ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৭
রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি
কলেজের ছুটি হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। দুপুরের কোলাহল ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিয়ে বিকেল নেমেছে ক্যাম্পাসজুড়ে। গেটের সামনে যে ভিড়টা আধঘণ্টা আগেও ছিল, এখন তার রেশটুকু মাত্র বাকি। দু-একজন ছাত্রছাত্রী ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে গল্প করছে, কেউ রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে, কেউ আবার ফোনে ব্যস্ত।
আর মুগ্ধা দাঁড়িয়ে আছে কলেজ গেটের ঠিক পাশে। মুখ মেঘকালো ভার। হাতে ব্যাগ।
খোলা চুলগুলো বারবার বাতাসে উড়ে এসে গালে লেগে যাচ্ছে।
আজ আকাশটাও কেমন অপরুপ সুন্দর। নীলের গায়ে সাদা মেঘের একটুকরো আঁচড়ও নেই। সূর্যটা যেন আকাশের এক কোণে বসে অলস ভঙ্গিতে পৃথিবীটাকে আগুনের রঙে রাঙিয়ে তুলছে।
মুগ্ধা বিরক্ত। ভীষণ বিরক্ত।ইশতিয়াক আজ আসেনি। না আসাটা বড় কথা না। বড় কথা হলো, ছেলেটা একটা ফোনও দেয়নি। ভুলেই গেলো বোধ হয়!
মুগ্ধা রাস্তার দিকে তাকাল। আবার ঘড়ি দেখল। আধাঘণ্টা ধরে এই করছে সে। গাড়ির পাত্তা নেই। সব গাড়ি গেল কি?
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
”গাড়ি কি সব মরেছে, নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্প তুলে নিয়ে গেছে? ।”
নিজের মনেই বিড়বিড় করল সে। ঠিক তখনই দূর থেকে একটা বাইকের শব্দ ভেসে এলো।
দূরে কালো একটা বাইক এগিয়ে আসছে। রোদের আলো গায়ে মেখে চকচক করছে। চালকের মাথায় কালো হেলমেট। কালো শার্ট। হাতা ফোল্ড করা। সাদা জিন্স।
দূর থেকে দেখতে তাকে মনে হচ্ছে যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য থেকে বেরিয়ে আসা চরিত্র। বাইকটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। মুগ্ধা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
কে না কে আসছে তার ঠিক নেই? পৃথিবীতে কি একিই রকম গাড়ি নেই আর?
কিন্তু বাইকটা গেটের সামনে এসে গতি কমিয়ে দিল। তারপর একেবারে মুগ্ধার সামনে এসে থামল।
মুগ্ধা ভ্রু কুঁচকাল। লোকটা কিছুক্ষণ স্থির বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হেলমেট খুলল। মুহূর্তেই মুগ্ধার চোখ বড় হয়ে গেল।
ইখতিয়ার?
বিকেলের সোনালি আলো এসে পড়েছে তার মুখে। কপালের ওপর কয়েকগাছি চুল এলোমেলো হয়ে আছে। চোখদুটো আগের মতোই গম্ভীর।
মুগ্ধার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করল না। বরং মুখ ফিরিয়ে আবার রাস্তার দিকে তাকাল। যেন মানুষটাকে দেখেইনি।
ইখতিয়ার বাইক বন্ধ করল না। শুধু শান্ত গলায় বলল,
”উঠো।”
“আমি যাইতে পারব।”
মুগ্ধা তড়িৎ মৃদু আওয়াজে জবাব দিল । ইখতিয়ার হাসল। বলল,
“জানি।”
“তাহলে?”
”তাইলে উঠো।”
মুগ্ধা ঠোঁট বাঁকাল।
“উঠব না।”
ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
বাতাস এসে দুজনের মাঝখানে জমে থাকা অভিমানগুলোকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল যেন।
সে আবার বলল,
“রোদে দাঁড়াইয়া থাকবা?”
”থাকব।”
“তাও উঠবা না?”
“না।”
“ওকে।”
সুর টেনে বলল ইখতিয়ার।
মুগ্ধা মনে মনে ভাবল, মানুষটা এবার চলে যাবে বুঝি। কিন্তু না। ইখতিয়ার ধীরে ধীরে বাইক থেকে নামল। লম্বা শরীরটা মুগ্ধার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার ছায়া এসে পড়ল মুগ্ধার ওপর। মুগ্ধা অনিচ্ছায় তাকাল। ইখতিয়ারের মুখে কোনো রাগ নেই।
কিন্তু চোয়াল শক্ত। চোখদুটো অস্বাভাবিক স্থির।
সে নিচু স্বরে বলল,
”মুগ্ধা।”
মুগ্ধার বুক কেঁপে উঠল। এই স্বরটা সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে। লোকটা চোখে চোখ রাখল মুগ্ধার ।
“উঠো।”
“না।”
”উঠো।”
“বললাম তো না।”
ইখতিয়ার ভ্রু তুলল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
“আর একবার বলতেছি।”
মুগ্ধা মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। ইখতিয়ার এবার সামান্য ঝুঁকে এলো।
“আমি কি তোমারে এখানে কোলে কইরা উঠাব? ব্যাপারটা কিন্তু মন্দ হয়না”
মুগ্ধার চোখ কপালে উঠে গেল। ইখতিয়ার আর তার মধ্যে পাঁচ সেন্টিমিটার ও ব্যবধান নেই যেন। লোকজন কীভাবে যেন তাকাচ্ছে। মুগ্ধার অসস্থি বোধ বাড়ল।
“ইখতিয়ার!”
“হ্যাঁ।”
“মানুষজন দেখতেছে। দূরে সরে দাঁড়ান”
“তাহলে উঠো।”
“আপনি—”
“পাঁচ সেকেন্ড।”
মুগ্ধা বুঝে গেল। মানুষটা মজা করছে না। মজা করার মানুষ ইখতিয়ার না। একদমই না।
আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, ইখতিয়ার যা বলে সেটা করার ক্ষমতাও রাখে।
মুহূর্তের মধ্যে তার সব সাহস উধাও হয়ে গেল।
সে দ্রুত গিয়ে বাইকের পাশে দাঁড়াল।
ইখতিয়ারের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। বিজয়ের হাসি। মুগ্ধা সেটা দেখে আরও রেগে গেল।
মুখটা এমন করে ফুলিয়ে রাখল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ সে-ই।
ইখতিয়ার হেলমেট পরে নিল। গাড়িতে বসল। মুগ্ধা ও চুপচাপ বসে পড়ল।
ইখতিয়ার আয়নাটা ঠিক করল। আয়না ঠিক হতেই সেখানে ভেসে উঠল মুগ্ধার মুখ। রাগে টকটকে।
অভিমানে ভরা। আর সেই দৃশ্য দেখে ইখতিয়ারের হাসি আরও একটু চওড়া হলো।
সি হাসি দেখে মুগ্ধার জ্বলন ব্যাড়ল বৈ কমল না।তখনই ইখতিয়ার পেছনে একটা হেলমেট বাড়িয়ে দিল।
”পড়ো।”
”না।”
”পড়ো।”
”পড়ব না।”
মুগ্ধা মুখ ঘোরালো। ইখতিয়ার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর আর কি! কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হাত বাড়িয়ে হেলমেটটা মুগ্ধার মাথায় পরিয়ে দিল ইখতিয়ার। মুগ্ধা হতভম্ব। চোখ বড়বড় করে তাকাল ইখতিয়ারের দিকে ।
“এইটা কি করলেন!”
“চুপ।”
“আমি খুলে ফেলব।”
”খুলে দেখো।”
কথাটার মধ্যে এমন এক শান্ত হুমকি ছিল যে মুগ্ধা সত্যিই আর খুলল না। শুধু মুখ বাঁকিয়ে বসে রইল।
বিকেলের আলোয় তাকে তখন রাগী পাখির ছানার মতো লাগছিল।যে উড়ে যেতে চায়, অথচ বাসা ছেড়ে কোথাও যেতে পারে না।
ইখতিয়ার আর কিছু বলল না।শুধু বাইক স্টার্ট দিল। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন গর্জে উঠল। মুগ্ধা অজান্তেই সিট শক্ত করে ধরল। পরের মুহূর্তে বাইকটা সামনে ছুটে গেল। বাতাস তাদের পাশ কাটিয়ে পেছনে চলে যেতে লাগল। ইখতিয়ার আয়নায় একবার তাকাল। বুকের ভেতর কোথাও একটা নরম অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। তার কবুল পড়া স্ত্রী। তার এ জীবনের জীবনসঙ্গী। তার সমস্ত অস্থিরতার কারণ।
আবার সমস্ত শান্তিরও।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা।
আকাশের পশ্চিম দিকটা কমলা আর সোনালি রঙে রাঙা হয়ে আছে। যেন কেউ বিশাল ক্যানভাসের উপর গলিত সোনা ঢেলে দিয়েছে। দূরে কয়েকটা পাখি সারিবদ্ধ হয়ে নীড়ে ফিরছে। বাতাসে দিনের ক্লান্তি মিশে আছে যেমন, আবার সন্ধ্যার প্রশান্তির আভাসও রয়েছে ঠিক।
বাড়ির দ্বিতীয় তলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ইশতিয়াক।পরণে ধূসর টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার।এক হাতে রেলিং ধরা।
অন্য হাতে ফোন। ফোনটা কানের সঙ্গে লাগানো।
আর ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
কিন্তু আজকের হাসির আড়ালে সামান্য উদ্বেগও আছে।
কারণ ওপাশে আছে বিশেষ কেউ। আর সম্ভাব্য রেগে আছে। ভীষণ রেগে আছে।
ওপাশে কিছু একটা বলল সে। সঙ্গে সঙ্গে ইশতিয়াক কপালে হাত ঠেকাল।
“আল্লাহ! আবার শুরু করলা?”
স্নিগ্ধার গলা ভেসে এলো।
“আপনি ভুল নাম্বারে ফোন দিছেন।”
ইশতিয়াক হেসে ফেলল।
“ও আচ্ছা। তাইলে স্নিগ্ধা কোথায়?”
”চিনি না।”
“চিনো না?”
“না।”
“তাইলে যে আমারে তিন দিন ধইরা ইগনোর করতেছে, সে কে?”
“জানি না।”
ইশতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামনের আকাশের দিকে তাকাল।
মেয়েদের অভিমান কখনো কখনো বর্ষার মেঘের মতো। কোথা থেকে আসে, কখন জমে ওঠে, আর কখন বজ্রপাত নামায়—কেউ বলতে পারে না।
“স্নিগ্ধা।”
“জ্বি?”
”রাগ করছো?”
“না।”
“মিথ্যা কথা।”
“আমি মিথ্যা বলি না।”
“তাইলে গলাটা এমন ঠান্ডা কেন?”
“আমার গলা এমনই।”
ইশতিয়াক মাথা নাড়ল। এই মেয়েটাকে সে খুব ভালো করে চেনে। যখন সে সত্যি রাগ করে, তখন চিৎকার করে না। বরং এমনভাবে কথা বলে যেন পৃথিবীতে ইশতিয়াক নামে কেউ কখনো ছিলই না। ইশতিয়াক নামের কাউকে চিনেই না। সেটাই আরও ভয়ের। ইশতিয়াক রেলিংয়ে হেলান দিল। তারপর নরম স্বরে বলল,
“শোনো, সেদিনের ব্যাপারটা নিয়ে এখনও রাগ করে আছো? সরি”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর—
“কোন ব্যাপার?”
”যেইটা নিয়া তিন দিন ধইরা আমারে নাকানিচোবানি খাওয়ায়তেছো ।”
“আমি কিছু করি নাই।”
“করো নাই?”
“না।”
“তাইলে কল ধরো না কেন?”
“ব্যস্ত ছিলাম।”
“চব্বিশ ঘণ্টাই?”
“হুম।”
ইশতিয়াক হেসে মাথা ঝাঁকাল। এই মেয়েটার জেদ মাঝে মাঝে পাহাড়কেও হার মানায়। মেয়েটার জেদ ধরলে যেন পাষাণস্তুপ কঠোর হয়ে যায়। গলেই না।
“আচ্ছা ঠিক আছে। সরি বলছি তো, আমার ভুল হইছে।”
“আপনার?”
“হ।”
“ও।”
“এইটা কি ধরনের উত্তর?”
“স্বাভাবিক উত্তর।”
ইশতিয়াক এবার সত্যিই হাসল। কি সুন্দর সে হাসি!তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওই মেয়েগুলার সাথে আমি এমনিই কথা বলছিলাম তো।”
“আমি কি কিছু বলছি?”
“তুমিই তো সব বলতেছো।”
“কোথায়?”
”তোমার রাগে।”
স্নিগ্ধা চুপ হয়ে গেল । ইশতিয়াকের মুখের হাসিটা নরম হয়ে এলো। গলাটাও।
“শোনো, আমি ফ্লার্ট করি নাই।”
“ও।”
“সত্যি।”
“হুম।”
“তুমি বিশ্বাস করো।”
“করলাম।”
কথাগুলো এমনভাবে বলল স্নিগ্ধা, যেন একটাও বিশ্বাস করেনি। ইশতিয়াক মাথা ঠুকে মরতে ইচ্ছে করল।
“আচ্ছা, তুমি কইলা না আমি যদি অন্য কারও সাথে কথা বলি, তোমার খারাপ লাগে?”
ওপাশে একটু নীরবতা। তারপর খুব আস্তে জবাব এলো,
”লাগে।”
এক মুহূর্তে ইশতিয়াকের হাসি থেমে গেল।
বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।
যেন দীর্ঘ খরার পর মাটিতে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে।
সে ধীরে বলল,
“তাইলে একটু বুঝো।”
“কি?”
”তুমি রাগ করলে আমারও খারাপ লাগে।”
স্নিগ্ধা এবারও কিছু বলল না। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। বাতাস এসে ইশতিয়াকের চুল এলোমেলো করে দিল। দূরে মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের সুর ভেসে উঠছে।
একটা অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো চারপাশে।
ইশতিয়াক এবার বাচ্চাদের মতো গলায় বলল,
“স্নিগ্ধা।”
“কি?”
“রাগ কমছে?”
ফোন কানে চেপে ধরল স্নিগ্ধা।
“না।”
“একটুও না?”
“না।”
“আধা ইঞ্চি?”
“না।”
“এক মিলিমিটার?”
স্নিগ্ধা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ওপাশ থেকে খুব ক্ষীণ একটা হাসির শব্দ ভেসে এলো।
ইশতিয়াকের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল
ইশতিয়াক ঠোঁট কামড়ে হাসল।
তারপর শিশুর মতো সরল গলায় বলল,
“আচ্ছা, আর করব না।”
“কি?”
”তোমারে রাগানোর মতো কিছু।”
“দেখা যাবে।”
“সত্যি।”
স্নিগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
”নাটক।”
কিন্তু এবার তার গলায় আর আগের সেই বরফশীতল দূরত্ব নেই। বরং আছে চাপা হাসি।
ইশতিয়াক আকাশের দিকে তাকাল। সূর্যের শেষ আলো তখন মিলিয়ে যাচ্ছে। তার মুখে ধীরে ধীরে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। যেমন বসন্তের রোদে শীতের কুয়াশা গলে যায়।
আর ওপাশে থাকা অভিমানী মেয়েটার কণ্ঠ শুনতে শুনতে ইশতিয়াকের মনে হলো—
মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলো জিতে ফেলতে পারে, কিন্তু প্রিয় মানুষের অভিমান ভাঙাতে পারলে যে তৃপ্তি পাওয়া যায়, তার সঙ্গে কোনো জয়েরই তুলনা হয় না।
সন্ধ্যা নেমেছে কিছুক্ষণ আগেই।
মাগরিবের আযানের ধ্বনি চারদিকের ব্যস্ততার উপর নরম একটা পর্দা টেনে দিয়েছে। আকাশের পশ্চিম প্রান্তে রয়ে গেছে শেষ আলোয়ের রক্তিম আভা, যেন সারাদিনের ক্লান্ত সূর্য বিদায় নেওয়ার আগে আকাশের কপালে লাল সিঁদুরের দাগ এঁকে দিয়েছে। শহরের রাস্তায় তখন গাড়ির হেডলাইটগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। দূর থেকে দেখতে লাগছে জোনাকির দীর্ঘ মিছিল। ইখতিয়ার গাড়ি পার্ক করে দরজা খুলে নামল। তারপর কোনো কথা না বলে মুগ্ধার দিকে তাকাল।
মুগ্ধা একবার শুধু চোখ তুলে দেখল।
তারপর মুখ ফিরিয়ে নিল।
সারাদিনে মানুষটার সঙ্গে যতটুকু কথা হয়েছে, তা প্রয়োজনেরও কম। অথচ ইখতিয়ারের মুখে আজকাল এমন এক অদ্ভুত হাসি লেগে থাকে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ জয় করে এসেছে।
মুগ্ধা সেই হাসি আরও বেশি অপছন্দ করছে।
অথবা হয়তো… ঠিক অপছন্দও করছে না।
সেটা নিজেকেও স্বীকার করতে চাইছে না।
রেস্টুরেন্টের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগল। মুহূর্তেই বাইরের গরমটা মিলিয়ে গেল। ভেতরটা সাজানো হয়েছে খুব নান্দনিকভাবে। ছাদের সঙ্গে ঝুলছে উষ্ণ হলুদ আলোয় ভরা ঝাড়বাতি। আলোগুলো এতটাই কোমল যে চারপাশকে স্বপ্নের মতো লাগছে।
এক কোণায় ছোট্ট জলপ্রপাতের মতো ফোয়ারা। টুপটাপ পানির শব্দ উঠছে। দেয়ালজুড়ে কাঠের কারুকাজ। কিছু কিছু টেবিলের পাশে বড় টবভর্তি মানিপ্ল্যান্ট আর স্নেক প্ল্যান্ট রাখা।
ইখতিয়ার মাথা নেড়ে ভেতরের একটা নিরিবিলি টেবিল দেখিয়ে দিল। জানালার পাশে।
সেখানে বসলে বাইরের শহরটাও দেখা যায়।
দুজন গিয়ে মুখোমুখি বসল।
মুগ্ধা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
ইখতিয়ার কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর মেন্যু হাতে তুলে নিল।
“কি খাইবা?”
মুগ্ধা উত্তর দিল না।
“চাইনিজ?”
“না।”
“থাই?”
“না।”
“পাস্তা?”
“না।”
ইখতিয়ার ভ্রু তুলল। তবে ধৈর্য ধরলে।
“স্টেক?”
“না।”
”বিরিয়ানি?”
মুগ্ধা এবার তাকাল। মুখে কোনো ভাব নেই।
“বিচ্ছিরি।”
ইখতিয়ার থমকাল।
“বিরিয়ানি বিচ্ছিরি?”
“হুম।”
“তুমি তো বিরিয়ানি ভালোবাসো।”
“এখন নাম শুনে বমি পাচ্ছে।”
ইখতিয়ার ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল।
ইখতিয়ার আর পারল না। হেসে ফেলল। গভীর, উষ্ণ হাসি। মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে কটমট করে তাকাল।
ওয়েটার এসে দাঁড়াতেই ইখতিয়ার নিজের মতো কয়েকটা খাবারের অর্ডার দিয়ে দিল।মুগ্ধা বাধা দিল না। দিলেও লাভ নেই জানে।
ওয়েটার চলে গেলে আবার নীরবতা।
ইখতিয়ার কনুই টেবিলে রেখে সামনে ঝুঁকল।
চোখ দুটো স্থির মুগ্ধার মুখে।
“একটা কথা বলি?”
মুগ্ধা বিরক্ত মুখে তাকাল।
“আপনিই তো শুধু বলছেন।”
“এইটা আলাদা।”
”শুনতেছি।”
ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“আজকাল তোমারে দেখলে আমার মনে হয়…”
সে একটু থামল। তারপর বলল,
“তুমি আমার বউ না।”
মুগ্ধার মুখ শক্ত হয়ে গেল। মুগ্ধা কটমট করে তাকালো। যেন পারলে মেরে বসে। ইখতিয়ার হাসল। একদম ছেলেমানুষের মতো।
ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৬
“মনে হয় তুমি আমার অবাধ্য প্রেমিকা।”
মুগ্ধার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। ইখতিয়ার আবার বলল,
”মনে হয় তুমি আমার অবাধ্য প্রেমিকা,আর আমি সেই হতভাগা প্রেমিক, যে নিজে বি’ষ পান করে প্রেমিকাকে ব্যথা দিয়েছি, ফলস্বরুপ দিনের পর দিন তোমার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করতে করতে পাগল হয়ে যাইতেছি।”
