Home বিয়ে পাগলি বিয়ে পাগলি পর্ব ৭

বিয়ে পাগলি পর্ব ৭

বিয়ে পাগলি পর্ব ৭
নিলুফা নাজমিন নীলা

সায়রা আর রেহানা বেগম রান্নাঘরে।
রেহানা বেগম ব্যস্তভাবে রান্না করছে, আর সায়রা যেন তার ছায়ার মতো পেছন পেছন ঘুরছে, একের পর এক ফালতু কথা বলে যাচ্ছে।রেহানা বেগম যেখানে যাচ্ছেন, সায়রাও হুবহু সেই দিকেই যাচ্ছে।কখনো হাঁড়ি উঁকি দেয়, কখনো লবণ কম-বেশি হবে কিনা সেটা নিয়েই বকবক করে।
রেহানা বেগম সবজি কাটছিলেন, পেছনে দাঁড়িয়ে সায়রা কৌতূহলী চোখে সব দেখছে।
হঠাৎই রেহানা বেগম পেছনে ফিরতেই ঠাস করে সায়রার মাথার সাথে ধাক্কা খেলেন।
রেহানা বেগম বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে উঠলেন, মুখ দিয়ে বের হলো,

“এই মেয়ে! আমার কাজের মাঝেই মাথা গুঁজে আছো কেন?”
সায়রা চোখ বড় বড় করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“হায় হায় শাশুমা! একবার টুকা খেলেই মাথায় শিং গজাবে। আরেকবার দেন না দেখি শিং দুটো সমান হয় কিনা।”
বলেই সায়রা হেসে রেহানা বেগমের মাথার সাথে আবার হালকা ধাক্কা দিল।
রেহানা বেগম এবার বিরক্তি সামলে হাঁসফাঁস করে বললেন,
“আল্লাহ বাঁচাও! এই মেয়েটা তো আমাকে পাগল করে ছাড়বে।”
রেহানা বেগম রান্না করতে করতে বিরক্তি সামলিয়ে বললেন,

“চা খাবে?”
সায়রা সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,
“নাহ… চা খেলে গরম লাগে।”
“তাহলে ঠান্ডা পানি খাবে?” রেহানা বেগম আবার জিজ্ঞেস করলেন।
সায়রা গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
“নাহ… ঠান্ডা লাগে।”
রেহানা বেগম বললেন,
“তাহলে আমার মাথা খাবে নাকি?”
সায়রা দাঁত বের করে খিলখিল করে হেসে উঠল, তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়াল,

“হ্য।”
রেহানা বেগম অবলার মতো তাকিয়ে থাকলো সায়রার দিকে।
রেহানা বেগম বললেন,
“যাও তো, গিয়ে শাওনকে কফি দিয়ে আসো।”
সায়রা হাত জোড় করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“যথা-আজ্ঞা শাশুমা।”
বলেই রান্নাঘরে বসে অনেকক্ষণ ধরে “স্পেশাল কফি” বানাতে লাগল। রেহানা বেগম হাফ ছেড়ে বললেন,
“গেছে তো… এবার একটু তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করি। তা না হলে আবার এসে মাথা খাওয়া শুরু করবে।”
এদিকে শাওন তখনো ঘুমাচ্ছে। সায়রা কফির কাপ হাতে শোবার ঘরে ঢুকে মিষ্টি গলায় ডাকল,
“ওগো সোয়ামি… শুনছো? তোমার জন্য কফি নিয়ে আসছি, ওঠো।”
শাওন হালকা বিরক্তি নিয়ে উঠে বসল। সায়রা কাপটা তার হাতে দিয়ে বলল,

“দেখো, তোমার জন্য নিজের হাতে বানানো স্পেশাল কফি।”
শাওন চুমুক দিতেই হঠাৎ নাক-মুখ কুঁচকে গেল।
“এসব কি বানিয়েছো? এটা কফি?”
সায়রা গর্বের ভঙ্গিতে বলল,
“অবশ্যই! এটা আমার স্পেশাল কফি।”
শাওন কপালে হাত দিয়ে বলল,
“কফিতে কী দিয়েছো তুমি?”
সায়রা নির্দ্বিধায় উত্তর দিল,
“বেশি কিছু না… পানি, দুধ, কফি-পাউডার, চিনি আর… জিরা।”
শাওন চোখ বড় বড় করে তাকাল,
“জিরা?! কফিতে কে জিরা দেয়, বলো তো?”
সায়রা গম্ভীর মুখে বলল,

“আমার শাশুমা বলেছেন রান্নায় জিরা দিলে স্বাদ বাড়ে। তাই ভাবলাম কফিতেও দিলে টেস্টি হবে।”
শাওন হাল ছেড়ে মাথা নাড়ল,
“কফি কি তোমার কাছে রান্না মনে হলো!”
সায়রা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“বাদ দেন তো! প্রথমবার কফি বানালাম, একটু তৃপ্তি করে খাওয়ার বদলে শুধু বকাঝকা করছেন।”
শাওন মুচকি হেসে বলল,
“তৃপ্তি তো হচ্ছেই, তবে সেটা খাওয়ার না মরার!”

ডাইনিং টেবিলে সকলে বসে সকালের নাস্তা করছে। রুটি, ডিম আর চা–সবই সাজানো। শুভ্র হঠাৎ মুখ গম্ভীর করে বলল,
“গতকাল পাশের বাড়িতে নাকি চোর ঢুকেছিল।”
সায়রা আর শাওন চমকে তাকাল। সুভা কৌতূহলী হয়ে বলল,
“কি চুরি করছে?”
শুভ্র মুখ টিপে হাসতে হাসতে বলল,
“তেমন কিছু না… শুধু গাছের অর্ধেক আম নাকি চুরি করে নিয়ে গেছে।”
শাওন আর সায়রা একসাথে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। মনে মনে দুজনের একই চিন্তা“দুইটা আম চুরি করে নিয়ে আসছি, আর এখন গল্প হয়ে গেছে গাছের অর্ধেক আম!”
শুভ্র আবার বলল,

“শুনেছি চোরগুলো নাকি আমাদের বাড়ির দিকেই আসছিল। ভাইয়া তুমি কিছু দেখোনি?”
শাওন মুখ বাঁকিয়ে গম্ভীর সুরে বলল,
“আমি কি দারোয়ান নাকি, যে চোর পাহারা দেব?”
মোজাম্মেল হোসেন আফসোসের ন্যায় বলল,
“আমের এত অভাব পড়েছে যে আমও আজকাল চোরি করতে হয়!”
শাওন কপালে হাত দিলো, আর শুভ্র–সুভা,সায়রা হেসে টেবিল কাঁপিয়ে দিল।
রেহানা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,
“চুপ করো তো সবাই! সকালে নাস্তার টেবিলটা তোমাদের নাটকের মঞ্চ মনে হয়?”
কিন্তু সায়রা দুষ্টুমি করে বলল,

“শাশুমা, নাটক তো শুরু হয়েছে চোর দিয়ে… এখন হিরো আসবে আর খলনায়ক ধরবে।”
সবাই আবার খিলখিল করে হেসে উঠল।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে শুভ্র, সায়রা আর সুভা একসাথে বসে লুডু খেলছে। তিনজনই সমান বয়সের মতো, হাসাহাসি করে দারুণ মজা করছে। অথচ সুভা বিয়েতে রাজী ছিল না হলুদের গুড়োর শরবতের কাহিনী এখনও সকলে মনে রেখেছে।
সায়রা শাড়ি পরে লুডু খেলতে গিয়ে বারবার বিরক্ত হচ্ছিল। যতই রেহানা বেগম সুন্দর করে পরিয়ে দিক না কেন, সায়রার মনে হচ্ছিল, “শাড়ি একদম ঝামেলার পোশাক।” রেহানা বেগম বিষয়টা টের পেয়ে বললেন,
“সায়রা, যাও গিয়ে শাড়ি চেঞ্জ করে অন্য কিছু পরে আসো।”
সায়রা বিড়বিড় করে বলল,

“মহিলা গম্ভীর হলেও কেয়ারিং আছে। আমার জামাইয়ের থেকেও কেয়ারিং! আর ওই ব্যাটা… খাওয়া দাওয়া করে ঘরে গেল, একবারও আসলো না।”
এই ভেবে সায়রা রুমে ঢুকতেই হঠাৎ কেউ তার হাত ধরে দেয়ালে চেপে ধরল। প্রথমে সায়রা ভয়ে চোখ বড় বড় করল, কিন্তু তারপরেই বুঝল শাওন!
সায়রার গলা শুকিয়ে গেল, হালকা গিলল। শাওন হেসে বলল,
“কি বউ, প্রথম দিনই দেবর ননদের সাথে লুডু খেলায় মশগুল? এই অদম স্বামীর দিকে একবারও তাকালে না!”
সায়রা চোখ পাকিয়ে বলল,

“কই একবারও তো ডাক দেননি।”
শাওন ঠোঁটে দুষ্টুমি হাসি এনে আরও কাছে ঝুঁকল,
“কে বলল ডাক দিইনি? তুমি তো খেলার ধ্যানেই ছিলে।”
এবার শাওন এত কাছে এলো যে, দুজনের মাঝে সামান্য ফাঁকা জায়গা ছাড়া আর কিছুই নেই। সায়রার হাঁটু কাঁপছে, অথচ এমন হওয়ার কথা নয়।সায়রার শরীরে কেমন শিহরণ জেগে উঠছে এতটা কাছে এই প্রথম তারা। শাওন গাঢ় পুরুষালি কণ্ঠে বলল,
“বিয়ে করেছি, অথচ ভালো করে হাতটাও ধরতে পারলাম না। প্রথম রাতেই আমাকে চুরি করতে বেরোতে হলো।”
সায়রা চোখ নামিয়ে বলল,

“ছাড়ুন।”
কিন্তু শাওন ছাড়ল না, বরং আরও দৃঢ়ভাবে ধরে রাখল। সায়রা বুঝল শাওনের মতলব মোটেই সোজা না। তাড়াহুড়ো করে বলল,
“ছাড়ুন, শাড়িটা চেঞ্জ করে আসছি।”
এই বলে এক টানে হাত ছাড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। শাওন হেসে মাথা নাড়ল। অনেকক্ষণ কেটে গেল, তবুও সায়রা বের হচ্ছে না। শাওন মুচকি হেসে বুঝে গেল সে আসছে না ইচ্ছে করেই।

অবশেষে ধীরে ধীরে দরজা খুলে বের হল সায়রা। মনে মনে প্ল্যান এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে লুডুর টেবিলে ফিরে যাবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে শাওনের কণ্ঠ,
“দাঁড়াও।”
শাওন সামনে এসে দাঁড়াল।
“কোথায় যাচ্ছো?”
সায়রা চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
“নিচে… খেলাটা স্টপ করে এসেছি।”
শাওন গম্ভীর মুখে বলল,
“তাতে কি, বউ? তোমার এই অধম স্বামীকে একটু টাইম দাও। যেমন করে বিয়ের জন্য পাগলি হয়েছিলে, তেমন করে স্বামীর জন্যও একবার পাগলি হও না।”
সায়রা ভেংচি কেটে ফেলল,
“আমি বিয়ে-পাগলি হতে পারি, কিন্তু স্বামী-পাগলি না।”

শাওন অদ্ভুত হেসে ধীরে ধীরে এক পা এক পা এগোতে লাগল, আর সায়রা পিছোতে লাগল। চোখেমুখে টানটান উত্তেজনা।
ঠিক তখনই রুমে ঢুকে পড়ল সুভা,
“ভাবি!খেলবেনা আসো!”
শাওন একদম জমে গেল, আর সায়রা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।সুভা দরজা ঠেলে ঢুকে মুচকি হেসে বলল,
“আমি কি ভুল টাইমে চলে আসলাম? সরি।”
সায়রা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেল সুভার দিকে, হাসিমুখে বলল,
“না না, একদম ঠিক টাইমে আসছো। চলো, যাই।”

বিয়ে পাগলি পর্ব ৬

তারপর পেছনে তাকিয়ে শাওনের দিকে চোখ ছোট করে তাকাল, মুচকি হেসে জিহ্বা বের করে দিল। আর কোনো পাত্তা না দিয়েই সুভাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
শাওন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁট বাঁকা করে মাথা নেড়ে নিজে নিজেই বিড়বিড় করে বলল,
“কি রে শাওন, দেখেশুনেই তো বিয়ে করেছিস। এবার বুঝ মজা…!”

বিয়ে পাগলি পর্ব ৮