মৌ লাল টুকটুকে একটা শাড়ি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোনো ভাবেই তা পরতে পারছে না। এদিকে উজান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছে‚ আজকে তাকে নতুন বউয়ের মতো শাড়ি পরে প্রস্তুত থাকতে হবে। অথচ সে কিছুতেই কুঁচি মেলাতে পারছে না। তুবা এখন ছোট রিহা’কে সামলাতে ব্যস্ত আর মেহের ব্যস্ত ইফাত’কে নিয়ে। এদিকে রাতও অনেকটা গভীর হয়েছে‚ মৌ কাকে ডেকে সাহায্য চাইবে বুঝে উঠতে পারছে না। এর মাঝেই হঠাৎ দরজা খুলে হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকল উজান। মৌ’কে এই অবস্থায় হাত-পা গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ‘হু হু’ করে হেসে উঠল। তা দেখে মৌ প্রচণ্ড রাগান্বিত হলো। বাজখাঁই মেজাজে বলে উঠল‚
”প্রফেসর সাহেব‚ একদম হাসবেন না। আপনার জন্যই যত বিপদ। আপনি খুব ভালো করেই জানেন আমি শাড়ি পরতে পারি না‚ তাহলে কেন পরতে বললেন?
মৌ মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে উজান হাসতে হাসতে তার দিকে এগিয়ে এলো। এক বাচ্চার মা হয়ে গেছে অথচ এখনো শাড়ি পরতে পারে না। সে ধীরে ধীরে কাছে এসে মৌ’য়ের সামনে ঝুঁকে দাঁড়াল। মৌ’য়ের হাত থেকে শাড়িটা নিজের হাতে নিয়ে নিজেই পরাতে শুরু করল। পরম যত্নে সে এক-একটা কুঁচি ঠিক করছে। মৌ শুধু অবাক চোখে তা তাকিয়ে দেখল। কুঁচি গুলো সুন্দর করে গুছিয়ে উজান যখন মৌ’য়ের নাভির কাছে গুঁজতে যাবে‚ ওমনি মৌ ঝটপট তার হাত ধরে ফেলল। উজান অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
“কী হলো‚ পিচ্চি? কুঁচি গুঁজতে দেবে না?
”দিন‚ আমি নিজে গুঁজে নিচ্ছি।
উজান সাথে সাথে মুখ বাঁকাল। সে যখন পুরো শাড়িটাই পরিয়ে দিতে পেরেছে‚ তখন বাকিটুকুও সে-ই পারবে। সে আবার কুঁচি গুঁজতে গেলে মৌ আবারও তার হাত টেনে ধরল।
”দিন না। আমি গুঁজে নিচ্ছি!
“আমি গুঁজে দিলে প্রবলেম কীসের? চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো। শাড়ি পরিয়েও আমি দেব‚ আবার শাড়ি খুলেও আমিই দেব।
উজানে’র সরাসরি কথায় মৌ লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে গেল। মানুষটা এখনো সেই আগের মতোই বেহায়া রয়ে গেছে। এদিকে উজান শাড়ির কুঁচি ধীরে ধীরে মৌ’য়ের পেটের কাছে নিয়ে এলো। গুঁজতে গিয়ে তার চোখ আটকে গেল মৌ’য়ের পেটের খাঁজে। মেয়েটিকে এতটা কাছ থেকে আজ অনেক গুলো মাস পর দেখছে সে। মৌ কাঁপছে‚ সেটা উজান ঠিকই অনুভব করতে পারছে। বিয়ের এত গুলো বছর পার হয়ে গেল‚ তবুও তার স্পর্শে মৌ আজও কেঁপে ওঠে। হঠাৎ উজান শাড়ির কুঁচি মৌ’য়ের পেটে গুঁজে দিল এবং সাথে সাথে সেখানে গভীর একটি চুমু আঁকল। মৌ তড়িৎ গতিতে পিছিয়ে গেল। তা দেখে উজান খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে মুচকি হেসে উঠে দাঁড়াল। তারপর মৌ’কে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে কক্ষ ত্যাগ করল। এরপর উজান মৌ’কে নিজেদের রুমের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে দ্রুত গিয়ে নিজের মেয়েকে কোলে নিয়ে এলো। রিহা ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। বাবাকে এত খুশি দেখে সে নিজেও যেন ভীষণ খুশি। ঠিক তখনই এক হাতে মেয়েকে আর অন্য হাতে মৌ’কে নিয়ে উজান তাদের সাজানো রুমে পা রাখল।
ভেতরে পা রাখতেই মৌ চমকে তাকাল। একবার রুমের সাজসজ্জার দিকে‚ তো আরেকবার উজানে’র দিকে।
আজ পুরো রুমটা নানা রঙের তাজা ফুল দিয়ে চমৎকার ভাবে সাজানো হয়েছে। মৌ খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে প্রশ্ন করল।
”প্রফেসর সাহেব আপনি এসব করেছেন?
উজান মৌ’য়ের ঘাড়ে আলতো করে চুমু খেল। তারপর মুচকি হেসে উত্তর দিল।
“হুম‚ আমি করেছি। সেটাও আবার আমার এই মিষ্টি ওয়াইফির জন্য। ফার্স্ট বাসর রাতে তো আমার ওয়াইফিকে সেলিব্রেট করতে দিইনি কিন্তু এখন আর সেসব মিস হবে না। আজকে আমি আমার পিচ্চির সাথে সেকেন্ড বাসর করব।
মৌ সাথে সাথে চোখ রাঙিয়ে তাকাল। তা দেখে উজান মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলল‚ “ইয়ে মানে…ওই একই তো হলো। সেকেন্ড বাসর না করলেও‚ সেকেন্ড টাইম বাসরঘর সাজালাম। তা-ও আবার নিজ হাতে। বলো বলো‚ কেমন ফিল হচ্ছে?
মৌ খুশিতে গদগদ হয়ে রুমের ভেতরে এগিয়ে গেল। পুরো রুমটাতে চোখ বুলাল সে। আজ মনে হচ্ছে কত যুগ পর সে নিজের প্রিয় রুমে ফিরল। সে দ্রুত গিয়ে দক্ষিণের জানালাটা খুলে দিল‚ আর সাথে সাথে রাতের হিমেল বাতাস হু হু করে রুমে ঢুকে পড়ল। উজান কোনো মতে মেয়েকে বিছানার একপাশে শুইয়ে দিয়ে মৌ’য়ের কাছে গেল। পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে এক হাত দিয়ে মৌ’য়ের কোমর আঁকড়ে ধরল। তারপর তার ঘাড়ে মুখ ডুবাতেই মৌ ছটফট করে উঠল। চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে নিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল।
”প্রফেসর সাহেব‚ প্লিজ একটু দূরে সরুন।
“উঁহু! ডিস্টার্ব কোরো না তো‚ জান। ফিল নিতে দাও…!!
মৌ ছটফট করতে লাগল‚ তবুও উজান তাকে ছাড়ল না বরং ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়িয়ে দিল। উজান মৌ”য়ের দিকে আরেকটু ঝুঁকতেই কেঁদে উঠল রিহা। মেয়ের কান্না শুনে মৌ দ্রুত উজান’কে ঠেলে সরিয়ে বিছানার দিকে ছুটে গেল এবং মেয়েকে কোলে নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগল। মৌ’য়ের কোলে উঠতেই বুড়িটা সাথে সাথে কান্না থামিয়ে দিল। উজান চরম অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আজ বাপের কষ্টটা মেয়ে একদমই বুঝতে চাইছে না।
উল্টো উজানে’র বেলুনের মতো চুপসে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে রিহা খিলখিল করে হেসে উঠল। উজান একদম হাঁ হয়ে গেল। সে সাথে সাথে মৌ’য়ের কোল থেকে মেয়েকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে তার নাকে নাক ঘষে বলল।
“বদের ধাড়ি মেয়ে। বাপকে একটু রোমান্স করতে দিবি না? এত পাজির পাজি। চল‚ তোকে তোর আসল মায়ের কাছে দিয়ে আসি।
এই বলেই উজান মেয়েকে কোলে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যেতে লাগল। মৌ পেছন থেকে অনেক ডাকল কিন্তু উজান কানেই তুলল না। সে গটগট করে হেঁটে আরিয়ানে’র রুমের দিকে গেল।
ওদিকে মাত্রই আরিয়ান তুবা’র কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল‚ ওমনি উজান’কে হুট করে রুমে ঢুকতে দেখে দ্রুত উঠে বসল। উজান এক সেকেন্ডও দেরি না করে মেয়েকে তুবা’র কোলে চাপিয়ে দিয়ে নাক কুঁচকে বলল‚
“ভাইয়া-ভাবি‚ এবার তোমরা তোমাদের মেয়েকে সামলাও। বদের হাড্ডি একটা মেয়ে‚ বাপকে একদমই রোমান্স করতে দিচ্ছে না।
”ছিঃ ভাই‚ সামান্য রোমান্স করার জন্য তুই মেয়েকে আমাদের কাছে রেখে যাচ্ছিস?
আরিয়ান টিপ্পনী কেটে বলল। উজান পালটা উত্তর দিল। “ভাই প্লিজ‚ নিজে তো সারাক্ষণ রোমান্স করো আর আমাকে সামান্য রোমান্স দেখাচ্ছে? গত কয়েক মাস ধরে আমি অভুক্ত আছি। এবার অন্তত বউটাকে কাছে পাওয়ার সুযোগ দাও। ধুর‚ আমার টাইম ওয়েস্ট হচ্ছে। তোমরা তোমাদের মেয়ে সামলাও‚ আমি গেলাম।
পেছন থেকে আরিয়ান কত ডাকল কিন্তু উজান সেদিকে কান না দিয়ে সোজা নিজের রুমের দিকে রওনা হলো। আরিয়ান ও তুবা দুজনেই উজানে’র এমন কাণ্ড দেখে হেসে গড়ায়াল। তারপর তুবা রিহা’কে পরম আদরে বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। তুবা’র ওম পেয়ে ছোট রিহাও খুব খুশি‚ তারপর সে তাদের সাথেই দুষ্টুমিতে মেতে উঠল।
উজান রুমে এসে সোজা দরজা লক করে দেয় এবং তড়িৎ গতিতে মৌ’য়ের দিকে এগিয়ে যায়। মৌ কোমরে হাত দিয়ে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। উজান তার সামনে যেতেই সে চেঁচিয়ে উঠল…
“লজ্জা করে না আপনার? এইটুকু মেয়েকে মায়ের থেকে দূরে রাখতে?
“উঁহু‚ একটুও লজ্জা করে না। মেয়ে তো তার আরেক মাকে ঠিকই পেয়েছে‚ এবার আমাকে আমার বউকে পেতে দাও।
”ফাজলামো করছেন আমার সাথে? আমার মেয়েকে আমার কাছে এনে দিন। আমি আমার মেয়েকে একা একা কোথাও থাকতে দেব না‚ নিয়ে আসুন ওকে।
উজান মৃদু হাসল। তারপর খানিকটা এগিয়ে গিয়ে মৌ’কে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। মৌ রাগী চোখেই তাকিয়ে রইল। সে সরে আসতে চাইলে উজান আরও শক্ত করে তাকে বুকে চেপে ধরে। মৌ’য়ের সারামুখে ভালোবাসার স্পর্শ মেখে দিয়ে ফিসফিস করে।
“পিচ্চি‚ রিল্যাক্স হও প্লিজ। তুমি কিন্তু দিন দিন ভীষণ পঁচা হয়ে যাচ্ছো। মেয়ে আমাদের ঠিকই‚ তবে সেই মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে যদি ভাইয়া-ভাবি একটু সুখ পায়‚ তাতে ক্ষতি কী বলো? আমার পিচ্চি তো সবার কষ্ট অনুভব করে‚ সবাইকে বোঝে‚ তাহলে আজ কেন অবুঝের মতো বিহেভ করছে?
রিহা তো আমাদেরই সন্তান। এখন ওকে যদি কিছুটা সময় ভাবির কাছে দিই‚ তবে ক্ষতি কি বলো। তুমি তো একজন সন্তানহীনা মায়ের মনের কষ্ট বোঝো‚ তাই না? জানো‚ আমি ভাবিকে লক্ষ্য করেছি। সে আমাদের মেয়ে থেকে কিছুটা দূরে দূরে থাকে। কারণ‚ সেদিন কেউ একজন বলেছিল নিঃসন্তান মা যদি কোনো বাচ্চা কোলে নেয়‚ তবে সেই বাচ্চার নাকি ক্ষতি হয়। সেই থেকেই ভাবি নিজেকে গুটিয়ে রাখে। আচ্ছা‚ তুমিই বলো এমন কথা মানুষ কীভাবে বলে? আল্লাহ তো সবাইকে কোনো না কোনো ভাবে পরীক্ষা নেন‚ হয়তো ভাইয়া-ভাবিকে এভাবে নিচ্ছেন। তাদের মুখে যদি আমরা একটু হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারি‚ তাতে ক্ষতি কী? তাছাড়া আমি তো আছি। আমাকে পেয়ে কি তুমি হ্যাপি নও?
মৌ লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। মানুষটা তাকে সবসময় কত সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে‚ কখনো একটুও রেগে কথা বলে না। এই জন্যই মানুষটাকে তার ভীষণ ভালো লাগে। মৌ নিচু কণ্ঠে বলল‚
”আমি ওইভাবে বলতে চাইনি…আমাদের মেয়ে তো একা কখনো ঘুমায়নি‚ তাই বলছিলাম।
“আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারো। রিহা আমাদের চেয়েও ভাইয়া-ভাবির কাছে অনেক বেশি ভালো থাকবে।
”হুম‚ আমি জানি।
হঠাৎ উজান আকুল গলায় ডেকে উঠল‚
“পিচ্চি…!!
”হুম।
“ওয়াইফি…!!
”হুম।
“মিসেস চৌধুরী…!!
”হুম।
“রিহার মাম্মাহ্…!!
এবার মৌ সত্যি বিরক্ত হলো। এতবার ‘হুম’ বলার পরও কেন ডেকে যাচ্ছে‚ বুঝতে পারছে না। নিজের রাগকে দমিয়ে রেখে হালকা হেসে বলল‚ “হুম‚ বলুন প্রফেসর সাহেব।
“ভালোবাসি আপনাকে।
এই বলেই উজান ঘনিষ্ঠতা বাড়াল। মৌ বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও উজান শুনল না। বরং নিচু কণ্ঠে ফিসফিস করে।
“রিহার মাম্মাহ্‚ আজ হবেন আমার। অনেক গুলো মাস ওয়েট করেছি আর সহ্য হচ্ছে না। অধৈর্য হয়ে যাচ্ছি। প্লিজ‚ সামলান আমায়। নয়তো আজ মরেই যাব।
… … …?
“কথা বলছেন না কেন? একটু সামলাতে পারবেন না আমায়?
… … …?
“সত্যি সত্যি এবার ধৈর্য হারাচ্ছি। প্লিজ‚ বাঁচান আমায়।
কিন্তু তবুও মৌ’য়ের কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। উজান অবাক হয়ে মৌ’য়ের মুখের দিকে তাকাল। দেখে মেয়েটার চোখে দু’ফোঁটা জল ছলছল করছে। তা দেখে উজান ব্যাকুল হয়ে একপা পিছিয়ে গেল। মাথা নিচু করে অসহায় গলায় বলল…
“সরি‚ পিচ্চি। আমি নিজেকে সামলে নিচ্ছি…তবুও তুমি কেঁদো না‚ প্লিজ। কিছু হবে না আজ।
এই বলে উজান সরে যেতে চাইলে মৌ ঝটপট তার হাত ধরে ফেলে এবং তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
“কোথাও যাবেন না আপনি। আপনি এখানেই থাকুন।
“তুমি তো চাচ্ছো না আমি থাকি।
মৌ উজান’কে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলল‚ “আমি কি মুখ ফুটে একবারও বলেছি যে আপনাকে চাই না?
“তাহলে কাঁদলে কেন?
”আপনি এত ভালো কেন? আপনাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি সত্যি ভাগ্যবতী। আমি তো আপনারই অধিকার‚ তবুও বারবার কেন আমার অনুমতি নেন‚ সেই জন্য কাঁদছি। আমার ভালোর জন্য এত গুলো মাস আমার থেকে দূরে থাকলেন‚ সেই জন্য কাঁদছি। আমি সত্যিই অনেক লাকি‚ তাই না?
“এই প্রশ্নের উত্তর আগামীকাল দেব। আজ আমাকে সামলাতে পারবেন কিনা‚ শুধু সেটা বলেন। আর স্বাভাবিক থাকতে পারছি না।
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৬৪
মৌ মাথা নিচু করে উজান’কে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তের মধ্যেই উজান তার উত্তর পেয়ে গেল। সাথে সাথে মৌ’কে কোলে তুলে নিয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে আওড়াল….
“মিসেস উজান চৌধুরী ভালোবাসি আপনাকে। সারাজীবন আপনার ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে থাকতে চাই। আপনার ভালোবাসাহীনা কোনো অস্তিত্ব নেই প্রফেসর উজান চৌধুরীর।
মৌ নিজেও মুচকি হেসে উজান’কে জড়িয়ে ধরলো। “আপনাকেও অনেক ভালোবাসি‚ #প্রফেসার_উজান_চৌধুরী। আমার প্রফেসর সাহেব।
মৌ’য়ের উত্তর শুনে উজান পরম তৃপ্তির হাসি হাসল। মৌ’য়ের কপালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে আবারও আওড়াল‚ “অসম্ভব রকম ভালোবাসি আপনাকে মিসেস চৌধুরী। ভালোবাসি‚ ভালোবাসি‚ ভালোবাসি।
সমাপ্ত
