প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৪
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না
সোফা থেকে উঠে রিত্তিকা শাশুড়ি মাকে সাহায্য করার জন্য রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো।
রান্নাঘরে ঢুকে সে মিষ্টি হেসে বলল,
_ “আম্মা, আজ আমি আপনাকে রান্নায় সাহায্য করি?”
রিহানা কায়সার পরম স্নেহে ছেলের বউয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
_”না মা, তোকে কিছু করতে হবে না। তুই গিয়ে বিশ্রাম নে।”
রিত্তিকা একটু আদুরে গলায় অভিমান করে বলল,
_”কেনো আম্মা? আমি করলে কী এমন হবে? বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত একদিনও আপনারা আমাকে কোনো কাজ করতে দেননি। আমি কি আপনাদের পর ?”
রিহানা কায়সার রিত্তিকার গাল দুটো ছুঁয়ে বললেন,
_”পাগলী মেয়ে, তুই আমাদের পর হতে যাবি কেন? তুই তো আমাদের ঘরের মেয়ে। আর আমরা থাকতে তোর কেন কাজ করা লাগবে বল তো?”
_”নাহ, আজ আমি আপনার কোনো কথাই শুনবো না!” রিত্তিকা বেশ জোর দিয়েই বলল, “আপনি বরং আমাকে রান্নার কোনো একটা কাজ বুঝিয়ে দিন।”
_”নাহ মা, তোর অভ্যাস নেই, হাত-টাত পুড়ে যেতে পারে। তুই যদি এতই করতে চাস, তবে সবজিগুলো ধুয়ে দে বরং।”
_”উঁহু, আজ আমিই রান্না করবো। দিন, আমি মাছগুলো ভেজে দিচ্ছি।”
শাশুড়ি মা মৃদু হেসে বললেন, _
“তুই পারবি না সোনা।”
রিত্তিকা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
_ “দেখুন না পারি কিনা! চেষ্টা করতে সমস্যা কোথায়?”
বউমার এমন আবদার দেখে রিহানা কায়সার আর না করতে পারলেন না। বললেন,
_ “আচ্ছা বাবা আচ্ছা, দেখ ওই খানে মাছগুলো ধুয়ে রাখা আছে।”
_”আচ্ছা আম্মা!” রিত্তিকা বেশ উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে গেল।
কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল তখনই। রিত্তিকা কড়াইয়ের গরম
তেলের ওপর মাছগুলো ছাড়তেই, টগবগ করে ফোটা তেল ছিটকে এসে সরাসরি তার নরম হাতের ওপর পড়লো।
_”আহ্!” তীব্র ব্যথায় রিত্তিকা আর্তনাদ করে উঠলো। চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল তার।
ঠিক তখনই জিয়ান অফিস থেকে বাড়ি ফিরে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ রান্নাঘর থেকে কারোর চিৎকার শুনে তার পা দুটো থমকে গেল। সে ধীর পায়ে কিন্তু দ্রুত রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
ভিতরে ঢুকে সে দেখলো রিত্তিকা হাতটা চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর রিহানা কায়সার তাড়াহুড়ো করে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি নিয়ে আসছেন। জিয়ান দ্রুত এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_ “কী হয়েছে মা? রিত্তিকার কী হয়েছে?”
রিহানা কায়সার ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললেন,
_”দেখ না বাবা, মেয়েটা মাছ ভাজতে গিয়েছিল। তখন তেল ছিটকে ওর হাতে পড়েছে। কত করে নিষেধ করলাম, তাও শুনলো না। এখন এই অবস্থা হলো!”
কান্নারত রিত্তিকার দিকে জিয়ান এগিয়ে গেল। তার চোখ-মুখ উদ্বেগে শক্ত হয়ে উঠেছে। সে রিত্তিকার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কিন্তু চিন্তিত গলায় বলল,
_”দেখি, হাতটা দেখাও।”
রিত্তিকা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বাধ্য মেয়ের মতো চোখের জল মুছতে মুছতে নিজের হাতটা জিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল।
হাতের লালচে ক্ষতটা দেখে জিয়ানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে সে একটু রাগত স্বরে একনাগাড়ে বলে গেল,
_”কতখানি পুড়িয়ে ফেলেছ দেখেছ? হ্যাঁ, কে বলেছিল তোমাকে এত ওস্তাদি করে রান্না করতে আসতে? মা নিষেধ করেছে, তারপরেও এসেছ! যা পারো না, তা করার কী দরকার ছিল শুনি?”
জিয়ানের এই বকুনিতে রিত্তিকা আর কিছুই বলল না, কেবল নীরবে চোখের জল ফেলতে লাগল। ততক্ষণে রিহানা কায়সার একটি বার্ন মলম নিয়ে আসলেন। জিয়ান সাবধানে মলমটি হাতে নিয়ে রিত্তিকার পোড়া জায়গায় খুব আলতো করে লাগিয়ে দিতে লাগল।
ঠান্ডা মলমের ছোঁয়া পেতেই রিত্তিকা আবার ফিসফিসিয়ে কেঁদে উঠল,
_”আহ্! … খুব জ্বলছে।”
রিত্তিকার চোখের এই পানি যেন জিয়ানের সহ্য হচ্ছিল না। বুকের ভেতরে কেমন এক অজানা অস্থিরতা কাজ করছে তার। কেন এমনটা হচ্ছে, সে নিজেও জানে না। নিজের অজান্তেই তার কণ্ঠস্বর নরম হয়ে এল। সে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“খুব বেশি জ্বলছে, হার্ট? দেখ, ঔষধ লাগিয়ে দিয়েছি, এখুনি ঠিক হয়ে যাবে। কান্না করিস না হার্ট তোর কান্না দেখলে কেন জানি বুকের ভেতরটা খুব কষ্ট হচ্ছে ।”
জিয়ানের মুখ থেকে এই ‘হার্ট’ সম্বোধন আর এমন আকুল কথা শুনে রিত্তিকা বিস্ময়ে তার চোখের দিকে তাকালো। জিয়ানের চোখে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা। রিত্তিকার কান্নার বেগ কিছুটা কমে এলো, এক দৃষ্টিতে সে জিয়ানের দিকে চেয়ে রইল।
পরিস্থিতি দেখে রিহানা কায়সার মৃদু হেসে বললেন,
_”জিয়ান, তুই রিত্তিকাকে নিয়ে ঘরে যা। ও একটু রেস্ট নিক। রাতের খাবার আমি তোদের ঘরেই পাঠিয়ে দেবো নে।”
জিয়ান মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
_”ওকে আম্মু।”
জিয়ান রিত্তিকাকে ধরে ধরে নিজেদের ঘরে নিয়ে আসলো। বিছানার ওপর তাকে খুব সাবধানে বসিয়ে দিয়ে, সে কাউকে একটা ফোন করল। তারপর নিজের তোয়ালেটা নিয়ে বাথরুমে চলে গেল শাওয়ার নিতে।
আর রিত্তিকা বিছানার হেডবোর্ডের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজলো। হাতে তীব্র যন্ত্রণার পর শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছিল তার। তাই চোখ বন্ধ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর শাওয়ার নিয়ে বাথরুম থেকে বের হলো জিয়ান। এসে দেখলো রিত্তিকা তখনো ঘুমিয়ে আছে। সে খুব যত্ন সহকারে রিত্তিকার মাথাটা বালিশে দিয়ে তাকে বিছানায় ঠিকভাবে শুইয়ে দিল এবং গায়ে একটা পাতলা চাদর টেনে দিল।
ঠিক তখনই জিয়া একজন ডাক্তারকে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল।
ডাক্তারকে দেখেই জিয়ান একটু ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
_ “ডক্টর, আমি আপনাকে এক ঘণ্টা আগে ফোন করেছি আর আপনি এখন আসছেন?”
ডাক্তারবাবু কিছুটা আমতা আমতা করে বললেন,
_”আই অ্যাম সরি মিস্টার কায়সার। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম ছিল, আর তাছাড়া কয়েকজন পেশেন্ট দেখে আসতে গিয়ে একটু দেরি হয়ে গেল।”
জিয়ান রেগে গিয়ে বলল,
_”তো আমি কি আপনার সাথে গল্প করার জন্য আপনাকে ডেকেছি? যদি ওর হাতের কোনো ক্ষতি হতো, তাহলে আপনাকে আমি দেখে নিতাম!”
জিয়া জিয়ানের কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করল। ডাক্তারবাবু লজ্জিত হয়ে বললেন, _
“সরি। এক্সাক্টলি বলুন কী হয়েছে পেশেন্টের?”
জিয়ান শান্ত হয়ে বলল, “হাতে গরম তেল ছিটকে পড়েছে।”
ডাক্তার রিত্তিকার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে সাবধানে হাতটা পরীক্ষা করলেন এবং কিছু ঔষধ লিখে দিলেন। তারপর আশ্বস্ত করে বললেন,
_ “টেনশন করবেন না। ২ বা ৩ দিনের মধ্যেই ক্ষতটা একদম ঠিক হয়ে যাবে। মলমটা নিয়মমতো লাগাবেন।”
জিয়ান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
_”ওকে। জিয়া, ওনাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আয়।”
জিয়া বলল, “আচ্ছা ভাইয়া।”
ওরা ঘর থেকে চলে যেতেই জিয়ান দরজাটা লক করে দিয়ে আবার রিত্তিকার বিছানার পাশে আসলো। খাটের একপাশে বসে সে রিত্তিকার শান্ত, নিষ্পাপ মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ঘুমের ঘোরে রিত্তিকার মুখটা কত মায়াবী লাগছে!
হঠাৎ করেই জিয়ানের ভেতরের সমস্ত আবেগ বাঁধ ভাঙল। সে ঝুঁকে এসে রিত্তিকার ললাটে এক গভীর, দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, অত্যন্ত পবিত্র আর ভালোবাসায় জড়ানো সেই স্পর্শ।
চুম্বন শেষে হঠাৎ নিজের হুঁশে ফিরে জিয়ান কিছুটা দূরে সরে গেল। মনে মনে ভাবল,
_”এটা কী করলাম আমি? এমনটা তো করার কথা ছিল না আমার!”
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে নিজেই বিড়বিড় করে বলল,
_”তাতে কী? ও তো আমারই বউ, অন্য কারোর না। ওকে ছোঁয়ার সম্পূর্ণ অধিকার আমার আছে।”
তারপর রিত্তিকার পাশ থেকে উঠে সে নিচে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে রিহানা কায়সারকে বলল,
_”আম্মু, রাতের খাবার ঘরে পাঠানো লাগবে না।”
রিহানা কায়সার বললেন, “কেন বাবা? খাবি না তোরা?”
আম্মু, রিত্তিকা গভীর ঘুমে আছে, আর আমারও এখন একদম খিদে নেই।”
“সামান্য কিছু অন্তত খেয়ে নে বাবা।”
“না আম্মু, আজ থাক।”
কথাগুলো বলেই জিয়ান ফের নিজের ঘরে চলে আসলো। ঘরের লাইটটা অফ করে দিয়ে সে রিত্তিকার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। রিত্তিকার দিকে মুখ করে, তার শান্ত মুখের অবয়ব দেখতে দেখতে কখন যে জিয়ানের চোখ জোড়াও ঘুমে বুজে এলো, সে নিজেও জানল না।
পরদিন সকালে রিত্তিকার যখন ঘুম ভাঙলো, সে চোখ কচলে পাশে তাকিয়ে দেখল জিয়ান নেই। তার মানে নিশ্চয়ই সে অনেক আগেই উঠে গেছে। কিন্তু মনে মনে রিত্তিকা একটু অবাক হলো—অন্যদিন তো জিয়ান তাকে ঠিকই ডেকে তোলে, সে উঠতে না চাইলেও জোর করে জাগায়। আজ কেন ডাকল না?
টেবিলের ওপর থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাতেই রিত্তিকার চোখ ছানাবড়া!
_”ওহ শীট! কত বেলা হয়ে গেলো! আজ ভার্সিটিতে একটা ইম্পর্টেন্ট ক্লাস আছে আর আমি এখানে পরে পরে ঘুমাচ্ছি!”
সে তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুমে ছুটল। দ্রুত তৈরি হয়ে সে নিচে নেমে এলো।
তাকে সিঁড়ি দিয়ে ওভাবে তাড়াহুড়ো করে নামতে দেখে ড্রয়িংরুমে বসা চাচি রেনিয়া কায়সার বলে উঠলেন,
_”আস্তে নামো রিত্তিকা, পড়ে যাবে তো পা পিছলে!”
রিত্তিকা সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
_”আস্তে নামলে হবে না চাচি, অনেক দেরি হয়ে গেছে। জিয়া! তুই কি আজ ভার্সিটি যাবি?”
জিয়া সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
_”হ্যাঁ , যাবো।”
_”তাহলে জলদি চল, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
রান্নাঘর থেকে রিহানা কায়সার বের হয়ে এসে বললেন,
_”কিছু খেয়ে যা রিত্তিকা। খালি পেটে বের হোস না।”
রিত্তিকা ব্যাগটা কাঁধে নিতে নিতে বলল,
_”না আম্মা, একদম সময় নেই, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এখন খেতে গেলে ক্লাসটা মিস হয়ে যাবে।”
_”আচ্ছা, তাহলে ভার্সিটি যাওয়ার পথে বাইরে থেকে ভালো কিছু কিনে খেয়ে নিস কিন্তু।”
“_আচ্ছা আম্মা, আসি।”
ভার্সিটির সব ক্লাস শেষ করে রিত্তিকা, জিয়া, আনিকা আর নিহারিকা একসাথে ক্যাম্পাসের মাঠের সেই বিশাল বড় বকুল গাছটার নিচে এসে বসল। হালকা বাতাস আর বকুল ফুলের মিষ্টি সুবাসে চারপাশটা বেশ ছায়াময় হয়ে আছে।
বসার পর থেকেই নিহারিকার নজর বারবার রিত্তিকার হাতের লালচে দাগটার দিকে যাচ্ছিল। সে আর থাকতে না পেরে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
_”কিরে রিত্তি, তোর হাত ওভাবে পুড়লো কী করে? কিন্তু দাগটা তো বেশ বড় রে!”
রিত্তিকা একটু হেসে বলল,
_”আর বলিস না, কালকে রান্নাঘরে ওস্তাদি করে মাছ ভাজতে গিয়েছিলাম। তখন তেল ছিটকে এসে পড়েছে।”
আনিকা রিত্তিকার কপালে মৃদু টোকা দিয়ে বলে উঠল,
_ “দেখে কাজ করতে পারিস না তুই? উঁহু, আমার তো মনে হচ্ছে অন্য কেস! রান্নায় মন ছিল, নাকি রান্নার উসিলায় দুলাভাইয়ের মন জয় করার ধান্দা ছিল, শুনি?”
রিত্তিকা একটু হেসে রসিকতা করে বলল,
প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৩
_”আরে ধুর, দেখেই তো করছিলাম। কিন্তু মনে হয় তেলটারই আমার নরম হাতে পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল, তাই নিজে থেকেই উড়ে এসে জুড়ে বসল! আর দুলাভাইয়ের মন জয়ের কথা বলছিস? সে তো কাল উল্টো আমাকে ধরে এমন একনাগাড়ে বকা দিল, বাপরে বাপ!
কিছুক্ষণ এরকম আরও অনেক হাসি-মজা আর খুনসুটি করার পর, রিত্তিকা আর জিয়া বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
