Home বিয়ে পাগলি বিয়ে পাগলি পর্ব ৮

বিয়ে পাগলি পর্ব ৮

বিয়ে পাগলি পর্ব ৮
নিলুফা নাজমিন নীলা

শাওন অনেকক্ষণ ধরে রুমে একা বসে আছে। কিন্তু সায়রা আসার নাম নেই। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত প্রায় বারোটা। হঠাৎ নিচ থেকে ভেসে আসছে খিলখিল হাসির শব্দ।নিচে তাকাতেই দেখল, সায়রা আর সুভা সোফায় বসে কার্টুন দেখছে।
শাওন চোখ কুঁচকে বিড়বিড় করল,
“এই বয়সেও কেউ কার্টুন দেখে?!”
সে রাগে গর্জে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। বুকের উপর দুই হাত রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু এদিকে সায়রা-সুভা যেন অন্য জগতের মানুষ হাসি থামছেই না।
শাওন এবার রাগি গলায় বলল,

“কি সমস্যা তোদের? এই রাত-বিরাতে পেত্নীর মতো হাসছিস কেন?”
শাওনের কণ্ঠ শুনে সুভা আঁতকে উঠল। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। কিন্তু সায়রা সরু চোখে শাওনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন মুখে লিখে রেখেছে “তুমি কিছুই করতে পারবে না।”
শাওন এবার এগিয়ে গিয়ে রিমোটটা ছিনিয়ে নিল, টিভি বন্ধ করে দিয়ে সুভাকে বলল,
“যা, গিয়ে ঘুমা।”
সুভা আর কিছু না বলে ধীর পায়ে রুমে চলে গেল। এখন সোফায় একা বসা সায়রা। শাওন গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“কি সমস্যা তোমার? হুম? তোমার যে কপাল পোড়া হলেও একটা জামাই আছে, সেই খবর রাখো?”
সায়রা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“কপাল পোড়া জামাই দিয়ে আমার কি কাজ?”
শাওনের ভেতরের রাগ গলে নরম হয়ে গেল। গলা নিচু করে শান্তভাবে বলল,
“চলো রুমে চলো।”
সায়রা মাথা নেড়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“না, যাব না রুমে। আপনার মতলব ভালো না সকাল থেকে খেয়াল করছি।”
শাওন এবার দাঁত চেপে রাগী গলায় বলল,
“আমার খুব রাগ হচ্ছে সায়রা! চলো রুমে, ঘুমাবো।”
সায়রা গলা উঁচু করে উত্তর দিল,
“না! আমি থাকব না আপনার সাথে।”
শাওন এবার একদম চুপচাপ হয়ে তার সামনে এসে সায়রা দুটো হাত ধরে বসে পড়ল। দু’চোখে গম্ভীর দৃষ্টি, ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। তারপর হঠাৎ নাটকীয় ভঙ্গিতে গলা পরিষ্কার করে গান ধরল,

ও বউ..!
তুমি আমায় কি ভালোবাসো না?
ও বউ..!
কেন আমার কাছে আসো না?
ও বউ..!
চলো ঝগড়া মারামারি ভুলে যাই তাড়াতাড়ি…
itna gussa kyu?
কেন এতো বোকা সাজো, আমায় একটু বোঝো…
শুনোনা…আই লাভ ইউ
ও বউ…!

গান শেষ হতেই সায়রা প্রথমে হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করে খিলখিল করে হেসে উঠল। মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল,
“হায় আল্লাহ! আমার জামাইয়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি!”
শাওন মুখ গম্ভীর করে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“হ্যাঁ, মাথা খারাপই হয়ে গেছে… তোমার জন্য।”
সায়রা এবার লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসি, কিন্তু চোখে-মুখে খুশি স্পষ্ট।শাওন আর কোনো কথা না বলে হঠাৎ করেই ঝটকা মেরে সায়রাকে সোজা কোলে তুলে নিল।
সায়রা চমকে উঠল তার শরীরটা যেন হঠাৎ বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠল।
“আহ! কি করছেন আপনি? আমাকে নামান!” সায়রা হাত-পা ছুঁড়তে লাগল, মুখ লাল হয়ে উঠেছে।
কিন্তু শাওন ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলল,

“এখন আর নামানো হবে না বউ… আজকে তুমি আমার কোলে সেফ।”
সায়রা ঠোঁট কামড়ে রাখল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ কানে বাজছে। শাওনের চোখের দিকে তাকাতেও পারছে না।
শাওন ফিসফিস করে কানে বলল,
“তুমি জানো, আজ পর্যন্ত আমি তোমাকে ঠিক মতো ছুঁতেই পারিনি… অথচ তুমি আমার বউ।”
সায়রার শরীর হালকা কেঁপে উঠল, শ্বাস ভারী হয়ে এলো। তার ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।

অনেকগুলো দিন পার হয়ে গেল সায়রার এই বাড়িতে সংসার করার। সংসার বললে হয়তো ভুল হবে, আসলে পুরো ব্যাপারটা দুষ্টামি আর খুনসুটি দিয়েই ভরা। তবুও আশ্চর্যের বিষয় এই বাড়ির মানুষগুলো যেন অন্যরকম, সবাই কত ভালোবাসে সায়রাকে! আর সায়রাও তার মিষ্টি স্বভাব আর দুষ্টুমির মাধ্যমে খুব সহজেই সবার আপন হয়ে গেছে।
আগে তো শুধু সুভা-শুভ্র আর সায়রা এই তিনজন মিলে দুষ্টামি করত। কিন্তু এখন তো বয়স্কদেরও ছাড় দিচ্ছে না সে। পুরো বাড়িটাই যেন মাথায় তুলে রেখেছে এই এক মেয়েই।
সেদিন রাতে ঠিক হলো সবাই মিলে হরর মুভি দেখা হবে। শাওন অফিসে, ফিরতে রাত হবে বলেছে। শুভ্র তার এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে গেছে। তাই টিভির সামনে বসে রইলেন রেহানা বেগম, মোজাম্মেল সাহেব, সুভা আর অবশ্যই সায়রা।
মুভি শুরু হলো। চারজন একসাথে বসে মুভি দেখছে। তবে অন্যদের চোখে ভয় থাকলেও সায়রার চোখ-মুখে শুধু বিরক্ত।

“আরে কি মুভি এটা! একটুও তো ভয় নেই।” সায়রা মুখ ভার করে বলল।
রেহানা বেগম হেসে বললেন,
“যাও গিয়ে লাইট অফ করে দিয়ে আসো, তাহলে ভয়টা আসবে।”
সুভা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না আম্মু! ভয় লাগে আমার।”
রেহানা বেগম সাথে সাথেই ধমক দিয়ে বললেন,
“চুপ কর চেমরি।”
অগত্যা সায়রাই উঠে গিয়ে ড্রয়িংরুমের লাইট অফ করে এল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা আধো অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু টিভির আলোয় এখনো সবার মুখ দেখা যাচ্ছে, আর দেয়ালে-দেয়ালে অদ্ভুত ছায়া খেলছে।

মুভির ভৌতিক সাউন্ড বেড়ে গেল, বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠল। সবাই মন দিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু হঠাৎ
তখনি টিভিতে ভয়ংকর দৃশ্য ভেসে উঠল।
সায়রা শুকনো ঠুক গিলল। ভয় করছে, তবুও কারও কাছে ধরা যাবে না সে ভয় পেয়েছে, এটা কিছুতেই বোঝা চলবে না।
সে একবার মোজাম্মেলের দিকে তাকাল উনি তো ঘুমিয়েই পড়েছেন সোফায় বসে!
রেহানা বেগম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন টিভির পর্দায়।
আর সুভা হাঁটু-মুখ একসাথে গুটিয়ে বসে, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে পর্দার দিকে।
অগত্যা সায়রা আবার মনোযোগ দিল টিভিতে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার কাঁধে পড়ল এক ঠান্ডা স্পর্শ!
সায়রা ধীরে ধীরে পেছনে তাকাতেই দেখে,
এক লম্বা কালো ছায়া দাঁড়িয়ে!

অথচ তো ঘরে তারা চারজন ছাড়া আর কেউ নেই!মুহূর্তের মধ্যেই সায়রার শরীর অবশ হয়ে গেল।তারপর হঠাৎ এক জোরে চিৎকার করে সোজা গিয়ে উঠে পড়ল রেহানা বেগমের কাঁধে!
চমকে গিয়ে মোজাম্মেল ঘুম থেকে জেগে উঠলেন।
দেখেন সায়রা দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে বসে আছে রেহানা বেগমের কাঁধে।সায়রার মুখ চেপে আছে রেহানার চুলের ভেতর, সারা শরীর কাঁপছে।
এমন দৃশ্য দেখে সুভা কিছুই না বুঝে নিজেই চিৎকার করে কান বন্ধ করে দিল।
রেহানা বেগম এবার চিৎকার করে উঠলেন,
“এ্যাই মেয়ে নামো আমার ঘাড় ভেঙে দিচ্ছে!”
হঠাৎ ঝটকা দিয়ে ড্রয়িংরুমের লাইট জ্বলে উঠল।সায়রা ধীরে ধীরে চোখ খুলে নিচে তাকাল,সে সত্যিই রেহানা বেগমের কাঁধে চড়ে বসে আছে!

লজ্জায় তাড়াতাড়ি জিভে কামড় দিল, তারপর নামতে গিয়ে একরকম গড়াগড়ি খেয়ে নামল।
রেহানা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,
“এতই যদি ভয় পাও, তাহলে মুভি দেখতে বসছো কেন?”
সবাই তখন অবাক হয়ে তাকাল পেছনের দিকে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে শাওন, হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাচ্ছে।
সায়রার এক নিমিষেই বোধগম্য হয়ে গেল,
পেছন থেকে যে তাকে ভয় দেখিয়েছে, সে আর কেউ নয় শাওন!
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সায়রা ছুটে গিয়ে দাঁড়াল শাওনের সামনে।
শাওন মুখে হাসি নিয়ে বলল,

“এত ভয়… ”
কথা শেষ করার আগেই,
ঠাস করে সরাসরি শাওনের নাকে এক ঘুষি বসাল সায়রা!
শাওন ব্যথায় নাক চেপে চোখ বন্ধ করে ফেলল।সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
রেহানা বেগম চিৎকার করে বললেন,
“এসব কি! সায়রা, শাওনকে মারছো কেন?”
সায়রা দাঁত খিচিয়ে বলল,
“শাশুমা, আমি যে আপনার কাঁধে উঠলাম, আপনি ব্যথা পান নাই?”
রেহানা বেগম গম্ভীর মুখে বললেন,
“পেয়েছি তো বটেই, ঘাড় বোধহয় ভেঙেই গেছে!”
সায়রা এবার গর্জে উঠল,

“হ্যাঁ, সেই ব্যথা পাওয়ার আসল কারণ হলো আপনার এই ছেলে ও-ই আমাকে ভয় দেখিয়েছে পেছন থেকে। তাই আমার এমন অবস্থা হলো।”
রেহানা বেগম এবার রাগী দৃষ্টিতে তাকালেন শাওনের দিকে।
তারপর সায়রাকে বলে উঠলেন,
“আস্তে দিলে কেন? আরেকটু জোরে দিতে, নাকটা ফাটিয়ে দাও বদমাইশটার।”
শাওন হতভম্ব হয়ে ভেতরে ভেতরে বলল,
“কি দিন দেখছি! নিজের মা-ও আমার পক্ষে নেই। নিজেরা ভূতের ভয় পায়, পরে দোষ হয় আমার!”
সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেছে।সায়রা শাওনের নাকে বরফ লাগিয়ে দিচ্ছে আর শাওন বার বার ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে নিচ্ছে।
“বউ গো তোমার হাতে এত শক্তি? আমার নাকটা তুমি অচল করে দিলে গো বউ।এখন আমার নাকে যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে সকলে তোমাকে নাক ছাড়া লোকের বউ ডাকবে।”
সায়রা নিচু গলায় বলল,

“কি দরকার ছিল আমাকে এভাবে ভয় দেখানো?”
“আমি তো ভেবেছিলাম তুমি মনে হয় ভয়ে আমাকেই জড়িয়ে ধরলে তা না করে আমার মা-য়ের কাঁদে উঠে গেলে।বাহ্ রে আমার রোমান্টিক বউ!”
সায়রা তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে শ্যামলা চেহারার নাকটা কেমন লাল হয়ে গেছে।সায়রা বলল,
“আচ্ছা এখন জড়িয়ে ধরি।” বলেই সায়রা জড়িয়ে ধরতে গেলে আবারো শাওনের নাক আর সায়রার কপাল এক্সিডেন্ট করে।
সায়রা চোখ মুখে কুঁচকে বলল,

বিয়ে পাগলি পর্ব ৭

“আল্লাহ আবারো ব্যাথা পায়ছে আমার জামাইটা। ” বলেই হাত দিয়ে আবারো স্পর্শ করল শাওনের নাক।সায়রা স্পর্শে আবার ব্যাথায় শিহরিত শাওন।
শাওন এবার জোরে চিৎকার দিলো
“আহ।”
শাওন বসা থেকে সোজা পড়ে গেল বিছানায়।শাওন চোখ বন্ধ করার আগে বলল,
“আল্লাহ গো এক নারীর হাতে পুরুষ নির্যাতিত হচ্ছে! এই লজ্জা আমি কই রাখবো?এর চেয়ে ভালো আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও।”

বিয়ে পাগলি পর্ব ৯