Home ভবঘুরে সমরাঙ্গন ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৯ (৩)

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৯ (৩)

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৯ (৩)
তাজরীন ফাতিহা

ডায়েরির কভারটা ক্যালেন্ডারের সাদা অংশ দিয়ে মোড়ানো। যেন বছরের পর বছর ডায়েরিটা সুরক্ষিত থাকে। ছিঁড়ে টিরে গেলেও কভারটা ক্ষতিগ্রস্ত যেন না হয়। তবুও ডায়েরির জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। কিন্তু আসল মলাটটা মোটামুটি ঠিকই আছে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার অতি যত্নে গাঁথা এই ডায়েরিটা। জীবনের বেশিরভাগ কাহিনী এইখানে টুকে রেখে দিয়েছেন স্মৃতি হিসেবে। অতীতের মানুষ গুলো বোধহয় চিঠি ও ডায়েরি লেখায় বেশ পারদর্শী ছিল। লেখাগুলো কি সুন্দর টানা টানা করে লিখিত। পুরোনো মানুষগুলো যত্ন নিতে জানত আর বর্তমান মানুষ অবহেলা করতে জানে। দিন যত যায় পৃথিবী উন্নত হয় মানুষের নীতি নৈতিকতার ততই অবনতি হয়। মানুষ এখন সম্পর্কের যত্ন নিতে জানে না। অতীতের সম্পর্কগুলো দেখতে এজন্য এতটা সুন্দর। মুনতাজির ডায়েরিটা সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিল। মুনতাজির ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলে ব্ল্যাক ভাইপারের উদ্দেশ্যে বলল,

“এই ডায়েরি নিয়ে আপনার কি ফায়দা হলো?”
ব্ল্যাক ভাইপার হাসল। বলতে লাগল,
“তোমার মা, বাবা যখন বিয়ে করে এল তাদেরকে আমি মেনে নেইনি। সেই প্রথম উর্মির প্রতি আমি কঠোরতা প্রকাশ করেছিলাম। মেয়েটা ভয়ে কাঁপছিল। সে বুঝতেই পারেনি ইমতিয়াজ এত বড় একটা ধোঁকা দিয়ে তাকে বিয়ে করবে। আমি সেদিন উর্মিকে আর ঘরে তুলিনি। মেয়েটা চিৎকার করে ভাইজান ভাইজান করে ডাকছিল। সেদিন বৃষ্টি ছিল। বাড়ির বড় গেটে দারোয়ানকে তালা মেরে দিতে আদেশ করেছিলাম। সেই বৃষ্টির কাদা মাটিতে বসে চিৎকার করে কেবল আমাকেই ডেকে গিয়েছিল। আমি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লেও সাড়া দেইনি কোনো। ও আমাকে সেদিন অনেক বড় আঘাত দিয়েছিল। ইমতিয়াজ ওকে নিয়ে চলে গেলে আমার বুকে ব্যথা ওঠে। আমার পুতুলের মৃত্যু, উর্মিকে তাড়িয়ে দেয়া সবকিছু আমার মস্তিষ্কে বাজে ভাবে প্রভাব ফেলে। মাত্র ২৮ বছর বয়সে প্রথম স্ট্রোক করি আমি।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

এইটুকু বলে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল ভাইপার। মুনতাজিরের এ পর্যায়ে বেশ খারাপ লাগে সামনের মধ্যবয়স্ক মানুষটির জন্য। রুবানার কোলে নাহওয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে। যদি সে নিজের আসল রূপে থাকত নির্ঘাত কেঁদে ফেলত। এই মানুষটা ছোট্ট বেলা থেকে তাদের দুই ভাইবোনকে ভীষণ আদর করতেন। কিন্তু কি এমন কারণে তার এই বদলে যাওয়া। কেন এত জঘন্যতা সাইফার স্যারের সঙ্গে?

রুবানা জয়েন হয়েছে বেশিদিন হয়নি। এমনিতেও সে এই সংস্থায় অনির্ধারিত সহযোগী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। বিভিন্ন গুপ্ত অপরাধীকে ধরতে তাকে ব্যবহার করা হয়। সবসময় এজেন্ট সংস্থায় সে সম্পৃক্ত থাকে না। কারণ ভার্সিটি পড়ুয়া অবস্থায় এজেন্ট সংস্থায় কেউই জয়েন হতে পারেনা। এরকম কোনো নিয়ম গোয়েন্দা সংস্থায় নেই। তবে মুনতাজিরের জন্য এক্ষেত্রে সে সুপারিশ পেয়েছে। সে মূলত বড় পদের কেউ না। শুধু তথ্য আদান, প্রদান করাই তার কাজ। এজন্য ডিপার্টমেন্টের হেড তাকে ছাড় দিয়েছে। তবে শর্ত একটাই যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো অবস্থায় ডাকা হলে কাজকে আগে প্রাধান্য দিতে হবে। কোনো সময় ‘না’ বলা যাবেনা তাতে যত জরুরি কাজেই সে থাকুক না কেন। রুবানা সমস্ত শর্ত মেনেই এ কাজে যুক্ত হয়েছে। ব্ল্যাক ভাইপার আবারও বলতে শুরু করল,

“আমি হাসপাতালে শুনে উর্মি এসেছিল তবে তাকে দেখতে দেয়া হয়নি। ওর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারণ ইমতিয়াজকে আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারতাম না। ওর কারণে আমি আমার পুতুলকে হারিয়েছিলাম। ওকে চোখের সামনে দেখলেই পুরোনো ক্ষত তাজা হয়ে উঠতো। দুই বছর পর যখন একদিন হঠাৎ তোমাকে নিয়ে উপস্থিত হলো আমার সামনে। আমি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই ছোট্ট উর্মি একেবারে পরিপক্ব নারীর বেশে আমার সামনে দাঁড়ানো।

এতদিন পর ওকে দেখে চোখে পানি এসে গিয়েছিল। চেহারার হাল বেহাল ওর। মনে হয় কতরাত ঘুমায় না। কোলে বাচ্চা কাঁদছে। আমাকে দেখতে পেতেই ছুটে এসে হুমরে পড়ে কেঁদে উঠলো। আমি ওর কান্না সহ্য করতে পারছিলাম না। পরে ওর থেকেই শুনলাম স্বামী, সন্তান নিয়ে সুখে থাকলেও শ্বশুর, শাশুড়ি কেউই মেনে নেয়নি তাকে। শ্বশুর মেনে না নিলেও অত্যাচার করেনা তবে শাশুড়ি তাকে নানাভাবে অত্যাচার করে। ইমতিয়াজের সাথেও সংসার জীবনে দুরুত্বের সৃষ্টি হয়েছে। শাশুড়ি তার ছেলেকে অন্যত্র ধনী ঘরে বিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইমতিয়াজ এসবে আগ্রহী না বিধায় তিনি তেমন সুবিধা করতে পারছিলেন না। উর্মির চোখের পানি কেন যেন সহ্য হচ্ছিল না। নিজের ভেতরের জমায়িত সমস্ত ক্রোধ জেগে উঠতে লাগল। ভেতরের ঘুমন্ত পশুটা জাগ্রত হয়ে উঠল। উর্মিকে নিয়ে সেবার ওর শ্বশুরবাড়ি যাই। ওর শাশুড়িকে নজরে নজরে রাখি। উনি আমার সামনে মেকি ভাব নিয়ে থাকতেন। দেখাতেন উর্মিকে বড্ড আদরে রাখেন তিনি। একদিন দেখলাম জ্বলন্ত খুন্তি উর্মির হাতের উপরে ছ্যাঁকা দিচ্ছেন। উর্মি মুখে হাত চেপে আর্তনাদ বন্ধ করছে।”

একটু শ্বাস নিয়ে বলল,
“উর্মির সাথে তার সমস্যা ছিল অনাথ, গরীব ঘরের মেয়ে এজন্য ওকে সহ্য করতে পারত না। নিজের পছন্দের মেয়ের সাথে ইমতিয়াজের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উর্মি আসায় সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। উর্মি যে অনাথ এটা জেনেছে উর্মির ওই দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে। তিনি উর্মির এত ভালো জায়গায় বিয়ে হয়েছে শুনে গিয়েছিল দেখতে। তবে থেকেই শুরু ওর উপরে অমানুষিক নির্যাতন। ওর একটাই দোষ সে এতিম। আমিও সব যোগাযোগ ছিন্ন করে ফেলেছিলাম দেখে আরও চড়াও হয়েছিল। সেদিন খুন্তি ছ্যাঁকা দিয়েছিল ওর নামে যেন আমি আমার জায়গা সম্পত্তি অর্ধেক লিখে দেই এটা বলতে বলেছিল। কিন্তু উর্মি নাকচ করায় ক্ষেপে যান তিনি। হাতের কাছে কিছু না পেয়ে খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে বসেন। আমি সেই দৃশ্য সহ্য করতে পারিনি। তৎক্ষনাৎ গিয়ে উর্মিকে ছাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে ওনাকে নানা কথা বলি। তিনি রাগে চেঁচিয়ে উর্মি আর আমাকে…”
এ পর্যায়ে ভাইপার থেমে যান। গ্লাসের পানি ঢকঢক করে পান করেন। সকলে উন্মুখ হয়ে তার দিকে চেয়ে। মুনতাজিরের চোখে তীব্র বিস্ময় ও কৌতূহল। ভাইপার নিজেকে সামলে বলতে লাগল,

“উর্মি আর আমাকে জড়িয়ে নানা নোংরা নোংরা কথা রটাতে থাকে। আমাদের নাকি অবৈধ সম্পর্ক আছে এরকম আরও জঘন্য জঘন্য কথা। তবে এতকিছু হওয়ার পরেও ইমতিয়াজ উর্মিকে কখনো অবিশ্বাস করেনি। কিন্তু মায়ের মুখের উপর প্রতিবাদও করেনি। উর্মির চোখের অশ্রু, চরিত্রহীন অপবাদ, আমাকে জড়িয়ে ওকে অপমান নিজের মনের গুপ্ত ক্রোধ আকারে বেরিয়ে এল। সকলের অগোচরে আমি উর্মির শাশুড়িকে সিঁড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেলি। রাগে ক্ষোভে আমার উপরে সেদিন অদৃশ্য শক্তি ভর করেছিল।

ইমতিয়াজ দ্রুত এসে মায়ের রক্তাক্ত দেহটা আগলে ধরে। আমি ইতোমধ্যে সেখান থেকে কেটে পড়েছি। উর্মি এসে শাশুড়ির রক্তাক্ত দেহের পাশে ইমতিয়াজ ভুঁইয়াকে দেখতে পেতেই তার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে যায় খুনটা ইমতিয়াজ করেছে। কারণ রাতেই নাকি উর্মিকে বলছিল মায়ের একটা কঠোর বিচার সে করবে। এরপর ইমতিয়াজ কিছুতেই আর উর্মিকে বিশ্বাস করাতে পারেনি এই কাজ তার না। উর্মির মস্তিষ্ক সেটা অটো সেট হয়ে গিয়েছিল। এসব ঘটনা উর্মিকে মানসিক ভাবে আরও ভেঙে দিয়েছিল। ও অকারণে খিটখিট করতো, মেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত। উন্মাদের মতো করতো। অনেক কিছুই ভুলে যেত তবে শাশুড়ির মৃত্যুটা কিছুতেই সে ভুলতে পারেনি। রক্ত দেখলেই ভয়ে কেঁপে উঠতো। শাশুড়ির মৃত্যুর পর উর্মি একেবারেই উদ্ভট আচরণ করা শুরু করল। ওকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো হলো। একটু সুস্থ হলেও পরিপূর্ণ সুস্থ হতে সময় লেগেছিল কয়েক বছর। অন্যদিকে ইমতিয়াজের ধারণা ওর মায়ের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত সে এটাই জানে।”

এটুকু বলে থামল ভাইপার। মুনতাজির, রুবানা কি রিয়েকশন দিবে সেটাই ভুলে গেছে। এত এত অজানা কথা লুকায়িত আছে তারা জানেও না। ভাইপার থেমে থেমে বলতে লাগল,
“ওর শাশুড়ির মৃত্যুর পর শ্বশুর বছর কয়েক বেঁচেছিলেন। এ কয়েকটা বছর উনি উর্মিকে ভীষণ আদর করেছেন। তার নিজের মেয়ের মতোই আগলে রাখতেন। তার দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় উর্মিকেই মেয়ে মনে করতেন। শ্বশুর মারা যাওয়ার পরে উর্মি আবারও মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসা করিয়ে মোটামুটি সুস্থ করানো হয়। তবে এখনো সে ইমতিয়াজকে খুনি হিসেবে আখ্যায়িত করে। ইমতিয়াজ প্রথম প্রথম নিজের পক্ষে সাফাই গাইলেও এখন আর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেনা। তোমার মায়ের সমস্ত পাগলামীকে সায় দেয়। কারণ উর্মির অসুস্থতার পিছনে তার মায়ের অত্যাচার, মানসিক নির্যাতন ছিল বলে সে বিশ্বাস করে। আর এটা ওর মাথায় আমিই ঢুকিয়ে দেই।”
সাইফার এতক্ষণ একটা টুশব্দ না করে সিগারেট টানছিল। তার চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। এবার মুখ খুলল,
“আপনি আর কার মাথায় কি ঢুকিয়েছেন এসব দ্রুত শেষ করে আপনার সাথে আমার লেনাদেনা কি তাই বলুন। আপনার পরিবারের কাহিনী শুনতে বসিনি এখানে। আমার সাথে আপনার সমস্যা কি? আমি বাসায় যাব। মাথা ব্যথা করছে। এত বকবক শুনতে পারিনা। আমার সাথে সমস্যাটা বলুন। তারপর নিজেদের কেচ্ছা নিজেরা খতম করুন। এর আগে আমাকে বিদায় করুন। একটু শুনে যাই আপনার কোথায় আমি হাত দিয়েছিলাম।”

ভাইপার হাসল কেবল। বলল,
“তোমার সাথে আমার সমস্যা কোনো সমস্যা নেই বলছ? আমি ব্যক্তি মানুষটা সাধু হলেও অন্যায়ের দুনিয়ায় আমিই রাজা, হিংস্র থেকে হিংস্রতর।”
সাইফার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ভাইপার আবার বলল,
“আমার প্রত্যেকটা কাজ যখন সে একে একে নষ্ট করে দিচ্ছিলে তখন থেকেই আমার অদৃশ্য ক্ষোভ ছিল তোমাদের পুরো পরিবারের উপর। অবশ্য আমার দুর্বল জায়গায় যারা হাত দেয় তাদেরকে আমি বাঁচিয়ে রাখিনা এমনিতেও।”
বলেই কুটিল হাসল। সাইফার এগিয়ে এসে দুপায়ে ভর দিয়ে বলল,
“সে তো আপনাকে দেখেই মনে হয় আপনি সাইকো। নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই। যাইহোক আপনার কেচ্ছা শেষ হয়েছে?”

ভাইপার কিছু বলল না। সাইফার উঠে দাঁড়িয়ে কোটের পকেটে দু’হাত ঢুকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“আমি বলি। মিস্টার রাসেল ভাইপার মিসটেক ব্ল্যাক ভাইপার সাহেব আমাকে অপছন্দ করতেন তার ভাগ্নের বন্ধু থাকাকালীন। ভাগ্নের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব তিনি মানতে পারতেন না। তবে শত্রুতা এবং তীব্র ঘৃণা করা শুরু করেন মূলত তার সমস্ত অন্যায়ের প্রমাণ আমার কাছে চলে এসেছিল এজন্য। ড্রাগ সাপ্লাই, মাদক ব্যবসা, অর্গান পাচার, অন্য বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছে অবৈধভাবে অস্ত্র আনা নেয়া সবই আমি জেনে গিয়েছিলাম। যদিও আমি তখন জানতাম না ব্ল্যাক ভাইপারই উমায়ের ভুঁইয়া। উনি আমাকে ঠিকই সিক্রেট এজেন্ট হিসেবে চিনতো। সেই থেকে নিজের ভাগ্নের সঙ্গে আমার জানে জিগার টাইপ দোস্তি তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। এজন্য একটা বিশ্রী পরিকল্পনা করে আমাদের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছিলেন তিনি। এতক্ষণ ওনার মুখ থেকে বিভিন্ন ঘটনাবলী শুনে এতটুকু নিশ্চয়ই ধারণা হয়েছে উনি ওনার পছন্দের মানুষদের অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারেন না। আমার সমূহ ধারণা উনি সাইকো টাইপ মানুষ।

আমাদের এত বছরের বন্ধুত্বে আমি কোনোদিন চেয়্যারম্যান বাড়িতে পা অবধি রাখিনি। কারণ আমি ধনীদের তেমন পছন্দ করিনা। তারা অহংকারী স্বভাবের হয়ে থাকে। কিন্তু মুনতাজির বন্ধু হিসেবে মন জয় করে নিয়েছিল। অবশ্য এফোর্টটা সেই বেশি দিয়েছিল। আমি চুপচাপ ছিলাম বিধায় অনেকেই মিশত না আমার সঙ্গে। তাদের টাইপের আমি ছিলাম না কিন্তু ঐ একমাত্র আমাকে ওর বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিল। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। সে মাঝে মধ্যে চেয়ারম্যান বাড়িতে এলে ভাগ্নের সঙ্গে আমার দোস্তির কথা সবই শুনতেন তিনি। মনে মনে রুষ্ট হলেও প্রকাশ করতেন না। যখন উভয়ই গোয়েন্দা সংস্থায় যোগদান করি উনি জানতে পারেননি। তবে একদিন ঠিকই কানে চলে যায়। যেটা ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার মাধ্যমে জানতে পারেন।”

সাইফার থামল খানিকটা। তারপর আবারও পায়চারি করতে করতে বলল,
“ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ছিল তার টোপ। যে টোপ দিয়ে তিনি আমাদের সকল গতিবিধি নজরে রাখতেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া তার টোপ গিলেছিলেন। তার মস্তিষ্কে আমার প্রতি তীব্র বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি আমাকে এমনিতেও অপছন্দ করতেন ছেলের কম্পিটিটর ভেবে। সেটাই মূলত কাজে লাগিয়েছেন মিস্টার ভাইপার। যেদিন ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ভরা মজলিসে আমাকে চোর বলে অপদস্ত করল সেটা ছিল এই ভাইপারের শিখিয়ে দেয়া মুখস্ত বুলি। মোটকথা একটা মানুষকে কথার দ্বারা হ্যালুসিনেট ও ম্যানুপুলেট করার ক্ষমতা ভাইপারের ছিল। তিনি খুব সহজেই মানুষকে প্রভাবিত করতে পারতেন। ভাইপার নামের মতোই তার কার্যকলাপ ছিল। মনুষ্য মস্তিষ্কে তীব্র বিষাক্ত বিষ ছড়াতে তিনি পারদর্শী ছিলেন।

উর্মি ভুঁইয়া এবং ইমতিয়াজ ভুঁইয়া উভয়ই ছিল তার গুটি। উভয়কে সে সেভাবেই পরিচালিত করত যেমনটা সে চাইত। যেহেতু উর্মি ভুঁইয়ার ডিল্যুশনাল ডিজঅর্ডার ও ডিমেনশিয়া ছিল তাই তিনি বাস্তব ও অবাস্তবের মধ্যে পার্থক্য করতে পারতেন না। ডিল্যুশনাল ডিজঅর্ডারের কারণে তিনি ভ্রান্ত বিশ্বাস করতেন যে ইমতিয়াজ ভুঁইয়া খুনি। অন্যরা তার ক্ষতি করতে চায়। এসব সূক্ষ্মভাবে তার মস্তিষ্কে সেট করে দিয়েছিল মিস্টার ভাইপার। তাছাড়া তিনি একই সাথে প্যারানয়েড সাইকোসিস রোগেও ভুগছিলেন। যার দরুন তিনি মনে করতেন তাকে কেউ হত্যা করতে চায়, খাবারে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলতে চায় ইত্যাদি অহেতুক সন্দেহ।”
কথাটা শেষ করে রুবানার দিকে চাইল। রুবানা স্যারের ইশারা বুঝতে পেরে সকলের সম্মুখে কিছু মেডিকেল রিপোর্ট টেবিলের উপরে রাখল। এই রিপোর্ট উর্মি ভুঁইয়ার ফিজিক্যাল ও মেন্টাল হেলথ কন্ডিশন সবই উল্লেখিত আছে। যেটা রুবানা একটু একটু করে সংগ্রহ করেছে। নেওয়াজ রিপোর্টটা মনোযোগ সহকারে পড়ে শোনালো। সাইফার টেবিলে দু’হাত ঠেকিয়ে বলল,

“দ্যা মোস্ট ইমপরট্যান্ট থিং, কয়েকদিন ধরে উর্মি ভুঁইয়ার আক্রমনাত্মক, সন্দেহপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছিলেন সম্মানিত ভাইপার সাহেব। তার রিয়েল মেডিসিন বদলে ভুল মেডিসিন ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তাও সকলের অগচরে বাট বাট..”
সাইফার ভাইপারের দিকে বাঁকা হেঁসে বলল,

“বাট তিনি এবার আর সকলের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেননি। তিনি হয়তোবা জানেন না মানহাকে ঐ বাড়িতে এমনি এমনি আমি পাঠাইনি। বোনের সমস্ত নিরাপত্তা দিয়েই পাঠিয়েছি। মুনতাজিরকে বাড়ির আনাচে কানাচে গোপন ক্যামেরা ফিট করতে বলেছিলাম। মানহার সমস্ত গতিবিধি মুনতাজিরকে নজরে রাখতে বলি। সবকিছু জেনে মিস্টার ভাইপার সর্বপ্রথম যে মানহাকে টার্গেট করবেন সে আমি খুব ভালোভাবেই জানতাম। উর্মি ভুঁইয়াকে ব্যবহার করে খুব সহজে মানহার চোখে ভিলেন বানাতে চেয়েছিলেন উনি। ভুলটা তিনি সেবারই করলেন। অতি চালাকের গলায় দড়ি একদিন ঠিকই পড়ে। টুড্যে অর টুমোরো। ফলাফল স্বরূপ গত কয়েকমাসের সমস্ত কাহিনী তো আপনারা জানেনই।”
কথা শেষ করে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল সাইফার। ভাইপারের সামনের চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে বলল,
“এবার আপনাদের কোনো কনফিউশন থাকলে করতে পারেন মিস্টার রাসেল আই মিন ব্ল্যাক ভাইপার।”
কথাটা রসিকতার সহিত বলল সাইফার। ভাইপারের চোখ মুখ বিকৃত হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে রাগে শরীর কাঁপছে তার। নিজেকে সামলে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,

“আমি শুধু জানতে চাই তোমরা দুজন এক হয়েছ কবে? তোমার দেশদ্রোহিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল তবে তুমি ছাড়া পেলে কিভাবে? শুনেছিলাম তোমার চাচা তোমাকে ছড়িয়েছিল কিন্তু আজীবনের জন্য চাকরিচ্যুত হয়েছিলে তবে কিভাবে আবার এই পেশায় এলে? আর বিশ্বাসঘাতককে মাফ করা এতই সোজা?”
সাইফার ঠোঁট এলিয়ে হাসল। যেন জানত এই প্রশ্নটাই তাকে করা হবে। আরেকটা সিগারেট ঠোঁটে নিয়ে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে লম্বা টান দিল। মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়িয়ে বলল,

“জেলে যাওয়ার তিন মাসের মাথায় হঠাৎ একদিন নোটিশ আসে আমাকে খালাস দেয়া হয়েছে। অবাক হয়েছিলাম। ততদিনে বন্ধুত্ব শব্দটা আমার কাছে বিষতুল্য। ছাড়া পেতেই একদম নির্লিপ্ত হয়ে যাই। সবার সঙ্গে মেশা বন্ধ করে দেই। নিজের মর্জি মাফিক চলতে শুরু করি। কাজের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ি। শুয়ে বসে দিনাতিপাত করতে থাকি। সকলের কাছে ভবঘুরে হিসেবে পরিচিতি লাভ করি। ভাদাইম্মা, বেকার, ভবঘুরে, পাগল আরও নানা উপাধি আশেপাশের মানুষ থেকে অর্জন করি। এসব কথা আমার গায়ে লাগত না। নিজের জীবন নিয়ে আমার আর কোনো চাওয়া পাওয়া, এক্সপেক্টেশন কিছুই ছিল না। মানুষকে বিরক্ত লাগতো। একা থাকতে ভালো লাগতো।

সেই ঘটনার প্রায় বছর খানেক পর চাচ্চু ডাকলেন তার বাসায়। সেসময় বেশ অবাধ্য হয়ে পড়েছিলাম। কারো কোনো কথা গ্রাহ্য করতাম না, শুনতামও না। তবে তার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারিনি। তাকে আইডল ভাবি নিজের সেজন্যই বোধহয়। গিয়ে দেখি তার সঙ্গে মুনতাজিরও আছে। বিরক্তি ও ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ঐ মুখটা সহ্য করতে পারতাম না। অতীতের বিশ্বাসঘাতকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতো। মুখ কুঁচকে এক দলা থুতু নিক্ষেপ করেছিলাম ওর সম্মুখে। ওর চোখে মুখে অসহায়ত্ব, কষ্ট ফুটে উঠেছিল তবে আমি সেসবে পরোয়া করিনি, গলেও যাইনি। কেবল ঘৃণাই হতো ওকে দেখে। চাচ্চু তার পাশে বসিয়ে সেদিন মুনতাজিরের আত্মত্যাগ সম্পর্কে বিস্তারিত খুলে বলেছিলেন।”

সাইফার সিগারেট মুখে নিয়ে মুনতাজিরের দিকে চাইল। মুনতাজির এবার বলতে শুরু করল,
“ওকে মানানো অতটা সহজ ছিল না। ওর চাচ্চুর সহায়তায় সাইফারের দেশদ্রোহিতার সমস্ত এভিডেন্সের সত্যতা যাচাই করা হয়েছিল। আমিই সেসব বের করেছিলাম। এজেন্ট তাহমিদের সাইফারের মুখোশ পড়া জালিয়াতি, ফেইক রেকর্ড, কণ্ঠ নকল সমস্ত প্রমাণ আদালতে পেশ করেছিলাম। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এসব আমি কোথায় পেয়েছিলাম? আমার মামাই যে আসল কালপ্রিট এটাও কি আমি জানতাম? উত্তর হলো না। এসব তথ্য আমি ব্ল্যাক ভাইপারের সহচর অর্থাৎ এজেন্ট তাহমিদের থেকে আদায় করেছিলাম। সেটাও ভাইপারের অগচরে। এমনভাবে অভিনয় করেছিলাম যে তাহমিদ বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল যে আমি আসলেই সাইফারের শত্রু। তার মাধ্যমে এসব জালিয়াতির বিভিন্ন তথ্য কালেক্ট করেছিলাম। সেসময় এজেন্ট তাহমিদের সঙ্গে আমার ভালোই বন্ডিং তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তাই সে আমায় বিশ্বাস করে সমস্ত কিছু বলতে দ্বিধাবোধ করেনি। তবে বিশ্বাসভাজন হওয়াটা সহজ ছিল না। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, কসরৎ করে সেই জায়গাটায় পৌঁছেছিলাম। তাদের দেখাতাম আমি সাইফারের জাত শত্রু, ওকে সহ্যও করতে পারিনা অথচ ভেতরে ছিল ভিন্ন রূপ। তখন বন্ধুত্বের কাছে অন্যসব কিছু ফিঁকে ছিল। বিশ্বাসঘাতকতার বিপরীতে বিশ্বাসঘাতকতাই ছিল তাদের মোক্ষম জবাব।

মুনতাজির থামতেই ব্ল্যাক ভাইপার কষে চড় বসালেন এজেন্ট তাহমিদের গালে। থাপ্পড়ের তীব্রতা এতই ছিল যে তাহমিদ চেয়ার থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল। ব্ল্যাক ভাইপারের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল রাগে। তার অগচরে এতবড় গাদ্দারী! তাহমিদ হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিজের ক্রোধকে দমন করল। মুনতাজির সেসবে পাত্তা না দিয়ে আবারও বলতে শুরু করল,

“এই সমস্ত প্ল্যান ছিল সাইফারের চাচ্চুর। আমি নিজেও সাইফারকে অবিশ্বাস করেছিলাম শুরুতে। তবে চাচ্চুর বদৌলতে সেই ধারণা আমার ভাঙে। যখন ভেতরে ভেতরে বন্ধু বিয়োগে গুমরে মরছিলাম তখন তিনি পথ দেখান আমাকে। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। যদিও আমাদের থেকে তার বয়সের পার্থক্য খুব বেশি ছিল না। সাইফারের থেকে মাত্র তেরো বছরের বড় ছিলেন তিনি। সাইফার ছোট থেকে তাকে অনুসরণ করতো। এই গোয়েন্দা হবার ভূত তিনিই ওর মাথায় ঢোকান। এজন্য তিনি বাড়ি ছাড়াও হয়েছিলেন। সাইফারের এমন দুর্দশার পিছনে ওর চাচার সম্পূর্ণ হাত আছে বলে মাহাবুব আংকেল বিশ্বাস করতেন। তাই নিজের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ছেলেকে মিশতে দিতেন না। ছোট থেকেই তিনি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর গোয়েন্দা বিভাগে যোগদান করেন। মাহাবুব আংকেল ভাইয়ের কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কিন্তু তার সঙ্গে সাইফারের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

সাইফারের চাচা বাড়িতে মাঝেমধ্যে যেতেন। সেবার আমিই তার সঙ্গে যোগাযোগ করে বন্ধুত্বের এই বেহাল দশার কথা জানাই। তারপর তিনি সাইফারকে ডেকে সমস্ত কিছু খুলে বলেন। সাইফারের মন খানিক নরম হলেও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি আমায়। আস্তে ধীরে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। চাচ্চু পরিকল্পনা করেন কিভাবে উমায়ের ভুঁইয়া ওরফে ব্ল্যাক ভাইপারকে বশে আনা যাবে। এমন পরিকল্পনা করলেন যেন কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা হয়ে যায়।”
নেওয়াজ বলল,
“কিন্তু এজেন্ট তাহমিদের এতবড় জালিয়াতি, মিথ্যাচারের সত্ত্বেও তার কোনো শাস্তি হয়নি কেন?”
মুনতাজির মুচকি হেসে বলল,

“সেটার পিছনেও হাত ছিল চাচ্চুর। কারণ এজেন্ট তাহমিদের তথ্য ফাঁস হলেই তো শত্রু তার লক্ষ্য পরিবর্তন করে ফেলতো। কোনোদিন তাকে ধরা যেত না। চাচ্চু সেজন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে সময় চেয়ে নিয়েছিল। সময় হলে রাঘব বোয়ালসহ সবাইকে ধরিয়ে দেয়া হবে এখন চুনোপুটি ধরে হাত ময়লা করার প্রয়োজন নেই। তবে সাইফারকে আজীবন বহিষ্কার করার আদেশ পাল্টে চার বছরের জন্য সাসপেন্ড করার নির্দেশ আদালত থেকেই দেয়া হয়। যেটা গোয়েন্দা ডিপার্টমেন্ট প্রচার করেছিল আজীবনের জন্য বহিষ্কৃত করা হয়েছে আজারাক সাইফারকে। মোটকথা শত্রুপক্ষকে দেখানো হয়েছিল সাইফারের মেরুদন্ড ভেঙে দেয়া হয়েছে। তাই এজেন্ট তাহমিদ কিংবা ব্ল্যাক ভাইপার কেউই বুঝতে পারেনি এই সমস্ত কিছু পরিকল্পনা মাফিক হয়েছিল।”
নেওয়াজ মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কিন্তু আমার আরেকটা প্রশ্ন, এজেন্ট তাহমিদ যে এইসমস্ত কাজের সাথে যুক্ত ছিল সেটা কিভাবে জেনেছিলেন?”
মুনতাজির বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“এটা জেনেছিলাম এজেন্ট তাহমিদের ডেস্কের একটা ফাইল থেকে। যেটায় আজারাক সাইফার নামের উপরে ক্রস চিহ্ন দেয়া ছিল। সন্দেহ আরও তীব্র হয় সাইফারকে সাসপেন্ড করা হয় যেদিন সেদিনের তারিখ উল্লেখ করে মিশন সাক্সিড লেখা ছিল পাশে। সম্ভবত ভুলে সেদিন এটি গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গুলোর সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। ব্যাস সেদিনের পরেই পরিকল্পনা করে তার আস্থাভাজন হয়ে সমস্ত তথ্য কালেক্ট করলাম। তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। ডিপার্টমেন্টও তাকে ভরসা করতে অনাগ্রহী ছিল। তার কারণে গুরুত্বপুর্ণ এবং মেধাবী একজন গোয়েন্দা চার বছরের জন্য সাসপেন্ড হয় এটা হেড মানতে নারাজ ছিলেন। একটা ক্ষোভ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চাচ্চুর জন্য পরিকল্পনা অন্যদিকে মোড় নেয়। সেই থেকে এজেন্ট তাহমিদ SAD ডিপার্টমেন্টে কাজ করে আর আমি হস্তান্তর হয়ে IMF ডিপার্টমেন্টে আসি।”
সাইফার সিগারেট শেষ করে পায়ের উপর পা তুলে বলল,

“আমার মৃত্যুদণ্ড না হয়ে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হয় এটা ভাইপার সাহেব মানতে নারাজ ছিলেন। আমাকে নজরে রাখতে মিস্টার ভাইপার সাহেবের কত আয়োজন ছিল। ট্র্যাকার, সিসি ক্যামেরা, ছদ্মবেশী দ্বারা সর্বক্ষণ নজরে রাখতে শুরু করে। আমি আসলেই কাজ করি কিনা তা সম্পর্কে নিশ্চয়তা পেতে চাচ্ছিলেন। আমার ঘরে হিডেন মাইক্রোফোনও ছিল যেটা আমার স্ত্রীর ব্যাগে খুব সূক্ষ্মভাবে সেট করে দেয়া হয়েছিল। যেহেতু আমি প্রতিদিন পুরো ঘর একবার হলেও সার্চ করতাম সেদিনও করতে গিয়ে এসব পাই। তীক্ষ্ম মস্তিষ্কে ঐদিনই সবটা ধরে ফেলি। তবে কাউকেই সেটা বুঝতে দেইনি। সেই মাইক্রোফোনের মাধ্যমে সে আমার ঘরের সমস্ত ঝগড়া, কূটক্যাচাল শোনেন তাই না মিস্টার ভাইপার? নিজের সংসারে অ্যাপ্লাই করেছেন কখনো সেসব?”
সাইফারের খোঁচায় ভাইপার থতমত খেয়ে গেল। এভাবে তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে তিনি বুঝতেও পারেননি। সাইফার আবারও বলতে শুরু করল,

“আমার স্ত্রীর অফিস কলিগ নাজমা নামের মহিলাটি ও তার স্বামী এই লোকের গোপনীয় লোক। প্রতিনিয়ত আমার সম্পর্কে নেগেটিভ কথা বলে আমার স্ত্রীর মন আমার প্রতি বিষিয়ে দিচ্ছিল ভাগ্যিস সে ঐ ফাঁদে পা দেয়নি নয়তো আমার সংসার ভাঙতো বহু আগে। হাসপাতালে মুনতাজির ভর্তি হয়েছিল সেটাও কিন্তু এই লোকের কারণেই।”
সকলে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বিশেষ করে মুনতাজির জায়েদ। বিস্মিত গলায় বলল,
“মানে? সেটা তো একটা অ্যাকসিডেন্ট ছিল। আর বাদবাকি সবকিছু অভিনয় ছিল।”
সাইফার চেয়ারের হাতলে দুই হাত রেখে ঊর্ধ্বমুখী চেয়ে বলল,

“উহু মানহাকে সবকিছুতে ডিফেন্ড করতি বলে তোকে সন্দেহ করা শুরু করেছিল। পরিকল্পনা করে গাড়ির ধাক্কায় পা ভেঙে দিয়েছিল। আমি হলে মেরে ফেলতো শুধু তুই বলে হালকা শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। হিডেন মাইক্রোফোনের সাহায্যে তোর সঙ্গে আমার খারাপ ব্যবহার সবই শুনেছিল। আসলে দেখতে চেয়েছিল তোর প্রতি আমার ভালবাসা, বিশ্বাস এখনো আগের মতো আছে কিনা। হাসপাতালে তোকে এজন্যই অভিনয় করতে বলেছিলাম। সেখানেও তার গুপ্ত সহচর ছিল। নাম গার্বেজ ওরফে পারভেজ। যে ঠ্যাং ভাঙা মজনু রূপে আমাদের প্রত্যেকটা পদক্ষেপের নজর রাখছিল। মানহাকে কষিয়ে চড় মারার অংশটাও তার স্ত্রী সেজে থাকা মহিলাটা লুকিয়ে ক্যাপচার করেছিল। তুই তো তোর মামার এতসব লুকায়িত রূপ সম্পর্কে দুদিন আগেও জানতি না তবে আমি আর চাচ্চু সবই জানতাম। সেই বিশ্বাসঘাতকতার পর আমার তোকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো। মনে হতো তুই অভিনয় করছিস। তোর মামাই তোকে আমার সাথে ভাব জমাতে ব্যবহার করছে। কিন্তু সেদিনের ঘটনার পর আমার ধারণা পুরোপুরি পাল্টে গেল। তুইও যে এই লোকের স্রেফ একটা দাবার গুটি বুঝে গিয়েছিলাম।”

সাইফার একটু থেমে আবার বলতে লাগল,
“কিলার জাদ ওরফে আমজাদ পাঠান ছিল এই লোকের ডান হাত। সমস্ত অপকর্ম, কুকর্ম কিলার জাদকে দিয়েই করাতো সে। জানোয়ারটা আমার বোনকে বিয়ে করতে উঠে পড়ে লাগে। সেসময় তুই মানহার ঢাল হয়েছিলি নয়তো ঐ বাস্টার্ড মানহাকে ভালোভাবে বাঁচতে দিতো না। গ্রামে বাবাকে থ্রেট দেয়া, ভাইদের অত্যাচার করা সবই আমার কানে পৌঁছেছিল। সেসময় আমাদের পরিবারে তুই ঢাল না হলে আমার পরিবারকে বোধহয় হারিয়ে ফেলতাম। এজন্য তোকে বোনের জামাই হিসেবে প্রথমে মানতে নারাজ হলেও বাবা সেদিন ডেকে নিয়ে চুপিচুপি সমস্ত কিছু খুলে বলায় আর আপত্তি করিনি। তোর কাছেই মানহার সুরক্ষা কবচ তুলে দিয়েছিলাম। আমার কিংবা আমার পরিবারের জন্য সে ও তার সহযোগীরা ত্রাস হিসেবে ভূমিকা পালন করল। দুই বছর ধরে গোয়েন্দা সংস্থায় বিভিন্ন ক্রিমিনালের তথ্য সাপ্লাই করা শুরু করি তবে অফিসিয়ালি সাসপেন্ড মেয়াদ শেষ হয় কিছুদিন আগে। চার বছরে একটু একটু পরিকল্পনা করেছি। এবার গোয়েন্দা সংস্থায় যোগদান করে সর্বপ্রথম কিলার জাদকে ধরি। আবারও ক্ষেপে ওঠেন মিস্টার ব্ল্যাক ভাইপার। তার কৃতকর্মের সবকিছু আমার কাছে সুরক্ষিত আছে বিধায় তার সম্রাজ্য বাঁচাতে উঠে পড়ে লাগেন আমাকে নিশ্চিহ্ন করতে।

এরপর থেকে প্রতিটা মুহূর্ত অপেক্ষা করেছি কবে মিস্টার ভাইপারকে পাকড়াও করব। এজন্য কত পরিকল্পনা করেছি, ভিন্ন সত্তায় নিজেকে উপস্থাপিত করেছি। নিজের সন্তানকে পর্যন্ত আমি ব্যবহার করেছি। এতটাই ধূর্ত ছিল এই লোক। যাকে ধরা, ছোঁয়া যেত না। ঠাণ্ডা মাথায় চাচ্চু আর আমি পরিকল্পনা করি। তবে আমার সন্তান ও সন্তানের মা হয় এবার ভুক্তভোগী। ভাইপার ভেবেছিল আমার সন্তানের মাধ্যমে আমাকে ধরে এনে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি এসব আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল। বাপেরও যে বাপ আছে সেটা সে কোনোদিনও কল্পনা করেনি।”
কথা শেষ করতেই সাইফারের চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো। ভাইপার কপালে হাত ঠেকিয়ে পরাজিত ভঙ্গিতে খুব ধীর গলায় শুধালো,

“তোমার চাচার নাম কী?”
“মার্ভ জেন।”
মুনতাজির শান্ত গলায় বলল। মার্ভ জেন হাসিমুখে উপস্থিত হলো। ভাইপার দেখে অবাক হয়ে বলল,
“তুমি তো সেই যে আমাকে সাইফার ও তার পরিবারের সমস্ত মুভমেন্টের তথ্য এনে দিতে। তোমার নাম হাবিব আকরাম না?”
মার্ভ জেন হাসিমুখে জবাব দিল,
“জ্বি স্যার আমিই সেই। ”
ব্ল্যাক ভাইপার তীব্র ক্রোধে ঝট করে দাঁড়িয়ে বলল,

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৯ (2)

“এতবড় গাদ্দারী, ছলনা, বিশ্বাসঘাতকতা!”
“জ্বি একেবারে আপনার মতো তাই না স্যাররর? ধোঁকা সবই ধোঁকাআ। আহারে আপনার জন্য বড্ড খারাপ লাগছে। এতবড় মাইনকার চিপায় কিভাবে পড়লেন ভাইপার সাপ থুক্কু সাব?”
মার্ভ জেন টেনে টেনে কথাটা বলল।

ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬০