মায়াবতী পর্ব ৩
ইসরাত জাহান ইকরা
সকাল হতেই দরজার তিব্র কড়াঘাতে ঘুম ভাঙলো মেঘার। চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠলো, কে খুলছি দরজা দাঁড়াও। দরজার ওপাশ থেকে আয়েশা বলে উঠলো _ তাড়াতাড়ি উঠ মেঘা, আজ তোকে আম্মা মেরেই ফেলবে।
সাথে সাথে মেঘার চোখের ঘুম উধাও হয়ে গেল। তড়িৎ গতিতে ছুটে গিয়ে দরজা খুললো। মেঘা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো _ কি হয়েছে আয়েশা, আমি কখন কি করলাম। আয়েশা বললো আম্মা বারন করেছিল না তোদের ওদের সাথে দেখা করতে, মেহমিদ ভাই দেখলো কীভাবে তোকে। এখন সকাল হতেই জেঠা জেঠি আর মেহমিদ ভাইয়ের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো মায়ের । মেঘার কাল রাতের কথা মনে পড়তেই চোখ বড় বড় করে ফেললো, আর মনে মনে ভাবতে লাগলো ওহ্,ওটা মেহমিদ ভাই ছিল। শুনেছি ওনার পড়াশোনা শেষ……. আর কিছু ভাবার আগেই আয়েশা মেঘা কে ধাক্কা মারলো। আচমকা ধাক্কায় মেঘার হুঁশ আসলে আয়েশা বলে উঠলো _ কি জিগ্যেস করছি তোকে।
মেঘা খানিকটা বিরক্ত সুরে বলে উঠলো _ একই বাড়িতে, একই ছাদের তলায়, লুকিয়ে থাকা আদেও সম্ভব। সেটা আজ না হয় কাল সামনে আসবেই। জানিনা চাচীর মাথায় কি ভুত চাপলো , কি আমাদের অপরাধ যে আমাদের সাথে এমন করছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আয়েশা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো _ বুঝেছি মেঘা, তুই আজকাল বেশি বার বেরে গেছিস। ভাগ্যিস সামনে এখন মা নেই তাহলে তোকে এখন আস্ত রাখতো না। আর চিন্তা করিস না, সামনের সপ্তাহে আমার বড় বোন বাসায় আসছে, যখন আগের মতো থাকবি তখন সব নীতি কথা তোর বের হয়ে যাবে। আর শুন তোদের নিচে ডাকছে,মাটি কে জাগিয়ে নিচে চলে আয়। এই বলে আয়েশা চলে গেল।।
আয়েশা চলে যেতেই মেঘা বিছানায় ধপ করে বসলো। এখন ফ্রেস হয়ে নিচে যেতে হবে। এখন আর লুকিয়ে চোরের মত থাকতে হবে না, ভেবেই মেঘা বড় একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো। ঘুমন্ত মাটির মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ মায়া হলো মেঘার, খুব ছোট থাকতে মা বাবা কে হাড়িয়ে মেয়েটা বড় হয়ে ও ছোটদের মতো আচরণ করে। মাটি কারো বকা ঝকা সহ্য করতে পারে না, কেউ বকা ঝকা করলে তার সাথে জীবনে ও কথা বলবে না। এইসব ভেবে মাটি কে ঝাঁকিয়ে ডাকতে লাগলো মেঘা_ আরু এই আরু উঠ, উঠে ফ্রেস হয়ে নিচে যেতে হবে।
মাটি ঘুমন্ত কন্ঠে বলে উঠলো _ উফফ আপু আমি আরেকটু ঘুমাবো। বিরক্ত করো না তো, আর নিচে যাওয়া মানা ।
মেঘা এবার বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো _ এই মাটি উঠতো,নিচে জেঠা জেঠি ডাকছে। চল তাড়াতাড়ি।
সাথে সাথে মাটি ধরফরিয়ে উঠে বসলো – আর বলতে লাগলো _ সত্যি, আমরা নিচে যাবো। ওদের সাথে দেখা করবো,চলো চলো । এই বলে মাটি দৌড়ে গিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল।
মেঘা ড্রয়ার থেকে ভালো একটা থ্রী পিচ খুঁজে নিলো পড়ার জন্য। শাড়ি পড়ে তো আর যাওয়া যাবে না। মাটি ফ্রেস হয়ে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নিল। সেই ফাঁকে মেঘা ফ্রেস হতে গেল।
এদিকে, উঠানে বসে রাহিমা বেগম সবজি কুটছে। মেহমিদের মা শায়লা বেগম, মেহমিদের বাবা মোশারফ হোসেন কে চা দিচ্ছে। শায়লা বেগম, রাহিমার উদ্দেশ্য বলে উঠলো _ এই বাড়িতে দুটো মেয়ে আছে, তারা আর কেউ না আমাদের ই আপনজন। অথচ আমরাই জানি না, আমাদের কে বললি না কেন রাহিমা ।
রাহিমা বেগম মনে মনে ভিশন বিরক্ত,আর বলতে লাগলো _ এই হতচ্ছাড়া কখন এদের সামনে আসলো কে জানে। এখন আমার একশ একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। রাহিমা বেগম আমতা আমতা করে বললো _ ইয়ে মানে ভাবী কীভাবে তোমাদের বলবো ভেবে পাই নি। ওদের কথা শুনে তোমরা কি রিয়েক্ট করবে বুঝতে পারিনি। আর ভাইজান তো শাহিনের প্রতি খুব রেগে ছিলো। ওদের মানবে কি না সেটা ও মনে ভয় ছিল। তাই ওদের কথা তোমাদের বলা হয় নি।
মেহমিদের বাবা মোশারফ হোসেন বললেন _ এটা তুমি কি বললে রাহিমা। আমাদের তো তুমি চিনোই, আমার ছোট ভাই শাহিন, একসময় অন্যায় করলে ও করেছে, সেই হিসেবে ওকে আমি কবেই ক্ষমা করে দিয়েছি, কিন্তু আফসোস ওর মরার খবর শুনে আসতে পারিনি কেননা আমি তখন বিজনেস এর কাজে দেশের বাহিরে ছিলাম। কিন্তু ওর যে দুইটা মেয়ে আছে জানতাম না,জানলে এখানে রাখতাম না। পারলে আমার জীবন দিয়ে ওদের জন্য যা যা করা লাগতো করতাম।
রাহিমা বেগম ভেতরে জ্বলে উঠলেন। আর মনে মনে বলতে লাগলেন _ আমি জানি তো। তাই তো তোমাদের জানাই নি, আমি আজকেই ওদের আমার বোনের বাড়ি পাঠিয়ে দিতাম। কিন্তু তার আগেই ওই মেয়েটা,,,দ্বাড়া মেয়ে তোর ব্যাবস্থা আমি করছি।
রাহিমা বেগম মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে উঠলো _ যাক আলহামদুলিল্লাহ। তবে আর কি, এখন আমি চিন্তা মুক্ত হলাম।
মেহমিদ মর্নিং ওয়াক শেষ করে, উঠানে চেয়ারে বসলো। নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। মেহমিদ শায়লা বেগমের উদ্দেশ্য বলে উঠলো _ মা আয়েশা কে বলো তো আমাকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দিতে।
তখনি উপরের দিকে দৃষ্টি গেল মেহমিদের, দেখলো মাটি দৌড়ে দৌড়ে আসছে, আর পিছনে মেঘা বলছে মাটি দৌড়াবি না বলছি পড়ে যাবি। মাটি দৌড়ে গিয়ে মোশারফ হোসেনের সামনে গিয়ে বললো _ জেঠু আসসালামুয়ালাইকুম। আমি আরিফা জামান মাটি, ।
মাটির এমন চঞ্চলতায় মোশারফ হোসেন হেসে ফেললেন, বললেন _এসো আমার কাছে এসে বসো। মাটি মুচকি হেসে মোশারফ হোসেনের পাশে গিয়ে বসলো। মোশারফ হোসেন বললেন _ তুমি হয়েছো আমার মায়ের মতো।
মাটি ফিক করে হেসে দিয়ে বললো _ আমার বাবা ও বলতো আমি নাকি দাদির মতো হয়েছি। আচ্ছা জেঠু দাদী কেমন ছিলেন। আমি তো দেখেনি।
মোশারফ হোসেন বললেন _ তোমার মতোই মিষ্টি, চঞ্চল আর মিশুক প্রকৃতির।
ততক্ষণে মেঘা সবার সামনে উপস্থিত, মেঘা সবার সামনে এসে সকলকে সালাম দিল। মোশারফ হোসেন, আর শায়লা বেগম তাকে কাছে ডাকলেন। মেঘা শায়লা বেগমের পাশে বসলো। শায়লা বেগম মাসাআল্লাহ বলে গলা থেকে চেইন খুলে মেঘা কে পড়িয়ে দিলো। মেঘা তো পুরো অবাক।
এদিকে রাহিমা বেগমের গা জ্বলে উঠলো, মেঘা কে স্বর্নের চেইন পরিয়ে দিলো বলে।
মেঘা আমতা আমতা করে বলে উঠলো _ জেঠি মনি এট আমি তো অনেক দামি চেইন। আমি এটা নিতে পারবো না।
শায়লা বেগম _ ধুর বোকা মেয়ে, বড় মেয়ে হিসেবে এটা তোমার প্রাপ্য। আর আমাকে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই ঠিক আছে।
মেঘা মাথা নাড়িয়ে মাথা সায় জানালো। মেঘার আজকে ভিশন আনন্দ লাগছে ,খুশিতে চোখের কোনে পানি জমে গেছে। কখনো মেঘা এতো আদর পাইনি এই বাসায় আসার পর থেকে।
শায়লা বেগম বললেন, হইছে আর দুঃখ করতে হবে না। মা বাবা মার গিয়েছে তো কি হয়েছে। আরো দুইজন মা বাবা আছে না। চলো তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। ওও হচ্ছে আমার বড় ছেলে মেহমিদ, বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসে ,এখন মাথায় ভুত চেপেছে সে পুলিশের জব করবে। কত করে বলেছি এসব না করতে, ওর বাবার এতো বড় একটা ব্যাবসা আছে,ওটা সামলাতে, কিন্তু কে শুনে কার কথা।
মেঘা এক নজর মেহমিদের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো। মেহমিদ আর মাটি আড্ডার আসর জমিয়ে ফেলেছে। এতোক্ষণে মেহমিদ আর আর মাটি গল্প করতে করতে হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠেছে। মাটি মেঘার সম্পর্কে মেহমিদ কে কি জেনো বলতেই
মেহমিদ ভ্রু কুঁচকে মেঘার দিকে তাকালো। সাথে সাথে মেঘা থতমত খেয়ে মাটির দিকে তাকালো।
শায়লা বেগম বললেন আমার আরেক ছেলে আছে বুঝছো, নাম মাহিদ, এবার অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। ওর মতো বাদড় পৃথিবীতে আর একটা ও খুঁজে পাবে না বুঝছো।
শায়লা বেগমের কথায় মেঘা বিনিময়ে সামান্য মুচকি হাসলো। তখনি রাহিমা বেগম বলে উঠলেন, মেঘা যা , তোর মেঝো জেঠা বাজার থেকে মাছ এনেছে এগুলো কেটে দিয়ে আয়।
মেঘা সোফা থেকে উঠতেই, মেহমিদ বললো মেঘা রান্না ঘর থেকে আমার জন্য এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে আয় তো।
সাথে সাথে মেঘা থমকে দাঁড়ালো,মেহমিদের সাথে কখনো কথা হয় নি, মেহমিদ যেভাবে বললো যেমন যনম জনমে একে অপরকে চিনে। কি সুন্দর করে তুই তুই করে ফরমাস দিলো।
মেঘা কোনরকম নিজেকে সামলে নিয়ে _ যাচ্ছি বলে রান্নাঘরের থেকে পানি এনে দিলো।
তখনি রাহিমা বেগম _ আবারো বলে উঠলেন, পানি দেওয়া শেষ এখন দাঁড়িয়ে না থেকে কাজে যা।
তখনি মেহমিদ আবারো বলে উঠলো _মেঘা দুটো বরফের টুকরো এনে দে তো। পানি মুটে ও ঠান্ডা না।
মেঘা এবার মনে মনে বলতে লাগলো _ আরেহ ইনি তো চরম ফাজিল। বাধ্য হয়ে মেঘা গ্লাস নিয়ে বরফের টুকরো আনতে গেল।
তখন মেহমিদ শায়লা বেগমের উদ্দেশ্য বলে উঠলো _ মা তোমার বাদড় ছেলে নাকি আমাদের গ্ৰামের রাস্তা ভুলে গেছে, সামনের রাস্তায় ঈদগাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, বললো কাউকে পাঠিয়ে দিতে।
শায়লা বেগম _ মাহিদ এসব নাটক করছে বুঝছিস,, বাসার কাউকে খাটাতে এমন করছে, নিশ্চয়ই লাকেজ নিয়ে আসছে। ওকে বল ওর চালাকি আমরা ধরে ফেলেছি, যদি না চিনে তবে বল গুগল ম্যাপের সাহায্যে চলে আসতে।
মেহমিদ বললো _ তোমার আদরের ছেলে বলে কথা।( বলেই ঠোঁট কামড়ে হাসলো)
মাটি বললো _ আচ্ছা মেহমিদ ভাইয়া, তোমার ছোট ভাই যে মাহিদ ওনি কি সত্যিই ফাজিল।
মেহমিদ ভ্রু উঁচু করে বলে উঠলো _ হুম, অনেক ফাজিল। ওর থেকে সাবধানে থেকো, তোমার মতো পিচ্চি মেয়েদের বোকা বানাতে খুব ভালোভাবে।
মাটি মনে মনে বলতে লাগলো _এ্যাহ, আমার থেকে ও ফাজিল নাকি। একবার এখানে পা রাখুক তারপর আমিই এরে বোকা বানাবো।।( এই বলে মাটি উপরে চলে গেল)
একটু পর মেঘা পানি নিয়ে আসতেই, মেহমিদ বলে উঠলো, আমি এখন পানি খাবো না। আমার জন্য এক গ্লাস কফি নিয়ে আমার রুমে আয়। এই বলে হনহন করে মেহমিদ উপরে চলে গেল।
এদিকে বোকার মতো মেঘা দাঁড়িয়ে রইলো।
একটু পরেই বাইক নিয়ে ফুল স্পিডে মাহিদ গেট পেরিয়ে উঠানে প্রবেশ করলো।
মাথা থেকে হেলমেট খুলে বাইক থেকে নেমে রাহিমা বেগম কে জরিয়ে ধরে বলে উঠলো _ কেমন আছো কাকিয়া। শরীর ভালো, কাকা কেমন আছে।
রাহিমা বেগম বললেন _ আরে ছাড় ছাড় মাহিদ রান্না করতে হবে, তোর কাকা উপরে আছে যা দেখা করে আয়।
মাহিদ _ আগে ফ্রেস হয়ে আসি তারপর একে একে সবার সাথে দেখা করবো। এই বলে শার্টের হাতা গুটিয়ে লাকেজ নিয়ে উপরে চলে গেল মাহিদ।
মায়াবতী পর্ব ২
উপরে গিয়ে নিজের জন্য একটা রুম বাছাই করে নিজের রুমে প্রবেশ করতে যাবে তখনি কেউ বলে উঠলো_ এই বেডা, এই রুমে প্রবেশ করবি না, করলে আজকে রাতে তোর গাঁড় মটকে দেব।
সাথে সাথে মাহিদের ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেললো। কার এতো বড় সাহস মাহিদের সাথে মজা নেয়।
