Home প্রিয় ইরাবতী প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৩৬

প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৩৬

প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৩৬
রাজিয়া রহমান

বাড়িতে নতুন বউ এসেছে সেই সাথে ইরা বুকে করে নিয়ে এসেছে পুরনো এক দগদগে ক্ষত।উপমা!
বুকের ভেতর কেমন গভীর একটা ক্ষতর মতো চেপে বসেছিলো এই মানুষটা।
অনেক দিন পর দেখা হলো।
অথচ ইরা কেনো তাকে ক্ষমা করতে পারে নি!
ইরার সাথে করা সব অন্যায়ের জন্য ক্ষমা করে দিলেও সাগরের প্রতি যেই অন্যায় করেছে, সন্তানকে যেভাবে সাগরের থেকে কেড়ে নিয়েছে তার জন্য বোধহয় কখনোই ইরা এই মানুষটাকে ক্ষমা করতে পারবে না।
ঝুমা আর সাগরের জন্য নিজের রুমটা ছেড়ে দিলো ইরা।তিন বেডে রুমের এই বাসাতে একটা রুমের সাথেই অ্যাটাচড ওয়াশরুম আছে।

সেটাতে এতো দিন ইরা আর ইশতিয়াক ছিলো।
এখন যেহেতু ভাই বিয়ে করেছে এবং ইরা এখানে স্থায়ীভাবে থাকবে না। আজ থেকে এই বাসার হেড অলিখিতভাবে ঝুমা হয়ে গেলো।
এই সংসার আজ থেকে ঝুমার।
ইরা ঝুমাকে এক জোড়া কানের দুল পরিয়ে দিলো। কানে পরাতেই ঝুমা বুঝতে পারলো দুলে সোনার পরিমাণ ভালো রকমের। তা না হলে এতো ভারী লাগতো না কানে।
ইরা ঝুমার হাত ধরে বললো, “আজকে তোমাদের নতুন সম্পর্ক শুরু হলো ভাবী,সেই সাথে নতুন জীবন। এই নতুন জীবনে পুরনো কোনো স্মৃতিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিও না।অতীতকে দুঃস্বপ্ন ভেবে ঘুম থেকে জেগে উঠো।নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ আল্লাহ দিয়েছেন।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আমার ভাই ভীষণ ভালো মনের মানুষ ভাবী।
আমি জানি, তুমি ও ভীষণ ভালো। আমি কূটনী ননদ শুধু। ব্যাপার না, ইচ্ছেমতো ঝগড়া কর‍তে পারো তুমি ইচ্ছে করলে।এই সংসার তোমার। আমাকে কিছুদিন থাকতে দেওয়ার আর্জি জানাই।”
ঝুমা ইরার হাত ধরে বললো, “কী যা তা বলছিস তুই!এসব বলে আমাকে কষ্ট দিস না।আমাকে তুমি করে বলছিস কেনো?তুই করে বল প্লিজ।আমার অস্বস্তি হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে।”
“আরে পাগল। কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই।বরং এটাই সত্যি।আজ থেকে তুই আমার ভাবী।এই সংসার তোর।এই সংসারের প্রতিটি কোণে তোর রাজত্ব। ভেতরে যতো দ্বিধা আর ভয় আছে সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবি।আমার ভাইকে নিয়ে ভালো থাকবি এটুকুই আমার চাওয়া ঝুমা।”
ঝুমার সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ইরা উঠে দাঁড়ায়। রাত অনেক হয়েছে। সাগরকে ভেতরে আসতে দেওয়া উচিত।

ড্রয়িং রুমে একটা সোফায় বসে সাগর আনমনা হয়ে কিছু ভাবছিলো। ইরা বের হয়ে এসে সাগরকে বললো, “ভাইয়া,যাও রুমে যাও।ঝুমা একা আছে।”
“তুই ওকে তোর রুমে নিয়ে গেলি কেনো?ওটা তোর রুম।”
“আমার যা তা কী তোমার নয় ভাইয়া?না-কি আমি ও তোমার কেউ নই?”
ইরার দুই চোখ টলমল করে।
সাগর ইরার দিকে তাকায়। কেমন অভিভাবকের মতো লাগছে ইরাকে।তার ছোট বোন ইরা যেনো আজ বড় বোন হয়ে গেছে। কী ভীষণ ধীর, স্থির,পরিণত।
অশ্রুভেজা দুই চোখ দিয়ে মমতা যেনো ঠিকরে পড়ছে।

যেই মমতা মা’য়ের চোখে দেখার আকুলতা নিয়ে সাগরের বুক ভারী হয়ে উঠে, সেই মমতা আজ বোনের চোখে দেখে সাগরের মনে হলো, “জীবনে একটা বোন থাকা সবচেয়ে বড় ব্লেসিং। ছোট হোক বা বড়।বোনেরা কখনো সন্তানের মতো হয় আবার কখনো মায়ের মতো।”
সাগর ইরার চোখ মুছে দিয়ে বললো, “যা,শুতে যা।”
“তোমার আলমারিতে একটা বক্স রাখা আছে।”
সাগর কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে ইরার দিকে তাকায়।
ইরা শুতে চলে যায়।

সাগর রুমে আসতেই ঝুমা বিছানা থেকে নেমে সাগরকে সালাম করে। সালামের উত্তর দিয়ে সাগর বললো, “ঝুমা,এশার সালাত আদায় করেছেন?”
মাথা নাড়িয়ে ঝুমা না বলে।
“আসুন,আগে সালাত আদায় করে নিই।তারপর কথা হবে।”
ঝুমা সাগরের দিকে তাকায়। এক গাল দাড়ি,লম্বা চুল,শান্ত মুখচ্ছবির এই মানুষটার দিকে তাকাতেই ঝুমার অশান্ত মন শান্ত হয়ে উঠে।
দুজন এশার নামাজ পড়ে নেয়।সেই সাথে পড়ে শোকরানা নামাজ।
নামাজ শেষ করে ঝুমা বিছানায় উঠে বসে।সাগর আলমারি থেকে ইরার রেখে যাওয়া বক্সটা হাতে নিয়ে ঝুমার সামনে বসে।
ঝুমার হাতে বক্সটা তুলে দিয়ে বললো, “এটা খুলে দেখেন।”
“কি আছে?”

“আমি জানি না ঝুমা।আমার ছোট বোনটা সবকিছু অ্যারেঞ্জ করে রেখেছে কীভাবে যেনো।সে জানে তার ভাইয়ের শূন্য পকেটে দ্বিতীয় বারের মতো নতুন জীবন শুরু করছে। তাই ভাইকে কোনো লজ্জায় ফেলতে চায় নি।বাসর রাতে বউকে উপহার দেওয়ার প্রচলন আছে।এটা আপনার উপহার।”
ঝুমা বক্সটা খুললো।ভেতরে ঝলমলে হিরে তার দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

ঝুমার গলা শুকিয়ে যায়।এতো দামী গিফট! সাগর ঝুমার দিকে তাকিয়ে বললো, “রাগ হচ্ছে আপনার? আপনার স্বামীর এতো বড় সামর্থ্য হয় নি।বোনের দেওয়া উপহার আপনাকে দিচ্ছে বলে কষ্ট পাচ্ছেন?”
“না।মোটেও তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে, যেই মানুষটা আমার জন্য এতো ভেবেছে।আপনার জন্য ভেবেছে।আমার এলোমেলো হয়ে যাওয়া জীবনটাকে নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছে তার জন্য আমি কতটা করতে পারবো।আমার দ্বারা যাতে তার কখনো কোনো অসম্মান না হয়।আমি যাতে তার কষ্টের কারণ না হই।”
সাগরের ভীষণ ভালো লাগলো এরকম কথা শুনে।ঝুমার হাত ধরে বললো, “আপনার কাছে আমার আরো একটা অনুরোধ আছে ঝুমা।আমার মা একটু অন্য রকম একজন মানুষ। মা যেমনই হোক, সন্তান তাকে ফেলে দিতে পারে না। আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে যায় সেই আদেশ ব্যতীত মা’য়ের সব আদেশ মানতে বলে আমাদের ধর্ম।
আমি আপনাকে বলছি না আপনি গিয়ে আমার মা’য়ের পায়ে পড়ে থাকতে হবে। আমার দায়িত্ব আমার মা’য়ের খেদমত করা।আপনার না।আমি চাইবো আপনি তাকে একটু সম্মানের চোখে দেখুন।

মা যদিও আমাদের সাথে থাকবেন না। তবুও যদি কখনো থাকেন তখন।”
“আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন।আমার দ্বারা ওনারা কেউ কখনো অসম্মানিত হবেন না।”
সাগর পকেটে হাত দিয়ে একটা নাকফুল বের করে।ঝুমার নাকে থাকা আগের নাকফুলটা খুলে নিজের আনা নাকফুলটা পরিয়ে দিয়ে বললো, “আমার এটুকু সামর্থ্য ছিলো ঝুমা।আপনি কিছু মনে করবেন না প্লিজ।”
ঝুমার দুই চোখ ভিজে উঠে।
সাগরের হাতে হাত রেখে বললো, “আপনি আমার জীবনে কী তা কেবল আমি আর আমার আল্লাহ জানি।আমার অতীতের জন্য আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।যেহেতু আপনার হক্ক আমি নষ্ট করেছি,আপনার কাছে ও আমি ক্ষমা চাই।”

“আমার মনে এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র আফসোস নেই ঝুমা।আমার আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিক।আমার জন্য চক্ষু শীতলকারী,নেককার স্ত্রী হিসেবে আল্লাহ আপনাকে কবুল করে নিক।যেই বন্ধনে আজকে আবদ্ধ হয়েছি দুজন সেই বন্ধন যেনো জান্নাতুল ফেরদৌসে ও থাকে আমাদের। জান্নাতেও যেনো আপনার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়।”
সাগর ঝুমার হাতে আলতো করে চুমু খেলো।
ঝুমার নিজেকে ভীষণ হালকা লাগতে থাকে।সাগরের উষ্ণ আলিঙ্গনে ঝুমার বুকের ভেতর সুখপাখি ডানা ঝাপটায়।
রাহাত উপমাকে নিয়ে বাসায় এসেছে। রাহাতের মা রাবেয়া প্যারালাইজড মানুষ। বিছানাতেই সে বন্দী।
ভেতরে ঢুকতেই ছুটা বুয়া হাবুর মা এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বললো, “নয়া বউ নিয়ে আসছেন ভাইজান?তাড়াতাড়ি এদিকে আইতে কন।খালাম্মা হাগা মুতা কইরা রাখছে।গন্ধে টিকতে পারি না আমি।এগুলো সাফ করা লাগবো।”
উপমা এদিকওদিক তাকায়।পুরো বাড়িতে অযত্নের ছাপ ফুটে উঠেছে। দেয়ালে মাকড়সার ঝুল,জানালায় ধূলোময়লা। বেডশিট ময়লা হয়ে আছে।

এলোমেলো হয়ে আছে রাবেয়ার রুম।সবই আছে কিন্তু কিছুই তার জায়গা মতো নেই।
রাহাত হাবুর মা’কে বললো, “আপনার ভাবীকে আমার রুমে নিয়ে গিয়ে বসান।আমি সব পরিষ্কার করে আসছি।”
হাবুর মা উপমাকে বললো, “আসেন ভাবী।আপনি আইসা বসেন।আমার যাইতে হইবো। এমনিতেই আইজ অনেক সময় থাকা লাগছে এইখানে।বাড়িতে আমার পোলা মাইয়া বইসা আছে।”
উপমা শান্ত গলায় বললো, “আপনি যান আপা।আমার সমস্যা হবে না।”
হাবুর মা চলে গেলো। উপমা রাবেয়া বেগমের রুমে ঢুকলো।ভীষণ বাজে গন্ধে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার যোগাড়। শাড়ির আঁচল নাকে চাপতে যেতেই উপমা নিজেকে ধিক্কার জানায়।
রাহাত তো দাঁড়িয়ে আছে, কই ওর তো গন্ধ লাগে না।

সে কেনো ঘেন্না করবে?
কানে বাজলো চণ্ডীদাসের বলা,”সবার উপরে মানুষ সত্য,তাহার উপরে নাই।”
রাহাত কে উদ্দেশ্য করে উপমা বললো, “আপনি রুমে যান।আমি দেখছি আম্মাকে।”
রাহাত চমকে তাকালো উপমার দিকে।
একটা স্বাক্ষর দিয়েই এই মেয়েটা তার হয়ে গেছে। তার মা’কে আম্মা বলে ডাকছে।
কি চমৎকার একটা ব্যাপার!
রাহাত আমতাআমতা করে বললো, “অসুবিধা নেই।আমি নিজেই করেছি সবকিছু এতো দিন ধরে। আমি পারবো।তুমি সবে এসেছো আজ থাক।”

“আমার কোনো সমস্যা হবে না।আপনার সাথে জীবন জড়িয়েছে মানে আপনার যা আছে সব আমার। সুখ,দুঃখ,দায়িত্ব সবকিছু।আপনি যান।আম্মাকে আপনার চাইতে আমি সহজভাবে হ্যান্ডেল করতে পারবো।”
রাবেয়া কান্নাভেজা গলায় চিঁচিঁ করে বললো, “ও বউ,তুমি আইসাই আমার হাগামুতায় হাত দিও না।আমার পোলারে করতে দাও।তোমার কষ্ট হইবো।”
উপমার কান্না এলো।শারমিন কী কখনো ওকে এরকম মায়া করে কথা বলেছে?
পরক্ষণে উপমার মনে হলো, তার মনে কী কখনো শারমিন, ইরার জন্য বিন্দু পরিমাণ আন্তরিকতা ছিলো?
সে ইরার কতো সর্বনাশ করতে চেয়েছে!

লজ্জায়,অনুশোচনায় উপমার হাত পা জমে গেলো যেনো।
নিজেকে সামলে নিলো উপমা।অতীতের সেসব অনুশোচনাই তাকে কঠিন শিক্ষা দিয়েছে।
রাহাতের মা’য়ের এই অবস্থা জেনেই উপমা রাজি হয়েছে বিয়েতে।
রাহাত রুমে চলে এলো।উপমা শাশুড়ীর বিছানার ময়লা কাঁথাটা সরিয়ে রেক্সিনটা ডিসইনফেক্টেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করে আরেকটা নতুন কাঁথা বিছিয়ে দিলো।

প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৩৫

রাবেয়াকে ক্লিন করে পোশাক পালটে দিলো।
রাবেয়া উপমার হাত ধরে বললো, “আমার পোলারে নিয়ে অনেক সুখে থাইকো মা।”
উপমা রাবেয়ার হাত ধরে বললো, “শুধু আপনার ছেলে কেনো আপনাকে সাথে নিয়েই আমরা ভালো থাকবো আম্মা।”

প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৩৭