Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৩

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৩

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৩
রানী আমিনা

থমকে দাঁড়িয়ে গেলো আনাবিয়া, বুকের ভেতর শুরু হলো এক দৃঢ়, পরিচিত আলোড়ন, যে আলোড়ন শুধুমাত্র সেই আত্মার ন্যায় চিরপরিচিত ব্যাক্তিটির সন্নিকটে গেলেই শুরু হয় তার। মুহুর্তেই অনুভব করলো এক জোড়া পেশিবহুল, অদম্য, লৌহসম হাত সাঁড়াশীর ন্যায় আষ্ঠেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে তাকে। যেন শুষে নিয়ে নিজের বক্ষগহ্বরে পুরে ফেলতে চাইছে আনাবিয়ার সমস্ত অস্তিত্ব!
দ্রুতশ্বাসে চকিতে মাথা তুললো সে, চোখে পড়লো অগ্নিশিখার ন্যায় দীপ্ত চোখ জোড়া, যাতে সুস্পষ্টরূপে প্রকট বহুবছরের জমাট অভিমান।

ক্ষণিকের জন্য জমে গেলো আনাবিয়া, দৃষ্টি সরাতে পারলোনা মীরের তীক্ষ্ণ, সম্মোহনী চাহনি হতে। কিন্তু পরমুহূর্তেই মীরকে দুহাতে সজোরে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মুক্ত করে নিলো নিজেকে, ঝটিতি পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম।
মীর বাধা দিলোনা, আটকালো না, শুধু চেয়ে রইলো নির্নিমেষ। আনাবিয়া কোন এক অজানা ক্রোধে হঠাৎ সন্তানহারা সর্পিণীর মতোন ফুসতে শুরু করলো, কেন এই ক্রোধ, কি তার হেতু, সেটা তার মন কিংবা মস্তিষ্ক কেউই ঠাহর করতে পারলোনা! বরং নিজের শরীরের এই স্বেচ্ছাচারিতায় আনাবিয়া নিজেই হতবাক হলো!
তার কি সম্মুখের ব্যাক্তিটাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করার কথা ছিলো? ছিলোনা। সে তো দূরে যেতে চেয়েছিলো আরও, অনেক অনেক দূরে!
মীর আনাবিয়ার মুখপরে স্থীর দৃষ্টি রেখে ধীর পদক্ষেপে এগোলো দু কদম। আনাবিয়া ঝটিতি দু পা পিছিয়ে গিয়ে এক প্রকার গর্জে বলে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“একদম আগাবে না! যেখানে আছো সেখানেই থাকো, এবং আমাকে যেতে দাও।”
“আমার কাছে এসো শিনজো, তোমাকে জড়িয়ে ধরতে দাও৷”
মোলায়েম অথচ অত্যন্ত দৃঢ় কন্ঠে বলল মীর, এগিয়ে এলো আরও দু কদম। কিন্তু আনাবিয়া তার দ্বিগুণ পিছিয়ে গিয়ে প্রতিবাদী স্বরে বলে উঠলো,
“কখনোই না, আমাকে যেতে দাও!”
“তোমার যত ক্রোধ, যত অভিমান, যত ক্ষোভ, যত বৈরিতা, আমার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ, অনুযোগ, ঘৃণা সমস্তই আমি শুনবো শিনজো, শুধু একটা বার শান্ত হয়ে আমার কাছে এসো, নয়তো আমাকে আসতে দাও! অনুরোধ করছি তোমাকে।”

বলে আরও কয়েক কদম এগিয়ে এলো মীর। আনাবিয়া আবারও পিছিয়ে গেলো তার দ্বিগুণ। কর্কশ কন্ঠে বলল,
“তোমাকে শোনানোর মতো কোনো কথাই আমার বুলিতে নেই, পথ ছাড়ো আমার৷ তুমি আমাকে ছাড়াই ভালো থাকবে, যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে, যেভাবে ইচ্ছে চলতে পারবে, তাই আমার পথ ছাড়ো৷”
“আমার ভালো থাকাকে যদি তুমি এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চাও তবে বলবো আমাকে তুমি এখনো চিনতে পারোনি, শিনজো।”
আনাবিয়া দমে গেলো সামান্য, পরমুহূর্তেই ঘুরে অন্যদিকে চলে যেতে উদ্যত হয়ে কড়া সুরে বলল,

“আমি তোমাকে চিনতে চাইওনা, আর না তোমার সাথে কোনো কথা বলতে চাই।”
কিন্তু সে পালানোর উপক্রম করতেই মীর ঝটিতি সামনে এসে দাঁড়ালো ওর৷ দৃঢ় গমগমে গলায় বলে উঠলো,
“তুমি কোথাও যাবে না শিনজো! ইয়্যু বিলং টু মি, অনলি মি। পালিয়ে বাঁচবে ভেবেছো? ভাগ্যও তো শেষমেশ তোমাকে আমার সামনে এনে দাঁড় করালো। আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে তুমি খুব ভালো থাকবে ভেবো না….. আমি জানি তুমি আমাকে ছাড়া শ্বাসটুকুও নিতে পারবে না।
পালিয়ে যেতে চাইছো, যাও। কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়ব না। তুমি যতবারই পালাতে চাইবে ততবারই তোমাকে আমার কাছেই বন্দী হতে হবে শিনজো। ইয়্যু য়োন্ট বি অ্যাবল টু গেট রিড অব ম্যি এভার।”

“আমাকে নিজের সাথে আঁটকে রেখে তোমার লাভ টা কি হবে? নিয়ন্ত্রণ করতে চাও আমাকে? আমি স্বাধীন ভাবে, সুখী হয়ে বাঁচবো সেটা কি তোমার চক্ষুশূল হবে?”
চোখ জ্বলে উঠলো আনাবিয়ার, কিন্তু কন্ঠ কাঁপলো না সামান্য! মীর তাকিয়ে রইলো ওর দিকে, স্বল্প বিরতি দিয়ে বলে উঠলো,
“তবে তুমি আমাকে ছাড়া খুব সুখে থাকো? স্বাধীনভাবে থাকো?”
“হ্যাঁ তাই। তুমি কখনোই আমাকে বোঝোনি, বোঝার চেষ্টা করোনি! সারাজীবন নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের ইচ্ছে আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছো। জিজ্ঞেস করোনি তাতে আমি সম্মত কিনা, তাতে আমি হ্যাপি কিনা।”
“মিথ্যাচার কোরোনা শিনজো, তোমাকে আমি কবে স্বাধীনতা দেইনি? কবে তোমার সুখের পথে আমি বাধা দিয়েছি? এ ধরণের অপবাদ তুমি আমাকে কিভাবে দাও? কি করিনি আমি তোমার জন্য? তোমার হ্যাপিনেসের জন্য?”
মীরের প্রশ্ন গুলো চাপা হুঙ্কারের ন্যায় শোনালো যেন!
দুজনে দাঁড়িয়ে রইলো মুখোমুখি, মীরের ক্রুদ্ধ নিঃশ্বাসের গরম ধোঁয়া এসে বাড়ি খেতে লাগলো আনাবিয়ার মুখের ওপর।

“তোমার সমস্যা কি জানো? তুমি সবসময় ভাবো একমাত্র তুমিই সঠিক, তোমার সিদ্ধান্তই সঠিক। তোমার সামনের জনের তাতে কি হলো না হলো তাতে তোমার কিছু আসে যায় না। এবং তুমি এটাও জানো না, তুমি একজন অহংকারী, মাত্রাতিরিক্ত অহংকারী!”
মীর দাঁতে দাঁত চাপলো, চোখে বিদ্রুপ ঝলকিয়ে শব্দ করে হেসে বলল,
“অহংকারী? আমি? ঠিক আছে মেনে নিলাম।
আর তুমি? তুমি এত সঠিক বেঠিকের ভাষণ দিচ্ছো, তুমি নিজে কি করেছো সেটা কখনো ভেবে দেখেছো? আমি না হয় আমার সিদ্ধান্ত তোমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছি, তুমিও কি তাই করোনি? তবে তোমার আর আমার ভেতরে পার্থক্য কি থাকলো শিনজো?”
ক্ষণিক থেমে মীর আবার বলল,

“তোমার সাথে এভাবে ছোটলোকের মতোন ঝগড়া করা আমার ধাতে নেই শিনজো। আমি কোনো ঝগড়া চাইনা। বললামই তো আমি তোমার সমস্ত অভিযোগ শুনবো, কিন্তু সেটা এভাবে নয়, এভাবে আমি পারবো না। তোমাকে আমার কাছে আসতে হবে, আমার গা ঘেঁষে বসতে হবে, আমি আমার সমস্ত তৃষ্ণা মিটিয়ে তোমাকে দেখবো, তোমাকে জড়িয়ে ধরবো, তারপর৷”
“আমার কোনো অভিযোগ নেই, তাই তোমার কাছে যাবারও কোনো কারণ নেই। তুমি যা ইচ্ছা করতে পারো। তোমাকে আমি অনেক আগেই মুক্ত করে দিয়েছি, নতুন করে এসব ড্রামার কোনো রিজন দেখিনা।”
“এভাবে কোনো কিছু সমাধান হয় না শিনজো।
আমি জানি তুমি রেগে আছো আমার ওপর, তোমার রাগ জায়েজ। কিন্তু তুমি এভাবে আমার থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না, আমি তা হতে দেবোনা৷
তোমার সময় লাগলে বলো, কত সময় লাগবে তোমার? আমি দিবো তোমাকে সময়। তোমাকে আমি জোর করছিনা, করবো না। কিন্তু আমার গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার কথা তুমি চিন্তাও করতে পারবে না শিনজো, সেটা আমি হতে দেবোনা, নেভার এভার।”

“লিখে নিয়েছো তুমি আমাকে?”
“হ্যাঁ।”
“আমি তোমার কাছে আর কখনো ফিরবোনা মীর। কেয়ামত পর্যন্ত সময় আমাকে দেওয়া হলেও আমার সিদ্ধান্ত একই থাকবে৷ আমি দেমিয়ান শেহজাদী, এক পুরুষের স্পর্শে আমি বিশ্বাসী। আমার শরীরে কখনো দ্বিতীয় কোনো ব্যাক্তির গভীর স্পর্শ আমি লাগতে দিবো না, তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো।
কিন্তু আমি ফিরবোনা, আর না তোমার জীবনের কোনো সিদ্ধান্তে আমি কখনো দখল দিতে আসবো। ফ্রম নাউ অন, ইয়্যু আর টোট্যালি অন ইয়োর য়্যোন।”
“বাড়াবাড়ি করছো এবার।”
দৃঢ় স্বরে বলে উঠলো মীর। আনাবিয়ার নাকের ডগা লাল হয়ে এলো, চোখ জোড়াতে জল আর ক্রোধ জমে চকচক করে উঠলো!
মীর এবার নরম হয়ে এলো হঠাৎই, আনাবিয়ার খুব কাছে এগিয়ে এসে গায়ের ওভারকোটটি খুলে আনাবিয়ার গায়ে চড়িয়ে দিতে দিতে মোলায়েম স্বরে বলল,

“ফিরে চলো আমার সাথে, এই শীতের ভেতর এভাবে অল্প পোশাকে তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে। রাগারাগি ঝগড়াঝাটি যা করার কামরায় গিয়ে করবে৷”
“ছাড়ো আমাকে, আমি কোথাও যাবোনা তোমার সাথে!”
ওভারকোটটি গা থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল আনাবিয়া। মীর একবার মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়া ওভার কোট আরেকবার আনাবিয়ার দিকে তাকিয়ে ওভারকোটটি তুলতে গেলো।
আনাবিয়া সুযোগ পেতেই ছুটে পালিয়ে যেতে চাইলো মীরের নাগাল থেকে। মীর তড়িতে ওভার কোটটি তুলে ঝটিতি ছুটে গিয়ে ওভারকোটটি দিয়ে পেছন থেকে জাপটে ধরলো আনাবিয়াকে,

“অনেক রাগারাগি করেছো, এবার শান্ত হও, আমার কথা শোনো শিনজো। কামরায় যেতে হবে না, তুমি এখানেই থাকো, তবুও আমার সাথে থাকো, আমার চোখের সামনে থাকো। মনে হচ্ছে আমি তোমাকে হাজার বছর দেখিনা! আমার সামনে একটু শান্ত হয়ে বসো প্লিজ, আমি তোমাকে একটু প্রাণভরে দেখি! একটু শান্ত হও প্রাণ আমার, একবার সমস্ত তৃষ্ণা মিটিয়ে জড়িয়ে ধরতে দাও তোমাকে, এতটা নিষ্ঠুর হইয়োনা শিনজো!”
মোলায়েম, স্নিগ্ধ, কন্ঠে বলল মীর, ওর কণ্ঠনিঃসৃত প্রতিটা বাক্যে ঝরে পড়লো আকাশ সমান আকুলতা!
আনাবিয়া ছটফটিয়ে উঠলো মীরের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য, এক অসহ্য, বিরক্তিকর অনুভূতিতে ছেয়ে যেতে লাগলো ওর মন মস্তিষ্ক! এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো ও মীরের মুখোমুখি, ঝাঝিয়ে উঠে বলল,

“শান্ত হবো না আমি!
আর কি বলছিলে যেন, আমি তোমাকে ছাড়া শ্বাস টুকুও নিতে পারবোনা?
ভুল ভেবেছো তুমি। তোমাকে ছাড়া আমি মরে যাবো না, বরং আরও ভালো ভাবে বেঁচে থাকবো, এতদিন যেমন ছিলাম।
আমি চাইনা তুমি আর কখনো আমার সামনে আসো, আমি তোমাকে দেখতে চাইনা, তোমাকে শুনতে চাইনা, তোমার স্পর্শ চাইনা, আমি ঘৃণা করি তোমাকে!”
“শিনজো, এতটা ঘৃণা পাওয়ার মতো আমি কিছুই করিনি। তুমি যে কারণে আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে তা আমি করিইনি শিনজো। যে মেয়েকে আমি নিয়ে এসেছিলাম আমি তার নামটা পর্যন্ত জানিনি! আমি কখনো তাকে খেয়াল করে দেখিনি পর্যন্ত, ছোয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার। তবুও কেন আমাকে এত ঘৃণা?”
“ওহ আচ্ছা!

গেছিলে তো তাকে আনতে, ছোঁয়ার জন্যই তো এনেছিলে! ছোঁয়া কেন বলছি, তুমি তো তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে। আমি যদি সেদিন পালিয়ে না যেতাম তবে তুমি কি তাকে বিয়ে করতে না? বলো, করতে কিনা!”
“যা হয়নি তা নিয়ে এত বাড়াবাড়ির কিছু নেই শিনজো, আর তাছাড়া দ্যাট ওয়াজ প্যাস্ট৷”
“যে প্যাস্ট আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত তাড়া করে বেড়াবে সেটা কখনো প্যাস্ট হতে পারে না। দ্যাট উইল অলওয়েজ বি মা’ প্রেজেন্ট!”
মীর শীতল চোখে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে, ফোস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা। আনাবিয়া তা দেখে তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“খুব ক্লান্ত লাগছে বলো! খুব বিরক্ত লাগছে?
চলে যাও তুমি, আমার পথ থেকে সরে দাঁড়াও। আমি ভালো আছি, ভালো থাকবো। আমি না থাকলেই বরং তোমার বেশি সুবিধা, প্রাসাদ তলিয়ে ফেলতে পারবে তোমার সন্তান দিয়ে। কেউ কিচ্ছুটি বলবে না।”
“চুপ করো শিনজো, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। আমি জানি আমি ভুল করেছি, কিন্তু ভুল তুমিও কম করোনি। এখন প্লিজ শান্ত হয়ে আমার কাছে একটু বসো। আমি তোমাকে একবার হারিয়ে ফেলেছি, দ্বিতীয় বার আর হারাতে চাইনা।”

দৃঢ়, শান্ত স্বরে বলল মীর।
আনাবিয়া দাঁতে দাঁত চাপলো, ক্রোধে লাল হয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
“তুমি চাইবে আর আমি সুড়সুড় করে তোমার কাছে চলে আসবো এটা ভেবে থাকলে তুমি ভুল করছো!
আর তুমি আমাকে হারিয়েছো কেন জানো? কারণ তুমি জন্মেছোই হারানোর জন্য! তুমি কাউকে কখনো ধরে রাখতে পারোনি! সবাই তোমাকে ছেড়ে গেছে, কারণ তুমি এটারই যোগ্য, তুমি একা থাকার জন্যই জন্মেছো! কেউ থাকেনি তোমার সাথে, কেউ না! না তোমার মা, না তোমার বাবা, না আমার বাবা, না তোমার ভাই, আর না অন্য কেউ!”
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মীর! আনাবিয়ার কথাগুলো যেন শত সহস্র ছুরির ফলা হয়ে বক্ষ ভেদ করে হৃৎপিণ্ডে গাঁথলো ওর! আনাবিয়া কন্ঠ সপ্তমে চড়িয়ে কঠিন স্বরে বলল,

“শুধুমাত্র তোমার জন্য আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি, মা কে হারিয়েছি, দাদাজান কে হারিয়েছি, আমার সমস্ত কাছের মানুষ গুলোকে হারিয়েছি! শুধু তুমি জন্মেছিলে বলেই এই সাম্রাজ্যে অভিশাপ নেমে এসেছে, সব ধ্বংস হয়েছে, কেউ নেই আর, কেউ না!
এই অভিশপ্ত তুমি থেকে পরিত্রাণ পেলে আমি আরও ভালোভাবে বাঁচবো, সহজ হবে আমার জীবন! তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁধা, সবচেয়ে বড় বোঝা!”
আনাবিয়ার মুখনিঃসৃত প্রতিটা শব্দে মীরের মস্তিষ্ক ওকে সমস্ত অতীত স্মৃতি থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এলো যেন, চোখের সামনে ভেসে উঠলো অতীতের সমস্ত বিচ্ছেদের স্মৃতি গুলো, ওর আম্মা, ওর দাদাজন, ওর বাবা, ওর বন্ধুরূপি ভাই সালিম- সকলের মর্মান্তিক মৃত্যুদৃশ্য গুলো!

এসবের জন্য কি তবে ও-ই দ্বায়ী, শুধু ও জন্মেছিলো বলে? এত এত মৃত্যুর জন্য শুধু সে নিজে দ্বায়ী, নিজের এই বর্তমান বিধ্বস্ত জীবনের জন্য তবে সে নিজেই দ্বায়ী!
কন্ঠরোধ হয়ে এলো মীরের, চোখের কোণে বাষ্প জমলো বিধ্বংসী মর্মযাতনা আর তীব্র ক্রোধের মিশেলে! অবিশ্বাস্য চোখে সে হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে। এমন কথা তার শিনজো তাকে কখনো এভাবে বলতে পারবে সে যে কল্পনাতেও আনেনি!
বিধ্বস্ত পায়ে এগিয়ে এলো সে কয়েক কদম, রুদ্ধ হয়ে আসতে থাকা কন্ঠে প্রাণপণে সে উচ্চারণ করলো কয়েকটি শব্দ,

“তুমি…..এমন কথা তুমি আমাকে কিভাবে বলতে পারলে শিনজো? তুমি এগুলো মন থেকে বলোনি…বলো!”
“হ্যাঁ, আমি মন থেকেই বলেছি, আর এটাই সত্যি! বিশ্বাস না হলে এই পঞ্চদ্বীপের যে কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারো, আমি ঠিক যা যা বলেছি তারাও সেই একই কথা বলবে। তুমি একটা অভিশাপ!”
ক্রোধে, কান্নায় ফুলে ফুলে উঠতে উঠতে বলল আনাবিয়া।
মীরের চোখ মুখ হঠাৎ ভয়ানক কঠিন হয়ে এলো, চোয়াল শক্ত করে শকুনি চোখে তাকালো সে আনাবিয়ার চোখের দিকে, পরক্ষণেই বজ্রের ন্যায় ভেসে এলো তার উগ্র, ক্রুদ্ধ কন্ঠস্বর,
“আমি বোঝাই যদি হই তবে এতদিন আমাকে কেন বয়ে বেড়িয়েছিলে? আগে কেন বলোনি আমি তোমার নিকট বোঝা?

হ্যাঁ, আমি অভিশপ্ত, আমি নিকৃষ্ট। আমি এরকমই থাকবো সারাজীবন, আমার এই অভিশাপ কেউ কাটাতে পারবে না। তুমি আমাকে ছাড়তে চাও তো? ঠিক আছে।
যেখানে ইচ্ছা যেতে পারো তুমি! তোমাকে আমি মুক্ত করে দিলাম। আজ থেকে তুমি আমার শিনজো নও, তোমাকে আমি চিনিনা। ফ্রম দিস ভেরি মোমেন্ট ইয়্যু আর অন অব মা’ সাবজেক্টস! নাথিং মোর! তোমার মতো অকৃতজ্ঞ কেউ আমার আশেপাশে থাকুক সেটা আমিও চাইনা!”
দম ছাড়লো মীর, রাগে ক্ষোভে চোখে রক্ত জমে উঠলো ওর! ফুলে উঠলো কপালের রগ, প্রশস্ত হয়ে এলো গলা! পরক্ষণেই বিক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলো,

“ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছো তুমি আমাকে, ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছো! ইয়্যু গেভ মি নাথিং বাট পেইন! তুমি আমার জীবনের একমাত্র ব্যর্থতা। তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, ভীষণ রকম ভালো বেসেছিলাম, অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ দ্যা বিগেস্ট মিসটেক অব মা’ লাইফ! আর এই ভুল আমি শুধরে নিবো।
মুক্তি চাও তো! যেতে পারো তুমি, তবে আর কখনো ফিরে এসো না, আর কখনো আমার সামনে এসো না! আমি কোনো অকৃতজ্ঞ কে দেখতে চাইনা!”
আনাবিয়ার চোখ উপচে পড়লো লোনা জল, ফুপিয়ে উঠলো সে। আশাহতের ন্যায় মীরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উলটো দিকে হাটা শুরু করলো সে।
মীর এগোলো ওর পেছনে, আনাবিয়ার হাত আকড়ে ধরে ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
“কোথায় যাচ্ছো তুমি? এখান থেকে এক পাও নড়বে না। কোথাও যাবে না তুমি।”
“ছেড়ে দাও আমাকে, ছোবে না তুমি আমাকে, একদম ছোবে না!”

মীরের থেকে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আর্তনাদের স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া, পরক্ষণেই ছুটে গেলো জঙ্গলের ভেতর৷
মীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা, নিজেও ছুটলো আনাবিয়ার পেছনে। দ্বিতীয় বার আনাবিয়াকে ধরে ফেলে জোর জবরদস্তি করে আলিঙ্গনাবদ্ধ করতে চাইলো,
“আমার ওপর রাগ দেখিয়ে পার পেয়ে যাবে না তুমি, তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। আমি যদি পৃথিবীর সর্বোচ্চ নিকৃষ্ট মানুষও হই তবুও তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। ইয়্যু আর মাইন, অনলি মাইন!”
উগ্র গলায় বলল মীর। আনাবিয়া মীরের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে করতে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো,

“কেন মনে পড়লো তোমার আমাকে? তুমি আমাকে চিরজীবনের জন্য ভুলে গেলেই আমি খুশি হতাম। আমাকে আবার ভুলে যাও, এবার ভুললে আর কখনোই যেন আমাকে মনে করতে না পারো! আর কখনোই যেন আমার চেহারা তোমাকে না দেখতে হয়! চলার পথে তোমার পাশ কাটিয়ে চলে গেলেও যেন তুমি আর কখনো টের না পাও যে সে জন কোনো একদিন তোমার বুকে ঘুমোতো!”
“এক থাপ্পড়ে তোমার দাঁত ফেলে দিবো আমি, বেয়াদব! বাজে কথা বলা বন্ধ করো!”
“আমি আর এসব সহ্য করতে পারবোনা, এসব আমি আর নিতে পারছিনা! আমিও একটা মানুষ, আমারও ব্যাথা লাগে, আমারও যন্ত্রণা হয়। আমি আর এসবের ভেতর নেই, আমি আর তোমার কাছে থাকতে চাইনা! তুমি তোমার মতো করে বাঁচো, ভালোভাবে বাঁচো, শুধু আমাকে ছেড়ে দাও, বাঁচতে দাও আমাকে!”
“চুপ করো শিনজো, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না, তোমাকে সাবধান করছি! শান্ত হও।”
আনাবিয়া ফুপিয়ে উঠলো, মীরকে আঁচড়ে কামড়ে আহত করে ওর শক্ত আলিঙ্গন থেকে প্রাণপণে নিজেকে ছাড়িয়ে ঝড়ের গতিতে লাইফ ট্রির দিকে ছুটে চলল আনাবিয়া।

বুক কেঁপে উঠলো মীরের, ওই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হওয়ার তীব্র ভয় গ্রাস করলো ওকে। বুকের ভেতর হাতুড়িপেটা শুরু হলো তৎক্ষনাৎ। তড়িতে ছুটলো সে আনাবিয়ার পেছনে।
ছুটে লাইফ ট্রির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো আনাবিয়া, অশ্রুসিক্ত ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো,
“তোমার সাথে আমার কি কথা হয়েছিলো? তুমি আমার কথা রাখবে কিনা বলো!”
লাইফট্রি নড়ে চড়ে উঠলো, নিজের লতাপাতা ঘুরিয়ে বার্তা দিলো,
“আ’ কান্ট গো বিয়ন্ড মা’ রুলস।”
“তোমাকে করতেই হবে! আ’ম কমান্ডিং ইয়্যু!”
“থিংক টোয়াইস বিফো’ ইয়্যু কমান্ড।”
“তুমি করবে, তোমাকে করতেই হবে। দ্যাটস অ্যান অর্ডার!”

লাইফট্রি এবার অদ্ভুত আচরণ শুরু করে দিলো, তার শরীরের গহ্বর হতে হঠাৎ শুরু হলো অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ, পরমুহূর্তেই ভেসে আসতে শুরু করলো নারী পুরুষ মিশেলের একটি অদ্ভুৎ কন্ঠস্বর,
“এরোর…..এরোর….এরোর…. এরোর…. এরোর……!”
মীর ছুটে এলো ততক্ষণে, আনাবিয়াকে পেছন থেকে শক্ত হাতে জাপটে ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে হিংস্র স্বরে বললো,
“আর কখনো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা যদি চিন্তাও করো তবে আমি খুন করবো তোমাকে শিনজো!”
আনাবিয়া মুহূর্তেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নিচ থেকে তুলে নিলো একটি ধারালো পাথর টুকরো, মীরের থেকে দূরে সরিয়ে গিয়ে ধারালো অংশ নিজের বা হাতের কবজি তে চেপে ধরে ঝাঝিয়ে বলে উঠলো,

“একদম আমার কাছে আসবে না!”
পরক্ষণেই লাইফট্রির দিকে ফিরে বলল,
“তুমি আমার কথা শুনবে? নাকি আমি নিজেকে শেষ করে দিবো!”
“ইয়্যু আর মেকিং মিসটেক বেইবি গার্ল, থিংক টোয়াইস বিফো’ ইয়্যু ডু সামথিং হরিবল।”
আনাবিয়া আরও জোরে চেপে ধরলো পাথর খণ্ড, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে কেটে গেলো কিছুটা। লাল রঙা তরল চুইয়ে পড়লো আনাবিয়ার হাত বেয়ে।
মীর শিউরে উঠলো, আনাবিয়ার কাছে যেতে পা বাড়ালে আনাবিয়া পিছিয়ে গেলো দু কদম, কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলো সে মীরের দিকে। পরক্ষণেই তাকালো আবার লাইফ ট্রির দিকে। দৃঢ় গলায় বলল,
“ডু ইট!
মুহুর্তেই আবার শুরু হলো সেই অদ্ভুত শব্দ,

“এরোর….. এরোর….. এরোর…… এরোর…..!”
মীর অশান্ত হয়ে উঠলো, আনাবিয়ার হাতের ক্ষতের দিকে তাকিয়ে অধৈর্য, অসহায় গলায় বলে উঠলো,
“তোমার কি চাই তুমি আমাকে বলো, আমি তোমাকে সব দিবো, তবু নিজেকে কষ্ট দিও না শিনজো। ওটা ফেলে দাও, আমার কথা শোনো প্রাণ আমার!”
অতি সাবধানে আনাবিয়ার দিকে একটু একটু করতে শুরু করলো মীর। আনাবিয়া তা দেখে লাইফট্রির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে পাথর খন্ডটা আরও জোরে চেপে ধরতেই হঠাৎ খুলে গেলো লাফট্রির বুকের ভেতরটা, ভেতর থেকে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে এলো এক ঝাঁক শক্ত পোক্ত লতা।
আর তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই মীরের ইস্পাত-দৃঢ়, দীর্ঘ শরীরটিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ছো মেরে তুলে নিয়ে মুহুর্তেই চলে গেলো ভেতরে।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যাওয়া মীর নিজের স্বর্ণাভ অক্ষিযুগলে অন্তিম বারের মতো নিজের প্রাণাধিক প্রিয়াকে একটিবার প্রাণভরে আলিঙ্গনের তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে নিদারুণ, অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো সম্মুখের কাষ্ঠল দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত!
আম্মাকে এগিয়ে নিতে এসে দুজনের তুমুল ঝগড়া দেখে দূরে লুকিয়ে থাকা কোকো এই অকল্পনীয় দৃশ্যে হতবাক হয়ে হাটু ভেঙে পড়ে রইলো মাটিতে!

সেদিন ভোর হলো খুব গোপনে, কেউ যেন টের পেলোনা ভোর হয়েছে। কারো ভেতর দেখা গেলো না কোনো ব্যাস্ততা। সকলেই যে যার স্থানে পড়ে রইলো জড়পদার্থের মতোন!
লাইফ ট্রির সম্মুখে হাটুর ভেতর মুখ গুজে পড়ে আছে আনাবিয়া। মীরের ওভারকোটটি জড়ানো ওর গায়ে, শেষ মুহুর্তে কখন সে এটি জড়িয়ে দিয়েছিলো খেয়াল হয়নি আনাবিয়ার৷
ভোরের শীতল হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দিতে লাগলো ওকে, কুয়াশায় ভিজে জবজবে হয়ে যাওয়া সফেদ চুল গুলো অযত্নে পড়ে রইলো পিঠের ওপর। ঠোঁট শুকিয়ে ফাটল ধরেছে ইতোমধ্যে।
এমন সময়ে কারো হাতের স্পর্শে চমকে মাথা তুললো আনাবিয়া, সামনে হাটু মুড়ে বসে আছে কোকো। ছলছল চোখে তার হাজার খানেক প্রশ্ন।
আনাবিয়ার লালবর্ণ ধারণ করা চোখে চোখ রেখে কোকো অস্ফুটে প্রশ্ন করলো,

“এমনটা কেন করলেন আম্মা?”
কোকোর প্রশ্ন করতে দেরি, আনাবিয়ার ওর বুকে ঝাপিয়ে পড়তে দেরি হলোনা! তীব্র আর্তনাদ তুলে কোকোকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরলো আনাবিয়া, ওর করুণ হাহাকারে ভারী হয়ে উঠলো রেড জোনের আকাশ, ঝুপঝুপিয়ে নামলো বৃষ্টি। তীব্র শীতে ঠান্ডা বৃষ্টির ফোটা ছুরির ফলার মতোন এসে আঘাত করতে শুরু করলো একের পর এক৷
“কি করেছেন আপনি, আম্মা!”
আবারও প্রশ্ন করলো কোকো। আনাবিয়া কোনো উত্তর দিলো না। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে বসে বসে কোকোর বুকে অসহ্য যন্ত্রণায় ঝড় তুলে দিতে রইলো।
বৃষ্টির তোপ কমে এলো একসময়, রোদ বেরুলো, আনাবিয়া তখনও সেটে রইলো কোকোর বুকের ওপর। কোকো ঠিক তেমন ভাবেই বসে আছে চুপচাপ, এতটুকু নড়েনি!
রোদে ক্রমশ শুকিয়ে আসলো আনাবিয়ার শরীর, ভীষণ ঠান্ডায় গলা ভারী হয়ে এলো দুজনের। লাল হয়ে এলো আনাবিয়ার চোয়াল, ঠোঁট, নাকের ডগা।
হঠাৎ নড়ে উঠলো লাইফট্রি। কোকো চমকে তাকালো সেদিকে। ধীরে ধীরে কোকোর বুক থেকে উঠে বসলো আনাবিয়া, রক্তিম চক্ষু নিয়ে তাকালো লাইফট্রির দিকে। লাইফট্রি নিজের লতাপাতা গুলো দিয়ে ফুটিয়ে তুললো একটি বার্তা,

“ইয়্যু হ্যাভ মেইড অ্যা বিস্ট, বেইবি গার্ল। ইয়্যু উইল বি হেল্ড এনটায়ারলি রেসপনসিবল ফর হোয়াট হ্যাপেনস নেক্সট।”
আনাবিয়া সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো, কিয়ৎক্ষণ মাটির ওপর স্থীর বসে থেকে বসে যাওয়া গলায় বলে উঠলো,
“আজ থেকে মীরের সম্পুর্ন দায়িত্ব তোদের ওপর। ওর কখনো কিছু হলে তার জন্য সম্পুর্ন তোরা দায়ী থাকবি। তোরা ছাড়া অন্য কাউকে আমি ভরসা করিনা।”
পরক্ষণেই উঠে দাঁড়ালো সে। ঘুরে উঠলো মাথা, পড়ে যেতে নিতেই কোকো ধরে ফেললো ওকে, বলল,
“আপনার গায়ে প্রচন্ড জ্বর আম্মা, আপনি কোথায় যাবেন আমাকে বলুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে।”
আনাবিয়া মাথা নাড়ালো দুদিকে, বলল,
“তোদেরকে যে দায়িত্ব দিয়েছি সেটা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পানল করবি। এর বাইরে তোদের কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই।”

পরমুহূর্তেই নিজের ডান হাত উচিয়ে ধরলো আনাবিয়া। মাটির তল বেয়ে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলল এক ঝাঁক শেকড়, পৌছে গেলো কিমালেবের পাহাড় সারীর তলদেশে, মাটি ফুড়ে বেরিয়ে সংবাদ পৌছালো স্ত্রেলকার কাছে।
আনাবিয়া হেলান দিয়ে রইলো কোকোর বুকে। চেয়ে রইলো আকাশের দিকে। কিয়ৎক্ষণ বাদেই অদ্ভুত শব্দে খুলে গেলো লাইফ ট্রির দরজা। ভেতর থেকে নগ্নাবস্থায় বেরিয়ে এলো মীরের জ্ঞানহীন, ঘর্মাক্ত দেহ।
কোকো চোখ সরিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। আনাবিয়া তড়িতে গায়ের ওভারকোটটি খুলে আবৃত করলো মীরের শরীর। কোকো কে বলল মসভেইল থেকে মীরের পোশাক এনে দিতে।
কোকো প্রস্থান করলো তৎক্ষনাৎ। আনাবিয়া ঝুঁকে পড়লো মীরের মুখের ওপর। রক্তাভ চোখে মীরের মুখখানা প্রাণভরে দেখে নিয়ে অস্ফুটে বলল,

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪২

“তোমার সাথে আমার আর কখনো দেখা না হোক, আমার জন্য তোমাকে আর কখনো কষ্ট পেতে না হোক, তোমার কোনো পিছুটান না থাকুক। অনেক উঁচুতে উঠো তুমি, যত উঁচুতে উঠলে জমিনের এই আমির নাগাল আর পাওয়া যাবে না।”
মীরের কালচে পুরুষ্ঠ ঠোঁট থেকে একটা প্রগাঢ় চুম্বন ছিনিয়ে নিলো আনাবিয়া। মীরের কপালে কপাল ঠেকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“মে দিস বি আওয়ার লাস্ট কিস….”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৪