ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬৩ (২)
মিথুবুড়ি
‘শহর আজ কেমন অচেনা। রাস্তা ফাঁকা—not by chance, by command. ট্রাফিক সিগন্যাল ঝিমিয়ে পড়েছে। দোকানপাট সব শাটার ফেলে কাঁপছে। হাওয়ায় বারুদের গন্ধ আর হেলিকপ্টারের পাখার শব্দ যেন উপরে ঝুলে থাকা শাস্তি। ময়লার স্তুপের উপর যেভাবে জংলী কাক ঘুরপাক খায়, ঠিক সেভাবে আকাশে হেলিকপ্টার ঘুরপাক খাচ্ছে অনড়তায়। সারি সারি কালো জিপ চলেছে লাইন ধরে। দুইপাশে দুই সারি, মাঝখানে রিচার্ডের কালো মার্সিডিস৷ প্রতিটা গাড়ির জানালা ফাঁক করে বেরিয়ে আছে সাইলেন্সার লাগানো আগ্নেয়াস্ত্র, পেছনের সিটে বসে থাকা গার্ডদের চোখে সর্তকতা। রিচার্ডের গাড়ি এসে থামল রিসোর্টের গেটে। ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে ন্যাসো ছুটে এল, ব্যাকডোর খুলে দিল নিঃশব্দে।
‘রিচার্ড নেমে এল ভেতর থেকে। কোনো বাহার নেই, কোটটা পুরোনো। সাদা শার্টটা কফের কাছটায় রক্তের দাগ,অথচ হেলদোল নেই আজ যে তার বিয়ে। ভেতর থেকে পিটবুলগুলো ছুটে এল। গন্ধ শুকল রিচার্ডের জুতোর মাথায়। যেন চিনে নিচ্ছে তাদের মালিককে । গার্ডদের হাত টানছে শিকল,তবু কুকুরগুলো মাথা নিচু করে বসে গেল। হেলিকপ্টার ওপরে ঘুরছে, এক ফাঁকে এক রাউন্ড ওপেন ফায়ার করে আকাশে। কোনো লক্ষ্যে করে নয়, শুধু স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য—আজ গ্যাংস্টার বস রিচার্ড কায়নাত বিয়ে করছে। কোনো প্রকার বাজনা নেই, ফুল নেই। আছে বন্দুকের নিরাপত্তা, কুকুরের আনুগত্য। চারিপাশে ছড়িয়ে আছে ঝাঁঝালো উত্তেজনা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘রেড ভেলভেটের একটা ব্রাইডাল গাউনে বঁধু সেজে এলিজাবেথ বসে আসে ভেনিটির সামনে। মেক-আপ আর্টিস সবেমাত্র বেরুলো। ইবরাত ড্রেস চেঞ্জ করতে পাশের রুমে গেলো কিছুক্ষণ হল। এলিজাবেথ শোভনীয় বিস্ময়ে দেখছে নিজেকে। তার গভীর, নিকষ কালো চোখ দুটো আশ্লেষে জরিয়ে রেখেছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত। নিজের সৌন্দর্যে আজ সে নিজেই অভিভূত। বুক ধাঁধিয়ে গেল শীতলতায়। এই সৌন্দর্য যে কেবল অবধারিত ছিল সেই লোকটার জন্যই, আজ তা জয় করে নিয়েছে লোকটা তার শুদ্ধ ভালোবাসায়।
‘হঠাৎ জোরসে দরজা খোলার শব্দে কেঁপে উঠল এলিজাবেথ। উঠে দাঁড়াল সে, পিছন ফিরতেই চমকে উঠল। রক্তমাখা রিচার্ড। সমুদ্র নীল চোখ দু’টোতে এখনো ঘনীভূত হচ্ছে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। শুকনো ঢোক গিলল এলিজাবেথ। বুঝতে পারল না এই আগ্নেয় দৃষ্টির মানে। প্রলয়কারী ঝড়ের বেগে ছুটে আসে রিচার্ড। কোনোরূপ হুশিয়ারি ও অবকাশ ছাড়াই এলিজাবেথের কণ্ঠনালি চেপে ধরল। বুক হিম হয়ে আসে তার, পিঠ গিয়ে ঠেকল দেয়ালে। রিচার্ডের নিঃশ্বাস অতি দ্রুত। নিঃশব্দে ছিঁড়ে গেল রক্তিম লাল দোপাট্টা,ছুঁড়ে ফেলা হলো মেঝেতে। খোঁপা থেকে খুলে পড়ল গোলাপগুলো ঝরাপাতার মতো। এলিজাবেথের কেশরাশি খুলে নেমে এল, আঁচড়ে পড়ল অর্ধউন্মুক্ত পিঠজুড়ে। সঙ্গে সঙ্গে রিচার্ড ঝাঁপিয়ে পড়ল। উন্মাদ এক কামড় বসাল তার গাঢ় খয়েরী লিপস্টিকে রাঙা ঠোঁটদুটিতে। বাঁ হাতে খামচে ধরল কোমরের মোহময় বাঁক। নখ ছিঁড়ে ফেলল কোমল চামড়া, ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো গাঢ় রক্ত।
‘এলিজাবেথ থমকে গেল। তার শরীর মোচড়াতে থাকলেও রিচার্ডের শক্তপোক্ত বাহু আরো জোরে চেপে ধরছে তাকে। রাগ, হিংসা, যন্ত্রণা সব ঢেলে দিতে চাইছে ভালোবাসার ছায়ায়। এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলল এলিজাবেথের গাউনের উপরাংশ। কণ্ঠে ঝাঁঝালো চাপা গর্জন,
“আমাকে শান্ত হতে দাও,রেড। প্লিজ, আই বেগ ইউ।”
‘লিপস্টিক ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে ঠোঁট থেকে। রক্তে, ঘামে, স্পর্শে। চোখের কাজল নোনাজলে গলে একাকার। বুক ফেটে কান্না আসে এলিজাবেথের, তবুও মুক্তি নেই। রিচার্ডের আচরণ ক্রমেই হিংস্র থেকে হিংস্রতর। হঠাৎ থেমে গেল সে। নিজেকে ছুড়ে ফেলল দূরে। চারপাশের সবকিছু ভাঙতে শুরু করল। থরথর কাঁপতে কাঁপতে গোঙাতে লাগল,
“স্যরি স্যরি… আমি পারছি না, আমি পারছি না রেড।”
‘এলিজাবেথ উদগ্রীব হয়ে ছুটে গিয়ে পিছন থেকে জাপটে ধরল রিচার্ডকে। বলে,
“কি হয়েছে আপনার? আপনি এমন করছেন কেন?”
‘রিচার্ড ভেঙে পড়ল মেঝেতে। এলিজাবেথ রিচার্ডের মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে কোমল হাতে পিঠে হাত বুলিয়ে দিল৷ অন্ধকারে ডুবে থাকা রিচার্ডের কণ্ঠরোধ কণ্ঠে অস্পষ্ট শব্দ ভেসে এল,
“নিজেকে খুব দুর্বল লাগছে, এলিজাবেথ। মনে হচ্ছে, আমি আমার একটা হাত হারিয়ে ফেলেছি। এই পাশটা… এই পাশটা একেবারে খালি খালি লাগছে।”
‘নিশুতি রাত। চতুর্থ প্রহর পার হচ্ছে ধীরে ধীরে। একটু পরই ফজরের আযান হবে। তবুও প্রাসাদের উঠোনে ভিড় জমিয়ে আছে অতিথিরা। সবাই অপেক্ষায় রিচার্ড কায়নাতের বিয়ে দেখবে বলে। বিয়ের আসরের ঠিক উল্টো পাশে একটি ছোট কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে রিচার্ড। একা। অপেক্ষারত। হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এলো হিলের শব্দ। পিছন ফিরে তাকাতেই রিচার্ডের চোখে পড়ল—লাড়া। পরিপাটি সাজে লাড়া, চোখে প্রশান্তির রেখা, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি। সে এসে সোজা রিচার্ডের সামনে দাঁড়াল।
“কংগ্রেচুলেশনস, রিচার্ড।”
“রিচার্ড চমকে বলল, “তুমি?”
“কেন, আসতে পারি না বুঝি?”একটুও ভেঙে না পড়ে উত্তর দিল লাড়া।
“আই… আই ডিডেন্ট মিন দ্যাট।”
‘লাড়া হেসে চুপ থাকল। দুজনের মাঝখানে সময়টা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। রিচার্ড ঘড়ির দিকে একবার চোখ বোলাল। তারপর আবার তাকাল লাড়ার নিরেট মুখপানে। সে নত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে। যেন বুকের ভেতর কত কিছু জমে আছে, অথচ ঠোঁট কাঁপছে না। শেষমেশ রিচার্ড নিজেই বলল,
“কিছু বলবে?”
‘লাড়া বলতে চায়, অনেক কিছুই বলতে চায়৷ তবে তার কণ্ঠরোধ। শব্দ যেন গলায় এসে আটকে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোঁস করে। অতঃপর ধীরে রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে এক চাপা হাসি হেসে বলল,”তোমাকে আজও আগের মতোই খুব হ্যান্ডসাম লাগছে রিদ।”
‘রিচার্ড ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, একবার নিজের রক্তমাখা অবয়বে দিকে তাকিয়ে বলল, “সত্যি?”
“সব সত্য জানতেও নেই, রিচার্ড। সব আবেগকে প্রশ্রয় দিতে নেই। কিছু সম্পর্ক দূর থেকেই সুন্দর।”
‘রিচার্ড চুপ করে গেল। কপালে পড়ল কয়েক স্তরের ভাঁজ।
“মানে?”
‘হেসে কথা ঘুরিয়ে নিল লাড়া, “নাথিং।”
‘ব্যাগ থেকে ছোট্ট, অতি ছোট্ট একটা শপিং ব্যাগ বাড়িয়ে দিল রিচার্ডের দিকে। বলল,
“উইথআউট ইনভাইটেশনে এসেছি তো, তাই ছোট গিফট। ইনভাইট করলে হয়তো এরচেয়ে বড় দিতাম।”
‘রিচার্ড কপাল কুঁচকে তাকাল ব্যাগটার দিকে। প্রশ্ন করল,
“কি এটা?”
‘লাড়া ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে বলল,”স্পেশাল মানুষদের মূল্যবান গিফট দিতে হয়।”
‘রিচার্ড চুপচাপ ব্যাগটা হাতে নিল। কিছু একটা ভেবে ধীরস্বরে বলল,”আর ইউ ওকে?”
‘লাড়া হাসল। সেই হাসির নিচে চাপা পড়ে রইল এক সমুদ্র ক্লান্তি।
“অভিশপ্ত বাস্তবতায়, অব্যক্ত অন্তরালে, অক্লান্ত শূন্যতায় আমি বড্ড ক্লান্ত।”
‘রিচার্ডের ঠোঁট নড়ে না। শব্দের জালেও বাঁধতে পারে না। কেমন নির্লজ্জ নীরবতা নামে ওদের মাঝখানে। লাড়ার বুক ঢিপঢিপ করতে থাকে। কষ্টটুকু আলগোছে নিজের ভিতর লুকিয়ে ফেলল সে। হঠাৎ আন্তরিক হেসে, খাদযুক্ত কণ্ঠে বলল,
য়শআমার না-পাওয়া সুখে, সুখী হও তুমি।
আমি নামক বেদনায় আহত হই আমি। তবুও চাই, দাম্পত্য জীবনে সত্যিকারের সুখ হোক তোমার।”
‘লাড়া পালিয়ে গেল। এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তবু রিচার্ড পিছন থেকে স্পষ্ট দেখতে পেল লাড়া চোখের জল মুছছে। সে ফোঁস করে এক নিশ্বাস ফেলল। এছাড়া আর কিছুই তার হাতে নেই।
‘বিশাল আকৃতির কাঠের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে যায়। লালচে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রিচার্ড—কালো ব্লেজারে রাজকীয়, হাতে একগুচ্ছ সাদা গোলাপ। সাদা শার্টে এখনো লেপটে থাকা শুকনো রক্ত তার উন্মত্ত অতীতের নীরব সাক্ষী বহন করছে। মেঝে জুড়ে ঘন ধোঁয়ার আবরণ, যেনোমেঘের দেশে পা রাখা । চারপাশে নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে থাকা ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট পোশাকধারী বিত্তশালী ব্যবসায়ী ও মাফিয়ারা সাক্ষী এই অদ্ভুত আবির্ভাবের।বলরুম যেনো এক মহার্ঘ স্বপ্ন। সোনালি আলোয় ঝলমল, মেঝেতে কুয়াশার চাদর, মাথার ওপর রেনেসাঁ যুগের চিত্রশিল্পে মোড়ানো ছাদ। ঝাড়বাতির দীপ্তি আর শত শত চোখের সম্মিলিত চাহনিতে যেনো সময় কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেছে। হলরুমের কেন্দ্রস্থলে এসে দাঁড়ায় এলিজাবেথ। বিশাল ঘোমটার নিচে তার মুখ ঢাকা, অফ-হোয়াইট গাউনে যেনো কোনো রাজবংশের শেষ রাজকুমারী। অথচ সেই গাউনের নিচেও রক্তের ছাপ। তখন রিচার্ডের ছিঁড়ে ফেলা রেড ভেলভেট গাউনের পর, এই নতুন পোশাকেও রয়ে গেছে তার পাগলামির লাল সাক্ষর। আজ ইতিহাসে লেখা হবে এক অদ্ভুত বিবাহের কাহিনি যেখানে বর-কনে রক্তভেজা জামাতে অঙ্গীকারবদ্ধ হচ্ছে।
‘এলিজাবেথ ধবধবে সাদা সিঁড়ি বেয়ে উঠছিল উপরের স্তরের দিকে৷ তার রাজকীয় গাউনের ভাঁজ সিঁড়ির গায়ে বিছিয়ে পড়েছে অপূর্ব এক চিত্রের মতো। হঠাৎ এক পা ফসকে যায়। পড়ে যেতে যেতে দু’পাশ থেকে একসাথে এগিয়ে আসে দু’টি হাত। এলিজাবেথ অবাক হয়ে তাকায়—লুকাস এবং ন্যাসো। লুকাসের ডান বাহুতে একটা বাঘের বাচ্চা। এটা সে উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছে। রক্তের বন্ধন নয় তবু হৃদয়ের এক অকাট্য আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে তাদের মাঝে৷ দু’জনেই মৃদু হাসিতে মাথা নাড়ে। সে হাসিতে শুধু ভরসা, ছিল প্রতিশ্রুতি। চোখের কোণে ভিজে ওঠা জলচিহ্ন আর একটুখানি কাঁপা হাসি নিয়ে এলিজাবেথ দু’হাত দু’জনের হাতের উপর রাখল। দুই ভ্রাতার অস্ত্রসম বুক তখন ঢাল হয়ে দাঁড়ায় তার পাশে। তারা এগিয়ে চলে ওকে সঙ্গে নিয়ে এক নতুন জীবনের সূর্যোদয়ের দিকে, যেখানে প্রতিটি ধাপ লেখা হবে ভালোবাসা আর সাহসের অক্ষরে।
‘এলিজাবেথ ধীরে এগিয়ে এসে নিঃশব্দে হাত রাখে রিচার্ডের কাঁধে। চোখ বুঁজে এক ক্লান্ত প্রশান্তির হাসি হাসে রিচার্ড। কিন্তু পিছন ফিরে থমকে দাঁড়ায়। চোখে ঝলঝলে বিস্ময়। লুকাস। লুকাস হাসল তার দিকে তাকিয়ে। রিচার্ড অনুভব করল দীর্ঘদিন বুকের ভেতর যে অপরাধবোধ আর অস্থিরতা বাসা বেঁধেছিল, তা যেন সূর্যাস্তের শেষ আলোর মতো মিলিয়ে যেতে থাকে। লুকাস উদ্ভাসিত চোখে এগিয়ে এসে রিচার্ডের কাঁধে হাত রাখে। চোখেচোখে কথা বলে ন্যাসোকে সঙ্গে নিয়ে সে বিদায় নেয় নিজের কর্তব্য সম্পূর্ণ করে। রিচার্ড গ্রীবা ঘুরিয়ে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকায় লুকাসের যাওয়ার পানে।
“আমাকে কেমন লাগছে?”
‘চঞ্চলা রমণীর মিহি কণ্ঠে ফিরে তাকায় রিচার্ড। আবেশময় নয়নে এলিজাবেথের দিকে চেয়ে থাকে। প্রশান্তিতে চোখ বুজে নিলো নিবিড় নৈঃশব্দ্যে।ঠোঁটের কোণ ফুটে বেরিয়ে এল প্রাপ্তির উষ্ণ হাসি৷ সুরেলা কণ্ঠে বলল,
“একদম রিচার্ড কায়নাতের ওয়াইফির মতো।”
‘এলিজাবেথের অন্তরের বয়ে যায় প্রশান্তির নরম স্রোত৷
তাকে আর এক মুহূর্তও দূরে না রেখে এগিয়ে গিয়ে এলিজাবেথের হাত ধরে। আর ঠিক তখনই ছাদ থেকে একে একে ঝরে পড়ে শত শত বেলুন৷ ভেতরে ঝলমলে সোনালি আর বর্ণিল কনফেটি। উল্লাসে ফেটে পড়ে অতিথিরা। চারদিক আলো আর রঙে ভরে ওঠে যেনো স্বর্গ নিজেই আশীর্বাদ ছিটিয়ে দিচ্ছে। এই আনন্দময় মুহূর্তের মাঝে ঠিক সেই ভিড়ের মধ্য থেকে ভেসে আসে এক ক্লান্ত, বিষণ্ণ কণ্ঠস্বর,
“তুমি অমলতাসের মতো উজ্জ্বল,
কৃষ্ণচূড়ার মতো রঙিন,
রঙ্গনের মতো স্নিগ্ধ,
অলকানন্দার মতো প্রাণজ্বল,
পলাশের মতো সুন্দর,
শিমুলের মতো নাটকীয়।
তুমি—ফুলেরা যেন নিজেরাই রূপ নিয়েছে তোমার মাঝে।”
‘আজ এই বিয়েতে কোনোরূপ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার নেই।তা তো আগেই হয়েছে। আজ শুধু উৎসব, একটি উদযাপন। কোনো প্রার্থনার বুলি নয়, শুধু পবিত্রতা খুঁজে নেয় চোখের চাহনিতে, হাত ছোঁয়ার মৃদু কাঁপন আর নিরব প্রতিশ্রুতির গভীরে। একেকটা মুহূর্ত যেন সিনেমার পর্দা ছিঁড়ে উঠে আসা বাস্তব। রিচার্ড ধীরে এগিয়ে আসে। সকলের সামনে নিঃশব্দে, অনর্গল ভালোবাসার ভাষায় এলিজাবেথের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে দেয়। চারদিক ফেটে পড়ে করতালিতে। সেই শব্দে মিলিয়ে যায় লুকানো কষ্ট, অপরাধবোধ, অতীতের ছায়া। বাকি থাকে শুধু আলো।
‘দূরে এক কোণের টেবিলে বসে ছিল লাড়া। চেয়ারের হ্যান্ডেলে হাত বিছিয়ে তার ওপর মাথা রেখে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল সেই দৃশ্যের দিকে। রিচার্ড, এলিজাবেথ —তাদের ঠোঁটের মিলনে হলরুম ফেটে পড়ছে করতালিতে। লাড়া টেরই পায় না কখন যে তার চোখের পাতার পেছনে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। লাড়া ধীরে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে সেলফি ক্যামেরা অন করে। স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে রিচার্ড ও এলিজাবেথ একে অপরকে চুমু খাচ্ছে। লাড়ার চোখের কোটর ভরে উঠছে বিষাদের জলে। তবুও সে ক্যামেরা নাড়ায় না। এই মুহূর্তটা ধরে রাখতে চায়। যন্ত্রণার মধ্যেও এক টুকরো ইতিহাস নিজের করে নিতে চায়। ক্যামেরার লেন্স ঘোলাটে লাগে। বারবার আঙুল দিয়ে মুছে দেয় লাড়া। তবু দৃষ্টিটা ঝাপসা রয়ে যায়।
‘অথচ বোকা মেয়ে জানে না—ময়লাটা ক্যামেরায় নয়, সে ময়লা লেগে আছে তার নিজের মুখে, তার চোখে, তার হৃদয়ে। অথচ সে দোষ দিয়ে গেল ক্যামেরাকে।
“প্রিসেন্স, এলিজাবেথ।”
‘এলিজাবেথ ধীরে ঘুরে তাকাল রিচার্ডের দিকে। চোখে অভিজাত প্রশান্তি, ঠোঁটে অল্প হাসি। প্রত্যুত্তর করল একই ভঙ্গিতে,
“প্রিন্স রিচার্ড।”
‘রিচার্ড আরেক ধাপ কাছে এল। দমকা হিসহিসে স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,”আপনি জানেন না, আজ রাতটা আপনার সর্বনাশের। আজ আপনাকে একটু বেশিই কষ্ট দিতে চাই।”
“আজ আমরা কেবল গল্প করব, নাথিং ইলস। এন্ড দ্যাটস ফাইনাল।”
“আজ আমি কিছুই শুনছি না। নো এক্সকিউজ। জাস্ট ইমাজিন… অ্যান্ড গেট দ্যাট গোস্বাম্প।”
‘এলিজাবেথের পেটের নিচে মোচড় দিয়ে উঠল। হাত-পা কাঁপে। তা দেখে রিচার্ড ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠল,
“এখনই শুকনো ঢোক গিলছ? ওয়াহ!”
‘এলিজাবেথ ঘুরে দাঁড়াল। দু’হাতে রিচার্ডের গলা পেঁচিয়ে বলল,
“অনেক সাধনার পর আপনাকে পেয়েছি, জনাব। এই ‘আমি শুধু আপনারই সম্পূর্ণই আপনার। আমার সর্বস্ব উৎসর্গ করেছি আপনাকে। খুব কাছে টানুন,, কাছে আসুন, ভালোবাসুন। থেকে যান আমার ভেতরে, শুধু আমার হয়ে।”
‘রিচার্ড দু’হাতে কোমর চেপে ধরল এলিজাবেথের।
নাকের ডগায় নাক ছুঁইয়ে বলে,
“ইতিহাসের পাতায় আজ এক নতুন পালা লেখা হলো। এই পৃথিবীর বুকে এলিজাবেথ ঠাঁই পেয়েছে রিচার্ডের বুকে। জয় হয়েছে ভিলেনের ভালোবাসা, পূর্ণতা পেয়েছে এলিচাডের ভালোবাসা। তাকদীরে লেখা ছিল এ-ই আর আমি সে তাকদীর সজ্ঞানে কবুল করলাম। আজ আমি খুশি, গভীরভাবে, নিঃশেষে খুশি।”
‘অতঃপর, তৎক্ষণাৎ রিচার্ড এলিজাবেথের হাঁটু জাপ্টে ধরে ওকে তুলে নিল বুকে। হাসিমুখে এক পাক ঘুরিয়ে নেয় যেন বিশ্বজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা রাজপুত্র। চারপাশ ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু তাদের ধ্বনি বেজে ওঠে হৃদয়ের গহীনে। আত্মার অন্তস্তল থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসে এক গানের উপমা,
‘যন্ত্রে বাঁধা মন ছিলো ক্লান্ত অসহায়,
অর্থে কেনা সুখ ম্রিয়মান দুঃখের ছায়ায়।
দীর্ঘ পথ চলা একাকী, নির্বাক মনোজালে,
ছিলাম হারানো, পথহীন, নিঃসঙ্গ কুয়াশায়।
আর নয় সময় উদ্দেশ্যহীন মিছিলে—
তুমি সেই পূর্ণতা, আমার অনুভবে।
আর নয় আঁধার, তুমি স্বপ্নে ডেকে
নিলে ভরে মন, অন্তহীন রঙিন এক উৎসবে।’
‘নিঃশ্বাসে হুইস্কির তীব্র গন্ধ। চোখের দৃষ্টি রিচার্ডের দিকে ছোঁড়া তিরের মতো। লুকাস রুষ্ট কণ্ঠে বলল,
“দেখেছো, মুহূর্তেই চোখমুখের রঙ কীভাবে বদলে গেল? কিছুক্ষণ আগেও তো আমার মৃত্যুর খবর শুনে শোকে কাতর হচ্ছিল! নাটক, সবই নাটক! এই যে এখন বিয়ে করছে, বিয়েটা হলেই বউ নিয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করবে। তখন কি আর এই চিরকুমার লুকাসের কথা মনে থাকবে? হুঁ, কী মনে করেছ? আমি কিছু জানি না? সব জানি! নিজেদের জন্য আলাদা প্রাইভেট জেট ঠিক করে রেখেছিল। ভেতরে সাজানো গোছানো একেকটা স্বর্গ। কী কী এনেছে, কী কী করেছে ছিঃ! ছিঃ! এত কিছু বলাও যায় না। তবে একটা কথা বলি— আমার বোনের জন্য আজকের রাতটা খুবই ভয়ংকর হতে চলেছে। বস’কে ভয় না পেলে এই বিয়ে আমি কখনোই হতে দিতাম না।”
‘কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সে। বিষন্নতায়, অভিমানে, রাগে টলমল করছিল চোখ। হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ন্যাসো হেসে বলল,
” ছিঃ লোকা, তুমি ওদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এতটা যাচ্ছো কেন?”
‘লুকাস হঠাৎই গর্জে উঠল,”আমার বিয়ে ভেঙে গিয়েছে! আমি আর কারও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভাবব না? খাটটাই ভেঙে পড়ুক বস, এখন ওটাই কাম্য!
‘লুকাসকে ব্ল্যাক কোবরার বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। বিষক্রিয়ায় এক পর্যায়ে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন সম্পূর্ণ থমকে যায়। এলিজাবেথ তখন ন্যাসোর কাছ থেকে খবর পেয়ে দৌড়ে গিয়ে দেখে লুকাসের দেহ নিস্তেজ হলেও সামান্য শ্বাস চলছে। চিকিৎসা না হলেও দেহের অতিমানবিক সহ্যশক্তির কারণে এই যাত্রায় লুকাস প্রাণে বেঁচে যায়। অন্যদিকে, এই সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুইটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। বর্তমানে সে হাসপাতালে ভর্তি। তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সুইটি সুস্থ হলে, বিয়েটা আবারও হবে। আপাতত তারা যেনো না যায়।
‘নাটকীয় ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠল ন্যাসো।
“লোকা?”
‘লুকাস মুখ ফিরিয়ে বিরক্তস্বরে বলল,”কিহ?”
“আজ কিন্তু বসের বিয়ে।”
“তো?”
“বাসর হবে।”
“সব বিয়েতেই হয়।”
“কিন্তু সবার তো বউ নেই।”
“মানে?”
“বসের বউ আছে।”
“তো?”
“আমার তো বউ আছে, আর তোমার?”
লুকাস গ্লাস নামিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“আজ বউ নেই বলে এমন করছ না। দাঁড়াও, বিয়েটা একবার করে নিই। বিয়েতে পিছিয়ে থাকলেও, বংশবিস্তারে কয়েক দাপ এগিয়ে থাকব। আর যদি না পারি দুটো মূল্যবান জিনিস অনাথাশ্রমে দান করে দিবো।”
“দুটো মূল্যবান জিনিস?”
“যে জিনিস আমাকে বংশবিস্তারে সাহায্যই করতে পারবে না, সেটা রেখে কী হবে হুঁ? তোমারটাও বোধহয় কাজের না। কাজের হলে এতোদিনে একটা সুখবর আসত। বাদ দাও, ন্যাসো। শরীরের ওজন বাড়িয়ে লাভ নেই। বাড়তি জিনিস ভালো কোনো আশ্রমে দিয়ে দাও।”
‘ন্যাসো থমকে গেল। মুখ শুকিয়ে এল। ধীরে বলে,
“আসলেই তুমি একটা অসভ্য। এজন্যই বার বার তোমার বিয়ে হয়েও হয় না।”
‘লুকাস হেসে উঠে দাঁড়াল। বলল,
“শোন ন্যাসো, বিয়ে নিয়ে একদম কোনো কথা বলবে না। এটাকে আমি পার্সোনাল বলি— পার্সোনাল। ওকে? চল এনজয় করি।”
‘হঠাৎই সাউন্ডবক্সে গর্জে ওঠে ‘গ্যাংস্টার ওয়াইফ’। এমন ভলিউমে যে গোটা হলটা কেঁপে ওঠে। চমকে তাকায় এলিজাবেথ। ঠিক সেই মুহূর্তে আলোর ঝলকে স্টেজে উঠে আসে ন্যাসো লুকার। হাতে ধরা টাকার মেশিন। একটা তালে, একটানা বিটে, মাথার ওপর মেশিন তুলতেই শুরু হয় টাকার ঝড়। গার্ডরা ছুঁড়ে দেয় একের পর এক বান্ডিল। চারপাশ থেকে লোকজনও যেনো পাগল হয়ে গেল। স্টেজে, বাতাসে, এলিজাবেথ আর রিচার্ডের গায়ে পড়ছে টাকার বৃষ্টি। দুজনেই স্তব্ধ, বিস্মিত। পরক্ষণেই হেসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। লুকাস আর ন্যাসো নাচতে নাচতে উড়াতে থাকে টাকা পাগলামি, মাদকতা আর বিজয়ের মিশেলে। দু’তলা থেকে নামতে থাকে আরও গ্যাংস্টার, আরও মাফিয়া। কারও হাতে ঝোলানো সোনার চেন, কারও চোখে রে-ব্যান। সবাই একসঙ্গে ছুঁড়ে দেয় টাকা। হলজুড়ে পড়ে ছিটিয়ে থাকা নোট যেন শ্যাম্পেনের মতো উদযাপনের অংশ। এটাই গ্যাংস্টারের বিয়ে। আর এভাবেই হয় টাকার বৃষ্টি। এভাবেই নেমে আসে রাজত্বের কুন্ডলী ধরে টাকার বজ্রপাত।
ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬৩
‘নিশ্ছল আনন্দের উৎসবের মাঝেও দাঁড়িয়ে আছে এক বিষণ্ণ মানব। চোখে তার ছলছলে জল। মুখে পরা এক অনুচ্চারিত যন্ত্রণার মাস্ক। কোঁচড়া চুলের ছায়ামূর্তি সে দূর থেকে স্থির দৃষ্টিতে দেখছে সবকিছু। আশপাশে আলো, উল্লাস শতবু তার ভেতর জমে থাকা এক নিঃশব্দ আর্তনাদ। হঠাৎ তার ঠোঁট কাঁপে। নিঃশব্দে ফেটে পড়ে চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু দুটি। সে কাঁপা গলায় বিরবির করে,
“পাওয়ার সুখ যতই গভীর হোক,হারানোর বেদনা তার চেয়েও অনেক বেশি নির্মম।”
