Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ৩৬

মৌটুসী পর্ব ৩৬

মৌটুসী পর্ব ৩৬
ঋতস্বিনী মাহবিশ

রাতের অবরোধ শেষে ভোরের দিকেই রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছিল। তাই আর দেরি না করে বোরাকও মৌটুসীকে নিয়ে রওনা দিল। রাত জাগা ক্লান্তি দুজনের চোখেমুখেই স্পষ্ট। শহরের নিত্য ব্যস্ততা জেগে উঠতে শুরু করার আগেই গাড়িটা মৌটুসীদের বাড়ির কাছাকাছি এসে থামল। বোরাক গাড়ি থামিয়ে মৌটুসীর দিকে তাকাল।
— “আজ আর অফিসে আসার দরকার নেই। বাসায় গিয়ে ভালো করে রেস্ট নাও।”
মৌটুসীও মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— “আচ্ছা। আর চড়ুই?”
​বোরাক একবার কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটার দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, স্কুলের সময় হয়ে এসেছে প্রায়। সাফওয়ান ওদের স্কুলে নিয়ে আসুক, কি বলো?
“​আচ্ছা, স্কুল থেকে এখানেই পাঠিয়ে দিয়েন।”
“​হুম।”
​আর হ্যাঁ, আপনার ছোট বোন তো মনে হয় বাড়িতে নেই। তাহলে স্কুল শেষে বীর কার কাছে থাকবে?
“​সমস্যা নেই। পরিচারিকারা আছে। ওরা দেখে রাখবে।”
“​তার দরকার নেই। আমি যেহেতু অফিসে যাচ্ছি না। আমার কাছে থাকবে। দুজনকেই এখানে পাঠিয়ে দিবেন।”
​”আচ্ছা, ঠিক আছে।”
​দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে এল মৌটুসী। এরপর দরজা আটকানোর আগে একবার বোরাকের দিকে তাকাল। লোকটা স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মৌ মৃদু স্বরে বলল, “আপনিও বাসায় গিয়ে আগে একটু রেস্ট করে নিবেন, তারপর অফিস-কাজ।”
​বোরাক মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, “হুম। যাও, বাই।”

​কাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে লম্বা একটা ঘুম দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল মৌটুসী। কাল শেষ রাতে ঘরে এসে সামান্য সময়ের জন্য চোখ লেগেছিল, তার কিছুক্ষণ পরই আবার ভোরে রওনা দিতে হয়েছে। ফলে ঘুম বলতে তেমন কিছুই হয়নি। শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধি যেন বিশ্রামের জন্য আকুল হয়ে আছে।
বিছানায় শুয়ে শরীরটা এলিয়ে দেওয়ার আগমুহূর্তে বাইরে থেকে মেহেরুনের কণ্ঠ ভেসে এলো।
কাল রাতে মৌটুসী বাড়িতে ফেরেনি—ব্যস, এই এক বিষয় নিয়েই সকাল সকাল নানা রকম কটুকথার পসরা সাজিয়ে বসেছে সে। মৌটুসী প্রথমে কান আড়ি দিয়েই রইল। ক্লান্ত শরীরে এসব অনর্থক কথার জবাব দেওয়ার মতো ইচ্ছা, রুচি—কোনোটাই তার নেই।
কিন্তু লাল বানু বেগম মেয়ের দুর্নাম সহ্য করতে পারলেন না। অস্থির হয়ে মুখ খুলে তর্কে লিপ্ত হতে যাচ্ছিলেন। মৌটুসী দরজা খুলে বেরিয়ে এল তক্ষুণি। মায়ের দিকে তাকিয়ে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা দিল,

— “আম্মা, খবরদার তোমার মুখে একটা কথাও যেন না শুনি। কাজ থাকলে সেটা চুপচাপ করো। আর কাজ না থাকলে ঘরে এসে বসে থাকো।”
মেয়ের কণ্ঠের দৃঢ়তায় লাল বানু বেগম সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেলেন।
মৌটুসীর কথার উপর বাড়তি কিছু বলার সাহস তার নেই। মেয়েটা যে তার ভীষণ রাগী। অথচ এতদিন ধরে আশপাশের মানুষের কত কথা, কত ইঙ্গিত, কত অপবাদ শুনেও সে নিজের রাগ সংযত করে রেখেছে। তার উপর তিনিও যদি উত্তেজিত হয়ে পরিস্থিতিটা আরও ঘোলাটে করে দেন, তাহলে শেষ পর্যন্ত সামлаবে কে?
​মৌটুসী আর এক মুহূর্তও বাইরে দাঁড়াল না। মেহেরুনের কটুকথাগুলো যেন কানে ঢুকছেই না—এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেল। দরজাটা ভেতর থেকে ভিজিয়ে দিয়ে ফ্যানের গতি বাড়িয়ে দিল সর্বোচ্চে। তারপর বিছানায় গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল। কাঁথাটা টেনে আপাদমস্তক ঢেকে নিয়ে চোখ বন্ধ করল সে।

​নার্সারির কচিকাঁচাদের নিয়ে ক্লাসরুমটা তখন বেশ সরগরম। টিচার সিরিয়াল অনুযায়ী একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন—বড় হয়ে তারা কে কী হতে চায়।
​একজন বুক ফুলিয়ে বলছে ডাক্তার হবে, আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার, কেউ পুলিশ কেউ পাইলট, কেউ আবার টিচার ইত্যাদি ইত্যাদি। ছোট্ট বয়সে ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন উচ্চাভিলাষী স্বপ্নই তো স্বাভাবিক।
​এবার টিচার এগিয়ে এলেন বীর আর চড়ুইয়ের বেঞ্চের কাছে। দুজন পাশাপাশি বসে মন দিয়ে সবার কথা শুনছিল।
টিচার বীরের মাথায় আলতো করে হাত রেখে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন,

— “বীর, তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?”
বীর এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর একেবারে সরল মুখে বলে উঠল,
“​আমি তো বলো হয়ে গালি চালাব!”
​ভদ্রমহিলা তৎক্ষণাৎ বীরের কথাটা ধরতে না পেরে একটু বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, বীর গালি চালাবে?
​বীর এবার আরও উৎসাহ নিয়ে দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে বলল,
“হুম, অনেক বলো বলো ট্লাক গালি চালাব। পাপা কিনে দিবে।”
​এবার যেন বিষয়টা পুরোপুরি বুঝতে পারলেন টিচার। তিনি কিছু বলার পূর্বেই পাশ থেকে চড়ুই টুপ করে বলে উঠল,
“মিস বীর বন্ধু বলেছে গাড়ি চালাবে। ট্রাক গাড়ি।”
​ভদ্রমহিলা এবারে আর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। ফিক করে হেসে উঠে বীরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, আচ্ছা! বীর শিকদার তাহলে বড় হয়ে ট্রাক গাড়ি চালাবে?
​”হ্যাঁ।” উজ্জ্বল মুখে উপর নিচ মাথা দোলাল বীর।
​টিচার এবার চড়ুইকে জিজ্ঞেস করলেন,
“চড়ুই কি হতে চায়?”
​চড়ুই উত্তর করতে সময় নিল না, গর্বিত ভঙ্গিতে চট করে বলল,
“আমি তো অনেক বড় হয়ে ডাক্তার হব। আর সবার চিকিৎসা করব।”

​খা খা দুপুর। ঘরের পর্দা টেনে দেওয়া, ফ্যানের মৃদু বাতাসে চারপাশটা বেশ আরামদায়ক। মৌটুসী চিৎ হয়ে বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মুখটা ঘুমের প্রশান্তিতে শান্ত, এলোমেলো চুলগুলো বালিশজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
সাফওয়ান বীর আর চড়ুইকে স্কুল থেকে নিয়ে মৌটুসীদের বাড়িতে পৌঁছে দিল। বাড়িতে ঢুকেই পুঁচকে দুটো যেন আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারল না। মাম্মা মাম্মা করে ছুট দিল মৌটুসীর ঘরের দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই মাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে দুজন একসঙ্গে খাটে উঠে পড়ল।

— “মাম্মা… মাম্মা…”
এদের দুজনই মৌয়ের বুকের দুপাশে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল।
​মৌটুসীর ঘুম ভাঙল না। বরং বুকের দুই পাশে সন্তানদের পরিচিত উষ্ণতা টের পেতেই তার ঘুম যেন আরও গভীর হয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল অতি ক্ষীণ এক টুকরো হাসি। ঘুমের ঘোরেই দু-হাত বাড়িয়ে দুজনকে আরও একটু শক্ত করে নিজের বুকের কাছে আগলে নিল সে।
​বীর মায়ের নরম বুকে মুখ ডুবিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকলেও অশান্ত চড়ুই মাথা উঁচু করে মায়ের গালে হাত রেখে ডাকল, “মাম্মা উঠো…. চড়ুই পাখি মিসড ইউ।”
​মৌটুসী ঘুমের মধ্যেই অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল—

— “উমম… হুম…”
​— “উঠো না! উঠো। চড়ুই পাখির মজা আর গিফট দেখাও।”
কথা শেষ করেই মায়ের গালে টুপটাপ দুটো চুমু বসিয়ে দিল।
​এদিকে লাল বানু বেগম দরজায় এসে সাফওয়ানকে ভেতরে বসবার জন্য জোরজুড়ি করতে লাগলেন,
— “আব্বা একটু ভেতরের ঘরে বইয়া একটু জিরাইয়া যাও। মৌ ভেতরেই আছে।”
সাফওয়ান বিনয়ী হেসে মাথা নাড়ল।
— “না আন্টি, আজকে একটু তাড়া আছে। অন্যদিন বসব।”
— “আরে আব্বা যাইবাই তো! দুইডা মিনিট ফ্যানের নিচে বইয়া যাও।”
— “আজকে না আন্টি, বসলে সত্যিই দেরি হয়ে যাবে।”
অগত্যা লাল বানু বেগম আর জোর করলেন না। তবে ছেলেটাকে খালি মুখে যেতে দেবেন—এটাও তাঁর স্বভাব নয়।

— “আইচ্ছা বইবা না যাইতে, একটু খাড়াও। ঠান্ডা পানি লইয়া আয়ি। খাইয়া যাইও।”
সাফওয়ান আর আপত্তি করল না।
কিছুক্ষণ পর লাল বানু বেগম এক গ্লাস ঠান্ডা পানিতে সামান্য লেবুর রস আর চিনি মিশিয়ে শরবত বানিয়ে এনে সাফওয়ানের হাতে দিলেন। সাফওয়ান মুচকি হেসে গ্লাসটা হাতে নিয়ে শরবতটুকু খেয়ে ফেলল। তীব্র এই গরমে ঠান্ডা তরলটুকু যেন মরুভূমির বুকে এক পশলা ঠান্ডা বৃষ্টির মতো কাজে দিল। খাদ্যনালী থেকে পেট পর্যন্ত শীতল হয়ে এল। খাওয়া শেষে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিল সে,
“ধন্যবাদ আন্টি।”
ভদ্রমহিলা মুচকি হেসে গ্লাসটা হাতে নিলেন।
“আসি আন্টি।”
“আইচ্ছা আব্বা। যাও।”

​মৌটুসী তার দুই পুঁচকেকে একে একে গোসল করিয়ে, খাইয়ে-দাইয়ে এবারে বিছানার উপর বসিয়ে দিল। এরপর তাদের সামনে খেলনার ঝুড়ি থেকে সব খেলনা নামিয়ে রেখে বলল,
“মাম্মা এখন একটু কাজ করবে বাচ্চারা। তোমরা মজা করে খেলো।”
​চড়ুইয়ের খেলনা বলতে প্লাস্টিকের হাঁড়িপাতিল, ব্লক, পুতুল আর ডাক্তারি সরঞ্জাম। দুজন সেগুলো নিয়েই খেলতে ব্যস্ত হয়ে গেল। মৌটুসী ঘরের টুকটাক কাজ গুছিয়ে নিজেও এবার গোসলে ঢুকে পড়ল।
​বিছানার উপর ছড়িয়ে আছে ডাক্তারের সরঞ্জাম—ছোট একটা স্টেথোস্কোপ, থার্মোমিটার, সিরিঞ্জ, ওষুধের বোতল, এমনকি একটা খেলনা প্রেসক্রিপশন প্যাডও।
চড়ুই গম্ভীর মুখে স্টেথোস্কোপটা দুই কানে লাগিয়ে বীরের দিকে তাকাল।
— “বীর বন্ধু, তুমি অসুস্থ। এখন শুয়ে পড়ো। আমি তোমার চিকিৎসা করব।”
বীরও বাধ্য রোগীর মতো সঙ্গে সঙ্গে পাশে সটান শুয়ে পড়ল।
চড়ুই অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে স্টেথোস্কোপটা তার বুকে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক শুনল। তারপর হঠাৎ চোখ বড় বড় করে আঁতকে উঠল,

— “আহ! বীর বন্ধু, তোমার খুব বেশি অসুখ হয়েছে!”
বীরের চোখ গোল হয়ে গেল।
— “কী অসুখ, চুলুই পাখি?”
চড়ুই গম্ভীর মুখে বলল,
— “তুমি সারাদিন শুধু খেলা করো, পড়াশোনা করো আর স্কুলে যাও। তাই তোমার অসুখ হয়েছে। এখন তোমাকে সুই দিতে হবে।”
বলেই সে খেলনা সিরিঞ্জটা হাতে তুলে নিল।
​বীর সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।
— “না চুলুই পাখি, আমি সুই দিব না। সুই দিলে ব্যথা লাগে।”
— “দিতেই হবে। না হলে তোমার অসুখ ভালো হবে না।”
— “না দিব না। মাম্মা…..”
বীর কেঁদে কেঁদে উঠল। ভয়ে পিছাতে যাবে, তার আগেই চড়ুই তার হাত ধরে ফেলল। তারপর অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে খেলনা সিরিঞ্জটা হাতে ঠেকিয়ে বলল,

— “বীর বন্ধু হয়ে গেছে। কান্না করে না।”
বীর নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “একটুও ব্যথা হয়নি চুলুই পাখি।”
চড়ুই সিরিঞ্জটা বীরের হাতের উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলল,
— “আমি তো খুব ভালো ডাক্তার!”
তারপর সিরিঞ্জটা রেখে প্রেসক্রিপশন প্যাডটা টেনে নিয়ে তাতে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বলল,
— “এখন তোমাকে অনেক ওষুধ খেতে হবে।”
​বীর মাথা কাত করে চড়ুইয়ের আঁকিবুঁকি দেখতে দেখতে বলল,

“ওষুধ খেতে হবে? অসুখ হলে ওষুধ খেতে হয়। আমি মিষ্টি ওষুধ খাই।”
​তন্মধ্যেই গোসল সেরে ঘরে ফিরল মৌটুসী। মাথার ভেজা চুল গামছায় জড়িয়ে রেখেছিল। ঘরে ঢুকেই গামছাটা মাথা থেকে খুলে চুলগুলো দু-একবার ঝাঁকিয়ে দিল। তারপর বিছানার দিকে তাকাতেই গাল ভরে হাসল।
— “আমার পাখি দুটো কী করছে?”
বীর সঙ্গে সঙ্গে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,
— “মাম্মা! আমলা তো ডাক্তাল ডাক্তাল খেলা কলছি!”
চড়ুইও খেলনা সিরিঞ্জটা তুলে ধরে বলল,
— “মাম্মা, আমি ডাক্তার আর বীর বন্ধু আমার রোগী। আমি ওকে সুই দিয়ে দিয়েছি।”
মৌটুসী হেসে গামছাটা মেলে দিতে দিতে ওদের কাছে এগিয়ে গেল। দুজনের কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,
“খেলো বাবারা।”
​মৌটুসী ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিংয়ে গিয়ে প্লেটে করে খাবার নিয়ে ঘরে ফিরে এল। এরপর সোফার উপর বসে সন্তানদের খেলা দেখতে দেখতে খেতে শুরু করল।
​চড়ুই আবারও বীরকে নিয়ে তার চিকিৎসার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এবার সে বীরের জ্বর মাপতে প্লাস্টিকের থার্মোমিটারটা ওর ডান হাতের নিচে গুঁজে দিয়ে বলল,

“​বীর বন্ধু এভাবেই বসে থাকো। তোমার জ্বর মাপতে হবে।”
​বীরও হাতের ভাজে থার্মোমিটার চেপে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল। আর চড়ুই গালে হাত দিয়ে মুখটা যথাসম্ভব গম্ভীর করে রেখেছে। সেভাবেই অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ আপনমনে বলে উঠল সে,
​— “মাম্মা, আমি যখন অনেক বড় হব আর সত্যি সত্যি ডাক্তার হব…”
মৌটুসী খেতে খেতেই মেয়ের দিকে তাকাল।
— “তখন আমি একটা অনেক বড় বাড়ি বানাব। আর তুমি, আমি, পাপা, বীর বন্ধু, নানিমনি, নানাভাই আর সাফওয়ান চাচ্চু—আমরা সবাই মিলে একসাথে সেখানে থাকব।”
​মৌটুসী মুখে লোকমা তুলতে যাচ্ছিল। কিন্তু চড়ুইয়ের সরল কথাটা কানে যেতেই তা আর হলো না, মাঝপথেই হাতটা থেমে গেল। স্তব্ধ দৃষ্টিতে অবুঝ ছোট্ট মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল সে।

​দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার পথে। দুই বাচ্চাকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে মৌটুসী। বীর আর চড়ুই দুজনেই তার দুই পাশে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। বীরের ছোট্ট মাথাটা তার বাহুতে রাখা, আর ডান হাত জামা আঁকড়ে ধরে আছে। চড়ুইটা চিৎ হয়ে ঘুমাচ্ছে, মাথাটা ওপাশ ফিরে রাখা। বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ নিরিবিলি শুয়ে থাকতে থাকতে মৌটুসীর নিজের চোখদুটোও ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছিল।
ঠিক তখনই বালিশের পাশে রাখা ফোনটা মৃদু শব্দে বেজে উঠল। ঘুমঘুম বিরক্তি নিয়ে মৌটুসী হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। স্ক্রিনের দিকে ভালো করে না তাকিয়েই কল রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত, ঝরঝরে কণ্ঠ—

— “হাই, মৌটুসী পাখি।”
মৌটুসী আধোঘুমে চোখ না খুলেই বলল,
— “হুম… হ্যালো।”
— “ঘুমাচ্ছিলে নাকি?”
— “শুয়েছিলাম।”
— “বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে?”
মৌটুসী চোখ মেলে দুপাশে তাকাল। দুজনই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।
— “হুম।”
— “আচ্ছা, পাঁচটার দিকে ওদের ডেকে তুলে রেডি করে দিও। আর তুমিও। আমি সাড়ে পাঁচটার দিকে তোমাদের নিতে যাব।”

— “কোথায় যাব?”
— “শিল্পকলা একাডেমি।”
মৌটুসী একটু অবাক হয়ে বলল, “শিল্পকলা একাডেমি? হঠাৎ?”
“হুম, দরকার আছে।”

​বোরাকের কথামতো পাঁচটা বাজতেই মৌটুসী বীর আর চড়ুইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। দুজনকে ভালো করে মুখ-হাত ধুইয়ে, জামাকাপড় পরিয়ে দিতে লাগল। চড়ুইকে পরিয়ে দিল কাঁচা হলুদ রঙের বেবি টপ আর প্লাজো, চুলগুলো উঁচু করে একটা পনিটেল। আর বীরকে পরিয়ে দিল একটা সুতি ফতুয়া আর হাফপ্যান্ট। ওদের তৈরি করিয়ে মৌ এবার নিজেও তৈরি হতে আরম্ভ করল।
​আজ আর তার জাতীয় পোশাক স্কার্ট-ফতুয়া পরল না মৌ। বরং সাদা ধবধবে একটা থ্রিপিস পরে নিল। এরপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মুখে ময়েশ্চারাইজার মাখতে লাগল।
​পেছনে আয়নার প্রতিবিম্বে দেখা যাচ্ছে বীর আর চড়ুইকে। দুজন পাশাপাশি একে অপরের হাত ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে। সদ্য ঘুম ভাঙার কারণে ছোট ছোট চোখগুলো এখনো কিছুটা ফুলে আছে, মুখেও ঘুমের রেশ। তুলনামূলক বেশ শান্ত ও থমথমে হয়ে আছে দুজনই।
​মৌটুসী চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে আয়নায় তাকিয়ে দেখল দুজনকে। তাদের এই গোমড়া ভাব ভাঙানোর জন্য মিষ্টি হেসে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল—

​আকাশে বাতাসে চল সাথী উড়ে যায় ডানা মেলে…
ময়নারে ময়নারে যাবো তোর পিছু ডানা মেলে…
আকাশে ভেসে চল, রূপকথার দেশে চল,
দুই দেশে বাঁধব ঘর পার হয়ে দেশান্তর।
সাত সাগর তেরো নদী পেছনে ফেলে…..

​গানটা সত্যিই ঘুমের রেশে নুয়ে থাকা দুটো ছোট্ট মুখে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরিয়ে দিল যেন। চড়ুইয়ের গোমড়া ঠোঁট ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে হাসিতে বদলে গেল। গানের তালে তালে তার ছোট্ট দুটো হাতও আপনাআপনি শূন্যে উঠে গেল। তারপর আর নিজের নৃত্যসত্তার তাল সামলাতে না পেরে শরীর দুলিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করল সে।
​মৌটুসী আয়নায় মেয়ের কাণ্ড দেখে গান না থামিয়েই মৃদু হাসল। চড়ুই নাচতে নাচতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বীরের হাত টেনে বলল,
— “বীর বন্ধু, নাচো! নাচো!”
​বীর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এবার সেও ছোট ছোট পা ফেলে গানের তালে দুলতে শুরু করল।

বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে শহরের বুকে। বসন্তের মৃদু বাতাসে রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়ার পাতাগুলো দুলছে। ব্যস্ত শহরের ভিড়ের মাঝেও কোথাও কোথাও রিকশার টুংটাং শব্দ, পথের পাশের ফুচকার দোকান থেকে ভেসে আসা গন্ধ, ফুটপাতে হেঁটে যাওয়া মানুষের আনাগোনা।
​চলমান রিকশায় পাশাপাশি বসে আছে বোরাক আর মৌটুসী। আর তাদের কোলে চেপে বসে আছে বীর আর চড়ুই। বাচ্চা দুটো চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, কখনো আবার নিজেদের মধ্যেই ফিসফিস করে কথা বলছে।
​মৌটুসীর চোখদুটোও অবশ্য এক মুহূর্ত স্থির নেই। রিকশা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টিও ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। খোলা বিকেলের বাতাসে তার চুলগুলো পাশের বোরাকের কাঁধ ছুঁয়ে আবার বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। পরনের ধবধবে সালোয়ার-কামিজের ওপর বিকেলের কোমল আলো এসে পড়ায় বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে তাকে।
​হঠাৎ পাশ থেকে বোরাকের মনোমুগ্ধকর কণ্ঠ ভেসে এলো,

— “আজকের প্রকৃতিটা একটু বেশিই সুন্দর, তাই না?”
মৌটুসী চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই মৃদু হেসে বলল,
— “হুম, সুন্দরই তো। বসন্তের প্রকৃতি তো সুন্দর হবেই। এটাই তো নিয়ম।”
বোরাক ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে মাথা নাড়ল।
— “উহু! এই সৌন্দর্য নিয়মবহির্ভূত।”
​মৌটুসী এবার ভ্রূ কুঁচকে একটু কৌতূহলী চোখে তাকাল।
— “কীভাবে?”
​বোরাক স্বচ্ছ আকাশের দিকে চোখ তুলে বলল,
— “প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে বসন্তের আকাশে আজ একমুঠো শরতের সাদা মেঘ নেমে এসেছে।”
এরপরই চোখ নামিয়ে মৌটুসীর দিকে তাকাল।

​মৌটুসী প্রথমে কথাটার অর্থ ধরতে পারল না। অবচেতনেই চোখ নামিয়ে কোলের দিকে তাকাল সে, পরক্ষণেই নিজের শরীরের সাদা পোশাকের দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা কেঁপে উঠল। অকারণেই গাল দুটো উষ্ণ হয়ে উঠতে লাগল। কোনো সূক্ষ্মতর সৌন্দর্যও যেন এই লোকের বিচক্ষণ চোখের আড়ালে রাখা সম্ভব নয়।
​ভালোলাগায় পুলকিত হয়ে উঠল মৌটুসীর নারী মন। চুলের আড়ালে থাকা ফিনফিনে সুন্দর ঠোঁট দুটোর কোণেও একটুখানি লাজমিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল তার।
বোরাক তা দেখল। চোখের কোণে জমে থাকা মুগ্ধতাটা আরও একটু গভীর হলো। আজই প্রথম মৌটুসীকে সালোয়ার-কামিজে দেখছে সে। অথচ অবাক হচ্ছে—যে সুন্দর, সে বোধহয় সব রূপেই সুন্দর। পোশাক-সাজ কোনো ব্যাপারই নয়, শুধু একটা সুন্দর দৃষ্টি দিয়ে দেখার দরকার হয়।

মৌটুসী পর্ব ৩৫

​— “প্রকৃতির মতো এমন একটু-আধটু অনিয়ম হলে খুব একটা ক্ষতি নেই, তাই না মৌটুসী পাখি?”
কথাটা বলেই ধীরে ধীরে হাত বাড়াল বোরাক। বাতাসে উড়ে এসে মৌটুসীর গালে লেপ্টে থাকা কয়েক গোছা চুল আলতো করে আঙুলের ডগায় সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল। সংবেদনশীল এই স্পর্শে কেঁপে উঠল মৌটুসী।

মৌটুসী পর্ব ৩৭