রাগে অনুরাগে পর্ব ১৭
সুহাসিনি ফাতেহা
তিতলি হাতের ফাইল গুলো নিয়ে দৌড়ে পালাতে চাইলো। নিজে বাঁচতে পারলে বাপের নাম, ফাইল পরে রাখা যাবে। কিন্তু ভাগ্য তাকে সহায় করলো না। সহসা শাড়ির ভাঁজে পা পড়ে টালমাটাল তিতলি ফারাজের সামনেই পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত কিনা ভাল্লুকের সামনেই তাকে পড়তে হলো।
ভয়ে চোখ মুখ খিঁচে রেখেছে। এই বুঝি চড় থাপ্পড় সব তার মুখে পড়বে। মনে মনে বলে,
“কি আনরোমান্টিক!” সে পড়ে গেলো একটু ধরলোও না। এমন আনরোমান্টিক লোকের প্রেমে পড়া কি তার খুবই দরকার ছিলো। এখন তো মনে হচ্ছে লিপিস্টিক লাগিয়ে দিয়ে একদম ভালো করেছে। এবার এই শার্ট পড়ে বনভোজন করে এসে আসুক! সবাই দেখে হাসুক।
তৎক্ষণাৎ চোখ খিঁচে রেখে নিজে নিজে উঠার চেষ্টা করলো। উঠতে গিয়ে আবার পড়ে গিয়ে ব্যাথাতুর আওয়াজে নিজে নিজে বলল,
“ পা টা ভেঙে গেলো রে! আমার মনে হয় আর বনভোজনে যাওয়া হবে না।—-”
ফারাজ খানের চোখজোড়া মেয়েটার অপরুপ মুখখানায় স্থির হয়। ধমক দিতে গিয়েও থেমে যায়। এভাবে কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়েছে কিনা সন্দেহ। এই মেয়ে তাকে তাকাতে বাধ্য করে। সেও এই মেয়েকে অনেক কিছু করতে বাধ্য করবে। পড়ে গিয়েছে একদম ভালো হয়েছে। এই মেয়ে এমন উচিত শিক্ষা পাওয়ারই যোগ্য। টিচারকে ধাক্কা দিয়ে নিজের দোষ স্বীকার না করে উল্টো পালাতে চাই ? এর ব্যবস্থা সে পরে করবে আগে উঠিয়ে নেওয়া যাক ? যুবক হাত বাড়িয়ে দিয়ে ধমকের স্বরে বলল,
“উঠো বলছি! না হলে এখানে তালা দিয়ে রেখে চলে যাবো।”
সপ্তদশীর চোখজোড়া কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার যোগাড়। সে কি স্বপ্ন দেখছে? ভাল্লুক তাকে হাত বাড়িয়ে উঠার কথা বলছে? তুলতুলে ভালোলাগায় বুকটা ভরে গেল বুকটা। উঠতে চাইলে আবার হাত ছেড়ে দিবে না তো? না না না সে ধরবে না ।
জেদের বশে বলল,
“আমি নিজে উঠতে পারবো। আপনার হাত ধরে উঠা লাগবো না।”
তিতলির মুখে এমন কথা শুনে ফারাজ রেগে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিয়ে এলো। বেয়াদব মেয়ের কতবড় স্পর্ধা! তাকে ইগনোর করে? ভালোর জন্য হাত ধরতে বলেছে আবার তেজ দেখায়।
তিতলি আবার উঠতে যায় কিন্তু এবারও সফল হয় না। পা মনে হয় মুচকে গেছে। তাও সে ভাল্লুকের হাত ধরবে না। ক্রসবডি ব্যাগ খুলে ফোন বের করতে নিলে,
তৎক্ষণাৎ যুবক ক্ষিপ্ত মেজাজে তিতলিকে দু হাতে টেনে তুলে সোজা পাশের দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে। দুুরুত্ব রেখে দাড়িয়ে যুবক প্রচন্ড রাগে হিসহিসিয়ে উঠে,
“আমার মুখের উপর না বলার সাহস কই পাও তুমি? ভেবেছিলে দৌড়ে পালিয়ে গেলে বেঁচে যাবে? তোমার ভাগ্য ভালো তোমাকে এখনো কিছু করিনি! না হলে ধাক্কা…..”
ফারাজের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই তিতলি
ব্যাথা পেয়ে বলল,
“ছাড়ুন!”
তিতলির গম্ভীর ফারাজ ভালো। এমন রাগী ফারাজ কে সে ভয় পায়। সে তাকানোর সাহস পেলো না। মাথা নিচু রেখেই প্রচন্ড সাহস যুগিয়ে বলল,
“আপনি আমার হাত ধরেছেন কেন?”
ফারাজ শুনলো কি-না কে জানে। উল্টো হাত পেছনে পেঁচিয়ে ধরেছে!
দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করলো
” আমি সেদিন ল্যাবে ডেকেছিলাম আসলে না কেন? আর এত রাগ কারে দেখাও হ্যাঁ?
ভয় লাগে না আমাকে ? ”
তিতলি নিম্নোষ্ঠ দাঁত কামড়াল। কথা খুঁজলো মনে মনে। সে তো ইচ্ছে করে আসে নি। আর কেন আসবে? সে না আসলে তো আরো খুশি তাকে তো সহ্য করতে পারে না। তবে ইগনোরে কি কাজে লেগেছে? এতে হবে না। ভালো কথা বললে আবার আগের মতো হয়ে যাবে। ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে থেকে একটু যাচাই করতে বলল,
“আমার ইচ্ছে তাই আমি আসিনি? আপনার কি সমস্যা? ”
প্রশ্ন করে অপেক্ষা করল সে। চাইলো, খুব করে চাইলো, যেন ফারাজ বলবে,
“হ্যাঁ সমস্যা! কারণ আমি তোমাকে দেখতে চেয়েছি। তোমার কণ্ঠসুর শুনতে চেয়েছি তোমাকে মিস করছিলাম তাই ডেকেছি।”
হয়নি! উল্টো ফারাজ ধমক দিয়ে বলল,
“” উত্তর দিতে বলছি!”
“দিবো না!”
মুখে মুখে তর্ক করলে……”
বলতে গিয়ে ফারাজ হঠাৎ অফিসের করিডোরের কাঁচের গ্লাসের আয়নায় চোখ পড়ে। একপাশ হয়ে থাকায় স্পষ্ট নিজের ধবধবে সাদা শার্টে লিপিস্টিকের গাঁঢ় দাগ দেখতে পেলো। যুবক রেগে গিয়ে ঘুরেফিরে ভালো করে দেখতে থাকে।
তিতলি ভয় পেয়ে যায়। সে ভাবে নি দেখে যাবে। ভয় পেয়ে মেয়েটা ত্রস্ত পায়ে চলে যেতে চাই। কিন্তু ফারাজ হাত হুট করে হাত টেনে ধরে রেগে গিয়ে বলে,
“বেয়াদব মেয়ে ! এসব কি লাগিয়েছো? ”
তিতলি পেছনে পেরার সাহস পায় না। মুখ ঘুরিয়ে রেখেই বললো,
“কি..কি লাগিয়েছি আমি?”
ফারাজ তিতলিকে টেনে ধরে নিজের পেছনে নিয়ে এলো। পিঠ দেখিয়ে শক্ত মেজাজে বলল,
“মিথ্যা বলবে একদম বনভোজন যাওয়ার শখ মিটাই ফেলবো। আমি কি আসার সময় শার্ট নিয়ে এসেছি! ” চোখ কোথায় থাকে বেয়াদব?”
তিতলি ভয়ে কেঁপে উঠলো। এভাবে কেউ ধমকায়! এই লোক তাকে একটুও বুঝে না। একটা চুমুই তো লেগেছে। একটু রোমান্টিক কথা বললে কি হয়?
তিতলি নিজের দোষ স্বীকার করবে না। মেয়েটা প্রচন্ড সাহস যুগিয়ে সে বলল,
“আমি কি ইচ্ছে করে লাগিয়েছি? আমার কোনো দোষ নেই। ”
সহসা ফারাজের ফোন বেজে উঠে। ফারাজ বিরক্ত হয়। ফোন আসার আর টাইম পায় না। দু তিনবার বেজে বেজে উঠছে দেখে ব্যস্ত হয়ে প্যাকেট থেকে ফোন বের করছে….”
তিতলি সুযোগ বুঝে ফারাজকে পাশ কেটে চলে যেতে থাকে।
ফারাজ ফোন হাতে চেপে ধরে ধমক দিয়ে বলল,
“এই মেয়ে দাড়াও বলছি!”
তিতলি শুনে না! পায়ের গতি বাড়িয়ে দেয়।যেন প্রাণ বাঁচাতে পারলেই বাঁচে।
ফারাজ রেগে যায়। এই মেয়ে তাকে বড্ড জ্বালাতন করছে সবদিক দিয়ে। ফারাজ খান রেগেমেগে নিজের শার্ট খুলে ফেলে। এটা এখন কিভাবে তুলবে? বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ঢলতে থাকে তিতলির চুমু লাগা লিপিস্টিকের জায়গা টা। কেমন একটা স্মেইল আসছে। লিপিস্টিক হাতে লেগে লাল লাল হয়ে গেছে। এত গাঁঢ় লিপিস্টিক কেউ দেয়? অনেক চেষ্টা করেও উঠাতে না পেরে অয়নকে কল দেয়। দুবার রিং হয়েই কল রিভিস হয়। ফারাজ বলল,
অয়ন– হ্যালো ভাই?
ফারাজ– অয়ন তুই কোথায়?
অয়ন– আমি তো বাজারে ভাই!
ফারাজ– একটা সাদা শার্ট কিনে নিয়ে আয়, ভালোমানের থেকে।
অয়ন ওপাশ থেকে অবাক হলো। কিন্তু উল্টো প্রশ্ন করার সাহস পায় না। শুধু বলে,
“আচ্ছা ভাই!”
ফারাজ কল কেটে দিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
“পালিয়ে যাবেন কই ! এর শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে । এমন শাস্তি দিবো জীবনে আর এসব ঠোঁঠে লাগানোর সাহস করবেন না। মাইন্ড ইট!”
তিতলিকে নিচে নামতে দেখে নিধি চিন্তার সুরে বলল,
“আমি এতক্ষণ ধরে তোর জন্য দাড়িয়ে আছি। ফাইল রেখে আসতে এতক্ষণ লাগে? কি করছিলি?”
তিতলি বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে। মেয়েটার হাঁসফাঁস লাগছে।
নিধি সন্দেহ করে বলল,
“এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন?”
“বড্ড বাঁচা বেঁচে গেলাম রে। আজ তো আমি গেছিলাম।”
“কি হয়ছে সেটা বলবি তো? ”
“পরে বলবো রে এখান থেকে চল!”
তিতলিরা গেটে গিয়ে দাড়ালো আবার। কিছুক্ষণ পর বাস ছাড়বে। এখন বাজে দশটা দশ মিনিট ।
তিতলিরা গেইটে দাড়িয়ে পিক তুলছে।
তখন অয়নকে আসতে দেখা গেলো।
অয়ন তিতলি কে দেখে দাড়িয়ে গিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকায়। অনেকদিন পর দেখেছে একটু কথা বলতে গেলো।
“কেমন আছো তিতলি?”
তিতলি পাশ ফিরে তাকায়। অয়ন ভাইকে দেখে খুশি হয়ে বলে,
“আরে অয়ন ভাইয়া তুমি? ”
“কেন বিশ্বাস হয় না নাকি?”
“তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে? ”
“হুমম!”
“তাহলে তো অনেক মজা হবে।”
“তুষার যাবে শুনছি তাই আসছি না হলে আসতাম না।”
তিতলি হেসে হেসে বলল,
“ভালো করেছো এসে। ” ফের বললো,
“তোমার হাতে শপিং ব্যাগ কেন ভাইয়া?”
“এটা ফারাজ ভাইয়ের জন্য এনেছি! ভাইর নাকি ইমার্জেন্সি লাগবে।”
তিতলি কেশে উঠলো। লিপিস্টিক লেগেছে তাই বলে কি ওটা চেঞ্জ করতে হবে? ওটা পড়ে থাকলে কি হয়? আরো সুন্দর লাগবে দেখতে। কোনো মেয়ে তাকাবে না। যত্তসব ঢং! আবার সেম সাদা শার্ট কিনে। তার শাড়ির সাথে মিলিয়ে কিনলে কি পাপ হতো?
অয়ন তিতলিকে একমনে কিছু ভাবতে দেখে চোখে র সামনে তুরি বাজিয়ে বললো,
“কি ভাবছো তিতলি? ”
“কি—–কিছুনা না ভাইয়া! ”
অয়ন কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তারপর মজা করে বলে,
“এতে সেজেগুঁজে ছেলেদের ইমপ্রেজ করতে চাও নাকি? ”
তিতলি ঠোঁঠ প্রসারিত করে হাসলো।
তারপর ফুরফুরে কণ্ঠে বলল,
“মেয়েরা কখনো ছেলেদের ইমপ্রেজ করানোর জন্য সাজে না ভাইয়া! তারা সাজুগুজু করে অন্য মেয়েদের গা জ্বালানোর জন্য! ”
অয়ন হেসে ফেলল। এ জন্য তিতলিকে তার ভালো লেগে যাচ্ছে। মুচকি হাসি দিয়ে চলে যেতে থাকে। দেরি করলে ভাই রাগ করবেন।
ফারাজ দু তালার করিডোরে দাড়িয়ে থেকে সব দেখছে। অয়নকে সে বলেছে ওখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ওই বেয়াদব মেয়েটার সাথে কথা বলতে? আজকে আসুক অয়নের ও একটা ব্যবস্থা করবে। সে এতবার প্রশ্নের উত্তর দিতে বলছে? না তার কোনো কথা শুনে নি? এখন সবার সাথে হেসে হেসে তাকিয়ে তাকিয়ে কথা বলছে! এতে যেন ফারাজের মস্তিষ্ক জ্বলে উঠলো। হাত দিয়ে রেলিং চেপে ধরলো।
বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। রুবায়েদ স্যার মাইক নিয়ে সব বলছেন,
“মেয়েরা সবাই মেয়েদের বাসে গিয়ে বসো। আর ছেলেরা ছেলেদের বাসে।”
তুষার বাসে উঠার আগে তিতলিকে সাবধানাতার বানি ছুড়ে দিলো,
“জানালা দিয়ে মুখ, হাত বের করবি না।”
তিতলি ভাইকে হেসে বললো,
“আচ্ছা ভাইয়া! ”
বোনকে সাবধান করে তুষার ছেলেদের বাসে চলে গেলো। ছেলেদের জন্য দুইটা বাস মেয়েদের জন্য দুইটা বাস ভাড়া নেওয়া হয়েছে। আর সব টিচারদের জন্য কাড় ভাড়া করা হয়েছে। তিতলি জানালার পাশে বসলো। তার যে কি খুশি লাগতেছে। মোকাইলে নন্দন পার্কের সব জায়গা গুলো দেখে তারও অনেক শখ ছিলো ওখানে যাওয়ার। কিন্তু কখনো যাওয়া হয়নি। আজ তার স্বপ্নটা পূরণ হচ্ছে। ওই সময়ের পর তিতলি আর ফারাজের সামনে পড়ে নি। সে ঠিকই ফারাজকে দেখেছে তবে তবে দূরে দূরে।
নিধি, তিতলি,প্রিমা স্মৃতি ওরা সবাই একসাথে বসেছে। নিধি তিতলিকে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ১৬
“ওই সময় কি হয়েছিলো তুই অফিসে গিয়ে এভাবে নেমে এলি কেন?”
তিতলির চোখের সামনে সে দৃশ্য ভেসে উঠে। সে কি লজ্জা মেয়েটার। ভীষন লজ্জা পাওয়ার মতো করে বলল,
“আমি ভাল্লুক স্যারের সাদা শার্টে লিপিস্টিক লাগিয়ে দিয়েছি।” মানে চুমু!
