বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ১৮
ইশরাত জাহান
বেশ কিছুক্ষণ হয়েগেলো শোভা উঠছে না দর্শনের উপর থেকে।দর্শন নিজেও কিছু বলেনা।আচমকা হুশ ফিরতেই দূরে সরে বলে,“আমি দুঃখিত।আসলে আমি দুঃখিত না।দোষ তো আপনার।আপনি বালিশ টান দিয়েছেন তাই আমি চলে এসেছি।”
“হুমমম যেমন কান টানলে মাথা আসে,তেমন বালিশ টানাতে তুমি এসেছো।”
শোভা একটু বেশি লজ্জা পেলো।শুকনো ঢোক গিলে বলে,“ঘুমোতে হবে।”
“উপরেই ঘুমাবে।”
শোভা কিছুক্ষণ চাইলো দর্শনের দিকে।কিছু একটা বুঝে বলে,“ঠিক আছে।”
শোভা অন্যদিক ফিরে শুয়ে পড়ে।দর্শন সেদিকে চোখ রেখে আচমকা বলে,“শোনো মেয়ে তুমি আমার থেকে স্বামীর অধিকার চাইবে না।কারণ আমি তোমাকে সেই অধিকার দিব না।”
শোভা শুয়ে ঠিক দাঁতে দাঁত পিষে বলে,“এই লোকটার মাথায় আবার পোকা কিলবিল করতে শুরু করেছে।”
এবার একটু জোড়ে বলে,“আমার বয়েই গেছে আপনার মত রাগী লোককে স্বামীর অধিকার দিতে।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মুখের উপর অপমান করে দিলো শোভা!মানতে নারাজ দর্শন।আসলে এখন কিসে যে সে রাজি আর কিসে রাজি না এটাই বুঝে উঠতে পারছে না।এতদিন তো তাও একটা সিদ্ধান্তে ছিলো।মস্তিষ্কের সিদ্ধান্তে।এখন মন মস্তিষ্ক দুটোই তাকে শেষ করে দিচ্ছে।রাগে ক্ষোভে শোভার দিকে ফিরে শোভার বামহাত ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের দিকে ঘোরালো।শোভা অপ্রস্তুত হয়ে চেয়ে আছে।বাইরের চাঁদের আলোয় শোভার মুখটা জ্বলজ্বল করছে।দর্শনকেও দেখা যাচ্ছে।কারণ আজকে জোৎস্নার রাত।দর্শন কপট রাগ দেখিয়ে বলে,“আমাকে ইগো দেখানো হচ্ছে?আমাকে?তোমার যোগ্যতা কতটুকু যে আমাকে অহংকার দেখাও?আমি তোমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি তুমি আমাকে সরাতে পারবে না সেই যোগ্যতা তোমার নেই।”
“মাঝরাতে ভূতে ধরে আপনাকে?”
“কিঃ!”
“মানে হুট করে কি করছেন কি বলছেন আমি সব গুলিয়ে ফেলছি তাই।”
“তুমি কি করছ আমার সাথে?”
“আপনার কথায় সম্মতি দিলাম।”
“আই জাস্ট হেইট ইউ।”
“সত্যি?”
“ইয়েস।”
“তাহলে দূরে সরুন।”
শোভা সরতে বললেও দর্শন সরল না।বরং আরো শক্ত করে ধরে রাখলো শোভার বাহু।শোভা ছাড়ানোর চেষ্টা করলো দর্শনকে।দর্শন ছাড়ল না।না পেরে শোভা বলে,“কি হলো ছাড়ুন?”
“তোমার কথাতে?”
“আশ্চর্য!আমাকে আপনার থেকে স্বামীর অধিকার নিতে নিষেধ করেছেন এখন আপনিই গায়ে জড়িয়ে আছেন।”
দর্শনের হাত আলগা হলো।একটু সরে গিয়ে বলে,“আমি জড়িয়ে ছিলাম?”
“না কিন্তু শক্ত করে ধরে ছিলেন।”
“ঘুমাও।”
“ঘুমাতে দিচ্ছেন না তো।”
“চুপ!”
“আমি তো চুপ করবো,আপনিই কথা আগান।”
“এই মেয়ে চুপ থাকতে বলেছি না?”
শোভা রেগে গেলো।উঠে বসে বলে, “গুল্লি মারি আমার কোমর ব্যথা।থাকবোই না আপনার সাথে, বজ্জাত ব্যাটা।”
দর্শন নিজেও উঠে বসে শোভার হাত ধরে শক্ত গলায় বলে,“কোথায় যাচ্ছো?”
“নিচে ঘুমাবো।আপনি তো ঘুমোতে দিবেন না।”
“উপরে ঘুমাতে বলেছি।”
“ঘুমাবো না উপরে।”
“আমার কথা শোনো।”
“শুনবো না।”
“মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে কিন্তু মেয়ে।”
“আপনার মাথাটা মাথা,আমার মাথা কিছু না তাই না?আমারও মাথা গরম হয়।”
“গালের কোণায় একটা দিলে মাথা গরম হওয়া বুঝবে।”
“আপনার দেই একটা?”
এবার দিলো দর্শন ঠাস করে একটা থাপ্পড়।শোভা গালে হাত দিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে নিচে নেমে যেতে নিলে দর্শন যেতে দেয়না।জেদ দুজনেরই চেপেছে।কিন্তু দর্শনের শক্তি আছে বলেই জেদ পূরণ হচ্ছে তার।শোভা ছোটাছুটি করছে দেখে শোভাকে টেনে নিয়ে আসলো।শোভা এবার কান্না করেই দিলো।কান্না করতে করতে দর্শনের বুকেই মুখ রাখলো।দর্শন বুকের মাঝে ভেজা অনুভব করে।শোভার চোখের পানিতে দর্শনের বুকের মাঝখানটা ভিজে গেছে।শোভা কান্না করতেই থাকে।জেদ তার পূরণ হয়নি বলে আরো রাগ বেড়েছে।দর্শন বলে,“জেদ কমাও।”
এই ব্যাটা নিজেই একজন জেদি আবার আরেকজনকে বলে কি না জেদ কমাও।পুরুষ মানুষ বলেই পার পাবে নাকি!কোনো অস্ত্র নেই পাল্টা আঘাত করার কিন্তু শোভা তো শোভাই।বুদ্ধি খাটিয়ে কামড় বসালো দর্শনের গলায়।দর্শন একটু কুঁকড়ে উঠে বলে,“আর ইউ ম্যাড?ইনফেকশন হবে তো।”
শোভা নাক টেনে বলে,“তাতে আমার কি?আমি কি আপনার ব্যাথা দেখতে যাবো নাকি?আমি তো পাল্টা আঘাত করার ধান্দায় আছি।”
দর্শন কিছু বলতে নিয়েও বলেনি।শোভার দিকে চাইলেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়।তাই পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে।শোভা বলে,“খুব লেগেছে কি?”
দর্শন মাথা উঁচিয়ে পিছন ঘুড়িয়ে বলে,“নাহ্ খুব শান্তি পেয়েছি।চুপ করে এক কোনায় ঘুমাও।”
শোভা ঠিক তাই করলো।এই যে পোলা!এখন আবার উঠতে নিলে আরেক দফা মাইরের উপর মার চলবে।
সকালবেলা ফজরের নামাজ পড়ে শোভা ও মিতু রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।দর্শন ও শামীম বসে আছে চৌকিতে।মৌলি এখন ঘুমে আচ্ছন্ন।শোভা রুটি ভাজতে থাকে আর মিতু কিছু জিনিস গুছিয়ে দিচ্ছে।শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাগ বস্তা ভর্তি কিছু জিনিস দিলো।এগুলো মেয়েদের পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে দেওয়া হয়।শোভা চায়নি নিতে কিন্তু মিতু বলল,“আমাদের যশোরের মানুষের মাঝে আপ্যায়ন বিষয়টি কিন্তু মনের মধ্যে গেঁথে গেছে।আমরা মেয়েপক্ষ চাই ছেলেপক্ষকে সবসময় আপ্যায়ন করেই নিজেদের কাছে হাসিখুশি রাখা।”
কথাগুলো মিতু ভুল বলেনি।এমনটাই ধরা হয় যশোরের মধ্যে।এখানকার মানুষজন আপ্যায়নে প্রচুর বিশ্বাসী।আসলে খেতে দেও তারপর তিনবেলা বেশি বেশি আয়োজন করা যাওয়ার সময় ব্যাগ ভরে জিনিস পাঠানো।এগুলো তো আছেই।
অবশেষে নিজের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাবে শোভা।দর্শনের কোলে বসে মৌলি একহাত দিয়ে জড়িয়ে আছে শোভাকে।দুজনকে নিয়েই কান্না করে দিলো।কান্না কণ্ঠে বলে,“যেও না পিপি।”
শোভা মৌলিকে আদর করে বলে,“যেতে হবে কি করব?”
“আমি কান্না কলব।”
শোভাও কান্না করে দেয়।আগেরবার হুট করে যাওয়ায় তেমন অনুমান ছিলো না তাই কান্না আসেনাই কিন্তু এখন কান্না আসছে।অচেনা শহরে চলে যাবে কাল।মিতু মৌলিকে কোলে নিয়ে বলে,“কালকে তো যাবো পিপির সাথে দেখা করতে।”
“না পিপি যাবে না।”
বলেই হাউমাউ কান্না মৌলির।শোভা এই কান্না সহ্য করতে পারলো না।শামীম নিজেও চুপ করে দেখছে।কান্না না করলেও বোনকে বিদায় দিতে ভাইয়ের কষ্ট আলাদা।মিতু ইশারা করে বলে,“বোনকে গাড়িতে বসিয়ে দেও।”
শামীম নিয়ে গেলো শোভাকে।এদিকে হাউমাউ করে কান্না করতে করতে মৌলি বলে,“পিপি পিপি..।
শোভা পিছন ঘুরতে চাইলেও শামীম গাড়িতে বসিয়ে দিলো।পিছনে তাকাতে নিলে বলে,“কষ্ট বাড়বে ওর।একটু পর এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।”
দর্শন ওপর প্রান্ত থেকে ঢুকে বসে।শামীমের উদ্দেশে বলে,“কাল দুপুর সাড়ে তিনটায় বের হবো।আপনারা স্টেশনে আসবেন দেখা হবে।”
শামীম মাথা উপর নিচ করে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানায়।শোভার কান্না পাচ্ছে খুব।সে কান্নাই করছে।দর্শন গাড়ি চালানো শুরু করে।পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে এখনও কান্না করে যাচ্ছে মৌলি।বাচ্চা মেয়েটার ফর্সা মুখের গোলাপী ঠোঁট বেকিয়ে চোখ থেকে পানি ঝড়িয়েই যাচ্ছে।মেয়ের কান্না দেখে মিতু নিজেও কান্না করে মেয়েকে বুকের মধ্যে মিশিয়ে নেয়।তাদের কিছুই করার নেই।এটাই তাদের নিয়তি।মেয়েরা সারাজীবন বাবার বাড়িতে থাকতে পারেনা,তাদেরকে বাবার বাড়ি থেকেই এক সময় বিদায় নিতে হয়।
শোভাদের বাসা থেকে দর্শনদের বাসায় আসতে বেশি সময় লাগেনা।গাড়িতে করে পনেরো মিনিট।বাড়িতে পৌঁছতেই দিজা এসে বলে,“তোমরা এসেছো।আমি অনেক্ষন ধরে অপেক্ষা করছিলাম।”
দর্শন ডাক দেয় দিদারকে,“গাড়িতে কিছু জিনিস আছে ওগুলো নিয়ে আসতে হবে।”
দাদাজান জানান,“ওগুলো আবার দিলো কেন?”
“এগুলো নাকি নিয়ম।তোমরাই তো ভালো জানো আমি কি এসব বিষয়ে পিএইচডি করেছি?”
বলেই দিদারকে নিয়ে চলে গেলো।দাদাজান বিড়বিড় করে বলেন,“কোনো উন্নতি নেই দেখছি।”
দিজা এসে বলে,“অনেক উন্নতি হয়েছে দাদাজান।কালকে একটা গান শুনিয়েছিল।তুমি তো ওই সময় ঘুমাও তাই তোমাকে জানানো হয়নি।”
দাদাজান অবাকের সাথে বলেন,“তাই নাকি!এত পরিবর্তন?”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ১৭
“হুমমম।”
“হইলেই ভালো।শোনো ঢাকায় যেয়ে ওদেরকে সবসময় একসাথে রাখার চেষ্টা করবা।তুমি চেষ্টা না করলে ওরা কিন্তু এক হতে পারবে না।”
“আচ্ছা দাদাজান চেষ্টা করব।’’
“মিয়া বিবিতে মিলে গেলেই আমার শান্তি।”
দিজা মুখ টিপে হাসলো।
