প্রিয় ইরাবতী শেষ পর্ব
রাজিয়া রহমান
ঢাকার রাতটা সেদিন অদ্ভুত রকম ভারী ছিল।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরটা আলোয় ভরা, তবু ইরার বুকের ভেতর কেমন অন্ধকার জমে ছিল।
এটাই ইরার জীবনের প্রথম বিদেশযাত্রা।
শুধু বিদেশ নয় জীবনের পরিচিত সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়া।হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রচুর আলো ছিল, মানুষ ছিল, শব্দ ছিল,কিন্তু ইরার কাছে সবকিছু যেন কাচের দেয়ালের ভেতর আটকে থাকা দৃশ্যের মতো লাগছিল। শব্দ আসে, কিন্তু স্পষ্ট না। আলো ঝলমল করে, কিন্তু উষ্ণতা দেয় না।
ইরা শক্ত করে নিজের হাতের ব্যাগটা ধরে ছিল। ব্যাগটার ভেতরে পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস।
বাংলাদেশে ইরার আজকে শেষ দিন।এরপর কী আর কখনো এই দেশে ফিরবে ইরা?
ইরা জানে এটাই শেষ বিদায় ইরার।এরপর যুগের পর যুগ কেটে যাবে এ দেশে ফেরা হবে না।কতো আঘাত, কতো ক্ষত বুকে নিয়ে যাচ্ছে ইরা তা কেবল ইরার আল্লাহ জানেন।
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ইরা শারমিনের কাছে বিদায় নিতে গিয়েছিলো।শারমিন শয্যাশায়ী। তবু গলার জোর কমে নি।বিছানায় পড়ে মেজাজ আরো বেশি তিরিক্ষি হয়েছে।
গত রাতেও শুনেছে রুমে থেকে ইরা সাগরকে চাপা গলায় বলছে বেশি ঝামেলা করলে যাতে তাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
শারমিন এই কথা শুনে একটু চুপ হয়েছে। সাগর আজকাল বোনের পরামর্শ মেনে চলে। কে জানে হয়তো রেখে ও আসবে।
যদিও শারমিন জানে না,ইরা কথাগুলো শারমিনকে শুনাতেই বলেছে।যাতে শারমিন একটু ভয় পায়।অযথা ঝামেলা, অশান্তি না করে।
ইরাকে দেখে শারমিনের একটুও মায়া লাগে নি।বরং কেনো জানি বিরক্তিকর লাগছিলো।ইরা অবশ্য শারমিনের সাথে খুব একটা কথা বলতে চেষ্টা করে নি।শারমিন যে তার উপর প্রসন্ন না তা ইরা জানে। তবুও যেই মা জন্ম দিয়েছে তাকে ইরা অগ্রাহ্য ও করতে পারে না।
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো শারমিনের বিছানার পাশে।দু’জনেই চুপচাপ।ইরার ইচ্ছে করছে শারমিনকে একবার একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
কিংবা শারমিন একবার তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিক।
বলা হয়ে উঠে নি তা আর শারমিনকে।
উঠে দাঁড়িয়ে ইরা বললো, “আমি চলে যাচ্ছি মা।নিজের খেয়াল রেখো।ভাইয়া,ভাবীর সাথে মিলেমিশে থেকো।মনে রেখো,আমি তোমার নিজের মেয়ে হয়ে ও তোমার কার্যক্রমের জন্য তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।ভাবী কিন্তু পরের মেয়ে।তুমি তাকে বুকে টেনে নিলে সে ও তোমাকে মাথায় তুলে রাখবে।দিন দিন কিন্তু তোমার বয়স বাড়ছে।শরীরের শক্তি কমছে।তাই নিজের ভালোর কথা ভেবে হলেও ভাবীর সাথে ভালো ব্যবহার করিও।”
শারমিন উত্তর করে না।জ্ঞান দিতে আসছে। যেনো শারমিনের জ্ঞান নেই।তবে এ কথাটা শারমিনের মনে ধরলো খুব করে।
তার নিজের ভালোর জন্য হলেও নিজের আচরণ সংযত করতে হবে।নয়তো এরা পরে সত্যি বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে দিবে।
শারমিনের রুম থেকে বের হয়ে ইরা অঝোরে কাঁদতে শুরু করে। অথচ কথা ছিলো কন্যার দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন মা তাকে বুকে জড়িয়ে রাখার।
কথা ছিলো মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দেওয়ার।
কিন্তু সেসব কিছুই ইরার ভাগ্যে জুটলো না।
ইরার ফোন বেজেই চলেছে। ইশতিয়াক প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় কল করে ইরাকে।
একটু পর ইরা বের হয়ে যাবে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।
ইরা কল রিসিভ করে কান্না চেপে কথা বলতে গেলো।
হাজার মাইল দূরে থেকেও ইশতিয়াকের মনে হলো ইরার বোধহয় বুক ভেঙে কান্না আসছে।
এই যন্ত্রণা ইশতিয়াকের চাইতে ভালো আর কে জানে?বাবাকে ছেড়েছিলো তখন তো তার ও একই অনুভূতি হয়েছিলো।ছোট্ট বুকটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো।
ইশতিয়াক নরম সুরে বললো, “ইরাবতী,আমি আছি তো।বুকের ভেতর যত ক্ষত জমিয়েছো সেসব আমি সারিয়ে দিবো।তোমাকে আমি এতো বেশি ভালোবাসি যে এই পৃথিবীর কারো বিন্দু পরিমাণ ভালোবাসার প্রয়োজন তোমার জীবনে হবে না।আর মাত্র কিছু সময়ের অপেক্ষা ইরা।”
ইরা জবাব দিতে পারলো না।
হঠাৎ করে মনে পড়তেই ইরা বললো, “আপনাকে না জানিয়ে আমি একটা কাজ করেছি।”
“কী কাজ?”
“আপনাকে না জানিয়ে আমি আসলে আপনাদের শেখ ভিলায় গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি আব্বা নেই।আপনি কী একবার ওনার
সাথে… “
“প্লিজ ইরাবতী, চেঞ্জ দিস টপিক।হাসিব শেখের জন্য এই পৃথিবীর সব রকম শাস্তি কম হয়ে যাবে।তার মানসিক যন্ত্রণাই হবে তার সবচেয়ে বড় শাস্তি। যে অন্যায়ের জন্য আমি আমার মা’কে ত্যাগ করেছি,সেই একই অন্যায় করা মানুষটাকে আমি কখনোই আপন করে নিবো না।আমার জীবনে ওনার কোনো ছায়া ইহকালে আর পড়বে না।আমি কষ্ট পেয়েছি ইরাবতী। ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। কেনো তুমি ওই বাড়িতে গেলে?আর কখনো এই কাজ করবে না।”
ইরা চুপ করে রইলো।ওই বাড়িতে এখন আর কেউ থাকে না।লিনা হাসপাতালে ভর্তি। হাসিব শেখ বৃদ্ধাশ্রমে। সব কিছু কেমন এলোমেলো, ছন্নছাড়া। কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েও তাদের জীবনে কেউই নেই।জীবনে সুখ মূলত কোথায়?
বাহিরে উবার চলে এসেছে।ইরা ভাবীর থেকে বিদায় নিয়ে বের হলো।
এয়ারপোর্টে এসেছে অনেকক্ষণ হয়েছে। ইরার দুই পা যেনো পাথরের মতো ভারী।
সাগর জিজ্ঞেস করলো,”কিছু বাদ পড়লো কি ভালো করে চেক করে নিয়েছিস?”
“হ্যাঁ ভাইয়া,সব নিয়েছি।”
“পাসপোর্টটা ব্যাগে রেখছিস তো?”
“হ্যাঁ ভাই…”
ইরার গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু চোখটা আর মানছিল না।
এই এয়ারপোর্ট পেরোলেই ওর জীবন বদলে যাবে এই ভাবনাটাই বুক চেপে ধরছিল।
সাগর হঠাৎ একটু চুপ করে গেল। তারপর ধীরে বলল,
“ভয় পাস না।ইশতিয়াক আছে।ইশতিয়াকের কাছে গেলে দেখবি জীবন কতো আনন্দময়।”
ইরা হাসলো।
“শুধু সেই একজন মানুষের জন্যই তো আমি আমার সব ছেড়ে চলে যাচ্ছি ভাইয়া।এই দুনিয়ায় সে আর কেউ নেই আমার ভাইয়া।”
লাউডস্পিকারে ঘোষণা এলো—
“Passengers for Doha, Qatar… please proceed to boarding gate.”
ইরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। “আমি তোমাদের ছাড়া থাকতে পারবো তো?”
সাগর এবার আর শক্ত থাকতে পারল না। গলা কেঁপে উঠল। “থাকতেই হবে। কারণ তোর স্বপ্নটার ওজন অনেক। আমরা সেটা কাঁধে তুলে নিতে পারবো না।ওখানে তোর সবকিছু আছে।তোর স্বামী, সংসার। তোর পড়ালেখা, তোর ভবিষ্যৎ। ”
দু’জন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। সময়টা যেন ইচ্ছা করে ধীরে হাঁটছে।
ঘোষণা শেষ । আর সময় নেই।
ইরা এক পা এগোল, আবার থামল।
“ভাই…”
“হ্যাঁ?”
“আমি চলে গেলে আমার কথা তোমার মনে পারবে তো?তুমি আমাকে ভুলে গেলে আমাকে মনে রাখার আর কেউ থাকবে না ভাইয়া।আমার খুব মন খারাপ করলে যদি তোমাদের কল করি তুমি আমার সাথে একটু কথা বলো।”
সাগর হাসল চোখে পানি নিয়েই।
“তোর যখন ইচ্ছে ফোন করবি। যেকোনো সময়, যতো রাতই হোক।মনে রাখিস,হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব হলেও তোর জন্য তোর ভাই আছে,থাকবে।যদি কথা বলতে না পারিস, শুধু লাইনটা খোলা রাখবি। আমি থাকবো।”
এই কথাটা ইরার জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে রইল।
ইরা নিরাপত্তা চেকের দিকে এগিয়ে গেল। কয়েক কদম পর থেমে পেছনে তাকাল।
সাগর তখনও দাঁড়িয়ে আছে। হাত তুলল। হাসল। চোখ ভিজে গেলেও হাসল।
কী অদ্ভুত যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্য!
ইরা জানে এই দৃশ্যটা সে সারা জীবন বয়ে বেড়াবে।
এই বিদায় শুধু এক বোনের বিদেশযাত্রা না। এই বিদায় একটা জীবনের অধ্যায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ।
আর ঠিক তখনই ইরা বুঝল সে একা যাচ্ছে না। সে ভাইয়ের ভালোবাসা নিয়েই উড়াল দিচ্ছে।
নিরাপত্তা চেক পেরিয়ে ইরা যখন বোর্ডিং গেটের দিকে হাঁটছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল পা দুটো ঠিক মেঝে ছুঁয়ে নেই। শরীরটা চলছে, কিন্তু মনটা এখনো পেছনে পড়ে আছে। সাগরের দাঁড়িয়ে থাকা মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
প্লেনে উঠেই সে জানালার পাশের সিটটা খুঁজে নিল। ব্যাগটা ওপরে তুলে রাখতে গিয়ে হাত কাঁপছিল। পাশে বসা অপরিচিত একজন মহিলা মৃদু হেসে বলল, “First time flying?”
ইরা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। সেই ‘হ্যাঁ’-এর ভেতরে কত গল্প লুকানো মহিলাটা জানে না।
প্লেন ধীরে ধীরে রানওয়ের দিকে এগোতে লাগল। বাইরে ঢাকার আলো ঝাপসা হয়ে আসছে। ইরা চোখ বন্ধ করল। মনের ভেতর শুধু একটাই কথা এটা আর ফিরে তাকানোর সময় না।
প্লেন আকাশে উঠতেই বুকের ভেতরটা হালকা হয়ে গেল, আবার শূন্যও লাগল। নিচে দেশটা ছোট হতে হতে একসময় অদৃশ্য হয়ে গেল।
এই প্রথম ইরা বুঝল বিদেশ যাওয়া মানে শুধু নতুন জায়গায় পৌঁছানো না, পুরোনো জীবনটাকে দূর থেকে দেখা।
দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর ইরা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এত বড় জায়গা, এত আলো, এত মানুষ তবু কেমন নিঃসঙ্গ।
তিন ঘণ্টার ট্রানজিট।
সে একটা বেঞ্চে বসে জানালার বাইরে তাকাল। প্লেনগুলো আসছে যাচ্ছে। সবাই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে। কেউ কি জানে, এই মেয়েটার ভেতরে কী ঝড় বইছে?
এক কফি নিয়ে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ইরা ভাবল এই মাঝখানের সময়টা হয়তো সবচেয়ে কঠিন। না পুরোপুরি ছেড়ে আসা, না পুরোপুরি পৌঁছানো।
দোহা থেকে লন্ডনের ফ্লাইটটা দীর্ঘ। সাত ঘণ্টার বেশি।
এবার ইরা একটু ঘুমাল, একটু জেগে থাকল, আবার নিজের সাথে কথা বলল। জীবনে এত সিদ্ধান্ত সে একসাথে নেয়নি কখনো।
মাঝে মাঝে তার মনে হলো সব ছেড়ে ফিরে গেলে কেমন হতো?
কি দরকার ছিলো দেশ ছেড়ে চলে আসার?
ইশতিয়াককে বললে সে কী দেশে চলে যেতো না?
তারপরই মনে পড়ল ইশতিয়াকের কথা। এতো যন্ত্রণা বুকে নিয়ে যে মানুষটা চলে এসেছে, সে কীভাবে সেই মানুষকে কষ্ট দিবে দেশে ফিরতে বলে!
ইরা জানালার দিকে তাকাল। মেঘের ওপরে সূর্য। জীবনও হয়তো এমনই কারো কারো জীবনে আলো পেতে হলে অনেক মেঘ পাড়ি দিতে হয়।
লন্ডনে নামার সময় ভোর। আকাশ ধূসর, হালকা বৃষ্টি। ঠান্ডা বাতাসে ইরার শরীর কেঁপে উঠল।
ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে তার বুক ধুকধুক করছে। কাগজপত্র ঠিক আছে তো? প্রশ্নের উত্তর ঠিক দিতে পারবে তো?
সব পেরিয়ে লাগেজ হাতে নিয়ে যখন বের হলো তখন চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে শুধু একজনকে।
লাগেজ হাতে নিয়ে ইরা যখন আগমনী গেটের শেষ কাচের দরজাটার সামনে দাঁড়াল, তখন ইরার বুকের ভেতরটা অসম্ভব জোরে ধুকধুক করছিল। এতক্ষণ সে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করেছে ইমিগ্রেশন লাইনে, লাগেজ বেল্টের পাশে, এমনকি হাঁটতেও। কিন্তু এই দরজাটার সামনে এসে সব শক্ত ভাব ভেঙে যেতে চাইছে।
এই দরজা খুললেই ইশতিয়াক।
বাস্তবে।
এতদিন শুধু ফোনের স্ক্রিন, ভিডিও কল, ছবি আজ সে মানুষটা সামনে থাকবে। হঠাৎ করে ভয় ঢুকে গেল মনে। যদি চিনতে ভুল হয়? যদি চোখে চোখ পড়েও অচেনা লাগে? যদি এত পথ পাড়ি দিয়ে এসে নিজেকে আরও বেশি একা মনে হয়?
নিজের ভাবনায় ইরা নিজেই হাসে।কেনো এসব অবান্তর ভাবনা ভাবছে।যে মানুষটা তাকে এমন পাগলের মতো ভালোবাসে তাকে নিয়ে এসব আজগুবি ভাবনা মাথায় কেনো আসছে!
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলল।
বাইরের শব্দ একসাথে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মানুষের কথা, হাঁটার শব্দ, হাসি, চাকার ঘর্ষণ। আর তার মাঝখানে ইশতিয়াক।
সে খুব দূরে ছিল না। তবু ইরার মনে হলো, ওর আর তার মাঝখানে পুরো একটা জীবন দাঁড়িয়ে আছে।
ইশতিয়াক ইরাকে দেখেই থমকে গেল। যেন সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ড সে নড়ল না। তারপর মুখে এমন একটা হাসি ফুটে উঠল যেটা দেখে ইরার চোখ ভিজে গেল।
ইরা এক পা এগোল। আবার থামল। বুকের ভেতর জমে থাকা সব ভয় একসাথে উঠে এলো। এত মানুষের ভিড়ে হঠাৎ করে নিজেকে খুব ছোট লাগল। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল, কোনো শব্দ ছাড়াই।
ইশতিয়াক সেটা দেখল। আর অপেক্ষা করল না। সে দ্রুত এগিয়ে এসে ইরাকে বুকে টেনে নিলো।
“ইরা… ঠিক আছো?”
এই একটা প্রশ্নেই ইরার ভেতরের সব দ্বিধা, সংশয় দূর হয়ে গেলো।
ইরা কথা বলতে পারল না। শুধু মাথা নাড়ল। হাত পা কাঁপছে।
ইশতিয়াক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।ইরার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বললো,“চলো, বসি। তুমি অনেক ক্লান্ত।”
ইশতিয়াক নিজেই ইরার লাগেজটা নিয়ে নিল। সে খেয়াল করল ইরা কাঁপছে। ঠান্ডায় না, উত্তেজনায়। সঙ্গে সঙ্গে নিজের কোটটা খুলে ইরার কাঁধে তুলে দিল।
“এটা পরে নাও। এখানে বাতাস ঠান্ডা।”
এই ছোট ছোট কাজগুলোতেই ইরার চোখের পানি আর আটকানো গেল না। এতক্ষণ যে শক্ত হয়ে ছিল, এখন যেন সব ভেঙে পড়ল।
একটা বেঞ্চে বসতেই ইরা মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করল। কোনো শব্দ নেই, শুধু চাপা কান্না।
ইশতিয়াক কিছু বলল না। সে জানে এই কান্নার দরকার আছে। সে শুধু পাশে বসে থাকল। ইরার হাতটা নিজের দু’হাতের মধ্যে ধরে রাখল। মাঝেমধ্যে খুব আলতো করে বলল, “আমি আছি।”
এই তিনটা শব্দই যথেষ্ট ছিল।
কিছুক্ষণ পর ইরা ধীরে মুখ তুলল। চোখ লাল, গলা ভারী। “আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“আমি জানতাম।”
“যদি এখানে এসে নিজেকে হারিয়ে ফেলি?”
ইশতিয়াক ইরার দিকে তাকাল। খুব শান্ত চোখে।
“তুমি হারাবে না। আমি তোমাকে হারাতে দেবো না।”
খুবই সাধারণ একটা কথা অথচ ইরাকে কী ভীষণ স্বস্তি দিলো।
ইরা প্রথমবার সত্যি করে তাকাল ইশতিয়াকের দিকে। এতদিনের চেনা মুখ, তবু আজ নতুন। চোখে দায়িত্বের ছাপ, মুখে শান্তি।
“তুমি এসেছো… এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।”
ইশতিয়াক হালকা হেসে বলল, “আমি তো অনেক আগেই এসেছি। তুমি শুধু দেরি করলে।”
ইরা হেসে ফেলল কান্নার মধ্যেই।
ইশতিয়াক উঠে দাঁড়াল।
“চলো। বাইরে গাড়ি আছে। আগে বাসায় যাই। গরম কিছু খাবে। তারপর বিশ্রাম।”
হাঁটতে হাঁটতে ইশতিয়াক আবার বলল, “আর কিছুই ভাববে না। এখানে পৌঁছানোটাই শুধু তোমার কাজ ছিল। সেটাই তুমি করেছো।তোমার বাকি সব কাজ আমার।”
ইরা মাথা নেড়ে বলল,“ধন্যবাদ।”
ইশতিয়াক থামল।
নিচু স্বরে খুব আস্তে বলল, “এটার জন্য ধন্যবাদ লাগবে না, ইরা।আমার অন্য কিছু লাগবে।”
ইরা শঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে রইলো।
ইশতিয়াক ইরার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, “বেশি কিছু চাই না তো,একটা চুমু দিলেই আপাতত চলবে।”
এয়ারপোর্টের দরজা পেরিয়ে যখন তারা বাইরে বের হলো, তখন ঠান্ডা বাতাস বয়ে এলো। ইশতিয়াক ইরার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
এই শহর অচেনা। এই জীবন নতুন।কিন্তু এই হাত ধরা পরিচিত।
ইরা ইশতিয়াকের দিকে তাকায়।
ইশতিয়াক ইরার হাত আরো শক্ত করে ধরে বললো, “আমাদের নতুন জীবন আজ থেকে শুরু হলো ইরা।আজ থেকে তোমার সাথে আমার ছোট্ট একটা সংসার শুরু হবে আজ থেকে। যেখানে শুধু ভালোবাসা থাকবে ইরা।”
ইরা চোখ মুছে নেয়।
প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৩৭
এই ঘরহারা মানুষটার জীবনের একমাত্র আশ্রয়,একমাত্র মানুষ সে।আল্লাহ যেনো তাকে সারাজীবন এই মানুষটাকে খুশি করার সেই সামর্থ দেন।
ইরার আর কিছু চাওয়ার নেই আল্লাহর কাছে। নতুন জীবনে যেনো আর কোনো আঘাত তার স্বামীর জীবনে না আসে।সে যেনো ঢালের মতো প্রিয় মানুষটাকে আগলে রাখতে পারে।
