Home প্রেমসুধা প্রেমসুধা পর্ব ৩৮

প্রেমসুধা পর্ব ৩৮

প্রেমসুধা পর্ব ৩৮
সাইয়্যারা খান

মাথামুন্ডু সবই আপাতত খারাপ হয়ে আছে পৌষ’র। রাগে, দুঃখে কান্না পায় ওর কিন্তু কাঁদে না। তৌসিফ’কে এত করে বলছে ও থাকবে আজ কিন্তু এই মহা লোক মানতে নারাজ, পৌষও আর মানাতে নারাজ। কতক্ষণ তুলুতুলু করবে আর? মানুষের বিবেক থাকা উচিত। এতদিন পর বাবার বাড়ী এসেছে থাকাটা মাস্ট কিন্তু হায় কপাল! এই কপালে জুটেছে তালুকদার বাড়ীর ছোট ছেলে। কপালটাকে মাঝেমধ্যে মন চায় সুপ্রসন্ন ভেবে নিজেই চুমু দিতে আবার মাঝেমধ্যে মন চায় ঝামা দিয়ে ঘঁষে পরিষ্কার করতে। কি এক কান্ড! শা*লার কপালটাই খারাপ। দেখেদুখে এক জামাই জুটেছে। তৌসিফ বউকে দেখছে অনেকক্ষণ যাবৎ। বউটা যেতে রাজি না কিন্তু যেতে তো হবেই। কাল সোহা’র পাঠ চুকাবে তৌসিফ। সংসারে তার শান্তি চাই ই চাই। বউ তার ভালো মন্দ বুঝে। ভলো একটা সুযোগ বুঝেই বাচ্চাকাচ্চা চাইবে তৌসিফ। যদি বউ রাজি হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা আর যদি এখন পড়তে চায়, বাচ্চা পরে চায় তাহলে নাহয় একটু ধৈর্য ধারণ করবে তৌসিফ। জীবনে সে কমতো ধৈর্য ধরলো না। বাবা হওয়ার স্বাদটা নাহয় আর কিছু বছর পরই পেলো। ভাবনার জগৎ থেকে বের হলো তৌসিফ। দরদ মাখা কণ্ঠে বললো,

— এখন রুমে আছো যে? রাতেই চলে যাব হানি। ভাই-বোনদের সময় দাও এখন।
— আমি যাব না।
কাঠকাঠ একবাক্যে পৌষ’র। তৌসিফ খাটে হেলান দিয়ে বসা। ওভাবে থেকেই স্বাভাবিক ভাবে বললো,
— ইটস ইম্পরট্যান্ট হানি। ট্রাই টু…..
— না না না। আমি কিছুই বুঝব না। যাব না মানে না।
এই দফায় তৌসিফ উঠলো। বউ তার এত জেদী হয়েছে। এসে ধরার আগেই ছ্যাঁত করে উঠে পৌষ। তৌসিফ’কে ছুঁতেও দিলো না। ব্যপারটা একজন পুরুষের জন্য গায়ে লাগার মতো হলো তারমধ্যে সামনের জন স্বয়ং তৌসিফ তালুকদার। দাঁত চেপে অপমানটুকু গিলে নিলো তৌসিফ যা সে বিয়ের প্রথম দিন থেকে গিলছে। একটা টু শব্দ না করে গিলছে সে। শুধু মাত্র পৌষ’র জন্য। প্রথম হয়তো ভালোবাসা ছিলো না কিন্তু এখন? এখন তো তৌসিফ জান হারায় এই পৌষ’র মাঝে। তার রাগ, জেদ সবটা শিরোধার্য। তৌসিফ পৌষ’র হাতটা জোর করে ধরে নরম স্বরে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে হানি। আমরা আবার আসব। বলছি না আমি? তোতাপাখি আমার না তুমি?
ঝটাক মে’রে হাত সরালো পৌষ। চোখ দুটো তুলে রাগী দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে বললো,
— আপনার বিবেকও বাঁধে না এমন আচরণ করতে? বিয়ের ঠিক কয়মাস পর আনলেন এখানে? আপনিই বলুন। আর সারপ্রাইজ? নিশ্চিত কোন নাইটি ধরিয়ে দিবেন আমার হাতে…….
রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে কথাগুলো বলতে নিলেই স্ব জোড়ে এক ধমক খেলো পৌষ,
— অ্যাই চুপ!
আচমকা তৌসিফে’র গলার সুর বদলালো। পৌষ বড়বড় চোখে তাকিয়ে তখনও। তৌসিফ পুণরায় ধমক দিলো,
— চোখ নিচে নামাও!

ভয়ে মিহিয়ে গেলো পৌষ। এই মানুষটার রাগ সে ভয় পায় তাই যথেষ্ট সমীহ করে চলে। তৌসিফের তোপের মুখে বার কয়েক পরেছিলো পৌষ। ভয়ে তার বুকটা এখনও ধুকধুক করছে। মাথাটা নামিয়ে গুটিয়ে গেলো একদম। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো কান্না আটকাতে। কিন্তু সেই কপাল বুঝি আছে তার? চোখ দুটো বেইমানি করে বসলো। পানির ধারা গড়িয়ে পরলো। তৌফিক’কে মন, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে ও। তৌসিফ ছাড়া যে ওর গতি নেই তা খুব ভালো করেই জানা পৌষ’র। নিজেকে খুব সাবধানে তৌসিফে’র হাতে সপেছে পৌষ। তৌসিফ অবশ্য মান রাখে। যত্নে আগলে রাখে। পুরুষ মানুষ রাগ থাকাটাই স্বাভাবিক। এখনকার বেয়াদবির ফলে ধমকটাও প্রাপ্ত তার। পৌষ জানে এটা কিন্তু ঐ যে ভয়। তৌসিফে’র ভয় তার আজও কাটে নি।

তৌসিফ তাকিয়ে পৌষ’র পানে। ওর থেকে বেশি না দুই হাত দূরে বসা। চোখে মুখে ভয় তার। কিছুটা আতঙ্ক। তৌসিফ ধমকটা শুধু শুধু দেয় নি। তার বিশ্বাস সম্পর্কে সম্মান জিনিসটা দরকার। একটু বেশিই দরকার। পৌষ’কেও সম্মান করে তৌসিফ। স্বামী হিসেবে হোক বা বয়সের হিসেবে তৌসিফ বড় সেই সুবাদে এহেন উচ্চবাক্য বেয়াদব বৈ কিছুই না। মাঝেমধ্যে অবশ্য তৌসিফের নিজের উপর ই রাগ হয়। বিয়ের পরপরই পৌষ’র সাথে একদিন জঘন্য এক কাজ করেছিলো সে। সেই থেকে হয়তো মেয়েটা ভয় পায় বেশি। রাগ উঠলে তার মাথা ঠিক থাকে না। তবে হ্যাঁ, এতটুকু ভয় কিন্তু সম্পর্কের সৌন্দর্য। এতটুকু ভয় প্রতিটা দাম্পত্য জীবনে দরকার। এটা সম্পর্কের মাধুর্য ধরে রাখে। একটা ব্যালেন্স হয়।

চাইলেই এখন বউকে বুঝিয়ে মানিয়ে নিতে সক্ষম তৌসিফ তবে নিজের পায়ে কুড়াল মা’রার পাবলিক তৌসিফ না। গটগট পায়ে রুম ত্যাগ করলো ও। পৌষ নাক টানলো। মানুষটা কি বেশিই রেগে গেলো? পৌষ কি করবে? ওর যে মুখটা বেশিই চলে একটু। এত বছরের তৈরী করা মুখ চাইলেই কি কম চালানো যায়? সে তো জানে তার তোতাপাখি মন থেকে বলে নি তবুও রাগ কমলো না? নিজেকে অপরাধী ভাবলো পৌষ। মনটা বেজার হলো নিমিষেই। চোখের পানি মুছতেই দেখলো পিহা ঢুকছে। হাসি মুখে আপা’কে দেখেই বললো,
— বাইরে এসো আপা। নাস্তার জন্য ডাকে।
— তোর দুলাভাই কি চলে গেল?
— কই যাবে? দুলাভাই তো চৈত্র ভাইয়ের সাথে বসা। আমরা সবাই আছি। মা পিঠা বানিয়েছে। আসো তুমি।
পৌষ’র বুকটা একটু হলেও শান্ত হলো। ও তো ভাবলো রাগে বুঝি জামাই তার ফুড়ুৎ হয়ে গেলো। সুন্দর মুখো এক জামাই। জ্বালা সব পৌষ’র৷ ভয়ই লাগে। কখন না উঁড়ে যায়। হায়! সে যে কি জ্বালা তা নারী মন বৈ কেউ বুঝবে না। জামাই আগলে রাখাও এক তপস্যার বিষয় যা রোজ করে বেড়াচ্ছে পৌষরাত হক তালুকদার।

মাগরিবের আজান দিলো মাত্র। চোখে, মুখে পানি দিয়ে রুম ত্যাগ করলো পৌষ। চোখ দুটো ভালো করে মুছে নিলো যাতে কেউ বুঝতে না পারে। সবসময় অল্পতে বাড়ী মাথায় তোলা পৌষ এখন কান্না লুকাতে জানে। কেউ বুঝলেই জিজ্ঞেস করবে চোখ ফুলার কারণ তখন পৌষ কিভাবে উত্তর দিবে? হাতে নিজের পার্সটা নিয়েই বের হলো। ড্রয়িং রুমে দুমসে আড্ডা চলছে। সবাই বেশ খোশমেজাজে আছে। পৌষ’র বুকটা ফেটে কান্না পায়। সে থাকতে চায় কিছুদিন কিন্তু তৌসিফ মানবে না। একেতো থাকা হবে না তার উপর তৌসিফ উল্টো রেগে গেলো। নাক টেনে উপস্থিত হলো পৌষ। জৈষ্ঠ্য বোনকে দেখেই বলে উঠলো,

— আপা এখানে বসো। দেখো তোমার না ডিম পিঠা পছন্দ।
পছন্দের ডিম পিঠাটাও আজ ওর খেতে মন টানলো না। মনটা তার কাছে আজকাল থাকেই না। তৌসিফ তালুকদার চুরি করেছে সেটা। ব্যাটা পাক্কা চোর একটা। ইনি, মিনি তৌসিফে’র পাশে বসা। তৌসিফ ছিত পিঠায় হাঁসের মাংস দিয়ে শালী দুটোর মুখে দিলো। মিনি আপাকে ডাকলো,
— আপা আপা আথো না।
ইনিও তাল মিলিয়ে ডাকলো। তৌসিফে’র পাশে বসার সাহস পৌষ’র নেই। সবার সামনে যদি তার রাগ প্রকাশ করে বসে তখন?
হেমন্ত হঠাৎ খেয়াল করলো পৌষ’র হাতে ব্যাগ। কপাল কুঁচকে তাকালো ও। জিজ্ঞেস করলো বোনকে,
— কোথাও বের হচ্ছিস?
মাথা নাড়ে পৌষ। হালকা শব্দে বলে,
— চলে যাচ্ছি হেমু ভাই।

এক সাথে অনেকগুলো চোখ তাকালো ওর পানে। তৌসিফ ও তাকালো। মুখে তার বক্র এক হাসির রেখা। ও জানতো এটাই হবে। পৌষ’কে এখান থেকে নেয়া যতটা সহজ ঠিক ততটাই কঠিন। তখন যদি বউকে ভয় ভাঙাতে বুকে আগলে নিতো তাহলেই এক লাফে তৌসিফে’র মাথায় চড়ে বসতো সে তাই তো তখন রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে এলো। এখন বউ উল্টো নিজে রাজি। হেমন্ত কিছুটা ধমকের গলায় বললো,
— ফাইজলামি করিস? যা ঘরে ব্যগ রেখে আয়। পিহু সোনা তোর আপা’র ব্যাগ রেখে আয় তো।
পিহা দৌড়ে এগিয়ে এলো। ব্যাগ নিয়ে টানাটানি করলেও পৌষ দিলো না। পৌষ থমকানো গলায় বললো,
— আবার আসব। আজ যাই। কাজ আছে একটু।
শ্রেয়া তৌসিফে’র দিকে তাকালো। বুঝার চেষ্টা করলো অতঃপর জিজ্ঞেস করলো,

— তুই না বললি থাকবি?
— কাজ আছে ভাবী নাহয় থাকতাম।
তৌসিফ পিঠা মুখে দিলো। ইনি, মিনি খাবে না আর। টেবিল ভর্তি হরেক রকমের পিঠা। বড় চাচা উঠে এলেন। পৌষ’র মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
— কিছু নিয়ে রেগে আছিস আম্মা? থেকে যা না আজ।
চোখ দুটো টলমল করে উঠলো হঠাৎ। বড় চাচার অনুরোধ ভালো লাগলো না ওর। চাচার হাত ধরে পৌষ নরম স্বরে বললো,
— আবার আসব তো।
— বেশি জরুরি?
— হু।

চৈত্র এসে আপার বাহু জড়িয়ে ধরলো। জৈষ্ঠ্য গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে রইলো পাশে। পিহা নাক, মুখ লাল করে ফেললো। ইনি, মিনি বুঝলো কিছু হয়েছে। নেমে আপার কাছে এসেই হাঁটু জড়িয়ে ধরলো দুটো। তোতলানো শব্দে বললো,
— আপা? আপা, কি হয়েতে?
চাচিরা তৌসিফে’র মাথায় হাত রাখতে সঙ্কোচ করলেন। মুখেই বললেন,
— বাবা যদি আজ….
তৌসিফ সাধু রইলো বটে। বললো,
— পৌষরাত থাকলে আমার সমস্যা নেই।
পৌষ’র বুক ফেটে কান্না পেলো। পৌষ থাকলে নাকি ব্যাটার সমস্যা নেই। কেন নেই? থাকতে হবে সমস্যা। একশত বার থাকতে হবে।বউ থাকতে তুই ব্যাটা কেন বউ ছাড়া থাকবি?

প্রেমসুধা পর্ব ৩৭

হতাশ চাচিরা দ্রুত হাতে খাবার প্যাক করলো। তৌসিফ যা যা পিঠা পছন্দ করেছে সব দিলো সাথে। ফোন আসাতে তৌসিফ বিদায় জানিয়ে বের হলো। ও বের হতেই পৌষ ছাড়াতে চাইলো ভাই বোনদের কিন্তু হায় তা বুঝি হয়? কান্নার রোল পরে গেলো মুহুর্তেই। পৌষ শক্ত হাতে সামলালো কিন্তু সম্ভব হলো না। হঠাৎ ই তৌসিফ ফিরে এলো। পৌষ ভেবেছিলো লোকটা ফিরবে না ভেতরে। তৌসিফ এসেই ইনি, মিনিকে কোলে তুললো। আল্লাহ মালুম সে কি বুঝালো তারা থামলো। তৌসিফের দুই গালে দুটো চুমু দিয়ে আদর লাগিয়ে বললো,
— দুলাভাই থাতো না পিলিত।

প্রেমসুধা পর্ব ৩৯