মহাপ্রয়াণ পর্ব ৪৩+৪৪
নাফিসা তাবাসসুম খান
পুরো রাজ্যে খবর ছড়িয়ে পড়েছে কাউন্ট লোনেল এবং কাউন্টেস সিসিলিয়া নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এই খুনের রহস্য কেউই উন্মোচন করতে পারে নি এখনো। প্রধান সেনাপতি স্টেফেন ঘোষণা করে দিয়েছে এই খুনের বিষয়কে অমীমাংসিত হিসেবে এবং আজ থেকে আগামী সাতদিন কাউন্ট এবং কাউন্টেসের মৃত্যুর শোক পালন হবে রাজ্য জুড়ে। সাতদিন পরে প্রিন্স ড্রাগোসের রাজ্য অভিষেক হবে এবং তাকে নতুন কাউন্ট হিসেবে মুকুট পড়ানো হবে। রাজ্যের সকলেই কাউন্ট এবং কাউন্টেসের খুনের মামলায় বেশ আতংকিত। অনেকে সন্দেহ করছে গ্রীক সম্রাট হার্মসকে। কিছুদিন আগে হওয়া যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে হয়তো উনি নিজের গোপন সেনা পাঠিয়েছিলো কাউন্ট এবং কাউন্টেসকে হত্যা করতে। কিন্তু এসব কেবল মানুষের মনের সন্দেহ। কারণ দিন শেষে একটা কিন্তু সকলের মনে রয়েই যাবে।
রাত গভীর হয়েছে। জোসেফ বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে দূর্গ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু তখনই রিকার্ডো তাকে ডেকে পাঠায়। জোসেফ বুঝে উঠতে পারে না এতো রাতের বেলা রিকার্ডোর তাকে দিয়ে কি কাজ হতে পারে। সকালে জোসেফ রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়াকে পাগল বলে সম্বোধন করেছিলো। রিকার্ডো আবার তা শুনে ফেলে নি তো? কিন্তু শুনে থাকলে সকালের হিসেব মেটাতে এখন ডাকবে কেন? যাতে রাতে মেরে লাশ গুম করে দিলেও কেউ টের না পায়? এসব উদ্ভট চিন্তাভাবনা মাথায় নিয়ে ভয়ে ভয়ে রিকার্ডোর কক্ষের সামনে এসে পৌঁছায় জোসেফ। কক্ষের দরজায় করাঘাত করতেই ভেতর থেকে রিকার্ডো ভরাট কণ্ঠে বলে উঠে,
” এসো। ”
জোসেফ দরজা খুলে কক্ষের ভেতর প্রবেশ করতেই দেখে রিকার্ডো বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে ডিভানে বসে আছে। জোসেফ মাথা নত করে প্রশ্ন করে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন কাউন্ট। ”
রিকার্ডো বলে,
” হ্যাঁ। বাসায় ফিরছিলে তুমি? ”
” জ্বি কাউন্ট। ”
রিকার্ডো একটি গোল করে পেঁচানো কাগজ জোসেফের দিকে এগিয়ে দেয়। জোসেফ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” এটা কি কাউন্ট? ”
রিকার্ডো শান্ত স্বরে জবাব দেয়,
” তোমার এতো কিছু না জানলেও চলবে জোসেফ। এই চিঠি একমাত্র আনাস্তাসিয়ার কাছে নিয়ে পৌঁছে দিবে। যদি অন্য কারো হাতে এই চিঠি পড়ে তাহলে তোমাকে মেরে তোমার দেহ জঙ্গলে এবং তোমার গর্দান কৃষ্ণ সাগরে ভাসিয়ে দিবো আমি। ”
জোসেফ ভয় পেয়ে যায়। আপনমনে তার হাত নিজের গলায় চলে যায়। সাথে সাথে নিজের আলখেল্লার ভেতর চিঠিটা লুকিয়ে ফেলে। মাথা নত করে বলে উঠে,
” আনাস্তাসিয়া ছাড়া আর কারো হাতে এই চিঠি দিবো না আমি জীবন থাকতে। ”
এটুকু বলেই জোসেফ মাথা নত করে বেরিয়ে যেতে নেয়। হঠাৎ কি মনে করে আবার সে পিছনে ফিরে মিনমিনে সুরে রিকার্ডোকে প্রশ্ন করে,
” কাউন্ট আমি কি জানতে পারি এই চিঠিতে কি এমন লেখা আছে? ”
রিকার্ডো উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে এগিয়ে আসে জোসেফের দিকে। জোসেফ ভয়ে ঢোক গিলে। বুঝতে পারে তার প্রশ্ন করা উচিত হয়নি এভাবে। রিকার্ডো শান্ত স্বরে জবাব দেয়,
” কৃষ্ণ সাগরে কয়টা হাঙ্গর মাছ আছে তার হিসেব লেখা আছে চিঠিতে। ”
জোসেফ আর কিছু প্রশ্ন করবে তার আগেই রিকার্ডো বলে উঠে,
” এখন আর একটা প্রশ্ন যদি তুমি করো খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম। ”
জোসেফ আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস পায় না। সোজা কক্ষ থেকে চুপচাপ বেরিয়ে পড়ে। কক্ষ থেকে বের হয়ে সে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠে,
” আবার কৃষ্ণ সাগর? হাঙ্গর মাছ? ঈশ্বর তুমি কাউন্টকে ঠিক করে দাও জলদি। হয়তো উনি মাথায় বেশ জোরে আঘাত পেয়েছে। ”
এটুকু বলেই আবার জোসেফ মনে মনে বলে উঠে,
” এ্যাঁ? ভ্যাম্পায়ারদের মাথায় আঘাত লাগলে উনারা পাগল হয়ে যায়? হতেও পারে। ছোট থাকতে আমার মা একবার আমাকে গাছের ডাল দিয়ে মেরেছিলো। আজও সেই ব্যথা রয়ে গিয়েছে। সেখানে ভ্যাম্পায়ারদের ব্যথা পেয়ে পাগল হওয়া কি এমন বড় বিষয়? ”
এটুকু বলেই জোসেফ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
জোসেফ প্রস্থান করতেই রিকার্ডো উঠে দাঁড়ায়৷ রক্ততৃষ্ণা পেয়েছে তার। জঙ্গলে তার শিকার খুঁজতে হবে। তৈরি হতেই যাচ্ছিলো রিকার্ডো তখনই দরজায় করাঘাতের আওয়াজ পায়। ভ্রু কুচকে উঠে তার। জোসেফ আবার ফিরে এসেছে নাকি? রিকার্ডো অনুমতি দিতেই ক্যামিলো হনহনিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। এই সময় সচরাচর ক্যামিলো কখনো রিকার্ডোর কক্ষে আসে না। রিকার্ডো ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” তুমি এতো রাতে এখানে মা? ড্যানিয়েলের কোনো খবর পেয়েছো? ”
ক্যামিলো মাথা ঝাকিয়ে বলে উঠে,
” না। কিন্তু অন্য খবর আছে। ”
” কি? ”
” লোনেল আর সিসিলিয়া কাল রাতে খুন হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় প্রধান সেনাপতি স্টেফেন এই ঘোষণা করেছেন। কিভাবে খুন হয়েছে তা অমীমাংসিত। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি খুনটা কে করতে পারে। ”
হঠাৎ এমন খবর শুনে বেশ অবাক হয় রিকার্ডো। প্রশ্ন করে উঠে,
” কে করেছে? ”
” ড্যানিয়েল আর জ্যাকসন। ”
রিকার্ডো সন্দেহজনক কণ্ঠে প্রশ্ন করে উঠে,
” তুমি কিভাবে নিশ্চিত যে ওরা এই খুন করেছে? ”
” লোনেল এবং সিসিলিয়ার গর্দান ওদের দেহ থেকে আলাদা ছিলো। একজন নেকড়ে এবং ভ্যাম্পায়ার মানুষকে যেভাবে খুন করে ওদের খুনও একইভাবে হয়েছে। ”
রিকার্ডোর কপালে চিন্তার ভাজ পড়ে। সে বুঝে উঠতে পারে না ওদেরকে মেরে জ্যাকসন এবং ড্যানিয়েলের কি লাভ হতে পারে? সাথে সাথে রিকার্ডোর মস্তিষ্ক জবাব দিয়ে উঠে,
” লাভ আছে। ”
জ্যাকসন কি এখন সম্পূর্ণ রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের লোভ করছে? ড্যানিয়েলও কি একই লোভে জ্যাকসনকে সাহায্য করছে? রিকার্ডোর ভাবনার মাঝেই ক্যামিলো তার কাধে হাত রেখে বলে উঠে,
” তুই যা ভাবছিস আমিও তাই ভাবছি। আর এমনটা যদি হয়ে থাকে তাহলে তোর জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে। ড্যানিয়েল জানে এই সাম্রাজ্যের আসল উত্তরাধিকারী তুই। হয়তো জ্যাকসনকেও এই কথা জানিয়ে দিয়েছে সে। ওদের পথের কাঁটা তুই। তোকে মারার জন্য ওরা এখন সম্পূর্ণ চেষ্টা করবে। ”
” যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে শুধু আমি নয় আরেকজনের জীবনও সংকটে আছে? ”
” কে? ”
” ড্রাগোস। ”
ক্যামিলো ভীত স্বরে বলে উঠে,
” আগামী সাতদিন পরে ড্রাগোসের রাজ্য অভিষেক এবং কাউন্ট হিসেবে মুকুট পড়ানো হবে। ”
রিকার্ডো গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সময় এসেছে। তার রাজপ্রাসাদে যেতেই হবে। ড্যানিয়েল এবং জ্যাকসনকে খুঁজে পেতে এখন সেই প্রাসাদে তাকে যেতে হবে যেই প্রাসাদের উত্তরাধিকার হয়েও সেই প্রাসাদে কখনো তার পা পড়ে নি।
জোসেফের কাছ থেকে রিকার্ডোর দেওয়া চিঠি পেয়েই আনাস্তাসিয়া সাথে সাথে কক্ষে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে সযত্নে সে চিঠির বাধন প্রথমে খুলে। তারপর চিঠি খুলে পড়া শুরু করে।
” চিঠিপ্রিয়া,
চিঠি পেয়েই তোমার মুখের যে হাসি ছিলো তা এখন মিলিয়ে যাবে। কারণ কাল ভোরে আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। তাই আজ রাতে বারান্দায় হাঁটাহাঁটি বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। প্রেম করতে হলে নিজের সকালের প্রিয় ঘুম তো মাঝেমধ্যে বিসর্জন দেওয়াই যায়। তাই না? আমি অপেক্ষায় থাকবো গোরস্থানের পিছনে জঙ্গলে। আর যদি না আসো তাহলে জোসেফের বাসা থেকে তুলে আনবো। তখন আমার জংলী বিড়ালের মতো লাফালাফি করা শুরু করবে না।
ইতি,
তোমার রিক। ”
চিঠি পড়েই ফস করে উঠে বসে আনাস্তাসিয়া। মনে মনে বলে,
” সকাল সকাল সাক্ষাতের জন্য আমাকে ডেকে খুব প্রেমিক সাজা হচ্ছে? আবার জংলী বিড়ালও ডাকা হচ্ছে আমাকে? তুমি যদি ভ্যাম্পায়ার হও তবে আমিও তোমাকে বসে আনা মানব কন্যা। আমার উপর হুকুম জারি করা এতো সহজ নয়। ”
এটুকু বলেই আনাস্তাসিয়া বিছানা ছেড়ে নেমে একটা কাঠের বাক্সে চিঠিটা রেখে দেয়। তারপর তাড়াতাড়ি এসে শুয়ে পড়ে বিছানায়। কাল সকালে তার বহু কাজ।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কানের দুল জোড়া খুলছিলো ক্যাথরিন। হঠাৎ নিজের উন্মুক্ত বাহুতে এক জোড়া হাতের শীতল ছোঁয়া অনুভব করে। আয়নায় তাকাতেই পিছনে দাঁড়ানো আরোণকে দেখতে পায় সে। আরোণ তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ক্যাথরিন ব্যঙ্গ করে বলে উঠে,
” তুমি কিন্তু খুব বউ কাতুরে হয়ে পড়ছো আরোণ। আগে তো সারাদিন জঙ্গল এবং নেকড়েদের সাথেই ঘুরে বেড়াতে। আর আজ দুদিন ধরে কক্ষ ছেড়ে বেরই হচ্ছো না। কিছুক্ষণের জন্য বের হলেও ঘুরে ফিরে আবার যে কোনো অজুহাতে কক্ষে এসে আমায় বিরক্ত করছো। ”
আরোণ মৃদুস্বরে বলে উঠে,
” তোমার খুশি হওয়া উচিত ক্যাথ যে তোমার স্বামী এতো বউ কাতুরে। আর যার এতো সুন্দর বউ আছে সে কি করে বন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় বলো? ”
ক্যাথরিন কনুই দিয়ে আরোণের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠে,
” তুমি থাকো। আমি লোল্যান্ডার কক্ষে যাচ্ছি। আজ রাতে ভাবছি ওর সাথেই থাকবো। কাল ও চলে যাবে আবার বুখারেস্ট। ”
আরোণ ক্যাথরিনের কোমর জড়িয়ে ধরে পিছন থেকে বলে উঠে,
” লোল্যান্ডার জন্য ক্রিয়াস আছে। ওদের এখন বিরক্ত না করাই উত্তম। তুমি আমাকে সময় দাও। ”
আকস্মিক আরোণের ছোঁয়ায় ক্যাথরিনের গত রাতের কথা মনে পড়ে যায়। সেই উষ্ণ মুহূর্ত মনে করে ক্যাথরিনের গালে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে। লজ্জায় এবং ভালোলাগায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। ক্যাথরিনের ভাবনার মাঝেই আরোণ তার গলায় মুখ ডুবিয়ে দেয়। ক্যাথরিন অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,
” অসভ্য। ”
আরোণের কানে যায় সেই কথা। সে মৃদু হেসে বলে উঠে,
” প্রমাণ দেই তবে। ”
তুষারাচ্ছন্ন ভোর। গাছের পাতা হতে শুরু করে পায়ের তলের মাটি সবই তুষারে ঢাকা পড়ে আছে। হাড় কাপানো শীতের মাঝে এই ভোর বেলায় জঙ্গলে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে রিকার্ডো নিজের প্রেয়সীর জন্য। তার গায়ে অবশ্য শীত তেমন লাগছে না। ভ্যাম্পায়ার সে। শীতল রক্তের দেহ তার। এই শীত তার জন্য নতুন কিছু নয়।
রিকার্ডোর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ধীর কদমে আগমন হয় আনাস্তাসিয়ার। রিকার্ডো দূর হতে দেখে নেয় হালকা বেগুনি রঙের গাউনের উপর ছাঁই রঙের ক্লক পড়া আনাস্তাসিয়াকে। মাথায় হুড দেয় নি। সোনালী চুলগুলো সামনে দিয়ে চিকন চার পাঁচটে বিনুনি করে বাকি চুলগুলো খোলা রেখেছে। দূর হতেও রিকার্ডো স্পষ্ট আনাস্তাসিয়ার শরীর হতে আসা জেসমিনের ঘ্রাণ টের পাচ্ছে। তুষারের বুকে যেন তুষার কন্যার আগমন।
আনাস্তাসিয়া আরো কয়েক কদম এগিয়ে আসতেই রিকার্ডোর চেহারার সামান্য হাসিটুকু মিলিয়ে যায়। চোখে হিংস্রতা ফুটে উঠে। দাঁত খিঁচিয়ে উঠে সে। আনাস্তাসিয়ার গলার ক্রুশের হারটির দিকে ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকে রিকার্ডো।
আনাস্তাসিয়া আর সামনের দিকে পা বাড়ায় না। দূরে দাঁড়িয়ে থেকেই গায়ের ক্লকটা খুলে একটি গাছের পাশে ফেলে। শুভ্র হাত এবং গলা দৃশ্যমান। ঠান্ডায় আনাস্তাসিয়ার শরীর জমে যাচ্ছে তবুও মুখে হাসি নিয়ে এই ঠান্ডাটুকু গিলে নেয়। রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বলে উঠে,
” কি হলো রিক? এতো দূরে দাঁড়িয়ে কেন তুমি? ”
রিকার্ডো দাঁত খিঁচিয়ে প্রশ্ন করে,
” গলায় ওটা পড়েছো কেন? ”
আনাস্তাসিয়া না বুঝার অভিনয় করে বলে,
” কোনটা? ”
রিকার্ডো বুঝতে পারে আনাস্তাসিয়া ওর সাথে মশকরা করছে। সে জোরে বলে উঠে,
” গলার ক্রুশটা খুলে ফেলো নাসিয়া। ”
আনাস্তাসিয়া দূর থেকেই চুল হাতে নিয়ে ঘুরে ফিরে বলতে থাকে,
” জংলী বিড়াল ডাকবে অথচ জংলী বিড়ালের মতো কাজ করলেই যত দোষ আমার? আচ্ছা মুশকিল তো! ”
রিকার্ডো বুঝতে পারে আনাস্তাসিয়া তার কালকের সেই চিঠির কারণে এমন করছে। আনাস্তাসিয়া আবার বলে উঠে,
” এবার জ্বলে পুড়ে ছাড়খাড় হও পিশাচ। চোখের সামনে এতো সুন্দর প্রেমিকা ঘুরে ফিরে বেড়াবে অথচ তুমি কাছেও ঘেষতে পারবে না। কি মজার বিষয় না? ”
” ঠিক করছো না নাযিয়া। ”
” আমি দুঃখিত রিক। কিন্তু প্রেমিকা হিসেবে খুব নির্দয় আমি। ”
এতক্ষণ রিকার্ডোর রাগ লাগলেও এখন সে বেশ মজা পাচ্ছে। আনাস্তাসিয়ার তার কাছে সহজে ধরা না দেওয়াটা বেশ আকর্ষণীয় লাগছে তার কাছে। রিকার্ডো স্মিত হেসে বলে,
” রিকার্ডোকে নিয়ে খেলছো ভুলে যেও না। ”
আনাস্তাসিয়া দূর থেকে হেসে বলে,
” উম! কাউন্ট রিকার্ডো আপনি হয়তো জানেন না যে আপনি আমার কতো প্রিয় একটা বিষয়। আপনার মন নিয়ে সামান্য খেলে আপনার হৃদয়ে আকুলতা জাগিয়ে বেশ আনন্দ পাচ্ছি আমি। ”
” পিশাচের সান্নিধ্যে এসে তোমার মাঝেও পিশাচ স্বত্তা জেগে উঠেছে। সমস্যা নেই। তুমি থাকো। আমি চললাম। ”
বলেই সাথে সাথে রিকার্ডো সেখান থেকে হাওয়ার সাথে মিশে প্রস্থান করে। আনাস্তাসিয়ার মন ক্ষুণ্ণ হয়। রিকার্ডো আসলেই চলে গেলো। সে তো সামান্য কেবল জ্বালানোর জন্য এই ক্রুশের হার পড়ে এসেছিলো। মনে মনে তো সেও রিকার্ডোর সান্নিধ্য চায়। এজন্যই তো এতো সকাল বেলা নিজের প্রিয় ঘুম ছেড়ে সে এখানে ছুটে এসেছে। আনাস্তাসিয়া আশেপাশে তাকায়। তারপর গলা থেকে ক্রুশের হারটি খুলে ক্লকের উপর ছুড়ে মারে। দৌড়ে সামান্য সামনের দিকে যায়। বিচলিত দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার করে উঠে রিক বলে।
আনাস্তাসিয়ার চিৎকারের সাথে সাথেই পিছন থেকে কেউ এসে তার মুখ হাত দিয়ে আলতো করে চেপে ধরে। তারপর কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” হুশশ। ”
অতঃপর রিকার্ডো নিজেই বলে উঠে,
” এখন হারটি খুললে কেন? ভেবেছ আমি তোমাকে ফেলে চলে গিয়েছি? ”
আনাস্তাসিয়া কিছু বলে না। কেবল মাথা নাড়িয়ে প্রতুত্তরে হ্যাঁ জানায়। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে ছেড়ে দেয়। তারপর হেসে বলে উঠে,
” আমি তোমাকে নির্বোধ ভাবতাম, কিন্তু তুমি যথেষ্ট চতুর নাসিয়া৷ আমাকে বশ করার ভালো ফন্দি রপ্ত করেছো। ”
আনাস্তাসিয়া হেসে বলে,
” আমি কোনো বোকা প্রেমিকা নই রিক। আমাকে তুমি যতটুকু দহনের আগুনে জ্বলিয়েছিলে তার সামান্য যে তোমাকে আমিও জ্বালাতে পারি তার একটি উদাহরণ দিলাম কেবল। ”
রিকার্ডো হাত বাড়িয়ে আনাস্তাসিয়াকে টেনে কাছে আনে। একহাত তার কোমরে রেখে আরেক হাত দিয়ে চুলগুলো কানের পিছনে গুজে দিতে দিতে বলে উঠে,
” এজন্যই তুমি আমার হৃদয় হরণ করতে পেরেছো নাসিয়া। তুমি কখনোই আমার সামনে নত হও নি। আমাকে ভালোবেসেও আমার সামনে কখনো নিজেকে লুটিয়ে দেও নি। উল্টো আমার বুকে তলোয়ার চালানোর সাহস রাখো তুমি। আর আমার মুখ থেকে ভালোবাসি বলিয়েই দম নিয়েছো তুমি। ”
আনাস্তাসিয়া কিছু বলতে পারে না। সে কেবল সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রিকার্ডোর দিকে। রিকার্ডো নিজেই আবার বলতে থাকে,
” এই যাত্রা এতো সহজ হবে না নাসিয়া। এই যাত্রায় প্রতি পদে তুমি পথে আগুন এবং কাঁটা বিছানো পাবে। সেসব পাড়ি দেওয়ার সময় তুমি সবসময় আমাকে তোমার পাশে পাবে। কিন্তু এই যাত্রা শেষে গন্তব্যে পৌঁছে তুমি আমাকে পাবে নাকি তার নিশ্চয়তা আমি তোমাকে দিতে পারছি না। আমি ভ্যাম্পায়ার দেখেই যে ভাগ্য আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো এমন নয়। ভাগ্যের সামনে সবাইকে কখনো না কখনো নত হতে হয়। আর যদি কখনো এমন দিন আসে আমার বিশ্বাস আমার নাসিয়া সহজে ভেঙে পড়বে না। ”
আনাস্তাসিয়া এবার কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই রিকার্ডো এক আঙুল তার ওষ্ঠদ্বয়ের উপর রেখে তাকে চুপ করিয়ে দেয়। তারপর বলে উঠে,
” তুমি আমার জীবনে আসার আগে ভালোবাসা কেবল আমার কাছে একটি শব্দ ছিলো। কিন্তু এই শব্দটিকে আমার কাছে অর্থবহ তুমি করেছো। সেজন্য আজ তোমাকে আমি একটা সত্যি জানাবো। আমার সত্যি, আমার জীবনের সত্যি, এই সাম্রাজ্যের সত্যি। ”
আনাস্তাসিয়া প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রিকার্ডোর দিকে। রিকার্ডো শান্ত স্বরে বলে উঠে,
” আমার আসল পরিচয় হলো আমি রিকার্ডো আলবার্ট। কাউন্ট লিও আলবার্ট এবং কাউন্টেস ম্যারি আলবার্টের একমাত্র সন্তান। এই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী। ”
বিস্ময়ে আনাস্তাসিয়ার মুখ হা হয়ে থাকে। লিও এবং ম্যারির ঘটনা জানেনা এমন খুব কম মানুষই আছে। আনাস্তাসিয়াও জানে। লোকমুখে সে শুনেছিলো মৃত্যুর সময় ম্যারি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তবে রিকার্ডোই সেই সন্তান? কিন্তু কিভাবে সম্ভব?
বাকরুদ্ধ আনাস্তাসিয়া কোনো প্রশ্ন করতে পারে না। ফ্যালফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে থাকে রিকার্ডোর দিকে। রিকার্ডো বুঝতে পারে আনাস্তাসিয়া বিস্মিত। অবশ্য বিস্মিত হওয়ারই কথা। তাই সে আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে নিচে একটি গাছের ডালের উপর বসায়। নিজেও আনাস্তাসিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। তারপর আনাস্তাসিয়ার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে উঠে,
” আমি জানি তোমার কাছে এটা অবিশ্বাসকর লাগতে পারে। আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারি নি যখন আমি প্রথম এটা শুনি। কিন্তু সব জেনে বিশ্বাস করতে বাধ্য হই। ”
আনাস্তাসিয়া বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
” কিন্তু দূর্গে তো আমি তোমার মা বাবাকে দেখেছি। ক্যামিলো, ড্যানিয়েল তারা তোমার মা বাবা না? আর ম্যাথিউ সে তোমার ভাই নয়? ”
” ড্যানিয়েল আমার বাবা নয় নাসিয়া। উনার স্ত্রী ক্যামিলো আমাকে গর্ভে ধারণ না করলেও আপন সন্তানের মতো ভালোবাসেন। আর ম্যাথিউ উনাদের আপন সন্তান। এটা সত্যি যে আমার আর ম্যাথিউর কখনো স্বাভাবিক ভাইদের মতো সম্পর্ক ছিলো না। কিন্তু তবুও ওকে আমি নিজের ভাই মানি। ওর প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। ”
আনাস্তাসিয়ার মাথা ঘুরে আসছে। সে রিকার্ডোকে বলে,
” আমাকে শুরু থেকে সব খুলে বলো। ”
রিকার্ডো সবকিছু আনাস্তাসিয়াকে খুলে বলে। ম্যারি এবং লিওর পরিণতি শুনে আনাস্তাসিয়ার চোখে অশ্রু জমা হয়। আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর হাত জোড়া শক্ত করে ধরে প্রশ্ন করে,
” সব জেনে তুমি কিভাবে শক্ত আছো রিক? ”
রিকার্ডোর গলা ধরে আসে এতক্ষণ সব বলতে গিয়ে। তবুও নিজেকে শক্ত রেখে সে বলে উঠে,
” কারণ আমি দূর্বল হয়ে পড়লে শত্রুরা আমার সুযোগ নিবে। আর আমি কখনো কাউকে সুযোগ দেই না নাসিয়া। ”
রিকার্ডো উপরে শক্ত থাকলেও অন্তরের অন্তঃস্থলে কতটুকু কষ্ট জমিয়ে রেখেছে তা অনুমান করতে পারে আনাস্তাসিয়া। সে কিছু বলার আগেই রিকার্ডো বলে উঠে,
” এখন আমি তোমাকে যা বলবো তা এর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নাসিয়া। মন দিয়ে শুনবে। ”
আনাস্তাসিয়া মনযোগ দিয়ে তাকায় রিকার্ডোর দিকে। এর চেয়েও বেশি জরুরি আর কি কথা হতে পারে? রিকার্ডো গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,
” সেই রাতে তোমাকে জ্যাকসন মারার চেষ্টা করেছিলো মনে আছে? ”
আনাস্তাসিয়া হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। রিকার্ডো বলে,
” জ্যাকসন একজন নেকড়ে মানব। যে আরোণের নেকড়ে পাল থেকে পালিয়ে বেরিয়েছে। সে ক্ষমতার লোভে পড়েছে। তার ইচ্ছা সে একসাথে নেকড়ে এবং ভ্যাম্পায়ারের শক্তি হাসিল করে হাইব্রিড হয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু হাইব্রিড হওয়ার জন্য তার কাছে দুইটা পথ খোলা আছে কেবল। প্রথমটা হলো হয় আমি তাকে ভ্যাম্পায়ার হওয়ার শক্তি প্রদান করবো এবং দ্বিতীয়টা হলো কোনো ভ্যাম্পায়ার নারীর গর্ভে তার সন্তান আসা। এই দুটির একটিও আমি কখনোই হতে দিবো না। এটা সে বুঝতে পেরেছে। তাই সে তার পরিকল্পনা বদলেছে। এখন তার উদ্দেশ্য আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয় বরং আমাকে হত্যা করা। কারণ আমি তার পথের কাঁটা। ”
এতটুকু শুনতেই আনাস্তাসিয়ার মনে অজানা ভয় হানি দেয়। জ্যাকসনের সেদিন তাকে অপহরণ করার পিছনে কারণ ভাবতে গিয়েও তার শরীর ঘৃণায় রি রি করে উঠে। আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
” কিন্তু তোমার এই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হওয়ার সাথে জ্যাকসনের কি সম্পর্ক? ”
” জ্যাকসন জেনে গিয়েছে আমি কাউন্ট লিও আলবার্টের সন্তান। ”
আনাস্তাসিয়া দু’হাতে নিজের হা হয়ে যাওয়া মুখ ঢেকে উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করে,
” কিভাবে? ওই নেকড়ে তোমার আসল পরিচয় কি করে জানলো? ”
রিকার্ডো সাবলীল স্বরে জবাব দেয়,
” ড্যানিয়েল জানিয়েছে ওকে। ”
আনাস্তাসিয়ার এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে তার মাথায় পরপর অনেকগুলো বাজ পড়ছে যেন। সে জীবনে কখনো একসাথে এতবার চমকে নি। অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
” কেন? কাউন্ট লিও তো তোমাকে উনার কাছে আমানত সরূপ দিয়েছিলেন। তবে উনি এই কাজ কেন করবেন? ”
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে ড্যানিয়েল এবং ম্যাথিউর তাকে ঘৃণা করার কারণ এবং ড্যানিয়েলের উদ্দেশ্য খুলে বলে। সব শুনে আনাস্তাসিয়া চাপা আর্তনাদ করে বলে,
” কিন্তু এতে তোমার দোষ নেই রিক। ম্যাথিউর এই জীবনের জন্য কোনো ভাবেই তুমি দায়ী হতে পারো না। ড্যানিয়েলের কেবল এই কারণে তোমাকে ঘৃণা করা সমীচীন নয়। তুমিও তখন শিশু ছিলে। ”
” অনিচ্ছাকৃত স্বত্তেও ম্যাথিউ আমার কারণেই এই জীবন পেয়েছে নাসিয়া। আর ড্যানিয়েল যখন ম্যাথিউকে এই সব জানায় তখন ম্যাথিউও বাচ্চা ছিলো। ওর মনে ধীরে ধীরে আমার এবং মায়ের প্রতি ঘৃণার বীজ বুনে ড্যানিয়েল চেয়েছিলো ম্যাথিউকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু হলো হিতে বিপরীত। ম্যাথিউ দিনশেষে নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিলো। ও এখন কোনো কিছুর পরওয়া করে না। নিজের মতো একা থাকতেই বেশি পছন্দ করে ও। ”
আনাস্তাসিয়ার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে আনমনে। সে রিকার্ডোর চোখে তাকিয়ে থাকে। এতক্ষণ অকপটে নিজের জীবনের ভয়ংকর সত্যগুলো কি সহজে বলে ফেললো সে। তবুও একটি বারের জন্য রিকার্ডোর চোখে মৃত্যু ভয় দেখেনি আনাস্তাসিয়া। হয়তো যুগের পর যুগ ধরে ঘৃণা সহ্য করতে করতে এখন কোনো ভয়ই তার মনে কাজ করে না। আনাস্তাসিয়া দু’হাতে আলতো করে রিকার্ডোর মুখ ধরে। তারপর সামান্য ঝুকে রিকার্ডোর কপালে নরম তুলোর মতো ছোঁয়া এঁকে দেয়। রিকার্ডো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। তার মতো রক্ত পিপাসুকে কোনো রমণী ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নিচ্ছে বিষয়টা ভাবতেই তার নিজেকে সৌভাগ্যবান পুরুষ মনে হচ্ছে। আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
” তোমার এবং ম্যাথিউর কারো দোষ নেই এতে। না তুমি এই জীবন স্বাচ্ছন্দ্যে পেয়েছো আর না ম্যাথিউ এই জীবন চেয়েছিলো কোনদিন। ভাগ্যের পরিক্রমায় তুমি জন্মেছো ভ্যাম্পায়ার হয়ে এবং ম্যাথিউকে জন্মানোর সাথে সাথেই ভ্যাম্পায়ার বানানো হয়েছে। যদি কারো দোষ থেকে থাকে তবে সেটা ড্যানিয়েলের যে তোমাদের দুই ভাইয়ের মাঝে ঘৃণার বীজ রোপণ করেছে। ”
রিকার্ডো আর এই বিষয়ে কথা বাড়ায় না। সে স্পষ্ট স্বরে বলা শুরু করে,
” তুমি নিশ্চয়ই শুনেছো কাউন্ট লোনেল এবং কাউন্টেস সিসিলিয়া খুন হয়েছে? এবং আগামী সাতদিন পর প্রিন্স ড্রাগোস সিংহাসনে বসবে? ”
আনাস্তাসিয়া মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানায়। পরপরই রিকার্ডো বলে উঠে,
” এই খুন জ্যাকসন এবং ড্যানিয়েল করেছে। তাদের লক্ষ্য যদি ক্ষমতা হয় তবে তারা কেবল আমাকে নয় প্রিন্স ড্রাগোসকেও খুন করবে। সেজন্য আমার বুখারেস্ট যাওয়া প্রয়োজন। এমনকি আমি কালই বুখারেস্টের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। এজন্যই আজ তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি এতো ভোরবেলায়। ”
আনাস্তাসিয়ার বুকে মোচড় দিয়ে উঠে। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে,
” তুমি না গেলে হয় না? ”
আনাস্তাসিয়ার নরম স্বরের আকুলতা শুনে রিকার্ডোরও যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু সে নিজেকে সাথে সাথে শক্ত করে ফেলে। কঠিন স্বরে বলে উঠে,
” সিংহাসন এখন আমার না হলেও সিংহাসনের প্রতি আমার কর্তব্য রয়েছে নাসিয়া। সিংহাসনে আমার অধিকার থাকলেও সেই সিংহাসন কখনো আমার হবে না। আমি আশাও করিনা। কিন্তু বর্তমানে যে এই সিংহাসনের ভবিষ্যৎ কাউন্ট তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জ্যাকসন এবং ড্যানিয়েলকে হত্যা করা আমি নিজের দায়িত্ব বলে অনুভব করছি। তাই তুমি আমায় বাধা দিও না দয়া করে। ”
রিকার্ডোর শেষ কথার পিঠে তাকে বাধা দেওয়ার আর সাহস করতে পারে না আনাস্তাসিয়া। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। আনাস্তাসিয়াকে উঠতে দেখে রিকার্ডোও উঠে দাঁড়ায়। রিকার্ডো দাঁড়াতেই আনাস্তাসিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
” বাধা দিবো না কিন্তু কথা দাও ফিরে আসবে। ”
রিকার্ডো কথা দেয় না। উল্টো কথা ঘুরিয়ে সে বলে উঠে,
” তোমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। ক্লক গায়ে জড়িয়ে বাসায় ফিরো। আরেকটা কথা, ওই ক্রুশের হার গলায় পড়ে থেকো আমি না ফিরে আসা পর্যন্ত। কোনো মূল্যেই গলা থেকে খুলবে না। ”
আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর চিন্তা বুঝতে পারে। তাই সে আর কিছু না বলে চুপচাপ ওর আলিঙ্গনে আবদ্ধ রয়।
জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাথিউ। তার সামনে একটি বন্য শিয়াল রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ম্যাথিউ নিজেই শিয়ালটিকে আঘাত করে আহত করে। এর শরীর থেকে প্রবাহিত রক্ত দেখে তার চোয়ালের সূচালো দাঁত দুটি বেরিয়ে আসে। তবুও সে কাছে গিয়ে সেই পশুটির রক্ত পান করে না। নিজের রক্ত পিপাসু স্বত্তাকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস। আনাস্তাসিয়ার যেন কখনো তার কারণে বিপদ না হয় এজন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি সে। প্রথম কয়েকদিন বেশ কষ্ট হলেও সে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। রক্তের প্রতি আসক্তি থাকলেও সে নিজের আসক্তিকে কখনো আনাস্তাসিয়ার উপরে প্রাধান্য দিবে না।
হঠাৎ পিছন থেকে কেউ ডেকে উঠে,
” ম্যাথিউ? ”
ম্যাথিউ চকিতে পিছনে ফিরে তাকায়। ক্যামিলো দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ক্যামিলো বেশ অনেকক্ষণ আগেই এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। ম্যাথিউকে পর্যবেক্ষন করে বুঝার চেষ্টা করছিলো সে কি করতে চায়। যখন দেখে সামনে রক্তাক্ত প্রাণী রেখেও ম্যাথিউ তার কাছে ঘেষছে না তখন তার বুঝার বাকি থাকেনা যে ম্যাথিউ নিজেকে সংবরণ করার প্রয়াস করছে।
ম্যাথিউ বিরক্তির সুরে প্রশ্ন করে,
” তুমি এখানে কি করছো? ”
” আমি শিকারের খোঁজে বেরিয়েছিলাম। পথিমধ্যে তোকে দেখে থেমে গেলাম। ”
ম্যাথিউ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” আমাকে দেখে থামার মতো কি হলো? ”
ক্যামিলো উত্তর দেয় না। তার বলতে ইচ্ছে করে না যে ম্যাথিউ এতক্ষণ যা করছিলো তা সে বুঝতে পেরেছে। ম্যাথিউ একবার সামনে তাকায় শিয়ালটার দিকে তারপর ক্যামিলোর দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
” শিকার যেহেতু খুঁজতেই এসেছো, সেহেতু এই শিয়াল তোমার জন্য রইল। আমি গেলাম। ”
ম্যাথিউ যেতে নিলেই ক্যামিলো তার পথ আটকায়। বিরক্ত হয় ম্যাথিউ। এসব অপ্রয়োজনীয় আদিখ্যেতা তার বোধগম্য হয় না। ক্যামিলো ম্যাথিউর কালো চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে উঠে,
” তুই হয়তো মানিস না কিন্তু আমি তোকে অনেক ভালোবাসি বাবা। তুই আমার নাড়ি ছেড়া সন্তান। তোর প্রতি আমার আবেগ, অনুভূতি সব অন্য রকম। এই অনুভূতি আমাকে একমাত্র তুই দিয়েছিস। নয় মাস তোকে পেটে নিয়ে প্রতি প্রহর আমি গুনতাম কবে তুই পৃথিবীতে আসবি। বিশ্বাস কর আমি যদি কখনো জানতাম যে আমাকে কখনো এই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে তাহলে আমি কখনো চাইতাম না তুই এই পৃথিবীতে আয়। ”
ম্যাথিউ এতক্ষণ চুপচাপ ক্যামিলোর কথা শুনছিলো। ক্যামিলো চুপ হতেই সে নিজের মাথা থেকে ক্যামিলোর হাত সরিয়ে বলে উঠে,
” তুমি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসতে তাহলে তুমি প্রয়োজনে আমাকে মৃত্যু দিতে তবুও এই পিশাচের জীবন নয়। ”
এটুকু বলেই ম্যাথিউ তীব্র বেগে সেখান থেকে চলে যায়। তার অসহ্যকর লাগে এরকম মিথ্যা ভালোবাসার কথা।
আরোণ শিকারে বের হয়েছে। ক্যাথরিন একা কক্ষে বসে থেকে বিরক্তি অনুভব করে। উঠে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসে সে। তার পিছু পিছু দুজন প্রহরী হাঁটছে। আরোণের কড়া নির্দেশ ক্যাথরিন যেখানেই যাবে এরা তার সাথে থাকবে। ক্যাথরিন জানে নিষেধ করে লাভ হবে না তাই সে মেনে নেয়৷ কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিচে নামতেই ক্রিনাকে দেখতে পায় ক্যাথরিন। ক্রিনা হেসে বলে,
” কি খবর নববধূ? ”
” বিয়ের দুদিন হয়ে গিয়েছে এখনো নববধূ বলছো? ”
” হ্যাঁ। গত এক শতাব্দীতে প্রথমবারের মতো বাসকোভ প্রাসাদে কোনো বিয়ে হয়েছে। এতো সহজে কি করে ভুলে যাই আমরা? ”
কথা বলার মাঝেই হঠাৎ করে ক্যাথরিন লক্ষ্য করে ক্রিনার চোখের মণির রঙ কালো। ক্যাথরিন চমকায়। ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
” তোমার চোখের মণির রঙ কালো? ”
ক্রিনা বলে,
” হ্যাঁ। ”
” তোমার চোখের মণি না উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের ছিলো? ”
” হ্যাঁ। সেটা আমাদের ওমেগা নেকড়েদের সকলেরই আছে। কিন্তু আমরা চাইলে মানব রূপে থাকা অবস্থায় আমাদের চোখের মণির বর্ণ স্বাভাবিক করতে পারি। ”
ক্যাথরিনের মাথা ঘুরে উঠে। সে এই জিনিস এতদিন কিভাবে লক্ষ্য করে নি। ক্যাথরিন ক্রিনাকে বলে নিজের কক্ষে ফিরে আসে। তার মনে পড়ে যায় মার্থার বলা কথা।
” আমি ওদের একজন হয়েও ওদের মতো নই ক্যাথরিন। আমি আজ পর্যন্ত কোনো মানব দেহকে খাদ্য হিসেবে গ্রহন করি নি। কাউকে হত্যা করি নি। সেটার প্রমাণ হচ্ছে আমার চোখ। কোনো ওমেগা জাতের নেকড়ে যদি কোনো মানুষকে হত্যা করে তবে তার চোখের মণির রঙ পরিবর্তন হয়ে উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ ধারণ করে। যতদিন কোনো ওমেগা নেকড়ে কোনো মানুষকে হত্যা না করবে ততদিন তার চোখের মণির রঙ সাধারণই থাকবে। ”
তারমানে মার্থা মিথ্যে বলে ছিলো। সে ক্যাথরিনের সামনে ভালো সাজার জন্য এই ভালো মানুষিকতার নাটক করেছে।
আরোণ প্রাসাদে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে নিজের কক্ষে ফিরে আসে। কক্ষে প্রবেশ করতেই সে দেখে ক্যাথরিন অন্যমনস্ক হয়ে গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন। আরোণ ক্যাথরিনের পাশে এসে বসে তবুও ক্যাথরিন খেয়াল করে না। আরোণ এবার সামান্য গলা খাকড়ি দেয়। সাথে সাথে ক্যাথরিন চমকে পাশে তাকায়। আরোণ প্রশ্ন করে,
” কি ভাবছিলে? ”
ক্যাথরিন জবাব না দিয়ে আরোণের চোখের দিকে তাকিয়ে রয়। আরোণের চোখের মণি রক্তিম নয় বরং স্বাভাবিক বাদামি রঙের। ক্যাথরিন মার্থার বলা সেই কথা একেবারে ভুলেই গিয়েছিলো। তাই তো এই জিনিস কখনো সে তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করে নি। আরোণ আবার ডাকে ক্যাথরিনকে। ক্যাথরিনের স্তম্ভিত ফিরে। সে বলে উঠে,
” আমার তোমাকে কিছু বলার ছিলো। ”
” কি সম্পর্কে? ”
” মার্থার সম্পর্কে। ”
ক্যাথরিন আরোণকে মার্থার বলা কথাটা বলে। পাশাপাশি মার্থা কিভাবে নেকড়েতে পরিণত হয়েছিল সেই কথাও জানায়। সব শুনে আরোণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
” মার্থা তোমাকে মিথ্যে বলেছে সব। আমার নেকড়ে পালের আমি ব্যতীত আর কেউই নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে নেকড়ে হয়নি ক্যাথ। সকলেই নিজের ইচ্ছায় এ জীবন গ্রহণ করেছে। আমার মার্থার প্রতি সন্দেহ ছিলো। কিন্তু কখনো কোন যুক্তিগত প্রমাণ পাইনি। জ্যাকসনকে যখন আমরা খুঁজছিলাম তখনও তার তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি। সেজন্যই ওকে আমি তোমার দায়িত্ব দেই। আমার বিশ্বাস ছিলো ও কোনো না কোনো ভুল করবে তোমার সামনে। ও সেটাই করেছে। ”
ক্যাথরিন আফসোসের সুরে বলে উঠে,
” আমি ওকে বিশ্বাস করেছিলাম। ভেবেছিলাম ও অন্তত ভালো। কিন্তু ও তার মানে জ্যাকসনের পক্ষেই ছিলো শুরু থেকে। ”
আরোণ আর কিছু বলেন না। ক্যাথরিনের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে সে। ক্যাথরিন কিছু না বলে আরোণের চুলে হাত বুলাতে থাকে। আরোণ চোখ বন্ধ অবস্থায় বলে উঠে,
মহাপ্রয়াণ পর্ব ৪১+৪২
” বিশ্বাস খুব দামী জিনিস ক্যাথ। এতো সহজেই কখনো কাউকে বিশ্বাস করবে না। অনেকেই তোমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তোমার পিঠে ছুড়ি মেরে চলে যাবে। তাই সবসময় বুঝে শুনে বিশ্বাস করবে। ”
ক্যাথরিন আরোণের কথার পিঠে আর কিছু বলে না। বিছানার পিছনে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রয়।
