মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩১
ফারহানা নিঝুম
“আপনাকে আরো একবার আমার জন্য কষ্ট করতে হলো!”
প্রিয়ার কণ্ঠস্বরটায় একপ্রকার লাজুক; যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে কারও ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করে ফেলেছে সে। বিকেলের সিউল নগরী তখন ম্লান সোনালি আলোয় আবৃত। দূরবর্তী স্কাইস্ক্র্যাপারগুলোর কাঁচে প্রতিফলিত সূর্যরশ্মি চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। রাস্তাজুড়ে ব্যস্ততা, অথচ সেই বিলাসবহুল গাড়িটার অভ্যন্তরে বিরাজ করছে অদ্ভুত এক প্রশান্ত নৈঃশব্দ্য।
প্রিয়ার কথায় ওষ্ঠপ্রান্ত সামান্য প্রসারিত করল জিয়ান। সেই হাসিতে ছিল দুর্বোধ্য এক মাদকতা, একফোঁটা দুষ্টুমি, আর গোপনে জমে থাকা অনাবিষ্কৃত অনুরাগের আভাস। মেয়েটা হয়তো বুঝতেই পারছে না তার এই অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি, এই অনর্গল বাচালতা, এই সরল অথচ প্রাণবন্ত সঙ্গ জিয়ানের শুষ্ক জীবনে কেমন এক উষ্ণ রৌদ্ররেখা এঁকে দিচ্ছে।
স্টিয়ারিংয়ে দীর্ঘ আঙুলের দখল বজায় রেখেই জিয়ান মৃদুস্বরে বলল,
“আপনার তো লাক খুবই ভালো ম্যাডাম। আমার মতো সেলিব্রিটির গাড়িতে কোনো কারণ ছাড়াই যখন তখন উঠে পড়ছেন, দেখা করছেন, আবার দিব্যি বেঁচেও যাচ্ছেন!”
শেষ বাক্যটায় কৌতুকের সুর স্পষ্ট। প্রিয়া খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। সেই হাসি যেন একঝাঁক রুপালি ঘণ্টাধ্বনি হয়ে প্রতিধ্বনিত হলো গাড়ির ভেতর। জিয়ানের হৃদপিণ্ডে অদ্ভুত এক কম্পন উঠল। কেন এই সাধারণ মেয়েটার হাসি এত অসাধারণ লাগে তার? কেন মনে হয় এই মেয়েটা পাশে থাকলেই জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত আর্তি গলে গলে নেমে যায়?
প্রিয়া মুখে হাত ছুঁইয়ে ভান করা গম্ভীরতায় বলল,
“খোঁচা দিলেন বুঝি? আমি কিন্তু কখনো বলিনি আমাকে গাড়িতে তুলতেই হবে! তাছাড়া আপনি তো কে-পপ আইডল। কেউ দেখে ফেললে তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে!”
জিয়ান একপলক তাকালো তার দিকে। সেই চশমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নিষ্পাপ চোখদুটো আজ ভীষণ বেশি সুন্দর লাগছে।
“কেন? আর ইউ স্কেয়ার্ড? ভয় পাচ্ছ নাকি?”
গভীর, খানিকটা হাস্কি কণ্ঠে প্রশ্নটা করল সে। প্রিয়া তৎক্ষণাৎ চোখ সঙ্কুচিত করে তাকালো। মুখভঙ্গিতে স্পষ্ট প্রতিবাদ।
“উঁহু! ভয় কেন পাবো? আপনি বাঘ নাকি ভাল্লুক?”
কথাটা শুনে জিয়ান নিম্নস্বরে হেসে উঠল। সেই হাসি বিপজ্জনক। যেন বহুদিনের সংযত অনুভূতি সামান্য ফাঁক খুঁজে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
“ভাল্লুক না হলেও!”
জিয়ান ধীরস্বরে বলল,
“কারও কারও জন্য আমি খুব ডেঞ্জারাস হতে পারি, চাশমিশ!”
প্রিয়ার বুকের ভেতর অকারণ ধক করে উঠল। ছেলেটা যখন “চাশমিশ” বলে ডাকে, তখন কেন যেন শব্দটা গালভরা অপমান না হয়ে আদুরে কোনো সম্বোধনে রূপ নেয়।
গাড়ির জানালার ওপারে তখন সিউলের আলোকোজ্জ্বল সন্ধ্যা নেমে এসেছে। নিয়ন লাইটে ঝলমল করছে রাস্তা। মিনিট দশেকের মধ্যেই হোস্টেলের সম্মুখভাগে এসে থামল গাড়ি। প্রিয়া ধীরে ধীরে ব্যাগ খুলে কিছু ডলার বের করল। অতঃপর সেগুলো জিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এইযে আপনার ডলার। এটা নিন আর আমাকে ঋণমুক্ত করুন!”
জিয়ান ডলারের দিকে তাকাল না পর্যন্ত। বরং ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে দুষ্টুমিভরা স্বরে বলল,
“এটা নিলে তুমি ফ্রি হয়ে যাবে?”
প্রিয়া নির্দ্বিধায় মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ! একদম!”
জিয়ানের চোখে তখন অদ্ভুত এক ঝিলিক। যেন এই ‘ঋণ’ সে ইচ্ছে করেই শোধ হতে দিতে চায় না। অতঃপর ঠোঁট বাঁকিয়ে ডেবিল মার্কা হাসি হেসে বলল,
“তাহলে তো এটা আমি নিচ্ছিই না!”
প্রিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।
“কেন?”
জিয়ান এবার সামান্য ঝুঁকে এলো তার দিকে। গাঢ় কণ্ঠে বলল,
“কারণ আমি চাই না তুমি এত সহজে আমার থেকে মুক্তি পাও!”
কথাটা বলেই চোখ টিপে সোজা হয়ে বসে পড়ল সে।
“বাই, চাশমিশ!”
পরক্ষণেই গাড়িটা ভোঁ করে সামনের দিকে ছুটে গেল।
প্রিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল হোস্টেলের সম্মুখে। শীতল বাতাসে তার চুল উড়ছে, অথচ শরীরজুড়ে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে। মেয়েটা বিড়বিড় করে পুনরায় জিয়ানের কথাটা আওড়ালো,
“মুক্তি দিতে চাইছে না?”
আর ঠিক তখনই নিজের অজান্তেই ওষ্ঠপ্রান্তে ফুটে উঠল ক্ষীণ, লাজুক এক হাসি।
অতীতের স্মৃতিগুলো…
“প্লিজ শয্য, একটাবার আমার কথা শুনো। আমার সাথে এমন করোনা প্লিজ!”
বাহুতে স্পর্শ করা মাত্রই শয্য ছিটকে দূরে সরে এলো আব্রাহামের নিকট হতে। দৃষ্টি যুগলে রাগের স্ফুলিঙ্গ! দাঁতে দাঁত পিষ্ট করে রোষ্ট কন্ঠে বলে ওঠে,
“হাউ ডেয়ার ইউ? আপনার সাহস হয় কি করে আমাকে টাচ করার?এত সাহস কে দিয়েছে আপনাকে?”
কথাটা শোনাতেই আহাত নয়নে তাকালো আব্রাহাম! সম্মুখে দাঁড়ানো ছোট শয্য বাদশাহ যে তার ভাই!তারা যে একই র’ক্ত! চোখ দুটো ছলছল করছে আব্রাহামের।
“আপনি, আপনার মা চিটার!আর একজন চিটার কখনোই আমাদের আপন হতে পারেনা!”
তীক্ষ্ণ শলাকার ন্যায় শোনালো শয্যের প্রতিটি কথা!যা হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে আব্রাহামের!
“একটাবার আমাকে বিশ্বাস করো, আমি জানতাম না শয্য!”
কথাটা শেষ হতেই শয্য তাকে উপেক্ষা করে হনহনিয়ে প্রস্থান করল। তার যাওয়ার পানে ছাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে রইল আব্রাহাম। অনুভব করল চোখ দুটো ভিজে উঠেছে,
“একটাবার ভাই বলে ডাক না শয্য। বিশ্বাস কর আমি সুনন্দা বাদশাহর মতো ঠকাবো না।”
••অতীত শেষ••
সজোরে এক প্রচণ্ড চড় আছড়ে পড়ল ঝুমঝুমের কোমল গালে! মুহূর্তের জন্য সমগ্র পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে গেল কন্যার নিকট। মাথাটা কেঁপে উঠল প্রবল অভিঘাতে। কানজোড়া ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। চোখের সম্মুখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অন্ধকার নেমে এলো। অতঃপর দগদগে জ্বালায় ফুঁপিয়ে উঠল ঝুমঝুম।
“মা!”
অত্যন্ত ক্ষীণ, ভাঙা স্বরে শব্দটা বেরোতেই পুনরায় গর্জে উঠলেন তারা বাদশাহ। কণ্ঠে এমন এক হিংস্রতা মিশ্রিত ছিল, যা শুনে বুকের ভেতর পর্যন্ত কেঁপে উঠল রিমঝিমের।
“একদম ন্যাকামি করবে না! কোন সাহসে তুমি খরগোশ বাড়িতে ঢুকিয়েছো হ্যাঁ? কার পারমিশনে?”
প্রণয়ের সহিত দেখা করে ফিরেছে সবে ঝুমঝুম। হাতে ছোট্ট ঝুড়ি, তার ভেতরে সাদা তুলোর ন্যায় লোমশ খরগোশটা নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল। কন্যা কল্পনাও করেনি বাড়িতে প্রবেশ করেই তাকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।
গাল চেপে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠল ঝুমঝুম। অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে থুতনি বেয়ে। অথচ তারা বাদশাহর দৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র মমতা নেই। রিমঝিম তৎক্ষণাৎ ছুটে এলো।
“কি করছো কি মা? কেন মারছো ওকে?”
তারা বাদশাহ আজ যেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। ক্রোধে তার চক্ষুদ্বয় রক্তাভ হয়ে উঠেছে।
“তুমি চুপ করো! একদম চুপ!”
চিড়বিড়িয়ে উঠলেন তিনি।
“কি ভেবেছে এই মেয়ে? যখন যা ইচ্ছে করবে? প্রথমে জেসমিন আপুকে বশ করে কাঠবিড়ালী নিয়ে এলো, এখন আবার খরগোশ! ক’দিন পর এই বাড়িটাকে চিড়িয়াখানা বানাবে বুঝি?”
প্রতিটা বাক্য বিষা’ক্ত তীরের ন্যায় বিদ্ধ করছিল ঝুমঝুমের হৃদয়ে। অথচ কন্যা কোনো প্রতিবাদ করল না। শুধু নৈঃশব্দ্যে কেঁদে চলল। তারা বাদশাহ এবার আঙুল তুলে কঠোর স্বরে বলে উঠলেন,
“এখুনি! এই মুহূর্তে এটাকে বাইরে ফেলে আসো! নয়তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না!”
আঁতকে উঠল ঝুমঝুম। খরগোশটার ঝুড়ি বুকে জড়িয়ে ধরল সে। ভীত, অপমানিত, অসহায় কন্যাটি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। তড়িঘড়ি করে ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ির বাইরে।
ঝুমঝুম চলে যেতেই রিমঝিম বিস্ফোরিত হয়ে উঠল।
“তুমি এটা কেন করলে মা? অহেতুক ওর উপর রাগ দেখালে কেন?”
তারা বাদশাহ হিসহিসিয়ে উঠলেন।
“হ্যাঁ দেখিয়েছি! তাতে তোর কি?”
তারপর আচমকাই এমন কিছু বলে বসলেন, যা শুনে রিমঝিমের মেরুদণ্ড পর্যন্ত শীতল হয়ে গেল।
“ওই মেয়েটাকে আমি দুচোখে সহ্য করতে পারি না! ও আমাকে মা বলে ডাকলে আমার মনে হয় আমি ওকে খু’ন করে ফেলি!”
স্তব্ধ। সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল রিমঝিম। মায়ের মুখে এমন ভয়ংকর, বিকৃত, ঘৃণায় পূর্ণ স্বীকারোক্তি শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।
“মা, আমি তোমাকে চিনতে পারছি না!
রিমঝিমের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“তুমি এতটা ভায়োলেন্ট কিভাবে হতে পারো?”
তারা বাদশাহ কোনো উত্তর দিলেন না। যেন প্রশ্নগুলোর অস্তিত্বই নেই। হনহনিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেলেন তিনি।
তার অন্তর্গত জ্বালা তিনিই বোঝেন। স্বামী নামক মানুষটির বিশ্বাসঘাতকতা তাকে বহু পূর্বেই ভিতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। অল্প বয়সে প্রাপ্ত সেই নির্মম আঘাত আজও রক্তক্ষরণ ঘটায় তার আত্মায়। সেই ঘটনার কথা জানে হাতে গোনা মাত্র দু’জন মানুষ। এক রিমঝিম। আর অন্যজন…
সেখানে গিয়েই থেমে গেলেন তারা বাদশাহ। ভাবনার দরজা জোরপূর্বক বন্ধ করে দিলেন যেন। নিজের কক্ষে প্রবেশ করে প্রচণ্ড শব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন তিনি।
ঠাস! আর বাইরে? সন্ধ্যার ক্রমশ ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে ঝুমঝুম তখন খরগোশটা বুকে চেপে একাকী কাঁদছে। তার চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে সাদা লোমশ প্রাণীটার মাথা।
আজ বুঝি কন্যা প্রথমবার উপলব্ধি করল কিছু মানুষ র’ক্তের সম্পর্ক হয়েও কখনো আপন হয় না।
“তুই কিন্তু আজ বেশি ড্রিংকস করছিস শয্য!”
গভীর, সতর্ক কণ্ঠে বাধা দিল জিয়ান।
টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অর্ধেক খাওয়া ড্রিংকস, বরফ গলা গ্লাস, আর অবিন্যস্ত নৈঃশব্দ্য। কিন্তু জিয়ানের কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না শয্য। বরং দ্বিতীয়বারের মতো গ্লাস ঠোঁটে ঠেকিয়ে ধীরলয়ে শেষ করল পুরোটা। তার হ্যাজেলবর্ণ চোখদ্বয় র’ক্তাভ, অথচ সেই রক্তিমতায়ও এক অদ্ভুত বিষণ্নতা জমাট বেঁধে আছে।
মেহবুব অবশেষে আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। সামনের দিকে ঝুঁকে ক্ষ্যাপাটে গলায় বলে উঠল,
“তুই আমাকে সত্যি করে বল তো শয্য, মাশাকে পছন্দ করিস?”
“পছন্দ?”
শব্দটা উচ্চারণ করেই অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল শয্য।
যেন শব্দটার মধ্যেই চরম তুচ্ছতা লুকিয়ে আছে। পছন্দ শব্দটা বড্ড ছোট মনে হচ্ছে। গ্লাসের গায়ে আঙুল ঠুকে নিচু স্বরে বলল,
“পছন্দ? ভীষণ ছোট একটা শব্দ!”
হিউন জে এবার ভ্রু কুঁচকালো।
“তাহলে? ভালোবাসিস?”
শয্য নাকের ডগা আলতো ঘষে মাদ’কতাময় স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এটাও খুব কম!”
টেবিলজুড়ে মুহূর্তেই নেমে এলো অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। জিয়ান ধীরে ধীরে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“তাহলে অবসেসড?”
শয্য এবার মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল। অতঃপর ধীরে ধীরে সোফার গায়ে শরীর এলিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“লাভ, অবসেশন, এগুলো জাস্ট ওয়ার্ড! ও তার থেকেও বেশি!”
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে এমন এক দহন ছিল, যা শুনে বাকিরা পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে গেল। মেহবুব, জিয়ান, হিউন জে তিনজনই একে অপরের মুখের দিকে তাকালো।
মেহবুব শেষমেশ ধৈর্য হারিয়ে ফেলল।
“কবে থেকে ভালোবাসিস?”
শয্য চোখ বুজল। দীর্ঘ, ভারী একটা নিঃশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে এলো।
“জানি না! তবে এটা জানি, যেদিন ছোট্ট ছোট্ট আঙুল দিয়ে এসে আমার হাত চেপে ধরে বলেছিল! ‘আমার খুব ভয় করছে আমাকে একটু কোলে নাও । ঠিক সেই দিন থেকেই আমি আর আমার মধ্যে নেই!”
কথাটা শুনে জিয়ান পর্যন্ত থমকে গেল।
“মানে?”
শয্য ধীরে ধীরে অতীতের গভীরে ডুবে গেল যেন।
“ও যখন এই বাড়িতে আসে তখন ওর বয়স মাত্র ছয়। একদম বাচ্চা! আমরা তখন বাংলাদেশে ছিলাম। সেদিন বাড়িতে তুমুল ঝগড়া চলছিল। তারা আন্টি আর শাওন আঙ্কেল মেয়েটাকে নিয়ে এমনভাবে চিৎকার করছিল যেন ও কোনো মানুষ না, বোঝা! তারা আন্টি রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। শাওন আঙ্কেলও দরজা ধাক্কা মেরে বেরিয়ে গেলেন। আর ওই ছোট্ট মেয়েটা একা বসে ছিল!”
হিউন জে নিঃশব্দে শুনছে। মেহবুবের চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে।
“আমারও তখন ওর উপর রাগ হয়েছিল। মনে হচ্ছিল সব সমস্যার মূল ওই। তাই আমিও কলেজে চলে যাই। তখন আমার বয়স ষোল।”
শয্য ঠোঁট চেপে ধরল।
“ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। বাড়িতে ঢুকেই দেখি মেয়েটা সোফায় ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট মুখটা কুঁকড়ে পড়ে আছে। বিরক্ত লাগছিল ভীষণ। পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনই একটা ফুলদানি পড়ে ভেঙে গেল!”
তার হ্যাজেল চোখ দুটো এবার চিকচিক করে উঠল।
“ওর ঘুম ভেঙে গেল। আর ভয়ে সোজা এসে আমার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল!”
মুহূর্তেই শয্যের কণ্ঠ বদলে গেল। নরম হয়ে এলো।
“এত ছোট ছিল যে কোমর পর্যন্ত আসত। ছোট্ট ছোট্ট আঙুল দিয়ে আমার হাত চেপে ধরে বলল, ‘আমার খুব ভয় করছে আমাকে একটু বুকে জড়াও।”
টেবিলজুড়ে কেউ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেলছে না।শয্য ফিসফিসিয়ে বলল,
“ব্যস! আমি ওই মুহূর্তে ওর চোখ দেখেছিলাম। টলটলে সোনালি চোখ! মনে হয়েছিল এই মেয়েটাই আমার বেঁচে থাকার কারণ। কিন্তু সমস্যা কী জানিস?”
ছেলেটা তিক্ত হেসে উঠল।
“আমার মাথা তখন এটা বুঝতেই চায়নি যে ও ছোট! আমি শুধু ওকেই দেখেছি, শুধু ওকেই!”
মেহবুব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। জিয়ান কষ্টেসৃষ্টে বলল,
“তারপর?”
শয্য হালকা হাসল। সেই হাসিতে যন্ত্রণার ছায়া স্পষ্ট।
“তারপর তোরা তো জানিসই। সতেরোতে মাম্মা আমাকে নিয়ে সিউলে চলে এলো। মাত্র একটা বছর ওর সাথে ছিলাম। কিন্তু ওই এক বছরেই আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম!”
তার আঙুল অন্যমনস্কভাবে নিজের ঘাড়ের ট্যাটুতে ছুঁয়ে গেল।
“ওকে নিজের মতো বানাতে চেয়েছিলাম। জোর করে কানের নিচে ট্যাটু করিয়ে দিয়েছিলাম। কী কান্না করেছিল জানিস? পুরো দিন বাইরে বাইরে ঘুরিয়েছি এটা ওটা কিনে দিয়েছি শুধু যেন ব্যথাটা ভুলে যায়!”
হিউন জে এবার বুক চেপে ধরল।
“এত ভালোবাসিস, তাহলে এমন আচরণ করিস কেন?”
প্রশ্নটা শুনে শয্য কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর নিচুস্বরে বলল,
“কারণ আমি ভয় পাই!”
মেহবুব গর্জে উঠল।
“কিসের ভয়?”
শয্য ধীরে মাথা তুলল। তার চোখদুটো ভিজে উঠেছে।
“বাদশাহ পরিবারের পুরুষরা স্বার্থপর রে! সবাই! যদি আমিও একদিন ওদের মতো হয়ে যাই? যদি আমিও ওকে কষ্ট দেই? যদি ওকে রেখে অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলি? দ্বিতীয় বিয়ে করি? ওকে ভেঙে চুরমার করে দেই?”
মেহবুব রাগান্বিত গলায় বলে উঠল,
“নিজের উপর বিশ্বাস নেই তোর?”
শয্য হেসে উঠল। ভাঙাচোরা, অসহায় এক হাসি।
“নিজের উপর আছে, নিজের ভালোবাসার উপরও আছে,
কিন্তু র’ক্তের উপর নেই! যদি একদিন এই র’ক্তই বেইমানি করে বসে! দিনশেষে আমি ওই পরকীয়াবাজ রাজিব বাদশাহর র’ক্ত!
অতঃপর নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। সিউলের ঝলমলে রাতের মাঝখানে প্রথমবারের মতো জুনেদ শয্য বাদশাহকে ভীষণ অসহায় দেখালো। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধটা সে লড়ছে নিজের ভেতরের মানুষের সাথে।
হিউন জে সন্দিগ্ধ কন্ঠে শুধোয়,
“কিন্তু ঝুমঝুম? সবকিছু বুঝলাম কিন্তু এটা বুঝলাম না, তোদের বাড়িতে এসেছে মানে? ঝুমঝুম কি তারা আন্টির মেয়ে নয়?”
শয্য প্রত্যুত্তর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল,
“যেদিন ঝুমঝুম সত্য জানতে পারবে, সেদিন….
থাই-গ্লাসের বিশাল প্রাচীরঘেরা লাউঞ্জের সম্মুখভাগে এসে স্থির হয়ে দাঁড়ালো শয্য। তার প্রশস্ত বক্ষগহ্বরের অন্তঃস্থলে তখন এক অদৃশ্য আলোড়ন অবিরাম আছড়ে পড়ছে। বাইরে থেকে দেখলে তাকে নিস্পৃহ, নির্লিপ্ত, প্রস্তরখণ্ডের ন্যায় দৃঢ় বলেই মনে হবে; অথচ অন্তরাত্মার গভীরে যে কী প্রচণ্ড তোলপাড় বয়ে যাচ্ছে, তা কেবল সে নিজেই জানে।
জিয়ান, মেহবুব এবং হিউন জে তিনজনই বহু বছরের সঙ্গী। শয্যের নীরবতার ভাষা পড়তে তারা শিখেছে অনেক আগেই। তাই তার স্থির দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যাকুলতাও তাদের দৃষ্টি এড়ালো না।
ভালোবাসা সত্ত্বেও কাউকে নিজের বক্ষে টেনে নিতে না পারার যন্ত্রণা কতটা নির্মম হতে পারে, তা হয়তো পৃথিবীর আর কেউ না জানুক, জুনেদ শয্য বাদশাহ জানে।
টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিচিত্র বর্ণের মদ, ক্রিস্টালের গ্লাস, আধখাওয়া ফাস্টফুড এবং অবহেলিত কিছু ন্যাপকিন। অথচ উপস্থিত চারজনের মধ্যে কারও মনোযোগ সেদিকে নেই।
হঠাৎই হিউন জে কাঁচের ওপারে তাকিয়ে বলে উঠল,
“মাশা আসছে না? ওই তো.. মাশা!”
এক নিমিষে সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল। থাই-গ্লাসটি ছিল বিশেষ প্রকৌশলে নির্মিত বহির্ভাগ থেকে অভ্যন্তর সম্পূর্ণ অদৃশ্য, অথচ ভেতর থেকে বাইরের প্রতিটি দৃশ্য সুস্পষ্ট।
সামনের পথ ধরে ধীর, সতর্ক পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে ঝুমঝুম। তার হাতে সযত্নে ধরা খরগোশের ঝুড়ি। কাঁধে যথারীতি বসে আছে পিউনিও বেবি।
একসময় এসে থামল কাঁচের ঠিক সম্মুখে। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে প্রথমেই আঙুল ছুঁইয়ে দেখল গাল। সেখানে এখনো হালকা লালচে আভা স্পষ্ট।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী ভেবে যেন হেসে ফেলল সে।
তারপর শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে ঝুড়িটা হাতে নিয়ে এক পাক ঘুরে দাঁড়ালো। সাদা পোশাকের ঘের বাতাসে সামান্য দুলে উঠল। খিলখিল হাসতে হাসতে পিউনিওকে নিজের প্রতিবিম্ব দেখাতে লাগল। ভেতরে বসা তিনজনের অবস্থা করুণ।
মেহবুব হাসতে হাসতে সোফায় গড়িয়ে পড়ার উপক্রম।
জিয়ান ওষ্ঠদ্বয় শক্ত করে চেপে রেখেছে, যেন হাসি বেরিয়ে না আসে। হিউন জে বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে আছে।
“এই মেয়েটা সত্যিই বড় হয়েছে তো?”
বিড়বিড় করে বলল সে। কিন্তু শয্য? সে নড়ল না। শুধু থাই-গ্লাসের উপর ডান হাতটি তুলে রাখল, একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টি এত তীক্ষ্ণ, এত নিবিষ্ট, যেন কাঁচের ওপারে দাঁড়ানো কিশোরীটিকে নয় নিজের সমগ্র পৃথিবীকে দেখছে। হঠাৎ ঝুমঝুম ঠোঁট গোল করে নিজের প্রতিবিম্বকে উদ্দেশ করে একখানা চুমু ছুঁড়ে দিল। পরক্ষণেই নিজেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। শয্যের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। অদ্ভুত এক অস্থিরতা বয়ে গেল তার শিরা-উপশিরায়।
চুম্বনটা কাঁচকে নয় তাকে দেওয়া উচিত ছিল। এই ভাবনাটুকুই তার সমস্ত সংযমকে বিপজ্জনকভাবে নাড়া দিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই দৃশ্যপট বদলে গেল। ঝুমঝুমের হাসি নিভে এলো। সে নিচে তাকালো খরগোশের ঝুড়িটার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে ছলছল করে উঠল চোখ। মেয়েটার মুখশ্রীতে নেমে এলো গভীর বিষণ্নতার ছায়া। খরগোশটা ফিরিয়ে দিতে হবে। নয়তো তারা বাদশাহ সত্যিই বাড়ি মাথায় তুলবেন। দীর্ঘ, ভারাক্রান্ত এক নিঃশ্বাস ফেলে ঝুমঝুম মেইন ডোরের দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরে শয্যের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল।
টিং-টং কলিংবেলের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো।
কয়েক মুহূর্ত পর দরজা খুলে দিল শয্য নিজেই। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটিকে দেখে মুহূর্তেই থমকে গেল ঝুমঝুম। অকারণ এক স্নায়বিক কম্পন ছড়িয়ে পড়ল তার শরীরজুড়ে। ইদানীং শয্যের কাছাকাছি এলেই বুকের ভেতর কেমন অজানা ঢেউ ওঠে। ভয়? নাকি অন্য কিছু?সে নিজেও জানে না। শয্যের গম্ভীর, অনমনীয় কণ্ঠ ভেসে এলো,
“কি চাই?”
ঝুমঝুম অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফাঁকা ঢোক গিলল। তারপর ঠোঁটে কষ্টার্জিত এক হাসি এঁকে বলল,
“এই,খরগোশটা ফিরিয়ে দিতে এলাম।”
কথাটা শুনেই শয্যের ভ্রুদ্বয় আড়াআড়িভাবে কুঞ্চিত হলো।
“কেন?”
এক শব্দের প্রশ্ন। তবু তার মধ্যে এমন শীতলতা ছিল যে ঝুমঝুমের বুক ধক করে উঠল।মিনমিনে স্বরে বলল সে।
“মা খরগোশ পছন্দ করছে না। আগেই পিউনিওকে নিয়ে অনেক বকা খেয়েছি। এখন এটাকে দেখে আরও রেগে গেছেন। বলেছেন খরগোশ বাড়িতে থাকলে নাকি তুলকালাম করে ফেলবেন।”
শয্য নির্বিকার শ্রোতার ন্যায় সব শুনল। কোনো মন্তব্য করল না। ঝুমঝুম ধীরে ঝুড়িটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“আপনি প্লিজ এটা রেখে দিন!”
তারপর সামান্য ইতস্তত করে যোগ করল,
“আর হ্যাঁ, ওর নাম রেখেছি আমি স্নোয়ি।”
এক মুহূর্ত। দুই মুহূর্ত। তিন মুহূর্ত। নৈঃশব্দ্য। অতঃপর শয্য ঝুড়িটা প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে হাতে তুলে নিল।
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩০
তার মুখভঙ্গি এতটাই কঠোর যে বোঝার উপায় নেই সে রাগান্বিত, আহত, নাকি অন্য কিছু। আর কোনো কথা না বলে ঠাস! সরাসরি ঝুমঝুমের মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দিল। কাঠের ভারী দরজার শব্দে চমকে উঠল ঝুমঝুম।
স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। অন্যদিকে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে শয্যও নিঃশব্দ। এক হাতে ঝুড়ি। অন্য হাত মুষ্টিবদ্ধ।
ভেতরে ভেতরে তার সমস্ত অস্তিত্ব শুধু একটাই বাক্য উচ্চারণ করছে,
“তুই ফিরিয়ে দিতে আসিসনি, মাশা তুই আমার ধৈর্য ফিরিয়ে নিতে এসেছিস।”
