প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২১
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
রিসেপশন শেষ হলে আরিশান ইসলাম চেয়েছিলেন একদিনের জন্য মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যেতে। প্রথমে বাড়ির কেউ রাজি ছিল না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে জিয়ান বেঁকে বসল—সে রিত্তিকাকে যেতে দিল না। অগত্যা আরিশান ইসলামসহ পুরো পরিবার রিত্তিকাকে রেখেই চলে গেল। ইরা, রিদিতা, রিহানও তাদের সঙ্গী হলো।
জিয়ান মোবাইলে স্ক্রল করতে করতে ঘরে ঢুকছিল। তখনই রিত্তিকা তাকে প্রশ্নটা করে—
“আপনি আমাকে যেতে দিলেন না কেন…?”
জিয়ান কোনো উত্তর দিল না। রিত্তিকা আবার বলল,
_ “কী হলো, কিছু বলছেন না কেন? বলুন, যেতে কেন
দিলেন না?”
_”আমার ইচ্ছা, তাই যেতে দিইনি।” জিয়ানের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
_”কেন, আপনার ইচ্ছা? আপনি তো আমাকে বউ হিসেবে মানেন না, তাহলে…?”
জিয়ান বিরক্ত হয়ে বলল, “তোমার সাথে তর্ক করার মতো মুড নেই আমার এখন।”
_”আমি কি তর্ক করছি আপনার সাথে?”
_”বেশি কথা না বলে পড়তে বসো।”
_”পারব না এখন পড়তে, আমার ঘুম পাচ্ছে।”
_”আমি যখন বলেছি, তখন পড়তে বসবে।” জিয়ানের কণ্ঠে আদেশ।
রিত্তিকাও দমবার পাত্রী নয়, “পারব না, পারব না! কালকেও অনেক রাত পর্যন্ত পড়িয়েছেন। আজ পারব না।”
জিয়ান ব্লেজারটা খুলে সোফার ওপর রাখল। তারপর একটা টাওয়াল নিয়ে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে বলল, “শাওয়ার নিয়ে এসে যেন দেখি তুমি পড়তে বসেছ।”
জিয়ান চলে যেতেই রিত্তিকা মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল, “ধুর, ভালো লাগে না! খালি পড়া আর পড়া। জীবনটাই তেজপাতা! আমিও পড়তে বসব না, দেখি কী করেন আপনি।”
৩০ মিনিট পর…শাওয়ার নিয়ে চুল মুছতে মুছতে বের হলো জিয়ান। দেখল রিত্তিকা আগের মতোই বসে আছে, পড়ার টেবিলের ধারেকাছেও যায়নি।
_”তোমাকে না পড়তে বসতে বলেছি?”
রিত্তিকা কোনো উত্তর দিল না, মুখ ঘুরিয়ে রইল।
তখনই জিয়ান টেবিলের পাশ থেকে একটা চিকন বেত হাতে তুলে নিল। তা দেখে রিত্তিকার চোখ কপালে, “এই, আপনি বেত নিয়ে আসলেন কেন?”
_”কথায় আছে না—সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকাতে হয়।”
_”আপনি আমাকে মারবেন?” রিত্তিকার গলায় এবার কিছুটা ভয়ের আভাস।
_”প্রয়োজন পড়লে তাই। পড়তে বসোনি, এখন তো মার খেতেই হবে।”
রিত্তিকা জেদ ধরে বলল, “আমি পড়ব না, মারলে মারেন!”
জিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল, আর রিত্তিকা ভয়ে এক পা এক পা করে পেছাতে লাগল। পেছাতে পেছাতে একপর্যায়ে রিত্তিকার পিঠ রিডিং টেবিলের সাথে ঠেকে গেল। তাদের মধ্যকার দূরত্ব একদম ঘুচে গেল।
জিয়ান এত কাছে আসায় তার গায়ের পারফিউমের সুবাস রিত্তিকার নাক দিয়ে সোজা বুকে গিয়ে লাগল। শাওয়ার নিয়েও পারফিউমের তীব্র স্মেল যায়নি। দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে তার। শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ, কেমন যেন একটা অনুভূতি! কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে রিত্তিকা বলে উঠল:
_”এত… এত কাছে কেন আসছেন, খচ্চর স্যার?”
সাথে সাথেই রিত্তিকার মনের ভেতরের সব ঝড় থামিয়ে দিয়ে তার হাতের ওপর বেত দিয়ে একটা বাড়ি বসিয়ে দিল জিয়ান!
_”আহ্! মরে গেলাম রে! কী জোরে মারল!” রিত্তিকা হাত ডলতে ডলতে কেঁদে ফেলার মতো হলো।
_”চুপ! একদম চুপ! বেশি কথা বললে আবার মারব। বেয়াদব মহিলা, পড়তে বসতে বলেছি না? দুইদিন পর যার পরীক্ষা, সে ঘুরে বেড়াচ্ছে!”
_”তাই বলে এত জোরে মারবেন? আমি না আপনার বউ?” রিত্তিকা অভিমানী সুরে বলল।
_”আরেকটা কথা বললে ফের মারব। চুপচাপ পড়তে বসো।”
জিয়ানের ধমক খেয়ে রিত্তিকা আর কথা না বাড়িয়ে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। কিন্তু মাথায় এখন তার একটা পড়াও ঢুকছে না। তার একমাত্র কারণ—সামনে বসে থাকা জিয়ানের গম্ভীর উপস্থিতি।
রাত প্রায় একটা…ঘড়ির কাঁটা একটার ঘর ছুঁতেই জিয়ান বইটা বন্ধ করতে বলল, “আর পড়া লাগবে না, যাও ঘুমাও গিয়ে।”
রিত্তিকা যেন খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া পাখির মতো হাফ ছেড়ে বাঁচল।
_”আর হ্যাঁ, শোনো,” জিয়ান আবার বলল, “কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে ফের পড়তে বসবে, তারপর ভার্সিটি যাবে।”
_”হ্যাঁ, সেটা আর আপনার বলা লাগবে না, আমি সকালেই ঘুম থেকে উঠি।”
ঠোঁটের কোণে হালকা রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে জিয়ান বলল, “ভোর ৫টার দিকে? মিস পুকি?”
কথাটা শুনতেই রিত্তিকার চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল, “কীহ্! এত সকালে? আমি পারব না! আমি ৭:৩০ টার আগে ঘুম থেকে উঠি না!”
_”তা বললে হবে না, ড্রামা কুইন। যা বলেছি তাই করতে হবে তোমায়।” জিয়ানের গলা এবার বরফের মতো ঠাণ্ডা শোনাল।
অসহায়ভাবে রিত্তিকা বলে উঠল, “আমি এত সকালে উঠতে পারব না…” তার চোখ দুটো ততক্ষণে পানিতে টুইটম্বুর হয়ে গেছে।
”এখন ঘুমাতে যাও, পরেরটা পরে ভাবা যাবে।” বলেই জিয়ান বেডসাইড ল্যাম্পটা বন্ধ করে দিয়ে বিছানার এক কোণে শুয়ে পড়ল।
পুরো ঘর গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। তার মাঝে রিত্তিকা এখনো অন্ধকার ঘরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। মনে মনে সে জিয়ানকে ইচ্ছেমতো গালমন্দ করতে লাগল,
”শা’লা কী খচ্চর প্রফেসর! জীবনে কোনোদিন এত সকালে ঘুম থেকে উঠিনি, আর এখন আমাকে ৫টার দিকে ঘুম থেকে উঠতে হবে? ভালো লাগে না! তখন আব্বুর সাথে চলে গেলেই হতো। কিন্তু… আমার মনও তো সাই দেয়নি যেতে। এজন্যই তো আমি আর জোরজুরি করিনি। ধুর, ভালো লাগে না!”
মনে রাগ দুঃখ সব ফুসতে ফুসতে শেষমেশ সেও বিছানার অন্য প্রান্তে ঘুমাতে চলে গেল।
— চারিদিকে তখন ফজরের আজানের সুমধুর আওয়াজ ভেসে আসছে। আজানের সেই পবিত্র প্রতিধ্বনি শুনে জিয়ানের ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। কিন্তু অপর প্রান্তে রিত্তিকা তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন, যেন পুরো পৃথিবীর ক্লান্তি তার চোখে ভর করেছে।
তা দেখে জিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটে উঠল। সে গ্লাস পানি নিয়ে এলো। তারপর কোনো রকম দ্বিধা না করে পুরো গ্লাসের পানিটুকু রিত্তিকার ঘুমন্ত মুখের ওপর ঢেলে দিল!
”উফ্! মাগো! কী হয়েছে! কী হয়েছে!”
ঠাণ্ডা পানির ছোঁয়া পেয়ে রিত্তিকা একদম ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। সে চোখ মুছতে মুছতে চেঁচিয়ে উঠল,
_”কী হলো! মুখে পানি দিলেন কেন আপনি?”
জিয়ান শান্ত গলায় বলল, “কটা বাজে খেয়াল আছে? এখনো ঘুম থেকে ওঠোনি কেন?”
রিত্তিকা বিরক্তিতে মুখ ফুলিয়ে বলল, “আমি কী জানি কটা বাজে! এক মিনিট… কেবল তো বাইরে আজানের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তার মানে এখনো ভোর!”
_”হ্যাঁ, এখনো ভোর।” জিয়ান তার কথায় সায় দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “বেশি কথা না বলে জলদি ফ্রেশ হয়ে ওজু করে নাও। নামাজ পড়তে হবে।”
রিত্তিকা তখনো বিছানার মায়া ত্যাগ করতে পারছে না। সে দুই হাত জোড় করে আদুরে গলায় বলল,
_”আরেকটু ঘুমাই না, স্যার? প্লিজ…”
_”না, আর এক মিনিটও ঘুমানো লাগবে না। যাও, তাড়াতাড়ি ওজু করে এসো। নামাজ শেষ করেই পড়তে বসবে।” জিয়ানের কণ্ঠে আর কোনো আপসের সুযোগ নেই।
রিত্তিকা মনে মনে গজগজ করতে করতে বিছানা থেকে নামল। ওজু করতে যাওয়ার সময়ও জিয়ানের দিকে একবার পিছন ফিরে তাকাল, কিন্তু জিয়ানের কড়া চাউনি দেখে আর কিছু বলার সাহস পেল না।
বাধ্য মেয়ের মতো রিত্তিকা হাত-মুখ ধুয়ে, ওজু করে এসে ফজরের নামাজটা আদায় করে নিল। নামাজ শেষে জায়নামাজ গুটিয়ে সে সোজা পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। জিয়ান তখন রুমে নেই, কোনো কাজে নিচে গিয়েছে। চারপাশটা এখনো বেশ শান্ত। রিত্তিকা বই খুলে নিয়ে পড়া শুরু করল। ভোরের ঠাণ্ডা বাতাসে পড়াটা মাথায় ঢুকছিল দ্রুত।
কিছুক্ষণ পর, জিয়ান ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম কফি। কফির সুবাস মুহূর্তেই পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
জিয়ান এসে রিত্তিকার ঠিক সামনের চেয়ারটায় বসল। কফির সুবাস পেয়ে রিত্তিকা বই থেকে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। জিয়ান বেশ আরাম করে কফিতে একটা চুমুক দিল।
তা দেখে রিত্তিকার ভেতরের রাগ আর অভিমান যেন আবার চাড়া দিয়ে উঠল। সে মনে মনে জিয়ানকে গালমন্দ করতে করতে বলতে লাগল,
_”কী খচ্চর রে বাবা! একা একা কফি খাচ্ছে, আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করছে না! ভোরবেলা ধরে-বেঁধে ঘুম থেকে তুলল, চোখের ঘুম এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এই সময়ে আমাকেও তো এক কাপ কফি বানিয়ে দিতে পারত! মানুষ এত স্বার্থপর হয় কীভাবে?”
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২০
রিত্তিকা জিয়ানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল, আর মনে মনে তার ওপর ক্ষোভের পাহাড় জমাতে লাগল। কিন্তু মুখে কিচ্ছু বলল না, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখল।
একে তো চোখে সমস্যা হচ্ছে লেখতে গিয়ে তার ওপর আবার কারেন্ট নেই কাল থেকে মাত্র আসলো আর পোস্ট দিলাম।
তোমরা যারা যারা পড়ো প্লিজ সবাই রেসপন্স করো।
