প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৫
উম্মে হাবিবা
দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও আদিবা বেশ কিছুক্ষণ কাঠের পুতুলের মতো করিডোরে দাঁড়িয়ে রইল। সোহার শেষ কথাগুলো তীরের মতো এসে তার বুকে বিঁধেছে। একজন সাধারণ, শ্যামলা মেয়ের কাছ থেকে এমন অপমান সে মুখ বুজে সহ্য করল? রাগে আর অপমানে আদিবার হাত-পা কাঁপতে লাগল। সে মনে মনে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, “সোহা, এই অপমানের বদলা আমি নেবই। তোকে এই বাড়ি থেকে না তাড়ানো পর্যন্ত আমার শান্তি নেই!”
ওদিকে ঘরের ভেতরে রুদ্র এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে একমনে হাসছে। সোহার মতো শান্ত, মায়াবী একটা মেয়ের মুখে এমন কড়া জবাব সে আশা করেনি। রুদ্রর হাসিমাখা দৃষ্টি নিজের দিকে ফিরতেই সোহা আবার লজ্জায় পড়ে গেল। ভেজা চুল থেকে এখনো দু-এক ফোঁটা পানি টুপটুপ করে মেঝেতে পড়ছে।
রুদ্র সোহার দিকে দু-পা এগিয়ে এসে বলল, “বাহ আজ দেখি একদম বউ বউ ! তোমার মুখে তো বেশ ভালো ভালো উপমা আসে। শ্যামলতা ! তা হঠাৎ এই জোনাকিপোকার বুদ্ধি মাথায় কোত্থেকে এলো?”
রুদ্রের মুখে শ্যামলতা ডাকটা এমন অদ্ভুত ভালোলাগলো। মনে মনে আওড়ানো শ্যামলতার সুদর্শন পুরুষ।
সোহাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রুদ্র ভ্রু নাচালো।
সোহা মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে আলমারি থেকে একটা শুকনো তোয়ালে বের করতে করতে বলল, “অন্যায় কথা শুনলে এমনিতেই মাথায় বুদ্ধি চলে আসে। আর আপনি যেভাবে রাগছিলেন মনে হচ্ছিলো তাকে থাপ্পড় না মেরে বসেন তাই। এতো রাগেন কেনো সে তো আপনার ফুফাতো বোন।”
”বোন বলেই তো রেহাই পেয়েছে, অন্য কেউ হলে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিতাম,” রুদ্র সোহার হাত থেকে তোয়ালেটা টেনে নিয়ে নিজেই সোহার ভেতরের দিকে চলে যাওয়া কোমর সমান লম্বা চুলগুলো মুছতে শুরু করল।
রুদ্রর এই আচমকা যত্নে সোহার হৃদস্পন্দন আবার এক দফা বেড়ে গেল। সে একটু সরে যাওয়ার চেষ্টা করে বলল, “আরে ছাড়ুন, আমি নিজেই পারব।”
”চুপচাপ দাঁড়াও তো। এই রাতে ভেজা চুল নিয়ে থাকলে এমনিতেই ঠাণ্ডা লাগবে, তারপর আবার পায়ের ব্যথার জন্য নতুন বাহানা শুরু করবে,” রুদ্র ধমকের সুরে বললেও তার গলায় ছিল গভীর ভালোবাসা। সোহা আর নড়াচড়া করল না। আয়নায় রুদ্রর যত্নশীল মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এই মানুষটার কঠোর খোলসের নিচে কতখানি মায়া লুকিয়ে আছে। সত্যিই কি সে তার এই গম্ভীর খিটখিটে টিচারকে ভালোবেসে ফেলেছে?
পরদিন সকালে, কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল রাইসা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিজাবটা ঠিক করতে করতে তার বারবার মনে পড়ছিল গতকাল রাফিন স্যারের দেওয়া সেই চকলেটটার কথা। কেন জানি আজ কলেজে যাওয়ার জন্য মনটা বড্ড ছটফট করছে।
কলেজে পৌঁছে ক্লাসের এক কোণায় গিয়ে বসল রাইসা। একটু পরেই ক্লাসে ঢুকলেন রাফিন স্যার। রাফিন এই কলেজের একজন জনপ্রিয় লেকচারার। ক্লাসে ঢুকেই অভ্যাসবশত প্রথম বেঞ্চের দিকে তাকাল সে, যেখানে সোহা বসে। কিন্তু আজকেও সোহার জায়গাটা খালি দেখে রাফিনের মনে এক অজানা হতাশা উঁকি দিল। সেই প্রথম দিন কলেজের করিডোরে যখন সোহার মায়াবী শ্যামলা চেহারা আর কোমর সমান খোলা চুল বাতাসে উড়তে দেখেছিল, সেদিন থেকেই মেয়েটার সরলতা রাফিনের মন কেড়ে নিয়েছে। রাফিন তো জানে না, সোহার বিয়ে হয়ে গেছে এবং এই কলেজেরই আরেকজন গম্ভীর ও প্রভাবশালী স্যার—রুদ্র মেহতাবই সোহার স্বামী!
ক্লাস শেষে রাফিন রাইসাকে ইশারায় ডেকে বলল, “রাইসা, একটু স্টাফ রুমে এসো তো।”
রাইসা বুক দুরুদুরু কাঁপন নিয়ে স্যারের পিছু পিছু স্টাফ রুমে গেল। রাফিন নিজের চেয়ারে বসে ফাইলপত্র গোছাতে গোছাতে জিজ্ঞেস করল, “তোমার বান্ধবী সোহা আজকেও আসেনি কেন রাইসা? ওর কি কোনো সমস্যা হয়েছে?”
রাইসা একটু আমতা আমতা করে বলল, “আসলে স্যার, ও একটু পারিবারিক কারণে ব্যস্ত আছে। পায়েও একটু চোট পেয়েছে।”
রাইসা স্যারের এই অতিরিক্ত আগ্রহের কারণ বুঝতে পারল না, সে ভাবল স্যার হয়তো একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক হিসেবেই সোহার খোঁজ নিচ্ছেন। সে হেসে বলল, “আচ্ছা স্যার, আমি সোহাকে বলব।” রাইসা মনে মনে স্যারের জন্য এক বুক ভালোবাসা জমিয়ে খুশি হয়ে ফিরে গেল, অথচ সে জানলই না রাফিনের মন জুড়ে অন্য কেউ আছে।
এদিকে নিজের বাড়িতে বসে ছটফট করছিল মাইশা। সে সোহার নিজের ফুফাতো বোন । সোহাদের বাড়িতে যখন রুদ্রকে প্রথমবার দেখেছিলো, তখন রুদ্রর সেই রাজকীয় ব্যক্তিত্ব, গম্ভীর চোখ আর অসাধারণ পার্সোনালিটি দেখেই মাইশা প্রথম দেখায় ক্রাশ খেয়েছিল। রুদ্র সোহার স্বামী এটা যেনো সে কিছুতেই মানতে পারছে না।তখন থেকেই মাইশার মনে এক তীব্র হিংসা আর জেদ চেপে বসেছে—সোহার মতো একটা সাধারণ শ্যামলা মেয়ের কপালে এমন একজন পুরুষ কিছুতেই সইবে না! তমাল কেও আজকাল ভিষন বিরক্ত লাগছে। কথা বলতেও ইচ্ছে করে না।
ফোনে তমালের ওপর বিরক্ত হয়ে মাইশা একা একাই ঘরের ভেতর পায়চারি করছিল আর ভাবছিল, “যেভাবেই হোক, রুদ্রর কাছাকাছি আমাকে যেতেই হবে। আবার শুনেছে রুদ্র নাকি সোকার কলেজের প্রফেসর ! হঠাৎ মাথায় এলো,, সোহার বাপের বাড়ির আত্মীয় হিসেবে মেহতাব ভিলায় যাওয়ার একটা উসিলা তো করাই যায়।”
যেমন ভাবা তেমন কাজ। বেলা প্রায় তিনটা বেজে বারো মিনিট,, মাইশা দাড়িয়ে আছে মেহতাব ভিলার সামনে। মেহতাব ভিলার গেট দিয়ে ঢোকার সময় তার বুকটা কাঁপছিল রুদ্রকে দেখার আশায়।
কলিংবেল চাপতেই একটু পর এসে দরজা খুলে দেয় রুনিয়া মেহতাব। সামনে থাকা মেয়েটাকে চিনতে পারেন না উনি। তখন মাইশা মুখে একটা মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বলে__
“আসসালামু আলাইকুম আন্টি। আমি সোহার ফুফাতো বোন, মাইশা।
রুনিয়া বেগম মাইশাকে চিলতেন না, তবে সোহার আত্মীয় শুনে বেশ আদর করে ভিতরে এনে বসালেন, “এসো মা বসো।
ড্রইং রুমে রাজিয়া চৌধুরী আর আদিবা ও ছিলো।
রুনিয়া মেহতাব মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলেন __
আর কেউ এলে না? তুমি একাই এসছো?
জ্বি আন্টি আসলে এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তো ভাবলাম বোন টাকে একটু দেখে যায়।
রাজিয়া তীক্ষ্ণ চাউনিতে তাকিয়ে আছে মাইশার দিকে।
মাইশা একটু অপ্রস্তুত হেসে প্রশ্ন করে __
সোহা কোথায় আন্টি?
“সোহা উপরে ওর রুমেই আছে।” আসলে মেয়েটা পায়ে একটু ব্যথা পেয়েছে, তাই নিছে আসতে বারণ করেছি।
পাশে বসা রাজিয়া চৌধুরী আর আদিবা মাইশাকে উপর-নিচ পরখ করল। আদিবা মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ওর আবার চোট! ও তো রাজপ্রাসাদের রানীর মতো রুমে বসে রুদ্র ভাইকে আঙুলের ইশারায় নাচাচ্ছে।”
মাইশা আদিবার কথা শুনে ভেতরে ভেতরে জ্বলে উঠল। সে বুঝতে পারল এই বাড়িতেও সোহার শত্রু আছে।
রুনিয়া মেহতাব ধমকের সুরে আদিবাকে বললেন।এসব কেমন কথা আদিবা, কথার ধাচ ঠিক করো। তার পর মাইশার দিকে তাকিয়ে বলে তুমি কিছু মনে করো না ও এমনি। তুমি বসো তোমার জন্য শরবত নিয়ে আসছি।
না আন্টি লাগবে না আমি ওর সাথে দেখা করেই চলে যাবো।
তাহলে কি ওকে ডেকে দিবো?
না থাক ব্যথা নিয়ে আসতে হবে না আমাকে রুম দেখিয়ে দেন আমি গিয়ে দেখা করে আসি।
তার পর আবার আমতা আমতা করে প্রশ্ন করলো।রুদ্র _রুদ্র ভাইয়া কি বাসায়?
“হ্যাঁ, আজ ওনার দুপুরের পর কলেজ বা অফিসের কাজ নেই, তাই রুমেই আছে,” আদিবা বলল।
মাইশা আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল, “তাহলে আমি একটু সোহার রুম থেকে ঘুরে আসি।”
রুনিয়া রুম দেখিয়ে দিতেই সে সেদিকে যায়।
সোহার রুমের সামনে এসে মাইশা দেখল দরজাটা সামান্য খোলা। সে ভেতরে উঁকি দিতেই দেখল, রুদ্র বিছানায় বসে ল্যাপটপে মার্কশিট বা কলেজের কিছু কাজ করছে আর সোহা পাশে বসে মন দিয়ে একটা বই পড়ছে। মাঝেমধ্যে রুদ্র সোহার পড়ার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ধমকের সুরে বুঝিয়ে দিচ্ছে, আর সোহা মায়াবী হেসে মাথা নাড়ছে। প্রথমবার সোহার বাপের বাড়িতে দেখা সেই হ্যান্ডসাম রুদ্র স্যারকে এত কাছ থেকে দেখে মাইশার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আর তাদের এই সুন্দর রসায়ন দেখে তার বুকের ভেতরটা হিংসায় জ্বলে উঠল।
সে দরজায় হালকা টোকা দিয়ে বলল, “আসতে পারি?”
রুদ্র আর সোহা দুজনেই চমকে দরজার দিকে তাকাল। মাইশাকে এখানে দেখে সোহার মুখের হাসিটা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। রুদ্র ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মতো গলায় বলল, “তুমি এখানে?”
মাইশা ঘরে ঢুকে সোহার পাশে বসার ভান করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, “হ্যাঁ রুদ্র ভাইয়া। আসলে এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম আপনাদের সাথে দেখা করে যাই।
আর সে দিনের জন্য আমি দুঃখীত ভাইয়া।
রুদ্র এই বিষয়ে কথা বলতে চাইলো না তাই চুপচাপ নিকের কাজে মনোযোগ দিলো।
ঐ বাড়িতে সেদিন আপনার সাথে ঠিকমতো কথাই হলো না। এখানে এসে সোহার চোটের কথা শুনে আর থাকতে পারলাম না। তা সোহা, তোর বর তো তোর কলেজেরও স্যার, ঘরে-বাইরে ডাবল যত্ন পাচ্ছিস, তাই না?”
মাইশার গলার ভেতরের কুটিলতা সোহা ঠিকই টের পেল। সে শুধু মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ আপু, ওনার মতো মানুষ পাশে থাকাটাই ভাগ্যের ব্যাপার।”
রুদ্র মাইশাকে প্রথম দিন থেকেই পছন্দ করেনি। সে ল্যাপটপটা বন্ধ করতে করতে ঠান্ডা ও কড়া গলায় বলল, “সোহা, তোমার পড়া এই চ্যাপ্টারটা শেষ হলে আমাকে নিচে এসে বলো। আমি একটু লাইব্রেরি রুমে যাচ্ছি।” রুদ্র মাইশাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তার দিকে একবারও না তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
রুদ্রর এই চরম অবহেলা মাইশাকে আরও বেশি ক্ষিপ্ত করে তুলল। রুদ্র চলে যেতেই সে সোহার দিকে ঘুরে বিষাক্ত গলায় বলল, “বেশিদিন এই সুখ কপালে সইবে না সোহা। রুদ্র স্যারের পাশে তোকে এক ফোঁটাও মানায় না। তুই ওনার যোগ্যই নোস, এটা মনে রাখিস!”
সোহা এবার আর চুপ থাকল না। সে তার কোমর সমান লম্বা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে, মায়াবী কিন্তু দৃঢ় চোখ দুটো মাইশার দিকে তাক করে বলল, “আমি যোগ্য কি অযোগ্য, সেটা আমার বর ভালো করেই জানেন আপু। তোমায় কষ্ট করে সার্টিফিকেট দিতে হবে না। আর নিজের ফুফাতো বোনের বরের দিকে এভাবে তাকিয়ে না থেকে, নিজের চরকায় তেল দিলে মনে হয় সম্মানটা বাঁচত।”
সোহার এই সপাটে জবাবে মাইশার মুখটা অপমানে আর রাগে কালো হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে রাগে পা দাপাতে দাপাতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। সোহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে, তাদের এই কাঁচা ভালোবাসার চারপাশটা কত শত্রুতে ভরে উঠছে, কিন্তু রুদ্রর ওই গম্ভীর শাসনের আড়ালে থাকা মায়াটাই এখন সোহার সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিকেলের দিকে আকাশের সাদা মেঘগুলো উঠে বেড়াচ্ছে হালকা বাতাসে একটা ফুরফুরে আবহাওয়া তৈরি হলো। সোহা তার কোমর সমান লম্বা চুলগুলো আলতো করে একটা খোঁপা করে রৌদকে সাথে নিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। একটু মুক্ত বাতাস গায়ে লাগলে সব টেনশন চিন্তা যেন নিমেষেই কেটে যাবে। এসেছে থেকে একবার মাত্র ছাদে এসেছে।
ছাদে কদম রাখতেই দেখা গেল, ছাদের এক কোণায় থাকা দোলনাটায় আদিবা আগে থেকেই গম্ভীর মুখে বসে দুলছে। সোহা আর রৌদকে একসাথে ছাদে আসতে দেখে আদিবার মুখটা আরও তিতকুটে হয়ে গেল। সোহা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ছাদের অন্য পাশে এগিয়ে গেল। সেখানে একটি বেশ বড় টবে রুদ্রর সবথেকে প্রিয় বেলি ফুলের গাছটি সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। গাছটি সাদা সাদা বেলি ফুলে ভরে আছে, আর তার সুবাস চারিদিকের বাতাসকে মাতাল করে তুলেছে। রুদ্র এই গাছটিকে জান দিয়ে ভালোবাসে, বাড়ির কাউকেই, এই গাছের ফুল ছুঁতে দেয় না।
সোহা মুগ্ধ নয়নে ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাত বাড়িয়ে পাপড়িগুলো ছুঁয়ে দেখতে গেল। ঠিক তখনই কোত্থেকে আদিবা ঝড়ের বেগে এসে সোহার হাতটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
আদিবা চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠল, “এই মেয়ে! একদম হাত দেবে না এই গাছে। এটা রুদ্রর সবথেকে পছন্দের বেলি ফুল গাছ। এই গাছ থেকে কেউ যদি একটা ফুলও ছেঁড়ে, তাকে রুদ্র যে কী কঠিন শাস্তি দেয় তোমার কোনো ধারণা নেই! নিজের সীমানায় থাকো।”
সোহা ধাক্কা খেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আদিবার এই অহেতুক মাতব্বরি দেখে সোহার ঠোঁটের কোণে একটা টিটকারির হাসি ফুটে উঠল। ও একটু বাঁকা হেসে বলল, “ওহ আচ্ছা! কঠিন শাস্তি দেয় বুঝি? কেমন শাস্তি আপু? ঠিক যেভাবে সেদিন তোমাকে কড় রৌদে কানে ধরিয়ে দাড় করিয়েছিল রেখে ছিলো, তেমন শাস্তি?”
সোহার এই সপাটে কাউন্টারে আদিবার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে অপমানে লাল হয়ে গেল। পাশ থেকে রৌদ আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে ফিক করে হেসে উঠে বলল, “ঐতিহাসিক শাস্তি ভাবি! ভাইয়া যদি আদিবা আপুকে আবার ওই শাস্তি দেয়, তবে এবার কিন্তু আমি ভিডিও করে রাখব। একদম ভাইরাল করে দেব!”
আদিবা রাগে গজগজ করতে করতে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “রৌদ! তুই কিন্তু একদম বাড়াবাড়ি করছিস। আর সোহা, তুমি আমাকে অপমান করলে? এই অপমানের বদলা আমি নেব। রুদ্রকে আমি সব বলব, তোমাকে এই বাড়ি থেকে ও নিজেই ঘাড় ধরে বের করবে, দেখে নিও”।
সোহা আদিবার এই ফাঁপা হুমকিতে বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। বরং ও রৌদের দিকে ঘুরে বেশ আয়েশ করে বলল, “রৌদ, জলদি নিচে যাও তো । একটা সুই আর সাদা সুতো নিয়ে এসো। আজ এই গাছের বেলি ফুল দিয়ে আমি সুন্দর একটা গাজরা বানিয়ে চুলে পরব।”
রৌদ সোহার কথা শুনে চোখ কপালে তুলল। সে আমতা আমতা করে বলল, “ভা-ভাবি! তুমি সত্যিই ভাইয়ার গাছের ফুল ছিঁড়বে? ভাইয়া কিন্তু রাগ করলে পুরো মেহতাব ভিলা মাথায় তোলে। তুমি নিশ্চিত তো?”
”তুমি যাও তো রৌদ, যা বলছি নিয়ে এসো,” সোহার আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠ শুনে রৌদ আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল।
এবার সোহা আদিবার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই। সে শান্ত কিন্তু কড়া গলায় আদিবাকে বলল, “আদিবা আপু, একটা কথা মাথায় ঢুকিয়ে নাও। তুমি আর আমি এক নই। রুদ্রর ওপর তোমার কোনো অধিকার নেই, কিন্তু রুদ্রর যা কিছু—তা এখন সোহার নিজেরও। ওনার রাগ যেমন আমার, ওনার ভালোবাসাও তেমন আমারই। তাই ওনার এই বেলি ফুল গাছের ওপর পুরো অধিকার এখন আমার।”
”কিসের অধিকার শুনি
হঠাৎ পেছন থেকে এক গম্ভীর, গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই সোহা আর আদিবা দুজনেই চমকে তাকাল। দেখা গেল, রুদ্র পকেটে হাত দিয়ে ধীর পায়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। তার চোখ দুটো বরাবরের মতোই তীক্ষ্ণ আর শান্ত।
আদিবা রুদ্রকে দেখেই যেন হাতে চাঁদ পেল। সে এক লাফে রুদ্রর সামনে গিয়ে নালিশের সুরে বলল, “রুদ্র! দেখো তোমার এই ধড়িবাজ বউ কী অবাধ্য! ও তোমার বেলি ফুল গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে চুলে পরার ফন্দি করছে। আমি বারণ করায় আমাকে উল্টো অপমান করল। তুমি আজ একে শক্ত একটা শাস্তি দাও তো!”
রুদ্র আদিবার কোনো কথার উত্তর দিল না। সে কিছুক্ষণ শান্ত চোখে সোহার মায়াবী শ্যামলা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সোহার চোখে তখন এক মৃদু জড়তা আর লাজুক চপলতা। রুদ্র সোহার দিকে দু-পা এগিয়ে এসে নরম কিন্তু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “এই ফুলগুলো তোমার খুব পছন্দ?”
সোহা রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ল।
সোহার সম্মতি পেতেই রুদ্র আদিবাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে নিজেই গাছটার দিকে এগিয়ে গেল। তারপর নিজের যত্ন করে বড় করা গাছটা থেকে আলতো করে একসঙ্গে অনেকগুলো সতেজ বেলি ফুল ছিঁড়ে নিল। আদিবা হা করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল, তার চোখ যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। রুদ্র ফুলগুলো নিয়ে সোহার সামনে এসে দাঁড়াল এবং সোহার বাড়িয়ে দেওয়া ছোট ছোট হাত দুটোর ওপর ফুলগুলো আলতো করে রেখে দিল। শুধু তাই নয়, রুদ্র সেখান থেকে একটি নিখুঁত সুন্দর বেলি ফুল নিয়ে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সোহার কানের পাশে চুলে গুঁজে দিল।
রুদ্রর এই আকস্মিক ও রোমান্টিক আচরণে সোহার পুরো শরীর শিউরে উঠল, বুকটা হাতুড়ি পেটার মতো কাঁপতে লাগল। ওদিকে আদিবা রাগে আর হিংসায় জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল হয়ে গেল।
ঠিক এই সময়েই রৌদ হাপাতে হাপাতে সুই আর সুতো নিয়ে ছাদে ফিরে এল। কিন্তু ছাদের এই দৃশ্য—ভাইয়া নিজেই ভাবিকে ফুল ছিঁড়ে দিচ্ছে আর চুলে পরিয়ে দিচ্ছে দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল। রুদ্র রৌদের হাতের সুই-সুতো দেখে ভ্রু কুঁচকে সোহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সুই-সুতো দিয়ে কী হবে?”
সোহা একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, “ওই… মালা গাঁথব। গাজরা বানিয়ে চুলে পরব।”
রুদ্র কিছু বলতে যাবে, এমন সময় তার পকেটের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল কলেজের কোনো জরুরি কল। সে সোহার দিকে একবার তাকিয়ে ইশারায় বলল, “আমি আসছি।” তারপর একটু দূরে গিয়ে ফোনে কথা বলতে লাগল।
রুদ্র দূরে যেতেই সোহা ফুলগুলো নিয়ে দোলনার পাশে বসল আর সুই-সুতো দিয়ে মন দিয়ে মালা গাঁথতে শুরু করল। কিন্তু রুদ্রর ওই তীব্র চাহনির ঘোর তখনো সোহার কাটেনি। মনটা উচাটন থাকায় হঠাৎ করে অসাবধানতাবশত তড়বড় করে সুইটা সোহার নরম আঙুলে ফুটে গেল।
”আহ!” সোহার মুখ থেকে একটা ছোট আর্তনাদ বেরিয়ে আসতেই আঙুল থেকে এক ফোঁটা রক্ত টুপ করে ঝরে পড়ল।
ফোনে কথা বলতে থাকা রুদ্র সোহার ওইটুকু শব্দও মিস করেনি। সে মুহূর্তের মধ্যে কলটা কেটে দিয়ে প্রায় দৌড়ে সোহার কাছে চলে এল। সোহার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় নিয়ে আঙুলের রক্তটুকু দেখে রুদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে প্রচণ্ড কেয়ারিং কিন্তু ধমকের সুরে বলল, “একটুও কি সাবধানে কাজ করতে পারো না? চোখ দুটো কি কপালে থাকে সবসময়?”
বলেই রুদ্র সোহার সেই রক্তাক্ত আঙুলটা হঠাৎ নিজের মুখে পুড়ে নিলো। চুষে নিতে চাইলো ব্যথাটুকু। রুদ্রের এমন আচরনে হঠাৎ নড়ে উঠে সোহার সমস্ত কায়া। শের দাঁড়াবে নেমে যায় শীতল এক শ্রোত। এই তীব্র ভালোবাসাময় আর যত্নশীল রূপ দেখে সোহার চোখ দুটো মায়ায় ভরে উঠল। সে একদৃষ্টে তার এই খিটখিটে প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে রইল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ পরিস্থিতি হালকা করতে সুই-সুতোটা সোহার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলল, “থাক ভাবি, তোমার আর কষ্ট করতে হবে না। ভাইয়া যেভাবে রেগে যাচ্ছে, আমারই ভয় লাগছে। মালার বাকিটুকু আমিই গেঁথে দিচ্ছি।” রৌদ চটপট মালার বাকি অংশটুকু গেঁথে সোহার হাতে দিল।
রুদ্র সোহার আঙুলটা পরীক্ষা করে দেখল রক্ত বন্ধ হয়েছে কি না। তারপর রৌদের হাত থেকে সেই বেলি ফুলের গাজরাটা টেনে নিল। “সোহা কিছু বোঝার আগেই,,, রুদ্র অত্যন্ত নিখুঁত ও যত্ন সহকারে সেই সুগন্ধি বেলি ফুলের গাজরাটা,,, সোহার খোলা চুলে লাগানো চিকন ক্লিপর সাহায্যে জড়িয়ে দিল”। বেলি ফুলের তীব্র সুবাস আর রুদ্রর হাতের ছোঁয়ায় সোহার পুরো পৃথিবী যেন থমকে গেল।
এতক্ষণ ধরে এই চরম রোমান্স আর নিজের পরাজয় দেখে আদিবা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এবার চিৎকার করে মুখ খুলল, “রুদ্র! এটা কিন্তু একদম অন্যায়! তোমার কি কোনো নিয়ম-কানুন নেই? সেদিন আমি জাস্ট একটা আধপচা ফুল হাত দিয়েছিলাম বলে তুমি আমাকে কড়া রৌদে কানে ধরিয়ে দাঁড় করে রেখেছিলে ! আর আজ এই মেয়েটা তোমার গোটা গাছ উজাড় করে ফুল ছিঁড়ল, আর তুমি তাকে শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, নিজের হাতে মালা বানিয়ে চুলে পরিয়ে দিচ্ছ? তোমার বেলায় কেন এই দ্বিচারিতা? কেন এই আলাদা নিয়ম?”
রুদ্র সোহার চুল থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আদিবার দিকে তাকাতেই তার চোখের সেই নরম মায়া উবে গিয়ে সেখানে এক শীতল, গম্ভীর ও কঠিন চাউনি ফুটে উঠল।
রুদ্র একদম বরফশীতল গলায় আদিবাকে শুনিয়ে বলল, “কারণ ও এই বাড়ির মেহমান বা বাইরের কেউ নয় আদিবা। ও আমার স্ত্রী, আমার অর্ধাঙ্গিনী। সোহার জন্য আমার বাড়ির তো বটেই, আমার জীবনের সমস্ত নিয়ম পালটে দেওয়ার অধিকার শুধু আমার একার আছে। আমার জিনিস ও ছিঁড়বে নাকি ভাঙবে, সেটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেখানে মাথা গলানোর সাহস দ্বিতীয়বার যেন তোমার না হয়!”
রুদ্রর এই কড়া আর চূড়ান্ত জবাব শুনে আদিবার মুখটা পুরো চুন হয়ে গেল। সে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না।
প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৪
রুদ্র আদিবাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সোহার হাতটা নিজের শক্ত ও উষ্ণ হাতের মুঠোয় পুরল। তারপর সোহার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “চলো সোহা, নিচে চলো। এখানে বাতাসটা বড্ড বেশি বিষাক্ত হয়ে উঠছে।”
সোহা রুদ্রর হাত ধরে ধীর পায়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে যেতে লাগল। যাওয়ার সময় সে একবার পেছনে ফিরে আদিবার ধূলিসাৎ হওয়া অহংকারী মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসল। বেলি ফুলের সুবাসে মেহতাব ভিলার ছাদটা তখনো ম ম করছে, ঠিক যেমন সোহার মনে রুদ্রর জন্য ভালোবাসাটা একটু একটু করে সুবাস ছড়াতে শুরু করেছে।
