বিয়ে পাগলি পর্ব ১
নিলুফা নাজমিন নীলা
আজ আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। আমি তো মহা খুশি! আয়নার সামনে বসে সাজুগুজু করছি। এই নিয়ে এগোরোটা বিয়ে ভেঙেছে এবারেরটা ভাঙলে আর চলবে না। তাই আজ যেভাবেই হোক, আমাকে সুন্দর লাগতেই হবে।
নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছি। আয়নায় নিজেকে ভালো করে দেখে নিচ্ছি, চুলের ভাঁজ ঠিক করছি, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। মনে মনে ভাবছি “আজ সব ঠিকঠাক হলে, আমার জীবন নতুন পথে যাবে।”
ঠিক তখনই মা রুমে ঢুকল।
“সায়রা কই রে তুই?”
আমি মুখে হাসি টেনে বললাম, “দেখো তো মা, কেমন লাগছে আমাকে?”
মা আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এসব কি? এত সেজেগুজে আছিস কেন?”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“আজ আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে, তাই…”
মা আমার মাথায় আলতো চাপ দিল, রাগী গলায় বলল,
“পাত্রপক্ষ আসবে বিকেলে… আর এখন সকাল ১০টা বাজে!”
তাতে কি হয়ছে সব কিছু আগে আগে করে রাখাই ভালো বুঝলে।
বিকালে পাত্রপক্ষ এসেছে।কিন্তু আমি এখনো রুমে আমাকে কেউ ডাকছেই না মানে বুঝলাম না পাত্র কি আমাকে না দেখেই বিয়ে করে ফেলবে।আমি ঘরের ভেতর পায়চারি করছি।
নাহ আর পারব না রুমে থাকতে। এবার রুম থেকে বের হয়ে কিচেনে গেলাম।কারণ পাত্র পক্ষের সামনে তো আর খালি হাতে যাওয়া যায়না।
খুব যত্ন করে শরবত বানিয়ে নিয়ে হাজির হলাম ড্রয়িংরুমে মা বাবা আমাকে দেখে অবাক হলো।
বাবা মায়ের কানে কানে বলল,
“দেখছো তোমার মেয়ে কতটা নিলজ্জ সবার সামনে একা একা এসে হাজির।”
মা রাগী রাগী মুখ করে বলল,
“যেভাবে বলছো মনে হচ্ছে এটা আমার একার মেয়ে!তোমার মতোই হয়ছে।ঠিক বাপের স্বভাব নিলজ্জ।”
বাবা এবার হাসি মুখে বলল,
“আমার মেয়ে সায়রা।”
আমি সবাইকে চোখ তুলে দেখে নিলাম ছেলের বাবা মা বোন আরো দুইটা ছেলে কিন্তু কোনটা পাত্র সেটা বুঝতে পারছিনা।তখন একটা ছেলের দিকে চোখ গেল বেশ হ্যান্ডসাম পড়নে সাদা শার্ট। আমি তো প্রথম দেখাতেই ক্রাশ খেয়ে গেলাম।
আমি শরবতের গ্লাস গুলো টেবিলের উপর রাখলাম।
আমি এবার সবার উদ্দেশ্য সালাম দিলাম।পাত্রের মা বলল,
“বসো মা।”
আমি মা বাবার পাশে গিয়ে বসলাম।সেই সাদা শার্ট পড়া ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম।ছেলেটাও মুচকি হাসলো।ছেলের বাবা জিজ্ঞেস করল,
“মা তুমি এখন কোন ক্লাসে পড়ো?”
আমি হেঁসে বললাম,
“এবার অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষে কিন্তু তৃতীয় বর্ষে থাকার কথা ছিল।”
পাত্রের বোন বলল,
“কেন কি হয়েছিল?”
আমি দুঃখ ভরা মন নিয়ে বললাম,
“আর বইলেন না জীবনটাই আমার বেদনা। কত মানুষে কত ন’কল করে পরিক্ষায় পাশ করে কিন্তু আমার কপালটাই খারাপ বুঝলেন।এইচএসসি পরিক্ষা দেওয়ার সময় ভাবলাম একটু ন’কল করি কিন্তু ভাগ্যক্রমে ধরা পড়ে যাই সেই কারণে আমাকে পরিক্ষার হল থেকে বের করে দেয় পরে ফেইল করি।”
পাত্র পক্ষ একজন আরেকজনের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছে।
বাবা মা আমার দিকে রাগী দৃষ্টিতে থাকালো।
মা এবার হেসে বলল,
“আমার মেয়ে কিন্তু পড়াশুনায় ভালো এসএসসিতে A+ পায়ছে।”
পাত্রর মা বলল,“তাহলে এইচএসসিতে ন’কল করার কি দরকার ছিল?”
আমি বললাম,
“আসলে আমার খুব শখ ছিল নকল করার কিন্তু কোনো ভাবেই আমার শখ পুরন হচ্ছিলোনা তাই ন’কল করেছিলাম।”
সাদা শার্ট পড়া ছেলেটা বলল,
“সেই এক্সপেরিমেন্ট টা তো আপনি এমনি ক্লাস টেস্ট পরিক্ষায়ও করতে পারতেন শুধু শুধু কেন বাঁশ খেতে গেলেন।”
“করেছিলাম ক্লাসে অনেক নকল কিন্তু কোনো স্যার ম্যাডাম বিশ্বাসই করতোনা আমি নকল করে লেখতে পারি।আর সত্যি কথা হলো আমার বাঁশ খেতে ভালোই লাগে। ”
পাত্রের বোন আমার বানানো শরবতের একটা গ্লাস হাতে নিয়ে চুমুক দিতেই মেয়েটার মুখের রং পরিবর্তন হয়ে গেল।তাড়াতাড়ি মুখ থেকে ফেলে দিল।
“এটা কি শরবত নাকি অন্য কিছু লবণে ভরা।আর কেমন হলুদের গুড়ার মতো স্মেইল আসছে।”
আমি বললাম,
“ও তাহলে মনে হয় আমি চিনির বদলে ভুলে লবণ দিয়ে ফেলছি আর ট্যাং-এর বদলে হলুদ দিয়ে ফেলছি সরি হুহ।”
মেয়েটা বিরক্ত নিয়ে বলল,
“হ্যা হ্যা বুঝতে পারছি।”
সবাই চুপ করে বসে আছে।আমি বললাম,
“আচ্ছা আপনাদের কি আমাকে পছন্দ হয়েছে?”
আবারো সবাই একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।বাবা আমাকে বলল,
“দোহাই লাগে মা আমার মান সম্মান আর নষ্ট করিস না।”
আমি বাবার দিকে কিছুক্ষন বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম কিছুই বুঝলাম না আমি কীভাবে মান সম্মান খেলাম।
এবার ছেলের বাবা বলল,
“আমরা এই বিয়েটা দিতে রাজি ন…
বাকি কথাটা শেষ করতে দিলনা পাশে বসা স্যুট কোর্ট পড়া ছেলেটা।তিনি বলল,
“আমি মেয়ের সাথে আলাদা কথা বলতে চাই।”
আমি মনে মনে ভাবলাম ও তার মানে এটা পাত্র পক্ষ তাহলে আমি এতক্ষণ ভুল ভেবেছিলাম।থাক সমস্যা নাই ওইটার থেকে এই ছেলেটা একটু বেশিই সুন্দর।
আমার বাবা বলল,
“হ্যা হ্যা ওরা কথা বলুক তার পর না হয় আমরা সিদ্ধান্ত নিব।”
আমি আর ওই ছেলেটা দাড়িয়ে আছি ছাঁদে। ছেলেটাকে খুব ভালো ভাবে পরখ করছি।খুব সুদর্শন দেখতে বেশ লম্বা সুঠাম দেহীর অধিকারি।চুল গুলো পরিপাটি।চাপ দাড়ি।গায়ের রঙটা তেমন সাদা না শ্যামলা রঙের।থাক সমস্যা নাই বেশি সাদা থাকলে আবার মুলার মতো দেখা যায়।
কিন্তু আমার বিরক্ত লাগছে কতক্ষণ ধরে আমি দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু লোকটা কোনো কথায় বলছে না।আমি আগে কথা বলব না বললে বলবে আমি বাঁচাল।
লোকটা এবার নিরবতা ভেঙে বলল,
“ আমার নাম শাওন।আমি ইন্জিনিয়ার।”
আমি মাথা নিচু করে ছোট করে বললাম,
“ও ভালো।”
ছেলেটা বলল,
“মনে হচ্ছে আপনি লজ্জা পাচ্ছেন?কিন্তু ওইখানে তো খুব পটপট করছিলেন।”
এবার আমি মাথা তুলে হাসলাম বললাম,
“লজ্জা পাচ্ছিনা আসলে একটু ভালো সাজার চেষ্টা করছিলাম তো। আসলে এবার বিয়েটা হয়ে গেলে খুব ভালো হতো।”
“কেমন ভালো হতো।”
“আপনি আমার এক ডজন।”
শাওন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করল কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে বলল,
“এক ডজন মানে?”
“এই পর্যন্ত এগারোটা ছেলে আমাকে দেখে গেছে কিন্তু কেউ আমাকে পছন্দ করেনি। আপনাকে নিয়ে বারোজন।তার মানে বারোটি সমান এক ডজন।হিসাব না বুঝলে খাতা নিয়ে আসি।”
শাওন আমার কথা শুনে ঠাস্কি খেয়ে গেল।
“না না খাতা আনতে হবে না হিসাব নিকাশ একটু আধটু আমিও পারি।”
“ও পারেন আমি ভাবলাম আপনিও বোধ হয় আমার মতো অঙ্কে কাঁচা।”
শাওন বলল,
“আপনি তো দেখতে মাসাআল্লাহ কিন্তু এতগুলো বিয়ে ভাঙার কারণ কি।”
“বেশির ভাগ বিয়ে ভেঙে বলেছে আমি নাকি বেশি কথা বলি বাঁচাল তাই।আরেকটা বিয়ে ভাঙার কারণ ছেলেটা ছিল কালোর কালো জন্মের কালো পরে আমি ছেলের মা কে বললাম আন্টি এর থেকে গর্জিয়াছ কোনো কালারের ছেলে নাই ওমা মহিলা আমাকে পাগল বলে চলে গেল।বলেন আমি কি ভুল বললাম?”
“না না আপনি কোনো ভুল করেননি পাগল তো আসলে ওরা ছিল।”
“শুনেন না আমাকে আপনি বিয়েটা প্লিজ করে নিন।”
শাওন বলল,
“আপনি বলেন বিয়ে পাগল হওয়ার কারণটা কি?”
“আপনি ভুল করলেন এখানে পাগল হবেনা পাগলি হবে আপনি মনে হয় ব্যাকরণে কাঁচা।”
শাওন আমার কথা শুনে বড় করে শ্বাস নিলো।
“হ্যা বুঝেছি এবার বলেন বিয়ে পাগলি কেন হলেন?”
“আর বইলেন না আমার বান্ধবীরা আমাকে বলে আমার কপালে নাকি ভালো জামাই জুটবে না কমপক্ষে দুই ডজন বিয়ে ভাঙবে।কিন্তু না আমি দেখিয়ে দিতে চাই এক ডজনেই আমি বিয়ে করে ফেলব।প্লিজ আপনি আমার এক ডজন হয়ে যান।”
শাওন গলা পরিষ্কার করে বলল,
“প্লিজ এক ডজন এক ডজন করবেন না নিজেকে ডিম ডিম মনে হয়।”
