Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ২৮

মৌটুসী পর্ব ২৮

মৌটুসী পর্ব ২৮
ঋতস্বিনী মাহবিশ

মৌটুসীদের বাড়ির গলিটা রাস্তা থেকে অনেকটা সরু-লম্বা হয়ে ভেতরের দিকে চলে গেছে। তার মুখেই জলপাই রঙের ট্র্যাকসুট পরে দাঁড়িয়ে আছে বোরাক। তার পাশেই একটা বাইসাইকেল দাঁড় করানো আছে। ভোরভোরেই সাইকেল নিয়ে পদ্মার পাড়ে গিয়েছিল যুবক। সপ্তাহে অন্তত একদিন নদীর পাড়ে বসে সূর্যোদয় দেখার চেষ্টা করে সে। আর আজ সেখান থেকেই সরাসরি এখানে এসেছে। উদ্দেশ্য চড়ুইকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া। বাচ্চাটাকে এখনও অব্দি বাসায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি; এককথায় বোরাকের ছোট্ট কিংডমে এখনো পর্যন্ত তার একমাত্র প্রিন্সেসের পা পড়েনি। এটা কি মেনে নেওয়ার মতো কোনো অপূর্ণতা? এছাড়াও আজকে তার কলিজার টুকরোটার জন্য বেস্ট ওয়েক আপ গিফট হবে তার চড়ুই পাখির কিচিরমিচির।
​প্রায় দশ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছে বোরাক। মাঝে মাঝে জনশূন্য নিস্তব্ধ রাস্তার এদিক-ওদিক হাঁটাচলা করছে, আবার ফিরে এসে প্রতীক্ষমাণ চোখে গলির দিকে তাকিয়ে থাকছে।
​এই পর্যায়ে কিছুটা অধৈর্য হয়েই কব্জির স্মার্টওয়াচের দিকে তাকাল বোরাক। ঠিক তখনই সামনে থেকে ভেসে এল এক টুকরো মধুর ডাক—

— “পাপা!”
​শব্দটা কানে পৌঁছাতেই বোরাক চট করে মাথা তুলে তাকাল।
গলির ভেতর থেকে মৌটুসীর হাত ধরে টুকটুক করে এগিয়ে আসছে ছোট্ট চড়ুই। ভোরের রোদের মতোই ঝলমলে তার মুখটা। গালভর্তি নিষ্পাপ হাসি, বড় বড় চোখে টলমল করছে সীমাহীন উচ্ছ্বাস। পাপা নামক মানুষটাকে দেখেই ছোট্ট পায়ে হাঁটার গতি আরও বেড়ে গেল তার।
​আর ঠিক সেই মুহূর্তে…
হঠাৎ, একেবারে হঠাৎই এক দমকা বাতাস বয়ে গেল ধরণীর বুক চিরে। সাথেই সাথেই বাতাসের ঝাপটায় মৌয়ের মাথায় আলতো করে জড়ানো সুতির ওড়নাটা পেছনে সরে গেল। আলতো একটা হাত ফোপাঁ করে রাখা আলুথালু চুলগুলোও মুক্তি পেয়ে হাওয়ার সঙ্গে উড়ে উঠল। ঘুমের শেষ আবেশটা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে জীর্ণ মুখটা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে একটু মোটা-গোলগাল দেখতে লাগছে তার। আধো ঘুমে ভেজা চোখদুটোতে কিঞ্চিৎ বিরক্তি, যেন এত সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়ে জরুরি তলব করায় বেজায় অখুশি সে।

​দিনের শুরুতেই এমন এক অপার্থিব রূপ দেখে বাতাসের হুাঁসাঁ শব্দের সঙ্গেই বোরাকের কানে বেজে উঠল নজরুলের সেই বিখ্যাত গানটির পঙ্ক্তি—
বনফুল আবরণ খুলিয়া ফেলিয়া,
আলুথালু এলোকেশ গগনে মেলিয়া,
পাগলিনী নেচে যায় হেলিয়া দুলিয়া,
ধুলি ধূসরি বায়….
জল তরঙ্গে ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি ঢেউ তুলে সে যায়…
​সকালের এই স্নিগ্ধ আলোয় রমনীকে সাক্ষাৎ এক স্নিগ্ধ পাগলিনীই লাগছে। এই যে, চড়ুইয়ের দ্রুততম হাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছুটা এলোমেলো পা ফেলে হেলেদুলে এগিয়ে আসছে নজরুলের রূপকথার সেই পাগলিনী!
​চড়ুই বোরাকের নিকটে এসেই তার দুই হাত উঁচিয়ে ধরল। বোরাক শিরদাঁড়া বাঁকিয়ে কোলে তুলে নিল মেয়েকে।

​— “পাপা তুমি এসেছ?”
​— “হ্যাঁ বাবা। পাপা এসেছি।”
​— “কিন্তু আমার বীর বন্ধু কোথায়?”
​— “বীর বন্ধু বাসায়, ঘুমাচ্ছে। পরে দেখা হবে।”
​”ওওও।” চড়ুই বোরাকের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল।
​এই সুযোগে বোরাক মৌয়ের দিকে তাকিয়ে টুপ করে একবার চোখ টিপ দিল, বাঁকা হেসে বলল, “হোয়াট’স আপ পাগলিনী?”
​”হাহ্? পাগলিনী? হু ইজ পাগলিনী?” ভ্রূ কুচকে বলেই দ্রুত হাতে ওড়নাটা মাথায় তুলে আলুথালু চুলগুলো আড়াল করে দিল মৌ।
​”আমার মেয়ে আর আপনি ব্যতিত আর কেউ আছে এখানে? আর আমি নিশ্চয়ই আমার মেয়েকে পাগলিনী বলব না! অতএব….”
​”আচ্ছা? পাগলিনীর খেতাব যেহেতু পেয়েই গেলাম। হাতটা বাড়িয়ে দিন, কামড়ে দিয়ে তার কার্যত প্রমাণ করি!”
​”উফ বাইট! সুন্দরীর দাঁতের বাইট! চরম সৌভাগ্য আমার। নিন ম্যাডাম, ধন্য করুন এই অধমকে”
​বলেই বাঁ হাতে চড়ুইকে আগলে, চরম উৎসাহ নিয়ে ডান হাতটা মৌয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল বোরাক। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি তার।
​বোরাকের এমন আচরণে মৌটুসী ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। সে তো একটু লোকটাকে ‘ঘ’ ঘাটাতে বলেছিল, সত্যি সত্যি নাকি? অথচ লোকটা তাকেই টাইট দিয়ে দিল এভাবে? হায়াংসহীন ব্যাটাজাত!
“হ্যালো মিস! আই এম ডেসপারেটলি ওয়েটিং….. নিশ্চুপ মৌয়ের চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে মনে করিয়ে দিল বোরাক।
​মৌ এবার উল্টো বিরক্তমাখা কণ্ঠে বলল,
“অহ! এত সকালে কী জন্য এসেছেন এখনো বলেননি কিন্তু! ”
​বোরাক মুখটা ছোট করে বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা সরিয়ে আনল। খুব আশাহত হওয়া ভান করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“আমার রাজকন্যাকে তার রাজ্য ভ্রমণে নিয়ে যেতে এসেছি। আজকে আর পাচ্ছেন না মেয়েকে।”
​”মানে? চড়ুইকে কোথাও নিয়ে যাবেন?”
​”হুম, বাসায়। আজকে সারাদিন আমার সাথে থাকবে।”
​কথাটা শুনেই চড়ুই আনন্দে বলে উঠল,
​”আমাকে তোমার বাসায় নিয়ে যাবে, পাপা?”
​”হ্যাঁ মামনি। বীর বন্ধুর কাছে।”
​”ইয়ে! অনেক মজা হবে!”
​চঞ্চল মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মৌ কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল। ইতস্তত করে বলল,
“কিন্তু… না মানে, ও যদি আপনাকে বিরক্ত করে?”
​”আপনাকে টেনশন নিতে হবে না, আমি সামলে নেব। ইউ নো, আই অ্যাম অ্যান এক্সপার্ট ফাদার!” শেষের কথাটা ঘাড় নাচিয়ে বেশ গর্ব নিয়ে বলল বোরাক।
​”আচ্ছা, ঠিক আছে।” এরপর মেয়েকে পইপই করে বলে দিল, “চড়ুইপাখি পাপাকে একদম বিরক্ত করবে না, কেমন?”

​চড়ুই এবার কপাল কুঁচকে বলল, “তুমি যাবে না মাম্মা?”
​উত্তরে বোরাক নিজেই বলল,
“না, বাবা। মাম্মা যাবে না। সাইকেলে তোমার মাম্মার জায়গা হবে না তো!”
​এরপর আড়চোখে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তবে মাননীয়া রানি সাহেবা যদি এই সুপুরুষের ঘাড়ে চড়ে বসে রাজ্য ভ্রমণে যেতে চান, নির্দ্বিধায় যেতে পারেন।”
​বোরাকের এই কথার অন্তর্নিহিত গভীরতা মাপতে গেল না মৌ। বরং ওর আত্মপ্রশংসামূলক কথা শুনে আনমনেই ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড় করে উঠল—
“​হু! আসছে খুব সুপুরুষ!”

​বিছানার ওপর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বীর। চড়ুই ঘরে ঢুকেই সোজা বিছানায় উঠে বসল, তারপর আস্তে করে বীরের শরীরটা একটু ঝাঁকিয়ে নরম গলায় ডাকল—
​— “বীর বন্ধু, ওঠো! দেখো, সকাল হয়ে গেছে। ওঠো!”
​কিছুক্ষণ পর বীর আস্তে আস্তে চোখ মেলল। কিন্তু চোখ খোলার পর মুহূর্তেই তার পলকহীন দৃষ্টি অস্বাভাবিক হারে বড় হয়ে গেল! পরক্ষণেই হাউমাউ করে শব্দ করে কেঁদে উঠল সে। কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে ডেকে উঠল— “পাপা! পাপা!”
​বীরের এমন আকস্মিক কান্নায় ভড়কে গেল চড়ুই! ভয় পেয়ে এক বিছানার কোণে কুঁকড়ে রইল সে।
​বীরের কান্না আর চিৎকারে ঘুমন্ত টাইটান জেগে উঠে এক লাফে বীরের কাছে চলে এল। ওর বুকের ওপর পা তুলে দিয়ে অভয় দিতে লাগল ওকে। সেই সঙ্গে বিছানায় অপরিচিত চড়ুইকে বসে থাকতে দেখে তীব্র শব্দে মেও মেও করে শাসাতে লাগল ওকে। এতে চড়ুই আরও বেশি ভয় পেয়ে গেল যেন। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে বসে রইল সে।
​এদিকে বোরাক ওয়াশরুমে ছিল। ছেলের হঠাৎ কান্নার আওয়াজ শুনে কাজ রেখেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বিদ্যুৎগতিতে বিছানার কাছে চলে এল। এক লাফে বিছানায় উঠে এক টানে ছেলেকে নিজের বুকের সঙ্গে জাপটে ধরল সে। বোরাকের আকস্মিক ও ভারী লাফে বিছানাটা দুলে উঠল খানিকটা।
​বীর পাপার বুকে মুখ গুঁজে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অস্পষ্ট স্বরে আওড়াতে লাগল—

​— “পাপা, খেয়ে নেবে! লাক্ষস খেয়ে নেবে!”
​— “না বাবা, পাপা আছি! কে আমার কলিজাকে খাবে? আমি তো আছি জানবাচ্চা, পাপা আছে!”—ছেলেকে বুকে জড়িয়ে অস্থির হয়ে পড়ল বোরাক।
​এদিকে বিছানার কোণে কুঁকড়ে বসে থাকা চড়ুই ভীতু গলায় বলল— “পাপা, আমি বীর বন্ধুকে কিচ্ছু করিনি!”
​বোরাক এক হাত বীরের পিঠে বুলিয়ে শান্ত করতে করতে, অন্য হাতের তর্জনী ঠোঁটে চেপে চুপ থেকে কাছে আসার ইশারা করল চড়ুইকে।
​চড়ুই পাপার কথামতো চুপচাপ হামাগুড়ি দিয়ে বোরাকের কাছে চলে এল। বোরাক এবার দুই হাতে তার দুই সন্তানকে এক সুতোয় আগলে নিল নিজের শরীরের সঙ্গে। অস্থির টাইটানকেও চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে শান্ত হতে বলল।
​কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। বীরের কান্না ধীরে ধীরে থামল। বোরাক তখন পরম যত্নে কপালে চুমু খেয়ে, আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল—
​— “কী হয়েছিল আমার জানবাচ্চার? খারাপ স্বপ্ন দেখেছে আমার বাবা?”
​বীরের চোখ তখনো বন্ধ, ভেজা। এবার আস্তে করে চোখ খুলে সরাসরি বোরাকের চোখের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল—

​— “পাপা, আমি চোখ খুলেই চুলুই পাখিকে দেখতে পেয়েছিলাম! আমাল দিকে লাক্ষসের মতো এই-ই বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে ছিল। আর বলছিল খেয়ে নিবে। তাই খুব ভয় পেয়েছি…..”
​বোরাক বুঝল, ছেলে তার ঘুম থেকে উঠেই সরাসরি অনাকাঙ্ক্ষিত চড়ুইকে দেখে ওর অচেতন মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়েছে, ফলে চড়ুইয়ের মাঝে বীরের কল্পনার রাক্ষসের রিফ্লেকশন দেখেছে সে। বোরাক মৃদু হেসে আদরের সুরে বলল—
“আমার কলিজাটা রাক্ষস দেখেছে?”
​”হুম।”
​”এখন যদি সত্যি সত্যি চড়ুই পাখি আমাদের বাসায় আসে, তাহলেও কলিজা ভয় পাবে?”
​”না। চুলুই পাখিকে ভয় পাই না তো! শুধু লাক্ষসকে ভয় লাগে।”
​”আচ্ছা, তাহলে চড়ুই পাখিকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসি এখন?”
​উৎসাহে বীরের ডাগর ডাগর চোখ দুটো আরও প্রসারিত হয়ে গেল। “অনেক মজা হবে তাহলে। মাম্মা আল চুলুই পাখিকে নিয়ে এসো পাপা, অনেক মজা হবে!”
​”আচ্ছা, তাহলে কালকে সাফওয়ান চাচ্চু তোমাকে যে ছড়াটা শিখিয়ে দিয়েছিল, সেটা বলে ডাকো দেখি চড়ুই পাখিকে।”
​”কোন ছলাটা?”
​”ওই যে, চড়ুই পাখি বারোটা, ডিম পেরেছে…..”

​”পাপা আমি বলব, আমি”—চটজলদি বোরাককে থামিয়ে দিয়ে নিজেই বলতে শুরু করল বীর, “চুলুই পাখি বালোটা, ডিম পেলেছে তেলোটা একটা ডিম নষ্ট, চুলুই পাখিল কষ্ট!”
​বোরাক এবার চড়ুইকে আগলে রাখা হাতটা নাড়িয়ে ওকে ইশারা করল। পাপার ইশারা বুঝে চড়ুই টুপ করে মুখের ওপর থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে এক গাল হেসে বলে উঠল, “বীর বন্ধু টুকি!”
​এবার আর বীরের সজাগ মস্তিষ্ক চড়ুইকে সামনে দেখে ভয় পেল না। বরং ভয়ের রেশ নিমেষেই কেটে গিয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল সে। চোখমুখ পরম আনন্দে চকচক করে উঠল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে একপ্রকার চিৎকার করে উঠল বীর,
“পাপা, এসেছে। চুলুই পাখি সত্যি সত্যি এসেছে!”

​চড়ুইকে বোরাকের কাছে দিয়ে এসে নিশ্চিন্তে ফের নরম তোসকে শরীর এলিয়ে দিল মৌটুসী। তবে এবার আর ঘুমাল না, এমনিতেও ঘুম আসবে না আর। কিন্তু আলসেমি ছাড়ছে না, অগত্যা আপাদমস্তক কম্বল দিয়ে নিজেকে মুড়ে নিয়ে ফোনে রিলস স্ক্রোল করতে শুরু করল সে।
​ফেসবুকের ফিডে একের পর এক রিলস পার হয়ে যাচ্ছে, এমনই একটা ছোট তৃণমূল সংবাদ পেজের একটা ভিডিও টাইমলাইনে ভেসে উঠল। সংবাদের ভিক্টিম আর থাম্বনেইলটা দেখেই চোখ দুটো পলকে ছানাবড়া হওয়ার জোগাড় মৌয়ের! সে আর শুয়ে থাকতে পারল না, চট করে সোজা হয়ে বসে পড়ল।
​হাসপাতালে বসে করা হয়েছে নিউজটি। ক্যামেরার সামনে কাতরাচ্ছে এক ব্যক্তি। মূলত দুষ্কৃতকারীরা রাতারাতি ওই লোকের অণ্ডকোষ কেটে নিয়ে পালিয়ে গেছে! হা হা কী ফানি, কষ্টদায়কও বটে! অথচ মৌয়ের জন্য এর চেয়ে তৃপ্তিদায়ক সংবাদ আর যেন হতেই পারে না।
​কেননা লোকটা আর কেউ নয়—সেদিন পাহাড়পুরের সেই লম্পট, অসভ্য লোকটা! ওর বুঝতে আর বাকি রইল না যে, এটা কার হুকুমকর্তৃক একটা মহৎ কাজ।
​এমন একটা সত্যি সামনে আসায় সঙ্গে সঙ্গে মৌটুসীর বুকটা প্রচণ্ড ভালো লাগায় কেমন যেন কেঁপে উঠল। সে এবার কমেন্ট বক্সে ঢুকল ভিডিওটা পোস্ট করার তারিখটা চেক করার জন্য। বেশিরভাগ কমেন্টই আজ থেকে প্রায় তিন সপ্তাহ খানেক আগের।

​অর্থাৎ, শুভ ঘটনাটি ঘটে গেছে অনেক আগেই। অথচ এতদিন বিষয়টি তার সম্পূর্ণ অগোচরেই ছিল! বোরাকও মুখ ফুটে তাকে কিচ্ছু বলেনি।
​মৌটুসী যেন আর সহ্য করতে পারল না। হঠাৎ বুক চিরে উঠে আসা এক তীব্র ঘোরে সে ফোনটা বিছানার এক দিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে নিল।
​বুকটা কেমন যেন উথাল-পাতাল করে উঠছে। এত সুখ সুখ লাগছে কেন তার? সে তো নিছকই এক সাধারণ মেয়ে, সমাজের চোখে নিতান্তই তুচ্ছ কেউ। সেদিন তো সে কেবল মুখ ফুটে নিজের ছোট্ট মনের বাসনাটা—একটু নিরাপত্তা, একটু অবিনাশী শান্তির আকূতি—জানিয়েছিল ওই মানুষটার কাছে। আর, প্রায় চোখের পলকে লোকটা অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর করে দিল তা!
​এভাবে যদি সমাজের প্রতিটি মেয়ের মনের অব্যক্ত বাসনাগুলো একে একে পূরণ হয়ে যেত—তা পূরণ করবার জন্য এমন অপ্রতিরোধ্য কেউ হঠাৎ করেই তার জীবনে চলে আসত, তবে হয়তো এই পৃথিবীতে আর কোনো লম্পট অবয়বের কীট অবশিষ্ট থাকত না। এভাবেই একে একে বিনাশ হয়ে যেত মানবাকৃতির নরাধম পশুগুলো।

​চড়ুই পাখিকে পেয়ে বীরের খুশির সীমানা রইল না আর। চড়ুইয়ের হাত ধরে পুরো বাড়ি ছুটে বেড়াচ্ছে সে। চড়ুই পাখিকেই সে কোথায় নিয়ে যায়, আর কী দেখায় চরম অস্থির বীরের ছোট্ট সত্তা। ঘুরে ঘুরে এবার আরোয়ার দরজার গিয়ে থামল সে। দরজায় গিয়ে হাতের তালু দ্বারা চাপড় দিয়ে ডাকতে লাগল ফুপুমনিকে। কিছুক্ষণ পর আরোয়া এসে দরজা খুলে দিল। সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বীর চটপটে গলায় বলল,
“আলোয়া ফুপুমনি দেখো কে এসেছে, চুলুই পাখি এসেছে।”
​আরোয়া দরজার কপাটে হেলান দিয়ে দাঁড়াল, চড়ুইয়ের আপাদমস্তক একবার পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে বলল,
“ওওও! এটাই তাহলে তোমার সেই চড়ুই পাখি বীর সোনা?”
​ওপর-নিচ ঘনঘন মাথা নাড়াল বীর, “হ্যাঁ!”
​চড়ুই পিটপিট চোখে চেয়ে থাকে আরোয়ার দিকে। আরোয়া মিষ্টি হেসে হাত বাড়িয়ে ওর নরম গাল টেনে দিল, “সো…..সুইট বার্ড!”
​”একসাথে দাঁড়াও তো, কয়েকটা ছবি তুলে রাখি তোমাদের।” বলে আরোয়া ঘর থেকে ফোনটা নিয়ে এল।
​”একসাথে সুন্দর করে দাঁড়াও দুজনে।”
​চড়ুই ও বীর পাশাপাশি হাত ধরে দাঁড়াল।
​”একটু হাসো বাচ্চারা।”
​তারা হাসল। আর আরোয়া সেই মুহূর্তের কয়েকটা পিকচার ক্লিক করে নিল। ছবিগুলো স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই আরোয়া মুগ্ধ হয়ে বলে উঠল—
“ওয়াও! হাউ সুইট ইউ আর বোথ!”
​চড়ুই এবার বীরের হাত ছেড়ে গুটি গুটি পায়ে আরোয়ার কাছে গিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

​— “ফুপুমনি, দেখি কেমন হয়েছে ছবিটা?”
​— “ওওও, চড়ুই পাখি ছবি দেখতেও ভালোবাসে নাকি! দেখো, দেখো।”—আরোয়া ফোনটা একটু নিচু করে চড়ুইয়ের চোখের সামনে ধরল। তারপর জিজ্ঞেস করল— “ভালো হয়েছে?”
​চড়ুই ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
​— “হ্যাঁ, অনেক সুন্দর!”

মৌটুসী পর্ব ২৭

“​ফুপুমনি আমিও দেখব, আমাকেও দেখাও”, বীরও এগিয়ে এল ছবি দেখতে।
আরোয়া বীরের দিকে স্ক্রিন ঘুরিয়ে দিল, “এই যে বাবা।”
ছবি দেখে বীর বলল, “অনেক সুন্দল ছবি!”
আরোয়া ফোন উঠিয়ে নিয়ে বলল,
“বড় হয়ে বীরের চড়ুই পাখি কখনো হারিয়ে গেলে, এই ছবিগুলো দিয়ে আমরা খুঁজব তাকে, কেমন?”

মৌটুসী পর্ব ২৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here