Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৮

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৮

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৮
jannatul firdaus mithila

“ তুই স্বেচ্ছায় ছুঁয়ে দিচ্ছিলি! তাই আর ডিস্টার্ব করিনি।”
সপ্তদশীর বিভ্রম লেপ্টানো হরিণী চোখদুটো তৎক্ষনাৎ একযোগে নিক্ষিপ্ত হলো সুদর্শনের মুখপানে। যুবক নিরুত্তাপ! বাদামী চোখদুটোতে আচ্ছন্নতার ঘোর। সে ঘোরে হারিয়ে যাবার ভয়ে, মায়াবিনী তক্ষুনি নজর সরালো। কন্ঠার কাছে চিবুক ঠেকিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“ আপনি কি পা গ ল?”

অস্ফুট বাক্যটুকু বেশ শুনল মাফিয়া বিস্ট। পরপরই দাঁত বসালো নিজ নিম্নাংশের অধরে। ডানহাতের তিনটে আঙুল এখনো ভিজে আছে লহুর স্পর্শে। যুবক আনমনে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল সেথায়। আঙুল তিনটায় যেন এখনো লেপ্টে আছে মেয়েটার মুখগহ্বরের স্বাদ। রুক্ষ আঙুলের ফর্সা চামড়ায় দগদগ করছে মায়াবিনীর কামড়ের দাগ! যুবক কেমন বোধহীনের ন্যায় তাকিয়ে আছে। মনের কোণে তার হুট করেই উত্থাপিত হয়েছে এক অদ্ভুত পাগলামি! যে পাগলামির জেরে আসক্ত মুগ্ধ! চট করে আহত আঙুলগুলো একযোগে ঢুকিয়ে দিলো নিজ মুখগহ্বরে। আবেশে চোখদুটো বুঁজে নিয়ে অনুভুব করল — মাহি’র মুখগহ্বরের স্বাদ! ওদিকে নতজানু সপ্তদশী! আনমনে উঁচু করেছে ঘাড়। ঠিক তখনি যুবকের ওমন উদ্ভট কান্ড দেখে কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাঁজ স্পষ্ট হলো মানবীর। সিটকে গেল নাক! বিরাগ কন্ঠে সে তক্ষুনি বলে বসল,

“ এ কি করছেন আপনি? ব্যথা হলে অয়েন্টমেন্ট লাগান! এভাবে নিজের র ক্ত নিজে খেলে আদৌও কাজ হবে?”
সহসা অক্ষিপুটের পর্দা সরে গেল রূঢ় মানবের। ভেঙে গেল আচ্ছন্নতার ঘোর! চোখদুটোর গভীর দৃষ্টি ফের তাক হলো সপ্তদশীর মুখপানে। মাহি তক্ষুনি নজর ঘোরায় অন্যত্র। বিতৃষ্ণায় খানিক নড়েচড়ে যুবকের কোল থেকে উঠতে চাইলেই ফের চাপ বাড়ল লতানো কোমরে। যুবক জোর বাড়িয়েছে হাতের। খামচে ধরেছে মেয়েটার বাঁকান কোমর। সহসা মৃদু ব্যথায় মুখ কুঁচকে নেয় সপ্তদশী। চোখেমুখে অবাধ বিতৃষ্ণা লেপ্টে আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সুদর্শনের পানে। কপট ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কি সমস্যা? খেলাম তো খাবার। এবার ছাড়ুন আমায়!”
যুবক তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর করেনি। উল্টো গম্ভীর মুখে এক হেঁচকা টানে মাহি’কে টেনে আনল আরও সন্নিকটে। মাহি হতভম্ব! স্রেফ হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া করতে পারলো না আরকিছু। এদিকে র ক্ত মাখা আঙুলগুলো খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে টেবিল থেকে একখানা গরম দুধের গ্লাস তুলে এনে, আলতো করে মেয়েটার মুখের সামনে এগিয়ে ধরেছে মুগ্ধ। গম্ভীর মুখে আদেশ ছুঁড়ল,

“ নে তারাতাড়ি সবটা শেষ কর।”
কপাল গোছায় মাহি। একবার মুগ্ধের মুখপানে, তো আরেকবার দুধের গ্লাস পানে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ফেলে আচমকা জিজ্ঞেস করল,
“ ব্যাপারটা কী? আজ এতো খাতিরযত্ন করে খাওয়াচ্ছেন যে? মতলবটা কী শুনি?”
বাঁকা হাসল রূঢ় মানব! বাড়ন্ত দুধের গ্লাসটা মাহি’র মুখের কাছে আরেকটু এগিয়ে ধরে, রহস্যময় কন্ঠে রাশিয়ান ভাষায় আওড়াল,
“ পেরেদ তেম কাক পাইমাৎ কুরিৎসু, ও নিয়ো নুঝনা খারাশো পাঝাবোতিৎসা। ইনাচে ইই বুদিয়েত ত্রুদনা পাইমাৎ।”
( মুরগী শিকার করার আগে খাতিরযত্ন করা লাগে। নাহলে শিকার করতে অসুবিধে হয়।)
বোধগম্যহীনতার ছাপ ফুটল সপ্তদশীর মুখাবয়বে। দৃষ্টি হলো চৌকস! তা যেন আড়দৃষ্টে বেশ দেখল মুগ্ধ। পরপরই সে কেমন গম্ভীর মুখে কপট ঝাঁঝ নিয়ে বলল,

“ তোর ঐ ছোট্ট মস্তিষ্কে চাপ দেয়ার কোনো দরকার নেই সিগনোরা! আপাতত যা দিচ্ছি তা চুপচাপ খেয়ে নে।”
“ সিগনোরা মানে কী?”
কথার পিঠে এহেন পাল্টা প্রশ্নে কপাল গোছায় মুগ্ধ। গম্ভীর মুখে তক্ষুনি হাত থেকে নামিয়ে রাখল দুধের গ্লাসটা। পরক্ষণে গমগমে গলায় বলল,
“ বান্দীর মেয়ে!”
সহসা মুখাবয়বে ঝাঁঝ লেপ্টে গেল মাহি’র! তার মানে এতদিন ধরে সবাই তাকে এ নামে ডাকছে? লোকটা বলতো বলতো, তার সঙ্গে সবাই ওমন তাল মিলিয়ে বলা শুরু করল? সপ্তদশীর রাগ বাড়ল ভীষণ। সে তক্ষুনি মুখ ঝামটি মে’রে বলে উঠল,
“ এক্ষুণি আমায় কোল থেকে নামান!”
রূঢ় মানব তা-ই করল। আলগোছে নামিয়ে দিলো ক্ষুদ্র চড়ুইকে। ছাড়া পাওয়া মাত্রই চড়ুই ছুটল! গটগট পায়ে চলে গেল ডাইনিং ছেড়ে। এদিকে তার চলে যাওয়ার পথে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মুগ্ধ! দৃঢ় চোয়ালখানা শক্ত করে ফুটিয়ে দাঁত খিঁচে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,

“ একটা দেড়ফুট বান্দীর মেয়ে’র এতো তেজ!”
কথাটা বলেই বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সুদর্শন। দাম্ভিক কদমজোড়ার ধুপধাপ শব্দে প্রস্থান ঘটালো ডাইনিং থেকে। শক্ত মুখে কয়েক-কদম সম্মুখে এগোতেই আচানক কোত্থেকে যেন প্রজাপতির ন্যায় ছুটে এলো সপ্তদশী! হাঁপাতে হাঁপাতে পথ রোধ করে দাঁড়াল যুবকের। মুগ্ধ গম্ভীর! দৃঢ় চোয়ালখানা বড্ড শক্ত তার। বাদামি চোখজোড়া সংকুচিত! মেয়েটা পথরোধ করে দাঁড়ালেও যুবক থামল না। উল্টো মাহি’কে একপ্রকার উপেক্ষা করে গটগটিয়ে চলে গেল পাশ কাটিয়ে। তার এহেন কান্ডে হতবিহ্বল মাহি! তক্ষুনি ছুট লাগাল মুগ্ধের পিছুপিছু। পেছন থেকে ডেকে ডেকে বলল,
“ এই বিস্ট! শুনুন!”
বাক্য কর্ণধার হওয়া স্বত্বেও থামেনি মুগ্ধ। উল্টো জোরালো করল দাম্ভিক কদমজোড়ার গতি! ধুপধাপ শব্দে বিশাল সিঁড়ি দু’টোয় পা রাখতেই আচানক পেছন থেকে তার ওভারকোটের একপাশ টেনে ধরে মাহি। ব্যগ্র কন্ঠে বলে ওঠে,
“ বিস্ট শুনুন শুনুন! একটা রিকুয়েস্ট! প্লিজ কিউটিকে এনে দিন না।”

কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল রূঢ় মানবের ব্যস্ত পদযুগল! দাম্ভিকতার ভারে উঁচু হয়ে থাকা ঘাড়ের পেশিটুকু সামান্য বাঁকিয়ে, যুবক কেমন ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটার পানে। পরপরই চোয়ালের পেশি আর-ও খানিকটা টানটান করে গর্জন তুলে বলল,
“ ঐ বান্দীর ছেলেকে আবার আনতে হবে কেনো? আমার পেন্টহাউজে ঐসব বুলশিটের কোনো জায়গা নেই! সো ফা’ক অফ দিস ননসেন্স সিগনোরা। আমায় রাগাস না!”
আঁতকে উঠে মাহি। নাছোড়বান্দার ন্যায় যুবকের ওভারকোটের একাংশ আঁকড়ে রেখে পাদু’টো সামান্য এগিয়ে এনে দাঁড়াল এক সিঁড়ির ওপরে। পরক্ষণে কেমন নাক টানতে টানতে মিনমিনিয়ে আওড়াল,
“ প্লিজ এভাবে বলবেন না! ও আমার….”

বাকিটা শেষ হবার পূর্বেই অতর্কিত আক্রমণের শিকার হলো বেচারি! নির্দয় যুবকের শক্তপোক্ত রুক্ষ হাতের হিং স্র থাবা আচানক আঁকড়ে ধরল মেয়েটার নরম তুলতুলে সুদীর্ঘ গ্রীবাদেশ। এহেন হুটহাট কান্ডে হকচকায় মাহি। নিশ্বাস আঁটকে সম্মুখে তাকাতেই দেখল — মুগ্ধ কেমন ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। মাহি ভয়ার্ত ঢোক গিলল কোনরকম। ওদিকে হাতের জোর বাড়িয়ে মুগ্ধ কেমন কটমট কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ আরেকবার শুধু আমি বিনে অন্য কাওকে ‘ আমার ’ বলার স্পর্ধা করে দেখ বান্দীর মেয়ে! আমার মৃ ত মায়ের কসম কেটে বলছি, তোর ঐ জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলব। আই সয়্যার, আমি ছিঁড়ে ফেলব। ইন দ্যাট কেস, সারাটাজীবন বোবা নিয়ে কাটানোর ক্ষমতা আমার আছে!”
ভয়ে কাঁপছে মাহি! থোড়াই বুঝল সুদর্শনের এহেন কথার গভীরার্থ! মুগ্ধ কটমট করছে বেশ! কটমট করতে করতে করতে আচমকা ফের গর্জন তুলে বলল,

“ বল আর কোনদিন কোনকিছুকে ‘ আমার ’ বলবি?”
তড়াক মাথা নাড়ায় মাহি! তা দেখতে পেয়ে তক্ষুনি এক ঝটকায় মেয়েটার চোয়াল ছেড়ে দেয় মুগ্ধ। মাত্রাতিরিক্ত রাগে গজগজ করতে করতে তৎক্ষনাৎ সরে গেল সিঁড়ি থেকে। এদিকে মাহি এবার কেঁদেই বসল! ঠোঁট ভেঙে বাচ্চাদের ন্যায় কাঁদছে বেচারি। যে কান্নার শব্দে আনমনেই থমকে দাঁড়িয়েছে মাফিয়া বিস্ট! না চাইতেও ফিরে তাকাল ক্রন্দনরত মেয়েটার পানে। আশ্চর্য! বুকটা আবার কাঁপছে কেনো তার? বান্দীর মেয়ে কান্না করলে করুক। তাতে তার কী?
মস্তিষ্কের বিরূপ প্রতিবাদেও ফের পিঠ দেখিয়ে চলে যেতে পারলেন না শ্যাডো মনস্টার! উল্টো গম্ভীর মুখে নিজ অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা ঘুরিয়ে চলে এলেন মেয়েটার সম্মুখে। ক্রন্দনরত মাহি! দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে। দেখেনি মুগ্ধের আগমন। রূঢ় মানবের শক্তপোক্ত হাতখানা আচানক নিশপিশ করছে। একবার প্রায় উঠে আসতে চাইলো মেয়েটার মাথার ওপরে, তবে পরমুহূর্তেই তা আবার কি মনে করে গুটিয়ে গেল দেখো! মুগ্ধ কেমন দিকবিদিকশূন্য! এদিক-ওদিক নিজ অস্থির দৃষ্টিযুগল খানিক লুকিয়ে গলা খাঁকারি দিলো সামান্য। অতঃপর গম্ভীর মুখে শুধালো,
“ কান্না থামা সিগনোরা!”

মুখমন্ডল থেকে হাত সরায় মাহি। ছলছল দৃষ্টি নিয়ে তাকাল রূঢ় মানবের পানে। সে দৃষ্টির অন্তরালে দৃষ্টি আঁটকাতেই থমকে গেল রূঢ় মানবের কনক্রিটের আস্তরণে ঢেকে থাকা হৃদয়খানা। কন্ঠায় নামল শুষ্কতা! মুগ্ধ তক্ষুনি নিজের দৃষ্টি সরালো অন্যত্র। মুখগহ্বরে সিক্ত জিভখানা ভার হয়েছে তার। অন্তরের কথা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন। তবে মাফিয়া বিস্ট শক্ত মানুষ! তড়াক গুরগুট্টে কন্ঠে আওড়ালেন,
“ গার্ডদের বলে দিচ্ছি! তোকে নিয়ে যাবে প্যালেসে। দেখে আয় ঐ বান্দীর ছেলেকে। তবে খবরদার, ও যেন আমার পেন্টহাউজে না আসে।”
বলেই রূঢ় মানব আর একমুহূর্তও সেথায় দাঁড়াল না। তক্ষুনি গটগট পায়ে চলে যেতে তৎপর হলো। ফের দু’টো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ গার্ডস! আত্বিয়েদিত্যে সিনইওরু ভা দ্বারিয়েৎস স দোলঝনিম উভাঝেনিয়েম।”
“ সিগনোরাকে সসম্মানে নিয়ে যা প্যালেসে।”

আদেশ পাওয়া মাত্রই হাওয়ার বেগে ছুটে এলেন বেশক’জন গার্ড। মাহি তাদের পানে ঘুরে তাকাতেই সে যেন হোঁচট খেল! ক’টা আফ্রিকান লোক! সে-কি অন্ধকার তাদের মুখ। পাহাড়ের মতো দেহ, চোখে কালো চশমা, হাতে রাইফেল! লোকগুলোকে আপাদমস্তক পরোখ করে শুকনো ঢোক গিললো মাহি। তড়িঘড়ি করে ভয়ে ছুটে গেল সিঁড়ি বেয়ে। ত্রস্ত কদমে চলন্ত মুগ্ধের পানে এগিয়ে এসে ফের পেছন থেকে আঁকড়ে ধরল সুদর্শনের ওভারকোট! ভয়ে তটস্থ কন্ঠে আওড়াল,
“ আমি ওদের সাথে যাব না বিস্ট! আপনি আমায় নিয়ে চলুন না।”
থামল মুগ্ধ! ঘাড় বাকিয়ে শক্ত চোখে তাকাল মেয়েটার পানে। কঠিন গলায় ঝাঁঝ ঢেলে আওড়াল,
“ ওদের সাথে গেলে যা, না গেলে না যা! আমি পারব না নিয়ে যেতে। আমি বিজি নাউ!”
বলেই মুগ্ধ পা বাড়ায় সম্মুখে। তবে মাহি আজ বড্ড নাছোড়বান্দা। তক্ষুনি আলতো করে আঁকড়ে ধরল রূঢ় মানবের ডানহাতের রুক্ষ পিংকি আঙুলখানা। এবারে থমকায় মুগ্ধ! আলগোছে ঘাড় নামিয়ে তাকাল নিজ হাতের দিকে। দেখল — তার শক্তপোক্ত আঙুলখানা কি সুন্দর করে চেপে রেখেছে একখানা তুলতুলে হাত! হাতের মালকিন বড়ো অসহায় কন্ঠে আওড়াল,

“ আমার ওদের দেখলে ভয় করছে বিস্ট! আপনি চলুন না।”
হতবাক চোখে তাকিয়ে রইল মুগ্ধ! হতবিহ্বলের ন্যায় দু’টো সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে দাঁড়াল মাহি’র মুখোমুখি। পরপরই সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ ওদেরকে দেখলে ভয় লাগছে তোর? আমাকে ভয় লাগে না?”
সদ্য কান্না থামানো সপ্তদশী! নাকের ডগাটা টুকটুক করছে লালিমায়। যুবকের এহেন কথার প্রতিত্তোরে মেয়েটা কেমন নাক টেনে টেনে নিষ্পাপ কন্ঠে শুধালো,
“ লাগে! তবে একটু একটু! খুব বেশি না।”
এহেন নিষ্পাপ প্রতিত্তোরে থমকালো মাফিয়া বিস্ট! যাকে ভয় পায় গোটা আন্ডারওয়ার্ল্ড, তাকেই কি-না খুব বেশি ভয় পায় না এক সপ্তদশী! যুবক অলক্ষ্যে বিমুগ্ধতায় নিরব হাসল। শক্তপোক্ত হাতখানা উঁচিয়ে এনে আলগোছে মুছে দিলো সপ্তদশীর সিক্ত কপোল। গম্ভীর অথচ কপট রাগ নিয়ে বলল,
“ ভীষণ জ্বলাচ্ছিস সিগনোরা! তবে আমি যেদিন শুরু করব, সেদিন আর কোনো থামাথামি হবে না।”
কথাটা বোধগম্য হয়নি মাহি’র। তার পূর্বেই যুবক নিজ গা থেকে একটানে ওভারকোটটা খুলে এনে জড়িয়ে দিলো মাহি’র গায়ে! মাহি হতবাক। যুবকের গা এখন উম্মুক্ত। কি করতে চাইছে সে? এদিকে মুগ্ধ তক্ষুনি একহাতে কাঁধে তুলে নিলো মাহি’কে। অতঃপর আর কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই মেয়েটাকে নিয়ে পা বাড়াল উল্টোপথে!

তীব্র তুষারপাতে আচ্ছন্ন চারপাশ! গায়ে ওতোকিছু জড়িয়ে রেখেও থরথর করে কাঁপছে মাহি। অথচ রূঢ় মানব কেমন উদোম গায়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে এগোচ্ছে। মাহি এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার কৌতূহলী কন্ঠে বলেই ওঠে,
“ আপনার ঠান্ডা লাগছে না?”
“ তুই থাকতে ঠান্ডা লাগে না-কি!”
“ মানে?”
এপর্যায়ে বাঁকা হাসল মুগ্ধ! পরক্ষণেই দুষ্ট কন্ঠে জবাব দিলো,
“ তুই ইদানীং পার্সোনাল হিটারের কাজ করছিস! আশেপাশে থাকলেই র ক্ত গরম হয়ে যায়। এপর্যায়ে কি করা যায় বল তো? ইন্টিমেট হতেও তো এখনো সময় লাগবে!”
মুখ কুঁচকায় মাহি। অভ্যন্তরে ফিসফিস করে বলে,
“ ঘাট হয়েছে আমার এ লোকের সাথে কথা বলে!”

মধ্যরাত থেকে স্নোফল হচ্ছে! তীব্র তুষারপাতে ফের ঢেকে গিয়েছে প্যালেসের চারপাশ। গায়ের ওপর মোটাসোটা একখানা ব্ল্যাঙ্কেট চেপে, ফায়ারপ্লেসের সম্মুখে বসে আছে মাহি। তার নরম কোলের উষ্ণ আমেজে গা গুটিয়ে বসে আছে কিউটি মহাশয়! পোহাচ্ছে আগুনতাপ। সপ্তদশীর নরম আঙুলের ডগা ধীরে ধীরে ছুঁয়ে দিচ্ছে পশমি ছানার তুলতুলে মাথা। এরইমধ্যে কক্ষের দ্বার থেকে ভেসে আসে এক সুপরিচিত কমলিনী কন্ঠ!
“ আসবো মুনলাইট?”
সহসা দৃষ্টি তুলে ডাকের উৎসের পানে তাকায় মাহি। দেখে — মিলা কেমন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। মাহি তৎক্ষনাৎ মুচকি হাসল। ওপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে পরপরই কোমল কন্ঠে বলল,
“ আমার ঘরে আসার জন্য নতুন করে অনুমতি নেবার প্রয়োজন পড়ল কেন মিলা? তোমার যখন ইচ্ছে তুমি আসতে পারো।”
স্মিত হাসে মিলা। নিরব সম্মোহে পাদু’টো সম্মুখে বাড়িয়ে বলতে লাগল,
“ কেমন আছো তা-ই বলো! আমিতো ভেবেছিলাম, তুমি আর আসবেই না।”
সপ্তদশী শান্ত! ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসির রেশ ঝুলিয়ে আলগোছে তাকাল ফায়ারপ্লেসের দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের পানে। খানিকক্ষণ সময় নিয়ে অতঃপর আওড়াল,

“ এমনটা ভাবার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো জোরালো কারণ রয়েছে! তা কারণটা কী বলা যাবে?”
চমৎকার হাসল মিলা! পাদু’টো এগিয়ে এনে গুটিয়ে বসল ফায়ারপ্লেসের বড্ড নিকটে। নিজ উদ্যোগে পাশে থাকা ছোট ছোট কাঠের টুকরো গুলো জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মাঝে ছুঁড়তে ছুঁড়তে আওড়াল,
“ পেন্টহাউজে যাওয়ার সাধ্যি যেমন কারোর নেই, ঠিক তেমনি — পেন্টহাউজ থেকে জীবিত বেরিয়ে আসার সাধ্যিও কারোর নেই। সে হিসেবে ভেবেছিলাম…. ”
“ আমি আর ফিরব না! তাই তো?”
মাহি’র পাল্টা উত্তরে মৃদু হেসে মাথা ঝাঁকায় মিলা। নিরবে জানায় — হ্যা-সূচক প্রতিত্তোর। তা দেখে বুক চিঁড়ে দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এলো সপ্তদশীর। মুখে নামলো রাজ্যের আঁধার! সম্পূর্ণ কক্ষে আরেকবার ডুবল পিনপতন নীরবতার ঘোরে। মিলা আগ বাড়িয়ে তেমন কিছুই বলছেনা আজ। মেয়েটা কেমন স্বেচ্ছায় দৃষ্টি লুকচ্ছে মনে হচ্ছে! এদিকে আদুরে পৌষ্য ছানার গায়ে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে মাহি কেমন ভারী কন্ঠে আচানক শুধালো,

“ আচ্ছা মিলা! একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“ হুম অবশ্যই!”
“ বিস্ট আই মিন, মনস্টার একজন মাফিয়া তাই তো? তাহলে সে সর্বক্ষণ প্যালেসে নয়তো পেন্টহাউজে বসে থেকে কি করে? তার কোনো কাজ-কর্ম নেই?”
সহসা হতবুদ্ধির ন্যায় ঘাড় উঁচিয়ে তাকায় মিলা। মেয়েটার মুখাবয়বে সে-কি হতভম্ব ভাবস্রোত! কন্ঠে একরাশ হতবাকতা নামিয়ে আওড়াল,
“ আর ইউ্য কিডিং উইদ মি মুনলাইট? কাজকর্ম নেই বলছো?”
থতমত খেয়ে বসল মাহি। কৌতুহলতার বশে ভুল কিছু বলে বসল নাকি? মেয়েটা পরপরই নিজেকে শুধরালো। খানিক আমতা আমতা করে বলতে লাগল,
“ না মানে বলছিলাম… তাকে তেমন কোথাও যেতে দেখিনা, তাই আরকি!”
এহেন কথায় কিয়তক্ষন থম মে’রে বসে থাকলেও পরক্ষণেই গা দুলিয়ে হেসে ওঠে মিলা! হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড়ি খাবার উপক্রম বেচারির। তা দেখে গাল ফোলায় সপ্তদশী! নাকের পাটা ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেলল কড়া। তরুণী হাসির মাঝেই আড়দৃষ্টে অবলোকন করল মেয়েটার এরূপ মুখভঙ্গি। পরক্ষণেই জোরপূর্বক কোনমতে গিলে নিলো নিজ উপচে পড়া হাসিটুকু। অভিমানিনীর রাগ ভাঙার উদ্দেশ্যে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে আওড়াল,

“ হেই মুনলাইট! রাগ করলে?”
নাকের পাটা আবারও ফুললো মাহি’র। তক্ষুনি কিউটিকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। মিলার দিকে পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়াতেই তরুণী কেমন উদ্বিগ্ন হলো। ব্যগ্র ভঙ্গিমায় নিজেও চটপট উঠে দাঁড়ালো। পরমুহূর্তে মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল,
“ সরি মুনলাইট! আসলে তোমার কথাটাই ছিল এমন, যার পরিপ্রেক্ষিতে না হেসে পারলাম না। যাইহোক, শোনো! মনস্টার এই প্রথমবার তার কোনো প্যালেসে টানা ১মাস ৭দিন কাটিয়েছে। এর আগে তিনি কখনোই রাশিয়া বলো, সাউথ কোরিয়া বলো কিংবা স্পেন বলো — কোত্থাও একনাগাড়ে এতদিন থাকেননি। তিনি আসেন, তবে একরাত, দু-রাত কিংবা মাঝেমধ্যে বড়জোর ৪দিন থাকতেন। এই যা! আর তাছাড়া তিনি তো কোনো মাফিয়া বস কিংবা গ্যাংস্টার নন।”
তৎক্ষনাৎ শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ায় মাহি। চোখদুটো সামান্য কুঁচকে, মুখাবয়বে সন্দিগ্ধতার ছাপ ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে,

“ মানে? তাহলে কে সে?”
মৌন মিলা! সপ্তদশীর পানে চাইলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টে। ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে পরপরই গম্ভীর মুখে শুধালো,
“ হি ইজ দ্য কিং অফ মাফিয়া’স! আন্ডারওয়ার্ল্ডের পরিধি বড্ড বড় মুনলাইট। এই জগতে হাজারো গ্যাংস্টার কিংবা মাফিয়া বস থাকলেও কিং কেবল একজনই। যার হুকুম তামিল করা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক। বাই দ্য ওয়ে — ডিড ইউ্য এভার হিয়ার্ড এবাউট সুইট পয়জন মুনলাইট?”
অবোধ্য কায়দায় না-বোধক মাথা নাড়ায় মাহি। তা দেখে মুচকি হাসে মিলা। পদযুগল সম্মুখে বাড়িয়ে বিজ্ঞ কন্ঠে আবারও বলে ওঠে,
“ ভাগ্যিস জানো না! জানলে হয়তো এতদিনে কফিনে থাকতে। সুইট পয়জন হচ্ছে রুশদী কিং ওরফে শ্যাডো মনস্টারের ট্যাগ! এই একটা নামই বহন করে তার সম্পূর্ণ হিং স্র পরিচয়। তাছাড়া মনস্টারের নিজে থেকে কোনকিছু করবার দরকারটাই বা কী? যার একটা ইশারায় কাজ করছে লক্ষাধিক গ্যাংস্টারস! তিনি শুধু মাথা খাটান। নিজ রাজ্যত্বের আধিপত্যে বসে কুট-কৌশল চালান ব্যস। বাকিটা তার দু’হাত — অর্থাৎ এডউইন এবং এলেক্সই করে ফেলে। তবে কোনদিন যদি মনস্টারের নিজে থেকে কোথাও যাওয়া হয় তাহলে বুঝে নিতে হবে — কারোর মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে।”
শুষ্ক ঢোক গিলছে মাহি! কাঁপছে থরথর করে। আড়দৃষ্টে তা অবলোকন হওয়া মাত্রই বাঁকা হাসে মিলা। রহস্যময় কন্ঠে বলে ওঠে,

“ রুশদী কিংয়ের আধিপত্যের নমুনা শুনেই এভাবে কাপছ মুনলাইট? যদি কোনদিন উনার কাজকর্ম স্বচক্ষে দেখে ফেলো তখন? তখন কি করবে?”
ভয় বাড়ল মাহি’র! তক্ষুনি ফের পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়াল মেয়েটা। অলক্ষ্যে শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে কদম এগোলো জানালার দ্বারে। আনমনে কৌতুহলতাবশত ফের জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ ইজ হি আ রেড ফ্ল্যাগ?”
“ ডোন্ট নো! হতেও পারে! তার যা হিং স্র তা!”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই বুকটা ধ্বক করে উঠল মাহি’র। বিতৃষ্ণায় কুঁচকে গেল মুখ। এরই মাঝে মিলা আবারও সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কেনো বলোতো?”
কদমে গতি টানল মাহি। এগোলো কাউচের পানে। কিউটির গায়ে অনবরত হাত বুলিয়ে, তিতিবিরক্ত কন্ঠে শুধালো,
“ ইউ্য নো হোয়াট মিলা? ছোট বেলা থেকেই আমি ভীষণ বইপোকা মেয়ে। এতো এতো বই পড়েছি! তবে বরাবরই আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দের মেল-ট্রোপ ছিল — রেড ফ্ল্যাগ চরিত্রগুলো। আমি সবসময় ভাবতাম — এসব রেড ফ্ল্যাগ এন্ড অল দিস আর জাস্ট আ বুলশিট! এসব বাস্তবে এক্সিস্টই করে না। অথচ…”
“ অথচ?”

মিলার সন্দিহান কন্ঠ! দাঁড়িয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায়। তবে কি মনে করে মেয়েটা আনমনে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল পেছনে। আর ওমনি কক্ষের দরজার সম্মুখে দন্ডায়মান মনস্টারকে দেখে আঁতকে উঠে বেচারি। তক্ষুনি ঝোঁকালো নিজ নেত্রদ্বয়। বাধ্যতায় নতজানু হয়ে সামান্য কুর্নিশ জানিয়ে, মিলা তক্ষুনি উদ্যোত হলো কক্ষ ত্যাগ করতে। এদিকে দন্ডায়মান মুগ্ধ! শক্ত চোয়ালে তেজীয়ান ভাবভঙ্গি নিয়ে তাকিয়ে আছে সপ্তদশীর পানে। অথচ মেয়েটার থোড়াই খেয়াল আছে সেদিকে! সে-তো মত্ত নিজ কথার জালে। মাহি ফের ঠোঁট নাড়ালো। অতিষ্ঠ কন্ঠে আওড়াল,
“ অথচ দূর্ভাগ্য দেখো! এ পুরো দুনিয়ায় প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ থাকা স্বত্বেও, শেষমেশ কিনা আমায় বন্দী হতে হলো একটা খাটাশ রেড ফ্ল্যাগের প্যালেসে! কপালললল! যার ঐটা মুখ না বোম, তা আল্লাহই ভালো জানেন। যখনি কথা বলবে, মনে হবে বোমা ফাটাচ্ছে! মাঝেমধ্যে আমার কি মনে হয় জানো মিলা? আমার মনে হয় — খাটাশটার জন্মের সময় কেউ তার মুখে মধু দেয়নি। আই মিন, তার কথা না যেন একেকেটা কুড়ালের কোপ! কি ধারররর!”
শেষটুকু সুর টেনে টেনে বলল মাহি। তা শুনে রূঢ় মানব কেমন দাঁত কিড়মিড় করছে দেখো! নিরবে কদম বাড়াচ্ছে মেয়েটার দিকে। এই ফাঁকে আপন জান বাঁচিয়ে পগারপার মিলা। তাকে আর পায় কে? ওদিকে মাহি এখনো বলে যাচ্ছে! কপালে শনি লাগানোর পূর্ব মুহুর্তে আনমনেই আওড়াচ্ছে,

“ তবে আর যা-ই বলো! মনস্টারকে হতে হবে মনস্টারের মতো। ঘৃণ্য, হিং স্র! অথচ বিস্টের চোখদুটো দেখেছো? সবকিছু যেমন-তেমন, তবে তার চোখদুটো সুন্দর। ঠিক নাহ?”
থমকায় মুগ্ধ! মুহূর্তেই যুবকের মুখাবয়ব থেকে এতক্ষণের সকল বিরক্তিকর ভাবস্রোত মিলিয়ে গেল বাতাসের ঝাপটায়। সেথায় ভর করল একরাশ বিমুগ্ধতা। কর্ণকুহরে মেয়েটার বলা শেষ কথাটা ফের বেজে উঠতেই ঠোঁট কামড়ে নিরব হাসল রূঢ় মানব। ঘাড়টা সামান্য কাত করে, দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে আলগোছে এসে দাঁড়ালো মাহি’র বড্ড নিকটে। অতঃপর নিজ চিরচেনা গুরুগম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ কতটুকু সুন্দর? বিস্টের বিউটিকে কাবু করার জন্য যথেষ্ট তো?”
আঁতকে ওঠে মাহি! সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে তক্ষুনি। কেঁপে ওঠার দরুন বেচারা কিউটি হুট করেই খসে পড়ল মেয়েটার বাহুডোর থেকে। এদিকে হতভম্বতায় সপ্তদশী তড়াক পেছনে ঘুরতেই আচানক ধাক্কা খেল পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষের সনে। আর ওমনি হকচকায় সে। ঘাড়ের মাংসল পেশীটুকু কুঁচকে তৎক্ষনাৎ ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল রূঢ় মানবের পানে। যুবক গম্ভীর! চোখদুটোর চাহনি ক্ষীণ। মাহি কেমন ভয়ে ভয়ে কদম পেঁছাচ্ছে। আমতা আমতা করে বলছে,
“ আ-আপনি? ক-খন এলেন?”
“ যখন তুই আমার বদনাম করছিলি!”

ফের শুকনো ঢোক গিললো মাহি! খরা নামল কন্ঠায়! যুবকের ওমন অদ্ভুত স্থির চাহনি দেখে ভয়ে অন্তরাত্মা বেরিয়ে যাবার উপক্রম বেচারির। তবুও নিজেকে সামলালোর সুরে সে কেমন কপট ভাব ধরে শুধালো,
“ আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার কথা শুনছিলেন?”
যুবকের পাদু’টো ধীরে ধীরে এগোচ্ছে মেয়েটার দিকে। দু’হাত তার বুকের কাছে ঠায় বেঁধে রাখা। ঘাড়টা আগের ন্যায় কাত! মুখাবয়বে গম্ভীর ভাব ধরে রেখে, মুগ্ধ খানিক গমগমে গলায় প্রতিত্তোরে বলল,
“ উঁহুম! তোকে দেখছিলাম!”
মুগ্ধের সোজাসাপ্টা উত্তর! যার পিঠে বলার মতো কথা গোছাতে সময় লাগছে মাহি’র। ভয়ডরে ভয়ার্ত বেচারি কথা গুলিয়ে ফেলছে বোধহয়। চোখের দৃষ্টি মেঝেতে ফেলে কদম পেছাতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো রূঢ় মানবের তীক্ষ্ণ কন্ঠ!
“ কি যেন বলছিলি তখন? জন্মের সময় আমার মুখে মধু দেয়া হয়নি তাইতো?”
তড়াক চোখ তুললো মাহি। বিরাট এক ঢোক গিলে নিজেকে শুধরে নেবার ন্যায় পরক্ষণেই বলল,

“ এই না না না! আপনি… না মানে আমি..না মানে আপনি!”
কথাটা শেষ হবার ফুরসত পেলো না বেচারি। তার পূর্বেই সুদর্শনের শক্তপোক্ত একখানা হাত এসে আচানক আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম বাঁকান কোমর! এক হেঁচকা টানে মেয়েটাকে নিজের বুকের কাছে টেনে আনতেই, সপ্তদশীর পাদু’টো হলো দোদুল্যমান! এহেন কান্ডে ভড়কায় মাহি! অস্বস্তিতে মোচড়াতে লাগল সাপের ন্যায়। অথচ কান্ড দেখো! মুগ্ধ কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে মেয়েটাকে একহাতে তুলে রেখেছে। তার নড়চড় বাড়তেই যুবক কেমন বাঁকা হেসে আচমকা বলে ওঠে,
“ জন্মের সময় মধু খাওয়ায়নি তো কি হয়েছে? তুই তো আছিস। তুই নাহয় এখন খাইয়ে দিবি!”
হতভম্ব মাহি! হতবুদ্ধির ন্যায় মোচড়ানো থামিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল রূঢ় মানবের পানে। চোখেমুখে একরাশ অবোধের ছাপ ফুটিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় আওড়াল,
“ মানে? আমি কোত্থেকে মধু আনব এখন?”
তৎক্ষনাৎ ঠোঁট কামড়ে হাসল মুগ্ধ। ধীরে ধীরে নিজ গভীর দৃষ্টিযুগল আলতো করে নামিয়ে আনলো মেয়েটার তিরতির করে কাপত্রয়ী নরম তুলতুলে অধরযুগল পানে। সঙ্গে সঙ্গে নিজ সুদীর্ঘ কন্ঠনালীর উঁচু হাড়খানা সামান্য নাড়িয়ে ঢোক গিলল মুগ্ধ। সেদিকে চেয়ে রইল তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায়। মাহি ভ্রু গোটায়। যুবকের দৃষ্টি অনুসরণ করতেই বুঝে গেল সবকিছু। মুহূর্তেই তেতেঁ উঠল মানবী। ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়াল,

“ কি দেখছেন আপনি অসভ্য লোক? এক্ষুণি আমায় নিচে নামান বলছি।”
মেয়েটার এহেন তেজী কন্ঠে ঘোর ভাঙল মুগ্ধের। সদ্য সম্বিৎ ফেরার ন্যায় দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকাল মেয়েটার মুখপানে। সপ্তদশী সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে। নাকের পাটা ফুলে হয়েছে দ্বিগুণ! গালদুটোয় ছেয়ে গিয়েছে লালিমা। এক অবাধ আকর্ষণে মেয়েটার এহেন রূপ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে রূঢ় মানবকে। সে আবারও ঘোরে পা রাখল! দিনদুনিয়া ভুলে জোর বাড়াল হাতের। সঙ্গে সঙ্গে চ্যাপ্টে গেল মাহি। পিষ্ট হতে লাগল নির্দয় মানবের রুক্ষ বক্ষভাজের সনে। মুগ্ধ মুখ এগোচ্ছে। সাপের ন্যায় মোচড়াতে থাকা মাহি, তা অবলোকন করা মাত্রই কুঁচকে নিলো মুখ। দু’হাতে যথাসম্ভব ঠেলতে লাগল রূঢ় মানবকে। অথচ বালাইষাট! লোকটা থোড়াই টললো। বেচারি আর কোনরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে ফুপিয়ে উঠল। ভয়ে চিবুক নামালো কন্ঠার কাছে। এদিকে সপ্তদশীর ফোপাঁনোর স্বর কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই কপাল গোছায় মুগ্ধ। বিরক্ত কন্ঠে দাঁত খিঁচে বলে উঠল,
“ একটা কিসে কেউ ম’রে যায় না বান্দীর মেয়ে! আ’ম জাস্ট প্রিপেয়ারিং ইউ্য!”
সহসা কান্নার বেগ বাড়ল মাহি’র। তা দেখে রাগ যেন তরতর করে বেড়ে গেল মুগ্ধের। মেয়েটাকে নিজের সঙ্গে আরেকটু পিষে নিয়ে কঠিন ধমকের সুরে বলল,

“ কান্না থামা বান্দীর মেয়ে! নাহলে এক্ষুণি জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিব বলে দিলাম।”
তৎক্ষনাৎ কান্না থেমে গেল মাহি’র। ছলছল চোখদুটো নুইয়ে রেখে নাক টানল খানিকটা। মুগ্ধ চিড়বিড় করছে! তক্ষুনি মেয়েটাকে বুক থেকে নামিয়ে দিয়ে দাঁড় করালো নিজ সম্মুখে। একহাতের রুক্ষ চাপায় আলগোছে চেপে ধরল মাহি’র নরম তুলতুলে গ্রীবাদেশ। অতঃপর চিড়বিড়িয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ আর জীবন যৌবন নষ্ট করার জন্য তোর মতো একটা দেড়ব্যাটারীই যথেষ্ট বুঝলি! একটু ধরতে এলেই ছাগলের মতো ভ্যা ভ্যা শুরু করে দিস। এই তুই কি বুঝিস না আমার কেমন লাগে? না-কি ইচ্ছে করে করছিস সবটা? বাই দ্য হেল ইন দা মনস্টার’স ওয়ে — রিমেম্বার ওয়ান থিংক, আর ১৪দিন পর যখন কাছে আসব, তখন তুই কাঁদতে কাঁদতে ম’রে গেলেও তোকে আমি ছাড়ব না। মাথায় রাখিস বান্দীর মেয়ে!”
যত্রতত্র নিজেকে সামলে নাক টানলো মাহি। হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে আলগোছে মুছে নিলো নিজ সিক্ত চোখদুটো। ঠিক তখনি গম্ভীর পুরুষ, মেয়েটার বাহু ছেড়ে দিয়ে গমগমে গলায় গর্জে বলল,

“ পেছনে ঘুরে দাঁড়া!”
হকচকায় মাহি। বেভুলার ন্যায় তাকায় সম্মুখে। ছলছল দৃষ্টিজোড়ায় এক আকাশসম সন্দিগ্ধতা ঢেলে শুধালো,
“ কে-কেনো?”
তক্ষুনি চোখ পাকায় মুগ্ধ! শক্ত চোয়ালখানা কটমট করতেই আঁতকে উঠে মাহি। ত্বরিত পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়ায় সে। রাগান্বিত হিং স্র মানব গজগজ করছে। রাগের পারদ তরতর করে বাড়ার পূর্বেই নিজেকে শান্ত করবার অভিনব কৌশল অবলম্বনে মত্ত হলেন রূঢ় মানব। একহাতে আলগোছে মেয়েটার ঘাড় থেকে সরিয়ে দিলো সবগুলো চুল! এহেন কান্ডে যারপরনাই অবাক মাহি। তড়াক নড়েচড়ে উঠতেই পিঠ বরাবর খোঁচা খেল ধাতব নল জাতীয় কিছুর। সন্দিগ্ধতায় কপাল কুঁচকায় মাহি! ঠোঁটদুটো নাড়িয়ে যেইনা কিছু বলবে তার আগেই কর্ণকুহরে পৌঁছাল রূঢ় মানবের শান্ত অথচ রাগী কন্ঠ!
“ জাস্ট একবার নড়ে দেখ! পরমুহূর্তেই রিভলবারের সবগুলো গু লি তোর ক্ষুদ্র বদনে ছুঁড়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করব না আমি।”

তৎক্ষনাৎ শীরঁদাড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল বেচারির। দেহ হলো অনড়! পারছেনা নিশ্বাসটা অবধি আঁটকে ফেলতে। এদিকে মুগ্ধ নিজ কাজে তৎপর। শক্ত মুখে মেয়েটার ঘাড়ের পাশ উম্মুক্ত করে, সেদিকে মুখ এগিয়ে আনতেই মানবী কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াল,
“ আপনি আবারও এসব করছেন?”
মুগ্ধ তেজীয়ান! কেবল চিড়বিড়িয়ে বলল,
“ রাগানোর আগে মনে থাকে না বান্দীর মেয়ে?”
ঢোক গিললো মাহি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। রূঢ় মানব ধীরে ধীরে নিজ রুক্ষ বাদামী অধরযুগল আলতো করে ছোঁয়াল সপ্তদশীর মসৃণ ঘাড়ের ত্বকে। তার উষ্ণ নিঃশ্বাসের প্রতিটি ঝাপ্টা যেন এক অদ্ভুত আধিপত্যে দোল খাচ্ছে বেচারির ঘাড়ের চারপাশে। তার এহেন উষ্ণ ছোঁয়ায় সর্বাঙ্গে ঝংকার বয়ে যাচ্ছে মাহি’র। মেয়েটা তক্ষুনি কুঁচকে নিলো নিজ চোখমুখ। যুবক সময় নিলো! ভীষণ সংযত যত্নে চুমু খেলো মেয়েটার ঘাড়ে। একবার, দুবার পরপর তিনবার! আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে — এরূপ কান্ডে যুবকের মাত্রাতিরিক্ত রাগে মুহুর্তেই ভাটি পড়েছে যেন। কি সুন্দর করে শান্ত হয়েছে সে। চুমুর বদলে এবার নাক ঘষছে মেয়েটার ঘাড়ে। সে অবাধ স্পর্শে কুপোকাত মাহি! নিজ পরনের জামার একাংশ খামচে ধরে তৎক্ষনাৎ কেঁপে উঠল মেয়েটা। যুবক বোধহয় টের পেলো তা। সপ্তদশীর পিঠ বরাবর তাক করে রাখা বন্দুকের শীতল নলটা ধীরে ধীরে মেয়েটার মাথার ওপর উঠিয়ে এনে আওড়াল,

“ উমম! শুভ কাজে যাব এখন। লো ফিল হচ্ছে, সো ডোন্ট মুভ সিগনোরা।”
ফের থমকাল মেয়েটার হৃদয়! থমকাল তার চারপাশ! ছলছল চোখদুটো আচমকা সরিয়ে দিলো নিজেদের পর্দা। আগুনের পরশে বরফ এলে যেমন গলতে বাধ্য, ঠিক তেমনিভাবে গলে যাচ্ছে বেচারি! যুবকের ওমন বিগলিত কন্ঠে গলে যাচ্ছে তার পাহাড়সম ঘৃণার দেয়াল। মেয়েটা যত্রতত্র নিজেকে সামলালো। অভ্যন্তরের অনুভুতিগুলো এককোণে আবদ্ধ রেখে কপট ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়াল,
“ কি এমন শুভ কাজে যাচ্ছেন শুনি? যার জন্য আবারও আমাকে ছুঁতে হচ্ছে!”
যুবক থামল এপর্যায়ে। ধীরে ধীরে মুখ সরালো মেয়েটার কাঁধ থেকে। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“এজ ইউ্যজুয়াল! একজনকে কফিনে বন্দী করতে যাচ্ছি!”
আঁতকে উঠে মাহি। তৎক্ষনাৎ বেভুলার ন্যায় ঘুরে তাকায় যুবকের পানে। চোখেমুখে আতঙ্ক লেপ্টে বলে ওঠে,

“ কিহ? আপনি কি পা গ ল? আবার কাকে মার*তে যাচ্ছেন নির্দয় লোক?”
চোখদুটো ক্ষীণ হলো মুগ্ধের। মুখটা ঝুঁকিয়ে আনলো মাহি’র মুখের ওপর। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টেনে, গমগমে গলায় আওড়াল,
“ তুই আমার কাছে কৈফিয়ত চাচ্ছিস কোন সাহসে?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৭ (২)

মুখ নামায় মাহি! আতঙ্কে মেয়েটার মুখ ধরেছে র*ক্তশূন্য ভাব। সে কেমন অস্ফুটে বলল,
“ এতোটা নির্দয় হবেন না বিস্ট!”
“ ইউ্য নো হোয়াট সিগনোরা? ফা’ক ইউ্য!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৮ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here