মৌটুসী পর্ব ৪০
ঋতস্বিনী মাহবিশ
সময়ের গতিতে পেরিয়ে গেল আরও কয়েকটি দিন। ব্যস্ত শহরের মাঝেই তুলনামূলক নিরিবিলি এক কফিশপের কোণের টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে বোরাক আর নীতি। কাচের জানালা দিয়ে বিকেলের নরম আলো এসে তাদের টেবিলটির ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। দুজনের সামনেই ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই তারা বসে আছে, অথচ কারও মুখে কোনো কথা নেই।
নীতি মূলত শুরু করার মতো উপযুক্ত কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না। এদিকে বোরাক চেয়ারে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে কোলের ওপর রাখা ফোনটা স্ক্রল করে চলেছে। তার সামনে নীতি নামের একটা মেয়ে বসে আছে—সেটা যেন তার লক্ষ্যের বহুদূর। গত কয়েকদিন নিশ্চিন্তে এক দণ্ড শ্বাস ফেলারও সময় হচ্ছে না ওর। তবুও এরই মধ্যে আজকে বিকেলে একটু সময় বের করে নীতির সাথে বসেছে। কেননা এই মুহূর্তে এটা তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
শেষ পর্যন্ত নীতি কফির কাপে চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিল। এরপর কাপটা টেবিলে নামিয়ে নরম স্বরে বলল—
— “বোরাক, তোমাকে বাসা থেকে আমার ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি?”
বোরাক এবার একটু নড়েচড়ে বসল। ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে কফিতে এক চুমুক দিল। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল—
— “হয়েছে। তবে বিষয়টা আমার জন্য খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত, নীতি। সত্যি বলতে, আমি কখনো এমন কিছু ভাবিনি। পুরো ব্যাপারটাই আমার আশাতীত।”
নীতির মুখটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—
— “কেন, বোরাক? তোমারও তো জীবনটা গুছিয়ে নেওয়া উচিত। সারাজীবন তো একা থাকা যায় না। সামনে আরও অনেকটা পথ পড়ে আছে। সেই পথ চলার জন্য একজন সঙ্গিনীর হাত দরকার।”
বোরাক মৃদু হেসে মাথা নাড়ল—
— “সঙ্গিনী দরকার—এটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু সেই জায়গাটায় তোমাকে কখনো ভাবিনি।”
নীতি কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর একটু নিচু স্বরে বলল—
— “আমাকে কি তুমি তোমার জন্য এতটাই অযোগ্য মনে করো?”
— “না। বরং হয়তো আমিই তোমার যোগ্য নই। ইউ ডিজার্ভ বেটার, নীতি। আমার জীবনের খুঁত আমি চাইলেও কখনো এড়িয়ে যেতে পারব না। আর সে হিসেবে তোমার জীবন প্রায় নিখুঁত, সুন্দর। তাই তোমার উচিত তোমার মতোই একজন নিখুঁত মানুষকে খুঁজে নেওয়া। আর আমাকে আমার মতোই কাউকে। সব সম্পর্কেই কমবেশি সমঝোতার প্রয়োজন হয়।”
— “তোমার খুঁত এড়িয়ে যেতে তো আমার কোনো আপত্তি নেই, বোরাক। আমি চেষ্টা করব তোমার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে। বীরকে আমি ভালোবাসি। ভবিষ্যতেও তাকে ভালোবাসতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
— “তোমার আপত্তি বা অনাপত্তি নিয়ে আমি ভাবতেই চাইছি না, নীতি। সাফ বলতে চাইলে, তুমি আমার খুব ভালো বন্ধু। আর আমি এই সম্পর্কটাকে যথেষ্ট সম্মান করি। তোমার প্রতি আমার এই সম্মানটুকু হারাতে দিও না। আশা করি, তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে। এ নিয়ে আর কোনো কথা না বাড়ালে খুশি হব।”
নীতির ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট একটুকরো হাসি ফুটল। পরাজয়ের হাসি। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সে বলল—
— “আচ্ছা, তাহলে একটা প্রশ্ন করি?”
— “হুম।”
— “তুমি কি মৌটুসীকে পছন্দ করো?”
বোরাকের মুখে কোনোই পরিবর্তন এল না। সহসা নির্বিকার স্বরে বলল—
— “অবশ্যই করি। আমি পৃথিবীর সকল অদম্য, সংগ্রামী নারীকে পছন্দ করি। আর সে তো আমার পথেরই একজন যাত্রী।”
— “আমি সেই পছন্দের কথা বলছি না, বোরাক… তোমরা কি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছ?”
— “না, এখনো নিইনি। তবে হ্যাঁ, সামনে নিতেও পারি। হঠাৎ এমন কিছু শুনলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আফটার অল উই আর দ্য সেম সেম। আমাদের জুটি খুব খারাপ হবে না!”
নীতির দৃষ্টি আরও গভীর হলো, তবে তাতে ঠিক কী ছিল তা বোঝা গেল না—
— “তুমি ওর সম্পর্কে কতটুকু জানো, বোরাক? হতে পারে, তার সম্পর্কে তোমার জানা সবচেয়ে বড় সত্যিটাই আসলে মিথ্যে!”
বোরাক হাতের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। তারপর সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে নীতির চোখে চোখ রেখে বলল—
— “সর্বোচ্চটা।”
নীতির ভ্রূ জোড়া সামান্য কুঁচকে গেল। বোরাকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরাসরি তার দিকেই নিবদ্ধ। সে বলেই চলল—
— “একটা মানুষ আরেকটা মানুষ সম্পর্কে সর্বোচ্চ যতটুকু জানতে পারে, যতটুকু জানা সম্ভব—তোমার কাজিনের আগাগোড়ার সবটুকুই আমার ধাতস্থ। হতে পারে এমন কিছুও, যা তুমি এমনকি সে নিজেও অবগত নয়। সো ডোন্ট ট্রাই টু মেক মি কনফিউজড। ইট উইল বি আ লস প্রেজেন্ট, নীতি কবির।”
বীর আর চড়ুইকে নিয়ে পার্কে এল সাফওয়ান। এখন প্রায় প্রতিদিন বিকেলেই ওদের নিয়ে এখানে আসা হয়। আর এই সময়ে ছোট্ট লাবিবকে নিয়ে তার বোন কুমকুমও আসে। লাবিব খেলে আর পুরোটা সময় কুমকুম চুপচাপ বসে ভাইয়ের খেয়াল রাখে। তাদের বাড়ি অবশ্য এই পার্কের প্রাচীরের ওপারেই—হাঁটাপথের সামান্য দূরত্ব।
আজও তার ব্যতিক্রম নয়। লাবিব একটু দূরে দৌড়ঝাঁপ করে খেলছে, বীর আর চড়ুইও যোগ দিল তার সাথে। কুমকুম একপাশের বেঞ্চে চুপচাপ বসে আছে। সবসময়ের মতোই মিষ্টি মুখটা ওড়নার আড়ালে। চোখ সামনের দিকে স্থির, মুখটা একটু গাম্ভীর্য—কোথাও যেন মনটা আটকে আছে।
সাফওয়ান কিছুক্ষণ দূর থেকেই তাকে লক্ষ্য করল। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কোনো শব্দ না করেই তার পাশে একটু দূরত্ব রেখে বসল। কুমকুম তার উপস্থিতি টের পেয়ে একবার আড়চোখে তাকাল। তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে তাকাল। সাফওয়ানও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এর আগেও কয়েকবার টুকটাক কথা হয়েছে তাদের। মেয়েটাকে ভীষণ মায়া হয় তার। যেখানে এসব পার্ক মানেই তরুণ-তরুণীদের আড্ডা-হুল্লোড় কাণ্ড, এই মেয়েটা সেখানে ভাইয়ের খেলার সারাটা সময় এভাবে একাই চুপচাপ বসে থাকে। সাফওয়ান হালকা স্বরে জিজ্ঞেস করল—
— “কালকে আসোনি কেন কুমকুম?”
কুমকুম চোখ স্থির রেখেই ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়ল। তারপর ব্যাগ খুলে একটা খাতা আর কলম বের করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাতে লিখল—
— “বাসায় পাত্রপক্ষ এসেছিল।”
সাফওয়ান কথাটা পড়েই খানিকটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
— “কেন? তোমার বড় বোন আছে?”
কুমকুম মাথা নাড়ল। তারপর খাতায় লিখল—
— “না। আমাকে দেখতে এসেছিল।”
সাফওয়ানের চোখ দুটো আরও খানিকটা বড় হয়ে গেল। অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
— “তোমাকে? তোমার বিয়ের বয়স হয়েছে? বয়স কত তোমার?”
কুমকুম এবার মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। সাফওয়ানের চোখে বিস্ময়। এই ছোট্ট মেয়েটাকেও পাত্রপক্ষ দেখতে আসে?
কুমকুম উত্তরে লিখল—
— “বিশ।”
সাফওয়ান লেখাটা পড়ে আরেক দফা অবাক হলো। এতদিন সে মেয়েটার বয়স বড়জোর ষোলো-সতেরো বলেই ভেবেছিল। দেখতে একদমই আসল বয়সটা বোঝা যায় না।
সে ছোট করে বলল—
— “ওহ… পড়াশোনা করো?”
কুমকুম লিখল—
— “না। ইন্টার পর্যন্ত পড়েছি।”
সাফওয়ান এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল—
— “তারপর পাত্রপক্ষের পছন্দ হলো?”
— “না, যৌতুক চায় ওরা। আমার বাবা যৌতুক দিতে পারবে না।”
লেখাটা পড়েই সাফওয়ানের স্বাভাবিক মুখটা হালকা কুচকে উঠল। চোখ তুলে কুমকুমের দিকে তাকিয়ে বলল—
— “ঠিকই তো আছে! তোমার বাবা তার আদরের মেয়ে দেবে, আবার যৌতুকও দেবে? এটা তো মানা যায় না।”
সাফওয়ানের কথাটা শুনে কুমকুম কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর মাথা নুইয়ে কোলের ওপর থাকা খাতাটার ওপর লিখতে লাগল—
— “আমরা তো মানবজাতির বোঝা, ভাইয়া। আর বোঝা হস্তান্তর করতে হলে—তার সঙ্গে কিছু না কিছু গুঁজেও দিতে হয়। আর না হলে বিশাল পৃথিবীতে সেই বোঝা নতুন করে গ্রহণ করার মানুষ পাওয়া যায় না।”
কিন্তু তা আর পড়ানো হলো না সাফওয়ানকে। এর আগেই ছোট্ট চড়ুই হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এসে সাফওয়ানের হাত টেনে মৃদু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “সাফওয়ান চাচ্চু, তাড়াতাড়ি এসো। ওখানে একটা জিনিস দেখবে এসো। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি! ফুরিয়ে গেল!”
রাত খানিকটা গভীর। চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে নিভে গেছে। দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ ডাক, মাঝেমধ্যে রাতজাগা কোনো পাখির ডাক—এইটুকুই। ঘরের ভেতর ফ্যানের একঘেয়ে ঘূর্ণনের সঙ্গে মিশে আছে গভীর নীরবতা।
চড়ুই মৌটুসীর পাশে গুটিসুটি মেরে বিভোর ঘুমে আচ্ছন্ন। ছোট্ট বুকটা নিয়মিত ওঠানামা করছে। ঘুমের মধ্যেই এক হাত মায়ের শরীরের ওপর ফেলে রেখেছে সে, যেন মৌটুসীর ছোট্ট মেয়েটা ঘুমের মাঝেও নিশ্চিত হতে চায়—মাম্মা তার পাশেই আছে। কিন্তু মৌটুসীর চোখে ঘুম নেই। একফোঁটাও নেই। কতক্ষণ ধরে এপাশ-ওপাশ করছে, সে নিজেও জানে না। কখনো চোখ বন্ধ করছে, আবার পরক্ষণেই খুলে ফেলছে। বালিশে মাথা গুঁজে ঘুমকে জোর করে ডেকে আনার চেষ্টা করছে—ঘুম যেন আজ তার ওপর ভীষণ অভিমান করে বসে আছে।
শেষমেশ বিরক্ত আর অস্থির হয়ে বিছানায় উঠে বসল সে। বুকের ভেতরটা কেমন করছে। কেন করছে, সেটাও ঠিক বুঝতে পারছে না। সাইড টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিয়ে কয়েক ঢোক পানি খেল। ঠান্ডা পানি গলা বেয়ে নিচে নেমে গেল, অথচ বুকের ভেতরের অস্থির আগুনটুকু একটুও শান্ত হলো না। বোতলটা আবার জায়গামতো রেখে দিল মৌটুসী। চোখ চলে গেল বিছানার ডান পাশের জানালাটার দিকে। আজ পূর্ণিমা।
খোলা জানালার গ্রিল ভেদ করে ধবধবে চাঁদের আলো ঘরের বিছানার মাঝখানে এক টুকরো রুপালি চাদরের মতো ছড়িয়ে আছে। মৌটুসী স্থির চোখে সেদিকেই তাকিয়ে রইল।
কিছু অনুভূতি কি সত্যিই এতটা অকারণ হতে পারে? এই প্রশ্নটার উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছে না। এতদিন ভালোবাসা বলতে মৌটুসী যা বুঝেছে, তার সবকিছুরই একটা নাম ছিল। একটা সম্পর্ক ছিল। ভালোবাসার একটা কারণ ছিল।
মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান। এই মানুষগুলোর জন্য বুকের ভেতর যে টান অনুভব করে, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয় না। তারা আপনজন। রক্তের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক। হৃদয় ও রক্ত থেকে তৈরি হওয়া বন্ধন। তাদের হারানোর ভয়, তাদের জন্য ছটফট করা, তাদের হাসিতে নিজের ভালো থাকা—এসবের একটা নাম আছে—মায়া, ভালোবাসা।
কিন্তু—কোনো নামহীন সম্পর্কেও মানুষ এভাবে কারও জন্য এতটা অস্থির লাগে কেন? একজন স্বল্পপরিচিত পুরুষ, যার সঙ্গে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, কোনো সম্পর্কের নাম নেই, সামাজিক বন্ধন নেই, তার জন্যও মনের ভেতর উথাল-পাথাল বয় কেন?
কেন কোনোপ্রকার পূর্বটান ছাড়া জীবনের এক পর্যায়ে নারী-পুরুষের মাঝে এই অদ্ভুত আকর্ষণের জন্ম নেয়? এতে শুধুই কী জৈবিক ব্যাখ্যা রয়েছে? নাকি হৃদয়ের অদৃশ্য কোনো কানেকশন?
মৌটুসী হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে চুপ করে বসে রইল। গত কয়েকদিন বোরাকের দেখা মেলেনি। কথাও হয়নি তেমন একটা। মাঝেমধ্যে ফোন করে চড়ুইয়ের খোঁজ নিয়েছে, এই যা। দুষ্টুমি করে কোনো কথা বলেনি। ‘মৌটুসী পাখি’ বলে ডেকে ডেকে অকারণে বিরক্ত করেনি। একচিত্ত দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে তাকে লজ্জা দেয়নি। কিছুই করেনি।
আর এই কদিন এসব থেকে বঞ্চিত হওয়ায় মৌটুসীর মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয়েছে, যেন ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না সে। বুকের ওপর কেউ অদৃশ্য ভারী একটা পাথর রেখে দিয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য যদি মনে হয়—তাদের মাঝে তো বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই, সে বোরাককে আর দেখতে পাবে না, আর কথা হবে না তাদের, লোকটা হঠাৎ করেই তার জীবন থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে—তখনি দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। এমনটা বাস্তবে কখনো হলে তার শ্বাস চিরতরে বন্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। ওই মানুষটাকে ছাড়া তার পৃথিবী কল্পনাতীত।
এসবই কি প্রেমে পড়ার লক্ষণ? প্রেমের অনুভবের সঙ্গে মৌটুসী পরিচিত নয়। কেবল লোকমুখে শুনে এসেছে, প্রেমের অনুভূতি নাকি সুখময় হয়? তবে তার এই অনুভব বুকে চিনচিনে ব্যথার উপক্রম করছে কেন?
মৌটুসী তাড়াতাড়ি গভীর একটা শ্বাস নিয়ে চোখ দুটো বুজে নিল। সঙ্গে সঙ্গেই স্মৃতির পর্দায় একে একে ভেসে উঠতে লাগল তাদের একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। শুরু থেকে এই পর্যন্ত, প্রত্যেকটা ঘটনায় যেন একেকটা মধুর স্বপ্ন। নিজেকে কেমন রুপকথার রাজকন্যা মনে হয় ওর। আর একদিন সত্যি সত্যি ঘোড়ার পিঠে এক রাজকুমারের আগমন হলো তার ছোট্ট পরিধির রাজ্যে।
চোখ বন্ধ রেখেই ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল তার। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিল মৌটুসী। সোজা হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকে বোরাকের অ্যাকাউন্টে গিয়ে থামল। আঙুল চালিয়ে তাদের চ্যাটগুলো টেনে টেনে ওপরে উঠতে লাগল। ধীরে ধীরে বোরাকের বলা প্রতিটা কথা নতুন করে পড়তে লাগল সে। সাথে অনুভব করল নতুন কিছু অনুভূতির সুখময় ব্যথা।
আরও একটু ওপরে উঠতেই একটা ভয়েস মেসেজ পাওয়া গেল। কিছুদিন আগে পাঠিয়েছিল বোরাক। মৌটুসী সেটার দিকে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থেকে প্লে বাটনে চাপ দিল।ফোনের স্পিকার থেকে সঙ্গে সঙ্গে সেই অতিচেনা কণ্ঠটা ভেসে এল—
— “এই মৌটুসী পাখি, সেদিন শিল্পকলা একাডেমিতে স্পেরোকে যেই ফরমটা পূরণ করতে দেওয়া হয়েছিল তার একটা ছবি তুলে আমাকে পাঠাও। কুইক! সাথে স্পেরোর সুন্দর একটা ছবিও দিও।”
মৌটুসী কয়েকবার সেই ভয়েস মেসেজটা শুনল। বোরাকের কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকভাবেই একটু ভারী, গভীর। ভয়েসে তা আরও সুগম্ভীর শুনতে লাগছে। মৌটুসী কিশোরীদের মতো ফোনটা বুকে চেপে ধরে ফিক করে মুচকি হেসে ফেলল। তার দূর্বলতার প্রথম উৎস লোকটার কথা ও কন্ঠস্বর, যাদু আছে তাতে, যা মৌকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ একইভাবে বসে থাকার পর এবার সেও ভয়েস রেকর্ডার অন করল।
চড়ুই পাশেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ছোট্ট শরীরটা নিশ্চিন্তে গুটিয়ে আছে। মৌটুসী একবার স্নেহভরা চোখে মেয়ের দিকে তাকাল। তারপর জানালার পাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ দুটো আলতো করে বুজে নিল। মনের ভেতর জমে থাকা সবটুকু অনুভূতি ঢেলে দিয়ে মিনমিনে সুরে গেয়ে উঠল—
”একটা ছেলে মনের আঙ্গিনাতে
ধীর পায়েতে এক্কা দোক্কা খেলে।
দূর পাহাড়ি ঝর্ণা খোঁজে, বৃষ্টি জলে একলা ভিজে।
সেই ছেলেটা হৃদয় ছুঁয়ে ফেলে।
আমি তো বেশ ছিলাম চুপিসারে,
ছোট্ট মেয়ে সেজে একটা কোণে….”
জানালা গলিয়ে পূর্ণিমার আলো এসে পড়েছে রমণীর সুশ্রী মুখজুড়ে। রুপালি সেই আলোয় সুন্দর মুখটা কেমন চকচকে, স্বপ্নময় দেখাচ্ছে! স্বপ্নপুরীর রাজকুমারীর মতোই সুরেলা মিষ্টি কণ্ঠটা রাতের অন্ধকারে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
গানটা শেষ করে মৌটুসী কিছুক্ষণ রেকর্ড করা ভয়েসটার দিকে নীরবে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ আঙুল উঠিয়ে টুপ করে সেন্ড করে দিল তা। পাঠানোর পরের মুহূর্তেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার। ইতিমধ্যেই ডেলিভারড হয়ে গেছে সেটা!
— “ওহ্ নো!”
রীতিমতো আঁতকে উঠল মৌটুসী। এক মুহূর্তও দেরি না করে তড়িঘড়ি মেসেজটার ওপর আঙুল চেপে ধরে ‘ডিলেট ফর এভরিওয়ান’ করে দিল।
এখন রাত প্রায় দেড়টা বাজে। মৌটুসী ভেবেছিল, এত রাতে নিশ্চয়ই বোরাক অনলাইনে থাকবে না! তাই কেবল নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই ভয়েসটা সেন্ড করেছিল। কিন্তু এই লোক তো অনলাইনেই! মৌটুসী অসহায় চোখে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সেকেন্ড কয়েকের মাথায় ওপাশ থেকে টাইপিং হতে লাগল। অস্বস্তিতে মৌটুসীর বুকটা ধকধক করছে। মাঝরাতে কাউকে নক করাটা মোটেও সৌজন্যতার মধ্যে পড়ে না!
ওর ভাবনার মধ্যেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল বোরাকের মেসেজ—
— “এই মেয়ে, এত রাতে না ঘুমিয়ে অনলাইনে কী করা হচ্ছে?”
মৌটুসী মেসেজটা পড়ে হাবলার মতো বসে রইল কিছুক্ষণ। কী করে সত্যি কথা বলবে সে এখন? অতঃপর মিথ্যে একটা কৈফিয়ত বানিয়ে লিখে দিল—
”কিছু না, এমনই। ঘুম আসছিল না, তাই রিলস দেখছিলাম। সরি, বিরক্ত করার জন্য।”
মেসেজ সিন হলো। কিন্তু কোনো রিপ্লাই এল না। মৌটুসী অপলকভাবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রিপ্লাইয়ের অপেক্ষা করছে। কিন্তু পাঁচ মিনিট পেরিয়েও কোনো রিপ্লাই এল না। মন খারাপ হলো ওর। আশাহত হয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল। তখনই মেঘ না চাইতে জল আসার মতো করে সরাসরি কল এল বোরাকের।
স্ক্রিনে কলটা ভেসে উঠতেই মৌটুসী নিজের অজান্তেই একটু নড়েচড়ে ভালো করে বসল। অনুভব করল, অদ্ভুত এক ভালো লাগা যেন নিঃশব্দে ছড়িয়ে গেল শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এলোমেলো চুলগুলো এক হাতে কানের পেছনে সরিয়ে নিল সে। তারপর ঠোঁটের কোণে লুকোনো একটুখানি হাসি নিয়েই কলটা রিসিভ করে ফোন কানে তুলল—”হ্যালো!”
ওপাশ থেকে কিছু সময় নিয়ে বোরাকের ঝরঝরে পরিষ্কার কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
— “হুম, তারপর বলো, মৌটুসী পাখির ঘুম আসছে না কেন?”
— “জানি না তো।” আস্তে করে বলল মৌটুসী।
— “বুঝেছি, মৌটুসী পাখিকে ঘুমপাড়ানি গান শোনানোর জন্য একটা কোকিল দরকার, তাই তো?”
মৌটুসী মৃদু হাসল। অথচ মনের ভেতর কথাটা একেবারে অন্যরকমভাবে বেজে উঠল—
”কোকিলটা আপনিই হয়ে যান না, বোরাক! প্রতি রাতে আমাকে ঘুমপাড়ানি গান শোনাবেন। আর আমি আপনার চুলে হাত বুলিয়ে আপনার সারাদিনের সবটুকু ক্লান্তি শুষে নেব… সুন্দর হবে না?”
কিন্তু মনের কথাটা মুখ পর্যন্ত এল না। তার বদলে বলল—
— “আপনিও যে এত রাতে জেগে আছেন! ঘুমাননি?”
— “আমি ঘুমিয়ে গেলে তোমার নির্ঘুম রাতের সঙ্গ দিত কে?”
— “এই জন্যই জেগে আছেন বুঝি?”
— “হুম। মাঝে মাঝে নিশাচর হয়ে মৌটুসীদের মতো নাজুক পাখিদের নির্ঘুম রাতের সঙ্গী হতে না পারলে পুরুষজীবন যে বৃথা।”
মৌটুসী এবার একটু শব্দ করেই হেসে ফেলল। ঘোরের মধ্যেই বালিশটা টেনে নিয়ে তার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে বলল
— “তাই নাকি? আপনাদের পুরুষজীবনের এই গভীর দর্শন তো আগে জানা ছিল না!”
— “অনেক কিছুই জানো না মেয়ে। ধীরে ধীরে জানবে। জ্ঞান অর্জনের বয়স নেই। চাইলে তোমার হাতের নাগালে এই বোরাক শিকদারকেও পড়তে পারো। আমার আপত্তি নেই কোনো। এক ভুবনমোহিনীর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উন্মোচন করে দেওয়াই যায়!”
মৌটুসী এবারে একটু ভাবুক হয়ে পড়ল। হাতের ওপর চিবুক ভর দিয়ে মৃদু স্বরে বলল—
মৌটুসী পর্ব ৩৯
— “আপনি? আপনি খুব জটিল অধ্যায়, বোরাক।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর কিছিটা সময় নিয়েই সেই পুরুষালী সুগম্ভীর স্বরটা ভেসে এল—
— “আমি জটিল নয় জুনিয়র। বরং ভীষণ সহজবোধ্য, তোমার ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় বইটির মতোই খুব চেনা ও ভালো লাগার হয়ে উঠতে পারি। শুধু একটু মন দিয়ে পড়বে, যত্ন নিয়ে ধরবে, গভীর থেকে নিয়ে বুঝবে আর… মাঝপথে বই বন্ধ করে যেন পালিয়ে যাবে না ।”
