Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ১৯

মেজর কারদার পর্ব ১৯

মেজর কারদার পর্ব ১৯
ফিনারা ঝুমুর

ধরিত্রী হতে আরও দুটো দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে, তবুও আকাশের সেই অবিরাম বৃষ্টির রেশ একটুও কমেনি। এইতো গত তিন দিন পূর্বেই আষাঢ়ে পা দিয়েছে ধরিত্রী, আর চারপাশ জুড়ে এখন চলছে তারই মেঘ-বৃষ্টির প্রলয়ংকারী খেলা। প্রকৃতির এই ওলটপালটের সাথে তাল মিলিয়ে মেঘের জীবন থেকেও বিষাক্ত দুটো দিন কেটে গেছে। সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতির বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে নিজের পায়ের নিচে মাড়িয়ে, সমস্ত ক্ষত বুকে চেপে ও অবশেষে ফিরে এসেছে নিজের চিরচেনা আপন বাসস্থান বাগেরহাটে।
​“ছাদ থেকে সুকাতে দেওয়া কাপড়গুলো চট করে নিয়ে আয় তো, মা!”

​রান্নাঘর থেকে মা আলেয়া বানুর চেনা আদেশ ভেসে এলো মেঘের কানে। মায়ের সেই অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই এতক্ষণের সমস্ত গুমোট ভাব ঝেড়ে ফেলে মেঘ চপল পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে ছুটল। কিন্তু ছাদ থেকে মেলে দেওয়া কাপড়গুলো একটা একটা করে হাত বাড়িয়ে গুটিয়ে নিতে নিতেই, হুট করে আকাশ চিরে আবারও ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। মেঘ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে ভিজতে চাইল না; অত্যন্ত দ্রুত পদে ছাদ ত্যাগ করে নিচের ঘরের দিকে নেমে এল ও।
​নিজের হাতের সেই আধভেজা কাপড়গুলোর দিকে তাকিয়ে এখন চরম অসহ্য লাগে মেঘের এই আষাঢ়ের অবিরাম বৃষ্টিকে। কেন যেন মনে হয়, এই বৃষ্টিই তো ওর জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্সময় আর কালবৈশাখী ঝড়টা বয়ে এনেছে! যদি সেদিন রামু রাবার বাগানে ওমন মুষলধারে বৃষ্টি না নামত, না ওর জীবনে এতো কিছু ঘটে যেতো।

আধভেজা কাপড়গুলো বসার ঘরের সোফাটায় তড়িঘড়ি করে রেখেই মেঘ হনহন করে দৌড়ে চলে গেল নিজের শোবার ঘরে। ছাদ থেকে নামার সময় কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি এসে লেগেছিল ওর চুলে আর কায়ায়। আলমারি থেকে একটা শুকনো তোয়ালে বের করে মাথা আর গায়ের পানিটুকু আলতো করে ঝেড়ে নিয়ে খাটের কোণে একটু বসতেই, আচমকা সতেজ ও চড়া সুরে বেজে উঠল ওর হাতের ফোনের চেনা রিংটোন।
​একটু চমকে উঠে রিংটোনের উৎস খুঁজতে খুঁজতে বালিশের নিচ হতে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মেঘের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ফোনের কাচে জ্বলজ্বল করছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির নাম। গুটিগুটি অক্ষরে স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠেছে”মেজর কারদার”।
​মেঘ কয়েক সেকেন্ড দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে অবশেষে কাঁপাকাঁপা আঙুলে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল। অত্যন্ত নম্র ও মৃদু স্বরে জানান দিল,

​“আসসালামু আলাইকুম, মেজর সাহেব।”
​ওপাশ থেকে সাথে সাথেই কোনো উত্তর এলো না, কেবল এক কিঞ্চিৎ গভীর নীরবতা ভেসে এলো। কয়েক সেকেন্ড যেন উভয় পাশেই এক অদ্ভুত ও দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা বিরাজ করল। এরপর ওপাশ থেকে মেজরের সেই চিরচেনা রাশভারী ও ঢিমে গলায় শোনা গেল,
​“ওয়ালাইকুম আসসালাম। হেলথের অবস্থা কেমন এখন তোমার? বাগেরহাটে ফেরার পর জ্বরটা কি আদেও কমেছে?”
​শীর্ষর এমন অতর্কিত ও যত্নশীল প্রশ্ন শুনে মেঘের ঠোঁটের কোণে এক বিষণ্ণ ও নিষ্প্রাণ হাসি ফুটে উঠল। জানালার দিকে তাকাতেই ও দেখল, দুপুরের শেষ ভাগে বাইরের দমকা হাওয়ায় ওর পুরো রুমের হালকা নীল রঙের পর্দাটা উড়োউড়ো হয়ে চলেছে। সেদিকে চেয়েই এক নিস্তেজ ও ভাঙা গলায় প্রতিউত্তর করল,
​“মনের যেখানে এত বড় উপাধি লেগে গেছে, সেখানে সেই কষ্টের ভারে এই কায়ার দেহ আর কেমন থাকবে বলুন? আমি ভালো আছি। আচ্ছা মেজর সাহেব! আমার একটা জরুরি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেবেন?”
​ওপাশ থেকে শীর্ষ ছোট করে জবাব দিল, “কী প্রশ্ন?”

​মেঘ নিজের শুষ্ক ঠোঁট দুটো জিহ্বার ডগা দিয়ে সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে, অত্যন্ত শান্ত ও ধীর স্বরে প্রশ্ন করল,
“আমায় এতো দামী মোবাইল সেট কেন কিনে দিয়েছেন? এতো দামী মোবাইল আমি ব্যবহার করি না, মেজর সাহেব।”
ওপাশ থেকে একইভাবে নির্লিপ্ত ও সংক্ষিপ্ত উত্তর আসে,
​“তোমার আগের মোবাইলটা রাবার বাগানে ওমন ধস্তাধস্তির মাঝে পড়ে পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। ওটা আর অন করার মতো বা চালানোর মতো পজিশনে ছিল না।”
​“তাতে কী হয়েছে মেজর সাহেব? আমি এত দামী ব্র্যান্ডের মোবাইল ব্যবহার করি না। আমার স্কুলমাস্টার বাবার যতটুকু সামর্থ্য, তার উপার্জনে যতটুকুতে যে সাধারণ মোবাইল হয়, সেই মোবাইলই আমি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আপনি যেদিন আমাদের এই জোর খাটানো বিয়ের চূড়ান্ত ইস্তফা দেবেন, সেদিন দয়া করে আপনার দেওয়া এই মোবাইলটি নিজের সাথে করে নিয়ে যাবেন। আমায় এভাবে আপনার দয়ার নিচে রেখে আর ঋণী করবেন না, প্লিজ।”
​মেঘের এই স্পষ্ট ও জেদি কথার বিপরীতে শীর্ষর কোনো চটজলদি উত্তর আসে না। ওপাশ থেকে শুধু মেজরের ভারী ও তপ্ত নিঃশ্বাসের ওঠানামার শব্দ শোনা যায়। সেই নীরবতা সহ্য করতে না পেরে মেঘ নিজেই আবার আমতা আমতা করে বলে ওঠে,

​“আমাকে… আমাকে সেদিন ওই নরপশুদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে যিনি নিজে রক্তাক্ত হলেন, তিনি এখন কেমন আছেন? ওনার শারীরিক অবস্থা কেমন?”
​মেঘের গলাটা কেমন যেন এক অসাড় ও অপরাধবোধে ছেয়ে যায়। বাগেরহাটে আসার পর থেকেই মনে মনে সে বীর যুবক মুসার খোঁজ নেওয়ার জন্য ছটফট করছিল।​শীর্ষ ওপাশ থেকে শান্ত গলায় জবাব দেয়,
“ঘণ্টা দুইয়েক পূর্বে রামু সিএমএইচ-এ ওর জ্ঞান ফিরেছে। ডাক্তাররা জানিয়েছে ও এখন বিপদমুক্ত। আগের থেকে আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছে ও।”
​“আলহামদুলিল্লাহ!”
মেঘের বুক থেকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে। সে আলতো করে বলে,
“আমি তাহলে এবার রাখছি, মেজর সাহেব।”
​“ওকে!”
​বলেই ওপাশ থেকে কোনো বাড়তি বিদায় সম্ভাষণ ছাড়াই লাইনটি চট করে চ্যুত হয়ে যায়। মেঘ স্ক্রিনের দিকে এক পলক তাকিয়ে দামি মোবাইলটি বিছানার নরম বালিশের ওপর রেখে ধীরপায়ে গিয়ে দাঁড়ায় জানালার একদম পাশে।
​বাইরে তখন আষাঢ়ের আকাশ চিরে অবিরাম ধারায় বৃষ্টি ঝরে চলেছে। প্রকৃতির সেই ক্রন্দন দেখতে দেখতে নিজের বুকের ভেতরের কালবৈশাখী ঝড়টাকে শান্ত করতে ফিসফিস করে কবিতার ছন্দে নিজের অবাধ্য মনকে শুনিয়ে বলে ওঠে,
​“ওগো মোর দখিনা, তোমায় করিয়ে আমি তীব্র ঘৃণা।
এসেছিলে জীবনের চরম দুঃসময়ে, করেছো নতুন ক্ষত-বিক্ষত মোর জীবনে।চাহিনা তোমায় কোনোদিন বন্ধু হিসেবে, চাহিবো যে আজন্মা বিচ্ছেদ তোমার সনে!”

সময় গড়িয়েছে ঘণ্টা তিনেক সম্মুখে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা। ক্যাম্পের জরুরি ফাইলপত্রের কাজ শেষ করে শীর্ষ এসেছে রামু সিএমএইচ-এ। করিডোর পেরিয়ে ও যখন একশত তিপ্পান্ন নম্বর কেবিনে ঢুকল, তখন দেখতে পেল আহত মুসা শুয়ে আছে বেডে। স্যালাইনের সুচ ফোটানো এক হাত নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে পাশে, চোখ দুটো বন্ধ।
​শীর্ষ ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বসে মুসার বেডের পাশে। নিজের স্নেহের এই ছোট ভাইসম সৈনিকের কপালে, রুক্ষ চুলে অত্যন্ত নরম করে হাত বুলায় ও। মাথার ওপর পরিচিত হাতের সেই চেনা স্পর্শ পেতেই ধীরে দর্পে মুসা ওর নিভুনিভু আঁখিপল্লব মেলে ধরে। প্রথমে চোখের দৃষ্টি সামান্য ঝাপসা লাগলেও, পরক্ষণেই তা মেজরের মুখে স্থির হয়ে স্পষ্ট হয়।
​“ম্যাম কেমন আছে, স্যার?”

​বুকের ব্যান্ডেজ আর ক্ষতের তীব্র যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে অত্যন্ত রুগ্ন, ভাঙা গলায় প্রশ্ন করে মুসা। চোখে এক আকাশ জানার আগ্রহ। নিজের এই মারাত্মক অসুস্থতা বা যমের দুয়ার থেকে ফিরে আসাটাও যেন কাবু করতে পারেনি এই সাহসী জওয়ানকে। শীর্ষ ওর চুলে হাত বুলাতে বুলাতেই শান্ত সুরে বলে,
​“ও ঠিক আছে মুসা, সুস্থভাবে নিজের বাড়ি ফিরে গেছে। এখন তোমায় বেশি কথা বলা বারণ। রেস্ট নাও।”
​“রেস্ট কীভাবে নেবো, স্যার? সেদিন ম্যামের ও অবস্থা দেখে আমি নিজেকে কিছুতেই রুখতে পারিনি। বার বার ভেতর থেকে মন বলছিল আমার নিজের বোনের সাথে এমন কিছু হলে কি আমি চুপ থাকতাম? তাই আগে-পিছে আর কিচ্ছু না ভেবে নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম।”
​মুসার কথা শুনে মুসার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই কাল সন্ধ্যার রাবার বাগানের সেই হাড়কাঁপানো দৃশ্যটা।
​সেদিন মেঘকে যখন বখাটেরা ঘিরে ধরেছিল, তখন অসহায় মেঘের মুখ থেকে আর্তনাদ বের হয়েছিল,
“আল্লাহ রে–!”
মেঘের এই গোঙানিতে বখাটেরা যেন আরও পৈশাচিক আনন্দ পেল। চারপাশের পরিবেশটা হুট করেই এক মরণ-নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজটাও যেন থমকে গেল।মেঘের চিৎকারে ওরা মজা নেয়। মজা–। চারপাশ নিস্তব্দ হয়ে যায়। আর কোনো শব্দ শোনা যায় না।
মেঘের অমন চরম দুর্দশা আর সম্ভ্রমহানির অবস্থা দেখে মুসা নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে পারেনি। নিজের চাইনিজ রাইফেলের কুঁদো তথা বন্দুকের নিচের অংশ দিয়ে খুব শক্ত করে আঘাত হেনেছিল লিডার গোছের সেই মোটা শয়তানের মাথা বরাবর।

​“আহহহহ! বাঁচাও! বাঁচাও–!”
​পশুটা মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। মাথা ফেটে রক্ত বের হতে লাগল ওর। তা দেখে বাকি ছোকরারা মেঘকে এক ঝটকায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল অন্য পাশে, আর দল বেঁধে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল একা মুসার ওপর।
​“শ্লা, কেবা তুই? কার পারমিশনে আমাদের লাইনে আসছিস?”
​মুসা এক মুহূর্তও দমে না গিয়ে এক চিলতের মধ্যে একটার মুখের চোয়াল বরাবর শক্ত এক ঘুষি হাঁকিয়ে সিংহগর্জনে চিৎকার করে বলল,
​“ওই অসহায় মেয়েটার ভাই!”
​মুসা যখন আরেকটা মারণ ঘুষি দিতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক বখাটে লাফিয়ে এসে ওর গলা পেঁচিয়ে ধরল। অন্য দুজন পাশ থেকে এসে ওর দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরতেই, প্রথম ঘুষি খাওয়া ছেলেটা নিজের কোমরে গুঁজে রাখা ধারালো পকেট নাইফটা সপাটে বের করে আনল।
​কোনো সুযোগ না দিয়ে পরপর তিনটে গভীর আঘাত মুসার পেটে আর বুকে বসিয়ে দিয়ে ওকে ছুঁড়ে ফেলে দিল দূর্বাঘাসের মৃত্তিকায়। মুসার শরীর থেকে রক্তের ফোয়ারা ছুটে গেল। মাটিতে পড়ে থাকা মেঘ তা দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল,
​“আল্লাহ! আল্লাহ–!”

​মুসাকে নিস্তেজ করে দিয়ে ছেলেগুলো এবার কামার্ত পশুর মতো আবারও মেঘের দিকে ধেয়ে এগিয়ে গেল। এক নরপশু ওর ডান বাহু শক্ত করে চেপে ধরে নিজের কুৎসিত মুখটা নামিয়ে আনল মেঘের মুখের কাছে। তৃষ্ণার্ত হায়েনার মতো মেঘের কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দাবাতে গেল মাত্র, আর ঠিক তখনই অলৌকিক কোনো শক্তির মতো আকস্মিক ওর নাকে-মুখে এসে আঘাত করল তীব্র এক আর্মির বুটের লাথি!
​লাথির চোটে ছেলেটা ছিটকে পড়ল বেশ কয়েক হাত পেছনে। রক্তাক্ত নাকে হাত দিয়ে পরখ করতে গিয়ে দেখলসেখানে হাত ভেসে যাচ্ছে ঘন লাল তরলে।
​“হারামখোর! কার এত বড় সাহস!”

​মুখ থেকে নোংরা গালি ছুঁড়ে সামনের দিকে তাকাতেই বখাটেটার মুখের ওপর এসে পড়ল দ্বিতীয় আঘাত। এবার আর বুট নয়, এক আঘাতেই থেঁতলে গেল ছেলেটার পুরো মুখমণ্ডল, চোয়ালের হাড় ভেঙে একাকার হয়ে গেল। দম ফুরিয়ে গেল নিমেষেই, দেহটা নিথর হয়ে গেল মাটিতে।​বাকি ভয়ার্ত ছেলেগুলো যখন কাঁপতে কাঁপতে সামনে তাকাল, তখন ওদের কলিজা শুকিয়ে গেল আতঙ্কে!
ওরা দেখে,
এক হাতে ভারী ও ধারালো একখানা কংক্রিটের ইট সহিত বখাটেদের সামনে যমদূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেজর শীর্ষ কারদার। তার পায়ের কাছে একটু আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে ওদের এক সঙ্গী যার পুরো মুখমণ্ডল মেজরের ইটের উপর্যুপরি আঘাতে অর্ধ-থেতলানো, মগজ আর রক্ত মিলেমিশে এক বীভৎস নরককুণ্ড তৈরি করেছে।

অতীতের সেই হাড়কাঁপানো নৃশংস স্মৃতিচারণ করতে করতেই মুসার বুজে আসা চোখ থেকে দু-ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল কানের লতি বেয়ে। কাল সন্ধ্যার সেই বীভৎস দৃশ্য মনে পড়ে ভয়ে ওর বুকটা এখনও ধরাস ধরাস করে কাঁপছে। ভেতরে জমে থাকা তীব্র আকুলতায় ওর মুখ থেকে এক করুণ গোঙানি বের হয়ে এলো,
​“স্যার– ও স্যার! ওরা ম্যামকে অনেক বাজেভাবে ছুঁয়েছিল স্যার! ম্যাম যন্ত্রণায়, ভয়ে চিল্কার করে কাতরাচ্ছিল–কিন্তু, কিন্তু ওই নরপশুদের একটুও মায়া হয়নি স্যার! বিন্দুমাত্র মায়া হয়নি ওদের!”

​মুসাকে ওভাবে যন্ত্রণায় ছটফট করতে আর পাগলামো করতে দেখে শীর্ষ নিজের সমস্ত গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে আলতো করে ওকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। কাগজে-কলমে মুসা তার অধীনস্থ একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও অনুগত কর্মী হলেও, মনে মনে শীর্ষ ওকে নিজের আপন ছোট ভাইয়ের মতোই স্থান দিয়েছে। সেদিন স্পটে পৌঁছাতে শীর্ষর সামান্য দেরি হলেও, মুসা নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে মেঘের সম্ভ্রম বাঁচাতে একচুলও দেরি করেনি; নিজের তাজা প্রাণটা তো প্রায় দিয়েই দিচ্ছিল ও!​শীর্ষ মুসার পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অত্যন্ত ভারী ও আবেগঘন গলায় বলল,

মেজর কারদার পর্ব ১৮

​“তোমার কাছে এই শীর্ষ কারদার আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে, মুসা। অনেক বড় একটা ঋণের বোঝা আজ তুমি আমার এই শক্ত ঘাড়ে চাপালে। কারদার বংশের বড় ছেলেকে আর কত যে ঋণী করবে তুমি, তা আমার জানা নেই। আল্লাহর কাছে মন থেকে দোয়া করি, জীবনে আরও অনেক বড় হও, অনেক সফল হও তবে নিজের ভেতরের এই সুন্দর ও পবিত্র মনুষ্যত্বটুকু সব সময় মনের মাঝে সজীব রেখো।”

মেজর কারদার পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here