Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৩

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৩

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৩
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

নিহারিকার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করে রাতের ডিনারটা শেষ করলো রিত্তিকা। ঘরে পা রাখতেই তার মনে পড়ে গেল জিয়ানের কড়া আদেশের কথা। জিয়ান তাকে আগেই একদম পরিষ্কার ভাষায় বলে রেখেছে— ঘরে এসে সে যেন রিত্তিকাকে পড়ার টেবিলেই দেখতে পায়। বেচারি রিত্তিকা! আর কী-ই বা করার আছে? নিজের ‘প্রফেসর হাজব্যান্ড’-এর হুকুম বলে কথা! অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বই-খাতা মেলে পড়তে বসলো সে।
​রাত তখন প্রায় ১১টা। চারদিকটা বেশ নিঝুম। এমন সময় জিয়ান ধীর পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকলো। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই সে দেখলো, রিত্তিকা আসলেই মন দিয়ে পড়ছে।
আজ বাইরে বেশ হাওয়া। জানালার পর্দা ভেদ করে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস ঘরে আছড়ে পড়ছে। আর সেই বাতাসে রিত্তিকার রেশমি চুলগুলো বড্ড অবাধ্য হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।
​রিত্তিকা চুলগুলো যতবারই হাত দিয়ে পেছনে সরিয়ে দিচ্ছে, বাতাস যেন ততবারই চুলগুলো তার মুখের ওপর আছড়ে ফেলছে। বারবার চোখে-মুখে চুল এসে পড়ায় তার পড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। জিয়ান দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সব টা দেখছিল।

_​”উফ! চুলগুলো তো বড্ড বেয়াদব! যত সরাচ্ছি, ততই মুখের ওপর এসে পড়ছে!”— শেষমেশ প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে বললো।
_​”তো চুলগুলো বেঁধে পড়তে বসতে পারছো না?”
​হুট করে পেছন থেকে গম্ভীর অথচ চেনা কন্ঠস্বর পেয়ে রিত্তিকা চমকে উঠলো। ভয়ে তার বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠেছিল। ঝট করে পেছনে তাকিয়ে দেখলো, অন্য কেউ নয়— জিয়ান হাত গুটিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
​রিত্তিকা বুকে হাত দিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মুখটা কালো করে বললো,
_”নাহ্, পারি না! আর আপনি এমন ভূতের মতো হুট করে এসে কথা বলেন কেন বলুন তো? ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তো!”
​জিয়ানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো,
_ “তুমি আবার ভয়ও পাও? বিশ্বাস হলো না।”
_​”কেন? আমি মানুষ না? আমি ভয় পেতে পারি না? আজাইরা কথা!” রিত্তিকা মুখ ফুলিয়ে আবার বইয়ের দিকে তাকালো।

_​”চুলগুলো বেঁধে পড়তে বসো,” জিয়ান আবার আদেশ দিল।
_​”বললাম তো পারি না!” রিত্তিকার গলায় স্পষ্ট জেদ।
​”কীহ্! চুল বাঁধতে পারো না?” জিয়ান সত্যি এবার একটু অবাক হলো।
_​”নাহ্! এতে এত অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই।”
_​”তোমার চুল তো অনেক বড়। এভাবেই রাখো বুঝি সবসময়?”
​রিত্তিকার চোখের কোণটা মুহূর্তের জন্য একটু নরম হয়ে এলো। সে একটু নিচু স্বরে বললো,
_”নাহ্… বিয়ের আগে প্রতিদিন মা বেঁধে দিতো। কিন্তু এখন তো আর মা এখানে নেই যে বেঁধে দেবে…”
​জিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রিত্তিকার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর পরিবেশটা হালকা করতে একটু খোঁচা মেরে বললো,

_”এত বড় হয়েছো, অথচ চুলগুলো বাঁধতে পারো না? শুধুই বড়ই হয়েছো, কাজের কাজ কোনোটা পারো না।”
_​”খামোখাই খোঁচা দেবেন না বলে দিচ্ছি! পারি না তো কী হয়েছে?”
_​”ঠিক আছে, তাহলে পড়ো মন দিয়ে।”
​জিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে রিত্তিকার সামনে থেকে চলে গেল। রিত্তিকা ফের পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু অবাধ্য চুলগুলো যেন আজ পণ করেছে তাকে পড়তেই দেবে না। বাতাস আর চুলের এই মেলবন্ধন দেখে জিয়ান নিজের মোবাইলটা হাতে নিল। ইউটিউবে গিয়ে চটপট ‘চুল বেণি করার সহজ টিউটোরিয়াল’ বের করে ফেললো। কিছুক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে, টিউটোরিয়ালটা দেখলো সে।
​ভিডিও দেখা শেষ করে মোবাইলটা পকেটে পুরে জিয়ান আবার রিত্তিকার সামনে এসে দাঁড়ালো।
_​”ওঠো এখান থেকে।”
​রিত্তিকা অবাক হয়ে চোখের চশমাটা একটু নামিয়ে বললো,

_”মানে?”
_​”মানে কিছু না। উঠে গিয়ে একটা চিরুনি আর একটা হেয়ার ব্যান্ড নিয়ে এসো।”
_​”কী করবেন আপনি এগুলো দিয়ে?” রিত্তিকা কৌতুহলী চোখে তাকালো।
_​”বেশি কথা না বলে যা বলছি নিয়ে এসো।” জিয়ানের গলায় প্রফেসরসুলভ গাম্ভীর্য।
​জিয়ানের ধমক খেয়ে রিত্তিকা আর কথা বাড়ালো না। ড্রয়ার থেকে চিরুনি আর একটা কালো হেয়ার ব্যান্ড এনে তার হাতে দিল।
_​”বিছানার ওপর বোসো।” জিয়ান নির্দেশ দিল।
_​”কিন্তু কেন?”
_​”আবার বেশি কথা বলছো? যা বলবো তাই করবে।”
​রিত্তিকা ঠোঁট উল্টে বিছানায় গিয়ে জিয়ানের দিকে পিঠ দিয়ে বসলো। জিয়ান অত্যন্ত সাবধানে, আলতো হাতে রিত্তিকার চুলে চিরুনি চালাতে লাগলো। রিত্তিকা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। জিয়ানের মতো একজন গম্ভীর মানুষ তার চুল বেঁধে দিচ্ছে— এটা ভাবতেই তার কেমন যেন একটা অদ্ভুত, মিষ্টি অনুভূতি হচ্ছিল।
​চুলগুলো তিন ভাগে ভাগ করে বেণি করতে করতে জিয়ান ফিসফিসিয়ে বললো,
_”ইডিয়ট একটা! সামান্য চুলটুকুও বেণি করতে পারো না। অথচ আমার মাথাটা তো ঠিকই চিবিয়ে খেতে পারো।”
​রিত্তিকা এই কথার কোনো উত্তর দিল না, শুধু মনে মনে হাসলো। কিছুক্ষণ বাদে জিয়ান খুব যত্ন নিয়ে একটা বেণি গেঁথে দিল। প্রফেশনালদের মতো খুব একটা নিখুঁত বা সুন্দর না হলেও, জিয়ানের প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে বেণিটা বেশ ভালোই হয়েছে।
​আয়নায় নিজের চুলটা দেখে রিত্তিকা মুচকি হেসে পেছনের দিকে তাকালো,

_”বাহ্! প্রফেসর জিয়ান কায়সার তো দেখছি বেশ ভালোই বেণি করতে পারেন!”
​জিয়ান মুখটা শক্ত করে বললো,
_”শাট আপ, স্টুপিড! যাও, ঘুমাতে যাও। আজ আর পড়া লাগবে না।”
​রিত্তিকা জিয়ানের কথা শুনে ভেংচি কেটে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো।
​এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল একটা পুরো সপ্তাহ। তাদের দিনগুলো হাসি-খুশি আর মিষ্টি খুনসুটিতেই কাটছিল। তবে পড়াশোনার ব্যাপারে জিয়ান রিত্তিকাকে এক চুলও ছাড় দেয়নি। প্রতিদিন তাকে নিয়ম করে ভার্সিটি যেতে হয়েছে। ক্লাসে অন্য স্যারের সামনে দুষ্টুমি করলেও জিয়ানের ক্লাসে বা জিয়ানের ভয়ে পুরো ভার্সিটিতে কোনো রকম বাঁদরামি করার সাহস রিত্তিকা পায়নি।

​আজ রিত্তিকা একটু অসুস্থ বোধ করায় ভার্সিটি আসেনি। জিয়া একাই এসেছে। ভার্সিটির সব ক্লাস আর কাজ শেষ করে সে একাই গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে ছিল।
​হঠাৎই একটা কালো রঙের গাড়ি এসে জিয়ার ঠিক পাশে থামলো। জানালার কাঁচটা নামতেই ভেতর থেকে একজন বলে উঠলো,
_”কেমন আছো জিয়া?”
​অচেনা অথচ একটু চেনা চেনা কণ্ঠস্বর পেয়ে জিয়া গাড়ির দিকে চোখ তুলে তাকালো। ভালো করে লক্ষ্য করতেই সে চিনতে পারলো— লোকটা আর কেউ নয়, রিত্তিকার বড় ভাই ইফাত।
​জিয়া বিনীতভাবে হাসে বললো,
_”আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
_​”আলহামদুলিল্লাহ। কোথায় যাচ্ছো এখন?” ইফাত জিজ্ঞেস করলো।
_​”বাসায় যাচ্ছিলাম। আপনি এদিকে যে?”
​”একটা মিটিংয়ে এসেছিলাম। এই দিক দিয়েই ফিরছিলাম, তখন তোমাকে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে দেখে গাড়িটা থামালাম।” ইফাত স্মিত হেসে বললো।
_​”ওহ, আচ্ছা।”
_​”গাড়িতে ওঠো, বাড়ি পৌঁছে দিই তোমায়।” ইফাত গাড়ির দরজা খোলার ইঙ্গিত করলো।
​জিয়া একটু ইতস্তত করে বললো,

_ “না না, দরকার নেই। আমি একাই যেতে পারবো।”
_​”কেন? আমি পৌঁছে দিলে কী সমস্যা হবে?” ইফাত একটু ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
_​”নাহ্, তেমন কিছুই না। আমি নিজেই যেতে পারবো, আপনাকে অযথা কষ্ট করতে হবে না।”
_​”আরে, এতে কষ্টের কী আছে? ওঠো।”
​জিয়া তাও নম্রভাবে এড়িয়ে গিয়ে বললো,
_”না, আপনি চলে যান। আমার আসলে একটু দরকারি কাজ আছে, সেটা সেরে তারপর বাড়ি ফিরবো।”
​ইফাত জিয়ানের চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করলো, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
_ “আচ্ছা, ঠিক আছে। সাবধানে যেও।”
জিয়া চলে গেলো।ইফাত শান্ত চোখে সেই চলে যাওয়া গাড়ির পানে তাকিয়ে রইলো। আসলে ইফাতের আজ কোনো মিটিং ছিল না। সে মূলত জিয়ার সাথে একটু দেখা করতেই, ইচ্ছা করেই এই রুটে গাড়ি নিয়ে এসেছিল।
জিয়ার অবয়বটা দূর হতেই ইফাত মনে মনে ভাবলো,
‘অবুঝ পাখি একটা!’
তারপর সে নিজের গন্তব্যে চলে গেল।

​অন্যদিকে, বিকেলে রিত্তিকা ড্রয়িংরুমে বসে তার শাশুড়ি রিহানা কায়সারের সাথে খোশগল্পে মেতে উঠেছে।
_​”আচ্ছা আম্মা, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?” রিত্তিকা শাশুড়ির হাতটা চেপে ধরে বললো।
​রিহানা কায়সার ভালোবেসে রিত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
_ “হ্যাঁ, করো না মা। কী বলবে?”
_​”বলছি… আপনার ছেলে কি আগে থেকেই এত গম্ভীর?
মানে ছোটবেলা থেকেই কি এমন? কেমন জানি সবসময় মুখটা ফুলিয়ে রাখে!” রিত্তিকা মুখটা একটু ভেঙচে জিয়ানের নকল করে দেখালো।
​রিত্তিকার এই কথা শুনে রিহানা কায়সার আর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি হাহা করে হেসে উঠে বললেন,
_ “হ্যাঁ রে মা! আমার ছেলেটা ছোট থেকেই এমনই। হাসি ওর মুখে খুব কমই দেখা যায়। সারাক্ষণ বই-খাতা আর পড়াশোনা নিয়েই থাকতো।”
_​”ওহ! একটু হাসলে কি ওনার জাত চলে যাবে নাকি? আমি তো বুঝি না!” রিত্তিকা চোখ কপালে তুললো।
_​”হয়তো তাই রে মা! ও মনে হয় ভাবে হাসলে ওর প্রফেসরি ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাবে,” রিহানা কায়সার ফোড়ন কাটলেন।
​শাশুড়ি আর পূত্রবধূর এই রসালো আলাপন চলাকালীন দুইজনেই একসাথে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। ঠিক তখনই মেইন গেট দিয়ে চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে ঘরে ঢুকলো জিয়া। ড্রয়িংরুমে হাসির রোল শুনে সে একটু থমকে দাঁড়ালো।

_​”কী নিয়ে তোমরা এত হাসাহাসি করছো শুনি? আমাকে বাদ দিয়ে?” জিয়া বললো।
​রিহানা কায়সার মুখে আঁচল চেপে হাসি থামিয়ে বললেন,
_”কিছু না রে , এমনিই।”
​জিয়া সোফায় ব্যাগটা রেখে মায়ের দিকে তাকিয়ে অভিমানের সুরে বললো,
_ “ওহ! আমি এলাম আর অমনি ‘কিছু না’? বাহ্! ঘরে নতুন বউমা আসতেই দেখছি মেয়ে পর হয়ে গেল!”
​ঠিক তখনই রিত্তিকা সোফার কুশনটা কোলে চেপে ধরে টিপ্পনি কেটে বললো,
_”আরে না রে ভাই! তোর খচ্চর প্রফেসর ভাইটাকে নিয়েই কথা বলছিলাম!”

​জিয়া বললো, “এই! আমার ভাই কিন্তু মোটেই খচ্চর না!”
​রিত্তিকা জিয়ার দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে বললো,
_”হুহ্!
​জিয়া রিত্তিকার এই চটপটে রূপ দেখে মনে মনে হাসলেও মুখে গম্ভীর ভাব ধরে রাখলো। রিহানা কায়সার হাসতে হাসতে সোফা থেকে উঠলেন,
_ “আচ্ছা, থাম তোরা। তোদের ঝগড়া আর থামবে না। জিয়া তুই হাত-মুখ ধুয়ে আয়, আমি তোকে খেতে দিচ্ছি।”
_​”আচ্ছা মা, আসছি।” জিয়া জবাব দিল।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২২

​রিহানা কায়সার রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। ড্রয়িংরুমের সোফায় এখন শুধু জিয়া আর রিত্তিকা। জিয়া রিত্তিকার পাশে এসে বসলো, । দুজনে মিলে সারাদিনের খুঁটিনাটি নিয়ে হালকা গল্প করতে লাগলো। জিয়া রিত্তিকাকে তার আজকের ক্লাসের কিছু মজার কথা শোনালো, যা শুনে রিত্তিকা খিলখিল করে হেসে উঠলো।
​কিছুক্ষণ গল্প করার পর জিয়া ফ্রেশ হওয়ার জন্য নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আর রিত্তিকা সোফা থেকে উঠে শাশুড়ি মাকে সাহায্য করার জন্য রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here