Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭০

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭০

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭০
ছায়া

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল পাহাড়ের গায়ে বৃষ্টির ঝাপটা এক ভয়ংকর সুন্দর পরিবেশ তৈরি করেছে। কিন্তু বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই মানুষের হৃদয়ে এখন বৃষ্টির চেয়েও বড় ঝড় বইছে। নিরব নিজের হাতের কবজির সেই গভীর দাগটার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে বলা হয়েছে এটা সাইকেল থেকে পড়ে যাওয়ার চোট, অথচ এই অন্ধ মেয়েটি কোনো এক অলৌকিক শক্তিতে জানে এটা এক্সিডেন। নিরব কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
নিরবঃ- আপনি না দেখেও কী করে জানলেন এখানে ক্ষত আছে? আপনি কি সত্যিই আমাকে আগে থেকে চিনতেন?
ইলা ম্লান হাসলঁ সেই হাসিতে হাজার বছরের ক্লান্তি আর একবিন্দু প্রাপ্তির সুখ মিশে আছে। সে হাত বাড়িয়ে নিরবের কবজিটা ছুঁয়ে দিল।

ইলাঃ- “দৃষ্টিশক্তি নেই বলে কি স্মৃতিও হারিয়ে গেছে? এই দাগটা সেদিন তৈরি হয়েছিল যেদিন আপনি আমাকে ভার্সিটিতে লিয়ানের সাথে কথা বলতে দেখে জেলাস হয়ে লিয়ান কে কথা শুনিয়েছিলেন। আর লিয়ান রাগ করে তার কার দিয়ে আপনার বাইক ঠুকে দেয়।
আপনার গলার স্বর, আপনার গায়ের ঘ্রাণ আর এই ক্ষত এগুলো আমার কাছে আপনার ডিএনএ রিপোর্টের চেয়েও বড় প্রমাণ।
নিরব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে ঝাপসা কিছু দৃশ্য দ্রুতবেগে ঘুরছে। একটা অন্ধকার ঘর, প্রচুর রক্ত, আর সাদা অ্যাপ্রন পরা কিছু মানুষের কথা। তার মনে হচ্ছে সে কোনো এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার।
এদিকে হেডকোয়ার্টারে শাহরিয়ারের ল্যাপটপে সজলের পাঠানো ফাইলগুলো একে একে ওপেন হচ্ছে। ফাইলের তথ্য দেখে শাহরিয়ারের কপালে ভাজ গভীর হলো। সে ফোনটা কানে তুলল।
শাহরিয়ারঃ- সজলবতুই কি নিশ্চিত?

সজলঃ- শতভাগ নিশ্চিত শাহরিয়ার। আসল নিরব চৌধুরী ৮ বছর আগে লন্ডনে এক রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। আর মজার ব্যাপার কী জানিস? ঠিক ৮ বছর আগে আমজাদ চৌধুরীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিশাল অংকের একটা টাকা জমা হয়েছিল, যার উৎস ছিল একটি বড় এনজিও, যারা যুদ্ধাহত সৈনিকদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করে। আর ওই একই সময় লন্ডনের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে একজন ‘আননোন পেশেন্ট’ এর ব্রেন সার্জারি করা হয়েছিল।শাহরিয়ার দাঁতে দাঁত চেপে বলল

শাহরিয়ারঃ- “তার মানে আরিয়ান স্যার মারা যাননি! তাকে ওই অবস্থায় উদ্ধার করে আমজাদ চৌধুরী নিজের মৃত ছেলের পরিচয় দিয়ে তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। কিন্তু কেন? কেন তাকে আমাদের থেকে আড়াল করা হলো?
সজলঃ- হয়তো ইমোশন নয়তো কোনো বড় স্বার্থ। আমজাদ চৌধুরী হয়তো তার হারানো ছেলেকে আরিয়ানের মাঝে ফিরে পেতে চেয়েছিলেন।কিন্তু তিনি এটা ভুলে গিয়েছিলেন যে সত্য কখনো চাপা থাকে না।
শাহরিয়ার আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে তার কমান্ডিং অফিসারকে ইমার্জেন্সি ছুটির জন্য রিকোয়েস্ট পাঠাল। তাকে এখনই ফিরতে হবে। আরিয়ান স্যারকে তার প্রাপ্য সম্মান আর ইলাকে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
বাংলোর ভেতর ইলা আর নিরব এখন মুখোমুখি বসে আছে। নিরবের মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। ইলা তাকে আরিয়ানের সাথে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তের গল্প বলছে।
ইলাঃ- আপনি গান গাইতে পারতেন না কিন্তু আপনার শিস দেওয়ার সুরটা ছিল অদ্ভুত। আপনি যখন খুব চিন্তায় থাকতেন, তখন কপালে তিনটা ভাঁজ পড়ত আপনার।
নিরব অজান্তেই তার কপালে হাত দিল। ঠিক তিনটি ভাঁজই পড়েছে সেখানে। তার মেমোরির তালাটা যেন ধীরে ধীরে খুলছে।সে হঠাৎ অস্ফুট স্বরে বলে উঠল

নিরবঃ- “ইলাফুল” সেই লাল ডায়েরিটা কি এখনও আছে? যেখানে আমি আমার স্বপ্ন লিখে রাখতাম?
কথাটা বলেই নিরব নিজের মুখ চেপে ধরল। সে তো এই ডায়েরির কথা জানত না! তবে কি এই শব্দটা তার অবচেতন মন থেকে বেরিয়ে এল? ইলা খুশিতে চিৎকার করে উঠল।
ইলাঃ- আপনি মনে করতে পারছেন?ডায়েরির কথা আপনার মনে আছে?
নিরব আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারছে, সে কোনো নিরব চৌধুরী নয়। সে মেজর আরিয়ান খান শাওন । সে একজন সৈনিক, সে ইলার স্বামী, সে ইলিয়ানার বাবা। কিন্তু আমজাদ চৌধুরীর দেওয়া এই ‘মিথ্যে’ বাবার পরিচয় আর মায়ার জাল তাকে এতদিন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল।নিরব উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন দৃঢ়তা সে বলল
নিরবঃ- ইলাফুল আমাকে আজই সব শেষ করতে হবে।আমি ওই বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। আমজাদ চৌধুরীর কাছ থেকে আমাকে জানতে হবে কেন তিনি আমাকে আমার পরিবার থেকে ছিনিয়ে নিলেন। কেন তিনি আমাকে ৮ বছর ধরে এই মায়ার নরকে বন্দি করে রাখলেন।
ইলা নিরবের হাতটা শক্ত করে ধরল।

ইলাঃ- সাবধানে যাবেন আরিয়ান। ওরা কিন্তু সহজে আপনাকে ছাড়বে না।
নিরব ইলার কপালে আলতো করে একটা চুমু খেল। ৮ বছর পর এই প্রথম এক স্পর্শে দুজনেই অনুভব করল তাদের হারানো পৃথিবী ফিরে পাওয়ার স্পন্দন।
নিরব যখন গাড়ি নিয়ে আমজাদ চৌধুরীর বাড়ির দিকে রওনা দিল, তখন পেছনে মেঘের গর্জন আরও বেড়েছে। আজ রাতে শুধু বৃষ্টি নামবে না, আজ রাতে বহু বছরের চাপা পড়া এক অন্ধকার সত্যের ওপর থেকে পর্দা সরবে।
বাসায় পৌঁছে নিরব দেখল আমজাদ চৌধুরী ড্রয়িং রুমে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন।নিরব সরাসরি গিয়ে দাঁড়াল।
নিরবঃ- “মিস্টার আমজাদ চৌধুরী” নাটক শেষ করার সময় হয়ে গেছে। আপনার মৃত ছেলের নামটা আর কতদিন আমি বয়ে বেড়াব?
আমজাদ চৌধুরী চমকে তাকালেন। নিরবের গলার স্বর এখন একজন কমান্ডিং অফিসারের মতো বজ্রকণ্ঠ।
ড্রয়িং রুমের আবহাওয়া এখন বাইরের ঝড়ের চেয়েও বেশি থমথমে। আমজাদ চৌধুরী স্তম্ভিত হয়ে নিরবের দিকে তাকিয়ে আছেন। নিরবের চোখেমুখে এখন আর সেই শান্ত শিক্ষকের ছায়া নেই, সেখানে ফুটে উঠেছে একজন দুর্ধর্ষ সৈনিকের কঠোরতা।নিরব চিৎকার করে উঠল,

নিরবঃ- উত্তর দিন নিরব চৌধুরী তো ৮ বছর আগেই লন্ডনে মারা গেছে। তাহলে এই ৮ বছর ধরে আপনি কাকে আপনার ছেলে বানিয়ে ঘরে রেখেছেন? আমি কে? আমার আসল পরিচয় কী?
আমজাদ চৌধুরী থরথর করে কাঁপছেন। হাসনা বেগম ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। আমজাদ চৌধুরী অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা গলায় বললেন
আমজাদঃ- নিরব শান্ত হও। যা করেছি তোমার ভালোর জন্যই করেছি।
নিরব দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

নিরবঃ- আমার ভালোর জন্য নাকি আপনার স্বার্থের জন্য? আমাকে আমার স্ত্রী আর সন্তানের থেকে দূরে সরিয়ে রাখা কি আমার ভালো ছিল? আমাকে একটা মিথ্যে পরিচয়ের খাঁচায় বন্দি করে রাখা কি ভালো ছিল?
ঠিক সেই মুহূর্তে ঝড়ের বেগে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল শাহরিয়ার।তার পরনে তখনও ইউনিফর্ম, কপালে বৃষ্টির পানি আর ঘাম মিশে একাকার। শাহরিয়ারকে দেখে আমজাদ চৌধুরী যেন পাথর হয়ে গেলেন।শাহরিয়ারের হাতে একটি ফাইল। সে সোজা আমজাদ চৌধুরীর সামনে গিয়ে ফাইলটা টেবিলের ওপর আছাড় দিল।
শাহরিয়ারঃ- নাটক শেষ মিস্টার প্রিন্সিপাল এই ফাইলে সব আছে। ৮ বছর আগে বর্ডারের সেই বিস্ফোরণের পর আরিয়ান স্যার যখন মারাত্মক আহত অবস্থায় নদীতে পড়ে যান, আপনি তাকে উদ্ধার করেছিলেন। আপনার ছেলে নিরবের সাথে তার চেহারার অদ্ভুত মিল থাকায় আপনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নেন। লন্ডনের প্রাইভেট ক্লিনিকে তার ব্রেন সার্জারির ব্যবস্থা করেন আপনিই। উদ্দেশ্য ছিল একটাই আপনার মৃত ছেলের জায়গায় আরিয়ান স্যারকে বসিয়ে নিজের একাকীত্ব দূর করা!
নিরব (আরিয়ান) শাহরিয়ারের দিকে তাকাল। শাহরিয়ারের চোখে জল।সে আরিয়ানের সামনে গিয়ে স্যালুট ঠুকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

শাহরিয়ারঃ- স্যার আমি জানতাম আপনি মরতে পারেন না।আপনার বডি সনাক্ত করার উপায় ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে বিশ্বাস করতে হয়েছে। কিন্তু আজ আপনাকে জীবিত দেখে সত্যি মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীতে আবার জন্ম নিলাম। ওয়েলকাম ব্যাক মেজর আরিয়ান
আরিয়ানের মস্তিষ্কে তখন হাজার হাজার স্মৃতির বিস্ফোরণ ঘটছে। ইলার সাথে প্রথম দেখা, বিয়ের রাত, আর সেই শেষ মিশন সবকিছু সিনেমার মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে টলতে টলতে সোফায় বসে পড়ল।তার দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল সে।
আরিয়ান বিড়বিড় করে বলল,
আরিয়ানঃ- আমি আরিয়ান…আমি নিরব নই। আমার একটা মেয়ে আছে… ইলিয়ানা! আমার ইলাফুল আমার বাবা মা আমার বোন দুটো তারা কোথায়?
শাহরিয়ারঃ- সবাই সুস্থ এবং ভালো আছে স্যার।
হাসনা বেগম এবার দৌড়ে এসে আরিয়ানের পায়ে পড়ে গেলেন।
হাসনাঃ- আমাদের মাফ করে দাও বাবা আমাদের একমাত্র ছেলে মারা যাওয়ার পর আমরা পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। তোমাকে যখন আধমরা অবস্থায় পেলাম, তোমার চেহারা দেখে আমাদের মনে হলো আমাদের নিরবই বুঝি ফিরে এসেছে। তোমাকে হারানোর ভয়ে আমরা তোমার অতীত মুছে দিয়েছিলাম। আমাদের জেল দাও, ফাঁসি দাও, শুধু ঘৃণা করো না বাবা।

আরিয়ান তার এই ‘মিথ্যে’ বাবা-মার দিকে তাকাল। রাগের চেয়েও তার করুণা বেশি হচ্ছে। এক অদ্ভুত মায়ার জালে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই মায়া ছিল বিষাক্ত।
শাহরিয়ার আরিয়ানকে ধরে দাঁড় করাল।
শাহরিয়ারঃ- স্যার, আপনার আসল ঠিকানা এখানে নয়। আপনার পরিবার আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। ইলা ৮ বছর ধরে আপনার পথ চেয়ে বসে আছে। চলুন আমার সাথে।
আরিয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ঘর থেকে বেরিয়ে জিপে গিয়ে বসল। শাহরিয়ার জিপ ছোটাল সেই পাহাড়ি বাংলোর দিকে।

বৃষ্টির বেগ কমছে, কিন্তু আরিয়ানের বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে। সে কীভাবে ইলার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? ইলা তো তাকে চিনতে পেরেছে শুধু তার স্বর শুনে, কিন্তু সে নিজে তো তাকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছিল!
বাংলোর সামনে জিপ থামতেই আরিয়ান দেখল ইলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ইলিয়ানা তার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে।শাহরিয়ার জিপ থেকে নেমে চিৎকার করে বলল,
শাহরিয়ারঃ- “বনু” দেখ কে এসেছে তোর বিশ্বাস জিতে গেছে রে।
ইলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে দেখতে পায় না, কিন্তু সে অনুভব করতে পারছে সেই চিরচেনা হৃদস্পন্দন। আরিয়ান ধীরপায়ে ইলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তার গলা কান্নায় বুজে আসছে।

আরিয়ানঃ- “ইলাফুল” তোমার ভয়েজ কিং ফিরে এসেছে।আমাকে কি ক্ষমা করবে?
ইলা ডায়েরিটা হাত থেকে ফেলে দিল। সে হাতড়ে আরিয়ানের মুখটা ছুঁয়ে দেখল।গাল বেয়ে নামা চোখের পানি আরিয়ানের হাতের তালুতে এসে পড়ল। ইলা হাসল, যে হাসিতে এক জীবনের তৃপ্তি মিশে আছে।
ইলাঃ- ক্ষমা কিসের? আপনি তো আমার হৃদয়েই ছিলেন।শুধু পথটা একটু লম্বা হয়ে গিয়েছিল।
সেই বিকেল থেকে ইলিয়ানা এই সব শুনছে এখন শাহরিয়ার আর তার স্যার এর কথা শুনে বুঝতে বাকি রইলো না এটাই তার হারিয়ে যাওয়া পাপা। ইলিয়ানা দৌড়ে এসে আরিয়ানের পা জড়িয়ে ধরল।
ইলিয়ানাঃ- পাপা? তুমি কি সত্যিই ডাইনোসরের দেশ থেকে ফিরে এসেছো? আর যাবে না তো?তুমি সত্যি আমার পাপা?

আরিয়ান ইলিয়ানাকে কোলে তুলে নিল। তার দুই চোখের জল আজ বাধ মানছে না। সে ইলা আর ইলিয়ানাকে নিজের বুকের মধ্যে মিশিয়ে নিল।
দূরে দাঁড়িয়ে শাহরিয়ার এই দৃশ্য দেখছিল আর তার চোখ মুছছিল। মায়ার জাল ছিঁড়ে সত্যের জয় হয়েছে। তবে লড়াই এখনো শেষ হয়নি, আরিয়ানের এই ফিরে আসার পেছনে আরও কোনো বড় ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা শাহরিয়ারকে খুঁজে বের করতেই হবে।
আরিয়ান, ইলা আর ইলিয়ানার সেই মহামিলনের মুহূর্তটি যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্যে রূপ নিল। শাহরিয়ার দূর থেকে তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু তার মনের এক কোণে তখনও খটকা আমজাদ চৌধুরী একা এত বড় কাজ করতে পারেন না। সেনাবাহিনী থেকে একজন মেজরের মৃত্যুর খবর ধামাচাপা দেওয়া এবং সার্জারির মতো ব্যয়বহুল কাজ করার পেছনে নিশ্চয়ই আরও বড় কোনো হাত আছে।

বাংলোর ড্রয়িং রুমে আজ এক নতুন আলোর মেলা বসেছে। ইলা আরিয়ানের হাতটা এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়ছে না, যেন ছেড়ে দিলেই এই স্বপ্নটা আবার হারিয়ে যাবে। ইলিয়ানা তার পাপার কোলে বসে একের পর এক বায়না ধরে যাচ্ছে। আরিয়ানও মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার ছোট্ট রাজকুমারীর দিকে তাকিয়ে আছে যার অস্তিত্বের কথা সে ৮ বছর ধরে জানতও না।
শাহরিয়ার গম্ভীর মুখে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। আরিয়ান তাকে দেখে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই শাহরিয়ার তাকে থামিয়ে দিল।
শাহরিয়ারঃ- “স্যার এখন আর প্রোটোকল নয়। আপনি এখন আমার বড় ভাই। এবং বোন জামাই। তবে একটা কথা আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। আমজাদ চৌধুরী একজন স্কুল প্রিন্সিপাল। তার পক্ষে কি সম্ভব ছিল সেনাবাহিনীর রেকর্ড থেকে আপনার নাম মুছে ফেলা?
আরিয়ান কপালে হাত দিয়ে একটু ভাবলেন। তার স্মৃতিগুলো এখনও পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়, মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে ওঠে।

আরিয়ানঃ- “শাহরিয়ার আমার মনে পড়ছে ৮ বছর আগে বর্ডারের যুদ্ধের সেই রাতে আমি একা ছিলাম না। আমার সাথে আরও একজন অফিসার ছিল। যার কোড নাম ছিল ‘শ্যাডো’। সেই শেষ মুহূর্তে বিস্ফোরণের আগে সে আমাকে বলেছিল ‘বিদায় ক্যাপ্টেন’’ আপনার অধ্যায় এখানেই শেষ।শাহরিয়ারের চোখ দুটো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
শাহরিয়ারঃ- তার মানে এটা শুধু একটা এক্সিডেন্ট ছিল না? আপনাকে মারার পরিকল্পনা করা হয়েছিল?
আরিয়ান মাথা নিচু করে বললেন,
আরিয়ানঃ- হয়তো আমজাদ চৌধুরী আমাকে উদ্ধার করার পর থেকে আমাকে সবসময় চোখে চোখে রাখতেন। তিনি আমাকে বলতেন আমি নাকি কোনো এক বড় মাফিয়া গ্যাং এর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি, তাই লুকিয়ে থাকাই ভালো। এখন বুঝতে পারছি তিনি আমাকে ভয় দেখিয়ে নিজের কাছে আটকে রাখতে চেয়েছিলেন।
ঠিক তখনই বাইরে জিপের শব্দ পাওয়া গেল। শাহরিয়ার সতর্ক হয়ে রিভলবার বের করল। কিন্তু দেখা গেল লিয়ান আর নাদিয়া হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকছে। আরিয়ানকে দেখেই লিয়ান থমকে দাঁড়াল।
লিয়ানঃ- আরিয়ান ভাই এ আমি কী দেখছি? তুমি…. তুমি বেঁচে আছো?
আরিয়ান লিয়ানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলেন।

আরিয়ানঃ- হ্যাঁ লিয়ান তবে নিরব চৌধুরী হিসেবে নয়, আরিয়ান হিসেবেই ফিরেছি।
নাদিয়া ইলাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। বাংলোর বিষাদ যেন এক নিমিষেই আনন্দে রূপ নিল। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই শাহরিয়ারের ফোনে একটা মেসেজ এল সজলের কাছ থেকে।
মেসেজ: শাহরিয়ার আমজাদ চৌধুরীর কল রেকর্ড ঘেঁটে একটা অদ্ভুত নম্বর পেয়েছি। নম্বরটি সরাসরি কোনো স্যাটেলাইট ফোন থেকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরিয়ানের চিকিৎসার সমস্ত খরচ এই নম্বর থেকেই ট্রান্সফার হয়েছিল। সাবধান থাকিস আমজাদ চৌধুরী কিন্তু শুধু এক দাবার ঘুঁটি ছিল।
শাহরিয়ার বুঝতে পারল বিপদ এখনও কাটেনি।সে আরিয়ানের কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল
শাহরিয়ারঃ- স্যার আজ রাতেই আমাদের এই বাংলো ছাড়তে হবে। আমজাদ চৌধুরীর ওপর নজরদারি বেড়েছে। ওরা হয়তো জেনে গেছে আপনি স্মৃতি ফিরে পেয়েছেন। আপনাকে আমাদের সেফ হাউসে নিয়ে যেতে হবে।
ইলা ভয় পেয়ে আরিয়ানের হাত শক্ত করে ধরল।
ইলাঃ- বার কি কোনো বিপদ হবে? আমি কি আবার আপনাকে হারাব?
আরিয়ান ইলার চিবুক ছুঁয়ে বললেন
আরিয়ানঃ- না ইলাফুল এবার তোমার ‘ভয়েজ কিং’ আর পরাজিত হবে না এবার লড়াইটা আমি লড়ব আমার মত করে।

রাতের অন্ধকারে তিনটা জিপ বাংলোর গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। গন্তব্য অজ্ঞাত কোনো সেফ হাউস।
অন্যদিকে,
আমজাদ চৌধুরীর বাড়িতে তখন অন্ধকার। আমজাদ চৌধুরী কারোর সাথে ফোনে কথা বলছেন।
আমজাদঃ- স্যার নিরব… মানে আরিয়ান সব জেনে গেছে। শাহরিয়ারও সেখানে পৌঁছে গেছে আমি এখন কী করব?
ওপাশ থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল
“তুমিও আমাদের জন্য একটা লাইবিলিটি হয়ে গেছ আমজাদ। আরিয়ানের স্মৃতি ফিরলে সে প্রথমেই তোমার বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেবে। তাই তোমার আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন নেই।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬৯

আমজাদ চৌধুরী কিছু বলার আগেই জানালা দিয়ে একটা সাইলেন্সর লাগানো পিস্তলের গুলি তার কপাল ভেদ করে চলে গেল। আমজাদ চৌধুরী নিথর হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
রহস্যের জাল এবার আরও গভীর হচ্ছে। কে সেই অদৃশ্য শত্রু যে আরিয়ানকে মারতে চেয়েছিল? আর কেনই বা আমজাদ চৌধুরীকে সরিয়ে দেওয়া হলো?

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৭১