Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩০

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩০

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩০
ফারহানা নিঝুম

সিউল নগরীর আকাশপটে আচমকাই নেমে এলো বর্ষণের তাণ্ডব। টুপটাপ শব্দ তুলে হিমশীতল বৃষ্টিবিন্দুগুলো আছড়ে পড়ছে রাজপথ, কাঁচঘেরা স্কাইস্ক্র্যাপার আর নিয়নবাতির দ্যুতিময় আলোকচ্ছটার উপর। সমগ্র নগরী যেন মুহূর্তেই রূপ নিল এক বিষণ্ন, নীলাভ স্বপ্নলোকে। কদাচিৎ দু’একজন পথচারী ছাতার আড়ালে নিজেদের গুটিয়ে দ্রুত পায়ে অগ্রসর হচ্ছে। দূরবর্তী ট্রাফিক লাইটের রঙিন প্রতিফলন ভেজা অ্যাসফল্টের বুকে লেপ্টে থেকে সৃষ্টি করেছে অপার্থিব এক আবহ। আর সেই হিমশীতল পরিবেশের অন্তরালে কালো রোলস রয়েসের অভ্যন্তরে জমাট বেঁধে আছে গুমোট নৈঃশব্দ্য।
সেই স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে কেবল প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এক রমণীর চাপা ফুঁপিয়ে কান্না। ঝুমঝুম। কিয়ৎক্ষণ পূর্বেই কন্যাটি অপমানিত হয়েছে নির্মমভাবে। একটি নহে পরপর দুই-দুইটি সপাট থাপ্পড়। প্রথমটি সকলের সামনে।
দ্বিতীয়টি এই চলন্ত গাড়ির অভ্যন্তরে। জুনেদ শয্য বাদশাহর ভারী, পেশিবহুল করতলের আ’ঘাতে কন্যার তুলতুলে গালদ্বয় রক্তাভ হয়ে উঠেছে। জ্বালায় যেন ত্বক দাউদাউ করে জ্ব’লছে। শয্য বিরক্ত, কর্কশ স্বরে বলে উঠল,

“তোর এই ফ্যাচফ্যাচ করে কান্না বন্ধ হবে? কানের পাশে বসে একটানা কান্না করেই চলেছিস!”
ঝুমঝুম সজল আঁখিতে তাকালো তার দিকে। আর সেই এক পলকের দৃষ্টিই যেন শয্যের অন্তঃস্থল এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। ওই ভেজা চোখজোড়া এতটাই নরম, এতটাই অসহায় দেখাচ্ছিল যে অপ্রত্যাশিতভাবে তীব্র অপরাধবোধ গ্রাস করল তাকে।
শয্য দাঁতে দাঁত চেপে নিম্নস্বরে বলল,
“স্টপ ক্রাইং, ঝুম!”
কিন্তু থামবার পরিবর্তে আরও প্রবলভাবে ডুকরে উঠল কন্যাটি।
“আপনি সবসময় এমন করেন কেন? কী সমস্যা আপনার? কেন এত বিশৃঙ্খলা নিয়ে চলেন?”
প্রশ্নটি বাতাসে ঝুলে থাকতেই শয্যের উত্তর এলো তীক্ষ্ণ, নির্দ্বিধায়,
“কারণ তুই।”
এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল ঝুমঝুম। মস্তিষ্কজুড়ে পুনরায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল প্রিয়ার বলা প্রতিটি বাক্য। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন উন্মত্ত হয়ে উঠল। সে কাঁপা গলায় শুধোল,

“আমি? আমি কেন? আমি কী করেছি?”
শয্য যেন কোনো সম্মোহনী আবেশে আচ্ছন্ন।
আজ তার কণ্ঠে ক্রোধের চেয়ে অধিক প্রকট স্বীকারোক্তির নেশা। সে গভীর তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“এলোমেলো করে দিয়েছিস!”
অতঃপর চোখ বুজে ফিসফিসিয়ে উঠল,
“মন, মস্তিষ্ক, সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছিস তুই।”
ঝুমঝুম নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে শুনছে। শয্য পুনরায় বলল,
“বলেছিলাম এখানে আসতে? অনুমতি ছাড়া কেন এসেছিস? দিব্যি তো বেঁচে ছিলাম আমি!”
বাক্যগুলো কন্যাটিকে সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ করে দিল। আজ বুঝি তার বিস্মিত হওয়ার দিন। সে আর একটি শব্দ উচ্চারণের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলল। গাড়ির অভ্যন্তরে পুনরায় নেমে এলো থমথমে স্তব্ধতা। প্রায় দশ মিনিট পর গাড়িটি এসে থামল বাড়ির সম্মুখভাগে। ঝুমঝুম প্রায় হুড়োহুড়ি করেই নেমে পড়ল। সে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করতে উদ্যত হতেই অকস্মাৎ তার কব্জি টেনে ধরল শয্য।

মুহূর্তেই কন্যার বুকগহ্বরে দামামা বেজে উঠল। ঘন পাপড়িযুক্ত নয়নপল্লব কেঁপে উঠল সূক্ষ্ম কম্পনে।
বর্ষণ থেমে যাওয়ার পর সূর্যের কোমল কিরণ গাছের পাতার ফাঁক গলে এসে পড়ছে তার ভেজা মুখাবয়বে। কেশরাশির কিছু এলোমেলো গোছা গাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে।
ঝুমঝুম কম্পিত ওষ্ঠ আলতোভাবে ভিজিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে দৃষ্টি তুলল। আর স্থির হয়ে গেল একজোড়া হ্যাজেলবর্ণ চক্ষুদ্বয়ে। সেই দৃষ্টিতে আজ অদ্ভুত এক সংমিশ্রণ অধিকার।
ক্রোধ। এবং বিপজ্জনক কোমলতা। শয্যের উলফ কাট চুল বাতাসে সামান্য দুলে উঠল। কপাল সামান্য কুঞ্চিত করে সে নিম্ন, দৃঢ় স্বরে বলল,

“আয়।”
অতঃপর ধীর পদক্ষেপে গাড়ির পেছনে এগিয়ে গেল।
সেখানে রাখা ছিল একটি ক্ষুদ্র খাঁচা। খাঁচার অভ্যন্তরে দু’টি ধবধবে শুভ্র খরগোশ নরম লোমশ দেহ, লালাভ চোখ, ভীতু ক্ষুদ্র নড়াচড়া। খরগোশ দেখামাত্রই বিস্ময়ে প্রসারিত হয়ে গেল ঝুমঝুমের আঁখি। এ তো সেই খরগোশ!
যেটি সেদিন দেখে শিশুসুলভ আবেগে পছন্দ করেছিল সে। না পেয়ে রিমঝিমের কাছে ফিরে অঝোরে কেঁদেছিল।
তার বিস্মিত চাহনি ধীরে ধীরে গিয়ে থামল শয্যের মুখাবয়বে। কিন্তু পুরুষটি কোনো ব্যাখ্যা দিল না। শান্ত, স্থির ভঙ্গিতে খাঁচাটি তার হাতে তুলে দিয়ে বলল,
“দিস ইজ ইয়োরস।”
কন্যার বুকগহ্বরে যেন অচেনা ঢেউ আছড়ে পড়ল।
হাত কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। নিজের জন্য কেউ এতটা ভেবে কিছু এনেছে এই অনুভূতিটুকুই যেন তার সমগ্র শরীরে শিহরণ ছড়িয়ে দিল। চোখজোড়া জলে ভরে উঠল।
কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“শয্য ভাইয়া, এটা আপনি এনেছেন? এটা তো আমার সেই খরগোশটা!”
ভাইয়া ডাকটি কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই শয্যের মুখাবয়ব পুনরায় কঠোর হয়ে উঠল। চোখে স্পষ্ট বিরক্তির ছায়া।
সে বরফশীতল গলায় বলল,

“আই ডোন্ট লাইক ইট। আই’ম নট ইয়োর ব্রাদার।”
এক মুহূর্ত থেমে পুনরায় বলল,
“আর নিতে না চাইলে ফেরত দে।”
বাক্যটি যেন মুহূর্তেই সকালের কোমল আবহকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। চারপাশের বাতাস পর্যন্ত থমকে গেল।
কিন্তু পরক্ষণেই খাঁচাটি বুকে জড়িয়ে উল্টো দিকে দৌড় দিল ঝুমঝুম। সে এটি কিছুতেই ফেরত দেবে না।
কোনোমতেই না। অন্তত এই নির্মম থাপ্পড়গুলোর প্রতিদান হিসেবেও না।
শয্যের মনে হলো দূরে কোথাও কেউ ফিসফিসিয়ে গাইছে,,,
••• মায়া লাগাইছে, দিওয়ানা বানাইছে
কি জাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে•••••••

“আমি তোদের ডিভোর্স পেপার রেডি করছি। তুই আব্রাহামকে ডিভোর্স দিবি!”
আজগর চৌধুরীর কণ্ঠনিঃসৃত সেই নির্মম ঘোষণাটি যেন বজ্রাঘাতের ন্যায় আছড়ে পড়ল জুঁইয়ের অন্তঃকরণে। মুহূর্তেই রক্তশূন্য হয়ে এলো কন্যার মুখশ্রী। হৃদপিণ্ড যেন বক্ষপিঞ্জর ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নিঃশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠল তার। ডিভোর্স? সে আব্রাহামকে ডিভোর্স দেবে? কেন? কোন অপরাধে? কম্পমান ওষ্ঠে কোনোরকমে শব্দ গাঁথল জুঁই।
“ডি…ডিভোর্স? কিন্তু কেন বাবা?”
আজগর চৌধুরী বরাবরই প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ সহ্য করতে অক্ষম। বিশেষত নিজের কন্যার মুখে প্রশ্ন? তা তো আরও অসহনীয়। অতঃপর গর্জন করে উঠলেন তিনি,
“আমি বলছি তাই! আমার সিদ্ধান্তের উপর কথা বলার সাহস যেন না হয় তোমার!”
তৎক্ষণাৎ বি’ষাক্ত সমর্থনের সুর মিশিয়ে পিহুও বলে উঠল,
“হ্যাঁ, ডিভোর্স দেওয়াটাই বেটার! যখন এই বিয়ে থেকে কোনো প্রফিটই আসছে না, তখন এই সম্পর্ক টেনে লাভ কি?”

কথাগুলো ছু’রির ফলার ন্যায় বিদ্ধ করছিল জুঁইয়ের কোমল হৃদয়। এতদিনের নীরব, লাজুক, ভীরু মেয়েটি আজ যেন অন্তর্গত সমস্ত ক্ষোভের কাছে পরাভূত হয়ে পড়ল। চোখজোড়া অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। অতঃপর আচমকাই কেঁদে চিৎকার করে উঠল সে,
“আমাকে কি তোমাদের পুতুল মনে হয় বাবা? যখন ইচ্ছে জোর করে বিয়ে দিবে, আবার যখন ইচ্ছে ডিভোর্স দিতে বলবে?”
আজগর চৌধুরীর চক্ষুদ্বয় রাগে রক্তিম হয়ে উঠল।
“তুমি আমার মুখের উপর তর্ক করছো? তোমার এত বড় সাহস!”
পিহু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“দেখলে বাবা? বিয়ের পর ওর সাহস কত বেড়ে গেছে! এখন আমাদের সামনেই তর্ক করছে!”
জুঁই তখন কান্নায় ভেঙে চুরমার। বুক কেঁপে কেঁপে উঠছে। শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেছে। অথচ তবুও আজগর চৌধুরীর কণ্ঠে বিন্দুমাত্র কোমলতা এলো না।
“একদম বাড়াবাড়ি করবে না। আমি যেটা বলব সেটাই হবে! তুই ডিভোর্স দিবি!”
বুকের ভেতর যেন কেউ আগুনের শলা’কা গেঁথে দিল। হাঁসফাঁস করতে করতে জুঁই দৌড়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। অশ্রুভেজা দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছিল চারপাশ। হৃদয়ের ভেতরকার আর্তনাদ যেন গোটা পৃথিবী কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
নিজের কক্ষে প্রবেশ করেই দরজা বন্ধ করে দিল সে। অতঃপর বিছানার পাশে রাখা মায়ের ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

“মা, তুমি দেখছো? বাবা আমার সাথে কি করছে? আমার সুখগুলো কেন বারবার কেড়ে নেওয়া হয়? প্রথমে তোমাকে হারালাম। তারপর কোনোদিন বাবার ভালোবাসা পেলাম না জোর করে বিয়ে দিল অথচ এখন এখন ওই মানুষটা আমাকে এত যত্ন করে আগলে রাখছে মা! আমি চেষ্টা করছি তাকে ভালোবাসতে সত্যি চেষ্টা করছি আর ঠিক তখনই বাবা তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছে!”
কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় গলা রুদ্ধ হয়ে এলো তার।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় মৃদু করাঘাত পড়ল।
“জুঁই? দরজাটা খুলো।”

পুরুষালী গভীর কণ্ঠস্বরটি কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই কেঁপে উঠল জুঁই। আব্রাহাম? এই সময়ে সে এখানে?
বুকের গভীরে হাহাকারময় আলোড়ন উঠল। দ্রুত চোখের পানি মুছে ফেলল মেয়েটি। নিজেকে স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে ধীরে দরজা খুলল।
দরজা খুলতেই থমকে গেল সে। সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে আব্রাহাম। দুই হাতে একগাদা টক ফল কাঁচা আম, বরই, তেঁতুল, জলপাই সঙ্গে পাঁচ রকম আচারের জার। মুখভর্তি দুষ্টু হাসি।
“এই যে, হাজির আপনার টক নিয়ে!”
কথাটা শুনেই বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা যেন আরও প্রবল হয়ে উঠল জুঁইয়ের। মানুষটা এতটুকু আবদারকেও কত যত্নে আগলে রাখে!
আব্রাহাম মুচকি হেসে বলল,
“ফোন কেটে দিয়েছিলাম বলে মন খারাপ করেছে বুঝি? আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি, জুঁইফুল! চেয়েছিলাম আপনি একটু আমার জন্য ওয়েট করেন। দেখতে চেয়েছিলাম আমার জন্য চিন্তা করলে কেমন লাগে আপনাকে!”

এই সামান্য আদরটুকুই আর সহ্য হলো না জুঁইয়ের। আচমকা ভেঙে পড়ল সে। কান্নায় থুতনি কেঁপে উঠছে। শব্দ করে কাঁদতে লাগল। আব্রাহাম মুহূর্তেই বিচলিত হয়ে পড়ল।
“হে! কি হয়েছে? জুঁই? লুক এট মি!”
অস্থিরতায় কন্যাকে বাহুবন্দী করল সে।
“সোনা, বলো কি হয়েছে? খুব হার্ট করেছি?”
জুঁই কিছু বলতে পারল না। কেবল আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল মানুষটাকে। বুক ভাসিয়ে কান্না করতে করতে বলে উঠল,
“আমি আপনাকে ছাড়তে চাই না আব্রাহাম আমি আপনার কাছেই থাকতে চাই। আপনার মতো করে কেউ কখনো আমাকে ভালোবাসেনি!”
আব্রাহাম থমকে গেল। হৃদয় যেন মোচড় দিয়ে উঠল তার।
ধীরে ধীরে জুঁইয়ের মুখখানি তুলে ধরল দুই হাতের অঞ্জলিতে। ভেজা চোখ, কাঁপা ঠোঁট, রক্তিম নাক সবটুকু গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে নিচু স্বরে বলল,
“কি হয়েছে? বাবা কিছু বলেছে?”
জুঁই এবার আর নিজেকে আটকাতে পারল না।

“বাবা,,, বাবা চাইছে আমি আপনাকে ডিভোর্স দেই!”
এক মুহূর্তে আব্রাহামের দৃষ্টি বদলে গেল। শান্ত সমুদ্রের নিচে যেন জেগে উঠল অগ্ন্যুৎপাত। পরক্ষণেই ক্ষিপ্ত বাঘের ন্যায় ঝড়ো পদক্ষেপে নিচতলার দিকে এগিয়ে গেল সে।
“মামুনি! মামুনি কোথায়?”
ঠিক তখনই চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন জেসমিন বাদশাহ এবং রাজিব বাদশাহ। ছেলেকে এতটা উত্তেজিত দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন তারা। রাজিব বাদশাহ ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“কি হয়েছে আব্রাহাম?”
আব্রাহাম দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কেন কাঁদবে না? ওকে জোর করে ডিভোর্স দিতে বলা হচ্ছে!”
ডিভোর্স শব্দটি শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন দু’জনেই।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন আজগর চৌধুরী ও পিহু। জেসমিন বাদশাহ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলেন,
“এসব কি শুনছি আজগর সাহেব?”
আজগর চৌধুরী দৃঢ় গলায় উত্তর দিলেন,
“যা শুনেছেন ঠিক তাই। আমি ওদের ডিভোর্স করাবো।”
“হাউ ডেয়ার ইউ!”
গর্জে উঠল আব্রাহাম।

“আপনি কে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার?”
আজগর চৌধুরীও ক্ষিপ্ত।
“ভদ্রভাবে কথা বলো! তোমাদের পরিবার আমাদের সঙ্গে বিজনেস ডিল করেনি। আমি বিশ্বাসঘাতকদের কাছে মেয়ে রাখব না!”
জেসমিন বাদশাহ এবার রীতিমতো ফেটে পড়লেন।
“এই সামান্য বিজনেস ডিলের জন্য নিজের মেয়ের সংসার ভাঙতে চাইছেন?”
আজগর চৌধুরী নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি দিলেন,
“হ্যাঁ! এই কারণেই বিয়ে দিয়েছিলাম!”
পরিস্থিতি মুহূর্তেই বিষাক্ত হয়ে উঠল। আব্রাহামের চোখদ্বয় রক্তবর্ণ ধারণ করল। কণ্ঠস্বর নিচু অথচ ভয়ঙ্কর।

“আমার দুর্বলতা নিয়ে খেলতে যাবেন না, মিস্টার চৌধুরী।”
‘বাবা’ থেকে হঠাৎ ‘মিস্টার চৌধুরী’ সম্বোধন শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল সবাই।
আব্রাহাম জুঁইকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“লিসেন কেয়ারফুলি, জুঁই আমার স্ত্রী। মাই এভরিথিং ,আমাদের মাঝখানে বাইরের কারও হস্তক্ষেপ আমি সহ্য করব না।”
পিহু তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
“জুঁই! এদিকে আয়! বল তুই ডিভোর্স দিবি!”
জুঁই ভয়ে সেঁধিয়ে গেল আব্রাহামের পেছনে। আব্রাহাম কঠোর কণ্ঠে বলল,
“শাট আপ! জুঁই আমাকে ভালোবাসে। আমার স্ত্রী কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না।”
আজগর চৌধুরী এবার তেড়ে এলেন মেয়ের দিকে। হাত তুলতেই বিদ্যুৎগতিতে তার কবজি চেপে ধরল আব্রাহাম।

“ডোন্ট ইউ ডেয়ার।”
তার কণ্ঠের হিংস্রতা মুহূর্তেই সবাইকে স্তব্ধ করে দিল।
“আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার সাহস হয় কি করে আপনার?”
জেসমিন বাদশাহর দিকে তাকিয়ে বলল,
“মামুনি, পুলিশে কল করুন। এই মানুষটার বাইরে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
কেঁদে উঠল জুঁই। আব্রাহামের
“না প্লিজ!”
জেসমিন বাদশাহ ছেলের বাহু চেপে ধরে বললেন,
“চলো এখান থেকে। আর হ্যাঁ, চৌধুরীদের সাথে আমাদের সবরকম ডিল আজ থেকেই ক্যানসেল।”
কথাটা শুনে আজগর চৌধুরীর মুখ বিকৃত হয়ে উঠল ক্রোধে। আর জুঁই? সে তখন আব্রাহামের বুকের কাছে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিল এই মানুষটাকে সে সত্যিই হারাতে পারবে না। কখনোই না।

সিউল শহরের বিকেলটা আজ অদ্ভুত রকম কোমল। অস্তগামী সূর্যের স্বর্ণাভ আভা ছড়িয়ে পড়েছে পার্কজুড়ে। সারি সারি ম্যাপল গাছের পত্রপল্লব ছুঁয়ে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। দূরে কোনো এক স্ট্রিট মিউজিশিয়ান মৃদু সুরে গিটার বাজাচ্ছে, আর সেই সুরের মায়াজালে মোড়া পরিবেশে পাশাপাশি বসে রয়েছে প্রণয় এবং ঝুমঝুম।
পার্কের বেঞ্চিটায় বসে কন্যা আপনমনে আঙুল ঘষছে। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ, স্নিগ্ধ এক হাসির রেখা। অপরপাশে বসা প্রণয়ও আজ আশ্চর্য রকম প্রশান্ত। গত কয়েকদিনের অস্থিরতা যেন কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে তার।
অতঃপর মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে সামান্য ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
“তাহলে,পরশু যাবে তো আমার সাথে?”
প্রশ্নটা উচ্চারণ করতেই ঝুমঝুমের দৃষ্টি নেমে এলো তার হাতে ধরা ইনভাইটেশন কার্ডটির দিকে। কিছুক্ষণ পূর্বেই প্রণয় তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তার কাজিনের বার্থডে পার্টিতে। চকচকে কার্ডটির উপর গোল্ডেন ফন্টে লেখা নামগুলো যেন কন্যার ভেতরে অদ্ভুত সংকোচের জন্ম দিচ্ছে। ঝুমঝুম ধীর, ইতস্তত কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু প্রণয়, আমি তো ওখানকার কাউকেই চিনি না!”
প্রণয় তৎক্ষণাৎ হেসে উঠল। সেই হাসিতে মিশে ছিলো মুগ্ধতা ,

“আমি আছি কিসের জন্য, হুঁ? তুমি আমার সাথে যাবে। নোবডি উইল মেইক ইউ আনকমফোর্টেবল।”
কথাগুলো বলার সময় তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ ঝুমঝুমের মুখশ্রীর উপর। যেন মেয়েটার প্রতিটা দ্বিধা সে নিজ হাতে সরিয়ে দিতে চায়। তবুও ঝুমঝুমের ভেতরের সংশয় কাটল না। আঙুলের ডগা দিয়ে ওড়নার কোণা মুচড়াতে মুচড়াতে নিচু স্বরে বলল,
“তবুও কেমন যেন লাগছে!”
প্রণয় এবার একটু ঝুঁকে এলো তার দিকে। কণ্ঠস্বর নিচু, অথচ গভীর।
“তাছাড়া ওইদিন শুধু বার্থডে না আরও একটা স্পেশাল থিং আছে।”
ঝুমঝুমের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।প্রণয় মুচকি হাসল। সেই হাসিতে যেন লুকিয়ে আছে বহুদিনের গোপন অনুভূতি।

“মানে? তোমাকে কিছু বলার আছে।”
কথাটা শুনেই ঝুমঝুমের গাল দুটো কিঞ্চিৎ রক্তিম হয়ে উঠল। সে জানে। খুব ভালো করেই জানে প্রণয় কি বলতে চায়। এতদিনের আচরণ, যত্ন, অকারণ রাগ, হঠাৎ করে মন খারাপ সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টা আর অজানা নেই তার কাছে। সে নিশ্চয়ই তাকে প্রপোজ করবে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই কন্যার হৃদস্পন্দন এলোমেলো হয়ে উঠল। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে সেই অনুভূতির ভেতরেও কোথাও যেন আরেক জোড়া হ্যাজেল চোখ ভেসে উঠল তার মস্তিষ্কে।
ঝুমঝুম দ্রুত ভাবনাটা সরিয়ে দিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,
“ঠিক আছে যাবো।”
মুহূর্তেই প্রণয়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“ওহ গ্রেট!”
আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ল যেন যুবকটি।
“আমি তাহলে তোমাকে নিতে যাবো। অ্যান্ড ট্রাস্ট মি, ইউ’ল লুক দ্য প্রিটিয়েস্ট দেয়ার।”
ঝুমঝুম লজ্জায় মৃদু মাথা দোলাল। হঠাৎ করেই যেন কিছু একটা মনে পড়ল প্রণয়ের। আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“ওহ ওয়েইট! চলো, গাড়িতে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে!”
ঝুমঝুম বিস্মিত।
“সারপ্রাইজ?”
“হুঁ। কাম উইথ মি।”
কোনোরকম সুযোগ না দিয়েই প্রণয় তাকে টেনে নিয়ে গেল পার্কিং এরিয়ার দিকে। গাড়ির নিকটে পৌঁছে দ্রুত দরজা খুলতেই আচমকা তার মুখভঙ্গি বদলে গেল। শিট!
ঝুমঝুম চমকে উঠল।
“কি হয়েছে?”
প্রণয় দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্ত গলায় বলল,
“তোমার জন্য একটা র‍্যাবিট পছন্দ করেছিলাম। গার্ডকে বলেছিলাম গাড়িতে তুলে দিতে। দ্যাট ইডিয়ট ডিডন্ট ডু ইট! বাস্টার্ড!”
ঝুমঝুম বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। খরগোশ? তার মস্তিষ্কে হঠাৎই ভেসে উঠল সেদিনের দৃশ্যটা বৃষ্টিভেজা বিকেল, শয্যের গম্ভীর মুখ, আর সেই সাদা লোমশ খরগোশ দুটো।
অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল কন্যার। সে ধীর স্বরে বলল,
“কিন্তু, আমার তো অলরেডি একটা খরগোশ আছে।”
প্রণয় কপাল কুঁচকে তাকাল।

“সেদিন তো বলেছিলে নেই?”
ঝুমঝুম মিনমিনে কণ্ঠে উত্তর দিল,
“শয্য ভাইয়া দিয়েছেন!”
শয্যের নামটা কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্রই প্রণয়ের মুখের রঙ পাল্টে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। কপালের শিরাগুলো স্পষ্ট স্ফীত হয়ে উঠল।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৯

“জুনেদ শয্য বাদশাহ?”
নিচু , ধারালো কণ্ঠে উচ্চারণ করল নামটা।
তার দৃষ্টিতে মুহূর্তেই অদ্ভুত এক অস্বস্তিকর পরিবর্তন নেমে এলো। যেন বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা ঈর্ষা নিঃশব্দে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩১