Home বাবুই পাখির সুখী নীড় বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৫

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৫

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৫
ইশরাত জাহান

শোভা এগিয়ে এসে দিজার উদ্দেশে বলে,“কোনো সাহায্য লাগবে?”
দিজা জানায়,“না ভাবী।তুমি ভাইয়ার কাছে যাও।”
দিজা ইশারা দিয়ে বুঝালো।শোভা বুঝতে পারে।দর্শনের পাশে এসে বসে।ভাব এমন যেনো গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না।অথচ এই মেয়েই প্রথমদিকে কতই না যুদ্ধ করতো এমন উগ্র স্বভাবের লোকটার সাথে।দর্শনের মাঝের আচরণ শোভাকে আতঙ্কে ফেলে।এরপর যেনো শোভাও চেঞ্জ।আজ সাহস জুগিয়ে শোভা প্রথমে বলে,“আমি সাহায্য করে দেই?”

শোভার কথা শুনে দর্শন তাকালো শোভার মুখের দিকে।মেয়েটার মধ্যে আগের সেই সাহসিকতা না পেয়ে দর্শন নিজেও হতাশ।শোভার কথার উত্তর না দিয়ে নিজের মত কাজ করছে।তুহিন ও দিজা মিলে আগুন ধরালো।তুহিন গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,“আগুন ধরানো হয়েছে।চিকেন নিয়ে আয়।”
তুহিনের পাশে বসে থেকেও দিজার মনটা ভার হয়ে আছে।তুহিন একটুও দিজার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছে না।দিজার সাথে কথাও বলছে না।দিজা মনক্ষুন্ন হয়ে আছে।আবার অপেক্ষাও করছে এখনই সিনথিয়া আসবে নতুন কোনো অশ্লীল সাজ নিয়ে। দিজাকে মনক্ষুন্ন দেখে দর্শন প্রশ্ন করে,“তোর কি হলো?”
দিজা আনমনে মনে,“কি আর হবে?সিনথিয়া আপুর এসব কাণ্ড দেখে বিরক্ত লাগছে।”
বলেই দিজা জিহ্বা কামড়ে ভয়ের সাথে তাকালো দর্শনের দিকে।মাথা নাড়িয়ে বলে,“কিছু না।”
দর্শন কিছু না বলে মুরগিস পিসগুলো রাখে নেটের উপর।শোভা পাখা নিয়ে বাতাস দেয় আর আগুনের ফুলকি জ্বলে ওঠে।একপাশে শোভা অন্যপাশে দিজা বাতাস করতে থাকে।সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি হয়েছিল।তাই আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা।মুখ বাঁধা থাকলেও শোভার কাছে আনন্দ লাগছে।দিজা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাত নারলেও এবার সাহস দেখিয়ে বলে,“পিকনিকে আনন্দ নেই।”
তুহিন তাকালো দিজার দিকে।দর্শন না তাকিয়েই বলে,“কি করলে আনন্দ পাবি?”

“তোমরা তো গান গাইতে পারো।দুই বন্ধু মিলে গান শোনাও আমাদের।আমরা গান শুনে বার্বিকিউ বানাতে থাকি।”
“গিটার নিচে আছে।”
দিজা বলে,“আমি নিয়ে আসি।”
দর্শন সম্মতি দেয়। দিজা যেতেই শোভা ও দর্শনের মাঝে নিজেকে একা একা লাগে তুহিনের।তাই ফোন হাতে নিয়ে অন্যদিকে যায়।দর্শন চুপচাপ ফোন টিপছে।শোভা একবার দর্শনকে দেখছে আরেকবার পাখা দিয়ে আগুনের ফুলকি তৈরি করতে বাতাস করছে বর্বিকিউয়ের দিকে।কিছুক্ষণ এমন করতে করতে পাখা এমন জোরে চালায় যে ফুলকি ছিটে শোভার মুখের দিকে আসে।শোভা চিৎকার করতেই দর্শন মোবাইল রেখে শোভার কাছে ছুটে আসে।শোভার চোখ দেখতে দেখতে বলে, “মন কোথায় থাকে তোমার?”
শোভা মৃদু হেসে বলে,“আপনার দিকে।”
দর্শন পরখ করে দেখলো শোভাকে।শোভার কপালে হাত ছুঁয়ে বলে,“আর ইউ ওকে?”
শোভা উল্টো প্রশ্ন ছুড়লো,“কিছু হবার কথা ছিল আমার?”

“জ্বর ছিলো তো।”
বিষন্ন মনে শোভা বলে,“এখন জিজ্ঞাসা করছেন?”
দর্শন গলা খাঁকারি দেয়। দিজা ছাদে আসার আগে সিনথিয়াকে সাজতে দেখে রাগ করতে করতে উপরে ওঠে।এখন ছাদে এসেই মুখে হাসি ফোটে।দর্শন আর শোভাকে একসাথে দেখে।তুহিন একবার শোভার চিৎকার শুনে তাকায় কিন্তু দর্শন ওর বউকে দেখে নিবে বলে তুহিন এগোলো না।তুহিন সাহায্য করতে গেলেই দর্শনের শত্রু লিস্টে নাম পরে যাবে।
দিজা সাথে সাত কয়েকটা ছবি তুলে নেয়।তুহিন দেখে মৃদু হাসে।মনে মনে বলে,“পাগলী একটা।”
ছবি তোলা শেষ করে দিজা গিটার দিয়ে বলে,“এই যে গিটার।”
দর্শন গিটার নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,“কি গান শুনবি?”
“যেকোনো কিন্তু বাংলা গান।”
দর্শন হালকা হাসলো।তুহিন মুরগির পিসগুলো উল্টে অল্প করে বাটার ব্রাশ করে দেয়।দর্শন গিটার বাজানো শুরু করে।চোখ বন্ধ করতেই নিজের সংসার জীবনের সমস্ত মুহূর্ত চোখের সামনে ভেসে আসে।শোভাকে অবহেলা করতে গিয়েও আজ ব্যর্থ হলো দর্শন।কতবার অবহেলা করেছিল কিন্তু শেষে এসে ধরা পড়ে।শোভার কি হলো দেখতে ছুটে গেলো।নিজেকে ব্যর্থ ভাবা দর্শন গাইতে থাকে নিজের মত করে।গানের মাঝ বরাবর এসে গায়…

মন যে কেন মানে না, তুমি ছাড়া কিছু বোঝে না
আর যাতনা সহে না, সহে না
মন যে কেন মানে না, তুমি ছাড়া কিছু বোঝে না
আর যাতনা সহে না, সহে না
তবু তোমার প্রেমে আমি পড়েছি
বেঁচে থেকেও যেন মরেছি
তোমার নামে বাজি ধরেছি, ধরেছি
তোমার প্রেমে আমি পড়েছি
বেঁচে থেকেও যেন মরেছি
তোমার নামে বাজি ধরেছি, ধরেছি
দর্শনের গানের কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল শোভা।হিজাবের আড়ালে মুচকি হেসে দর্শনকে দেখছে।সিনথিয়া চলে এসেছে এতক্ষণে। এসেই দর্শনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশংসা শুরু করে দেয়।শোভার মুখ গোমড়া হয়ে গেলো। দিজা বিরক্ত হয়ে বলে,“আসতে না আসতেই শুরু!”
সিনথিয়া অবাক হয়ে বলে,“কিসের শুরু?আমি কি মিথ্যা বলেছি?দর্শনের কণ্ঠ আসলেই নেশা লাগিয়ে দেয়।দর্শন যদি সিংগার হতো তাহলে তাহলে ফরাজি বাড়ির আশেপাশে সবাই বলত সিংগারের বাড়ি এটা।এই যেমন আমার বাড়ির পাশ দিয়ে সবাই বলে নায়িকার বাড়ি এটা।মম তো আমাকে কত কত কথা বলে খুশি হয়ে।”

দিজা মুখ ভেংচি দেয়।কটাক্ষ করে বলে,“নিজের গল্প নিজে দেওয়া মানুষদের সুনাম যে কত আসে এটা তো দেখতেই পাই।”
সিনথিয়া কথা এড়িয়ে গেলো।এদেরকে ধৈর্যের সাথে শেষ করতে হবে।তুহিন হেসে দেয় দিজার কথা শুনে।দর্শন গিটার এগিয়ে দিয়ে তুহিনের উদ্দেশে বলে,“তুইও গান গা।”
সিনথিয়া অবাক হওয়ার মতো হাসি দিয়ে বলে,“মিস্টার হ্যান্ডসাম তুমিও গাইতে পারো?”
দর্শন তুহিনের প্রশংসা করে বলে,“আমার মধ্যে যেসব গুণ আছে তুহিনের মাঝেও একই গুণ আছে।দুজনেই একসাথে ঘুরেছি একসাথে সবকিছুর কোর্স করেছি শুধু দুজনের ক্যারিয়ার আলাদা রেখেছি।”
তুহিন নাকোচ করে বলে,“আমার গাইতে ইচ্ছা করছে না।”
দর্শন জোর করে বলে,“গা না ভাই।সবাই আগ্রহ নিয়ে শুনতে চাইছি।না করিস না।আমার বোনের বোরিং লাগছে।”

তুহিন কথা না বাড়িয়ে গিটার হাতে নিয়ে গাইতে শুরু করে,
পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে
স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে,
ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী
আ হা হা হা হা, আ.. হা,
আ হা হা হা হা, আ.. হা,
আ হা হা হা…..
ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে
যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে,
ঘুচে গেছে বেশ কাল সীমানার গন্ডি
আ হা হা হা হা, আ.. হা,
আ হা হা হা হা, আ.. হা
আ হা হা হা হা…
ভেবে দেখেছো কী??
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে,তারো দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে,
ভেবে দেখেছো কী??
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে,তারো দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
তুহিনের গান শুনে হঠাৎ করেই দিজা চমকে উঠল।গানের কথাগুলো মনকে আরো বিষন্ন করে দেয়।সিনথিয়া হামি তুলে তুহিনের সামনে এসে অভিনয় করে বলে,“তোমার কণ্ঠ তোমারই মতো আকর্ষণীয় মিস্টার হ্যান্ডসাম।”

তুহিনের কাশি উঠলো।দিজা পানির বোতল এগিয়ে দিলো তুহিনের দিকে।সিনথিয়ার দিকে চেয়ে বলে,“সবাই তো রান্নার কাজে হাত লাগাচ্ছে।তুমিও একটু কাজ করো।”
সিনথিয়া নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে ইশারা করে বলে,“আমি?”
“হ্যাঁ,তুমি।”
“আমি রান্না পারি না।”
“সারাদিন হ্যান্ডসাম দেখতে থাকলে সাংসারিক কাজ পারবে কিভাবে?চলো আমার সাথে রান্নার কাজে সাহায্য করবে।”
সিনথিয়া দুই হাত দেখিয়ে বলে,“ম্যানিকিওর করেছি আমি।”
দিজা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,“রাক্ষসের মত দশটা নখ রেখে ম্যানিকিওর করলেই কি মেয়েদের জীবন উজ্জ্বল হবে?রান্না শিখে হ্যান্ডসাম ছেলেদের খাওয়াতেও তো হবে।চলো আমার সাথে।”
“আমি পারব না।”
“কেন পারবে না?হ্যান্ডসাম ছেলেদের একটু হাতের রান্না খাওয়াতে পারবে না?তাহলে জীবনে করলে টা কি?”
“কয়লার কালী আমার হাত নষ্ট করে দিবে।”
দিজা এবার হেঁয়ালি করে বলে,“তোমার থেকে আমার ভাবীই ভালো।এত টাকা খরচ করে হাতটাকে সুন্দর বানিয়ে রেখেছো কিন্তু কোনো কাজে লাগাতে পারবে না।আমার ভাবী পার্লারে না গিয়ে কয়লায় কাজ করেও হাতগুলো কি সুন্দর রেখেছে।বলতে হবে আমার ভাইয়ের ভাগ্য আছে।বউ রূপবতী তো আছেই সাথে গুণবতী।”

শোভা দুজনের ঝগড়া শুনে মজা নিচ্ছে আর নিজের নিকটে থাকা বারবিকিউ নিয়ে একটু একটু ছিঁড়ে হিজাবের নিচ থেকে হাত ঢুকিয়ে মুখে পুড়ছে। দিজার কথা শুনে মনে মনে খুশি হয় শোভা।নিজের প্রশংসা শুনছে আর ঝগড়া দেখছে।এর থেকে ভালো কোনো মুহূর্ত শোভার কাছে কিছুই হয়না।এদিকে দর্শন দেখে শোভাকে হিজাবের নিচ থেকে হাত ঢুকিয়ে খেতে।শোভার পাশে এসে বসে।হালকা কাশি দিতেই শোভা চমকে ওঠে।পাশ ফিরে দর্শনের দিকে তাকিয়ে বলে,“কিছু বলবেন?”
“কমফোর্টবল হয়েই খাও।কেউ কিছু বলবে না।”
শোভা হাসলো।দেখা দিলো না সেই হাসি।দর্শনের সামনে লেগপিস ধরে বলে,“আপনিও খান।”
দর্শন ভ্রুকুটি করে তাকায়।শোভা একদম স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,“তুহিন ভাইয়া আছে তো তাই মুখ খুলতে পারছি না।আমার মুখ তো আপনি ছাড়া কেউ দেখেনি।দেখবেও না।”
দর্শনের মন চাইছে বউকে জড়িয়ে গাল ভরে চুমু দিতে।এমন কথা এতদিন বলেনি কেন তার বউ?শোভার এই কথার জন্য দর্শনের উচিত শোভাকে কিছু উপহার দেওয়া।কি দেওয়া যায় ভাবতে ভাবতে দর্শন দ্রুত ফোন হাতে নিয়ে শোভার জন্য ব্র্যান্ডের একটি পেজ থেকে গুণে গুণে দশটা শাড়ি আর খুব সুন্দর দেখতে পনেরোটা গাউন অর্ডার দেয়।গাউনের সাথে পড়বে বলে ম্যাচিং হিজাবও অর্ডার দিলো।এগুলো আসতে সময় লাগবে দুইদিন।ততদিনে দর্শনের কাজ সম্পূর্ণ হবে বলে আশা করা যায়।
দর্শনকে ফোনে ব্যাস্ত থাকতে দেখে শোভা একটু উকি দিয়ে বলে,“আমি আপনার সাথে কথা বলছি আপনি ফোনে ব্যাস্ত কেন?”

দর্শন ফোন বন্ধ করে বলে,“ইম্পর্ট্যান্ট কাজ ছিল।”
“আমার থেকেও ইম্পর্ট্যান্ট?”
দর্শন আজকে শোভাকে নিয়ে আকাশে উড়াল দিতে চাইছে।তার বউ হঠাৎ কিউট কিউট কথা বলছে।একদম তার মতো করেই জাজ করছে।আনমনে ঠোঁট প্রসারিত হয় দর্শনের।মাথা নাড়িয়ে বলে,“কাজটা যদি তোমাকে নিয়েই হয় তাহলে কি এই কাজকে ইম্পর্ট্যান্ট বললে ভুল হবে?”
শোভা চমকে বলে,“আমাকে নিয়ে?কি কাজ?”
“এখন বলব না।ধৈর্য ধরো।”
“ঠিক আছে।”
“পারবে তো ধৈর্য ধরতে?”
“অধৈর্য ছিলাম কি আমি?”
“না,আমার মতো মানুষের সাথে থাকতে ধৈর্যের প্রয়োজন।এটা আমি অস্বীকার করেছি না।কিন্তু আমি চাই আরো বেশি ধৈর্য ধরো।”

শোভা আশ্বস্ত করে বলে,“আমার ধৈর্য ততদিন থাকবে যতদিন না আপনি আমাকে অসম্মান করবেন আর প্রতারণা করবেন আমার সাথে।আমি প্রতারক সহ্য করতে পারিনা।”
“তোমার থেকে আমি তাদেরকে আরো বেশি ঘৃণা করি।”
দিজা এতক্ষণ সিনথিয়ার সাথে ঝামেলা করলেও এখন চুপচাপ মুখ ঘুরিয়ে দর্শনকে শোভার সাথে গল্প করতে দেখে মুচকি হাসে।তুহিন ফোনে আবারও ব্যাস্ত দেখায় নিজেকে।এখানে তার কিছুই করার নেই উল্টো নিজেকে একা একা লাগছে। দিজা এটা অনুভব করে দর্শনকে বলে,“বার্বিকিউ হয়েছে।প্লেট নিয়ে আসব?”
দর্শন শোভার থেকে চোখ সরিয়ে বলে,“না, কলা পাতা কিনেছি।”
শোভা মুখ বেঁকিয়ে বলে, “কলা পাতা কেনা লাগে!”

“হ্যাঁ লাগে।”
“বাগানেই তো আছে।”
“আনহাইজেনিক।”
“বাজারে হাইজেনিক!”
সিনথিয়া মুখ ভেংচি দিয়ে বলে,“তুমি এসবের কি বুঝবে?দর্শন কি ফকির নাকি যে বাগান থেকে কলাপাতা কেটে আনবে।ও হলো কোটিপতি।এগুলো কেনা ওর কোনো ব্যাপারই না।”
শোভা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,“আপনার মুখ সেলাই করার জন্য সুই সুতো কেনাটাও হয়তো তার কাছে কোনো ব্যাপার না।”
সিনথিয়া আঙুল উঁচিয়ে বলে,“ইউ!”
তুহিন মুখে হাত দিয়ে হাসে।দিজাও হাসছে।পাশে বসে দর্শন সেও মজা নিচ্ছে।শোভা উত্তরে জানায়,“এই এম ইউর সিস্টার ইন লো।”
সিনথিয়া চোখ ছোট ছোট করে বলে, “হোয়াট!”

“কানে কি কম শোনেন?আমি বলেছি আই এম ইউর সিস্টার ইন লো।মানে ভাবী।আপনার ফুফাতো ভাইয়ের একমাত্র প্রথম এবং জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত থাকা লিগ্যাল বউ।”
সিনথিয়া হাত দিয়ে মুখে বাতাস করে ব্যাঙ্গাত্মক আকারে বলে, “হাহ।”
দর্শন এবার কলাপাতা বের করে বলে,“কিনতাম না কিন্ত সন্ধ্যার পরে আসতে আসতে দেরি হয়ে যায় তো তাই কিনে এনেছি।বাসায় এসে আবার ছুরি নিয়ে বাগানে গিয়ে পাতা কেটে সেগুলো ফুটন্ত পানিতে ধোয়ার ঝামেলা নিতে মন চাইছিল না।হঠাৎ করেই কেনাকাটার সময় চোখে পড়ল তাই কলাপাতায় খাওয়ার প্লান করেছি।আগে থেকে প্লান করলে পাতা কেটেই ধুয়ে রাখতার।”
দিজা পানি নিয়ে আসে।তুহিন এগিয়ে এসে বলে,“আমার কাছে দে।তুই পাতাগুলো ধুতে পারবি না।”
দর্শন পাতাগুলো দিয়ে শসার ছুলতে নেয়।শোভা বলে,“আমাকে দিন।”
“আমি করছি।তুমি আমার ফোন দিয়ে দাদাজান আর তোমার ফোন দিয়ে শামীম ভাইজানের কাছে কল দেও।সবাই দেখুক আমাদেরকে।”

শোভা তাই করলো।দুই ফোন দিয়ে দুজনকে কল দিয়ে নিজেদের পিকনিকের আয়োজন দেখাচ্ছে।শামীমের কোলে বসে মৌলি হাততালি দিয়ে বলে,“আমি খাবো আমি খাবো।”
দর্শন হেসে বলে,“আমরা যশোরে আসলেই তোমাকে নিয়ে পিকনিক করবো মামণি।”
মৌলি খুশিতে হাততালি দেয়।পিছন থেকে মিতু ভাবী উকি দিয়ে দেখছে সবকিছু।দাদাজান রসিক সুরে বলেন,“আমার নাতির তো দেখি ভালোই উন্নতি হয়েছে।কাল বউকে নিয়ে রাতের বেলা বৃষ্টিতে ভিজলো আজকে আবার পিকনিক করে।বলি কি বউকে যত্ন করতে গিয়ে আমাদেরকে ভুলেই গেলে নাকি?”
দর্শন গম্ভীর হয়ে বলে,“ভুলে গেলে কল দিতাম নাকি?”
দাদাজান অভিমানের ভাব করে বলে,“আগে তো দিনে দশবার কল দিতে।এখন বউকে পেয়ে বুড়োকে ভুলেই গেছো।”

দর্শন মৃদু হেসে বলে,“তাহলে স্বীকার করলে তুমি বুড়ো হয়েছো?”
দাদাজান কপট মেজাজ দেখিয়ে বলেন,“বুড়ো হবে তোমার বাপ।আমি এখনও জোয়ান।শুধু চুল পেকেছে অল্প বয়সে।”
দিজা লজ্জাজনক হেসে এক পলক তুহিনের দিকে তাকালো।তুহিনের মুখেও প্রাণবন্ত হাসি তবে মুচকি দিয়ে।দিজা ইতস্তত বোধ করে বলে,“আমার দাদাজান এমনই।”
তুহিন সম্মতি দিয়ে বলে,“জানি আমি।”
পাতাগুলো ধুয়ে তুহিন একেকটা পাটির উপর রাখে।শোভা ক্যামেরা সেদিক করতেই দাদাজান বলেন,“তুহিন ভাই কেমন আছো?”
তুহিন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলে,“আসসালামু আলাইকুম,ভালো আছি দাদাজান।আপনি কেমন আছেন?”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম।আছি ভালই।তবে খুব বেশি ভালো নেই। একটু বললে ভুল হবে খুব বেশি দুশ্চিন্তায় আছি।”
তুহিন প্রশ্ন করে,“কেন দাদাজান?”
দাদাজান হতাশ হবার মতো করে বলেন,“নাতিটার বয়স বাড়ছে বাতাসের গতিতে।বিয়ে দিলাম সঠিক সময়ে।কিন্তু বেচারা বাপ হতে পারলো না বিয়ের এই চার বছর পার হয়ে পাঁচ বছরে এসেও।”
তুহিনের বিষম এলো। খুকখুক করে কাশছে।দাদাজান দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,“আহারে বেচারা,বন্ধুর বাবা হবার কথা বলেছি তুমি লজ্জায় কেশে দিলে।অথচ যার লজ্জা করার কথা তার কোনো লজ্জাই নেই।”
“আমার লজ্জা করবে কেন?”
“ওই দেখো ছেলে বলে কি?বিয়ের বয়স বাড়ছে অথচ বাবা হতে পারল না।এটা লজ্জার না তো কিসের কথা?মানুষজন শুনলে তো তোমার দিকে আঙুল তুলবে।”
দর্শন বিরক্ত হয়ে বলে,“দাদাজান!”

“দাদাজান দাদাজান করবে না।এই দাদাজানের কাছে বড় হয়েও জীবনে কিছু শিখলে না।আমি তোমাকে শিক্ষা দিতে ব্যার্থ হয়েছি।তাই তো আজও বড় বাবা হতে পারলাম না।পোড়া কপাল আমার।”
“এখানে সবাই আছে।”
“সবাই তোমাকে নিয়ে মনে মনে দুশ্চিন্তা করে।আমি অত চাপা স্বভাবের না।চেপে রেখেও বা কী হবে?তোমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতে স্ট্রোক না করে আমি সবকিছু খোলাশা করে কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করি।কি বলো তুহিন মিয়া?”
তুহিন বিপাকে পড়ে বলে,“আমাকে ঠেলছেন কেন দাদাজান?”
দাদাজান তুহিনের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে বলেন,“কেমন বন্ধু তুমি?ছেলেটার বয়স বাড়ছে টাকাপয়সা বাড়ি গাড়ি সব হয়েছে এখনও তাকে বাবা হবার জন্য ইন্সপায়ার করছো না?”
তুহিন হা হয়ে বলে,“আমি বলব!”

“এসব কথা বন্ধুরাই তো বলে।একজন বন্ধু পারে ওপর বন্ধুকে কোনো কাজে উদ্যোগ গ্রহণে গঠনমূলক কথা বলে সাহায্য করতে।”
তুহিন বিপাকে পড়তেই দাদাজান বলেন,“এ দেখি নিজেই লজ্জায় নেতিয়ে পড়ছে।অবশ্য যে ছেলে বুড়ো হতে যাচ্ছে তাও বিয়ে করছে না সে আবার আমার নাতিকে কিসের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ইন্সপায়ার করবে!”
দর্শন এবার রাগ দেখিয়ে বলে,“দাদাজান!”

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৪

দাদাজান থামলেন না।মুখের উপর বলে, “পারো তো শুধু লোকজনের উপর রাগ দেখাতে,মারতে আর ধমকাতে।বাবা হবার জন্য উদ্যোগ নিতে তো কোনোদিনও পারবে না।এই নিয়ে খোঁচা মারলে আবার গায়ে ফোসকা পড়ে।”
মিতু ভাবী ইশারা করে শামীমকে এদের কাণ্ড দেখতে বলে পিছনে পিছনে হাসে।শামীম তো চাইছে লজ্জায় কল কেটে দিতে।কিন্তু বিদায় না জানিয়ে পারছে না কাটতে।

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৬৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here