ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৯
ছায়া
দেখতে দেখতে একটি সপ্তাহ কেটে গেল।পাহাড়ের বুকে কুয়াশার চাদর এখন আরও ঘন হয়েছে।শাহরিয়ারের অনুপস্থিতিতে বাংলোটা শুরুতে যতটা নিঝুম মনে হয়েছিল,ইলিয়ানার চঞ্চলতায় তা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে ইলার মনের কোণে একটা অজানা আশঙ্কা সবসময়ই বিচরণ করে। শাহরিয়ার প্রতিদিন রাতে নিয়ম করে ফোন দেয়, কিন্তু নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে কথা খুব অল্পই হয়।
অন্যদিকে, স্কুলে ইলিয়ানা আর নিরব স্যারের মধ্যে এক অদ্ভুত ও সুন্দর বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়েছে।ক্লাসের ফাঁকে কিংবা টিফিনের সময় নিরব স্যার এখন ইলিয়ানার নিত্যসঙ্গী।কেউ বলবেন না তারা শিক্ষক আর ছাত্রী বরং মনে হয় তারা বহু বছরের চেনা কোনো দুই সত্তা।একদিন টিফিনের সময় নিরব ইলিয়ানাকে নিয়ে স্কুলের লাইব্রেরির পাশের বাগানে বসে ছিলেন।
নিরবঃ- প্রিন্সেস আজ তোমার টিফিনে এনেছো?আজকেও কি তোমার মাম্মাম এর হাতের জাদুকরী কিছু এনেছো?
ইলিয়ানা খিলখিল করে হেসে উঠল।নিরব এখন প্রাই ইলার হাতের রান্না খুজে কেনো খুজে সেটা সে নিজেও জানে না। কিন্তু ইলার হাতের রান্না খেয়ে তার পূরোন কারো সৃতি ভেসে আসে। ইলিয়ানা টিফিন বক্স খুলে পরোটা নিরবের দিকে এগিয়ে দিল।
ইলিয়ানাঃ- স্যার আজ জবেদা দাদি পরোটা বানিয়েছে। তবে মাম্মাম গরুর গোসত রান্না করেছে। আপনি খেয়ে দেখুন তো কেমন হয়েছে? আমার আরিয়ান এর নাকি এই রান্না অনেক পছন্দের ছিলো।
নিরব পরোটার সাথে এক টুকরো গোসত মুখে নিয়ে থমকে গেলেন আরিয়ান নামটা শুনে।নিরব এর মস্তিষ্কের কোনো একটা কোণ তীব্রভাবে জানান দিয়ে ওঠে। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন
নিরবঃ- আরিয়ান কে ইলিয়ানা তোমার অন্য কোনো মামা নাকি?
ইলিয়ানা মাথা নেড়ে বলল
ইলিয়ানাঃ- না,আরিয়ান তো আমার পাপা। মাম্মাম বলে পাপা নাকি আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হয়ে আমাদের দেখছে। কিন্তু জানেন স্যার? আপনার গলার স্বর শুনলে না, আমার মনে হয় পাপা আকাশ থেকে নেমে এসে আমার সাথে কথা বলছে।
নিরব চুপ হয়ে গেলেন তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। কেন এই ছোট্ট মেয়েটার কথাগুলো তার হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে? তিনি ছোটবেলা থেকে লন্ডনে বড় হয়েছেন বলে জানেন, কিন্তু সেই দুর্ঘটনার পরের স্মৃতিগুলো কেন এত ঝাপসা?
সেই রাতে নিরব তাদের ফ্ল্যাটে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলেন। জানালার বাইরে পাইন গাছের শোঁ শোঁ শব্দ। ঘুমের ঘোরে তিনি আবার সেই স্বপ্নটা দেখতে শুরু করলেন।
একটি ধোঁয়াটে রণক্ষেত্র। চারদিকে গুলির শব্দ আর বারুদের গন্ধ। নিরব দেখছেন তিনি ইউনিফর্ম পরে দৌড়াচ্ছেন। তার সামনে একজন ছিপছিপে গড়নের মেয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। মেয়েটির মুখটা স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার হাসির শব্দটা একদম চেনা। মেয়েটি বলছে
“আরিয়ান ফিরে এসো আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
পরক্ষণেই দৃশ্য পাল্টে গেল নিরব দেখলেন তিনি পাহাড়ের খাদ দিয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছেন।চারদিকে শুধু অন্ধকার তিনি চিৎকার করে উঠতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোলো না।
হঠাৎ ধড়ফড় করে জেগে উঠলেন নিরব।সারা শরীর ঘামে ভিজে একাকার।তিনি উঠে বসে এক গ্লাস পানি খেলেন। আয়নার সামনে গিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলেন।নিরব বিড়বিড় করে বললেন
নিরবঃ- কে এই আরিয়ান?কেন বারবার আমি যুদ্ধে নিজেকে দেখি? বাবা কি তবে আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছেন? আমার অতীত কি লন্ডনে নয়,এই পাহাড়ের বুকেই ছিল?
পরদিন সকালে স্কুলে আসার পর নিরবকে কিছুটা বিমর্ষ দেখাচ্ছিল।ইলিয়ানা সেটা খেয়াল করল। সে ক্লাস শেষে নিরবের কাছে গিয়ে তার হাতে একটা ছোট বুনো ফুল দিল।
ইলিয়ানাঃ- স্যার,আপনার কি আজ মন খারাপ? আপনি কি ডাইনোসরের দেশে ফিরে যাবেন?
নিরব ইলিয়ানাকে কাছে টেনে নিলেন।তার কপালে হাত বুলিয়ে বললেন
নিরবঃ- না রে মা আমি কোথাও যাব না। আচ্ছা ইলিয়ানা তোমার মাম্মামের সাথে কি আমার একবার দেখা হতে পারে? আমি আসলে উনার হাতের রান্না করা স্যান্ডউইচের রেসিপিটা জানতে চাই।
নিরব নিজেই জানেন না তিনি কেন ইলার সাথে দেখা করতে চাইছেন।এটা কি শুধুই কৌতূহল,নাকি নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা?ইলিয়ানা খুশি হয়ে হাততালি দিয়ে উঠল।
ইলিয়ানাঃ- অবশ্যই আজ বিকেলেই আসুন না আমাদের বাসায়। মামা তো নেই মাম্মাম একা বোর হচ্ছে। আপনি গেলে খুব খুশি হবে।
নিরব এক মুহূর্ত ভাবলেন শাহরিয়ারের কড়া সতর্কবার্তার কথা তিনি জানেন না, কিন্তু তার সিক্সথ সেন্স বলছে এই বাংলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার হারিয়ে যাওয়া জীবনের চাবিকাঠি।ইলিয়ানাকে বলল সে বিকেলে যাবে।
তাই ইলিয়ানা স্কুল থেকে ফিরে ইলাকে সব কিছু বলেছে, ইলাও বাধা দেয়নি ইলিয়ানার কাছে অনেক অনেক গল্প শুনেছে তার নিরব স্যার এর। ইলা চেয়েছিলো শাহরিয়ার আসলে তাকে ইনভাই করবে। কিন্তু আজ যেহেতু সে নিজের আসার আগ্রহ দেখিয়েছে তাই আর কিছু বলল না।
বিকেল বেলা,যখন সূর্য পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকাচ্ছে, তখন নিরব তার সাদা গাড়িটা নিয়ে ইলাদের বাংলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কলিং বেলের শব্দ শুনে ইলা ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল
ইলাঃ- জবেদা খালা দেখোতো কে এসেছে?
কোনো উত্তর এলো না তাই ইলা নিজের গেলো দরজা খুলতে। দরজার কাছে যেতেই এক পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ দরজার নিচ দিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।ইলার শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল।এই ঘ্রাণ এই এটা তো আরিয়ানের……
ইলা কাঁপাকাঁপিতে দরজার নবটা ঘুরিয়ে খুলল। সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, তার নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ইলাঃ- কে?? কাকে চাই??
নিরব শান্ত চোখে ইলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইলার চোখের মণি দুটো স্থির, সে দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু নিরব যেন সেই অন্ধ চোখ দুটোর গভীরে তার সারা জীবনের উত্তর খুঁজে পেলেন।
নিরবঃ- আমি নিরব চৌধুরী ইলিয়ানার টিচার।
ইলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।এই স্বর এই গভীরতা এটা কি সত্যিই কোনো অপরিচিত মানুষের হতে পারে?পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। চারদিকের বাতাস থমকে দাঁড়িয়েছে। নিরব চৌধুরীর কণ্ঠস্বর যখন তার কানে আছড়ে পড়ল, ইলা অনুভব করল তার বুকের ভেতর এক বিশাল সাইক্লোন বয়ে যাচ্ছে। এই স্বর, এই তীক্ষ্ণ অথচ মায়াবী গভীরতা যা এক সময় ইলার সারাটা পৃথিবী জুড়ে ছিল।
ইলার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। সে দরজার চৌকাঠটা শক্ত করে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। তার অন্ধ দুচোখ বেয়ে অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। নিরব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন এই শান্ত মেয়েটির দিকে। তার কান্নার কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না, অথচ তার নিজের হৃদপিণ্ডও কেন যেন আজ অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্পন্দিত হচ্ছে।ইলা বিড়বিড় করে অস্ফুট স্বরে বলল,
ইলাঃ- এই কন্ঠস্বর আমি কি ভুল শুনছি?
নিরব কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললেন,
নিরবঃ- মিসেস ইলা আপনি ঠিক আছেন? আমি কি ভুল সময়ে চলে এলাম?
নিরবের এই ‘ Mrs. Ila’ সম্বোধনটা যেন ইলার কানে তপ্ত সিসার মতো লাগল। কিন্তু ওই কণ্ঠের প্রতিটি ভাঁজে যে সুর লুকিয়ে আছে, তা ইলা হাজার বছর পর শুনলেও চিনতে পারবে। ইলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হঠাতই কান্নায় ভেঙে পড়ল, কিন্তু সেই কান্নার আড়ালে ছিল এক অদ্ভুত বিজয়ের হাসি।ইলা ধরা গলায় চিৎকার করে বলে উঠল,
ইলাঃ- আমি জানতাম আমি জানতাম আপনি ফিরবেন আমার বিশ্বাস মিথ্যে হতে পারে না। আপনি এসেছেন… আমার ‘ভয়েজ কিং’ ফিরে এসেছে
নিরব চমকে দুই পা পিছিয়ে গেলেন।তার মাথার ভেতর তড়িৎ খেলে গেল ‘ভয়েজ কিং’ এই শব্দটা শোনার সাথে সাথে নিরবের চোখের সামনে সেই ঝাপসা স্বপ্নের মেয়েটির মুখটা ভেসে উঠল।সেই রণক্ষেত্র, সেই হাসি, আর এই ডাকটা সব যেন এক নিমিষেই এই অন্ধ মেয়েটির চেহারায় এসে মিশে গেল।
নিরবের মস্তিষ্ক তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল। তিনি কপালে হাত দিয়ে ধরে দেয়ালে হেলান দিলেন। তার মনে হচ্ছে,তার স্মৃতির সেই হাসিমুখের মেয়েটি আর কেউ নয় এই ইলা কিন্তু কীভাবে? তার পরিচয় তো আজ একটু আগেই হলো।নিরব কাঁপা গলায় বললেন,
নিরবঃ- আপনি আমাকে কী নামে ডাকলেন? ভয়েজ কিং? কে সে?আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে আমি নিরব চৌধুরী।
ইলা দেয়াল হাতড়ে নিরবের খুব কাছে চলে এলো।সেই দিকটায় মুখ তুলে তাকিয়ে হাসল।চোখের জল আর হাসির এমন সংমিশ্রণ নিরব আগে কখনো দেখেননি।
ইলাঃ- এত বছর আমি শুধু এই স্বরটা শোনার জন্য বেঁচে ছিলাম।আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার সেই ভয়েজ কিং, যার কণ্ঠ শুনে আমি প্রেমে পড়েছিলাম।
নিরব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ইলার এই আকুলতা তার ভেতরের কোনো এক শক্ত দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। তার মনে হলো,সে যেন এক গভীর গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে। ইলার মুখাবয়ব দেখার পর থেকে তার স্মৃতিতে জমে থাকা সেই কুয়াশাগুলো ধীরে ধীরে সরতে শুরু করেছে।
ঠিক তখনই ইলিয়ানা ড্রয়িং রুম থেকে দৌড়ে এলো।
ইলিয়ানাঃ- মাম্মাম তুমি কাঁদছো কেন? স্যার আপনি কি মাম্মামকে বকেছেন?
ইলা দ্রুত চোখের জল মুছে ইলিয়ানাকে জড়িয়ে ধরল। সে নিরবের দিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
ইলাঃ- না রে মা স্যার বকবে কেন? আসলে তোর স্যার এর সাথে আমার অনেক কাছের কাউকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম।
নিরব তখনো ঘোরের মধ্যে।তিনি ইলার দিকে তাকিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করছেন তবে কি বাবা তাকে মিথ্যে পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে? আমি কি সত্যিই এই পরিবারের অংশ?
পরের এক ঘণ্টা ড্রয়িং রুমে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করল।জবেদা খালা চা দিয়ে গেলেন।নিরব চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন ঠিকই,কিন্তু তার নজর বারবার ইলার দিকে যাচ্ছে।ইলা যদিও দেখতে পাচ্ছে না,কিন্তু সে অনুভব করতে পারছে নিরবের অস্থিরতা।নিরব অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
নিরবঃ- আমি জানি না আপনি আমাকে কেন অন্য কেউ ভাবছেন।কিন্তু আপনার কথাগুলো শোনার পর আমার নিজের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ হচ্ছে। আমার অতীতে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল যার পর থেকে আমি অনেক কিছুই ভুলে গেছি।
ইলা ম্লান হেসে বলল,
ইলাঃ- আসলে সরি আমি চোখে দেখিনা কিন্তু অনুভব করলাম আপনি আমার কাছের কেউ তাই। কিছু মনে করবেন না আমি আমার এই ব্যবহার এর জন্য ক্ষমা করবেন।
নিরব কিছু বলল না পূরো বিকেল নিরব আর ইলিয়ানা খেললো আজ নিরব ও মনে হচ্ছে তার হাসি ফিরে পেয়েছে। ইলিয়ানার সাথে বাগান ঘুরে দেখছে। এই বাগানের সব ফুল নিরবের পছন্দের। নিরবের কেমন স্বপ্নের মত কেমন জানি মিলে যাচ্ছে। এভাবে সন্ধ্যা নেমে এসেছে নিরব যখন বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠলেন, তখন তার সারা শরীর অবসন্ন। গাড়ির লুকিং গ্লাসে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি যেন এক অচেনা মানুষকে দেখলেন।
নিরব যাওয়ার পর থেকেই ইলা এটাই চিন্তা করছে এতটা মিল কিভাবে থাকতে পারে তার সাথে।ভাবতে ভাবতে শাহরিয়ারের ফোন এলো ইলার ফোনে।ইলা ফোন রিসিভ করেই উত্তেজিত হয়ে বলল,
ইলাঃ- ভাইয়া ভাইয়া আমি জানি না কতটুকু সত্যি কিন্তু আমার মনে হয় আরিয়ান ফিরে এসেছে ভাইয়া! নিরব চৌধুরীই আরিয়ান!
ফোনের ওপাশে শাহরিয়ার স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
শাহরিয়ারঃ- বনু তুই কী বলছিস? পাগল হয়ে গেছিস?
ইলা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
ইলাঃ- আমি পাগল হইনি ভাইয়া আমি ওর ভয়েজ শুনেছি। আমি অনুভব করেছি এই পৃথিবীতে আর কারো কণ্ঠে এমন জাদু নেই। তুমি বিশ্বাস কর ভাইয়া, আমাদের আরিয়ান ফিরে এসেছে।
শাহরিয়ারের কপালে ঘাম জমে গেল।তার মনে পড়ে গেল সজলের পাঠানো সেই ইমেইলটা, যা সে একটু আগেই রিসিভ করেছে।সেখানে লেখা ছিল লন্ডনের সেই অক্সফোর্ড স্ট্রিটের ঠিকানায় নিরব চৌধুরী নামে সত্যি একজন ছিলো।কিন্তু সেই নিরব চৌধুরীর সাথে এই নিরব চৌধুরীর কোনো মিল নেই
তাহলে কে এই নিরব চৌধুরী? শাহরিয়ারের মনে এক বিশাল ভয়ের মেঘ জমতে শুরু করল। যদি লোকটা আরিয়ান স্যার হয়, তবে সে এতদিন কোথায় ছিল? আর যদি সে আরিয়ান না হয়,তবে সে কেন আরিয়ানের হুবহু রূপ আর স্বর নিয়ে ফিরে এলো?কে সে??
ইলার কথাগুলো শোনার পর শাহরিয়ারের আর এক মুহূর্ত স্থির থাকতে ইচ্ছে করছে না।অপারেশন হেডকোয়ার্টারের চার দেয়াল তাকে দমবন্ধ করে দিচ্ছে।সজলের পাঠানো ইমেইলটা সে আবারও চেক করল।লন্ডনের আসল নিরব চৌধুরী নামে একজন ব্যক্তি যে ৮ বছর আগে মারা গেছে।
তাহলে প্রিন্সিপাল আমজাদ চৌধুরীর এই ছেলেটি কে? কেন সে নিরব চৌধুরীর পরিচয় আর অবয়ব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে? শাহরিয়ারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে মনে মনে ঠিক করল, কাজ শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব তাকে ফিরতে হবে।
অন্যদিকে,
ইলারিয়ান এর স্বপ্ন বাগান থেকে বের হওয়ার পর নিরব চৌধুরীর পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেছে। গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফেরার সময় তার কানে শুধু ইলার সেই আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল “ভয়েজ কিং” এই নামটা শোনার পর তার মস্তিষ্কে যে ঝনঝনানি শুরু হয়েছে তা থামছেই না।
বাসায় পৌঁছে নিরব সরাসরি তার বাবার ঘরে ঢুকল। আমজাদ চৌধুরী তখন ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিলেন। ছেলেকে দেখে তিনি হাসিমুখে তাকালেন।
আমজাদঃ- কী ব্যাপার নিরব? আজ ফিরতে একটু দেরি হলো যে? স্কুলের কাজ বেশি ছিল?
নিরব কোনো ভণিতা করল না সে সোজা আমজাদ চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় প্রশ্ন করল
নিরবঃ- বাবা আমি কি সত্যিই তোমার ছেলে?
আমজাদ চৌধুরীর হাতের কলমটা হাত থেকে টেবিলের ওপর পড়ে গেল। তার চেহারায় এক মুহূর্তের জন্য আতঙ্কের ছায়া খেলে গেলেও তিনি তা দ্রুত সামলে নিলেন। একটা কৃত্রিম হাসি মুখে এনে বললেন—
আমজাদঃ- একী আবোলতাবোল বলছ বাবা কী হয়েছে তোমার? হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?
নিরব এবার টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল। তার চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত তেজ।
নিরবঃ- বাবা লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের যে ঠিকানায় আমরা থাকতাম বলে তুমি বলো, সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে নিরব চৌধুরী নামে যে থাকতো সে ৮ বছর আগে মারা গেছে তাহলে আমি জীবিত কিভাবে? আর আজ একজনের সাথে আমার দেখা হয়েছে যে আমাকে ‘ভয়েজ কিং’ বলে ডাকছে। সে বলছে আমার কন্ঠস্বর নাকি অন্য কারোর মতো। বাবা তুমি কি আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছ? সেই দুর্ঘটনার আগে আমি আসলে কে ছিলাম?
আমজাদ চৌধুরী এবার বেশ অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। তার গলার স্বরে কিছুটা অস্বস্তি।
আমজাদঃ- দেখো নিরব সেই দুর্ঘটনায় তোমার ব্রেনে চোট লেগেছিল।ডাক্তার বলেছিল তোমার মেমোরি ফিরে আসতে সময় লাগবে।তুমি এখন যা শুনছ বা দেখছ, সেগুলো তোমার হ্যালুসিনেশন হতে পারে।যার কথা বলছো সে হয়তো কোনো মানসিক ভারসাম্যহীন। তুমি কেন কারো কথায় কান দিচ্ছ? আমরা তোমার বাবা মা আমাদের তুমি বিশ্বাস করো না।
নিরবঃ- কিন্তু বাবা আমার স্বপ্নগুলো? কেন আমি ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় নিজেকে দেখি? কেন বারবার যুদ্ধের ময়দান আর একটা হাসিমুখের মেয়ে আমার সামনে আসে? সেই মেয়েটির অবয়ব আজ আমি সেই মেয়ের মধ্যে দেখেছি এটা কি শুধুই কাকতালীয়?
ঠিক সেই সময় নিরবের মা হাসনা বেগম ঘরে ঢুকলেন। স্বামী পুত্রের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুনে তিনি কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। তিনি নিরবের কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত রাখলেন।
হাসনাঃ- নিরব শান্ত হও বাবা তোর বাবা ঠিকই বলছে। তুই অসুস্থ ছিলি অনেক দিন। অতীতের কথা ভেবে কেন বর্তমানটা নষ্ট করছিস? আমরা তো তোকে ভালো রাখার জন্যই সব করেছি।
নিরব মার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারা দুজনেই আমতা আমতা করছেন, সরাসরি কোনো উত্তর দিচ্ছেন না এটা বুঝতে নিরবের বাকি রইল না। তার মনের সন্দেহ এখন বদ্ধমূল বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। সে গলার স্বর নিচু করে বলল
নিরবঃ- তোমরা আমাকে অনেক কিছু গোপন করছ। হয়তো আমার ভালোর জন্যই করছ, কিন্তু আমি আমার শিকড় না জেনে শান্তিতে থাকতে পারছি না। আমি নিজেই খুঁজে বের করব আমি কে।
নিরব নিজের ঘরে চলে গেল আমজাদ চৌধুরী আর হাসনা বেগম একে অপরের দিকে তাকালেন। তাদের চোখেমুখে এক অজানা ভয়ের ছাপ।সারারাত নিরবের চিন্তায় কাটলো আসলে কে সে।
পরের দিন নিরব স্কুলে গিয়েও ঠিকমতো মন দিতে পারছিল না। তার মাথায় শুধু ইলার সেই কান্নাভেজা মুখ ভাসছে। সে ঠিক করল আজ সে আবার ইলার কাছে যাবে। তবে শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন সত্যসন্ধানী হিসেবে।টিফিনের সময় সে ইলিয়ানাকে খুঁজে বের করল।ইলিয়ানা তখন বারান্দায় খেলছিল।
নিরবঃ- প্রিন্সেস আজ স্কুল শেষে কি আমাকে তোমাদের বাসায় নিয়ে যাবে? আমার তোমার মাম্মামের সাথে আরও কিছু কথা ছিল।
ইলিয়ানা খুশি হয়ে বলল
ইলিয়ানাঃ- অবশ্যই স্যার আপনি গেলে মাম্মাম খুব খুশি হবে। জানেন স্যার আপনি যাওয়ার পর মাম্মাম সারারাত ঘুমানি, শুধু একটা নাম ধরে বিড়বিড় করছিল ‘আরিয়ান’
নিরবের বুকটা একবার কেঁপে উঠল ‘আরিয়ান’ এই নামটার মধ্যেই কি লুকিয়ে আছে তার অস্তিত্বের সমাধান?
এদিকে শাহরিয়ার তার হেডকোয়ার্টারে বসে সজলকে আবার ফোন করল।
শাহরিয়ারঃ- সজল আমাকে নিরব চৌধুরীর মেডিকেল রিপোর্ট জোগাড় করে দে। আর সেই নিরব চৌধুরীর ডেথ সার্টিফিকেট সেটা ও আমার জানা দরকার। আর আমজাদ চৌধুরীর ব্যাংক স্টেটমেন্টও চেক কর।কোনো বড় ট্রানজাকশন হয়েছিল কি না।
শাহরিয়ারের মনে হচ্ছে সে এক বিশাল ষড়যন্ত্রের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।যদি নিরব চৌধুরীই আরিয়ান স্যার হয়, তবে তাকে কেন মৃত্যুর নাটক সাজিয়ে সরিয়ে রাখা হয়েছিল? আর কেনই বা এত বছর পর তাকে অন্য পরিচয়ে এই পাহাড়ি অঞ্চলেই ফিরিয়ে আনা হলো?
স্কুল ছুটির পর নিরব যখন ইলাদের বাংলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, আকাশটা কালো হয়ে বৃষ্টি নামার উপক্রম। ইলা বারান্দায় বসে ছিল, বৃষ্টির ঘ্রাণ নিচ্ছিল। নিরবের পায়ের শব্দ শুনতেই সে ঘুরে দাঁড়াল।
ইলাঃ- আপনি আবার এসেছেন?
নিরব কাছে গিয়ে দাঁড়াল তার চোখে জল না থাকলেও মনের ভেতর এক বিশাল হাহাকার।
নিরবঃ- মিস ইলা আমি আমার পরিচয় খুঁজতে এসেছি। আমাকে সাহায্য করুন আপনি কী করে নিশ্চিত হলেন যে আমিই আপনার সেই মানুষটি?
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৮
ইলা এক পা এগিয়ে এল সে নিরব কে বলল হাতের কবজিটা দেখতে, সেখানে একটা পুরনো দাগ আছে কি না।নিরব আঙুল বুলিয়ে সেই দাগটা অনুভব করল আর কম্পিত স্বরে বলল
নিরবঃ- আমার এখানে দাগ আছে এটা আপনি কি করে জানলেন?
ইলাঃ- এই দাগটা এটা তো সেই দাগ যা আপনি আমার জন্য খেয়েছিলেন।শরীর পাল্টে যেতে পারে, কিন্তু আপনার দেহের এই চিহ্নগুলো তো মিথ্যে বলবে না।
নিরব স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল নিজের হাতের দিকে। এই দাগটা নিয়ে আমজাদ চৌধুরী বলেছিল এটা ছোটবেলার চোট। আজ ইলার কথা শুনে সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে।
