মৌটুসী পর্ব ৭
ঋতস্বিনী মাহবিশ
পৌষের সকাল। কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশটা এক মায়াবী ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন। সকালের স্নিগ্ধ আলো গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া শিশিরবিন্দুতে চুমু খেয়ে ঝিলিক দিয়ে উঠছে। শীতের বাতাসের এক দলা হিমেল স্পর্শে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা পেয়ারা গাছটার পাতাগুলো থরথর করে কাঁপছে। বাতাসের গন্ধে একটা স্নিগ্ধতা, ঠিক যেন ভেজা মাটি আর শিশিরের যৌথ উচ্চারণ।
ছামেদ আলীর চারকোনা আঙিনাটাকে ছোটখাটো একটা বাগানও বলা চলে। গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেলি—এমন হরেক রকমের ফুলেল গাছ; এর ফাঁকে ফাঁকে মাথা তুলে আছে অ্যালোভেরা, পাথরকুচিসহ কয়েক রকমের সবজি গাছ। এই পুরো বাগানটুকু মৌটুসীর পরম মমতায় গড়ে ওঠা এক টুকরো সবুজ স্বর্গ। বাগান করা বা গাছ লাগানোটা তার অন্যতম একটা শখ। বাড়িতে ছাদ, বারান্দা—কোনোটাই না থাকায় আঙিনাতেই সেই শখ পূরণ করে সে। প্রতিদিন শত ব্যস্ততার মাঝেও সময় বের করে তাদের যত্ন নেয়। এই যেমন এখন সকাল সকাল তাদের পেছনে পড়ে লেগেছে! গাছের গোড়ার আগাছাগুলো উপড়ে ফেলে পানি দিচ্ছে সেগুলোতে। ফজরের আগেই ঘুম থেকে উঠেছিল, লালবানু বেগম তাহাজ্জুদ কালে ডেকে দিয়েছিলেন। সেই সময় উঠে পড়তে বসেছিল মৌটুসী, মাঝে ফজরের নামাজ পড়ে আবারো পড়া। তারপর ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার পর এই কনকনে শীতের মাঝে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে তার শখের বাগানে।
মৌটুসীর পানি দেওয়া প্রায় শেষের দিকে। গ্রিল দেওয়া বারান্দার দরজায় এসে দাঁড়াল চড়ুই। উস্কোখুস্কো চুল, চোখে তখনও ঘুমের আলস্য—দুই হাত দিয়ে চোখ ডলতে ডলতে ঘুম ঘুম অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
“মাম্মা….”
চড়ুইয়ের আদুরে ডাক কানে যেতেই এদিকে ঘুরে তাকাল মৌটুসী। চড়ুইকে দেখেই মৌটুসীর চোখেমুখে এক টুকরো সকালের রোদের মতো মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে হাত থেকে পানির মগটা নামিয়ে রেখে বলল,
“আমার ভোরের চড়ুই পাখির ঘুম ভেঙেছে?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই চড়ুই চঞ্চল পায়ে দৌড়ে এল। মৌটুসী এক হাতে আগলে নিল তাকে। নিজের গায়ে জড়ানো গরম চাদরের ভেতর চড়ুইকে জড়িয়ে নিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“ঘরে চলো কিউটি পাই, এখানে অনেক ঠান্ডা।”
চড়ুইকে চাদরের ওমে আগলে নিয়ে মৌটুসী বাকি টবগুলোতে দ্রুত পানি দিয়ে নিল। এরপর চড়ুইকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা দিল ঘরের দিকে। ওয়াটার হিটারে কুসুম গরম পানি করে চড়ুইকে ব্রাশ করিয়ে ফ্রেশ করে দিল। এরপর বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে বসিয়ে দিয়ে, ফোনে কার্টুন বের করে তা হাতে ধরিয়ে দিল। বলল,
“বসে বসে কার্টুন দেখো মাম্মা, এখান থেকে বের হবে না। বাইরে ঠান্ডা।”
চড়ুই আরাম করে খাটে হেলান দিয়ে বসে ফোনে ফেইরি টেলস কার্টুন দেখতে লাগল, ওর পুরো মনোযোগ এখন ফোনের ভেতর। এদিকে মৌটুসী বাইরে টুকটাক কিছু কাজ সেরে রান্নাঘরে এল। লালবানু বেগম পরোটা বানাচ্ছেন। মৌটুসী প্লেটে একটা পরোটা, ডিম পোঁচ আর মিষ্টি নিয়ে বারান্দার ডাইনিং টেবিলে রাখল।
তারপর ঘরে গিয়ে চড়ুইয়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে রেখে দিল।
“এই যে চড়ুই পাখি, হয়েছে কার্টুন দেখা। এখন খেতে হবে। চলো।”
বলেই ওকে কোলে করে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের সামনে রাখা উঁচু কাঠের টুলটাতে বসিয়ে দিল। টুলটা আলাদা করে চড়ুইয়ের জন্যই বানিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এতে বসে ছোট্ট চড়ুই খুব সহজেই টেবিলের প্লেট হাতাতে পারে। অনেক আগে থেকেই চড়ুই নিজ হাতে খেতে পারে। মৌটুসী তাকে সেভাবেই তৈরি করেছে। শুধু রাতের খাবারটা মৌটুসী তুলে খাইয়ে দেয়, আর বাকি সময় চড়ুই নিজ হাতেই খায়। চড়ুইকে বসিয়ে দিয়ে মৌটুসী এবার ছামেদ আলীকে খাওয়াতে খাবার নিয়ে উনার ঘরে চলে গেল।
পৌষের হিমেল হাওয়া জানালার কাচ ছুঁয়ে ঘরে ঢুকছে। সেই কনকনে শীতের সকালেও বোরাকের শরীরে উত্তাপের যেন কোনো কমতি নেই। পরনের নাইকি ব্র্যান্ডের কালো স্যান্ডো গেঞ্জিটা ঘামে কিছুটা ভিজে তার ফর্সা শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, ফলে চেস্ট ক্লিভেজ আর সিক্স প্যাকের পেশির গঠন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কপাল আর সুঠাম বাইসেপের ওপর ঘামের বিন্দুগুলো আলোয় চিকচিক করছে—একেকটি তার সবেমাত্র জিম সেশন শেষ করে ফেরার জীবন্ত নিদর্শন। বোরাক বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা বীরকে দেখে নিল একবার। তারপর গলায় একটা তোয়ালে ঝুলিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।
গোসল সেরে ভেজা শরীরে সাদা বাথ টাওয়াল জড়িয়ে বেরিয়ে এল বোরাক। বাথ টাওয়ালের সামনের ফাঁড়া দিয়ে ফর্সা বুকের কুচকুচে লোমগুলো উঁকি দিচ্ছে। মাথা মুছতে মুছতে সে বীরের বিছানার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বীর তখনো গভীর ঘুমের রাজ্যে। বোরাক তোয়ালেটা সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেলল। এরপর ছেলের ওপর ঝুঁকে আলতো হাতে তার নরম চুলে বিলি কাটতে কাটতে নিচু স্বরে ডাকল,
“আযান বীর শিকদার! উঠে পড়ুন বাবা! স্কুলে যেতে হবে।”
তার সাথে যোগ দিল টাইটান। মেও মেও বলে সেও ডাকছে বীরকে।
বীরের নড়চড় নেই। চোখের পাতা দুটো মৃদু কাঁপছে শুধু। বোরাক আবারও ডাকল,
“বাবা? আমার জানবাচ্চা। পাপার কলিজা!”
অবশেষে তন্দ্রা আলগা হয়ে এল বীরের। কবার মাথা এপাশ-ওপাশ করে পিটপিট করে চোখ মেলে দিল সে। বোরাক শিকদারের ঠোঁট দুটো প্রসারিত হয়ে এল। ছেলের কপালে কপাল ঠেকিয়ে আদুরে গলায় রেশ রেখে বলল, “মাই চ্যার্পি লিটল বার্ড! পাপা ইজ ওয়েটিং ফর ইউর মর্নিং চ্যার্প, বাবা!”
বীর আচমকা এক হৃদয়স্পর্শী কাণ্ড করে বসল। নরম হাত দুটো উঠিয়ে বোরাকের গলা জড়িয়ে ধরল। বোরাক আবেশের তাড়নায় আর ঝুঁকে থাকতে পারল না। ছেলের গলার ভাঁজের কোমল ত্বকে মুখ গুঁজে আধশোয়া হয়ে গেল তার ওপর। আহা কি শান্তি! যেন জগতের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত একাকীত্ব এই ছোট্ট শরীরের উষ্ণতায় মুছে যাচ্ছে। বাবা একটা ঘ্রাণ এসে ঠেকছে নাসারন্ধ্রে। দুজনই নীরব, নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর কেবল তাদের গভীর, ছান্দিক শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। বোরাক চোখ বুজে সেই স্পর্শটুকু শুষে নিচ্ছে, আর বীর ঘুম-ঘুম চোখে সোজা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে।
বেশ কিছুক্ষণ পর বীর ঘুম জড়ানো অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
“পাপা, সকাল হয়ে গেছে?”
আবেশিত বোরাক ধীরে ধীরে মাথা তুলল। ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল,
“ইয়েস মাই সানসাইন! ইটস অলরেডি লেট মর্নিং।”
বোরাকের আলিঙ্গনের মাঝেই বীরের ছোট্ট শরীরটা মুচড়ে উঠে আড়মোড়া ভেঙে নিল।
”কাম অন…. লেট’স গেট ফ্রেশ ফার্স্ট!” বলেই বোরাক বীরকে কোলে তুলে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিল। বীর আবার জিজ্ঞেস করল,
“এখন স্কুলে যেতে হবে?”
বোরাক চিবুক দিয়ে ছেলের মাথায় আলতো চাপ দিয়ে বলল,
“অবশ্যই বাবা! এখন আমরা ফ্রেশ হয়ে, ব্রেকফাস্ট করে স্কুলে যাব।”
টয়লেটে নিয়ে বীরকে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে পরিষ্কার করিয়ে তাকে বেসিনের সামনে টুলে দাঁড় করিয়ে দিল বোরাক। এরপর ব্রাশ করিয়ে, মুখ-হাত ধুয়ে একদম ফ্রেশ করে দিয়ে, ফের কোলে করে ঘরে নিয়ে বিছানার ওপর দাঁড় করাল।
এবার ক্লোজেট থেকে প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় বের করে নিয়ে এসে বীরকে সেগুলো পরিয়ে দিল। তারপর নিজেও পরে নিল। বীর নিজের গায়ের রয়্যাল ব্লু কালারের জ্যাকেট আর বোরাকের গায়ের সেম কালারের কোট দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“পাপা, আজকেও ম্যাচিং ম্যাচিং!”
”হ্যাঁ বাবা। আজকেও আমরা ম্যাচিং ম্যাচিং।”
বোরাক ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে হেয়ার ব্রাশটা তুলে নিল। বীরের চুলগুলোও তার মতোই ভীষণ রকমের আদুরে, তবে একটু জেদি। ওপরের দিকের কিছুটা অংশের চুল সব সময় একটু খাড়া হয়ে থাকতে চায়, আবার সিল্কি ফ্রিঞ্জগুলো কপাল ঢেকে পড়ে থাকে। ছোটখাটো পূর্ণিমার চাঁদের মতো ফুটফুটে মুখটা কী যে সুন্দর তার! বোরাক শিকদারের আকাশ জুড়ে জ্বলজ্বল করা তার একান্ত ব্যক্তিগত চাঁদ।
বীরের থুতনির ডগায় ছোট্ট খাঁজটার জন্য তাকে দেখতে আরও আদুরী ও মায়াবী লাগে। এই পরিবারের ছেলে-মেয়েরা সবাই বংশানুগতভাবে থুতনির ডগায় ছোট একটা খাঁজ পায়, যাকে ক্লিফট চিন বলা হয়। আশা-আরোয়ারও আছে। বলা বাহুল্য, তাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এই ক্লিফট চিনের বিশেষ ভূমিকা আছে। এদিকে আবার বোরাকের ঘন চাপ দাড়ি থাকায় তার থুতনির খাঁজটা বিশেষ বোঝা যায় না। কেবল ক্লিন শেভ করলেই চোখে পড়ে তা।
বোরাক ছেলের চুল আঁচড়ে তাকে একেবারে তৈরি করা শেষে ওর দুই বাহুতে হাত রেখে পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিল। ছেলের অপার্থিব সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে গর্বিত স্বরে বলল,
“আমার সাহসী ও সুদর্শন ছেলে!”
বীর পাপার মুখে নিজের প্রশংসা শুনে খুশিতে ডগমগ। এক গাল হেসে মুখ বাড়িয়ে বোরাকের দুই গালে শব্দ করে দুটো চুমু একে দিল।
এদিকে বাবা-ছেলের ভালোবাসা দেখে টাইটান লেজ নাড়িয়ে এগিয়ে এসে ওদের মাঝখানে ঢুকে পড়ল। তারও এখন একটু আদরের আবদার। বোরাক ওর কোমল শরীরে একটু আদরে হাত বুলিয়ে দিতেই মেও মেও করে আপ্লুত হয়ে পড়ল সে।
বোরাক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও বীরের স্কুল ব্যাগসহ একেবারে তৈরি হয়ে বীরকে কোলে করে নিচে নেমে এলো।
কাপড় সেলাইয়ের সুবাদে লালবানু বেগমের ঘরে পাড়ার মহিলাদের আনাগোনা লেগেই থাকে। কিন্তু দর্জি ঘরের কাজের চেয়ে মৌটুসী আর তার মেয়েকে ঘিরেই তাদের যত কাজ। তাদের নিজেদের থেকেও বেশি চিন্তা যেন মৌটুসীকে নিয়ে। আজ যেমন সকাল সকাল পাশের বাড়ির এক ভাড়াটিয়া মহিলা কাপড় সেলাইয়ের নামে এসে লালবানু বেগমের পাশে বসে বেশ আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“ভাবি, আপনার মাইয়াটারে বিয়া-সাদি দিতেন না? দেখতে শুনতে তো মাশাল্লাহ এখনো রূপবতীই আছে!”
লালবানু বেগম নিবিষ্ট মনে কাপড়ের মাপ নিচ্ছেন। মাথা না তুলেই উত্তর দিলেন, “দিতাম না ক্যান? ভালা পাইলেই দিমু। মাইয়া তো আর আপন খাঁচায় পোষার পাখি নয়!”
মহিলাটি যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন,
“তা মাইয়ার মাইয়াটারে কি করবেন? বাপের কাছে পাঠাইবেন?”
”না, হেয় মাইয়ার লগেই থাকব। মাইয়া যেই ঘরে যাইব হেই ঘরেই হেও যাইব।”
”কি কন? এক মাইয়া সমেত কেডায় বিয়া করত হেরে? তালাকের দোষ তাও মাইনা নেওন যান, কিন্তু পোলাপান? হুনেন ভাবি পরামর্শ দেই, আমার হাতে একখান ভালা ঘর আছে। বিশাল বড়লোক। বউ মইরা গেছে। বয়স অল্পই, পোলাপাইন কিছু নাই। সুন্দরী বউ খুজতাছে। কইতাছি আপনার নাতিটারে হের বাপের নিকট পাইঠা দেন, বাপের মাইয়া বাপের ঘরেই থাউক। আর আপনার মাইয়ারে আমি হেই ঘরে দেওয়ার ব্যবস্থা করতাছি।”
ভেতরের ঘর থেকে মৌটুসী এতক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে সব হজম করলেও এবার আর পারল না। শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছে তার। চড়ুইয়ের চুল বেঁধে দিচ্ছিল সে, এবার নিজেই আঁচড়ানো চুলগুলো ক্ষিপ্র হাতে এলোমেলো করে দিল।
ছোট্ট চড়ুই মায়ের কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মাম্মা আমার চুল নষ্ট করে দিচ্ছ কেন?”
মৌটুসী মেয়ের প্রশ্ন উপেক্ষা করে তীব্র স্বরে লালবানু বেগমকে ডেকে উঠল, “আম্মা! আম্মা, ঘরে আসো!”
”আইতাছি। একটু খাড়া।”
”এক্ষুনি আসো!”
লালবানু বেগম কাজ রেখে উঠে দাঁড়ালেন। মহিলাটিকে বসতে বলে ঘরে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হইছে?”
”কি হইছে মানে? সকাল সকাল গল্পের হাঁড়ি নিয়ে বসার মানে কি? মানুষের কাজকাম কিছু নাই বলে তোমারও কি নাই? এত সুখী হলে কবে থেকে?”
মৌটুসীর ফর্সা চোখমুখ লাল হয়ে আছে। হঠাৎ মেয়ের শান্ত মেজাজ চটে যাওয়ার কারণ বুঝতে বাকি রইল না লালবানু বেগমের। তিনিই বা কি করবেন? মানুষের মুখ বন্ধ রাখার ক্ষমতা তো আল্লাহ তাকে দেননি।
“আস্তে কথা ক মৌ। কি করতে হইব? আমি কইরা দিতাছি।”
”চড়ুইয়ের চুল বেঁধে দাও।” লালবানু বেগমের হাতে চিরুনি ধরিয়ে দিয়ে নিজে রেডি হতে চলে গেল মৌটুসী। তার ড্রেসআপ মানেই, ফতুয়া আর লং স্কার্ট। শীতের জন্য অবশ্য একটা কার্ডিগান সোয়েটার আর চাদর যোগ হয়েছে। ভেজা চুলগুলো থেকে তখনও টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে মেঝেতে পড়ছে, সেদিকে মৌটুসীর খেয়ালই নেই। সে নিজের মতো তৈরি হতে ব্যস্ত।
লালবানু বেগম চড়ুইয়ের চুলে সিঁথির কাছ থেকে দুই পাশে দুটো খেজুর বেণী গেঁথে নিয়ে আসছেন। সাথে আড় চোখে মেয়েকে লক্ষ্য করে বললেন,
“মাথাটা ভালো করে মুইছে নে, মৌ। আগা দিয়া পানি পড়তাছে।”
চড়ুইও বিজ্ঞদের মতো তাল মেলাল নানির সাথে। “ভালো করে চুল মোছো মাম্মা। নাহলে সর্দি লেগে যাবে।”
অথচ মৌটুসীর মুখে কোনো রা নেই, তার চোয়াল শক্ত। সে দ্রুত হাতে চড়ুইয়ের স্কুল ব্যাগটা গুছিয়ে নিচ্ছে।
মৌটুসীর নির্লিপ্ততা দেখে ছোট্ট চড়ুই বুঝল, তার মাম্মার হয়ত মন খারাপ। কেননা মাম্মার মন খারাপ হলে আর রাগ হলে মাম্মা একদম কথা বলে না। চুপ করে থাকে। চড়ুই ঠোঁট উল্টে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার মাম্মার মন খারাপ হলে তারও মন খারাপ হয়!
বেণী গাঁথা শেষ হলে লালবানু বেগম মোটা সোয়েটারটা পরিয়ে দিলেন চড়ুইকে। এরপর পায়ে মোজা দুটোও পরিয়ে তাকে একেবারে তৈরি করে দিয়ে তিনি হাতে একটা গামছা নিয়ে মৌটুসীর কাছে গেলেন। মৌটুসী আয়নায় একবার নিজেকে দেখে সাইড ব্যাগটা কাঁধে নিল। লালবানু বেগম আলতো হাতে মৌটুসীর চুলের আগাগুলো মুছে দিতে লাগলেন।
মৌটুসী এবার একটু শান্ত হলো। মায়ের হাতের স্পর্শে ভেতরের তোলপাড় করা রাগটা কিছুটা থিতিয়ে এল। লালবানু বেগম ভেজা চুলেই চিরুনি বুলিয়ে দিলেন। চুলগুলো খোলায় রইল। মৌটুসীর কব্জিতে একটা স্ক্রাঞ্চি হেয়ার ব্যান্ড, চুল শুকালে পনিটেল করে নিবে তা দিয়ে।
”খাবার বাটিতে তুলে রেডি করে রেখো আম্মা। চড়ুইকে নামিয়ে দিয়েই চলে যাব। কালকে এমনই দেরি হয়ে গিয়েছিল।”
”আচ্ছা।”
চড়ুইয়ের হাত ধরে বেরিয়ে এল মৌটুসী। ঘর ছেড়ে বারান্দায় আসতেই মাসুমদের ঘরের ভেতর থেকে মেহেরুনের তীব্র চেঁচামেচি আর সেই সাথে মাসুমের কান্নাকাটির আওয়াজ ভেসে এল কানে।
”ক স্কুলে যাবি! যাবি ক। মুখ দিয়ে উচ্চারণ কর।”
”না, যাইতাম না, স্কুলে যাইতাম না আমি।”—মাসুমের কান্নার দমক।
পরক্ষণেই পশ্চাৎদেশে আবারো কঞ্চি দিয়ে পেটানোর শব্দ—চপাৎ। “তুইও যাবি তোর বাপও যাবইব। স্কুলে না গেলে, পড়া না শিখলে জীবনে করবি কি? খাবি কী? বাপের মতন কামলা দিবি মানষের?”
মাসুমের কান্নার দমক বেড়ে গেল। এদিকে চড়ুই ঠোঁট চেপে হেসে বিদ্রুপ করে বলল,
“উফফ, কেমন লাগছে? আরও মারো মামিমা!”
মৌটুসী ভ্রু কুঁচকে শাসনের স্বরে বলল, “চড়ুই পাখি! এভাবে বলে না!”
চড়ুই মুখ ভেংচে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,
“কেন বলে না? মাসুম পঁচা ছেলে। মার খাক এখন!”
লালবানু বেগম দাঁত খিঁচিয়ে বিড়বিড় করলেন, “ছাওয়ালটারে মারতাছে কেমনে? পাষাণ? পাশাণ সবার জীবনই অতিষ্ঠ কইরা ছাড়ল।”
মৌটুসী দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুই না শোনার ভান করে চড়ুইয়ের হাত ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু মাসুমদের ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মৌটুসী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ভাইপোর কান্নার শব্দ বিষের মতো ঠেকছে তার কানে। থামল সে, স্থির দৃষ্টিতে মেহেরুনের ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে গলাটা যথাসম্ভব শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ করে বলল,
“বাচ্চাকে মেরে কোনোদিন সমাধান পাওয়া যায় না। বাচ্চা কেন স্কুলে যেতে চাইছে না, তা আগে আদর করে জিজ্ঞেস করতে হয়। এজন্যই লোকে বলে, মা একটু শিক্ষিত না হলে সন্তানের কপালে দুঃখই লেখা থাকে।”
কথাটা বলেই সে আর দাঁড়াল না। চড়ুইকে নিয়ে বড় বড় কদমে বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে বারান্দা থেকে বাইক বের করতে উদ্যত হলো। এদিকে মেহেরুনের তীব্র গলা ভেসে আসছে,
“তুমি তো শিক্ষিত মা*গী! দেখতাছি মাইয়ারে কি বানাইতাছ? ম্যাজিস্ট্রেট না টিওনো হইব বাঁইচা থাকলে ঠিকই দেখমু। আমি অশিক্ষিত, আমার পোলা কামলায় দিব।”
মৌটুসী সেসব তোয়াক্কা না করে বাইক বের করে গলির রাস্তায় তুলল। লালবানু বেগম মেইন দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। চড়ুই বাইকে উঠে বসে এক হাতে মৌটুসীর কোমর জড়িয়ে ধরল। তারপর পেছনে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল, “নানিমনি থাকো। টাটা।”
”যাও নানু। ভালা করে পড়াশোনা কইরো।”
আজকে আর মৌটুসী প্রথমেই কেক ডেলিভারি দিতে গেল না। কালকে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে ভাবল, চড়ুইকে স্কুলে দিয়ে এসে পরে ডেলিভারি দুটো পৌঁছে দিবে। আজকে বেশ আগেভাগেই ক্লাসে এসেছে ওরা। সকালের শান্ত পরিবেশে এখনো খুব একটা ভিড় জমেনি, তাই সামনের সারির একটা বেঞ্চ ফাঁকা। চড়ুই দৌড়ে গিয়ে সেখানে বসে পড়ল। মৌটুসী ব্যাগটা টেবিলে রেখে নিজেও পাশে বসে পড়ল। তারপর সাইড ব্যাগ থেকে দুটো সেন্টার ফ্রুট বের করে একটা নিজে মুখে পুরে নিয়ে অন্যটা চড়ুইকে দিল। চড়ুই আবার হাত পেতে বলল,
“আমার বীর বন্ধুর জন্যও একটা দাও!”
মৌটুসী মুচকি হেসে আরও তিন-চারটার মতো চড়ুইকে দিল। মৌটুসীর ব্যাগে চুইংগামটা হলো কম্পালসারি একটা জিনিস।
গতদিন তড়িঘড়ির মাঝে ক্লাসরুমটা ভালো করে দেখার সুযোগ হয়নি মৌটুসীর। আজ চুইংগাম চিবুতে চিবুতে চোখ জোড়া চারপাশ ঘুরে এল। ক্লাসরুমের পরিবেশটা সত্যিই অন্যরকম—একটু বেশিই গোছানো, একটু বেশিই প্রাণবন্ত। দেয়ালগুলোতে বিভিন্ন থিমভিত্তিক সুন্দর সুন্দর পেইন্টিং, এমনকি ছাদটাও বাদ যায়নি। উন্নতমানের স্কুলের ক্লাসরুম বলে কথা! পরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাস ভরা সৃজনশীলতায় ভরপুর। গোটা স্কুলটাই অন্যরকম, স্কুল প্রাঙ্গণটা ছোটখাটো একটা পার্ক বলা চলে। জায়গায় জায়গায় দোলনা, স্লাইডার বসানো। স্কুল এত সুন্দর হলে বাচ্চারা আবার আসতে চাইবে না স্কুলে?
এদিকে চড়ুইয়ের চোখে-মুখে অধীর প্রতীক্ষা। সে চুইংগাম চিবুতে চিবুতে ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে বেঞ্চের প্রান্তটা আঁকড়ে বসে আছে, প্রতীক্ষিত চোখ দুটো দরজার দিকে তাকিয়ে। এবার চোখ ফিরিয়ে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মাম্মা, বীর বন্ধু কখন আসবে?”
মৌটুসী খুব মন দিয়ে পেইন্টিং করা দেয়ালের লেখাগুলো পড়ছিল। চড়ুইয়ের কথা শুনে ওর দিকে ফিরে কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “চলে আসবে কিউটি পাই। এখনো তো ক্লাসের অনেক সময় বাকি! ধৈর্য ধরে একটু বসো।”
চড়ুই ঠোঁট উল্টে বসে রইল। মৌটুসীর হাতে অনেক কাজ, কেকের ডেলিভারিগুলো পৌঁছে দিয়ে শোরুমে সময়মতো হাজিরা দিতে হবে। সে চড়ুইয়ের ব্যাগটা ঠিকঠাক গুছিয়ে দিয়ে ওঠার উপক্রম করল।
“চড়ুই পাখি, তুমি বসো মাম্মা? আমি এখন আসছি, নাহলে আমার দেরি হয়ে যাবে। তুমি একটু অপেক্ষা করো, বীর চলে আসবে। তখন আর বোর লাগবে না।”
”আচ্ছা মাম্মা তুমি চলে যাও। আমি বসে থাকব।”
মৌটুসী যাওয়ার সময় আবার একটু সতর্ক করে দিল, “এখানেই বসে থাকবে কিন্তু। ক্লাস থেকে বাইরে বেরোবে না। খাবার আর পানি শেষ করবে।”
চড়ুই চটপটে ভঙ্গিতে বলল, “আচ্ছা। বীর বন্ধু এলে একসাথে বের হবো।”
”আচ্ছা। কিন্তু নিচে কোথাও যাবে না। আর ছুটি হলে আমি নিতে আসব। আমার আসতে দেরি হলেও গেটের বাইরে যাবে না।”
মৌটুসী চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ক্লাসরুমে বেশ ভিড় জমতে শুরু করল। চড়ুই বই বের করে তাতে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় একটা মা তার মেয়ের হাত ধরে চড়ুইয়ের বেঞ্চটার সামনে এসে দাঁড়াল। চড়ুই ফট করে মাথা তুলে তাকাল। মেয়েটা ব্যাগ হাতে চড়ুইয়ের পাশের জায়গায় বসতে যাওয়ার আগেই চড়ুই সোজা হয়ে বসে খুব সুন্দর করে মেয়েটাকে বলল, “ফ্রেন্ড, তুমি এখানে বসো না। এখানে আমার একটা বন্ধু বসবে।”
চড়ুইয়ের এই স্পষ্ট আপত্তিতে মেয়েটির মা তেমন গুরুত্ব দিলেন না। তিনি না শোনার ভান করেই মেয়েটির পিঠে হাত রেখে বসতে ইশারা করলেন। বাচ্চা মেয়েটাও বসে পড়ল।
চড়ুইয়ের ভ্রু কুঁচকে গেল। মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। সে তো বীরের জন্য এখানে জায়গা রেখেছিল। বীরটাও এখনো আসছে না! চড়ুই মন খারাপ করে মাথা ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল। দুই নম্বর সারিটাও এরই মধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। চড়ুই চুপচাপ পানির বোতলটা গলায় ঝুলিয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে উঠে পেছনের দিকে চলে গেল। তারপর তিন নম্বর সারির ডান দিকের কলামের ফাঁকা বেঞ্চটাতে নিঃশব্দে বসে পড়ল। জানালার কাছে বসে গালে হাত দিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে চড়ুই। এরই মধ্যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করল বীর সাফওয়ান ও বোরাক। বীরকে দেখে চড়ুইয়ের গালের ওপর থেকে হাতটা আপনা-আপনিই সরে গেল। সোজা হয়ে বসল সে। কিছুক্ষণ আগেই অভিমানে পাউট করে রাখা ঠোঁট দুটো মুহূর্তের মধ্যে খুশিতে দুই দিকে প্রসারিত হয়ে এক টুকরো মিষ্টি হাসিতে রূপ নিল। সিট থেকে দাঁড়িয়ে পড়ল চড়ুই, বীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ছোট হাতটা উঁচিয়ে নাড়াতে নাড়াতে প্রাণোচ্ছল গলায় ডেকে উঠল,
“বীর বন্ধু! এখানে এসো!”
চড়ুইয়ের ডাক অনুসরণ করে ওদিকে তাকাল বীর। চড়ুইকে দেখে তার ঈষৎ বাদামী চোখ দুটোও খুশিতে চকচক করে উঠল। বোরাকের ধরে থাকা হাতটা আরও শক্ত করে ধরল বীর। চড়ুইয়ের দিকে আঙুল তাক করে বলে উঠল,
“পাপা, ওই যে চুলুই পাখি।”
বোরাক সেদিকেই এগিয়ে গেল। ওরা কাছাকাছি আসতেই চড়ুই বলল,
“বীর তুমি এত দেরি করলে কেন? আমি তোমার জন্য জায়গা রেখেছিলাম। পরে ওখানে আরেক ফ্রেন্ড বসে গিয়েছে।”
”দেলি কলি নি তো!” চড়ুইয়ের পাশে বসে পড়ল বীর। সাফওয়ান টেবিলের ওপর বীরের ব্যাগটা রাখল। চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,
“বীরের চুলুই পাখি কেমন আছে?”
”আমি ভালো আছি সাফওয়ান চাচ্চু। তুমি কেমন আছো?”
”চাচ্চুও ভালো আছি মামনি।”
বীর এবার উৎসাহ নিয়ে বোরাকের হাত ধরে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
“চুলুই পাখি, দেখো আমাল পাপা!”
বোরাক চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসল। মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বলল,
“স্পেরো? মাশাআল্লাহ! ভীষণ মিষ্টি একটা পাখি, মা তুমি!”
এত কিছুর মাঝেও চড়ুইয়ের মুখে সবসময়ের মতো সেই পরিচিত উজ্জ্বল হাসিটা ফুটল না। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বোরাকের দিকে, যেন ওই মানুষটার মাঝে অনেক কিছু পরখ করে নিচ্ছে সে। বীরের সাথে টুকটাক বিষয়ে দুই-একটা কথা বলে এবার বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো বোরাক।
বিদায় নেওয়ার আগে নিচু হয়ে বীরের কপালে আলতো করে একটা চুমু একে সরে আসার সময় বোরাকের নজর গেল চড়ুইয়ের দিকে। বাচ্চা মেয়েটা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ছোট ছোট মায়াবী চোখ দুটিতে কী যেন এক নিদারুণ তৃষ্ণা! কত না বলা কথা, আবদার! কেন যেন ওই সরল দৃষ্টি বোরাকের হৃদয়ের কোনো এক সংবেদনশীল কোণকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল।
মৌটুসী পর্ব ৬
বোরাক স্থির থাকতে পারল না। মায়ার আবেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওর ডান হাতটা আলতো করে চড়ুইয়ের নরম গালে স্পর্শ করাল। চড়ুইয়ের চোখের অফুরন্ত মায়ার দিকে তাকিয়ে ফের নিচু হলো বোরাক, বীরের কপালে যেভাবে চুমু খেয়েছিল, ঠিক সেভাবেই চড়ুইয়ের কপালেও পরম মমতায় একটা চুমু একে দিল এই বাবা।
