বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৯ (২)
রানী আমিনা
“তুমি আগেও দেমিয়ান ছিলে, এখনো দেমিয়ান, ভবিষ্যতেও থাকবে।”
“সেটা ব্লাডে, কাগজে কলমে তো আর নই!”
“কাগজে কলমেও।”
মীরের উত্তরে আনাবিয়া ভ্রুতে ভাজ ফেলে সন্দিহান চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে। মহলের প্রায় নিকটে চলে এসেছে ওরা, বৈদ্যুতিক বাতির সফেদ আলো গাছপালার ফাঁক ফোকড় দিয়ে বিচ্ছুরিত হয়ে চোখে লাগছে আনাবিয়ার৷ মীরের গলা আকড়ে ধরা হাতের বন্ধনী আচমকা আলগা হলো কিঞ্চিৎ। ভ্রু কুচকে চেয়ে সে জিজ্ঞেস করলো,
“কাগজে কলমেও মানে কি?”
মীর ওর ঝলমলে চোখে তাকালো একবার, চোখ ফিরিয়ে কর্দমাক্ত মাটিতে সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে বলে উঠলো,
“তোমার থেকে দেমিয়ান পদবী কখনোই নেওয়া হয়নি।”
“তবে ওই পেপার্সগুলো….!”
দ্বিধান্বিত, সন্দিহান স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে গলা খাকারি দিয়ে উত্তর দিল,
“ওগুলো ফেক ছিলো।”
আনাবিয়া ক্ষণিক স্তব্ধ চোখে চেয়ে রইলো মীরের দিকে, অবিশ্বাস্য, ধীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ফেক…ছিল?”
মীর দৃষ্টি লুকিয়ে উত্তর করলো,
“হ্যাঁ।”
“তার মানে… আমি কখনোই পদবী ত্যাগ করিনি? কখনো দেমিয়ান থেকে কমোনার হইনি?”
“না।”
আনাবিয়া হাত সরিয়ে নিলো মীরের গলা থেকে। দ্বিধা জড়ানো অস্থির স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“তাহলে আমার বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা করতে আমাকে যে ছয় মাস অপেক্ষা করতে হতো? কেন? তুমি যদি আমাকে পদবী ত্যাগ করতে না-ই দিবে তবে আমার বাচ্চাদের থেকে আমাকে কেন দূর সরিয়েছিলে?”
মীর চুপ রইলো ক্ষণিক, তারপর গলা খাকারি দিয়ে উত্তর দিল,
“পদবী ত্যাগের ব্যাপারটা তোমাকে বিশ্বাস করানোর জন্য।তখন তুমি রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে, রিয়্যেলিটির চাইতে তোমার আবেগকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলে।ভেবেছিলে রাজপরিবার থেকে বেরিয়ে গেলে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু আমি জানতাম তুমি পরে অনুতপ্ত হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আফসোস করবে৷ কারণ কেউ একবার দেমিয়ান পদবী ত্যাগ করলে আর কখনোই তা ফেরত পায়না, এটাই রুলস।”
“তাই আমার হয়ে তুমি সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে? এভাবে মিথ্যায় রাখলে আমাকে এত গুলো বছর!”
“আমি তোমাকে, তোমার ডিগনিটিকে প্রোটেক্ট করতে চেয়েছিলাম। কারণ আজ না হলেও আগামী দিন তুমি তোমার পরিবারকে ফিরে পেতে চাইতে, পরিবারের সাথে থাকতে চাইতে। তখন যেন তোমার দিকে কেউ আঙুল তুলতে না পারে, তার ব্যাবস্থাই আমি করতে চেয়েছিলাম।”
“আর তাই আমাকে মিথ্যায় ভুলিয়ে, মিথ্যা পেপার্স দেখিয়ে আমাকে বিশ্বাস করালে, আমার থেকে আমার বাচ্চা গুলোকে ছিনিয়ে নিলে!”
মীর ক্ষণিক চুপ থেকে উত্তর করলো,
“তুমি তখন নিজের ভেতরে ছিলেনা, শিনজো! তুমি তোমার জেদকে বড় করে দেখছিলে সবকিছুর থেকে। তখন তোমাকে বাধা দিলে তুমি আরও ভায়োলেন্ট হয়ে যেতে, তাই… আমি বাধ্য হয়ে তোমার সব শর্ত মেনে নিয়েছিলাম। তুমি ফ্রিডম চেয়েছিলে, যথেষ্ট ফ্রিডম দিয়েছি তোমাকে। তোমার কোনো কাজে আমি ইন্টারফেয়ার করিনি, তোমার সামনেও আসিনি। আর পদবীর ব্যাপারটা… তুমি যদি কখনো একটিবারও নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে আফসোস করতে তবে আমি তোমাকে জানিয়ে দিতাম দেমিয়ান প্রাসাদের দরজা তোমার জন্য সবসময় খোলা। তুমি নির্দ্বিধায় ফিরে আসতে পারতে।”
“ওরা জানে?”
জিজ্ঞেস করলো আনাবিয়া, মীর ওর দিকে তাকালে আবার জিজ্ঞেস করলো,
“আমার বাচ্চারা জানে এ ব্যাপারে? ওরা জানে যে তুমি এতদিন ইচ্ছাকৃত আমাকে দূরে রেখেছো ওদের থেকে? জানে ওরা?”
“না।”
আনাবিয়া কথা বললনা ক্ষণিক, স্তব্দ চোখে চেয়ে রইলো মীরের মুখের দিকে। মীর শঙ্কিত দৃষ্টিতে বার বার তাকাতে রইলো ওর স্থীর চোখ জোড়ায়। এক পর্যায়ে বলে উঠলো,
“শিনজো, আমি চাইনি তুমি কখনো আফসোস ক্—”
“চুপ করো!”
গর্জে বলে উঠলো আনাবিয়া! পরক্ষণেই মীরের কোল থেকে একপ্রকার যুদ্ধ করে নেমে গেলো মাটিতে। বৃষ্টি তখনো পড়ে চলেছে টুপটাপ। আনাবিয়া নেমেই দুহাতের সজোর ধাক্কায় মীরকে সরিয়ে দিলো নিজের থেকে।
“তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাই না?”
কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করলো আনাবিয়া। মীর ওর স্থীর, দৃঢ়, জলসিক্ত দৃষ্টিতে চেয়ে মৃদুস্বরে উত্তর করলো,
“হ্যাঁ, অনেক অনেক ভালোবাসি।”
আনা শক্তহাতে চোখের পানি মুছে বলল,
“এতই যখন ভালোবাসো তবে কীভাবে বুঝতে পারলে না যে আমার সন্তানদের থেকে আমাকে দূরে রাখলে আমি মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করবো? এমন নিকৃষ্ট ভালোবাসাই কি আমি তোমার কাছে চেয়েছিলাম!”
মীর উত্তর করলোনা, নিশ্চুপ চেয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে। আনাবিয়া ওর দিকে চেয়ে তিক্ত স্বরে বলে উঠলো,
“সতেরোটা বছর! বিগত সতেরোটা বছর আমি কি ছিলাম, মীর? তোমার স্ত্রী? তোমার সন্তানদের মা? নাকি একজন অপরাধী যে কিনা নিজের জেদ বজায় রাখতে নিজের গর্ভজাত সন্তানদের ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল?”
“শিনজ্—”
“না! একদম ওইনামে ডাকবেনা আমাকে! আজ আমাকে বলতে দাও!”
মীর থেমে গেল সাথে সাথেই। আনাবিয়া স্থীর কঠিন চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে, বলে উঠলো,
“এতগুলো দিন ধরে আমি ভেবে এসেছি আমি একটা খারাপ মা! প্রতিবার ওদের জন্মদিন এলে আমার মুখে খানার উঠতো না! আমি নিজেকে বোঝাতাম, এটা আমার নিজের সিদ্ধান্তের ফল, আমার দোষে আমি আমার সন্তানদের হারিয়েছি! আরসালান যখন চোখে পানি নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করত, আমি কেন ওদের সঙ্গে থাকতে পারি না….. আমি উত্তর খুঁজে পেতাম না! আমি ভেবেছিলাম আমি নিজের হাতে…. নিজের কৃতকর্ম, নিজের জেদের কারণে আমার বাচ্চাগুলোর ঘৃণার পাত্র হয়েছি…!”
গলা কেঁপে উঠল আনাবিয়ার! ছলছল চোখে সে মীরের চোখে চেয়ে বলে উঠলো,
“কিন্তু আমি জানতাম না…আমি জানতাম না যে তুমি নিজেই, স্বেচ্ছায়, ঠান্ডা মাথার সুনিপুণ পরিকল্পনায় আমার হাতজোড়া বেঁধে রেখেছিলে।”
মীর স্থীর দাঁড়য়েছিলো, গলা আঁটকে আসতে চাইলো তার। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শান্ত স্বরে বলল,
“আমি তোমাকে কখনো হারাতে চাইনি। চাইনি তুমি তোমার নিজের সিদ্ধান্তে পরিবার ছাড়া হয়ে একাকী জীবন যাপন করো। চাইনি, কখনো তুমি নিজের সিদ্ধান্তের কারণে অনুশোচনায় ভুগো… কখনো তোমার মনে হোক তুমি আর একজন দেমিয়ান নও, কখনো সন্তানদের কাছে ফিরতে চাইলে যেন কেউ তোমাকে বলতে না পারে তুমি দেমিয়ান নও। আমি সারাজীবন এই পৃথিবীতে থাকবনা, শিনজো! তাই আমি চলে যাওয়ার পর যেন তোমার জীবনটা কঠিন না হয়ে যায়!”
আনাবিয়ার চোখ জোড়া ভর্তি হলো লোনা জলে, বিকৃত স্বরে বলল,
“আর তাই তুমি আমাকে আমার সন্তানদের থেকে দূর করে দিলে? স্বেচ্ছায় ওদেরকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিলে? একটাবারও জানানোর প্রয়োজন মনে করলেনা? একটাবারও তোমার মনে হলোনা যে তুমি অন্যায় করছো, একজন মায়ের সাথে, তার সন্তানদের সাথে!”
মীর উত্তর দিল না কোনো। নিশ্চুপে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার ঘৃণাভরা চাহনির দিকে। অকস্মাৎ মস্তিষ্কের শিরা উপশিরা গুলো যেন কোন এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় একটু একটু করে নিমজ্জিত হতে রইলো তার। আনাবিয়া বিতৃষ্ণা নিয়ে বলে উঠলো,
“সতেরোটা বছর, মীর! আমি আমার সন্তানদের বড় হতে দেখতে পারিনি, আমি ওদের শৈশবের দিনগুলো উপভোগ করতে পারিনি, আমি জানতে পারিনি ওরা প্রথম কবে নিজের হাতে খাওয়া শিখেছিলো, কবে প্রথমবার পড়ে গিয়ে মা মা বলে ডেকে উঠেছিল, কবে ওদের হাতেখড়ি হয়েছিলো, কবে দুধ দাঁত গুলো পড়তে শুরু করেছিলো, কবে আমাকে মনে করে ওদের মন খারাপ হয়েছিলো!”
আনাবিয়ার গলা উঁচু হলো আরও, তিক্ততা মিশিয়ে সে বলে উঠলো,
“ওদের জ্বর হলে আমি একটু ওদের তপ্ত কপালে হাত রাখতে পারিনি, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ভয়ে পেয়ে ঘুম ভাঙলে বুকে টেনে নিতে পারিনি, ছুটতে গিয়ে পড়ে গেলে তুলে স্বান্তনা দিতে পারিনি, কখনো কষ্ট পেলে আদর করতে পারিনি! আর তুমি…….! তুমি সব জেনেও, সব করেও তুমি…… তুমি আমাকে কিচ্ছুটি কখনো জানাওনি!”
মীর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, অসহায় দৃষ্টি দিল আনাবিয়ার মুখপরে। মৃদু স্বরে বলে উঠলো,
“তুমিই চেয়েছিলে আমি তোমার সাথে কখনো কোনো যোগাযোগ না করি, তোমার সামনে না আসি!”
“হ্যাঁ তো? আর কি কোনো মাধ্যম ছিলনা? তুমি জানতে আমি ওদের মা। তুমি জানতে ওরা আমার সন্তান। তুমি জানতে আমি ওদের জন্য পাগল হয়ে যাই। তারপরও তুমি আমাকে ওদের থেকে দূরে রেখেছো, ইচ্ছাকৃত! কী করে পারলে?”
মীরের ঠোঁট নড়ল, অস্ফুটে বলে উঠলো,
“শিনজো আমি—”
“তুমি কী? এখন তুমি কি বলবে? তুমি আমার ভালোর জন্য করেছো? তুমি আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসো, এইতো?”
প্রশ্নটি করে উত্তরের অপেক্ষায় ক্ষণিক শিকারি চোখে চেয়ে রইলো সে মীরের দিকে, পরক্ষণেই তিক্ত হেসে বলে উঠল,
“এটাকে ভালোবাসা বলে না, মীর! ভালোবাসার নামে এমন নোংরা কাজ কেউ করতে পারে না, মীর! নাকি তুমি এসব করেছো আমার অবাধ্যতার জন্য ইনডিরেক্টলি শাস্তি দিতে? সত্যিই কি শাস্তি দিতে চাইছিলে আমাকে? আমার নাড়িছেঁড়া সন্তানদের থেকে দূরে রেখে আমাকে কষ্ট দিয়ে মারতে চাইছিলে?”
আনাবিয়ার চোখ জোড়া জ্বলে উঠলো, লোনা পানি জমলো চোখের কোণে, মীরের দিকে কঠিন চাহনি দিয়ে বলল,
“যদি আমাকে শাস্তি দিয়েও থাকো তবে সেটা কিসের জন্য? ঠিক কোন কারণে? তোমাকে ভালোবাসার অপরাধে? তোমার স্ত্রী হওয়ার অপরাধে? নাকি শুধু এই জন্য যে আমি তোমার অবাধ্য হয়েছি, তোমার মনের মত চলতে পারিনি?”
মীর চোখ নামিয়ে ফেলল, অস্ফুটে বলল,
“আমি কসম করে বলছি এ ধরণের কোনো ইনটেনশন—”
“আরে আমি যদি তোমার কাছে অপরাধীই হতাম তবে আমাকে বন্দী করতে, নির্বাসনে পাঠাতে! মারতে, কাটতে, যা ইচ্ছা করতে! কিন্তু আমার সন্তানদের কেন? ওদের কী অপরাধ ছিল? বলো আমাকে!”
মীর কোনো উত্তর দিল না ওর প্রশ্নের, এগিয়ে এসে ওকে আগলে নিতে চেয়ে বলে উঠলো,
“ভিজে যাচ্ছো, শিনজো। এসব কথা মহলে ফিরেও বলা যাবে। এখানে বৃষ্টির ভেতর ঝগড়া কোরো না, প্লিজ!”
“কোথাও যাব না আমি! আমি না হয় তোমার কাছে খুব খারাপ, তোমার অবাধ্য, অকৃতজ্ঞ! কিন্তু ওরা কী অপরাধ করেছিল যে ওদের মা থাকা সত্ত্বেও মা-হীন করে বড় করলে? কী অপরাধ করেছিল আমার বাচ্চারা?”
মীর হাত ধরতে গেলো ওর, কিন্তু আনাবিয়া এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো ওকে। তিরিক্ষি স্বরে বলে উঠলো,
“তুমি আমার থেকে আমার সন্তানদের জীবনের সতেরোটা বছর চুরি করেছো! ওদের শৈশব চুরি করেছো! ওদের মা হওয়ার অধিকার চুরি করেছো! এমনকি আমাকে মা হওয়ার অনুমতিটুকুও নিজের হাতে মেপে মেপে দিয়েছো।”
মীর শান্ত চোখে দেখলো ওকে ক্ষণিক, কিন্তু শান্ত দৃষ্টির আড়ালে থাকা মস্তিষ্কের ভেতর তখন তুমুল বেগে, শিরায় শিরায় বয়ে যেতে রইলো যন্ত্রণা! রক্ত যেন ফুটতে রইলো ওর মস্তকের প্রতিটা নিউরনে! কিন্তু সে তীব্র যন্ত্রণার ছাপ সে ফুটতে দিলনা চোখে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে মৃদুস্বরে বলে উঠলো,
“তোমার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই কাজটা আমি করিনি। আমি তোমাকে ধোঁকা দিতে চাইনি, ধোঁকা থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছি, তোমার ফিউচার সিকিউর করতে চেয়েছি। তুমি বিশ্বাস করো আর না করো, এটাই ধ্রুব সত্য!ভেবেছিলাম একদিন তুমি আমাকে বুঝবে, বুঝবে আমার সকল কাজের পেছনের কারণ!”
আনাবিয়া তাকিয়ে রইল তার দিকে, হতাশা মিশ্রিত স্বরে বললো,
“আমি তোমাকে বুঝতাম, মীর! আর সমস্যাটা এখানেই! আমি তোমাকে এতটাই বুঝতাম, এতটাই বিশ্বাস করতাম যে তুমি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো —এই বিশ্বাসটা আমি কখনো হারাইনি! কখনো চরম হতাশা গ্রাস করলেও আমি নিজেকে সবসময় বিশ্বাস করিয়েছি, এ পৃথিবীতে কেউ না হলেও তুমি আমার আছো! তাই যখন আমার বাচ্চারা আমাকে ছাড়াই বড় হয়েছে তখন আমি তোমাকে এক ফোটাও ঘৃণা করিনি। বরঙ আমি ঘৃণা করেছি নিজেকেই! যে কেন সেদিন আমি জেদের বসে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার সন্তানদের হারিয়েছি! কিন্তু আজ জানতে পেলাম আমার এত বছরের দোষারোপ, আত্মগ্লানি আমার কখনো প্রাপ্যই ছিল না!”
আনাবিয়া বিক্ষুব্ধ চোখে চেয়ে রইলো মীরের স্বর্ণাভ, প্রচন্ড শান্ত চোখের দিকে৷ ওকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে না দেখে যেন আরও ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো সে, ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলো,
“কিছু বলছোনা কেন? নাকি সব এক্সকিউজ শেষ হয়ে গেছে? তুমি সারাজীবন ভেবেছো আমার জীবনটা তুমি আমার চেয়ে ভালো বোঝো। তুমি অলওয়েজ সিদ্ধান্ত নিয়েছো আমি কী চাইবো, আর কি পাবো! সিদ্ধান্ত নিয়েছো আমার জন্য কোনটা ভালো হবে, আমার সন্তানদের জন্য কোনটা ভালো হবে, সিদ্ধান্ত নিয়েছো আমি কাকে দেখতে পাব, কখন দেখতে পাব, আর ঠিক কতক্ষণের জন্য একজন মা হতে পারব!”
ক্ষণিক থেমে সে আবার বলল,
“তুমি সারাজীবন বলেছো আমাকে ভালোবাসো, আমাকে হারাতে চাওনা, যা করেছো আমার ভালোর জন্য করেছো! কিন্তু তুমি কখনো এটা বুঝতে পারোনি যে কাউকে ভালোবাসা আর তার জীবনটা নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করা, নিজের হাতের আঙুলে নাচানো এক জিনিস নয়!”
মীরের শরীর যেন অসাঁড় হয়ে আসতে রইলো, আনাবিয়ার কথা গুলো যেন সূচ হয়ে বিঁধতে রইলো ওর মস্তিষ্কের প্রতিটি পরতে! আচমকা কিছু বলতে চেয়েও রোধ হয়ে এলো কন্ঠ, শত চেষ্টাতেও গলা থেকে যেন শব্দ বের করতে পারলোনা এতটুকু! চোখ ভরা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে সে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার ক্রুদ্ধ মুখপানে। কিন্তু আনাবিয়া ওর চোখের যন্ত্রণা দেখতে ব্যর্থ হলো সম্পুর্ন, দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বলে উঠলো,
“আমি তোমার ওপর রাগ করিনি এতদিন, সবকিছুর জন্য আমি নিজেকেই দ্বায়ী করে গেছি, নিজের ওপর রেগেছি, নিজেকে কষ্ট দিয়েছি! সবসময় তোমাকে, তোমার ভালোবাসাকে, সম্মান করে গেছি! কিন্তু আজ প্রথমবার… প্রথমবার তোমাকে ভালোবাসার জন্য নিজেকে নিজের কাছেই অপরাধী লাগছে! তুমি চাইলেই পারতে আমাকে সত্যিটা জানাতে, সত্যিটা না জানালেও অন্তত আমার সন্তানদেরকে আমার কাছাকাছি রাখতে পারতে! কিন্তু তুমি তা করোনি! কিভাবে পারলে তুমি? ঘৃণা হচ্ছে আজ আমার নিজের ওপর! যে তোমাকে আমি আমার সব ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিলাম!”
শেষোক্ত কথাটা বলতেই আচমকা চক্কর দিয়ে উঠলো আনাবিয়ার মাথার ভেতর। টালমাটাল হয়ে পাশের ছোট মেহগনি গাছটাকে আগলে ধরতেই মীর দ্রুত পায়ে এসে জাপটে ধরলো ওকে, জিজ্ঞেস করতে চাইলো আনাবিয়া ঠিক আছে কিনা, ওর শরীর খারাপ লাগছে কিনা। কিন্তু গলা থেকে শব্দ বের হলোনা। সাহস করে কিছু বলতে নেবার আগেই আনাবিয়া দুহাতে সজোর ধাক্কায় সরিয়ে দিলো ওকে নিজের থেকে! ঝাঝিয়ে বলে উঠলো,
“ছোবেনা আমাকে! ধোঁকাবাজ কোথাকার! সারাজীবন শুধু ধোঁকাই দিয়ে গেছো তুমি আমাকে! আর কিছুই দাওনি, কিছুই না!”
মীর আহত, ব্যাথাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ওর দিকে। মস্তিষ্কের প্রতিটি রগে তীব্র বেদনা যেন টগবগিয়ে ছুটে চলতে রইলো! কিন্তু সে যন্ত্রণাকেও ছাঁপিয়ে গেলো আনাবিয়ার মুখনিঃসৃত শব্দ গুলো! চোখ জোড়া আচমকা ভর্তি হয়ে এলো তার জলে। আনাবিয়া তা দেখে বিকৃত মুখে বলে উঠলো,
“খুব তো জবান চলে তোমার! এখন কোথায় গেছে তোমার জবান, তোমার মুখস্থ এক্সকিউজ গুলো? বলার মতো আর কিছুই পাচ্ছো না তাইনা! শুনে রাখো মীর, আমি আর তোমাকে ক্ষমা করব না, কখনোই না! তোমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও না। তুমি যদি হাজারবার আমার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা চোখের পানি ফেলো তবুও না। যদি বাকি জীবন আমার পায়ের কাছেও পড়ে থাকো, তবুও না। ঘৃণা করি আমি তোমাকে!”
মীর কেঁপে উঠলো যেন, হতভম্বতা গ্রাস করলো তাকে! নিজের বেঁচে থাকা শক্তিটুকু দিয়ে একবার প্রচন্ড বিস্ময়ভরে ডেকে উঠলো,
“শিনজ্—”
ওর ডাক ছিনিয়ে নিয়ে আনাবিয়া ভর্ৎসনার স্বরে বলে উঠলো,
“একদম ডাকবেনা আমাকে ওই নামে! তোমার মুখে আজ আমার এত সাধের নামটাও নোংরা শোনাচ্ছে! আর কখনো ডাকবেনা আমাকে! কখনো না!”
মীর হতবিহ্বল, বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার শাণিত চোখে। অস্ফুটস্বরে কোনো রকমে বলে উঠলো,
“পদবী ত্যাগ করাটা তোমার ডিসিশন ছিলো, শিনজো! আমি শুধু তোমাকে ব্যাপারটা বিশ্বাস করাতে… আমি তোমাকে ওদের থেকে দূরে রাখতে চাইনি, সত্যি বলছি!”
আনাবিয়া কথাটা শুনে ভ্রুতে ক্রুদ্ধ ভাজ ফেলে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে শুধোলো,
“চাওনি? তাহলে কী চেয়েছিলে? আমাকে ওদের থেকে দূরে রেখেছিলে, অথচ বলছো চাওনি? আমাকে ছয় মাসে একবার ওদের দেখতে দিয়েছো, কিন্তু চাওনি? আমার নিজের সন্তানদের কাছে যেতে আমাকে অনুমতি নিতে হয়েছে, তুমি পারমিট করলে তবেই আমি ওদের একবার চোখের দেখা দেখতে পেয়েছি, কিন্তু বলছো তুমি চাওনি?”
ক্ষিপ্র বেগে এগিয়ে এলো সে কয়েক কদম, বিক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলো,
“তোমার কোনো ধারণা আছে একজন মা তার সন্তানকে কতটা মনে করলে তার বুকের ভেতরটা ঝাঝরা হয়ে যায়? এত গুলো বছর আমার ওপর দিয়ে কে গেছে জানো তুমি? তুমি তো ওদের বাবা! নাকি তুমিই শুধু ওদের বাবা, ওদের একমাত্র অভিভাবক হতে চেয়েছিলে, আমাকে মা হতে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করোনি?”
মীর নিজের যন্ত্রণাক্লিষ্ট, জলভর্তি চোখজোড়া নামিয়ে ফেলল তৎক্ষণাৎ। আনাবিয়া গর্জনের স্বরে বলে উঠলো,
“এই চোখ তুলে তাকাও! আমার দিকে তাকাও!”
মীর তাকাল, ভ্রু জোড়া অসহায়ত্বে ওপরে উঠে গেলো তার। আনাবিয়া দেখলো ওর চোখ জোড়া, নির্দয় স্বরে বলল,
“কাঁদছো? কাঁদো! আজ কাঁদো। কারণ আমার সতেরোটা বছর তো তুমি ফিরিয়ে দিতে পারবে না, তাই না! এখন তোমার কোনো অনুশোচনা, অনুতাপ কাজে আসবেনা আমার! আমার বাচ্চারা আর সেই সতেরো বছর পূর্বের ছোট্ট বাচ্চাটি হয়ে যাবে না। ওরা আর আমার কোলের ভেতর, আমার বুকের ভাজে ঘুমাবে না। ওদের শৈশব আর ফিরে আসবে না আমার কাছে! তোমার কান্না আমার কোনো কাজে আসবেনা মীর, অযথা এসব নাটক কোরো না!”
মীর চোখ নামিয়ে নিলো আবার, যন্ত্রণায় নীল হয়ে এলো ওর মুখশ্রী, কপালের রগগুলো ফুলে উঠতে রইলো, তাদের কম্পন গুলো স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হতে রইলো! মীর যন্ত্রণাটুকু প্রাণপণে গিলে ফেলতে চাইলো, কথা বলার শক্তিটুকুও শুষে নিলো ওর বিধ্বংসী যন্ত্রণা! ঠোঁট নড়লো ওর, হয়তো বলতে চাইলো কিছু কিন্তু শব্দ এলোনা কোনো! আনাবিয়া ওর কথার উদ্রেককে ছিনিয়ে নিয়ে কর্কশ স্বরে বলে উঠলো,
“আমি জানি আমি ভুল করেছি, কিন্তু তুমি? তুমি তো জানতে আমি ভুল ছিলাম, তুমি খুব দয়াবান হয়ে সব ঠিক করতে চেয়েছো! কিন্তু সব ঠিক করতে গিয়ে তুমি যে আমাকে ঠকিয়েছো সেটা তোমার বুঝে আসেনি মীর? ঠকানোটা ইচ্ছাকৃত যে নয় তার নিশ্চয়তা কি? বলো আমাকে! কিভাবে বিশ্বাস করবো আমি তোমাকে? জীবনে তো কম ঠকাওনি আমাকে!”
ক্ষণিক বিরতি দিয়ে আনাবিয়া আবার বলে উঠলো,
“আর জানো তো! তোমার তো কই মাছের প্রাণ, এতবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছো! অনেক অনেক হায়াত তোমার! নিজের পতন দেখার জন্য অনেক সময় পাবে সামনে! আর আমিও চাই তুমি বেঁচে থাকো! অনেক অনেক বছর বেঁচে থাকো! আমি না থাকলেও আমার অংশ তো তোমার সামনে থাকবে! আমি চাই আমার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে তুমি তিলে তিলে শেষ হও, তুমি প্রতিনিয়ত অনুভব করো ঠিক কি করেছো তুমি আমার সাথে! ওদের হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ; তোমার ওদের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্তে আমার হারানো বছরগুলো তোমাকে তাড়া করুক! অপরাধবোধে শেষ হয়ে যাও তুমি! জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তুমি এই অপরাধবোধ বয়ে বেড়াও। কারণ তোমার জন্য মৃত্যুও খুব সহজ শাস্তি। তোমার সহজে মৃত্যুও না হোক!”
আনাবিয়া চলে যেতে চাইলো, মীর প্রায় ছুটে গিয়ে হাত চেপে ধরলো ওর! স্বর্ণাভ চোখ জোড়া রক্তিম হয়ে এসেছে, সেখানে এখন শুধু অসহায়ত্ব, যন্ত্রণা আর নিজ প্রাণকে হারানোর আশঙ্কা! শেষ অবলম্বনটির মত সজোরে চেপে রইলো সে আনাবিয়ার হাত, কিন্তু মুখ থেকে টু শব্দটি বের হলোনা ওর, একটি স্বান্তনা বাক্যও সে বের করতে পারলোনা আনাবিয়াকে মানানোর জন্য!
আনাবিয়া জোর জবরদস্তি এগোতে এগোতে আঁচড়ে মুচড়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো মীরের কবল থেকে। কিন্তু নাছোড়বান্দা মীর থেকে ছাড়া না পেয়ে যেন আরও দগদগে হয়ে উঠলো ওর ক্রোধ! শেষে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মীরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো সে, ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠলো,
“একদম আঁটকানোর চেষ্টা করবেনা আমাকে! আমি আগেও যেমন ছিলাম এখনো তেমনি থাকব। তোমার সাথে কোনো ধরণের সম্পর্ক আমি রাখতে চাইনা! কারণ আমি জানি, যতদিন আমার হায়াত আছে ততদিনই তুমি আমাকে ধোঁকা দিয়ে যাবে, মিথ্যা বলে আমাকে স্বান্তনা দিয়ে যাবে, আমার ভালো চাওয়ার নামে আমাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে যাবে! তোমার জন্য এই মুহুর্তে আমার আর কোনো ঘৃণা নেই মীর! এখন আছে শুধুই আফসোস!”
মীর আবারও হাত ধরলো ওর, শক্ত করে ধরে রইলো যেন আনাবিয়া আবার ওকে প্রত্যাখ্যান করতে না পারে। কিন্তু আনাবিয়া জোরে দম নিয়ে দ্বিগুণ ক্রোধে বলে উঠলো,
“আফসোস হচ্ছে যে আমার সন্তানদের বাবা হিসেবে আমি তোমাকেই বেছে নিয়েছিলাম! হাজারটা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি তোমার হাত কখনোই ছেড়ে দেইনি! আজ যদি তুমি না হয়ে অন্য কেউ ওদের বাবা হতো….. তবে না আমি আমার সন্তানদের থেকে দূরে যেতাম আর না ওরা মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হতো!”
মীরের মুখ খানা বিবর্ণ হয়ে গেল মুহুর্তেই! অবিশ্বাসের চোখে আনাবিয়ার সফেদ, কঠিন মুখশ্রীতে চেয়ে রইলো সে ক্ষণিক, আনাবিয়ার জ্বলন্ত চোখে কিছু খুঁজলো যেন। পরক্ষণেই মাঝ সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া কূলকিনারা হীন আশাহত নাবিকের হাত ফসকে পড়ে যাওয়া বৈঠার ন্যায় ছেড়ে দিলো সে আনাবিয়ার হাত।
আনাবিয়া থামলো না এবার, মীরের রক্তিম চোখে নিজের ঝলমলে, শাণিত চোখ রেখে কর্কশ স্বরে বলে উঠলো,
“তুমি না স্বামী হওয়ার যোগ্য আর না বাবা হওয়ার! তুমি কখনোই ভালোবাসোনি ওদের! তুমি শুধু ওদেরকে নিজের করে রাখতে চেয়েছিলে, ঠিক যেমন আমাকে রাখতে চেয়েছো সারাটা জীবন! তুমি কাউকে কখনো ভালোবাসো না, মীর। তুমি মানুষকে শুধু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে, নিজের সম্পদে পরিণত করে রাখতে ভালোবাসো। আর আমি! এত বছর ধরে তোমার এই কন্ট্রোলফ্রিক পজেসিভনেসকে ভালোবাসা ভেবে এসেছি। ধিক্কার জানাই নিজেকে!”
আনাবিয়া পা বাড়ালো চলে যেতে, ক্ষণিক এগিয়ে পেছন ফিরে বলে উঠলো,
“কথা দিচ্ছি, কখনো আমার বাচ্চাদের জানতে দেবনা তোমার এসব কীর্তির কথা! কারণ আমি চাই না ওরাও কোনো একদিন আমার মতো রিয়ালাইজ করুক ভালোবাসার নামে তুমি ওদেরকে নিজের হাতের মুঠোয় ভরে রাখতে চেয়েছিলে! নইলে বাকিটা জীবন শুধু ঘৃণা নিয়েই বাঁচবে, কারো ভালোবাসা আর তোমার পাওয়া হবে না!”
আনাবিয়া পা বাড়ালো আবার, মীর যেতে চাইলো কিন্তু পা জোড়া উঠানোর মতো শক্তি খুঁজে পেলোনা যেন! শরীরটা যেন আজ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে তার ঘূণে ধরা মস্তিষ্কের বিরুদ্ধে, একটি কমান্ডও মানতে চাইছেনা কেউ! নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ক্ষিপ্ত পায়ে তাকে ছেড়ে চলে যেতে থাকা আনাবিয়াকে পেছন থেকে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে প্রাণপণে ডেকে উঠলো,
“শিনজো…!”
আনাবিয়া ক্ষিপ্র বেগে পেছনে ফিরে ঝলসানো চোখে চেয়ে কঠিন স্বরে বলে উঠলো,
“সেদিন যদি তোমাকে নিজের শক্তি খরচ করে ওই মৃত্যুপুরীতে খুঁজতে না যেতাম, তুমি যদি সেদিনই মরে যেতে তবে এসব দিন আমার দেখার প্রয়োজন হতো না! আমি হয়তো তোমার জন্য কাঁদতাম, অনেক অনেক কাঁদতাম! তোমার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তোমার দেওয়া সব কষ্ট গুলো ভুলে তোমাকে ক্ষমা করে দিতাম! কিন্তু তুমি বেঁচে থেকে যা করেছো….. তোমাকে ক্ষমা করার মতো কোনো সুন্দর স্মৃতি তুমি আমার জন্য রেখে যাওনি! তোমার সঙ্গে কাটানো প্রতিটা সুখের মুহূর্ত এখন আমার কাছে মিথ্যে মনে হচ্ছে। হয়তো প্রতিটা মুহুর্তে তুমি আমাকে এমনই ধোঁকা দিয়ে গেছো, যা আমি ঘূর্ণাক্ষরেও টের পাইনি! হয়তো রাতে কোনো দাসীকে সঙ্গ দিয়ে তুমি আবার আমার বিছানায় ফিরে এসেছো, আমাকে বুকে জড়িয়েছো অথচ আমি টেরটুকু পাইনি!”
মীর চোখ ভর্তি অবিশ্বাস, হতভম্বতা নিয়ে চেয়ে রইলো ওর দিকে। যেন বিশ্বাস হতে চাইলোনা ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুকঠিন নারীটি ওরই শিনজো, ওরই প্রাণ, ওরই স্ত্রী! আনাবিয়া দুকদম এগিয়ে এসে ঝাঝালো স্বরে বলল,
“আমি যদি এই পরিবারের কেউ না হতাম! তোমার সঙ্গে যদি আমার কখনোই দেখা না হত তবে আমি হয়তো কম সুখী হতাম, হয়তো এত আভিজাত্য এত ক্ষমতা তখন আমার থাকতনা! কিন্তু আমার সন্তানদের নিয়ে আমার অন্তত এতগুলো অনুতাপ থাকত না। আমি একটা সুন্দর স্বাভাবিক জীবন পেতাম! তুমি সেদিনই মরে গেলে হয়তো একদিন তোমাকে ক্ষমা করতে পারতাম, কিন্তু তুমি তো বেঁচে আছো! তোমাকে ক্ষমা করার সুযোগটাও তুমি আমাকে দিচ্ছো না। প্রতিনিয়ত নিজের ওপর ঘৃণা বাড়িয়ে চলেছো! বেঁচে থাকো তুমি! অনেক বছর বেঁচে থাকো। যতদিন না তুমি বুঝতে পারো তুমি ঠিক কতটা ঠকিয়েছো আমাকে, আর আমার বাচ্চাগুলোকে!”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৯
কথাটা বলেই আর এক মুহুর্ত দাঁড়ালোনা আনাবিয়া, ঝড়ো বেগে বেরিয়ে গেলো সে মীরের সম্মুখ হতে। মীর ওর যাওয়ার দিকে রক্তিম চোখে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলো অথর্বের ন্যায়। বিধ্বংসী যন্ত্রণায় সবেগে পতিত হওয়া মস্তিষ্কটি রক্তস্নানে পর্যবসিত হতে হতে কষতে রইলো শেষ হিসাব গুলো।
