ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৪৩
মিথুবুড়ি
‘প্রথম প্রভাত। ছোট ছোট চড়ুই পাখির আনাগোনা। আশপাশ ভরে উঠেছে বাড়ির পিছনের গাছের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা দুষ্টুমিষ্টি কিচিরমিচিরে। আলো এখনো পূর্ণ জাগেনি। এলিজাবেথ ভোরের আলো ফোঁটার আগেই যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নেয়। তাকবীর আর কিছু বলল না। এলিজাবেথ তার কথা রেখেছে, এবার তাকবীরের পালা। লাগেজ গোছানো শেষ, এলিজাবেথও পুরোপুরি তৈরি। তাকবীরও প্রস্তুত, ওকে চাচার বাড়ি পৌঁছে দেবে।
‘হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। এই ভোরবেলায় কে এল ভেবে এলিজাবেথ নিজেই দরজা খুলল। বাইরে দাঁড়িয়ে দারোয়ান, হাতে বড়সড় একটি ফাইল।
“বড় মালকিন এটা আপনার জন্য এসেছে। আপনাকেই খুলতে বলা হয়েছে।”
‘এলিজাবেথ অবাক হয়ে ফাইলটা হাতে নিল, “কে পাঠিয়েছে?”
“সেটা তো জানি না। বলল, যেন আপনার হাতেই দেওয়া হয়,” বলে দারোয়ান চলে গেল।
‘ফাইলটা হাতে নিয়ে বারবার উল্টে-পাল্টে দেখল এলিজাবেথ। কোনো প্রেরকের নাম নেই! শুধু অচেনা সিলমোহর। কপালে ভাঁজ ফেলে গিয়ে বসল সোফায়। ধীরে ধীরে ফাইলের ক্লিপ খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বেশ কিছু কাগজপত্র।এলিজাবেথের দৃষ্টি আটকে গেল একটি লাইনে,
“গোপনীয়: শুধুমাত্র প্রাপক পড়ার জন্য”।
‘মুহূর্তেই ঘর ভরে উঠল অজানা এক উদ্বেগের ভারে। বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। প্রথম ফাইলের পাতা উল্টাতে উল্টাতে এলিজাবেথের ভ্রু কুঁচকায়। দেশের নামি-দামি গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নাম, তাদের জীবনের আদ্যোপান্ত লেখা,সম্পত্তির হিসাব, লেনদেনের তথ্য, এমনকি কিছু গোপন তথ্য যা সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়। এলিজাবেথ কিছুই বুঝে উঠতে পারে না এসব তার কাছে কেন পাঠানো হয়েছে। হঠাৎ চোখ আটকালো একটি পরিচিত নামে। হৃদস্পন্দন থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য! কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে বোঝাল ‘একই নাম তো অনেকেরই হতে পারে।’ তেমন আমলে নিল না।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘ফাইলটা সরিয়ে নিল এলিজাবেথ। ভিতর থেকে বের করল আরেকটি খাম। খুলেই আঁতকে উঠল! বিগত বারো বছরের সব নিখোঁজ শিশুদের রিপোর্ট, সবার ছবি, বয়স, ঠিকানা, নিখোঁজের তারিখ। পাতার পর পাতা জুড়ে শত শত নাম। প্রতিটি নিষ্পাপ মুখের ছবি যেন ভীষণ ভারী করে তুলল ঘরের বাতাস। এলিজাবেথের মুখ গম্ভীর হয়ে এল! বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভূত হচ্ছে।
‘অবশেষে বের করল শেষ খামটি। এখানে ছিল কিছু শিশুদের মৃত্যুসনদ। নির্দিষ্ট তথ্য, বয়স, মৃত্যু কারণ। আর সবার নিচে রাখা ছোট্ট একটি মেমোরি কার্ড। শরীরটা হঠাৎ থমকে যায়। গলার কাছে জমে থাকা শ্বাসটা এক শক্ত ঢোক গিলে নামায় এলিজাবেথ। সাহস সঞ্চয় করে মেমোরি কার্ডটা টিভিতে লাগায়। ভিডিও চালু হতেই এলিজাবেথের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। ঠোঁট কাঁপতে থাকে অনবরত। চোখ বড় বড় হয়ে যায় আতঙ্কে। কার্নিশ কোণে জমে থাকা নোনা জল ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে। শরীর জমে যায় সেখানে। ভিতরে তোলপাড় ঢেউ খেলে গেলেও দৃষ্টি সরে না টিভির পর্দা থেকে।
‘পর্দায় ভেসে উঠল এক নৃশংস, ভয়াবহ দৃশ্য।
একটা শীতল ল্যাব। চারদিক ঘন কেমিকেলের ধোঁয়ায় ঢাকা। মৃত্যু আর জীবনের মাঝখানে এক অদ্ভুত বিভাজন রেখা টানিয়ে রাখা হয়েছে এখানে। স্টেইনলেস স্টিলের টেবিলের উপর শুয়ে আছে ছোট ছোট নিথর দেহ, নিঃসাড়, নির্দোষ, নিষ্পাপ প্রাণ। ক্যামেরা ধীরে ধীরে জুম করে এগোতে থাকে আর এলিজাবেথের হৃদস্পন্দন থামতে থাকে। সাদা ডাক্তারের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে তাকবীর৷ নির্লিপ্ত, ঠান্ডা চোখে নিখুঁতভাবে কাজ করছে৷ যেন বহুবার চর্চা করা কোনো শৈল্পিক দক্ষতা!ছোট্ট দেহগুলোর বুক, পেট চিরে বের করে নিচ্ছে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ-চোখ, কিডনি, লিভার-সবকিছু। কাটার সময় তাকবীরের হাতে কোনো কাঁপুনি ছিল না আর না মুখে কোনো ভাবলেশ।
‘আশেপাশের কিছু মানুষও সাদা ল্যাবকোট পরে ব্যস্ত। তারা ছোট ছোট বয়ামে সংরক্ষণ করছে অঙ্গগুলো। এক সারি তাকজুড়ে থরে থরে সাজানো বয়াম। প্রতিটিতে ছোট ছোট চোখ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কেমিক্যালের মাঝে ভাসছে। চারপাশে শুধু ব্লাড ব্যাগ, অপারেশন টুলস, আর নীরবতা। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। বুকে গুমোট এক যন্ত্রণা! শ্বাস নিতে গিয়েও এলিজাবেথ হাঁপিয়ে উঠছে। তাকবীর-যে মানুষটি তার সবচেয়ে আপন সেই মুখ এখন এক ভয়ংকর দানবে রূপান্তরিত। এই-কি তার ভালো মানুষ! তার আলোর দিশারি, শান্তির পূজারী?
‘এলিজাবেথ অনুভব করল ওর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছে। চোখের জল গুলো আজ করল না কোনো কৃপণতা। টপটপ করে অশ্রু ঝরছে! গালের বাঁক বেয়ে গ্রীবা ভিজিয়ে ছোট্ট এক জলরেখা তৈরি করছে। ভেতরের সমস্ত জ্বালা গলে বেরিয়ে আসছে সেই স্রোতে। নিঃশ্বাসটা বুকে আঁটকে আছে। যা নামছেও না, উঠছেও না। টান টান করে শ্বাস নিতে চায়, কিন্তু ঐ যে বুকের খাঁচায় জমাট বাঁধা। কোনো ভাবেই শ্বাস টানা যাচ্ছে না।
‘একবার, দু’বার… তারপর হঠাৎ হেঁচকি উঠল। গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের গভীরে চেপে থাকা যন্ত্রণা টেনে তুলছে যেন কেউ ভিতর থেকে। শরীর থরথর করে কাঁপছে। হেঁচকিতে ঘাড়ের রগে টান পড়ছে, বুকে তীব্র ব্যাথা। পাশে কারও ছায়া অনুভব করল এলিজাবেথ। কষ্টসাধ্য এক চাহনিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। অবিস্মরণীয়, অবাক-ভেজা দৃষ্টি গিয়ে আটকালো সেই মুখে তাকবীর ;তার ভালো মানুষ।
‘দু’জোড়া চোখের মধ্যে ভয়! অবিশ্বাস আর তীব্র বিষাদের সংঘর্ষ। তাকবীরের চোখে আতঙ্কের স্পষ্ট ছাপ। টিভির স্ক্রিনে ভেসে থাকা ভিডিও দেখে ওর হাত থেকে এলিজাবেথের লাগেজটা দপ করে পড়ে গেল মেঝেতে। এলিজাবেথ একটা কোনো কথা বলল না ছুটে গিয়ে একটা রুমে ভিতর থেকে দরজা আঁটকে দিল। ছুটে গেল তাকবীর নিজেও বদ্ধ উন্মাদের মতো। অঝোরে ধাক্কাতে থাকে দরজায়।
“এলোকেশী প্লিজ ওপেন দ্য ডোর। লেট মি এক্সপ্লেন।”
‘ফাঁক হয় না দরজার দু’টো প্রান্ত। ভিতর থেকে ভেসে আসছে ভাঙচুরের শব্দ আর বুকভাঙা হাহাকার। অস্থির হয়ে উঠল সুষ্ঠ সবল মস্তিষ্ক। পাগলের মতো চেঁচাতে থাকে তাকবীর।
“প্লিজ আমাকে বলার সুযোগ দাও। পায়ে পড়ি তোমার।”
“আমার উপর অভিমান করে নিজেকে কষ্ট দিও না এলিজাবেথ। শরীরে আঘাত লাগবে তোমার।”
‘মস্তিষ্কে তোলপাড়, বুক পাঁজরের পাঁজর,পাঁজরে সুনামির ঢেউ। শরীরটাও কেমন নিস্তেজ হয়ে গেছে। ধাক্কাতেও ভাঙছে না দরজা। আজ বোধহয় দরজাও সত্যের সাথে চুক্তিতে নেমেছে অতীত প্রকাশ্যে টেনেহিঁচড়ে আনার।তাকবীর গলা ছেড়ে ডাকতে থাকল,
“এলোকেশী গো! আমি নেই পাপের মধ্যে! আর নেই আমি! সব ছেড়ে দিছি আমি!”
‘কিন্তু কোনো সাড়া নেই। তাকবীরের মস্তিষ্কে গোলমাল লাগছে। সব কিছু কাঁপছে, দুলছে। যেই চোখে এতদিন শুধু সম্মান দেখেছে, আজ সেই চোখে অবিশ্বাস! পাগল প্রায় হয়ে উঠল তাকবীর। ভেতরটা জ্বলছে, পুড়ছে শুধু সেই দুই সেকেন্ডের অবিশ্বাসী দৃষ্টির কারণে। তার এলোকেশীর চোখ থেকে পানি ঝরেছে… তার জন্য!সে তো এমনটা চায়নি! এই মেয়ের খুশির জন্য তো নিজের জীবনও দিতে পারত! এই মেয়েটার হাসির জন্যই তো সব আত্মত্যাগ! চোখের সামনে ভালোবাসার মানুষকে অন্যের হতে দেখেছে, তবুও জোর করেনি—যদি সে কষ্ট পায়? কখনো জোরে কথা বলেনি—ভীতু মেয়েটা যদি ভয় পায়? তবে কেন… কেন আজ এই মেয়ে তার জন্য কাঁদছে? আরও ছটফটিয়ে উঠল তাকবীর।
“এলোকেশী! আমার এলোকেশী! আমার কথা শুনো! আমার অনেক কিছু বলার আছে তোমাকে! তুমি এখনও অনেক কিছু জানো না! আমি বলতে চাই! আমাকে সুযোগ দাও!”
‘ভিতর থেকে সাড়া আসে না। বাড়ির প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হয় তাকবীরের অসহনীয় চিৎকার। দূর থেকে মেড’রা দাঁড়িয়ে বিমূঢ়ভাবে তাকিয়ে থাকে তাকবীরের পাগলামির দিকে। কেউ এগিয়ে যেতে সাহস পায় না। তাকবীর কাঁদছে,চিৎকার করে কাঁদছে। একবার দৌড়ে চলে যাচ্ছে বসার ঘরের দিকে, আবার ছুটে আসছে দরজার কাছে।
“কাঠগড়ার আসামীকেও তো মৃত্যুর আগে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। তুমি কি আমাকে সেটাও দিবে না? এতো স্বার্থপর হলে কি করে?”
‘ধাক্কাতে থাকে। তবে দরজা খুলে না। তাকবীর মেঝেতে শুয়ে পড়ল। গড়াগড়ি করে কাঁদতে থাকে। তবে কি সে এখন ঘৃণার পাত্র? তার এলোকেশী কি তাকে আর ভালো মানুষ বলে ডাকবে না? সে খারাপ হয়ে গেছে? কিন্তু সে তো নিজের সমস্ত পাপ সত্যের চাদরে ঢেকে রেখেছিল। সব কিছু থেকে সরে এসেছিল তাহলে কেন? কেন ভিতরটা এতটা জ্বলে যাচ্ছে? কে দেখবে এই কষ্ট? কোথায় জায়গা পাবে এই কষ্ট? চোখের পানি তো থামছেই না। অনেক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তাকবীর এখন ছটফট করছে। যারা বলে পুরুষ মানুষ কাঁদে না, তারা কি এই শ্যাম বর্ণের তাকবীর দেওয়ানকে দেখেনি?
‘এরই মধ্যে রেয়ান ছুটে আসে। গার্ডের কলে রেয়ান এসেছে। তাকবীরকে মেঝেতে পড়ে কাঁদতে দেখে রেয়ান দ্রুত তাকবীরের রুমে গিয়ে একটা ঔষুধের কোটা নিয়ে আসে। তাকবীর নেয় না, ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তাকবীর রেয়ানের হাত জাপটে ধরল। অসহায়ের মতো বারবার বলতে থাকে,
“ও রেয়ান! বলো না তোমার ম্যামকে দরজা খুলতে। আমি বলতে চাই আমার অতীত। হালকা হতে চাই। ও এমন করছে কেন আমার সাথে? ওকে বল না, আমি সব ছেড়ে দিয়েছি। বল না ওকে দরজা খুলতে। তোমরা সবাই ওকে ধরে রেখো। দিও না আমার থেকে দূরে যেতে।”
‘রেয়ান কি জবাব দিবে? আদৌ কি কিছু বলার আছে? রেয়ানও অনেকক্ষণ দরজার কাছে গিয়ে ডাকতে থাকে। কিন্তু এলিজাবেথ দরজা খুলে না। তাকবীর আবারও হামাগুড়ি দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ে। তার গলা ভেঙে গেছে। পথিকের মতো বসে রইল আরও কিছুক্ষণ।বারবার অস্পষ্ট স্বরে আওড়াতে থাকে,
“পরানডা জুইড়া যে এতো হাহাকার সেগুলো কি তুমি দ্যাহো না?”
‘দরজা খোলার শব্দ হলো। তাকবীরের ভিতর হঠাৎ শ্বাস ফিরে এলো। তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল। এলিজাবেথকে দেখার মুহূর্তে বুকের ভিতর তীব্র চাপ অনুভব করল। কেঁদেকুটে কি অবস্থা করেছে মেয়েটা চেহারার। তাকবীর ছুটে গিয়ে এলিজাবেথের হাত ধরতে চাইল। এলিজাবেথ হাত সরিয়ে নিল, তাকাল না পর্যন্ত। তাকবীরের নিশ্বাস থমকে যায়। কার্নিশ কোণের জলধারা কোনোভাবেই থামছে না।
“ম্যাম আপনার স্যারকে সত্যিটা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত। অতীত ছাড়া ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না ম্যাম।”
‘এলিজাবেথের ঠোঁট কেঁপে উঠে। গলা ফেটে যায়, “বলুন না সবটা মিথ্যে? প্লিজ…”
‘তাকবীর চকিতে বসে পড়ল এলিজাবেথের পায়ের কাছে। হাতে জড়িয়ে ধরল এলিজাবেথের পা। আবারও হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমায় ক্ষমা কর এলোকেশী। আমি তোমার এই অগাধ বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি।”
‘এলিজাবেথের চোখের অশ্রু একের পর এক গড়িয়ে পড়ল। এলিজাবেথ জানত সত্যটা। তবুও তার মন মানতে চাইছিল না। কিন্তু এখন? আসামী নিজেই নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে। এলিজাবেথ ছিটকে দূরে সরে গেল। তাকবীর এগিয়ে গেলে, এলিজাবেথ পিছিয়ে যায়। তাকবীরের গলা দিয়ে শব্দ বের হতে পারছিল না। আর কাছে গেল না। দূর থেকে বলল,
“আচ্ছা, আচ্ছা, আমি কাছে আসব না। আমরা এক জায়গায় বসি? একটু খোলামেলা কথা বলি। আমি চাই না আমাদের সম্পর্কটা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাক। ফিগার আউট করা যাক!”
‘এলিজাবেথ বিস্ফোরিত হলো। আরও দূরে সরে ব্যথায় কেঁপে উঠল, “কোনো সম্পর্ক নেই আমাদের মধ্যে। আর না কখনো ছিল। যা ছিল, তা ছিল শুধু সম্মান। আজ থেকে সেটাও নেই। ঘৃণা করি আমি আপনাকে। ঘৃণা মিনিস্টার তাকবীর দেওয়ান।”
‘তাকবীর রেয়ানের কোমরে গুঁজে রাখা গানটা নিয়ে এলিজাবেথের সামনে এগিয়ে দিল, “নাও, মেরে ফেলো। তোমার চোখের ঘৃণার থেকে অন্তত এটা কম হবে।”
‘এলিজাবেথ গানটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। চিৎকার করে “আপনি এভাবে আমাকে কেন ঠকালেন? কেন? আমাকে তো আপনি শেষ ভাঙা টা ভেঙে দিলেন। কেন করলেন এমনটা?”
‘পাশ থেকে রেয়ান নিঃশব্দে বলল, “ম্যাম, সত্যিটা আমি বলতে চাই। স্যার আপনার জন্য সব কিছু ছেড়ে দিয়েছে। এমনকি নিজের ব…”
“রেয়ানননন!” বিকট এক দমকে রেয়ানকে থামিয়ে দিল তাকবীর। এলিজাবেথ রাগে গর্জে উঠল তাকবীরের উপর,
“কেন দমকাচ্ছেন? বলুক না সত্যি। আর কী মিথ্যে দিয়ে পাপ ঢাকবেন?”
“আমি পাপী না এলোকেশী। পাপ আমাকে পাপী করেছে।”
‘শক্ত ঢোক গিলল তাকবীর। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“কি জানতে চাও বল?”
‘এলিজাবেথ চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, “আপনার চাচার পুরো পরিবার এবং আপনার বাগদত্তাকে আপনিই মেরে ছিলেন?”
“হুম,” একটিই শব্দ উচ্চারণ করল তাকবীর৷
“ইতালির শপিং মলে সেই ছেলেটাকে আপনিই মেরে ছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“আর কাকে কাকে মেরেছেন আপনি?”
“পথের কাটা সবাইকে।”
“কতোদিন ধরে চলছে আশ্রমের নাম করে এই রেকেটিং?”
“অনেক বছর।”
‘নিঃশ্বাস আঁটকে আসছে এলিজাবেথের। কণ্ঠ বুজে এলো কান্নায়। ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে বলল,”আপনি তো এমন না তবুও কেন এমন হয়ে গেলেন? এই হাতে কেন রক্ত ঝড়ল এতো নিষ্পাপের। বাচ্চাগুলো কি ক্ষতি করেছিল আপনার?”
“সত্যিই আমি এমন ছিলাম না এলোকেশী। আমার অতীত আমাকে এই পথে নিয়ে গিয়েছে।”
“কি ছিল আপনার অতীতে, যে এই মৃত্যুকূপী পথ বেছে নিতে হলো? জানতে চাই আমি।”
“সহ্য করতে পারবে তো?”
‘তাকবীর মুখ তুলে তাকাল এলিজাবেথের দিকে। এলিজাবেথ ক্লান্ত ভঙ্গিতে তার দিকে চেয়ে আছে উত্তরের আশায়। মাথা নুইয়ে চোখ বুঝে ফেলল তাকবীর।
“মাই মাদার ওয়াজ রেপ্ড হোয়াইল মাই সিস্টার ওয়াজ ইন হার বেলি।”
‘পায়ের নিচটা কেঁপে উঠল। ছিটকে দু’কদম পিছিয়ে গেল এলিজাবেথ। ওর প্রকম্পিত হাত ছুটে গেল পেটের উপর। তাকবীর বলতে শুরু করল,
‘ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন ভাদ্র মাস, কোনো এক নিরানব্বই সালের দিনলিপি। আর্শি নগর গ্রামের চেয়ারম্যান তাজুয়ার সম্রান্ত বংশের গর্ব দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছিল। প্রচারণার পথ তাকে নিয়ে গিয়েছিল পাশের চৈতন্য গ্রামে। চারপাশে নরম হাওয়া বইছিল। প্রকৃতি যেন নিজেই কোনো অদৃশ্য সুরে ডুবে ছিল। সেই সুরের মাঝেই এক শ্যামবর্ণা কন্যার দেখা পেল তাজুয়ার। গড়নে ছিল গাঢ় খয়েরি শাড়ি, কোমরে খসখসে ভাঁজ, পুকুরঘাটে কলসি ভরতে ব্যস্ত ছিল অষ্টাদশী। অথচ সে জানতই না পুকুরের জল তুলে তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে যে সে আরেকজনের বুকের ভেতর এক অবসন্ন চৈত্রের খাঁ খাঁ তৃষ্ণা জাগিয়ে দিয়েছে।
‘সেদিন ফিরে গেলেও চোখে ঘুম ধরা দেয়নি। রাতভর তাজুয়ারের চোখে ভাসছিল সেই মুখখানা। চোখের পাতা বন্ধ করলেই যেন শ্যামল সেই ছায়া দুলে ওঠে অন্তরের আঙিনায়। ভোর হতে না হতেই আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না তাজুয়ার। ছুটে গিয়েছিল আবারও সেই কৃষ্ণ ধূসরিকার দেখা পেতে। মেয়েটির নাম ছায়া। পরিচিত “ছায়া মালতী” নামে। তবে সমাজের চোখে সে কেবল এক দাগ আর অভিশাপের ছায়া। ছায়া মালতীর কোনো পিতৃপরিচয় নেই। মা মালতী, গ্রামের পাগলিনী, যার পেটের সন্তান হিসেবে ছায়া জন্মেছিল। সে নিজেও জানত না তার সন্তানের আসল পিতা কে। সে দুনিয়ার কিছুই জানত না, কিছুই বুঝত না। তাই সমাজ তাদের ঠেলে দিয়েছে অমাবস্যার অন্ধকারে, যেখানে কোনো আলো পৌঁছায় না। একঘরে হয়ে বেড়ে ওঠা ছায়া মালতীর।
‘তাজুয়ার বুকের ভেতরটায় যেন ভেঙে পড়ল এক দেহাতি প্রাচীর এসব শুনে। তবে নব্বই দশকে প্রেম তো কোনো নিয়ম মানে না, কোনো পরিচয়ের ফ্রেমে আটকা থাকে না। প্রেম জেগেছিল তাজুয়ারের মধ্যে তীব্র, দাবানলের মতো।ছায়া মালতী,নর্দমার কাদা জলে ফুটে ওঠা স্বয়ং এক ফুটন্ত পদ্মফুল। গায়ের রঙের চাপা কাঁপন তার সৌন্দর্য ঢাকতে পারেনি। পাগলের মেয়ে বলে সবাই দূরে থাকলেও, সেই দূরত্বের মাঝেই ছড়িয়েছিল এক অস্পর্শ মায়ার রাজ্য। স্রষ্টা যেন কৃপণতা করতে ভুলে গিয়েছিল ছায়া মালতী কে গড়তে গিয়ে। ছায়া মালতী শুধু একটি অবহেলিত, পরিচয়হীন মেয়ে নয়, সে ছিল এক রাজ্যের মায়া, যার প্রতিটি হাসিতে, প্রতিটি চাহনিতে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে লুকানো ছিল কোনো এক অদেখা দেবতার অমোঘ আশীর্বাদ। আর তাজুয়ার? সে তো সেই আশীর্বাদে সিক্ত এক মানব। যাকে সমাজের দেয়াল থামাতে পারেনি।
‘ছায়া মালতীর হৃদয়ে পুরুষজাতির প্রতি জন্মেছিল তীব্র ঘৃণা। লোকমুখে শোনা তার পাগলিনী মা মালতীর করুণ জীবনের গল্প সেই ঘৃণার শিকড়কে আরও গেঁথে দিয়েছিল মনে। সমাজের অবজ্ঞা আর অপমানের পাহাড় বয়ে নিয়ে ছায়া বেছে নিয়েছিল নিঃসঙ্গ এক জীবন। সেলাইয়ের কাজেই ছিল তার জীবিকা! আর ছোট্ট এক কুড়ে ঘরেই বন্দি ছিল তার সমস্ত জগৎ। পুরুষদের চোখ এড়াতে, অপমানের দৃষ্টির ভয় এড়াতে ছায়া খুব কমই ঘরের বাইরে পা রাখত। তবুও হাজার তালা-চাবি দিয়ে মনকে আটকে রাখলেও ভালোবাসার দৃষ্টি থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা যায় না।
‘তাজুয়ার, সেই প্রেমিক পুরুষ কোনো সংকোচ ছাড়াই একদিন পৌঁছে গেল ছায়া মালতীর ঘরের দরজায়। তবে ছায়া ছিল পাথরের মতো অবিচল। মুখের উপর দরজা আটকে দিয়েছিল। তাজুয়ার মুখের উষ্ণ ডাকও তার শীতল দেওয়ালের ফাঁক গলিয়ে পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু প্রেমিক তাজুয়ার রাগ করল না, দুঃখ পেল না। বরং আরও দৃঢ় হলো তার মনের টান। নির্বাচনী প্রচারণার অজুহাতে বারবার ফিরে যেত চৈত্রন্য নগরে। শুধু এক ঝলক ছায়া মালতীকে দেখার আশায়।
‘আর ছায়া মালতী? সে তো নিজের মনকে আগুনের শিখায় পোড়াত। তাজুয়ার চোখের সেই মগ্ন দৃষ্টিতে যে প্রেমের ভাষা ছিল তা প্রথম দেখাতেই বুঝে গিয়েছিল কৃষ্ণকলি ছায়া মালতী। তাই তো নিজেকে আড়াল করে ফেলেছিল! অদৃশ্য করার চেষ্টা করেছিল এই দুনিয়া থেকে। তবুও প্রেম কি এত সহজে ছেড়ে যায়? তাজুয়ার সাদা পাঞ্জাবি পরে যখন মিছিলের স্লোগান দিয়ে রাস্তা দিয়ে যেত তখন ছায়া মালতী ঝোপের আড়াল থেকে দেখত। অজান্তেই তার চোখ খুঁজে নিত তাজুয়ার ছায়া! বুকের ভেতরে গোপনে জমা করত সেই অপার আগুন। যা সমাজের ঘৃণায়ও নিভে যায় না।
‘প্রেম, এই দুই ভিন্ন আত্মার মাঝেও ক্রমশ জ্বলে উঠছিল। একটি দরজা বন্ধ করে রাখলেও, অন্য একটি জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ছিল অবলীলায়। তবে এভাবে আর কতদিন? ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল অবশেষে প্রেমিক তাজুয়ারের। হৃদয়ের তীব্র টানে সোজা গিয়ে দাঁড়াল পিতার সামনে। জানাল সেই অবৈধ কন্যা ছায়া মালতীকে বিয়ে করার ইচ্ছা। পিতার মুখে নেমে এল কঠিন বিরোধের ছায়া। উচ্চবংশের রক্তে নিচু জাতের মেয়ের নাম শুনে বেজে উঠল অমর্যাদার শঙ্খ।
‘কিন্তু প্রেম কি কখনও থামে সমাজের নিষেধে? তাজুয়ারের বুকের মধ্যে যে প্রেমের নদী বইছে তার স্রোতে কোনো বাঁধই দাঁড়াতে পারল না। এক রাতে সমস্ত নিয়ম-কানুনের শিকল ছিঁড়ে সরাসরি কাজী নিয়ে পৌঁছে গেল ছায়া মালতীর সেই পাটের তৈরি ছোট্ট কুঠিরে। আকাশের তারাগুলো সাক্ষী হয়েছিল তাদের পবিত্র বন্ধনের। বাতাস বয়ে নিল পবিত্র বন্ধনের মৃদু গন্ধ। সেই রাতেই সম্পন্ন হলো তাদের বিয়ে।
ভোরের আলো ফুটতেই খবর ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সমাজ উত্তাল হয়ে উঠে। উচ্চবংশের সন্তান হয়ে এক “অবৈধ” কন্যাকে বিয়ে করার জন্য তাজুয়ারকে কর্দমাক্ত করা হলো। অবজ্ঞা আর তিরস্কারের কাঁটার মুকুট পরানো হলো তার মাথায়। তেজ্যপুত্র করা হল তাকে।
‘শুরু হলো কষ্টের দিন। সমাজ মুখ ফিরিয়ে নিল, পরিবার দূরে সরে গেল। তবে তাজুয়ারের মনে ছিল বিজয়ের ধ্বনি। যাকে ভালোবেসে নিজের সমস্ত কিছু ত্যাগ করেছে তার পাশে দাঁড়ানোই তো আসল বিজয়। কষ্টের দিনে কষ্ট দিল না ছায়া মালতী। সে ছিল তাজুয়ারের প্রেরণা, শান্তির ঠিকানা। সময়ের স্রোত থেমে থাকে না। তাজুয়ার গড়ে তুলল নিজের আলাদা পরিচয়। রাজনীতির মঞ্চে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। সমাজের চোখে বদলে যেতে লাগল সেই “নিষিদ্ধ” প্রেমের রঙ। বছরের ব্যবধানে অনেক কিছু পাল্টে গেল। তাজুয়ার আর ছায়া মালতীর ভালোবাসা ভাস্বর হয়ে উঠল নতুন আলোয়। তারা গড়ে তুলল ছোট্ট এক কুড়েঘর, যেখানে ছিল না সমাজের কোনো জঞ্জাল। শুধু ছিল ভালোবাসার নিঃশব্দ উষ্ণতা।
‘একদিন পাগলিনী মালতী পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেল। রেখে গেল তার মেয়ের জীবনে এক অদ্ভুত শূন্যতা। তবে সেই শূন্যতা ভরিয়ে দিল নতুন অতিথি,তাদের সন্তান তাকবীর। জীবন পূর্ণ হলো সুখে। অভাব-অভিযোগের কষ্ট পেরিয়ে, সমাজের ঘৃণার পাহাড় ডিঙিয়ে তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয় প্রেম কোনো পরিচয়ের মুখাপেক্ষী নয়। প্রেমই শেষ কথা, প্রেমই চূড়ান্ত জয়।
‘নাতির মুখ দেখার পর শেষ বয়সে তাজুয়ারের বাবা অবশেষে মেনে নিয়েছিল ছায়া মালতীকে। তবে তাজুয়ার আর ফিরে যায়নি পিতৃগৃহে। কারণ ছিল একটাই—ছায়া মালতী। তার প্রিয় স্ত্রীকে কখনওই ভাইদের বউদের ছোট চোখে দেখার তুচ্ছতার মুখোমুখি করতে চায়নি। সমাজের সেই বিষাক্ত শ্রেণি বিভাজন থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিল ছায়া মালতী কে তাজুয়ার। তাজুয়ার আর ছায়া মালতী ছিল একে অপরের প্রাণ।আর তাদের সেই প্রাণের পরিপূর্ণতা ছিল ছোট্ট তাকবীর। তাকবীর ছিল তাদের জীবনের আনন্দ, তাদের ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু তাকবীরের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল এক শূন্যতা,একটি বোনের অভাব।
‘ছোট থেকেই মা-নেওটা তাকবীরের একটাই ইচ্ছে ছিল একটা বোন। তাকবীরের বয়স তখন আট বছর৷ ছোট থেকেই খুব ভোলাবালা ছিল তাকবীর। সময়টা তখনো আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতিতে পিছিয়ে ছিল। আল্ট্রাসনোগ্রামের মতো কোনো সুবিধা ছিল না তখন। তবে যেদিন শুনল তার ভাই-বোন আসতে চলেছে এই পৃথিবীতে সেদিনই নিজের মনের মধ্যে গড়ে নিল এক বোনের ছবি। আর নাম? তা তো আগেই ঠিক করে রেখেছিল—”আলো”। মায়ের নামে মিলিয়ে, যেন মায়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে পৃথিবীতে আসে তার ছোট্ট বোন। ছায়ার মতো কোমল, শীতল, মায়াময়। আলো আর ছায়া দুইটি বিপরীত সত্তা! তবুও একে অপরের পরিপূরক। ঠিক যেমন তাজুয়ার আর ছায়া মালতী। তাদের জীবনের আলো ছিল তাকবীর, আর তাকবীরের জীবনের ছায়া হয়ে আসবে তার ছোট্ট পরি-বোন, “আলো”।
‘সব ঠিকঠাকই চলছিল। ছায়া মালতীর গর্ভে আট মাসের আলো নিয়ে বড় হচ্ছিল আরেকটি প্রাণ। তাজুয়ারের জীবনেও ছিল স্থিতি ভালোবাসা, পরিবার, আর একটুকরো শান্তি। কিন্তু সুখ কখনও স্থায়ী হয় না। বিশেষ করে যেখানে সমাজের শিকলে বন্দি সত্য। চতুর্থবারের নির্বাচনে চক্রান্তের শিকার হয়ে হেরে যায় তাজুয়ার। রাতের অন্ধকারে নেমে আসে অন্য এক অন্ধকার। নতুন চেয়ারম্যানের অমানুষিক ক্ষমতার খেলা শুরু হয়। সেদিন রাতেই মিথ্যা মামলার দায়ে তাজুয়ারকে বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকবীর যার ছোট্ট হৃদয়ে তখনও ভয় বলে কিছু গড়ে ওঠেনি। তাকবীর সেদিন ছিল তার পৈতৃক বাড়িতে। চাচা সন্ধ্যায় এসে ওকে নিয়ে গিয়েছিল তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে থাকার জন্য। সে জানত না সে রাতে কি ঝড় বয়ে গিয়েছিল তার সাজানো পরিবারের উপর দিয়ে।
‘তাজুয়ার ছিল সৎ। যার কারণে পুলিশের ওসির সাথে তার শত্রুতা অনেক পুরনো। সেদিন রাতে ওসি নিজে এসে তাজুয়ারকে হাতকড়া পরিয়েছিল। তাজুয়ারের অনুপস্থিতি যেন ডাকল এক অভিশপ্ত রাতকে। সে রাতে আকাশ ভেঙে পড়ছিল বজ্রের গর্জনে। চারদিক জুড়ে বৃষ্টি যেন সৃষ্টিকর্তার কান্না হয়ে নেমেছিল। ছায়া মালতী ছিল তাহাজ্জুদের সেজদায়! স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় ডুবে। তাজুয়ার যাওয়ার আগে বলেছিল, “সকালের আগেই ফিরে আসব,” কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই সকাল আর শান্তি নিয়ে আসেনি।
‘দরজায় ধাক্কাধাক্কির শব্দ! এক ভয়ংকর অশনি সংকেত। দরজা খুলতেই দেখা যায় ওসির বিকৃত হাসি, চোখে পশুর লালসা। ছায়া মালতীর সৌন্দর্য, যা একসময় তাজুয়ারের হৃদয় জ্বালিয়েছিল! সেদিন সেই রূপই তার জন্য অভিশাপ হয়ে নেমে আসে ধরিত্রীতে। গর্ভের সন্তান নিয়ে অসহায় ছায়া মালতী পড়েছিল এক হিংস্র জানোয়ারের কবলে। রাতভর চলে পাশবিক নির্যাতন। ছায়া মালতীর সৌন্দর্য ভেঙে চুরমার হয়ে যায় লালসার ভয়াবহ থাবায়। সেদিন সে শুধু নির্যাতিত হয়নি। তার ভেতরের প্রতিটি আশা, প্রতিটি স্বপ্ন ছিঁড়ে খেয়ে ফেলেছিল সেই দানব। ঝড়ের রাতে ছায়া মালতীর গলা ফাটা আর্তনাদ আকাশের গর্জনেও ডুবে গিয়েছিল। কোনো দরজা, কোনো জানালা সেই চিৎকারের সাক্ষী হতে পারেনি। বাইরে যায়নি কোনো চিৎকার।
‘চতুর্থ প্রহরে সেই নরপশু ক্লান্ত হয়! তবে ততক্ষণে যে সব শেষ। ছায়া মালতী সেই বিষাদময় রাতে অনুভব করেছিল তার মায়ের যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি। যে যন্ত্রণার কথা সে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে লোকমুখে। সেই অভিশপ্ত রাত শুধু তার শরীরকে নয়, তার আত্মাকেও ভেঙে দিয়েছিল। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাজুয়ারের জামিন করিয়ে আনে তার বন্ধু। কিন্তু ভয় তাজুয়ারের মনে গেঁথে বসেছিল। ছায়া মালতীকে নিয়ে এক অজানা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল ভিতরে। তাকে ধরে নিয়ে আসার সময় স্পষ্টতই দেখেছিল ওসির কুৎসিত দৃষ্টি পড়েছে ছায়া মালতীর ওপর।
‘সে রাতে দীর্ঘ দশ বছর পর পৈতৃক ভিটেয় পা রাখে তাজুয়ার। এক হাতে তাকবীরকে শক্ত করে ধরে মনে মনে প্রতিজ্ঞা নিয়েছিল সকাল হওয়ার আগেই গ্রাম ছাড়বে। তার পরিবারের ওপর কোনো অভিশপ্ত ছায়া পড়তে দেবে না। তাকবীর তখন ঘুমে টলছিল। উঠোনে পা রাখতেই কাঁদাতে তাজুয়ারের জুতো আঁটকে যায়। সময় নষ্ট না করে জুতো ছেড়েই তাজুয়ার তাকবীরের হাত ধরে টেনে নেয় ভেতরে। দরজাটা আগেই খোলা ছিল। বুকের ভিতর ধপ করে উঠে। বড় নিশ্বাস টানল তাজুয়ার। বসার ঘরে পা রাখতেই পদতলে অনুভূত হয় এক ঘন, তরল কিছু। নিচে তাকাতেই দেখতে পায় শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। রক্তের প্রবাহ অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই পায়ের তলা অবশ হয়ে আসে।
‘তাজুয়ার দ্রুত একহাতে চেপে ধরে তাকবীরের চোখ। নিজেও আর এক মুহূর্তের জন্যও সেদিকে তাকাল না।
তাকবীরকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের কক্ষে গেল তাজুয়ার। ধীর হাতে শিশুটিকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ল তাকবীর। সকালে পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙল তাকবীরের। প্রতিদিনের মতো আজ পাশে মাকে পেল না। চোখের ঘুম আড়মোড়া দিয়ে ঝেড়ে ফেলে মাকে ডাকতে ডাকতে বসার ঘরের দিকে যায় সে।মেঝেতে চোখ পড়তেই দৃষ্টি জ্বলজ্বল করে উঠল তাকবীরের।ওর বোন এসে গেছে দুনিয়ায়। নিঃশব্দে শুয়ে আছে বাবা-মায়ের মাঝখানে। তাজুয়ারের হাতে একটুখানি হাত মুঠো করে রাখা সদ্যজাত শিশু।
‘ছায়া মালতী আর তাজুয়ারের মাঝখানে শুয়ে আছে আলো। তাজুয়ারের এক হাত ছায়া মালতীর মাথার নিচে আর ছায়া মালতীর রক্তাক্ত হাত চাপা পড়ে আছে রক্তাক্ত আলোর উপর। তার আরেকটি হাত মেঝেতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে, নিথর, প্রাণহীন। সৃষ্টিকর্তার বিশেষ রহমতে তাকবীরের বোনই এসেছে দুনিয়ায়। এই তো চোখের সামনে তাদের শুয়ে থাকার ভঙ্গিটা যেন ফ্যামিলি ফটো অ্যালবামের মতো নিখুঁত। তাকবীরের মস্তিষ্ক তখনও বুঝে ওঠেনি বাবার মুখের সাদা ফেনা, মায়ের রক্তে ভেজা নিথর শরীর। সে তো খুশিতে বিভোর। ফ্যামিলি ফটোকে পূর্ণতা দিতে সে নিঃসংকোচে মায়ের পাশে জায়গা করে নেয়।বোনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। তবে আলোর শরীর ছিল বরফ ঠান্ডা। চমকালো তাকবীর। উষ্ণতা দিতে বোনকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। র’ক্তে মাখানো গালে, কপালে, ঠৌঁট অজস্র চুমু খেল। বোন কান্না করে না কেন? কথা বলে না কেন? ডাকল বাবা-মাকে। কেউ সাড়া দেয় না। অস্থির হয়ে উঠে তাকবীর। কান্না শুরু করে দেয় শব্দ করে।
‘রাতের ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে প্রকৃতি তখন নতুন রূপ নিয়েছে। বাইরে ঝলমলে রোদ। তাকবীরের কান্না শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে আসে। মুহূর্তেই কান্নার আহাজারি ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। ভিড়ের মাঝে তাকবীর সোফার এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে রইল। কিছুই বুঝতে পারছিল না সে। পুলিশ এলো। তার চোখের সামনে বাবাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে কোথায় যেন নিয়ে গেল। দুপুর হল। মহিলারা ওর মা-বোনকে গোসল করিয়ে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে দিল। এর মধ্যেই কেউ তাকবীরকেও গোসল করিয়ে সাদা পাঞ্জাবি পরিয়ে দিল। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো একটা মাঠে। দুটি কাঠের খাটিয়া রাখা ছিল সামনে।একটা বড়, একটা ছোট। তাকবীর কানে ভেসে আসা শব্দের সঙ্গে ঠোঁট নাড়ল। অতঃপর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো এক জঙ্গলে। সেখানে খোঁড়া ছিল দুটি গর্ত। সাদা কাপড়ে মোড়ানো কাউকে শুইয়ে দেওয়া হলো মাটির গভীরে। সবার আগে মাটি দিল তাকবীর। তার কাছে তখনও সবকিছু এক ঘোরের মতো লাগছিল।
‘চারপাশে এত মানুষ, এত কান্না, এত আহাজারি—কেন? তাকবীরের মস্তিষ্ক কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। সন্ধ্যায় তাকে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। বাবা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল, হাউমাউ করে। পাগলের মতো কাঁদছিল সে। সবকিছু এলোমেলো করে দিতে থাকল। ডাক্তাররা বাবাকে কিছু একটা দিল। আর তাতেই ঘুমিয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু শান্ত হলো না তাজুয়ারের ভেতর। শান্ত হলো না তাকবীরের শৈশবও। এ গল্প এখানেই থেমে যায় না। এখান থেকে শুরু হয় প্রতিশোধ। এক নিঃশব্দ আগুনের জ্বালা! যা শেষ পর্যন্ত সবকিছু ভস্ম করে দেয়।
‘সেই রাতে জন্ম নিয়েছিল এক নিষ্পাপ প্রাণ জানোয়ারের বর্বর উল্লাস শেষে চাপ সহ্য করতে না পেরে। কিন্তু এই নির্মম পৃথিবীতে টিকে থাকার সুযোগ পেল না সে। ছায়া মালতীও পারেনি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ। মৃত সন্তানকে দুই উরুর মাঝে চেপে ধরে নিথর হয়ে রইল সে। তাজুয়ার পেরোয়নি এই বিভীষিকা। বুক ফাটা যন্ত্রণায় বিষ পান করেছিল স্বার্থপরের মতো নিজেকে শেষ করে দেওয়ার আশায়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সেদিন তাকে নেননি। শরীর বেঁচে থাকলেও, তার ভেতরটা মরে গিয়েছিল সেই রাতেই। ন্যায়বিচারের জন্য সে ছুটেছিল। চেষ্টা করেছিল খুনিদের শাস্তি পাইয়ে দিতে। কিন্তু ক্ষমতা আর টাকার শিকলে বন্দি আইন তাকে হাস্যকর বানিয়ে দিয়েছিল। তখনই বদলে যায় তাজুয়ার। প্রতিশোধের নেশায় সে ঢুকে পড়ে অন্ধকার দুনিয়ায়—অর্গান পাচারের ভয়ংকর ব্যবসায়।
‘ছোট তাকবীরকে নিয়ে সে ফিরে যায় পৈতৃক নিবাসে। ভাইদের সাথে মিলে গড়ে তোলে অবৈধ সাম্রাজ্য। আর তাকবীর? ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
তাকবীরের প্রথম খুনটা করে সতেরো বছর বয়সে। তার প্রথম শিকার ছিল সেই ওসি। যে একদিন তার জীবন তছনছ করে দিয়েছিল। রক্তে ভিজে যায় তাকবীরের হাত।আর সেই হাতেই রচিত হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
‘এলিজাবেথ কাঁদছে! হেঁচকি তুলে কাঁদছে। একটু পরপর কেঁপে উঠছে ওর সমস্ত কায়া। অদেখা কষ্টের ভারে বুকটা ভারি হয়ে উঠেছে। তাকবীর ভঙ্গুর অবস্থায় মেঝেতে ঠেস ধরে আছে এখনও।
“আপনি,,,,
‘তাকবীর হুড়মুড়িয়ে উঠে গিয়ে খোপ করে ধরে ফেলল এলিজাবেথের হাত। কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওকে টানতে টানতে নিয়ে গেল ” ঠিকানা” নামক সেই ঘরটায়। এখনও গা শিউরে উঠছে এলিজাবেথের এই অন্ধকারে আচ্ছন্ন ঘরে থাকতে। তাকবীরের কণ্ঠস্বর থরথর করে কাঁপছে।
“এ-যে এলোকেশী আমার দেখো। এই ছবিটা দেখছ এটাই আমার মা। আর ঐ বাচ্চাটা দেখতে পাচ্ছো ওটা আমার বোন। আমার না হওয়া বোন। বিশ্বাস কর এলোকেশী আমি খারাপ হতে চাইনি। আমাকে খারাপ বানানো হয়েছে। আমার শৈশবের মূল্যবান সময়গুলো কেটেছে এই বদ্ধ ঘরে। আমাকে বন্দী করে রাখা হতো এখানে, যাতে আমি আমার বিষাক্ত অতীত ভুলে না যায়। প্রতিশোধস্পৃহা এভাবেই আমার ভেতরে জ্বালিয়ে আমাকে নরখাদকে পরিণত করা হয়েছিল।”
‘এ এক অমোঘ সত্য তাকবীর চাইনি পশু হতে। তাকে পশু বানানো হয়েছিল। তাজুয়ারের প্রতিশোধের আগুন শুধু খুনিদের ভস্ম করেনি ধ্বংস করেছিল তাকবীরের মনুষ্যত্বও।ছোটবেলা থেকেই এই ঘরেই বন্দী থাকত তাকবীর। দেয়ালে টাঙানো সেই নৃশংস ছবি যেন ওর ভিতরের আগুন আরও উসকে দিত। ঘৃণা, ক্রোধ, প্রতিশোধ—সবকিছু একসঙ্গে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল রন্ধে রন্ধে৷ তাকবীর জানত এই আগুন নিভে গেলে সে আর বাঁচতে পারবে না। তার বিবেক,মনুষ্যত্ব তাকে গলা টিপে মেরে ফেলবে। তাই তো ছবিটা কখনো চোখের আড়াল হতে দিত না। তার মা আর বোনের রক্তাক্ত মুখ যেন ওকে বারবার মনে করিয়ে দিত সে হিংস্র হওয়া ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।
‘তাকবীর কোনো কথা বলল না, এলিজাবেথকেও বলতে দিল না। আবারও হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল গাড়িতে। এলিজাবেথ নির্বাক। বাক শক্তি হারিয়েছে আজ।তাকবীরের মায়ের ভয়ংকর অতীত মনে পড়তেই শরীর কেঁপে উঠছে বারবার। কল্পানায় প্রতিফলিত হতে থাকে সেই সময়টায় কিভাবে কাতড়ে ছিল অসহায় ছায়া মালতী। আর কতোটা চাপের ফলে একটা শিশু সময়ের আগের ভূমিষ্ট হয়। তাকবীর গেল আলোছায়া আশ্রমে। সরাসরি এলিজাবেথকে শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে এল ফাঁকা বেজমেন্টে। সেই ভয়ংকর ল্যাব, যেটা নির্মম ভিডিওতে দেখানো হয়েছিল। এখন সব ফাঁকা। শূন্য। কোথাও কিছু নেই। এলিজাবেথ স্তব্ধ হয়ে চারপাশে তাকিয়ে রইল। মনে হলো পুরো ঘরটা যেন ঘূর্ণির বেগে ঘুরছে ওর পাশ দিয়ে। শূন্যতার মাঝেও কানে বাজতে থাকল ছোট ছোট শিশুদের আতঙ্কিত আর্তনাদ।
“এই যে,এই এলোকেশী, দেখো! সব খালি… কিছু নেই… আমি সব ছেড়ে দিয়েছি, সত্যি সব ছেড়ে দিয়েছি। তোমাকে আমি এক নতুন জীবনে এনেছি, যেখানে এসবের আর কোনো জায়গা নেই। আমি আর জড়িত নই, আমি মুক্ত!আমাকে বিশ্বাস করো এলোকেশী… জান নিয়ে নাও যদি চাও, তবুও ঘৃণা দিও না! তোমার চোখের সেই তীক্ষ্ণ ঘৃণা আমার জান কেড়ে নেবে… আমি মরে যাবো, এলোকেশী! মরে যাবো! আমি তো সব ছেড়ে দিয়েছি, বিশ্বাস করো আমাকে… প্লিজ, বিশ্বাস করো…
‘এলিজাবেথ তাকাল তাকবীরের দিকে। তাকবীর অস্থির হয়ে উঠেছে। ঘুরে ঘুরে সব দেখাচ্ছে।
“আমি আর কুয়েত কোম্পানির সাথে কোনো চুক্তিতে নেই। তিন মাস—হ্যাঁ!তিন মাসের ভেতর আমার হাতে কোনো শিশুর রক্ত ঝরেনি। সেদিন সিলেটে পাহাড়ের থেকে যারা তোমাকে খাদে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল ওরা কোম্পানির লোক ছিল। আমি কেন ওদের সাথে নেই, কেন চুক্তি ভেঙেছি, তারই প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল ওরা। বিশ্বাস করো আমাকে… প্লিজ, বিশ্বাস করো! মরে যাবো আমি… সত্যি মরে যাবো! তোমার জন্য আমি আমার ব,,,,,” কি যেন বলতে গিয়েও বলতে পারল না তাকবীর।
‘হ্যাঁ তাকবীর ঠিকই বলেছে। সে আর কোনো কোম্পানির সাথে চুক্তিতে নেই। সেই কবেই সব ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে এলিজাবেথের জন্য। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল বাবা-ছেলের দ্বন্দ্ব। ব্যবসায় লসের পর লস। আর সেই ক্ষোভ থেকেই তাজুয়ার সেদিন এলিজাবেথ’কে মারতে গিয়েছিল। রিচার্ড সেদিন খেলার মাঠে কৌশলে স্ক্রিনে যেই ভিডিওটা চালিয়ে দিয়েছিল যেখানে তাকবীরকে দেখা গিয়েছিল কারো সাথে তর্ক করতে। একপর্যায়ে গান পয়েন্ট করেছিল লোকগুলোকে। তারা ছিল কোম্পানির লোক, প্রতিশোধপরায়ণ শিকারি…
‘তাকবীর হাঁটু গেঁড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। নিঃশ্বাস গুলো দ্রুত ছুটছে। কাঁপতে কাঁপতে পাগলের মতো বারবার বলে যাচ্ছে,
“আমি খুনি নই, এলোকেশী… আমাকে খুনি বানানো হয়েছে! আমি ঘৃণা করি আমার বাবাকে… কিন্তু তুমি আমাকে ঘৃণা করো না, প্লিজ! আমি শুদ্ধ হতে চাই… আমি মুক্তি চাই…”
‘এলিজাবেথ গিয়ে দাঁড়াল তাকবীরের সামনে।
“শুদ্ধ হতে চান তো?”
‘তাকবীর ক্ষীণ চেহারাটা উপরে তুলল। ঘন মাথা নাড়াল।
‘এলিজাবেথ স্থির কণ্ঠে বলে, “পদত্যাগ জমা দিন। আপনি জনসাধারণের জন্য নন। ওদের জন্য বিপদজনক আপনি।”
‘তাকবীর এক মুহূর্ত দেরি করল না জবাব দিতে,
“হ্যাঁ তুমি বললে তাই করব। আমার চাই না কোনো পদ! চাই না কোনো ক্ষমতা! তুমি চাইলে এই জীবনটাই দিয়ে দেব, সব ভাসিয়ে দেব আমি… শুধু প্লিজ, আমার থেকে দূরে যেও না। ভালোবাসতে হবে না আমাকে… আমি নাহয় পথেঘাটের ধুলো হয়ে সারাজীবন তোমার পিছন ছুটে গেলাম…।তবুও তুমি থাকো কাছে। আমার যে কেউ নেই। এতিম আমি। আমার কবরে মাটি দেওয়ার জন্য হলেও যে তোমাকে লাগবে এলোকেশী।”
‘এলিজাবেথ করুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটু গেঁড়ে বসে তাকবীরের সামনে। দু’হাতের আজলায় আলতো করে ধরল তাকবীরের ভেজা চিবুক। কণ্ঠ নরম তবে কঠোর সত্যে বাঁধা,
“আপনার অতীত ভয়ংকর। কিন্তু আপনি যা করেছেন তা পাপ। শত শত মায়ের বুক খালি করেছেন আপনি। এই হাতে কত রক্ত ঝরেছে… এর শাস্তি দরকার। আপনি আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করুন।”
‘একটি দীর্ঘশ্বাস… অতঃপর মৃদু হাসল এলিজাবেথ।
“আপনি পাপী,তবু আমার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত হবেন। আমার দুর্ভাগ্য আপনাকে ভালোবাসতে পারলাম না। কিন্তু গর্বিত, জীবনে আপনাকে পেয়েছি আমার এই ছোট জীবনে। আপনি আমার কাছে সেরা, অতুলনীয়। ভালো মানুষ… আমার ভালো মানুষ… সারাজীবন আমার কাছে ভালো মানুষ হয়ে থাকুন না। প্লিজ আপনার সব দোষ স্বীকার করুন। আমি পায়ের পড়ি আপনার! আপনার শাস্তি প্রয়োজন। পাপ যে খুব বেশি।”
‘তাকবীর নিস্প্রভ, দ্বিধাহীন চোখে তাকিয়ে থাকল এলিজাবেথের দিকে। দৃষ্টিতে এক অসমাপ্ত যন্ত্রণা, নির্বাক আর্তি। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে,পড়ল এলিজাবেথের চোখ থেকেও। মলিন হাসল এলিজাবেথ। হাতে ছুঁয়ে দিল তাকবীরের চোখের পানি,আলগোছে মুছে দিল তা। নরম দৃঢ় স্বরে বলল,
“সবচেয়ে বড় আদালত হলো মানুষের মনুষ্যত্ব। ওটা ভারি, খুব ভারি… দেখুন না, আমি একজনকে তিন বছর ধরে ভালোবেসে গেলাম, তবুও তার হতে পারলাম না। কারণ সে পাপী। পাপ পূর্ণ মিলেমিশে কিভাবে থাকে বলুন? তার সাথে থাকতে হলে আমাকে পাপী হতে হবে, পাপ কে প্রশ্রয় দিতে হবে। একটা সুস্থ মানুষ হয়ে তা কিভাবে পারি বলুন? তাই বেছে নিলাম এক পাক্ষিক বিরহ। যেখানে কোনো আশা-ভরসা, বিশ্বাস কিছুই নেই। কিন্তু আমি আপনাকে বিশ্বাস করতাম…বলুন, কেমন করে আপনাকে মাফ করে দিই? তবুও চাই আপনি আত্মসমর্পণ করুন। যেমন ওজুর পর মানুষ পবিত্র হয়, তেমনই আপনিও আমার কাছে আগের মতো পবিত্র হয়ে উঠুন। আমার সেই ভালো মানুষটা হয়ে উঠুন মি.তাকবীর। থাকুক না আমাদের মাঝে চৌদ্দ শিকের বেড়াজাল। তবুও সম্মান থাকুক, আস্থা থাকুক। আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করব আপনার শাস্তি যেন কমে আসে। আপনার মুক্তি যেন ন্যায়ের হয়…”
ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৪২
‘হঠাৎ তাকবীর মেঝেতে শুয়ে পড়ল। গড়াগড়ি করতে লাগল। বুকে হাত দিয়ে নিজেকে চাপড়াতে থাকল জোরে। পাগলের মতো উচ্চস্বরে হেসে উঠল,”আমি সুখী! আমি সুখী! দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ আমি আজ! আমার এলোকেশী আমার কথা ভাবছে! মা, দেখো! কে বলে আমি কপাল পোড়া? এই দেখো আমার এলোকেশী আমার কথা ভাবছে! আমার ভালো চাইছে! আমি আজ কিছু না পেয়েও কত সুখী!”
‘তাকবীরের চোখের সামনে ধীরে ধীরে সব ঝাপসা হয়ে এল। দুই চোখ জলে টইটম্বুর। ঝাপসা দৃষ্টির ফাঁক গলে তাকবীর দেখতে পেল এলিজাবেথ ঢলে পড়ছে! ছুটে গেল তাকবীর। হাত বাড়াল… কিন্তু ধরতে পারল না। এলিজাবেথ চেতনা হারিয়ে নিথর পড়ে রইল মেঝেতে।
