মৌটুসী পর্ব ৩৭
ঋতস্বিনী মাহবিশ
রিকশা এসে থামলো সোজা বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে। প্রশাসনিক ভবনের তিনতলায় উঠে গিয়ে বোরাক একজন পিয়নকে ডেকে বলল,
— “এক্সকিউজ মি ভাই, ড. নাসরিন সুলতানা ম্যাডামকে একটু জানাবেন, বোরাক এসেছে।”
পিয়ন নাম শুনেই সম্মানের হালকা সঙ্গে মাথা নেড়ে ভেতরের রুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল,
— “স্যার, ম্যাডাম আপনাকে ভেতরে যেতে বলেছেন।”
বোরাক মৌটুসী আর বাচ্চাদের নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ডেস্কের ওপাশে বসে থাকা বয়স্ক ভদ্রমহিলার মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— “আরে বোরাক বাবা! এসো, এসো।”
তিনি চেয়ার ছেড়ে প্রায় উঠে দাঁড়ালেন। তাতে পরনের পরিপাটি ঘিয়ে রঙের শাড়িটি ভালোভাবে দৃশ্যমান হলো। মাথায় আধপাকা চুলের সমাহার। ফর্সা হালকা কুঁচকানো মুখটাতে নিদারুণ আনন্দ।
বোরাক এগিয়ে আসতে আসতে সালাম দিল।
ভদ্রমহিলা সস্নেহে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
— “বসো বাবা! এতদিন পর তোমাকে দেখছি! শেষ দেখেছিলাম সেই কিশোরবেলায়। তখন হ্যাংলা পাতলা আর কী লম্বা ছিলে! আর এখন একেবারে বড় মানুষের সাথে সাথে বলিষ্ঠবানও হয়ে গেছ, হু?”
বলেই শব্দ করে হেসে উঠলেন বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা।
বোরাকও মুচকি হেসে একটা চেয়ারে বসে পড়ল, আর তার পাশেরটাতে মৌ।
— “তা বলো কেমন আছো বাবা?”
— “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আন্টি। আপনি কেমন আছেন?”
— “এই তো, আল্লাহর কৃপায় ভালোই আছি। তবে তোমাদের মতো ছেলেমেয়েদের দেখলে মনে হয় সময়টা কী দ্রুত চলে গেল!”
কথা বলতে বলতেই ভদ্রমহিলার চোখ চলে গেল বোরাক আর মৌটুসীর কোলে বসে থাকা বীর-চড়ুইয়ের দিকে। তারা কৌতূহলী চোখে নান্দনিক কেবিনের এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।
তিনি মুচকি হেসে ওদের দিকে চোখের ইশারা করে বললেন,
— “আমার নাতি-নাতনি নাকি?”
বোরাক হেসে মাথা নাড়ল।
— “জি আন্টি।”
— “মাশআল্লাহ! কী সুন্দর হয়েছে দুটো! একেবারে পুতুলের মতো। এদিকে এসো দাদুভাইরা।”
বীর আর চড়ুই একবার বোরাকের দিকে তাকিয়ে উঠে এগিয়ে গেল। ভদ্রমহিলা তাদের দুই হাতে আগले নিয়ে নাম জিজ্ঞেস করলেন। তারপর তাদের সঙ্গে দু-একটা মিষ্টি কথা বলতে বলতেই ভদ্রমহিলার মুখে হঠাৎ বিষণ্ণতার ছায়া নেমে এলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একরাশ আক্ষেপ নিয়ে বললেন,
— “তোমার মা আজ বেঁচে থাকলে কী যে খুশি হতো, বাবা! হতভাগিনীর ঘরে কী সুন্দর দুইটা চাঁদ উঠেছে।”
বোরাক স্থির থেকেই বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা খুব কৌশলে গিলে ফেলল। মৌটুসী নীরবে পুরো ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল। বুঝল, বৃদ্ধা হয়তো বোরাকের মায়ের রিলেটিভ কিংবা ফ্রেন্ড হবেন।
— “তারপর তোমার বোনেদের খবর কী?”
— “ভালোই। আশার বিয়ে হয়েছে ঢাকায়। আর আরোয়া এবার অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে।”
— “বাহ্, ভালো।”
কথা বলতে বলতে বৃদ্ধার দৃষ্টি এবার গিয়ে থামল মৌটুসীর ওপর। কয়েক মুহূর্ত মেয়েটিকে দেখে মুগ্ধ হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে।
— “আমার বৌমাটাও কিন্তু খুব মিষ্টি!”
মৌটুসী এবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। অস্বস্তিতে সামান্য নড়েচড়ে বসে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর আড়চোখে তাকাল বোরাকের দিকে।
অথচ বোরাকের মুখে কোনো হেলদোল নেই। ভুলটা সংশোধন করার সামান্যতম চেষ্টা নেই তার মাঝে। নির্বিকার ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ বসে থেকে মূল প্রসঙ্গে এল সে,
— “আন্টি, আমার মেয়েটার নাচের প্রতি খুব আগ্রহ। তাই আপনার কাছে নিয়ে এলাম, নাতনিকে শিষ্য করতে কোনো আপত্তি নেই তো?”
ভদ্রমহিলা হেসে উঠে বললেন,
— “কী যে বলো বাবা! এই শরীরে আর আমার গুরু হওয়া সম্ভব? এখন তো নাত-নাতনিরাই এই বুড়ির গুরু হয়ে বুড়িকে নাচাবে।”
শিল্পকলা একাডেমিতে ভর্তি করানো হলো ছোট্ট চড়ুইকে। প্রতি শুক্রবার বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত তার নাচের ক্লাস থাকবে। এছাড়াও তার নাচের দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বৃদ্ধা। তাই সে এখন থেকেই বিভিন্ন সরকারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ টিভি ও রেডিওতেও পারফর্মের সুযোগ পাবে।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেরিয়ে এল তারা। হাঁটতে হাঁটতে মৌটুসী ফট করে জিজ্ঞেস করল,
— “আচ্ছা, আন্টি যখন ভুল করে আমাকে বৌমা বললেন, আপনি তা সংশোধন করে দিলেন না কেন?”
বোরাক হাঁটতে হাঁটতেই নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
— “সংশোধন করে দেওয়া উচিত ছিল?”
— “তো ছিল না?”
— “সংশোধন করলে লাভ কী হতো? আর এখন লস কী হয়েছে, আগে সেটা বলো।”
মৌটুসী ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “এখানে লাভ-লসের হিসাব আসছে কেন?”
— “আমাদের গোটা জীবনটাই তো কোনো না কোনো লাভ-লসের হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সত্যিটা জানালে আন্টি কি স্পেরোকে এত আপন করে ট্রিট করতেন? অবশ্যই এতটা করতেন না। এতে লাভের বদলে লসই হতো।”
বোরাকের কথাগুলো শুনে মৌটুসী আর কিছু বলল না। হাঁটার গতি ঠিকই রইল, অথচ মনটা কেমন যেন থমকে গেল তার। তাহলে তাদের মাঝেও কি সবকিছু এই লাভ-লসের গাণিতিক হিসেবেই এগোচ্ছে? মৌটুসীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে এলো।
এই যে এতদিন ধরে অজান্তে জন্ম নেওয়া টান, অকারণ অপেক্ষা, তার যত্নে বুকের ভেতর জমে ওঠা নরম অনুভূতিগুলো—এসবের কোনো মূল্য নেই? লাভ ফুরিয়ে গেলে কি এই অনুভূতিগুলোও ফুরিয়ে যাবে?
বোরাক স্বাভাবিকভাবেই হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে চলে এলো তারা। বোরাক ডান হাতের কব্জির ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “মৌটুসী পাখি, সন্ধ্যা নামাতে এখনো অনেকটা বাকি। ভার্সিটির দিক থেকে এক পাক দিয়ে আসি চলো।”
মৌটুসীর অনুমতির কোনো তোয়াক্কা না করেই বোরাক একটা রিকশা ডেকে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে ভাড়া করল।
কিছুক্ষণ পর তারা ভার্সিটিতে এসে পৌঁছাল। রিকশা থেকে নেমে প্যারিস রোডে হাঁটতে হাঁটতে একটি বড় গাছের নিচে শানবাঁধানো চত্বরে এসে বসল তারা। বীর আর চড়ুইকে নিয়ে গিয়ে বোরাক কাছের একটা দোকান থেকে আইসক্রিম কিনে দিল। দুই পুচকে এখন জিহ্বা বের করে একে অপরকে দেখিয়ে দেখিয়ে আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত।
তাদের থেকে কিছুটা দূরে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অল্পবয়সী ছেলেপলে গোল হয়ে বসে আছে। একজনের হাতে গিটার। টুংটাং করে তার টেনে নিজেদের মধ্যেই আড্ডা, হাসাহাট্ঠা করছে তারা।
বোরাক একবার ছেলেগুলোর দিকে তাকাল, তারপর পাশ ফিরে মৌটুসীর দিকে। মৌটুসী চুপচাপ বসে বাচ্চাদের খাওয়া দেখছিল। হঠাৎ বোরাক উঠে দাঁড়াতেই কৌতূহলী চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সে। বোরাক ধীর পায়ে ছেলেগুলোর কাছে গিয়ে বলে উঠল,
— “হাই জুনিয়রস, কী অবস্থা সবার?”
ছেলেগুলো নিজেদের কথোপকথন থামিয়ে বোরাকের দিকে তাকাল। বোরাক হাসিমুখে কথা বলতে বলতে একে অপরকে হাত মেলাল। তারপর তাদের পাশেই বসে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে ছেলেগুলোও বেশ উৎসাহী হয়ে পড়ল যেন। কিন্তু তাদের মধ্যকার কথোপকথনের কিছুই মৌটুসী এখান থেকে শুনতে পেল না। অগত্যা সে চোখ ঘুরিয়ে ফের বাচ্চাদের দিকে তাকাল।
একটু পর ছেলেগুলো গিটার হাতে দল বেঁধে মৌয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। একজন মিষ্টি হেসে বলল,
— “আপু, একটা গান প্লিজ!”
আরেকজন বলল,
— “আপনার কণ্ঠে গান শুনতে চাই আপু। প্লিজ না করবেন না। আপনি শুধু গানটা বলুন, আমি গিটারে সুর তুলে দিচ্ছি।”
মৌটুসী খানিকটা হতভম্ব হয়ে বোরাকের দিকে তাকাল। বোরাক ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি নিয়ে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে আছে।
মৌয়ের বুঝতে আর কিছু বাকি রইল না। বোরাক ইনোসেন্ট ফেস করে নিজের সাফাই গেয়ে বলল,
— “আমি কিন্তু কিছু জানি না, জুনিয়র। এটা তোমার আর তোমার জুনিয়রদের মধ্যকার ব্যাপার-স্যাপার।”
পাশ থেকে গিটার হাতে ছেলেটা উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল,
— “আপু, প্লিজ! শুরু করুন। ওয়ান… টু…”
থেমে গেল ছেলেটি। মৌটুসী তার দিকে হাত বাড়িয়ে রেখেছে। ইশারাটা বুঝতে পেরে ছেলেটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় থেকে গিটারটা খুলে মৌয়ের দিকে এগিয়ে দিল।
মৌটুসী গিটারটা হাতে নিয়ে আস্তে করে কোলের ওপর রাখল। খুব আলতো করে একবার তারগুলোতে হাত বুলাল। তারপর চোখ বুজে গভীর একটা শ্বাস টেনে নিল বুকের ভেতর।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আলতো করে আঙুল রাখল তারের ওপর। টুং… টুং…
একটু সুর তুলে তালটা যাচাই করে নিল আগে। তারপর চোখ তুলে একবার চারপাশে তাকাল।
সবাই নিঃশব্দ। বীর আর চড়ুইয়ের ছোট্ট হাতেও আইসক্রিম থেমে গেছে, তারা কৌতূহল ও একই সাথে উৎসাহ নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে। ছেলেগুলোর চোখেও দারুণ উত্তেজনা।
মৌটুসীর চোখ ঘুরে গিয়ে থামল বোরাকের ওপর। মানুষটা দুহাত বুকের কাছে ভাঁজ করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে কিসের যেন গভীর প্রতীক্ষা।
পাশে টিম্বারিন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা একবার সেটা ঝাঁকিয়ে তাল দিল,
— “আপু, হবে!”
মৌটুসী ক্ষীণ হেসে আবার চোখ নামিয়ে নিল গিটারের তারের দিকে। আঙুলের স্পর্শে ধীরে ধীরে সুর জেগে উঠল। কয়েকটি মৃদু টানের পর তার সুরেলা কণ্ঠ ভেসে এলো—
যে জন প্রেমের ভাব বোঝে না,
তার সাথে নেই লেনাদেনা।
খাঁটি সোনা ছাইরা যে নেয় নকল সোনা,
সে জন সোনা চেনে না।
কুটা কাটাই মানিক পাইলো রে….
অতল পানিত ফালিয়া দিল রে….
সাত রাজার ধন মানিক হারেয়া।
মৌটুসীর গলা দুর্দান্ত, তা অস্বীকার করার জো নেই কোনো। সেও আজ সবটুকু দিয়ে গলা ছেড়ে গাইছে। ছেলেগুলো এতটাও ভাবেনি, তাই প্রথমে বিস্ময়ে কিছুক্ষণ থমকে থাকলেও পরক্ষণেই গানের তালে তালে উল্লাসে ফেটে পড়ল। মাঝে মাঝে তারাও সমস্বরে গলা মিলাচ্ছে। একজনের হাতে ছোট একটা তবলা, আরেকজনের হাতে টিম্বারিন। সব মিলিয়ে গানটা বেশ জমে উঠল। আশেপাশে আড্ডায় জমে থাকা তরুণ-তরুণীরা আড্ডা ভেঙে উঠে এসে ঘিরে ধরল তাদের। পথচারীরা হাঁটা থামিয়ে উঁকি দিল এদিকটায়। মুহূর্তেই এখানকার পরিবেশটাই পাল্টে গেল যেন। এই গানটা শেষ হতেই উপস্থিত সবার কঠোর জোড়াজুড়িতে মৌকে আরেকটা ধরতে হলো। এভাবে পরপর তিনটা গান গাওয়ার পর ছাড় মিলল তার।
সন্ধ্যার পরপর মৌটুসীদের পৌঁছে দিয়ে বীরকে নিয়ে বাড়ি ফিরল বোরাক। তার কিছুক্ষণ পরই বীরের টিচার এসে পড়াতে এলেন। বীর এখন ওর টিচারের সাথে খেলার ঘরে পড়ছে। এদিকে বোরাক গিয়ে বসল তার অফিসরুমে। কয়েকদিন বেশ গরমিল গিয়েছে তার। ফলে মাথার উপর একগাদা কাজ জমা হয়ে আছে।
কম্পিউটার ডেস্কের সামনে বসে একনাগাড়ে টাইপিং করে চলেছে বোরাক। কিবোর্ডের খটখট শব্দে নিস্তব্ধ ঘরটা ভরে উঠেছে।
ঘণ্টাখানেক পর বীরের পড়া শেষ হলো। টিচার চলে যেতেই বীর ছোট্ট পায়ে ছুটে বাবার অফিসরুমে এসে ঢুকল।
— “পাপা…”
ছেলের উপস্থিতি টের পেয়ে বোরাক কাজ থামিয়ে হাত বাড়িয়ে ছেলেকে উরুর ওপর বসিয়ে নিল। কপালে চুমু এঁকে আদুরে গলায় বলল,
— “আমার আযান বাবা! পড়াশোনা শেষ আমার প্রাণের?”
— “হুম শেষ!”
একটু থেমে আবার কিছু একটা মনে হতেই বীর দুহাত দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
— “পাপা, বীল আজকে নতুন একটা ছলা শিখেছে, শুনবে?”
— “হ্যাঁ বাবা, অবশ্যই।”
বীর উৎসাহ ভরা কণ্ঠে শুরু করল,
— “নুটুন নুটুন পায়লা গুলি ঝোটন বেঁধেছে,
ওপালেতে ছেলে-মেয়ে নাইতে নেমেছে,
উম……” মাঝখানে এসে থেমে গেল বীর। পরের লাইনটা ছোট্ট মস্তিষ্কের আর মনে পড়ছে না। বোরাক নিবিষ্ট মনে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। সে পরের লাইনটা ধরিয়ে দিল,
— “দুই ধারে দুই…..”
— “মনে পড়েছে পাপা, মনে পড়েছে! আমি বলব,
দুই ধালে দুই লুই কাতলা ভেসে উঠেছে,
কে দেখেছে, কে দেখেছে? দাদা দেখেছে!
দাদাল হাতে কলম ছিল,
ছুলে মেলেছে,
উফঃ বড্ড লেগেছে!”
বীরের ছড়া বলা শেষ হতেই চোখ বড় বড় করে বাহবা দিল ছেলেকে,
— “ব্রাভো সানশাইন! খুব সুন্দর ছড়া বলেছে আমার ছেলে, আমার ব্রিলিয়ান্ট বাচ্চা।”
বাবার প্রশংসায় খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল ছোট্ট বীর। টুকটুকে ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে মিষ্টি করে হাসল সে। বলল,
— “পাপা, চুলুই পাখিও ছলা শিখেছে। আমলা স্কুলে একসাথে ছলা বলি।”
বোরাক ছেলেকে কোলে রেখেই এক হাতে মাউস দিয়ে স্ক্রিন টেনে কাজগুলো পরখ করতে লাগল। আর বীর বাবার বুকের সঙ্গে হেলান দিয়ে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বাবার কাজ দেখছে।
কিছুক্ষণ এভাবেই চুপচাপ বসে থাকার পর হঠাৎ বলে উঠল,
— “পাপা, বীল কেক খাবে!”
বোরাক এবার কাজ থামিয়ে ছেলের দিকে তাকাল।
— “কেক খাবে বাবা?”
বীর আগ্রহভরে মাথা নাড়ল।
— “ঠিক আছে কলিজা। চলো দেখি।”
কম্পিউটারটা সেভাবে রেখেই ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল বোরাক। গতকাল সে পেস্ট্রি এনেছিল। সম্ভবত ফ্রিজে এখনো একটা-দুটো আছে। ফ্রিজ খুলে একটা পেস্ট্রি পাওয়া গেল। সেটা বের করে প্লেটে রেখে বীরকে নিয়ে বসে পড়ল। তারপর নিজ হাতে ছোট ছোট করে কেটে ছেলেকে খাওয়াতে লাগল। ছেলেকে বেশ তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখে ঠোঁটের কোণে অতি সূক্ষ্ম একটুকরো হাসিও ফুটল তার।
একধ্যানে ছেলেকে খাওয়াতে খাওয়াতে হঠাৎ বোরাকের মনে পড়ে গেল মাস দুয়েক আগের ফেসবুক থেকে অর্ডার করা কেকটার কথা। সেদিনের কেকটা বেশ ভালোই ছিল—স্বাদ, ডিজাইন, সবকিছুই। আজকেও সেখান থেকে একটা কেক অর্ডার করলে মন্দ হয় না। বীর-চড়ুই কালকে একসাথে কেটে মজা করে খেতে পারবে।
ততক্ষণে বীরের খাওয়া শেষ। আর খাবে না সে। বাকিটুকু বোরাক মুখে দিয়ে ছেলেকে পানি খাইয়ে দিল। এরপর ফোনটা হাতে তুলে ফেসবুকে ঢুকে সেভ লিস্ট থেকে ‘মৌ’স কেক হাউস’ পেজটা খুঁজে বের করল। তারপর পেজের বায়োতে দেওয়া নম্বরটায় কল করে ফোনটা কানে তুলল।
দু-একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে অতি পরিচিত মিষ্টি কণ্ঠটি ভেসে এল—
— “হ্যালো, মি. বোরাক? বলুন।”
বোরাকের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে ফোনটা কানের কাছ থেকে একটু সরিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। নাহ্! মৌটুসীর নাম্বার তো তার সেভ করা আছে। কিন্তু ওপাশের কণ্ঠ! কিছুটা বিস্মিত হয়েই ডাকল বোরাক,
— “মৌটুসী?”
— “হুম, বলুন।”
— “এটা তোমার নাম্বার?”
ওপাশে মৌটুসীও একটু থমকাল।
— “হ্যাঁ! কেন? কোথায় ফোন করেছিলেন?”
প্রশ্নটা করতেই যেন তার মাথার ভেতর আচমকা একটা ঘণ্টা বেজে উঠল। সন্দেহের বশে তাড়াতাড়ি ফোনটা চোখের সামনে এনে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তার ব্যবসায়িক নাম্বারে কল দিয়েছে বোরাক। সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। উত্তেজনা ও উদ্বিগ্নতায় অবচেতন মনেই নখ কামড়াতে লাগল সে।
ওপাশে বোরাকের নীরবতাও আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে ফেলতে তারও খুব বেশি সময় লাগল না। অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তার। মৌটুসীকে একটু ঘাঁটাতে গলা ভারী করে বলল,
— “আচ্ছা! আমি তো কেক ফ্যাক্টরির ক্রিমআপার কাছে ফোন দিয়েছিলাম… আপনি কি সেই কাঙ্ক্ষিত ক্রিমআপা বলছেন?”
ক্রিমআপা? শব্দটা কানে পৌঁছাতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চা হওয়া একটা মুখ মৌটুসীর চোখে ভেসে উঠল। ইশ! সম্বোধন করার জন্য আর কোনো নাম পেল না লোকটা? মৌটুসী লজ্জা ও বিরক্তিতে শক্ত করে চোখদুটো বন্ধ করে নিল।
বোরাক আবার বলল,
— “কেকের অর্ডার ছিল, ক্রিম ম্যাডাম। নিতে পারবেন?”
— “দেখুন বোরাক, একদম মজা করবেন না!” গাল ফুলিয়ে বলল মৌ।
— “মজা করব কেন? আপনি কি আমার বিয়াইন লাগেন?”
মৌটুসী কথা কাটাতে বলল,
— “আচ্ছা, আমার ছেলে কী করছে?”
— “আপনার ছেলে কী করছে তা কি আমার জানার কথা?”
— “উফ! ভালো হচ্ছে না কিন্তু!”
— “উফ! আমি কী খারাপি করলাম আপনার সাথে?” মৌটুসীর মতোই মেয়েলি ঢং করে বলল বোরাক।
মৌটুসী বুঝল, এই লোকের সঙ্গে কথা বাড়ালে শেষ পর্যন্ত তাকেই হার মানতে হবে।
— “আচ্ছা থাকুন। বাই।”
বলেই টুস করে কল কেটে দিল মৌটুসী।
বোরাক ফোনটা কান থেকে নামিয়ে হেসে ফেলল। মাথা নেড়ে মনে মনেই বলল, দিনে দিনে আরও কত কী যে দেখতে হবে! দুনিয়ার প্রত্যেকটা গুণ নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে মেয়েটা— মানুষকে দফায় দফায় অবাক করে দেওয়ার গুণটাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি।
তখনই হাতের ফোনটা আবার মৃদু আওয়াজে বেজে উঠল। আশার ভিডিও কল। বোরাক চেহারার অভিব্যক্তি যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে নিল। বীরের দিকে তাকিয়ে ডাকল,
— “আযান, আশা ফুপুমণি কল দিয়েছে বাবা। এসো।”
একটু দূরে টাইটানের সঙ্গে ব্যস্ত বীর ‘ফুপুমণি’ শব্দটা শুনেই খেলনা ফেলে ছুটে এলো।
— “ফুপুমণি? পাপা, আমি কথা বলব।”
বোরাক কলটা রিসিভ করে বীরকে কোলে তুলে পাশে বসিয়ে নিল। তারপর ফোনটা ছেলের সামনে ধরল। বীরও সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনের দিকে মুখ বাড়িয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ডেকে উঠল,
— “ফুপুমণি!”
আশা স্ক্রিনে বীরের মুখটা দেখেই মিষ্টি করে হেসে উঠল।
— “আহ্ আমার সোনা বাবাটা! আমার বাচ্চা কী করছে?”
— “আমি আল টাইটান তো খেলা কলছিলাম। তুমি কী কলছ? আমাল ভূবন ভাই কী কলছে?”
ছোট ভাইয়ের প্রতি বীরের দরদ দেখে আপ্লুত হলো আশা,
— “এই তো বাবা, ভূবন ভাইও তোমার মতো খেলা করছে।”
বলেই সে পাশে আরোয়ার কোলে বসে খেলতে থাকা ছেলের দিকে ক্যামেরা ঘুরিয়ে দিল।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে বীরের সঙ্গে গল্প করল আশা আর আরোয়া। ফুপুদের সাথে কথা বলতে বলতে একসময় বীরের মন অন্যদিকে চলে গেল। বোরাক তাকে নামিয়ে দিতেই সে আবার টাইটানের সঙ্গে অন্য পাশে ছুটে গেল।
স্ক্রিনে এবার শুধু আশার মুখ। বোরাক কথা শুরু করার আগেই আশা সরাসরি চঞ্চল গলায় বলল,
— “ভাইয়া, এবার কিন্তু আর না করার কোনো চান্স নেই। এবার তোমার শর্তমতোই একেবারে সুইটেবল একটা মেয়ে নিয়ে এসেছি।”
বোরাকের মুখে বিরক্তির ক্ষীণ ছায়া ফুটে উঠলেও স্বরে তার কোনো প্রকাশ ঘটল না।
— “এসবের দরকার নেই, আশা। আমি—”
উত্তেজিত আশা তাকে বাকিটা বলার সুযোগই দিল না।
— “দরকার আছে কি নেই, সেটা আমি জানি। তুমি শুধু একবার দেখো। পছন্দ না হলে তারপর না বলবে। কারিমা খালার মনির রিলেটিভ। মেয়ের বয়স ত্রিশ। অবিবাহিত। দেখতে সুন্দরী, শিক্ষিত, ভদ্র—সব দিক থেকেই তোমার জন্য পারফেক্ট। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবারটাও খুব ভালো। আমি বায়োডাটা তোমাকে ইমেইল করে দিয়েছি। এখনই দেখে নাও। ফোন রাখার সাথে সাথে ইনবক্স চেক করবে। বোঝা গেল?”
একনাগাড়ে সব উগড়ে দিতে দম নিল আশা।
বোরাক আর তর্কে গেল না, কথাও বাড়াল না। আপাতত এসব নিয়ে আশার সঙ্গে আলোচনা করার সময় হয়নি। তাই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শুধু বলল,
— “আচ্ছা, দেখব।”
আশার মুখে সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল।
— “এই তো আমার ভালো ভাইয়া!। ”
পাশ থেকে আরোয়া উৎসাহভরা কন্ঠে বলে উঠল, “ভাইয়া এবার আমাদের ছোট্ট ছোট্ট মনগুলো ভাঙলে কিন্তু আর জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। আমরা সুইজারল্যান্ড থেকে ফিরলেই এসপার উসপার কিছু একটা হওয়া চাই।”
বোনদের সাথে খানিক্ষন কথা বলে কল কাটল বোরাক। এরপর ঠাই কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল। নাহ্! আর বেশি দেরি করা যাবে না বোধহয়। রমনীর মনের পাহারে অনুভূতির বরফেরা গলতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই, সে তা ভালোই টের পাচ্ছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে নিবেদনের কাজটা সারতে হবে। তবেই না বাজবে সানাই!
মৌটুসী পর্ব ৩৬
কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে অবশেষে জিমেইল খুলে ইনবক্সে ঢুকল বোরাক। আশার পাঠানো মেইলটা খুঁজে বের করল সে। এই মেইলটা সিন না করলে জেদি বোনটা কিছুতেই শান্ত হবে না।
আশার পাঠানো মেইলটা ওপেন করতেই স্ক্রিনে মেয়েটার ছবি আর বায়োডাটা ভেসে উঠল। অনাকাঙ্ক্ষিত ছবিটার দিকে তাকাতেই কিছুটা বিশ্বয়ে বোরাকের কপালের চামড়া কুঁচকে উঠল। ‘নীতি?’
