প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৭ (২)
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
তৈরি হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতে ঘড়ি পড়ে সামনে তাকাতেই দেখলো তায়েবা নীল রঙের শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে হালকা মেকআপে মেয়েটাকে দারুণ লাগছে।
লামিয়া পিছন ঘুরে হাতের ইশারায় তয়েবাকে নিজের দিকে ডাকলো। তায়েবা শাড়ির কুচি সামলাতে সামলাতে লামিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই লামিয়া কাজল নিয়ে তায়েবার কপালে লাগিয়ে দিলো।
তায়েবা ভ্রু কুঁচকে আয়নায় নিজেকে দেখে রেগে গিয়ে লামিয়ার পিঠে তিন চারটা কিল বসিয়ে দিতেই লামিয়া মুখ থমথমে করে বললো
– ঠিক এই কারণেই বলে মানুষ ভালো করতে নেই। উপকার করলে বাঘে খায়। ছ্যাঃ জীবনটাই বেদনাময়।
তায়েবা কপাল কুঁচকে কপালের কালি মুছতে মুছতে বললো
– হারামি তোকে বলেছিলাম আমার ভালো করতে।
দিলি তো যাওয়ার আগে একটা আকাম করে।
তায়েবার কথা শুনে মুখ বাঁকিয়ে গিটারের ব্যাগটা কাঁধে তুলে রুমের বাহিরে যেতে যেতে বললো
– আরে নজর টিকা দিলাম জানি নজর না লাগে। আর এমনিতেও তোকে কামের বেডি ছকিনা লাগছে। আর রাস্তার কুনজর সবসময় বাড়ির কামের বেডির ছকিনার উপরেই পড়ে তাই তোকে বাঁচাতে দিয়েছি। আর তুই কি না মারলি আমাকে ছিঃ তায়েবা।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
বলেই হাঁটা ধরলো। তায়েবা লামিয়ার কথা শুনে হাসলো। তারপর পিছন পিছন সে ও দৌড় দিলো।
আজকে ভার্সিটিতে প্রোগ্রাম তাই খান ও ইসলাম বাড়ির সব ছেলে মেয়েরা সবাই যাবে লামিয়া গান শুনতে আর তায়েবার নাচ দেখতে যাবে। তাই সবাই বাগানে এসে বসে আছে কিন্তু তাদের দুজনের খবর নেই।
বেচারা আবিরের শরীর প্রচুর ব্যাথা তাই আবির যাবে না। আবির যাবে না দেখে লামহা ও যাবে না। এরা দুজনের একজন ও যাবে না তাছাড়া সবাই যাবে।
শারমিন সামিরের পাশে দাঁড়িয়ে আড়চোখে রাশেদের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু রাশেদ তার দিকে ফিরে ও তাকাচ্ছে না। তা দেখে শারমিনের মন খারাপ হলো।
এদিকে মনিকা খালি শুভ্রর দিকে লেগে যাচ্ছে। শুভ্র বিরক্ত হয়ে যতোদূর যাচ্ছে, মনিকা তাঁর সাথে ততোই লেগে যাচ্ছে।
লাবিব এসব দেখে বিরক্ত হয়ে চোখ ঘুরিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মলিন হাসলো। স্ক্রিনে ভেসে আছে এক ছয় বছরের বাচ্চা মেয়ের ছবি।
গাঁয়ে তাঁর লাল রঙের উড়না পেঁচিয়ে শাড়ির মতো পড়া আর মাথায় কালো উড়না দিয়ে চুল বানিয়ে রেখেছে।
মাথায় লাল রঙের আরো একটা উড়না দেওয়া। গালে হাত দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট দাঁত কেলিয়ে হাসছে।
লাবিব তা ফোনটা বুকের বা পাশে চেপে ধরে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।
মাহির, তায়েব, জাহিদ, সাফওয়ান, হামিদা, হাফসা, ফারিয়া সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
বাড়ির মা – চাচিদের থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির বাহিরে বেরিয়ে এলো তায়েবা আর লামহা।
জাহিদ চোখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই থমকে গেলো। হালকা বাতাস যেনো তার গা ছুঁয়ে গেলো। এই প্রথম তায়েবাকে শাড়িতে দেখলো। ভীষণ মারাত্মক লাগছে। নিজের অজান্তেই জাহিদের হাতটা বুকের বাঁ পাশে চলে গেলো।
লামিয়া কি যেনো বলছে আর তায়েবা হাসছে। তায়েবার হাঁসি মুখ দেখে জাহিদের বুকে কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। বুকে হাত চেপে উফ করে উঠতেই, সবাই তার দিকে দৃষ্টি দিলো।
রাশেদ জাহিদ কে ধরে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো
– জাহিদ কী হয়েছে??
জাহিদ নিজের কাজে নিজেই লজ্জা পেয়ে বললো
– তেমন কিছু না বুকে ব্যাথা করছিলো। এখন ঠিক আছি।
পাশ থেকে সাফওয়ান বলে উঠলো
– হঠাৎ বুকে ব্যাথা??
– ওই আরকি! বলেই মাথা চুলকালো জাহিদ।
লামিয়া এসেই তারা দিতে লাগলো দেরি হয়ে গিয়েছে সবাই তাড়াতাড়ি চলো।
লাবিব লামিয়ার কন্ঠ শুনে চোখ তুলে লামিয়ার দিকে তাকাতেই বুকে ভেতর হাহাকার করে উঠলো।
আজ মাহিরের বাইকে হাফসা যাবে, দেখে সবাই একটু অবাক হলো। তারপর একে একে গাড়িতে উঠে পড়তেই
তায়েবা তায়েবের বাইকে উঠতেই তায়েব বলে উঠলো
– এই শাড়ি পড়ে তোকে বাইকে নিতে পারবো না। তুই গাড়িতে চলে যা।
তা শুনে তায়েবা ভ্রু কুঁচকে তাকালো তায়েবের দিকে।
তায়েব বাইকে উঠতেই ফারিয়া তায়েবের বাইকে উঠে পড়লো। তায়েবা ব্যাপার বুঝতে পেরে ধাম করে তায়েবের পিঠে কিল মেরে চলে গেলো।
রাশেদ বাইকে বসতেই শারমিন রাশেদের বাইকে উঠতে চাইলে রাশেদ কড়া গলায় বলে উঠলো
– আরিফ তাড়াতাড়ি উঠ বাইকে। আর লামিয়া আজকে আবরারের সাথে চলে যা।
রাশেদের কথা শুনে লামিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকালো রাশেদের দিকে।
রাশেদ আরিফ কে বাইকে উঠিয়ে স্টার্ট করলো বাইক।
শারমিন মন খারাপ করে চলে গেলো সাফওয়ান আর হামিদার সাথে। এদিকে লাবিব, মনিকা আর সামির এক গাড়িতে যাবে তাই তায়েবা ও তাদের সাথে উঠতেই
জাহিদ লাবিবের দিকে তাকিয়ে কিছু ইশারা করতেই লাবিব তায়েবা কে বললো
– তুই জাহিদের সাথে যা। আমাদের যেতে দেরি হবে।
বলেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
তায়েবা বিরক্ত হয়ে জাহিদের গাড়িতে যেয়ে পিছনের সিটে বসলো। তা দেখে জাহিদ গম্ভীর গলায় বললো
– আমি কারোর ড্রাইভার না। সামনের সিটে এসে বস।
তায়েবা তা শুনে রেগে মেগে আবার সামনের সিটে বসলো ।
তা দেখে জাহিদ তায়েবার দিকে তাকিয়ে বললো
– আরে আস্তে আস্তে গাড়ি ভেঙে ফেলবি নাকি??
তায়েব মুখ ঝামটা দিয়ে চুপচাপ বসে থাকলো।
জাহিদ হালকা হেসে গাড়ি স্টাট দিয়ে বেরিয়ে যেতেই লামিয়া ভ্রু কুঁচকে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
– কি ব্যাপার সবাই চলে গেলো, আপনি যাচ্ছেন না কেনো?
শুভ্র সানগ্লাস পড়তে পড়তে বললো
– ধরে না বসলে আমি গাড়ি স্টার্ট দিবো না।
– বেশি বাড়াবাড়ি করছেন কিন্তু।
বিরক্ত হয়ে বললো লামিয়া।
শুভ্র তা দেখে বাঁকা হেঁসে জোরে বাইক স্টার্ট দিয়ে টান দিতেই লামিয়া পড়ে যেতে যেতে একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছে । বেশ বিরক্ত হয়ে শুভ্রর কাঁধে আলতো হাত রাখতেই ৪৪০ ভোল্টের ঝাটক্কা খেয়ে হাত সরিয়ে ফেললো ঝাড়া মেরে।
অবাক দৃষ্টিতে শুভ্রর কাঁধের দিকে তাকিয়ে বললো
– আপনার শরীরের কারেন্ট আছে নাকি?
– কেনো? ভ্রু কুঁচকে বললো শুভ্র।
– মনে হলো শক খেলাম।
শুভ্র হেঁসে বাইক টান দিতে দিতে বললো
– পানি আর কারেন্ট এক হলে তো শক খাবেনই মিস। যাই হোক ভালো মতো ধরে বসুন।
লামিয়া আবার শুভ্রর কাঁধে হাত রাখতেই কেঁপে উঠলো। কিন্তু এবার আর হাত সরালো না। শুভ্র তা বুঝতে পেরে হেঁসে রওনা হলো ভার্সিটির দিকে।
সাদা রঙের পাঞ্জাবি পড়ে ফুল হাতে নিয়ে এদিক ওদিক ছুটছে জুনায়েদ।
অনুষ্ঠানের সমস্ত দ্বায়িত্ব এসেছে তাঁর টিম এবং তার ঘারে। সব কিছু গুছিয়ে উঠতে প্রায় ক্লান্ত সে। পাঞ্জাবি ঘেমে ভিজে গিয়েছে। রাসেল কোথা থেকে এক হাত পাখা এনে জুনায়েদ কে বাতাস করতে লাগলো।
জুনায়েদ পাশ থেকে পানির বোতল নিয়ে খেতে লাগলো। হঠাৎ জুনায়েদের ফোন আসতেই পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোবাইল বের করে রিসিভ করে বললো
– হ্যাঁ, চলে এসেছিস?? ওখানে দাঁড়া আমি আসছি।
বলেই উঠে দাঁড়ালো। ফোন পকেটে রেখে ভার্সিটির গেটের দিকে হাঁটা ধরলো। তাঁর পিছন পিছন রাসেল ও।
একে একে তিনটা বাইক আর তিনটা গাড়ি এসে থামলো ভার্সিটির মাঠে। গাড়ি থামতেই
তায়েবা দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে মন ভরে শ্বাস নিলো। দেখে মনে হচ্ছে এতোক্ষণ সে শ্বাস আটকে রেখেছিলো। জাহিদ তায়েবার এমন কাজে হেঁসে গাড়ি থেকে নামলো। তায়েবা পিছনে ঘুরে তাকাতেই বিরক্ত হলো। পুরোটা রাস্তা তাঁকে জ্বালিয়ে এসেছে এই লোক।
এইভাবে সেজেছিস কার জন্য, শাড়ি পড়েছিস ভালো কথা ছেলেরা পাগল না হলেই হলো, এতোটা লিপস্টিক দিয়েছিস কেনো, হেন তেন আগড্ডুম বাগড্ডুম প্রশ্ন করতে করতে মাথা পুরো ধরিয়ে ফেলেছে। এই ছেলে এতো কথা বলতে পারে তা জানা ছিলো না।
সবসময় গম্ভীর মুখ করে থাকে এমনকি হাসে ও না। আর আজকে কথা বলে পুরো মাথা ধরিয়ে ফেলেছে।
এইসব ভেবে তায়েবা আরো বিরক্ত হলো।
গাড়ি থেকে একে একে সবাই নেমে আসলো। আশেপাশের মেয়ে গিলে খাচ্ছে খান আর ইসলাম বাড়ির ছেলেদের। তা দেখে হামিদা সাফওয়ানের হাত ধরতেই সাফওয়ান হালকা হেসে হামিদার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরলো।
লাবিব গাড়ি থেকে নামতেই জুনায়েদ দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলো প্রাণ প্রিয় বন্ধু কে। লাবিব হেঁসে জুনায়েদ কে জড়িয়ে ধরে সবার সাথে পরিচয় করাতে লাগলো।
লামিয়া আর শুভ্র এই মাত্র এসে থামলো তাদের সামনে। লামিয়াকে দেখে জুনায়েদ আর রাসেল চমকে উঠলো। এই মেয়ে কে খুঁজে খুঁজে মরছে সে, তেমন ভার্সিটিও আসে না আর এই মেয়ে কি না আজ তাঁর সামনে।
জুনায়েদ লামিয়ার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে তা শুভ্র খেয়াল করে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
লাবিব জুনায়েদের কাঁধে হাত রেখে শুভ্রর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে লামিয়ার সাথে পরিচয় করাতে চাইলে জুনায়েদ লাবিবের দিকে তাকালো।
লামিয়া মাথা তুলে জুনায়েদের দিকে তাকাতেই বিরক্ত হয়ে তায়েবা কে নিয়ে চলে গেলো।
তা দেখে সবাই বেশ অবাক হলো। মাহির লাবিবের দিকে বললো
– লাবিব ভাই আপনি কী পরিচয় করাবেন ওনাকে?
ওনার সাথে আমার আর লামিয়ার আগে থেকেই পরিচয় আছে।
লাবিব ভ্রু কুঁচকে বললো
– কীভাবে?
– আরে রাসেল ভায়ের ডিম ফাটিয়ে দিয়েছিলো লামিয়া। তারপর থেকেই পরিচয়। রাসেল দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেঁসে কথা গুলো বললো মাহির।
তারপর তায়েব কে নিয়ে চলে গেলো লামিয়া দের কাছে।
এদিকে মাহিরের কথা কেউ বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে সবাই। ওইদিকে রাসেল লজ্জায় লাল নীল হয়ে যাচ্ছে।
তাই জুনায়েদ পরিস্থিতি সামলে সবাইকে প্যান্ডেলের চেয়ারে বসিয়ে দিলো। তারপর লাবিব কে টেনে এক পাশে নিয়ে গিয়ে অস্থির হয়ে বললো
– ওই মেয়ে কে? তোর কী হয়?
– কোন মেয়ে?
– আরে ওই যে লামিয়া !
– কেনো?
– আরে বল না!
– তুই আগে বল কেনো?
– তোকে বলেছিলাম না একটা মেয়ে কে আমি ভালোবাসি।
– হ্যাঁ!
– সেই মেয়েটা আর কেউ না লামিয়া।
লাবিব অবাক দৃষ্টিতে তাকালো জুনায়েদের দিকে।
তা দেখে জুনায়েদ হালকা হেঁসে বললো
– হ্যাঁ রে আমি লামিয়া কে ভালোবাসি। প্লিজ কিছু করে ওকে আমার করে দে। প্লিজ ভাই।
– এটা সম্ভব না।
বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো লাবিব।
– কেনো সম্ভব নয়??
– কারণ লামিয়া তোকে কোনোদিন ও ভালোবাসবে না।
– কিন্তু কেনো?
– কারণ আছে, এসব কল্পনাতেও আনবি না। তাহলে তুই বাঁচতে পারবি না জুনায়েদ। লামিয়ার দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালেই তাঁর চোখ উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
জুনায়েদ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লাবিবের দিকে।
জুনায়েদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই লাবিব বলে উঠলো
– প্লিজ ভাই আর কিছু বলিস না।
বলেই চলে গেলো। জুনায়েদ মলিন মুখ করে লাবিবের যাওয়ার দিকে তাকালো। তাহলে কী তাঁর ভালোবাসাকে পাওয়া আর হলো না?
ভার্সিটিতে প্রধান অতিথির আগমনের পর ই অনুষ্ঠানে শুরু হবে। তাই সবাই তার অপেক্ষাই করছে।
কিছুক্ষণ পর একে একে পাঁচ ছয়টা কালো গাড়ি প্রবেশ করলো ভার্সিটির মাঠে।
সব মেয়েরা ফুল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতিথিকে বরণ করার জন্য।
সবার গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো কিছু কালো পোষাক পড়া লোক আশেপাশে তাকিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো নাসির কায়সার ।
সাদা শার্ট প্যান্ট পড়ে চোখে কালো সানগ্লাস এঁটে আছে। দেখতে তাঁকে কম লাগছে না, মেয়েরা বরণ
না করে হা করে তাকিয়ে আছে কায়সারের দিকে।
নাসির কায়সার তা দেখে হালকা হেসে চুল গুলো হাত দিয়ে ব্রাশ করে বললো
– চোখ দিয়ে আমাকে গেলা শেষ হলে বরণ করতে পারো তোমরা।
কায়সারের কথায় সবার হুঁশ আসতেই তাঁকে বরণ করে নিয়ে মঞ্চে বসিয়ে দিলো।
কায়সার কে দেখে খান আর ইসলাম বাড়ির ছেলেরা কোনো রিয়েক্ট করলো না তাঁরা চুপচাপ দেখলো সব।
কায়সার বসে বসে চোখ ঘুরিয়ে কাউকে খুঁজছে।
খুঁজতে খুঁজতে চোখ গেলো সোজা পিছনের সারিতে।
সেখানে নেভী ব্লু রঙের চুড়িদার পড়ে বসে বসে গিটারের তার ঠিক করছে লামিয়া। চোখ মুখের বিরক্তির ছাপ।
কায়সার তা দেখে হাসলো। সেদিন রাতে লামিয়াকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার পর এই মেয়ের উপর আরো দূর্বলতা দেখা দিচ্ছে। এই মেয়ে স্বপ্নে এসেও তাকে জ্বালিয়ে যায়। স্বপ্নের কথা মনে করে কায়সার আবার হাসলো।
একে একে সুরু হলো অনুষ্ঠান। তায়েবা মঞ্চে উঠেছে নাচের জন্য। জাহিদ ফোনের ক্যামেরা অন করে রেখেছে।
তায়েব ক্যামেরা নিয়ে এসেছে বাসায় গেলে মা চাচি দের দেখাবে।
তায়েবা মঞ্চে উঠতেই স্পিকার বক্সে বেজে উঠলো রবীন্দ্রসঙ্গীত।
– মনো মরো মেঘের ও সঙ্গি
তায়েবা সেই গানের তালে তালে নৃত্য করছে। কিন্তু তায়েবা জানলো না কেউ তার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে।
তায়েবার নাচ শেষ হতেই কড় তালি দিলো সবাই। এই প্রথম কেউ রবীন্দ্র সংগীতে নৃত্য পরিবেশন করেছে তা দেখে স্যার ম্যামরা তায়েবার বেশ প্রশংসা করলেন।
এঁকে এঁকে নাচ শেষ হতেই শুরু হলো গানের পালা।
এইবার লামিয়া কে মঞ্চে ডাকা হলো।
লামিয়া গিটার হাতে নিয়ে মঞ্চে উঠে চেয়ারে বসে গিটার কোলে তুলে নিলো।
কায়সার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
লামিয়া গিটারের টুংটাং শব্দ তুলে
চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টি দিলো শুভ্রর দিকে। শুভ্র ও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
তা দেখে লামিয়া হেঁসে গান তুললো
~ চোরাবালি মন তোমার
কেনো শুধু লুকিয়ে থাকো?
একটু আড়াল হয়ে আমায় দেখো
যদি কোনো চিত্র আঁকি
পৃথিবীর সবচেয়ে দামি
সেই চিত্রতে তুমি Perfectly বসো
কেনো লাগে শূন্য শূন্য বলো
তোমায় ছাড়া এত ?
তুমি কি তা বলতে পারো ?
সবাই বেশ মুগ্ধ হয়ে গান শুনছে লামিয়ার। কায়সার কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
কিন্তু লামিয়ার সেদিকে খেয়াল নেই, সে গভীর দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে।
তাঁর দিকে এইভাবে তাকিয়ে আছে দেখে শুভ্রর বেশ চিন্তিত হলো, তবে বুঝতে দিলো না। সে ও এক দৃষ্টিতে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
অনেক্ষণ যাবত লামিয়ার দিকে তাকিয়ে লামিয়ার দৃষ্টি কার দিকে আছে সেটা পর্যবেক্ষণ করছে কায়সার। লামিয়ার দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই শুভ্রকে দেখতে পেলো কায়সার। শুভ্র লামিয়ার থেকে চোখ ঘুরিয়ে কায়সারের দিকে শীতল চোখে তাকাতেই কায়সার মনে মনে হাসলো। দুইজন দুইজনের দিকে
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হয়তো চোখে চোখে কোনো যুদ্ধ হচ্ছে।
গান শেষ হতেই কড় তালির শব্দে দুজনের দৃষ্টি দুজনের থেকে সরিয়ে হাঁসি মুখে তালি দিলো।
ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান শেষ হতে প্রায় সন্ধ্যা হলো।
সবাই প্লান করলো আজকে একটু ঘুরে কোনো রেস্টুরেন্টে থেকে খেয়ে একবারে বাসায় যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ, কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে রাতে খেয়ে একবারে বাসায় চলে গেলো সবাই।
বাসায় যেতে যেতে প্রায় রাত আটটা বাজলো। সবাই বেশ ক্লান্ত।
লামিয়া কাঁধে থেকে গিটারের ব্যাগ টেবিলে রেখে জামা নিয়ে চলে গেলো ফ্রেশ হতে।
ফ্রেশ হতে হতে তার কিছু মনে পড়তেই দ্রুত জামা পড়ে দৌড় দিলো আরিফের রুমে। সেখানে তাকে না পেয়ে দৌড়ে ছাদে পা রাখতেই দেখলো আরিফ ছাদের বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
– আছে দুঃখ-আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবুও আনন্দ,তবুও অনন্ত জাগে হৃদয়ে।
কারোর কন্ঠ শুনে আরিফ পিছন ফিরে তাকালো। লামিয়া কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মলিন হাসলো।
লামিয়া আস্তে ধীরে আরিফের পাশে যেয়ে বসতেই আরিফ বলে উঠলো
– এটা কার উক্তি??
– কেনো, জানো না তুমি?? এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।
– ওও হ্যাঁ ভুলেই গিয়েছিলাম তুই তো আবার রবীন্দ্রনাথের বিগ ফ্যান। বলেই লামিয়ার মাথায় গাট্টা মারলো।
– উফ ছোট্ট ভাই, সবসময় গাট্টা মারবা না ভালো লাগে না।
লামিয়ার কথায় আরিফ হালকা হাসলো। তারপর আবার আকাশে তাকালো।
লামিয়া ও আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো
– ছেলেরা কান্না করলে কী জাত যায় ছোট্ট ভাই?
আরিফ লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো
– এটা কেমন প্রশ্ন?
– এটা যেমন প্রশ্ন ই হোক, তুমি বলো আগে।
আরিফ আকাশে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো
– জাত যায় কী না জানি না কিন্তু ছেলেদের কাঁদতে নেই, তাঁরা যতোই কষ্ট পাক না কেনো তাঁরা কান্না করতে পারে না।
– তাহলে তোমার চোখে পানি কেনো?
আরিফ থমকে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টেনে হাঁসির চেষ্টা করে চোখ মুছে বললো
– কোথায় পানি, আসলে ঠান্ডা লেগেছে তাই।
– মেয়েটা কে ছোট্ট ভাই?
আরিফ অবাক দৃষ্টিতে তাকালো লামিয়ার দিকে।
লামিয়া আরিফের চোখের দিকে তাকালো। আরিফ মলিন হেঁসে বললো
– কোন মেয়ে?
– তুমি যাকে ভালো বাসো।
– এসব কি বলছিস? আমি আবার কা.. কাকে ভালোবাসবো?
– আয়না কে ভাইয়া?? বেশ শীতল কন্ঠে বললো লামিয়া।
আরিফ লামিয়ার দিকে তাকালো। বোনের দিকে তাকিয়ে আরিফ বুঝতে পারলো লামিয়া সব জানে তাই লুকানোর কিছু নেই। তাই ভাঙা গলায় বলতে শুরু করলো
– আয়না আমার ক্লাসমেট ছিলো। আস্তে আস্তে ভালো বন্ধুত্ব তারপর বন্ধুত্বের থেকে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। আমরা দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসি, আমাদের তিন বছরের রিলেশন। সব ভালো ছিলো কিন্তু কিছু দিন আগে ওর জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব আসে, ওকে জোড় করে পাত্র পক্ষের সামনে বসানো হয়। তাঁরা আয়নাকে প্রথম দেখায় পছন্দ করে ফেলে।
আয়না ওর বাবা মা কে সব বলে আমাদের রিলেশনের ব্যাপারে কিন্তু তাঁরা মানতে রাজি না কারণ এখনো আমি কোনো কাজ করি না, তাঁর উপর ওর বাবা পুলিশ
কোনো ভাবেই রাজি না তাঁরা। সেদিন আয়না ফোনে অনেক কান্না করছে। ও এই বিয়ে করতে চায় না।
আমি ওর বাবা মা কে অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু বুঝেনি, এমনকি বলেছিলাম মা বাবাকে দিয়ে প্রস্তাব নিয়ে যাবো,কিন্তু তাতে ও রাজি হয় নি। আজকে ওর গাঁয়ে হলুদ হচ্ছে কালকে রাতে বিয়ে। আমাকে একটু আগে ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করছে। আমি কী নিয়ে বাঁচবো রে লামিয়া, আমার যে সব শেষ হয়ে গেলো। আমি বাঁচতে পারবো না ওকে ছাড়া, আমি সত্যি বাঁচতে পারবো না। আর আয়না বলেছে ওও নাকি নিজের ক্ষতি করে দি….
আরিফ পুরো কথা আর শেষ করতে পারলো না ডুকরে কেঁদে উঠলো আরিফ।
লামিয়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আরিফের দিকে। যে ভায়ের চোখ দিয়ে কোনোদিন পানি ঝড়ে নি সেই ভাই আজ কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
– তুমি কী আয়না আপু কে চাও??
– হ্যাঁ চাই কিন্তু…
– কোনো কিন্তু না আমি আছি আমরা সবাই আছি। সোজা আঙুল ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতে হয়। তুলে নিয়ে আসবো দরকার পড়লে মেয়েকে।
আরিফ হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। আরিফ কিছু বলার আগেই ঠাস করে থাপ্পড় এসে পড়লো তার পিঠে। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো রাশেদ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তার পিছনেই তাঁর সব ভাই বোন দাড়িয়ে হাসছে।
আরিফ অবাক হয়ে তাকালো লামিয়ার দিকে। লামিয়া ফিক করে হেসে উঠলো।
রাশেদ আরিফের গলা জড়িয়ে ধরে বললো
– তুই অনেক স্বার্থপর হয়ে গেলি কীভাবে? আমাদের একবার ও বললি না কেনো?
পাশ থেকে হামিদা বলে উঠলো
– ছোট্ট ভাইয়া আমাদের কথা কী ছিলো?
আমরা সবার সুখ দুঃখ ভাগ করে নিবো, আর তুমি কি না একাই নিয়ে নিলে সব দুঃখ।
রাশেদ বললো
– লামিয়া না বললে জানতাম না এতো কিছু। ভাগ্যিস লামিয়া বলে ছিলো।
আরিফ লামিয়ার দিকে তাকালো। তা দেখে লামিয়া আরিফের চুল টেনে বললো
– এইভাবে তাকাবে না ছোট ভাই
রাশেদ আরিফের দিকে তাকিয়ে বললো
– পছন্দ হয়েছে ভালো কথা আমাদের তো বলতে পারতি আমরা কোনো না কোনো ব্যবস্থা করতাম।
আরিফ মাথা নিচু করে বসে আছে।
তা দেখে রাশেদ আবারো বললো
– শুধু হলুদ হয়েছে বিয়ে হয়নি এখনো বিয়ে বাকি। আমরা প্লান করে রেখেছি চিন্তা করিস না। মেয়েকে বিয়ের আসর থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসবো।
– কিন্তু..বাবা?
– কোনো চিন্তা নেই, আমি সামলে নিবো। ইসলাম বাড়ির ছেলে যাকে ভালোবাসে তাকেই বিয়ে করবে। এইবার না হয় ইসলাম বাড়ির চার বিচ্ছুর সাথে আমরা ও বিচ্ছু হলাম, কী বলিস??
পাশ থেকে মাহির, তায়েব, তায়েবা,লামিয়া, লামহা, হামিদা এক সাথে বলে উঠলো – ঠিক ঠিক।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ২৭
বিপদের সময় ভাই বোনদের পাশে পেয়ে আরিফ রাশেদকে জড়িয়ে ধরলো। রাশেদ হেঁসে এক হাত দিয়ে আরিফ কে সামলে আরেক হাত বাড়িয়ে দিতেই, মাহির, তায়েব, তায়েবা, লামিয়া, লামহা, হামিদা সব ঝাঁপিয়ে পড়লো। তা দেখে সবাই এক সাথে হেঁসে উঠলো। পাশে দাঁড়িয়ে শুভ্র তাদের দেখে নিজে ও হেঁসে উঠলো।
ভাই বোনদের এমন ভালোবাসা দেখে শুভ্র ফোন বের করে ছবি তুলে নিলো।
ভাই বোনরা যতোই বিচ্ছু থাকুক না কেনো, বিপদের সময় সবসময় ঢাল হয়ে দাঁড়ায় একজন আরেকজনের পাশে।
