Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ৬

মৌটুসী পর্ব ৬

মৌটুসী পর্ব ৬
ঋতস্বিনী মাহবিশ

​বোরাক ফিরল সাড়ে এগারোটার দিকে। ভুবন আর বীর দুজনকে ঘরে শুইয়ে দিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছিল আশা। বোরাককে প্রবেশ করতে দেখেই টিভির আওয়াজ কমিয়ে উঠে দাঁড়াল সে।
নিকটে এসে বোরাক জিজ্ঞেস করল, ​”বীর, ভুবন ঘুমিয়ে পড়েছে?”
​”হুম। আমার ঘরেই শুইয়ে দিয়েছি।”
“খেয়েছে কিছু?”
“ভাত খায় নি। শুধু কয়েকটা মিট বল আর একটু সবজি খেয়ে ঘুমিয়েছে। ভাত খাওয়াতেই পারি নি।”
“আচ্ছা, সমস্যা নেই। ওতেই হবে। তুই খেয়েছিস?”
“হুম। আর তুমি? ডিনার করে এসেছ?”
​”না, টেবিলে খাবার গুছিয়ে রেখে চলে যা, আমি আসছি।”

​বলেই ওপরে উঠে গেল বোরাক। ঘরে এসে কোট-শার্ট খুলে ফোন, ওয়ালেট রেখে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর ছোট একটা হট শাওয়ার নিয়ে কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এল। তার উজ্জ্বল উদাম শরীরে নিশ্চিন্তে বসে থাকা কয়েকটা টসটসে জলবিন্দু কী মোহনীয়তায় না ছড়াচ্ছে! অন্য আরেকটা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ক্লোজেটের সামনে এসে দাঁড়াল বোরাক। ক্লোজেট থেকে একটা সাদা ট্রাউজার আর কালো সোয়েটশার্ট বের করে সেগুলো পরিধান করে নিল সে।
​নিচে নেমে দেখল আশা খাবার নিয়ে ডাইনিংয়ে বসে আছে। বোরাক বলল,
​”বসে আছিস কেন? শুয়ে পড়তি!”
​”সমস্যা নেই ভাইয়া।” বলেই বোরাকের প্লেটে খাবার তুলে দিতে লাগল আশা।
​বোরাক এক লোকমা ভাত মুখে দিতেই প্রাণ জুড়িয়ে এল তার। প্রায় তিন মাস পর ফের এমন সুস্বাদু রান্নার স্বাদ অনুভব করছে জিহবা। মেডরা তো রান্না করে কেবল ঠ্যাকা পার করার জন্য, সে রান্নায় প্রাণের ছোঁয়া নেই। অথচ বোনটা কয়েক মাস পর বেড়াতে এলে ভালো ভালো রান্না খাইয়ে অভ্যাস খারাপ করে দিয়ে যায়, পরে শ্বশুরবাড়ি ফিরে গেলে আর মেডদের রান্না মুখে তুলতেই ইচ্ছে হয় না। সত্যিই, মায়ের মতো রান্নার হাত পেয়েছে মেয়েটা। বোরাক মনে মনে ভীষণ তৃপ্ত হলেও, স্বভাবতই তার চাপা ব্যক্তিত্বের আদলে তা বেরিয়ে আসতে পারল না।
​আশা ভাইয়ের সামনাসামনি চেয়ারটাতে বসল। বোরাক জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলবি?”

​”হুম, বলতাম। তুমি খাওয়াটা শেষ করো।”
​বোরাকের বুঝতে বাকি রইল না বোনের মনোভাব। নতুন কিছু না। পুরনো কিছু শোনার জন্য আলাদা করে টাইম বের করে ওয়েস্ট করার মানেই হয় না। তাই বলল,
​”সমস্যা নেই বল, শুনছি আমি।”
​আশা একটা গভীর শ্বাস টেনে নিল। ধীরেস্থিরভাবে কথা শুরু করল,
​”ভাইয়া, এভাবে আর কতদিন?”
​”কিসের কতদিন?”
​”উফ! বুঝেও বুঝতে চাইছ না! আর কতদিন এভাবে সঙ্গীহীন একা থাকবে?”
​বোরাক খাবারের প্লেট থেকে মুখ না তুলেই উত্তর দিল,
​”একা কোথায়? আমার বাবা আমার সাথে আছে। আমার প্রাণের সঙ্গী, আমার অস্তিত্ব।”
​”ভাইয়া কথাটা কিন্তু দার্শনিক হয়ে যাচ্ছে। এমন আবেগী কথা বলে আর কতদিন চলবে?”
​”আবেগ না, বাস্তবতা। আর আমার ছেলে দার্শনিক কোনো বস্তুও নয়।”
​”আচ্ছা তোমার দিকটা নাহয় মানলাম, কিন্তু বীর? তার জীবনে তো একটা মমতাময়ী দরকার।”
​”আমার জন্য যেমন আমার ছেলে আছে, তেমনই আমার ছেলের জন্যও আমি। এখানে থার্ড পারসন মমতাময়ী হতে পারে না, পারে কেবল স্বার্থপর।”

​”ভাইয়া, তুমি কেবল একটা নারীর কর্মগুণ দিয়ে পৃথিবীর সকল নারীকে বিচার করতে পারো না। নারীদের মাতৃত্বের জোর সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই।”
​নিত্য একই ঘ্যানঘ্যান শুনতে শুনতে বিরক্ত বোরাক। প্রসঙ্গ পাল্টে নিল সে, “শুনলাম হাসান ভাই গাজীপুর শাখায় ফ্যাক্টরি দিতে যাচ্ছে!”
​আশার ভ্রু কুঁচকে এল। তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
​”কথা ঘুরাবে না ভাইয়া। তোমার সাথে আমার অনেক বোঝাপড়া আছে আজ। আমার বীরের সুরক্ষা, নিরাপত্তা নিয়ে জবাবদিহিতা করতে হবে তোমাকে।”
​বোরাকের হাত থেমে গেল। প্লেট থেকে চোখ সরিয়ে প্রশ্নসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল আশার দিকে। “মানে?”
​”হ্যাঁ। বলতে চেয়েছিলাম না। কিন্তু না বলে পারছি না।”
​বোরাকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। কণ্ঠস্বর গম্ভীর হয়ে এল তার, “কী হয়েছে আশা? খুলে বল সব।”
​”বীর ভালো নেই ভাইয়া। সত্যি বলছি। দুই-একটা সাধারণ বাচ্চার মতো তার মানসিক ডেভেলপমেন্ট বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তুমিই বলো, ওর শৈশবটা কেমন হওয়ার কথা ছিল, আর হচ্ছে কেমন? কে আছে ওর পাশে? তুমি দিনের বেশিরভাগ সময়ই অফিসে থাকো। আরোয়া ভার্সিটিতে ফ্রেন্ডদের সাথে, ও-ও বড় হয়েছে, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আমরা সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। এতদিন খোদেজা চাচি ছিলেন বলে সমস্যা হয়নি। অন্তত আপন দাদির মতো কেউ একজন পাশে ছিল তার। এখন তো চাচিও অসুস্থ। বীরকে এখন সম্পূর্ণ অপরিচিত মেডদের ভরসায় রাখছি আমরা। তারা কতটা আস্থাভাজন, তার নিশ্চয়তা আমাদের আছে?”

​”আশা! কিছু কি হয়েছে? বীরের যত্নে কোনো ল্যাগিংস পেয়েছিস তুই?”
​আশা সরাসরি সালমার বিষয়টা খুলে বলল না। এতে ভাইয়ের অসহায়ত্ব বাড়বে, ভেঙে পড়বে সে। তাই বলল, “মেডদের দ্বারা শিশু নির্যাতনের কত খবর আসছে প্রতিনিয়ত। আমাদের মেডরাও বীরের সাথে কোনো খারাপ আচরণ করছে না—তা কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছি আমরা? আচ্ছা মানলাম তারা বীরের ঠিকমতো যত্ন নেয়, কিন্তু তাতে কি মমতা আছে ভাইয়া, তুমিই বলো। কেবল টাকার বিনিময়ে সেই যত্ন। কিন্তু স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা তো টাকা দিয়ে কিনতে পাওয়া যায় না। এসবের জন্য নিজের কাউকে দরকার।”
​”নতুন কেউ যে সেইসব ভালোবাসা দিতে সক্ষম হবে, তারই বা নিশ্চয়তা কী?” কেমন অসহায় শোনাল বোরাকের কণ্ঠস্বর। খাওয়া থেমে গিয়েছিল অনেক আগেই।
​আশা ভাইকে আশ্বস্ত করতে অত্যন্ত নরম স্বরে বলল,

​”ভাইয়া, আমরা চেষ্টা তো করতে পারিই, তাই না? চেষ্টা না করে যদি আগেই ভয় পেয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকি, তাহলে তো সমাধান আজীবন আসবে না। এছাড়াও যাকে আমরা এ বাড়িতে নিয়ে আসব, তার পরিচয় তোমার স্ত্রীর পাশাপাশি বীরের মা-ও হবে। একটা মেয়ে যখন প্রথম থেকেই স্বেচ্ছায় এই পরিচয় গ্রহণ করতে সক্ষম হবে, তখন অবশ্যই সে বীরকে মায়ের ভালোবাসা দিতেও সক্ষম হবে। দেখে নিও। অনেক সময় দায়িত্ববোধ থেকেও নিখাদ ভালোবাসা জন্ম নেয়। সেই সাথে তুমিও একটা ভরসার হাত পাবে।”
​”আর সেই হাত যদি মাঝপথেই ছেড়ে দেয়?”
​আশা বুঝতে পারল ভাইয়ের শঙ্কা। ভালোবাসা সুন্দর, তবে ভয়ংকর-সুন্দর। ভালোবাসার দ্বারা একবার কেউ ভাঙলে, সেই ভঙ্গুর হৃদয়ে পুনরায় কারো ওপর ভরসা করাটা যে কতটা কঠিন, তা হয়তো সে বুঝবে না। যার হৃদয় ভাঙে, সেই কেবল জানে সেই যন্ত্রণার গভীরতা। তবুও সে হাল ছাড়ল না। শান্ত গলায় বলল, “ভাইয়া, সব হাত তো আর আশিয়ানার নয়! কিছু হাত আগলে রাখতেও জানে।”
​বোরাক এবার চট করে উঠে দাঁড়াল। অবশিষ্ট খাবার আর গলা দিয়ে নামবে না তার। ওকে উঠে যেতে দেখে আশা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, “ভাইয়া, খাওয়া তো শেষ করলে না তো!”
​”ফেলে দে।” বলেই বোরাক বেসিনের দিকে হাঁটা দিল। হাত ধুয়ে ওপরে যাওয়ার সময় আশা পেছন থেকে আবারও ডেকে উঠল, “কিছু তো বললে না, ভাইয়া!”

​বোরাক সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “কী বলব? যা করার কর।”
​অমনি আশার মুখে এক চিলতে বিশ্বজয়ী হাসি ফুটে উঠল। দ্রুত বলে উঠল সে, “তাহলে কিন্তু আমি আমার ভাবি খোঁজায় লেগে পড়লাম!”
​বোরাক উত্তর দিল না। নীরবে ওপরে উঠে গেল সে। নীরবতা সম্মতির লক্ষণ, আশা সতেজ একটা নিশ্বাস ফেলে দ্রুত হাতে সব গুছিয়ে রেখে নিজেও ওপরে দৌড় দিল।
​বোরাক আশার ঘরে এল। বিছানার মাঝখানে পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে বীর আর ভুবন। দুই ভাইয়ের মুখের ওপর নরম আবছা আলো এসে পড়েছে, কী মায়াবী লাগছে তাতে তাদের! বোরাক ঝুঁকে ভুবনের কপালে আলতো চুমু খেয়ে বীরকে সাবধানে কোলে তুলে নিল।
​নড়াচড়া টের পেয়ে বীর অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “উহম… উহম… পাপা!”
​বীরের পিঠে হাত বুলিয়ে বোরাক আদুরে স্বরে ফিসফিস করে বলল, “কলিজা!”
​বীর পাপার কাঁধে মাথা এলিয়ে আবার ঘুমে তলিয়ে গেল। বোরাক ছেলের পশ্চাৎদেশে হাত দিয়ে দেখল ডায়াপার পরেছে কিনা। পরেছে, আশা পরিয়ে দিয়েছে। বীরকে নিয়ে আশার ঘর থেকে বের হয়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল বোরাক।

​ঘরে এসে বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল টাইটান আগে ভাগেই তার নির্দিষ্ট জায়গা দখল করে শুয়ে পড়েছে। এই পর্যায়ে তাদের আসতে দেখে মাথা উঠিয়ে নিচু স্বরে কবার ‘মেও মেও’ আওড়াল। বোরাক ইশারা করতেই ফের মাথা এলিয়ে চোখ বুজে নিল সে।
​বোরাক বীরকে বিছানায় শুইয়ে দিতে গেলে ওর ছোট্ট শরীরটা পুনরায় নড়েচড়ে উঠল। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় হালকা ঘ্যানঘেনে স্বরে বিরক্তি প্রকাশ করতে লাগল ও। বোরাক সেভাবেই বুকে জড়িয়ে নিল ছেলেকে। বাবার উষ্ণতা পেয়ে শান্ত হলো বীর, তবে এবার অভ্যাসমতো মুখ দিয়ে বারবার ফিডার চোষার মতো চুকচুক শব্দ করতে লাগল।
​তা দেখে বোরাক আস্তে করে বিছানা ছেড়ে উঠে গেল। বোরাক উঠে যেতেই টাইটান ওর এক পা আলতো করে বীরের বুকের ওপর তুলে দিয়ে রাখল, যেন বীরকে অভয় দিতে কাছে কারো উপস্থিতি বুঝাতে চাইছে সে।
​এদিকে বোরাক তাড়াতাড়ি করে ঘরের মিনি ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে ফিডারে ঢেলে নিল। তারপর ফিডারটা বোতল ওয়ার্মারে হালকা গরম করে নিয়ে এসে বীরের মুখে ধরল। এক হাতের ওপর বীরের মাথাটা তুলে নিয়ে, অন্য হাত দিয়ে পরম যত্নে ছেলেকে ফিডিং করাতে লাগল এই বাবা। পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলল ছেলের। তবুও আজও বোরাকের কাছে পাঁচ মাসের সেই ছোট্ট আযানটাই রয়ে গেল।
​বোরাকের বাবা, মরহুম আযান উদ্দিন শিকদার। প্রিয় বাবার নাম যেন সময়-কালের গহ্বরে হারিয়ে না যায়, তাই বোরাক নিজের ছেলের নাম আযান রেখেছিল। তবে ছেলেটা যেন তার হারিয়ে যাওয়া বাবা হয়েই ফিরে এসেছে তার জীবনে।

​আশা ঘরে এসে বিছানায় বসল। মুখে এক চিলতে হাসি, মনে রাজ্যের উত্তেজনা। খুশি মনে ফোনটা হাতে তুলে ‘গুল্লাছুটের গসিপ’ নামের মেসেঞ্জার গ্রুপটায় ঢুকল সে। গ্রুপে আগে থেকেই স্নেহা, নেহা, আরোয়া, নীলিমা আর শুভ অ্যাক্টিভ ছিল। স্নেহা আর শুভর মধ্যে কোনো একটা বিষয় নিয়ে তুমুল ঝগড়া চলছে—মেসেজের পর মেসেজ ভেসে আসছে স্ক্রিনে।
​আশা সব কিছু উপেক্ষা করে আঙুল চালাল কিবোর্ডে। ছোট একটা লাইন লিখে সেন্ড করে দিল:
​”মিশনে লেগে পড়ো গাইস। ভাইয়া রাজি।”
​ব্যাস, গ্রুপে বোমা ব্লাস্ট হওয়ার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। স্নেহা আর শুভর ঝগড়া এক নিমেষে উধাও। একেকজনের “সিরিয়াসলি?”, “সত্যি বলছ?”, “কী কথা শোনালে আপু?”, “তার মানে অবশেষে একটা বিয়ে খেতে পারছি”—এমন সব মেসেজে অস্থির করে তুলছে আশাকে। সবার পাগলামি দেখে হাসল আশা। লিখল, “এখন করণীয় কী মনে আছে তো?”

​শুভ লিখল, “তুমি কোনো চাপ নিও না আপু। আমি একাই সব ম্যানেজ করে নিব। চব্বিশ ঘণ্টা—শুধু চব্বিশ ঘণ্টা সময় দাও, একশটা সুন্দরীর বায়োডাটা তোমার সামনে হাজির করব।”
​স্নেহা শুভকে মেনশন করে লিখল, “মনে হচ্ছে সুন্দরীদের ইন্টারভিউ নিয়ে রেখেছিস। তা তোর ব্যক্তিগত অফিসে কটা সুন্দরীকে চাকরি দিলি?”
​শুভও স্নেহাকে মেনশন করে পাল্টা লিখল, “বহুত, সংখ্যাটা আর না বলি। পরে কারো মনে জ্বালা ধরে যাবে।”
​আশা কিছুক্ষণ ওদের ঠেসাঠেসি দেখে এবার লিখল,
​”শোন সবাই, আসছে শুক্রবারে সবাইকে বাসায় দেখতে চাই। কী জন্য তা নিশ্চয়ই বলতে হবে না! জুয়েল ভাইয়া আর আসাদ ভাইয়াকেও জানিয়ে দে।”
​তখনই আরোয়া ঘরের দরজায় নক করল। আশা উঠে দরজা খুলে দিতেই উত্তেজিত আরোয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল বোনের ওপর।

​”আপু, আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। কীভাবে রাজি করালে ভাইয়াকে?”
​আশা হেসে বলল,
​”ওভাবেই। শোন, এখনই এত উত্তেজিত হলে হবে না।”
​”আরে আমি জানি এখন কী করতে হবে আমার। কালকেই আমার ফ্রেন্ডদের জানিয়ে দিব, তাদের চৌদ্দ গোষ্ঠীতে যত সুন্দরী আছে সবার বায়োডাটা ছিনিয়ে আনব।”
​”আচ্ছা। সব ভালো হলেই ভালো।”
​”আচ্ছা আমি যাই এখন। অনেক কাজ।” বলে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই ঝড়ের বেগে চলে গেল আরোয়া।
​আশা দরজা লক করে এসে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল, চোখজোড়া তার জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে স্থির। আরোয়ার সাথে তার বয়সের তফাৎ প্রায় এক দশকের, অথচ বোরাকের সাথে তার ব্যবধান মাত্র দুই বছরের। বয়সের এই সামান্য পার্থক্যই তাকে ভাইয়ের জীবনের প্রতিটি ভাঙন, প্রতিটি চড়াই-উতরাই খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।

​আশার চোখে তার এই শক্তপোক্ত ব্যক্তিত্বের ভাইটা এক জীবন্ত সুপারহিরো। কিশোর বয়সে নিজে মা হারা হয়েও ছোট দুই বোনকে মাতৃ চাদরে আগলে রাখা, বাবার পাশে ভরসা হয়ে দাঁড়ানো, সেই প্রিয় বন্ধুর মতো বাবাকে হারিয়ে প্রায় ভেঙে পড়া। বাবার ঘাম ঝরানো হালাল সাম্রাজ্য রক্ষা করতে আশেপাশের স্বার্থপর মুখোশধারী কিছু শত্রুর সাথে একা লড়ে যাওয়া। সেই শোক আর লড়াইয়ের মাঝেই আরও এক গভীর ক্ষত, প্রিয় সহধর্মিণীর অকল্পনীয় ধোঁকা। চার মাসের একটা ছোট্ট প্রাণকে বুকে জড়িয়ে নিষ্ঠুর এই পৃথিবীর বুকে একা টিকে থাকার যে অবিরাম লড়াই বোরাক লড়েছে, তা তো আশা খুব কাছ থেকে দেখেছে। এই শক্ত খোলসের মানুষটার ভেতরে যে পাহাড়সম একাকীত্ব, অসহায়ত্ব তা আশার চেয়ে কে বেশি জানবে? এবার সত্যিকারের দুটো বিশ্বস্ত, ভালোবাসার এবং ভরসার হাত তাকে আগলে নিক, আল্লাহর কাছে এই-ই প্রার্থনা।

“​আযান, আমার বাবা! ফুপুমনি এসব কি বলছে? তোমাকে আমি ভালো রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি? তুমি কষ্টে আছো কলিজা? কিসের কষ্ট বাবা তোমার? পাপাকে বলো! কি চাই তোমার? একাকিত্বের সঙ্গী? কিন্তু পাপা তো ভয় পায় বাবা আমার। পুনরায় ঠকে যাওয়ার ভয়। বিশ্বাস করো বাবা, বেশ ভালোই আছো তুমি। কেননা কেউ তোমাকে মিথ্যে সঙ্গ দিয়ে মাঝপথে একা করে পালায় নি। স্বার্থপর পৃথিবীতে একা থাকাটাই খুব শ্রেয়। এখানে বিশুদ্ধ ভালোবাসার বড় অভাব। তোমার জীবনে কেউ স্থায়ীভাবে আসবে না। তোমাকে মিথ্যে ভালোবেসে তোমার অভ্যাস খারাপ করে দিবে, তারপর কোনো এক ভোরে ফাঁকি দিয়ে পালাবে, কিন্তু তোমার জীবনে সকাল আর আসবে না। বাবা, সেই যন্ত্রণার কাছে একাকিত্বের এই যন্ত্রণা একাংশও নয়।”
“​তবুও যদি তুমি চাও, যদি তোমার হাসির জন্য সত্যি কোনো মমতাময়ীর প্রয়োজন হয়, আমি নামব তার খোঁজে। পাপা তোমার সুখের জন্য সব কিছু করবে। কিন্তু সেও যদি কোনদিন তোমাকে আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালায়, তবে সেই দায়ভার আমি নিতে পারব না বাবা। আমার পক্ষে সম্ভব না আর কোনো নতুন ক্ষত সইবার, আর কোনো দায় নেবার। ”

​নিশুতি রাত। জানালার বাইরের আকাশটা আজ মেঘলা, ফিকে জোছনাও যেন থমকে দাঁড়িয়েছে বোরাকের মাস্টার বেড রুমের কাঁচের ওপারে বিশাল বারান্দাটায়। ঘরের ভেতর বাতিটা ডিম করে জ্বালানো, মৃদু হলদে আলোয় বীরের মুখটা নূরানী ফেরেস্তার মতোই মায়াবী লাগছে।
​ফিডার খেতে খেতেই বাবার বাহুবন্ধনে আবারো ঘুমের দেশে পাড়ি জমাল বীর, ছোট্ট হাতটা তখনো বোরাকের সোয়েটশার্টের কলার আঁকড়ে ধরে আছে। মুখের ডান পাশটা বোরাকের শক্তপোক্ত বুকের সাথে লেপ্টে আছে, তৃপ্তিতে নিচের ঠোঁটটা একটু উল্টে আছে। সে যে বাবার বুকে কতটুকু নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে, তা তার বুক ওঠানামা করা ছোট ছোট প্রশান্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দেই টের পাওয়া যাচ্ছে।
​তবে বোরাকের চোখে ঘুম নেই। সে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ছেলের ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখপানে, এক হাতে দিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। এই নিশুতি নিস্তব্ধতায় বোরাকের হৃদয়ের অলিগলিতে হাজারটা প্রশ্ন, দ্বিধা ও শঙ্কার আনাগোনা। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। নিজেকে ব্যর্থ পিতা দাবি করছে মন। সত্যিই কি সে ব্যর্থ পিতা? কার কাছে একটু জানতে চাইবে? নিভৃতে তার প্রশ্ন শুনবার জন্য কেউ নেই। অগত্যা নীরব মনে অঘোষিত সেই প্রশ্নগুলো ঘুমন্ত ছেলের কাছেই তুলে ধরল বোরাক শিকদার।

মাঝরাতের নিস্তব্ধতা পুরো বাড়িকে গ্রাস করে রেখেছে। প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে ওয়াশরুম থেকে ফেরার পথে লালবানু বেগম মৌটুসীর ঘরের সামনে থামলেন একবার। দরজার কপাটটা আলতো ভেজানো, তিনি হাত বাড়িয়ে ঠেলে সামান্য ফাঁক করে ভেতরে উঁকি দিলেন।ডিম বাতিতে বিছানার অবস্থা দেখে কপালে ভাজ পরল ভদ্রমহিলার।
ঠিক যা আশঙ্কা করেছিলেন, তাই! ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে বিছানার এক কোণায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে চড়ুই। এদিকে, মৌটুসী গোটা কম্বল নিজের কবজায় নিয়ে আয়েশে হাত-পা ছড়িয়ে পুরো বিছানাটাই দখল করে নিয়েছে। আবার এক পা চড়ুইয়ের পেটের ওপর আড়াআড়িভাবে তুলে রেখেছে।
​লালবানু বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করতে করতে ঘরে ঢুকলেন। ঘুমের মধ্যে এই মেয়ের শুয়ে থাকার ভঙ্গি আর কোনদিনও ভালো হবে না বোধহয়! কাছে গিয়ে তিনি মৌটুসীর কাঁধ ঝাকিয়ে ডাকলেন, “মৌ! এই মৌ? এই ছ্যামড়ি!”
​মৌটুসী তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় হকচকিয়ে উঠল। চোখ রগড়াতে রগড়াতে ভয়ার্ত গলায় বলল, “কী হয়েছে আম্মা? চড়ুই?”

লালবানু বেগম এবার গলায় স্বর কিছুটা নরম করলেন,
“কিছু না। দেখ কিভাবে শুয়েছিস? পাখিটা ঠান্ডায় কুঁকড়ে আছে, খেয়াল আছে? ভালো করে শো!”
মৌটুসী এবার চোখে ঘুম নিয়েই হাতরে দেখল, চড়ুইকে না পেয়ে উঠে বসল।বুঝল, এতক্ষণ উল্টো করে শুয়ে ছিল সে। পায়ের দিকটায় ঘুমিয়ে আছে চড়ুই। মৌটুসী এবার ঠিক ভাবে শুয়ে চড়ুইকে টেনে কাছে নিয়ে এল, তারপর কম্বলটা দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিল ওকে। চড়ুই ঘোরের মধ্যেই একটু নড়েচড়ে আরাম করে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিল। মৌটুসীও মেয়েকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে নিল।

মৌটুসী পর্ব ৫

লালবানু বেগম দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বিরক্তিতে বিড়বিড় করে বললেন,
“সাধে কি আর বলি আলাদা আলাদা কম্বল নে তোরা! ঘরে কি কম্বলের অভাব? কথা তো শুনবে না, একটা কম্বল নিয়ে প্রতিদিন টানাটানি।

মৌটুসী পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here