যাত্রাপথ পর্ব ৪৩
মাশফিত্রা মিমুই
বাড়ি ফিরেই নওশাদ ঘরে গিয়ে খিল আঁটলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে তখন। ফরিদা বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে নাজিরকে জিজ্ঞেস করলেন,“দুই ভাইয়ে মিল্যা কই গেছিলি?”
উত্তর না দিয়ে মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল নাজির। কি স্নিগ্ধ সেই মুখখানা! চোখ জোড়ায় খেলা করছে কৌতূহল। অথচ এই নারীই তার মায়ের ঘরে পরপুরুষ ঢুকিয়ে নষ্ট করেছিল মায়ের সতীত্ব, এই নারীও তার মায়ের খুনি, পিতার অচলাবস্থার জন্য দায়ী। নাজিরের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সে জানতো, এই মহিলা বাইরে ভালো মানুষি দেখালেও পুরোপুরি ভালো নয়। কিছুটা স্বার্থপর বটে। কিন্তু তাই বলে?চুপচাপ ঘর থেকে পোশাক এনে গোসল সেরে আসে নাজির। তার প্রতিক্রিয়াহীন আচরণে ফরিদা অবাক হন। বেশ কিছুক্ষণ সেখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে চলে যান ঘরে।
গোসল সেরে ঘরে ফিরতেই তাকে দেখে মুখ ফুলিয়ে মিছরি বলে উঠলো,“আজকেও আপনার ফিরতে দেরি হয়েছে।”
স্ত্রীর সঙ্গে রসিকতা করার মতো অবস্থায় ছেলেটা নেই। তাই বেছে নিলো নীরবতা। তাকে আপাদমস্তক দেখে মিছরি পুনরায় জিজ্ঞেস করল,“মন খারাপ?”
এবারেও উত্তর না পেয়ে হতাশ হলো সে। নারাজ হয়ে বললো,“যান, কথা বলতে হবে না। খেতে আসুন। আপনার কথামতো আজ কচু শাক আর পাঙ্গাশ মাছ ভুনা করেছি। তবে রান্নায় সাহায্য করেছিল ছোটো চাচী। খেয়ে বলবেন, কেমন হয়েছে।”
নাজির তার হাত টেনে ধরে পাশে বসালো। কিছুক্ষণ ওই অভিমানী মুখখানায় তাকিয়ে থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,“একটু চুপ থাকো, বউ।”
স্বামীর কথা মেনে নিলো মিছরি। লোকটার যখনি মন খারাপ থাকে তখনি চুপ থাকে, তাকে জড়িয়ে ধরে। মিছরি তা জানে। তাই পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,“আমার স্বামীর সব মন খারাপ ভালো হয়ে যাক, সব বিপদ দূর হয়ে যাক, আল্লাহ হেফাজত করুন।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দুঃখের মাঝেও নাজিরের অধরে মৃদু হাসির দেখা মিললো। তার ছোট্ট বউটা তাকে মানসিক প্রশান্তি দিচ্ছে। নাজির তো এমন কাউকেই জীবনে চেয়েছিল।
বেশ কিছুক্ষণ পর তাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেলো নাজির। মিছরি উঠে দাঁড়ালো। যেতে যেতে বললো, “খাবার বাড়ছি, আসুন। না খেলে শরীরে শক্তি হবে কীভাবে? কাজ করবেন কীভাবে?”
নাজির সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললো না, শুয়ে পড়ল বিছানায়। চোখ বন্ধ করে বললো,“ভাল্লাগতাছে না, পরে খামু।”
“ভাইয়া খাবেন না?”
“ক্ষুধা লাগলে খাইবো, ডাইকো না।”
মিছরি আর কথা বাড়ালো না। দরজা চাপিয়ে চলে গেলো ঘরের বাইরে। নওশাদকে বলার পরেও এই ভিটেতে সে আর আসেনি। তাই বাবার ঘরটাকে এখন খাবার ঘর হিসেবেই ব্যবহার করছে তারা।
আমিরুল শাহ চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে হুক্কা টানছেন। আজকাল বাড়ি থেকে দিনেরবেলা তেমন একটা বের হচ্ছেন না। নিজের ভাগের সমস্ত কাজ ছেলেদের উপর চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে আছেন। সন্ধ্যা হলেই শুধু বাড়ি থেকে বের হন, তদারকি করেন সবকিছুর। পানের বাটা নিয়ে ফরিদা এসে বসলেন কিছুটা দূরে। মুখ বিকৃত করে বললেন,“এইসব খাইয়া কী স্বাদ পান? হুদাই রোগ শোক ডাইকা আনা।”
“তুই তো খাস না, তারপরেও রাইত বিরাইতে খুক খুক কইরা কাশোস ক্যান?”
“ঠান্ডা লাগছে।”
“তোর ভাই কই? দুইদিন ধইরা দেহি না। হুট কইরা গায়েব হইয়া যায় ক্যা? সোহেলরেও তো দেহি না।”
“হেইদিন আঁতকার উপরে গিয়া নাজির তারে যেমনে চড় মারলো! কেমনে আইবো? গায়ে হাত তোলা ওর স্বভাব হইয়া দাঁড়াইছে।”
“ঠিকই করছে। মাইনষের বউয়ের মিহি এত নজর যায় ক্যান? একেবারে বাপের মতন হইছে। তগো গোষ্ঠীর সবই কী এমন নাকি?”
“মুখ সামলান, বংশ তুইল্যা কথা কইবেন না।”
“একশবার কমু। কী করবি? ঠিকমতো তো খাইতে পাইতি না। আমার বৌদলতে সুখ দেখছোস।“
“আমি আর আমার ভাই না থাকলে আমনের অবস্থাও এমনই হইতো।”
“অন্তত সুখে শান্তিতে থাকতাম। তগো লাইগা আইজ আমার এই অবস্থা। এহন আমার পোলা দুইডার উপরে খারাপ ছায়া না পড়লেই হইলো। ওরা সারাজীবন মিলমিশ থাকুক।”
“কয়দিন ধইরা নাজিরের জানি কী হইছে। ঠিকমতো বাড়িত থাহে না, কারো লগে কথা কয় না, বাপ মরার পর সংসার আলাদা করছে। আইজ আবার সকাল সকাল ভাইরে লইয়া জানি কই গেছিলো। কিছুক্ষণ আগে ফিরছে।”
“জিগাও নাই কিছু?”
“জিগাইছিলাম কিন্তু উত্তর দেয় নাই। কেমন কইরা জানি চাইয়া থাইক্যা গেলো গা। নওশাদ তো আইয়াই দরজায় খিল দিছে।”
“ওর কথা বাদ দেও। বাপের মতোই দুর্বল, অচল মাল। সুবহান সবসময় আব্বার উপরে নির্ভরশীল আছিলো, আর ওয় নাজিরের উপরে। কয়দিন আগে তালাক হইছে। তার দুঃখও তো আছে।”
“আমার ডর নাজিররে লইয়া। দিনদিন যেই উন্নতি ওর হইতাছে, খামার যেমনে চলতাছে! বিয়ার পর তো আরো বদলাইয়া গেছে। আমার কথা হুনে না, ট্যাহা পয়সা লইয়াও কথা কয় না। মাস্টর বাড়ির বুইড়া কানপড়া দেয় না তো?”
“নাজিররে কানপড়া দেওয়া সহজ না। আর দিলেও কী করবো ওয়? আসল ঘটনা তো জানতে পারবো না। আকবর মিয়ায় নিজেই কী জানে? প্রমাণ আছে কিছুর?”
ফরিদা মাথা নাড়ালেন। তবুও মন থেকে ভয় সরে না। অসৎ, মিথ্যুক মানুষেরা কখনো নিশ্চিন্তে থাকতে পারে না। অতীতের কুকর্ম ফাঁসের ভয় সর্বদা তাদের তাড়া করে বেড়ায়।
নারিকেল পাতার মাদুর ছেড়ে এখন কাঁথা সেলাইয়ের কাজ ধরেছেন মর্জিনা। কদিন পর থেকে ঠান্ডা পড়বে। সবসময়কার মতো গ্ৰামে ঠান্ডা পড়ে একটু বেশি। তাই নিজের বেশ কয়েকটা পুরোনো শাড়ি একযোগে করে প্রথম ধাপের সেলাই শেষ করে এখন দ্বিতীয় ধাপে নকশা করছেন তিনি। মিছরি এসে পাশে দাঁড়ালো। একা একা তার ভালো লাগে না, ছটফট করে মন। উঁকি দিয়ে দেখে বললো,“আমার মা ও ভালো কাঁথা সেলাই করতে পারে।”
“আর তুমি? তুমি পারো না?”
“না, আমি নকশা করতে পারি।”
সুই, সুতা ভর্তি কাঠের বাক্সটা এগিয়ে দিয়ে বসার জায়গা করে দিলেন মর্জিনা। নিজের কাজ জারি রেখে বললেন,“দেখি, কত নকশা পারো।”
মিছরি পিঁড়ি টেনে বসলো। সুইয়ে সুতা ভরে শুরু করল কাজ। মর্জিনা আশপাশ লক্ষ্য করে গলার আওয়াজ নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“তোমার দেওর আর জামাই কই গেছিলো?”
“একটা কাজে।”
“কোন কামে?”
মিছরি জানে না। তবুও মিথ্যের আশ্রয় নিলো। জানে না বললে মহিলা মনে করতে পারে, তার গুরুত্ব স্বামীর কাছে নেহাৎ কম। বললো,“কী কাজ আবার? যা তিনি সবসময় করেন। সার, বিজ আর কিটনাশক আনতে গিয়েছিলেন। ভাইয়ার মন খারাপ তো তাই তাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
“ওহ।” মর্জিনা বিশ্বাস করে নিলেন কথাটা। বললেন, “তোমার জায়ের খবর কী? জানো কিছু?”
“না, কখনো জিজ্ঞেস করিনি।”
“নাজির কই? শরীর খারাপ নাকি? এমনিতে তো এক জায়গায় স্থির বইয়া থাকতে পারে না।”
“সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকায় একটু ক্লান্ত, তাই ঘুমায়।”
মর্জিনা প্রসঙ্গ বদলায়,“এই বাড়ির পুরুষ মানুষগো কহন কী হয় আল্লাহ জানে। আমার ঘরে দুইডা পাডা আছে, তাড়াতাড়ি বিয়া দিতে পারলে বাঁচি। এই মাসটা খালি যাউক, যেমনেই হোক ঘরে বউ তুলমু। একলা একলা আর কয়দিন? এহন নাতি নাতনি লইয়া ঘুইরা বেড়ানোর বয়স।”
“বিয়ে না ঠিক করেছেন?”
“তা তো করছিই। হেরপর থাইক্যাই তো শুরু হইছে পাডা আর পাডার বাপের ব্যস্ততা।”
ভুল করে হেসে ফেলল মিছরি। মর্জিনা মুখ বাঁকিয়ে বললেন,“এহন হাসিই আইবো। আমার জায়গায় যেইদিন আইবা হেইদিন বুঝবা। তাই কই, পোলাপাইন এহনি নিয়া ফেলাও। এইডাই মা হওয়ার সঠিক সময়। তোমার বয়স জানি কত?”
মিছরি লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলো। মিনমিন করে বললো,“পনেরো হয়েছে।”
“এই বয়সে আমার কোলে নাজমুল আছিলো।” থেমে বললেন,“নাজিরের লগে কথা কইবা। পোলাপাইন থাকলে সংসারে মাইয়া মাইনষের জোর থাকে বেশি, জামাই মান্য কইরা চলে। যদিও বড়জনে দিন রাইত দুই বেলাই ছ্যাচা খায়। তবে আমার জনের আবার এত সাহস নাই।”
“চাচীও মাইর খায়?”
“ক্যান, তুমি দেহো নাই?”
“না, শুধু ভাবির কান্নার আওয়াজ শুনেছি।”
“ওইডায়ও খায়। আমিও হুনি। বাপ, পুত দুইডাই এক রকমের জাউড়া, চরিত্রেও দোষ আছে। নেশা পানি খাইয়া আইয়া বউরে পিডায়। তোমার জনেও অমনই হইতো, শুধু আমি আছিলাম বইল্যা মানুষ হইছে।”
কৌতূহলী দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকালো মিছরি। মর্জিনা সেই দৃষ্টির অর্থ বুঝতে পেরে বললেন,“মা ছাড়া পোলা, বাপ অচল। বড়জন নিজের পোলাগোই তো ঠিকঠাক মানুষ করতে পারে নাই, দেওরের পোলা আর কী মানুষ করবো? অভিভাবক ছাড়া ছুডো ভাইডারে লইয়া মাঠ ঘাট চইষা বেড়াইতো, হাইনজায় বাড়ি ফিরতো। ধীরে ধীরে খারাপ সঙ্গের লগে চলাচল শুরু হইলো। সবাই ফালাইয়া দিতে পারলেও আমি পারি নাই, পোলা তো আমারও আছিলো। আমার গুলারে আমি ইচ্ছামতো বাইড়াইতাম। এহনো দেখবা ডরায়, যা কমু তাই হুনবো, মুখে মুখে কথা কওয়ার সাহস নাই। তাই ওগোও চেষ্টা করতাম। কিন্তু নওশাদ হুনলেও নাজির ঘাউড়া। হের লাইগা যে পিছে পিছে লাঠি নিয়া কত দৌড়াইছি! বাড়ি খাইয়া সঠিক পথে ফিরছে। এর লাইগাই তো আমার লগে খালি কাইজ্জা করে।”
শেষ কথা বলে হাসলেন মর্জিনা। কাঁথা সেলাইয়ের পাশাপাশি গল্প করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। বসা থেকে উঠে এলো মিছরি। উঠোন থেকে সব পোশাক ঘরে নিয়ে গুছিয়ে রেখে কলসি আর জগে পানি ভরে রাখলো। হারিকেন মুছে কেরোসিন তেল ভরে নামাজ পড়তে গেলো। মাগরিবের নামাজ পড়ে জাহিদ বাড়ি ফিরে আসে প্রতিদিন। কলপাড় থেকে পানি আনা, হাঁস মুরগি খোপে ঢোকানো তারই কাজ। না করলে আবার সমস্যা। মা মারবে, মুখের উপর কিছু বলতে গেলে খবর পৌঁছে যাবে বাবার কাছে।
নাজির ঘর থেকে আর বের হলো না। বের হলো না নওশাদও। মিছরি এসে স্বামীর গায়ে হাত রাখতেই চমকালো। সারাদেহ জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।একটি বাটিতে ঠান্ডা পানি নিয়ে কাপড় ভিজিয়ে জলপট্টি দিতে দিতে ডাকলো,“শুনছেন! হঠাৎ করে জ্বর এলো কীভাবে? আমি বলেছিলাম, খেয়ে নিন। অথচ আপনি আমার কোনো কথাই শুনেন না। এখন কী হবে? কী করবো আমি?”
ললাটে বিরক্তির ভাঁজ নিয়ে চোখ খুলে তাকালো নাজির। কপাল থেকে ভেজা কাপড় সরিয়ে আড়ষ্ট কণ্ঠে বললো,“কিচ্ছু করতে হইবো না, এমনি এমনি সাইরা যাইবো। এইগুলা নতুন না।”
“হ্যাঁ, বললেই সেরে যাবে। চুপচাপ উঠে বসুন। আমি এত তাড়াতাড়ি বিধবা হতে চাই না। খাইয়ে দিচ্ছি, খেয়ে নিন।”
“সামান্য জ্বর আইছে আর তুমি বিধবা পর্যন্ত ভাইবা ফেলছো, বেয়াদব মাইয়া!”
“হ্যাঁ, ভেবেছি। আমার বড়ো চাচীর ভাইয়েরও সামান্য জ্বরই এসেছিল। লোকটা আপনার মতোই ঘাড়ত্যাড়া। ওষুধ না খেয়ে সারারাত বিছানায় পড়েছিল। সকাল হতেই সব জারিজুরি শেষ।”
নাজিরের দৃষ্টি শীতল হলো। এমন জ্বর অতীতে তার অনেক হয়েছে। এভাবেই একা একটা ঘরে অসুস্থ হয়ে পড়ে থেকেছে রাতের পর রাত। কেউ কখনো সামান্য জলপট্টিও দিয়ে দেয়নি, ওষুধ খাওয়ার জন্য তাড়া দেয়নি, কিংবা খাইয়ে দেয়নি একমুঠো ভাত। কই তখন তো কিছু হয়নি নাজিরের। তাহলে? অবশ্য কার মৃত্যু কখন লেখা আছে তা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। তবুও নাজির উঠে বসার চেষ্টা করল। শক্তপোক্ত দেহ আজ ভীষণ দুর্বল। মিছরি তাকে বসতে সাহায্য করল। থালায় করে নিয়ে এলো খাবার।
নাজির বললো,“সাধারণ জ্বর আর ডেঙ্গু জ্বরের মধ্যে পার্থক্য আছে।”
“ওসব পার্থক্য জেনে আমার কাজ নেই। হা করুন। আমাকে বাচ্চা বলে এখন নিজেই বাচ্চা হয়ে যাচ্ছেন।”
“সুযোগ পাইয়া গিন্নীগিরি দেখাও?”
“হা।”
নাজির হা করল। জ্বরের মুখে তেমন স্বাদ পেলো না, সব তেতো লাগছে। চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞেস করল, “নওশাদ ঘর থাইক্যা বাহির হইছিলো? খাইছে কিছু?”
“না, বের হয়নি। আপনি নিষেধ করায় আমিও আর ডাকিনি।”
“ডাকার দরকার নাই। দেওর, ভাসুরগো থাইক্যা সবসময় দূরে থাকবা। মাথায় ঘোমটা ছাড়া ঘরের বাহিরে বাইর হইবা না। মানুষের মনে কী আছে কেউ জানে না। কহন কার নজর পইড়া যায়! সোহেলরে দেখলা না? ওরে আরেকদিন বাড়িত দেখলে লুলা বানাইয়া দিমু।”
“ওদের সবার নজরই খারাপ, সাথে চরিত্রও।”
“আর কার খারাপ? কেডায় চাইছে?”
“কেউ তাকায়নি।”
“তাইলে?”
“ছোটো চাচী বললেন, বড়ো চাচা আর তার বড়ো ছেলের নাকি চরিত্রে দোষ আছে, নেশা করে।”
“শুধু নেশা না, পরকীয়াও করে।”
মিছরি অবাক হলো,“সত্যি!”
“হ, হেইদিন হিন্দু পাড়ায় সেই মাইর খাইছিলো। পরে মাঝ রাইতে গিয়া চাচায় ছুডাইয়া আনছে। মায়ের গোষ্ঠীর স্বভাব পাইছে।”
“বড়ো ভাবি জানেন না?”
“জানি না। জানলেই বা কী করবো? দুই দুইডা সন্তান আছে।”
“তাই বলে সহ্য করবে?”
“দুনিয়া সম্পর্কে তোমার ধারণাই নাই। আমগো দেহা কয়ডা সংসারে এত সুখ শান্তি আছে? কয়জন মহিলা ভালা স্বামী পাইছে? সচ্ছলতা মানেই সুখ শান্তি না। বেশিরভাগ মহিলাই স্বামীর সংসারে অত্যাচারিত। শুধু সমাজের ডরে আর পেটের পোলাপাইনের লাইগা সব সহ্য কইরা সংসার করতাছে। ওই যে কলিমের মায়রে তার স্বামী ঠকাইছে। তবুও দোষ হইছে ওই মহিলার। নিজের বাপের বাড়ি যাইতে পারে না, থাহে আমগো গেরামে। পোলা লইয়া কাম কইরা খায়। এমন অনেক ঘটনা আছে।”
খাবার খাওয়াতে খাওয়াতে মিছরি অবাক হয়ে শুধু শুনলো। নাজির পানি খেলো। বালিশে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বললো,“আমি ছাড়া এই বাড়ির আর কাউরে বিশ্বাস কইরো না। কারো লগে ঝামেলায় জড়াইয়ো না। সব অমানুষ। স্বার্থের লাইগা ওরা সব করতে পারে।”
মিছরি কথাগুলোর অর্থদ্বার উদ্ধার করতে পারে না। তবুও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ায়। দাদী তাকে বলেছেন,‘সবসময় স্বামীর কথা হুইন্না চলবা।’ দাদী যা বলেন ভালোর জন্যই নিশ্চয়ই বলেন!
জ্বরের ওষুধ খেয়ে কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে থেকে ভাইয়ের ঘরের দিকে হাঁটা ধরে নাজির। কে জানে ছেলেটার কী অবস্থা? কিন্তু নওশাদের তেমন কিছুই হলো না। ছেলেটার চোখ জোড়াই যা ফুলে আছে। হয়তো কেঁদেছে!
ভোর হতেই নির্জন বাড়িটা মানুষের পদচারণা আর হাঁকডাকে সজাগ হয়ে উঠেছে। খাবার খেয়ে মুরগির দল চলে গিয়েছে ঘুরতে, গরুর পাল এখনো গপাগপ করে খাচ্ছে।
চুলায় বিশাল এক ভাতের হাঁড়ি চড়েছে। পারুল বসে পেঁয়াজ, মরিচ কাটছেন। আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা করবেন। পাশেই ভাতের পাতিলের ভেতরে আলু আর বেশ কতক ডিম দিয়ে দিলেন দিলারা। উঠোন ঝাড়ু দিয়ে জেসমিন এসে বললো,“গোয়ালায় দুধ ধুয়াইয়া দিয়া গেছে। এহনি জাল দিবেন, আম্মা?”
“হ, লইয়া আইয়ো। আরেক চুলায় বসাইয়া দেই।” চুলায় পাতা গুজতে গুজতে বললেন দিলারা।
জেসমিন দৌড়ালো। বড়ো বালতিতে গরুর দুধ। মাত্রই গোয়ালা তাদের জন্য কেজি তিনেক রেখে বাকিটুকু সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে। সুজনের হাত থেকে বালতিটা নিয়ে চলে এলো জেসমিন। সকালের নাশতায় আর রাতের খাবারের পর এই বাড়ির মানুষদের দুধ ছাড়া চলে না।
হাত-মুখ না ধুয়ে বাসী মুখে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে কলা খাচ্ছে পলি। কলপাড় থেকে ঘরে এসে স্ত্রীর কার্যকলাপ দেখে তালেবের মুখমন্ডল রাগে লাল হয়ে গেলো। উঁচু স্বরে বললো,“এইগুলা কেমন নোংরামি? মুখ ধুইছো তুমি?”
পলি ভয় পেলো না। তার ভাষ্যমতে, লোকটা আস্ত এক জল্লাদ রাক্ষস। রাক্ষস, জল্লাদের কাজই তো হুটহাট রেগে যাওয়া। হাতের কলাটা খেয়ে খোসা তার দিকে ছুঁড়ে মেরে বললো,“আমার কী দোষ? আমনের পোলাপাইনের হুট কইরা ক্ষুধা লাগছে। তাই না পাইরা খাইতাছি।”
তালেব দ্রুত সরে দাঁড়ালো,“আমার পোলাপাইন! কই থাইক্যা আইলো?”
পলি ইশারায় নিজের পেট দেখালো। তালেব হতভম্ব দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এগিয়ে এসে হাত থেকে বাকি কলাগুলো কেড়ে নিয়ে বললো, “এহন আমার পোলাপাইনের নামে দোষ দেও? তুমি জাত নোংরা। শুধু ভালাবাসি দেইখা কিছু কই না। যত দ্রুত সম্ভব এইসব বদঅভ্যাস বদলাও। না হইলে আবার আমার পোলাপাইনও এইসব স্বভাব পাইবো।”
“খাইছি দেইখা খোঁটা দেন? আর খামু না। আমার আব্বারে খবর দেন, যামুগা আমি।”
“সাত সকালে মেজাজ খারাপ করবা না। তোমারে কহন খাওয়ার খোঁটা দিছি? মুখ ধুইয়া পরিষ্কার হইয়া খাইতে কইছি।”
পলি তাকে বাহু দিয়ে ধাক্কা মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। নিমের ডাল দিয়ে দাঁত ঘষতে ঘষতে রান্নাঘরে এসে শাশুড়ির উদ্দেশ্যে বললো,“এই বাড়িত আর থাকমু না। দুইডা কলা খাইছি দেইখা আমনের পোলা আমারে নোংরা কইছে।”
সেদ্ধ আলুগুলোর খোসা ছাড়িয়ে দিয়েছে জেসমিন। পারুল একে একে মাখিয়ে এখন ভর্তা তৈরি করছেন। পুত্রবধূর কথায় মাথা তুলে তাকালেন। তালেবও বেরিয়ে এসেছে বাইরে। স্ত্রীর নালিশ শুনে বললো, “মিছা কথা কয়, মা। বাসী মুখে খাইতাছিল।”
পারুল গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“বাসী মুখে খাওয়া ভালা না। একটু কুলি কইরা নিতে পারতা। পোয়াতি মানুষ। বুইঝা হুইন্না না চললে হইবো?”
ধরা খেয়ে চোরের মতো মুখ লুকিয়ে কলপাড়ের দিকে হাঁটা ধরলো পলি। তালেব বিদ্রুপ হাসলো। সঙ্গে সঙ্গে পিছু ফিরে স্বামীকে জিভ দেখালো সে।
সকালের নাশতা সবাই একসঙ্গে করল। নাশতা শেষে সুজন, রুহুল, মাসুম বেরিয়ে গেলো কাজে। আকবর মিয়াকে কাশেম আলী আর তালেব মিলে ধরে ধরে বিছানায় নিয়ে বসালো। লোকটার পায়ে পানি উঠে ফুলে গিয়েছে। ঠিকঠাক আর চলাচল করতে পারেন না। হঠাৎ করে কী যে হয়ে গেলো! হাঁটুর উপরের উঁচু বালিশে হাত রেখে বৃদ্ধ বললেন,“শরীরডা ভালা না। কহন কী হইয়া যায়!”
কাশেম আলী গম্ভীর হয়ে বললেন,“এমন কথা মুখে আনবেন না, আব্বা। আল্লাহ আমনের হায়াত আরো বাড়াইয়া দিক।”
“এহনো বাপের ভরসায় চললে হইবো? কয়দিন পর দাদা, নানা হইবি। ভরা সংসার তগো। আমার পর তুই আর নজরুলই তো এই বাড়ির কর্তা। সব দায়িত্ব তগো দুই ভাইয়ের, সবসময় একলগে থাকবি। অন্যের কথায় কাইজ্জা লাগিস না। মাইনষে কারো ভালা সহ্য করতে পারে না। নজরুলরেও আমি কইয়া দিছি।”
“আমনে আমগো যেই শিক্ষা দিয়া বড়ো করছেন, আব্বা! বেঠিক পথে কহনো যাই নাই আর যামুও না।”
“তগো উপরে আমার ভরসা আছে। হুন তালেব, তোরাও ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব করিস না, কহনো লোভ করিস না। লোভ খারাপ জিনিস। সবসময় পরিশ্রম করবি। আল্লাহ পরিশ্রমীগো নিরাশ করেন না। আর সর্বশেষ কথা, বোইনরেও কহনো ত্যাগ করিস না। মিছরি তগো একমাত্র বোইন। তোরা ছাড়া ওর আর কেডা আছে? হের বিপদ আপদে সবসময় ঝাঁপাইয়া পড়বি। নাজির রগচটা হইলেও মানুষ ভালা। ওর লগে সম্পর্ক ঠিক কইরা নেইস। এই দুনিয়াত পোলাডার আপন বলতে মিছরি ছাড়া আর কেউ নাই। ঘরের মানুষই ওর শত্রু। ওর এই অবস্থার লাইগা আমিও কম দায়ী না। কিন্তু কহনো প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি নাই। তাই তো মিছরির লগে ওর বিয়া দিছিলাম।”
যাত্রাপথ পর্ব ৪২ (২)
তালেব মনোযোগ দিয়ে দাদার কথা শোনে। এত বছরে আজ প্রথম হয়তো দাদাজান তার সঙ্গে এভাবে কথা বলছেন। বিশ্বাস করে জানাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে গোপন রাখা সব কথা।
আজ দীর্ঘক্ষণ ছেলে, নাতির সঙ্গে কথা বললেন বৃদ্ধ। একপর্যায়ে দুর্বল কণ্ঠে বললেন,“অনেকদিন ওর লগে দেখা হয় না, কথা হয় না। একটু আইতে কইবি? কে জানে কী অবস্থায় আছে? বাপও তো নাই যে একটু মাথায় হাত রাইখা সান্ত্বনা দিবো। কইস আমার অসুখ। কহন কী হইয়া যায় ঠিক নাই। তাই আমি ওরে ডাকছি।”
অন্যান্য দিনের তুলনায় আকবর মিয়াকে আজ একটু বেশিই অস্থির লাগছে। অল্পতেই চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে, বেশি কথা বলছেন। স্ত্রীকে কাছ ছাড়া করছেন না। বয়সের ভারে শরীরটা দুর্বল হয়ে গেছে।
