মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪১
ঐশী রহমান
সময় যেন থমকে গেছে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে। জানালার ফাঁক গলে আসা বিকেলের ম্লান আলোটুকুও যেন এই মুহূর্তের ভার সইতে না পেরে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ধারার পায়ের নিচে যেন মাটি নেই। বুকের ভেতরটায় কে যেন সজোরে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। কান দুটো ভোঁ ভোঁ করছে। ওয়াসিফের বলা শেষ কথাগুলো বারবার ইকো হচ্ছে তার মস্তিষ্কে— “দেশের দায়িত্ব আগে। সামির, প্যাকিং শুরু করো। আমরা কাল ভোর পাঁচটায় বের হচ্ছি।”
যে মানুষটা মাত্র আধা ঘণ্টা আগে তাকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার কথা বলছিল, যে মানুষটা তাকে কথা দিয়েছিল আর কখনো তাকে ওই ভয়ংকর একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেবে না, সেই মানুষটা এত বড় একটা মিথ্যে বলল? চাকরি ছাড়ার মিথ্যে?
ওয়াসিফ স্থির দৃষ্টিতে ধারার দিকে তাকিয়ে আছে। তার শক্ত চোয়াল আরও শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু চোখের ভেতর একটা অপরাধবোধ স্পষ্ট। সামির আর লুইপা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে চুপচাপ সেখান থেকে সরে গেল। তারা জানে, এই মুহূর্তে স্বামী-স্ত্রীর মাঝখানে তৃতীয় কারও থাকাটা অনুচিত।
ধারা এক পা, দু’পা করে পিছিয়ে গেল। তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই। সে কিছুই বলল না, কোনো চিৎকার করল না, শুধু ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে নিজেদের ঘরের দিকে ছুটে গেল।
ওয়াসিফ একটা গভীর শ্বাস ফেলল। তার মনে হচ্ছিল বুকটা ফেটে যাবে। সে জানত, এই দিনটা আসবে। সে জানত, সত্যটা একদিন না একদিন ধারার সামনে আসবেই। কিন্তু এভাবে এত তাড়াতাড়ি, এত আকস্মিকভাবে আসবে, সেটা সে ভাবেনি। সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মণমণের মতো ভারী।
ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। ওয়াসিফ আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। দেখল, ধারা বিছানার এক কোণে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। তার মুখটা দুই হাতের তালুতে ঢাকা। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। কান্নার দমকে তার পুরো শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। গলায় ঝুলে থাকা সোনার চেইনের ‘W’ লকেটটা বিকেলের আলোয় তখনো চিকচিক করছে, যেন ওয়াসিফের অস্তিত্বের এক নীরব সাক্ষী হয়ে ধারার বুকের কাছে লেপ্টে আছে।
ওয়াসিফ ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। বিছানায় ধারার পাশে বসে খুব সাবধানে তার কাঁধে হাত রাখল। কিন্তু ধারা সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে সরে গেল।
“আমাকে ছোঁবেন না!” ধারার গলাটা ভাঙা, কিন্তু তাতে মিশে আছে রাজ্যের অভিমান আর রাগ। “একদম ছোঁবেন না আমাকে। মিথ্যুক! আপনি একটা মিথ্যুক!”
ওয়াসিফ শান্ত গলায় বলল, “মুমতাহিনা,আমার কথাটা একবার শোন…”
“কী শুনব?” ধারা মুখ থেকে হাত সরিয়ে ওয়াসিফের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল। “আর কী মিথ্যে শোনানো বাকি আছে আপনার? আপনি আমাকে বলেছিলেন আপনি ইউনিফর্ম ছেড়ে দিয়েছেন। বলেছিলেন, ওই ভয়ংকর রাতগুলোর পর আপনি আর কখনো আমাকে একা ফেলে ওই বিপদের মাঝে ঝাঁপ দেবেন না। আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন ওয়াসিফ! আর আজ… আজ শুনছি কাল ভোরেই আপনি চলে যাচ্ছেন? কেন করলেন এমনটা আমার সাথে? কেন এই মিথ্যে আশা দিলেন আমাকে?”
ওয়াসিফ মাথা নিচু করে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর হঠাৎ করেই ধারার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরল। ধারা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। ওয়াসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে ধারা থমকে গেল। সেই কঠোর, পাষাণ মেজরের চোখে আজ পানি টলটল করছে।
“কী করতাম আমি, মুমতাহিনা ? তুই বল, কী করতাম?” ওয়াসিফের গলাটা অস্বাভাবিক ভারী শোনাল। “সেদিন যখন তোকে ওই ভয়ংকর লোকগুলোর হাত থেকে উদ্ধার করে আনলাম, তোর কী অবস্থা ছিল মনে আছে? রাতের পর রাত তুই দুঃস্বপ্নে চিৎকার করে উঠতি। আমার গায়ে ইউনিফর্ম দেখলে তুই ভয়ে কুঁকড়ে যেতি। তোর ওই আতঙ্কিত মুখটা আমি সহ্য করতে পারতাম না। একজন স্বামী হিসেবে নিজের স্ত্রীর ওই ভয়ংকর ট্রমা চোখের সামনে দেখাটা যে কতটা যন্ত্রণার, সেটা তুই বুঝবি না। আমি শুধু চেয়েছিলাম তুই সুস্থ হয়ে ওঠ। তুই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আয়। তুই আমাকে বলেছিস, আমি যদি আবার মিশনে যাই, তবে তুই মরে যাবি। আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম মুমতাহিনা । তাই মিথ্যে বলেছিলাম। হ্যাঁ, আমি অপরাধী। কিন্তু আমার এই অপরাধের পেছনে শুধু তোর প্রতি আমার ভালোবাসাটাই ছিল।”
ধারার কান্নাটা এবার যেন আরও বাঁধভাঙা হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছে ওয়াসিফের কষ্টটা। কিন্তু তার নিজের ভেতরের ভয়টাও তো কম নয়। ওই অপহরণের তিনটে দিন তার জীবনের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। সে জানে ওয়াসিফকে হারানোর ভয়টা কেমন।
“কিন্তু তাই বলে আমাকে এভাবে মিথ্যে বলে ভুলিয়ে রাখবেন? আপনি কি জানেন না, আপনাকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও কাটে না? আপনি যখন ওই বর্ডারে, ওই গুলির সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন এখানে আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে, তা কি আপনি বোঝেন?” ধারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল। “আমি তো শুধু আপনাকে চেয়েছিলাম। খুব সাধারণ একটা জীবন চেয়েছিলাম।”
ওয়াসিফ ধারাকে টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে এলো। এবার আর ধারা বাধা দিল না, বরং ওয়াসিফের শক্ত বুকে মুখ গুঁজে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করল। ওয়াসিফ তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “আমি জানি রে পাগল, আমি সব জানি। কিন্তু আমার যে উপায় নেই। এই দেশ, এই মাটি—এরা আমাকে ডাকে। আমি যে শপথ নিয়েছি, সেই শপথ আমি ভাঙব কী করে? তুই তো একজন বীরের স্ত্রী। মুমতাহিনা ধারা কি এতটা দুর্বল হতে পারে? তুই তো আমার শক্তি। তুই ভেঙে পড়লে আমি লড়ব কী করে?”
ধারা মাথা তুলে ওয়াসিফের দিকে তাকাল। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, “আমি বীরের স্ত্রী হতে চাই না । আমি শুধু আমার স্বামীর স্ত্রী হয়ে থাকতে চাই। যে স্বামী দিন শেষে নিরাপদে আমার কাছে ফিরে আসবে।”
ওয়াসিফ আলতো করে ধারার কপালে চুমু খেল। “আমি ফিরে আসব মুমতাহিনা । আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোর কাছে ফিরে আসব। এই ‘W’ লকেটটা শুধু আমার নামের আদ্যক্ষর নয়, এটা আমার অস্তিত্ব। আমি যেখানেই থাকি না কেন, আমার আত্মা সবসময় তোর কাছেই থাকবে।”
রাত গভীর হতে থাকে। বাইরের বৃষ্টিটা আবার শুরু হয়েছে। রিমঝিম শব্দে চারপাশটা মুখরিত। ঘরের ভেতরের অভিমান, রাগ, আর কান্নার ঝড়টা আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে এসেছে। ধারা ওয়াসিফের বুকে মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে আছে। ওয়াসিফ এক হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, অন্য হাত দিয়ে ওর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে।
“কাল কখন বের হবেন?” ধারা খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“ভোর পাঁচটায়,” ওয়াসিফ উত্তর দিল।
“কতদিন লাগবে ফিরতে?”
“ঠিক নেই। তবে খুব বেশি দিন লাগবে না। মিশন শেষ হলেই চলে আসব।”
ধারা আর কিছু বলল না। সে জানে, এই মানুষটাকে আটকে রাখার সাধ্য তার নেই। দেশের ডাকে যে মানুষটা নিজের জীবন বাজি রাখতে পারে, তাকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে রাখা যায় না। সে শুধু মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, যেন তার মানুষটা নিরাপদে ফিরে আসে।
রাত পোহাল। ভোরের আলো ফোটার আগেই ওয়াসিফ উঠে পড়ল। ধারাও উঠল তার সাথে। সারা রাতের না ঘুমানো ক্লান্ত চোখদুটো নিয়েও সে নিজের হাতে ওয়াসিফের ইউনিফর্মটা বের করে দিল। ওয়াসিফ যখন ইউনিফর্ম পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল, তখন তাকে দেখে ধারার বুকের ভেতরটা আবার কেমন যেন করে উঠল। এই বেশেই মানুষটাকে সে প্রথম ভালোবেসেছিল, আবার এই বেশটাই তার সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ।
ওয়াসিফ তার কমব্যাট বুট জোড়া পরে, মাথায় ক্যাপটা ঠিক করে ধারার দিকে ঘুরল। ধারা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ওয়াসিফ এগিয়ে এসে ধারার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল।
“নিজের খেয়াল রাখবি। আর একদম কাঁদবি না। আমি দ্রুতই ফিরব,” ওয়াসিফ ফিসফিস করে বলল।
ধারা কোনোমতে চোখের পানিটা আটকে রেখে একটু হাসার চেষ্টা করল। “সাবধানে থাকবেন। আর… আমাকে ফোন করবেন কিন্তু, যখনই সময় পাবেন।”
“অবশ্যই,” বলে ওয়াসিফ ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।
নিচে সামির অপেক্ষা করছিল। ওয়াসিফ আর ধারা নিচে নেমে এলো। লুইপা আর বাড়ির অন্যরাও ততক্ষণে উঠে পড়েছে। সবার চোখেমুখেই একটা বিষণ্ণতার ছাপ। ওয়াসিফ সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪০
গাড়িতে ওঠার আগে সে শেষবারের মতো পেছন ফিরে তাকাল। ধারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের আলোয় ধারার গলায় থাকা ‘W’ লকেটটা চিকচিক করে উঠল। ওয়াসিফ একটা স্যালুট দিল, যেটা শুধু একজন কমান্ডোর নয়, একজন প্রেমিকেরও স্যালুট ছিল। তারপর সে গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়িটা স্টার্ট নিল এবং ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে বাইরের রাস্তায় হারিয়ে গেল। ধারা ততক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল, যতক্ষণ না গাড়িটা চোখের আড়াল হয়। তার চোখ দিয়ে এবার অঝোরে পানি পড়তে শুরু করল। কিন্তু এই কান্নায় কোনো আক্ষেপ নেই, আছে শুধু অন্তহীন অপেক্ষা আর এক বুক ভালোবাসা। সে জানে, তার ওয়াসিফ ফিরে আসবে। আসতেই হবে তাকে। কারণ তাদের গল্পের শেষটা এখনো বাকি।
