মৌটুসী পর্ব ২৫ (২)
ঋতস্বিনী মাহবিশ
অবশেষে চড়ুইয়ের বহুল কাঙ্ক্ষিত দিনটা শুরু হলো। সকাল সকাল মা-মেয়ে শাড়ি, গহনা ও প্রয়োজনীয় কিছু মেকআপ নিয়ে বিছানার ওপর বসে গেল। চড়ুইকে গাঢ় বেগুনি রঙের শাড়িটা ধুতি স্টাইলে পরিয়ে দিল মৌ। চুলগুলো বেগুনি ফিতা দিয়ে পেছনে একটা খেজুর বেনী গেঁথে দিল, চার হাত-পা রাঙিয়ে দিল আলতার গাঢ় প্রলেপে।
চড়ুই শান্ত হয়েই বসে আছে। তবে তার জিহ্বা আর চোখ অশান্ত। এটা-ওটা প্রশ্নের বুলি ফুটতেই আছে মুখ দিয়ে। মৌটুসী নিপুণ হাতে তার পুতুল বাচ্চাকে মনের মতো করে সাজিয়ে তুলছে, আর সেই সঙ্গে আলতো হেসে মেটাচ্ছে তার অজস্র কৌতূহলের খেই।
চড়ুইয়ের নরম ত্বকে কোনো ভারী মেকআপ দিল না মৌটুসী, কেবল চোখের কোল ঘেঁষে গাঢ় কাজল, লিপস্টিক আর কপালে বড় একটা বেগুনি টিপ। এরপর একের পর এক অলঙ্কারে সেজে উঠল ছোট্ট মৌয়ের পুতুল—গলায় চোকার, হার, বাহুতে বাজু, আর কোমরে কোমরবন্ধনী। এই রুপোর গহনাগুলো সব মৌটুসীর। ছোটবেলায় লাল বানু বেগম মেয়েকে নাচের জন্য বানিয়ে দিয়েছিলেন। চড়ুইয়ের মাথায় রুপোর টায়রাটা ক্লিপ দিয়ে আটকে দিতে দিতে মৌ সুর দিয়ে গেয়ে উঠল—
“বাক-বাকুম পায়রা, মাথায় দিয়ে টায়রা।
বউ সাজবে কাল কি? চড়বে সোনার পালকি?”
মৌ থাকতেই চড়ুই এবার হালকা লাজুক হেসে বলল, “মাম্মা, আমি বউ সাজছি?”
মৌটুসী ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “বউ কীভাবে সাজে?”
“বউ তো এভাবেই সাজে, শাড়ি পরে, সাজুগুজু করে!”
মৌটুসী এবার হেসে মেয়ের থুতনি ছুঁয়ে বলল, “এটা আমার টুকটুকে বেগুনি বউ! এখন একটা রাজকুমার বর আসার অপেক্ষা শুধু, তারপর সোনার পালকিতে করে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিব তোমাকে।”
“না!” চট করে বাঁধ সাধল চড়ুই।
“না কেন?”
“শ্বশুরবাড়ি তুমিও সাথে যাবে? তুমি গেলে যাব। নাহলে একা একা যাব না।”
মৌ শব্দ করে হেসে উঠল। তারপর হাসি থামিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, “হায় হায়! মেয়ে বলে কি! বেয়াই মশাই তো তাহলে ভারী বেজায় হবেন মা। বলবেন, বেয়ান আমার ঘরের চাল শেষ করতে এসেছেন! বাড়ি যাবেন কবে?”
“উমম! তোমাকে ছাড়া যাবই না, যাবই না।” নাছোড়বান্দার মতো ঠোঁট উল্টে বলল মৌয়ের অবুঝ পাখিটা।
মৌটুসী হেসে মেয়ের নাক টেনে বলল, “আচ্ছা, আচ্ছা! তোমাকে তাহলে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবই না। আমার জামাই বাবাজিকেই উঠিয়ে নিয়ে এসে রাখব আমার ঘরে। হবে তো?”
এভাবেই চলতে থাকল মা-মেয়ের আজগুবি আলাপচারিতা। এদিকে কথা বলতে বলতেই পায়ে ঘুঙুর পরার মধ্যে দিয়ে চড়ুইয়ের সাজ পুরোপুরি কমপ্লিট হয়ে গেল। ছোট্ট চড়ুই এবার বিছানা থেকে নেমে চটপট পায়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আর নানান ভাবে ঢং করছে; বুড়ি নিজের রূপ দেখে নিজেই মুগ্ধ! ঠোঁটের কোণ থেকে মিষ্টি হাসিটা সরতেই চাইছে না যেন।
মৌ বিছানায় বসে ঘাড় ঘুরিয়ে একদৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কত্ত সুন্দর লাগছে তার চড়ুই পাখিটাকে! সত্যিই যেন রূপকথার কোনো বধূ সশরীরে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন কেবল মাথায় একটা ঘোমটা টেনে দেওয়ার অপেক্ষা—কিন্তু সেই মুহূর্তটা আসা মানেই তো তার বুকের ধনকে পরের ঘরে তুলে দেওয়ার এক অনিবার্য রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া।
মৌ বুকের বাঁ-পাশে অসহ্য ব্যথা অনুভব করে। ডান হাতটা আপনাআপনি সেখানে চেপে বসল। ইশ! তার বুকের ধন কেড়ে নিয়ে যাবে অন্য কেউ? পৃথিবীর মায়েরা এই চরম সত্যিটা মেনে নেয় কীভাবে? তার তো ভাবতেই বুক চিঁড়ে যাচ্ছে। সারা জীবন যদি ওই প্রাণপাখিটাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে পারত!
চড়ুই সবাইকে তার সাজ দেখাতে চঞ্চল পায়ে ছুট দিল ঘরের বাইরে। মৌটুসী শাড়ি পরিহিত মেয়ের তাড়াহুড়ো করা দেখে আঁতকে উঠল, গলা উঁচিয়ে বলল, “চড়ুই পাখি আস্তে যাও, পড়ে যাবে।”
ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে আলমারি খুলল মৌটুসী। শাড়ির স্তূপ থেকে আলতো হাতে টেনে বের করে আনল একটা জামদানি শাড়ি। শাড়িটা মৌয়ের খুব প্রিয়, হালকা নীলাভ-বেগুনি জমিনের ওপর গাঢ় বেগুনি রঙের ছোট ছোট কিছু ফুলের সমাহার। রোদ বা নিয়ন আলো পড়লে সুন্দর একটা দ্যুতি ছড়ায় শাড়িটা।
মৌ চটপট দক্ষ হাতে কুঁচি তুলে শাড়িটা পরে নিল। কবজিতে পরল একগুচ্ছ কাঁচের চুড়ি, কানে সাদা স্টোনের সুন্দর দুটো টপ। এরপর চোখে চিকন করে আইলাইনার টেনে দিল, ঠোঁটে হালকা শেডের লিপস্টিক—ব্যস, এর বেশি প্রসাধনের প্রয়োজন বোধ করল না সে। চুলগুলো পিঠে ছেড়ে দিয়ে কপালে বসিয়ে দিল ছোট্ট একটা বেগুনি টিপ। খুব স্নিগ্ধ ও পরিপাটি একটা সাজ। এতেই যেন পুরোনো মৌটুসীকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। একেবারে প্রস্ফুটিত পরিপূর্ণ যুবতী লাগছে দেখতে।
অনুষ্ঠান শুরুর সময়, সকাল দশটা। প্রথমে হবে পুরস্কার বিতরণ, এরপর সাংস্কৃতিক। স্কুলের টিচার ও স্টুডেন্টদের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অনুষ্ঠান আরও বিনোদিত করার জন্য একটা নাম করা মিউজিক ব্র্যান্ডও ভাড়া করা হয়েছে।
বোরাক, সাফওয়ান আর বীর স্কুলে এসে পৌঁছাল। অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে তিনতলার বিশাল অডিটোরিয়ামে। সেখান থেকে সাউন্ড বক্সে মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছে। দশটা বাজতে এখনো আধা ঘণ্টা বাকি, তাই তারা এখনই অডিটোরিয়ামে গেল না।
অনুষ্ঠান উপলক্ষে মাঠ জুড়ে অনেক রকম স্টল বসেছে। কফি, ফুচকা, পেস্ট্রি, ফাস্টফুড, এছাড়াও বাচ্চাদের বই ও খেলনার দোকান। সাফওয়ান বীরকে নিয়ে মাঠের সেই স্টলগুলোর দিকে চলে গেল। বোরাক গেল না তাদের সাথে, সে জুতো খুলে শহীদ মিনারের বেদিতে পা ঝুলিয়ে বসে পকেট থেকে ফোনটা বের করল।
হঠাৎ দুতলার বারান্দা থেকে নীতির দৃষ্টি গেল বোরাকের দিকে। ছাই রঙের একটা শার্ট মানবের সুঠাম দেহে জড়ানো। শার্টের হাতা দুটো অল্প ফোল্ড করে রাখা। কবজিতে একটা কালো ডায়ালের চকচকে ঘড়ি শোভা পাচ্ছে। মাথার ঘন চুলগুলো কিঞ্চিৎ এলোমেলো হয়ে কপালের একদিকে জায়গা করে নিয়েছে। সব মিলিয়ে ক্যাজুয়াল একটা লুক, তবে খুবই ম্যানলি। এই রূপ দেখে নীতির নারীমনে কেমন উতাল-পাতাল হতে শুরু করল। এলোমেলো পা ফেলে সে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিয়ে যাবে তখনই পেছন থেকে এক সহকর্মীর ডাক ভেসে এল, “মিস নীতি! হেড স্যার আপনাকে অফিসে ডাকছেন।”
নীতি দাঁড়িয়ে গিয়ে ফোঁস করে বিরক্তমাখা একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল। মন চাইছে সেই সহকর্মীর নাক বরাবর একটা ঘুষি দিয়ে সোজা নাক বাঁকা করে দিতে, ডাক দেওয়ার আর সময় পেল না? কিন্তু কী আর করার! নীতি ঘুরে গিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে হেড টিচারের অফিস রুমের দিকে হাঁটা দিল।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক পৌনে দশটা বাজতেই স্কুলের প্রধান ফটকের সামনে এসে থামল রিকশা। মৌটুসী রিকশা ভাড়া মিটিয়ে চড়ুইয়ের হাত ধরে ভেতরের দিকে হাঁটা দিল।
স্কুলের ভেতরটা বেলুন আর রঙিন কাগজ দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মাঠের একপাশে ছোট ছোট কয়েকটি ফটো কর্নারও সাজানো হয়েছে। সেখানে আগত শিক্ষার্থী আর অভিভাবকেরা দল বেঁধে ছবি তুলছে, কলতানে মুখর হয়ে উঠেছে চারদিক। এখানে প্রায় প্রতিটা মায়ের পরনেই চোখধাঁধানো দামি শাড়ি, গায়ে ভারী গয়না, কারও মুখে ভারী পার্লার মেকআপ। এদিকে একেবারে সাদামাটা মৌটুসী ঠোঁট সামান্য উল্টে নীরবে সব দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল।
মাঠ পেরিয়ে শহীদ মিনারের কাছে বীরদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল চড়ুই। মেয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে গিয়ে মৌটুসী এক হাতে শাড়ির কুঁচি সামলে সাবধানে দ্রুত পা ফেলতে লাগল।
ওদের আসতে দেখে সাফওয়ানও বীরকে নিয়ে এগিয়ে এল। কিন্তু বোরাক পারল না। সে স্তব্ধ হয়ে কেবল চেয়েই রইল। খুব হঠাৎ দেখা পাওয়া কোনো অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য দেখে বুকের ভেতর যেমন অদ্ভুত এক সুখকর ব্যথার উদ্রেক হয়, বোরাকের ঠিক তেমনটিই হচ্ছে। সে তো ভেবেই নিয়েছিল আজকেও রমণীকে তার সহজাত পোশাকেই দেখবে, কিন্তু একি! এই প্রথম বোরাক মৌকে স্কার্ট ছাড়া অন্য পোশাকে দেখছে, তাও আবার শাড়ি। মানে প্রথমেই ওভারডোজ! রমণীর এই অতিরিক্ত সৌন্দর্যের প্রবল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল তার পুরুষ সত্তায়। শেষ কবে কোনো নারীকে দেখে এতটা মুগ্ধ হয়েছিল, তা আর মনে করতে পারল না বোরাক।
এখানে এত এত সুন্দরী ঝকঝকে রমণীর ভিড়ে এতক্ষণ যাবৎ বসে আছে সে, কিন্তু কারো দিকে চোখ আটকানো তো দূর ফিরে তাকানোর আগ্রহ জাগেনি মনে, অথচ এই মোলায়েম স্নিগ্ধ রমণীর দিকেই চোখ আটকে গেল ওর! আর ফিরতেই চাইল না যেন।
মৌয়ের পরনের শাড়ির কালার কম্বিনেশনটা দেখে সর্বপ্রথম নীলমণিলতা ফুলের নামটাই মাথায় এল বোরাকের। যেন রমণী একগুচ্ছ প্রস্ফুটিত নীলমণিলতা আপন সৌন্দর্য গায়ে জড়িয়ে হেঁটে আসছে। আর সেই ফুলগুচ্ছের হাত ধরে এগিয়ে আসছে আরেকটি জীবন্ত ছোট্ট ফুল।
কাছে এসেই সেই ছোট্ট ফুলটি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “পাপা, আমাকে কেমন লাগছে?”
চড়ুইয়ের কণ্ঠস্বরেই যেন সম্মোহনের ঘোর কাটল বোরাকের। চড়ুইরা কখন তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে তা বোরাক খেয়ালই করতে পারেনি। তবে নিজের এই মানসিক বিচ্যুতি কাউকে বুঝতে না দিয়ে চট করে নিজেকে সামলে নিল বোরাক। হাত বাড়িয়ে চড়ুইকে কোলে তুলে নিয়ে স্নিগ্ধ হেসে বলল, “আমার মাকে শাড়ি পরে তো একদম মা-মা লাগছে!”
চড়ুই একদম বুড়ির মতো মুখ করে করে বলল, “আমি তো তোমার মা-ই! আর মাম্মারও মা।”
বোরাক এবার চোখ তুলে তাকাল। মৌটুসী বীরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো নত, দৃষ্টি মাটির দিকে। ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা লাজুক হাসিটা হয়তো অন্য কারও চোখে ধরা পড়ল না। কিন্তু বোরাক ঠিকই দেখতে পেল। কারণ সেই লাজুকতার জন্ম তো তারই নিবিড় দৃষ্টির তীব্রতায়।
বীর মৌটুসীকে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে বলল, “ মাম্মা তুমি আশা ফুপুমনিল মতো সেজেছ?”
মৌটুসী মিষ্টি হেঁসে বীরের নাক আলতো টেনে বলল,
“তোমার আশা ফুপুমনি এভাবে সাজে বুঝি?”
বীর মাথা নাড়ল, “হুম!”
সাফওয়ান বলল, “আসলে আশা আপু সবসময়ই শাড়ি পরে তো, তাই হয়তো বীর বলছে।”
“ওহ, আচ্ছা।”
সাফওয়ান এবারে না পেরে মনের কথাটা মুখ ফুটে বলেই ফেলল, “যাইহোক আপু আপনাকে কিন্তু অসাধারণ লাগছে আজকে। মানে, এই লুকে!”
মৌ মৃদু হেসে বলল, “ধন্যবাদ ভাইয়া।”
সাফওয়ান একটু অপ্রস্তুত বোধ করল। মাথা চুলকে বলল, “ইয়ে মানে আপু, আমি আপনার থেকে অনেকটা ছোটই হব। তাই নাম ধরে ডাকলে বেশি ভালো লাগত।”
মৌ সম্মতির হাসি দিয়ে বলল, “ঠিক আছে সাফওয়ান, এখন থেকে নাম ধরেই ডাকব।”
সাফওয়ান লাজুক হেসে বলল, “এবার ঠিক আছে আপু।”
সবাইকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে বোরাক কবজির ঘড়ির দিকে তাকাল। “আচ্ছা, এবার যাওয়া যাক। নাহলে বসার জায়গা পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।”
অডিটোরিয়ামটা বিশাল। প্রায় এক হাজার লোকের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন। একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অডিটোরিয়াম এত বড় আর আধুনিক হতে পারে তা আজ স্বচক্ষে না দেখলে মৌটুসী হয়তো কখনো বিশ্বাসই করত না। গ্যালারির মতো ধাপে ধাপে উঠে গেছে বসার সিটগুলো। সামনের সারিগুলো ততক্ষণে প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তারা পেছনের দিকের একটা সারিতে গিয়ে বসল।
সাড়ে দশটার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রধান শিক্ষক মঞ্চে এসে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখছেন, সবাই নিবিষ্ট মনে তা শুনছে। কিন্তু বীরের মন সেদিকে নেই; তার পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ পাশে বসা চড়ুইয়ের সাজের দিকে। কৌতূহলী দৃষ্টিতে চড়ুইকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সে। তার চুলুই পাখি আবার এত এগুলো কি পরে বসে আছে? একসময় তার দৃষ্টি গিয়ে থামল চড়ুইয়ের বাহুতে বাঁধা রুপোর বাজুবন্দটির ওপর। কৌতূহল সামলাতে না পেরে বীর আস্তে করে হাত বাড়িয়ে বাজুটি ছুঁয়ে দেখল।
স্পর্শ পেয়ে চড়ুইও ফিরে তাকাল। সুযোগ পেয়ে বীর নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “চুলুইপাখি, তুমি এখানে এটা কী পলেছ?”
চড়ুই বলল, “এটা গহনা বীর বন্ধু। কিন্তু নাম আমার মনে নেই। দাড়াও।”
চড়ুই সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে ডাকল, “মাম্মা!”
মৌটুসী সামনের স্টেজ থেকে নজর নামিয়ে মেয়ের দিকে তাকাল। চড়ুই নিজের বাহু দেখিয়ে বলল, “মাম্মা, এটাকে কী বলে?”
মৌটুসী মৃদু হেসে বলল, “এটাকে বাজু বলে, মাম্মা।”
চড়ুই আবার বীরের দিকে ফিরে বলল, “বীর বন্ধু এটা হলো বাজু।”
“বাজু?”
“হুম, বাজু গহনা।”
বীর এবার চড়ুইয়ের গলার হারটা দেখিয়ে দিয়ে বলল, “তাহলে এটা কি?”
“এটা মালা।”
এবার চোকার দেখিয়ে, “আল এটা?”
“এটাও মালা।”
বীরের কৌতূহল যেন বেড়েই চলেছে। এবার সে আঙুল দিয়ে মাথার টায়রাটার দিকে ইশারা করে বলল, “আল ওটা?”
চড়ুই এবার হাত তুলে মাথার টায়রাটা ছুঁয়ে একটু বিশেষ ভঙ্গিতে বলল, “এটা টায়রা। টায়রা পরে বউ সাজে। বাক-বাকুম ছড়াতে আছে না?”
বীর একটু অবাক হয়ে বলল, “তাহলে তুমি বউ সেজেছ চুলুই পাখি?”
চড়ুই মিষ্টি করে হেসে ওপর-নিচে মাথা দোলাল। এভাবেই বক্তব্যের পুরোটা সময় তাদের মিষ্টি ফিসফিসানি চলতেই থাকল।
মাইকে অ্যানাউন্স করা হলো, যেসব শিক্ষার্থীরা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয়েছে তারা যেন মঞ্চের পাশে এসে দাঁড়ায়।
মৌটুসী উঠতে যাবে, ঠিক তখনই সাফওয়ান তড়িঘড়ি করে দাঁড়িয়ে বলল, “আপু, আপনি বসুন। আমি ওদের নিয়ে যাচ্ছি। বীর, চড়ুই—চলো চাচ্চু।”
বীর আর চড়ুইকে নিয়ে সাফওয়ান চলে যেতেই মৌটুসী আবার সামনে তাকায়। এবার ওর চোখ যায় স্টেজে দাঁড়ানো নীতির ওপর। সেও রক্তচক্ষু নিয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে ক্রোধ, হিংসা, আফসোস সব সমানভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
মুহূর্তেই মৌটুসীর মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল।
‘আরেকটু জ্বলুক না!’
নীতিকে ঈর্ষার আগুনে জ্বলে পুড়ে ছারখার করে দিতে এবার সে উঠে এসে বোরাকের পাশের সিটটাতে বসে পড়ল।
হঠাৎ মৌটুসীকে পাশে বসতে দেখে বোরাক বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকাল।
মৌ যেন কিছুই হয়নি, এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মিষ্টি হেসে বলল, “আমার জায়গা থেকে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না, মি. বোরাক। এখান থেকে স্টেজটা অনেক পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।”
কথাটা বলার সময় তার অভিব্যক্তি এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল যে দূর থেকে কেউ দেখলে মনে করবে খুব গভীর সম্পর্ক বিরাজমান তাদের মাঝে।
বোরাকও খানিকটা অবাক হলো। এতদিনে এই প্রথম রমণীকে সে নিজ থেকেই এতটা ফ্রি-লি আচরণ করতে দেখল। তবে বোরাক এত ভাবল না। বিস্ময়ের চেয়ে মনের ভেতর অন্য এক অনুভূতিই বেশি জায়গা করে নিল তার—নীরব, অদৃশ্য এক ভালোলাগা। হালকা হেসে বলল, “আরে, এভাবে অনুমতি নিয়ে বসার কী আছে? যেখানে ইচ্ছে বসবেন। দরকার হলে আমার জায়গাটাও ছেড়ে দিতে পারি।”
মৌটুসী মাথা নেড়ে হেসে বলল, “না না, এবার একদম ঠিক আছে। এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।”
বলেই মৌটুসী আড়চোখে তাকাল নীতির দিকে। এবার মেয়েটার চোখে রাগে-দুঃখে একরাশ অসহায়ত্ব আর গভীর হতাশা ভর করেছে যেন। এবারে দেখার মতো হয়েছে মুখটা। দৃশ্যটা দেখে মৌটুসীর ভেতরটা বেশ তৃপ্ত হলো।
তবে সে তা প্রকাশ না করে, নীতির দিকে তাকিয়ে থেকেই খুব ইনোসেন্ট দুঃখী-দুঃখী একটা এক্সপ্রেশন নিল। যেন খুব কৌশলে অবজ্ঞা করছে তাকে। নীতি আর এবার তাকিয়ে থাকতে পারল না। চট করে চোখ নামিয়ে নিল। এমনকি একসময় হাতে থাকা রেজাল্ট শিটটা তার এক সহকর্মীর হাতে দিয়ে হনহনিয়ে স্টেজ থেকেই নেমে গেল মেয়েটা।
এই মুহূর্তে মৌটুসীর এত হাসি পাচ্ছে যে, হাসি আটকে রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে তার পক্ষে। হাসি আটকাতে দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে বসে আছে সে।
“নীলমণিলতা কবিতা পড়েছেন কখনো?”
বোরাকের প্রশ্নে নীতির দিক থেকে মনোযোগ সরে এল মৌয়ের। বোরাকের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বলল, “না, তবে নামটা শুনেছি। রবি ঠাকুরের লেখা না?”
“হুম।”
“আপনি পড়েছেন?”
“পড়েছিলাম, অনেক আগে।”
“হঠাৎ ওই কবিতার কথা মনে হলো কেন?”
বোরাক রমনীর দীর্ঘ পাপড়ি বিশিষ্ট চোখের দিয়ে তাকিয়ে বলল, “হঠাৎই নিজের চোখে কবিতাটার সার্থকতা খুঁজে পেলাম তাই। বুঝলাম, কবিগুরু কেন নীলমণিলতার প্রেমে পড়ে তার এমন সুন্দর একটা নাম রেখেছিলেন। আজ মনে হলো—নামটা সত্যিই তার বাহকের জন্য সার্থক।”
মৌ ভ্রু কুঁচকে কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা? তো আজ হঠাৎ কী এমন অনন্য দেখলেন শুনি?”
বোরাক এবার মৌটুসীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিল। দৃষ্টিতে কোনো ঔদ্ধত্য ছিল না, ছিল না কোনো অশালীনতা—কেবল ছিল একরাশ নিখাদ মুগ্ধতা।
এরপর কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে রবীন্দ্রনাথের নীলমণিলতা কবিতার প্রথম পঙ্ক্তিটি উচ্চারণ করল সে,
“ফাল্গুনী-মাধুরী তার চরণের মঞ্জীরে মঞ্জীরে…”
বোরাকের দৃষ্টি অনুসরণ করে মৌটুসী অবচেতনেই চিবুক নামিয়ে নিজের শাড়ির দিকে তাকাল।পরক্ষণেই যেন সবকিছু বুঝে ফেলল সে।
বিস্ময়ে চোখ দুটি গোল হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই রমণীর গৌঢ়বর্ণের কপোলদ্বয় কোমল রক্তিম আভায় রঙিন হয়ে উঠল। লাজুক লতার মতো নুইয়ে পড়ল তার সুন্দর চেহারা। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠল এক টুকরো নিঃশব্দ, লাজমাখা হাসি।
লোকটা কি এতক্ষণ ধরে পরোক্ষভাবে তারই প্রশংসা করছিল?
ইশ… কী লজ্জা!
লজ্জায় মৌটুসীর বুকের ভেতরটা যেন ধুকপুক করে উঠল। অপ্রস্তুত হয়ে শাড়ির আঁচলটা হাতে তুলে গভীর মনোযোগে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সে।
সত্যিই তো!
মনে হচ্ছে যেন নীলমণিলতা ফুলকে কেন্দ্র করেই শাড়িটির নকশা করা হয়েছে। অসংখ্য হালকা নীলাভ-বেগুনি ক্যালিক্সের ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে গাঢ় বেগুনি নীলমণিলতার ফুল।
এর আগেও এই শাড়িটি বহুবার পরেছে মৌটুসী। অনেকের কাছ থেকে সুন্দর সুন্দর প্রশংসাও কুড়িয়েছে। কিন্তু কেউ কখনো এভাবে শাড়ির নকশার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য আবিষ্কার করেনি। কেউ তাকে এমন গভীর উপমায়, এমন মুগ্ধ ভাষায় দেখেনি কখনো। এমনকি সে নিজেও কখনো এতটা বিচক্ষণতার সাথে নিজেকে জানতে চায়নি।
অথচ লোকটা? সে সত্যিই অন্যরকম।সবাই চেয়ে একটু বেশিই সংবেদনশীল। একটু বেশিই বিশেষ।
মৌটুসী আর লজ্জায় বোরাকের দিকে তাকাতে পারল না। অথচ বোরাক ঠিকই আড়চোখে নীলমণি লতার লাজুক মাখা সৌন্দর্য দেখে গেল। তার কাছে আরও একবার প্রমাণিত হলো, মেয়েরা পৃথিবীর সব অলংকার ছাপিয়ে শাড়ি আর লাজেই বেশি শোভা পায়।
চড়ুইয়ের গলায় তিনটা মেডেল ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুইটা গোল্ড আর একটা সিলভার। এদিকে বীর কেবল একটা ব্রোঞ্জ মেডেল নিয়ে সাফওয়ানের সাথে স্টেজ থেকে নেমে চড়ুইয়ের কাছে এসে দাঁড়াল। বীর আসতেই চড়ুই ওর গলার ব্রোঞ্জ মেডেলটা হাত দিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগল।
বীর বলল, “চুলুই পাখি তেমাল তিনটা মেডেল আল আমাল একটা।”
চড়ুই এবার তার গলা থেকে একটা গোল্ড মেডেল খুলে নিয়ে বীরের গলায় পরিয়ে দিয়ে বলল, “এখন সমান সমান। তেমারও দুইটা আমারও দুইটা।”
বীর এবার বেজায় খুশি। সাথে সাথে তার ছোট্ট মুখটা ঝলমল করে উঠল।
পাশে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল সাফওয়ান। অজান্তেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। সত্যিই, বন্ধুত্বের টান বড় অদ্ভুত। আর শিশুদের বন্ধুত্ব—সে তো আরও নির্মল, আরও নিঃস্বার্থ। সেখানে হিসাব নেই, অহংকার নেই; আছে শুধু ভাগ করে নেওয়ার সরল আনন্দ।
মৌটুসী পর্ব ২৫
মুচকি হেসে সে বলল, “বীর, বন্ধুকে থ্যাংক ইউ বলে দাও, বন্ধু তোমাকে তার মেডেল দিল না?”
সাফওয়ানের কথা শুনে বীর এবার বলল, “চাচ্চু থ্যাংক ইউ বলবই তো! থ্যাংক ইউ চুলুই পাখি!”
চড়ুইও মিষ্টি হেসে উত্তর দিল, “ওয়েলকাম, বীর বন্ধু।”
“প্রাইজ নেওয়া হয়ে গেছে, এখন চলো চাচ্চুরা!” বলেই সাফওয়ান দুই হাতে দুজনের হাত ধরে পুনরায় তাদের সিটের দিকে এগিয়ে গেল।
