রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১
সিমরান মিমি
“আপনি অনেক সুন্দর।”
ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ানো অতিব সুন্দরী রমনির থেকে প্রশংসা শুনে লজ্জা পেয়ে গেলেন মাছুদ। দৃষ্টি নত করে নিজেকে সামলে কিঞ্চিৎ হাসলেন। সন্তুষ্ট হলো না স্পর্শীয়া সরদার। জিভের ঢগা দিয়ে নিম্ন ওষ্ঠ ভিঁজিয়ে পুণরায় তাকালো পুরুষটির দিকে। কোনো রকম ভণিতা না করেই বললো,
-মাছুদ সাহেব, আপনি আসলেই অনেক সুন্দর।
লোকটা অসস্তিতে পড়ে গেলেন। মুখে এখনো হাসির রেখা বিদ্যমান। ডান হাত উঁচিয়ে আলতো করে কলার ঠিক করলেন। ভেতরটা কেমন কাঁপছে। ঠিক যেনো চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে ফেঁসে গেছে। সামনে রাগী, তেজি বস দাঁড়িয়ে। নিজেকে সামলানোর প্রবল প্রয়াস করে সাবলীল ভাবে বললেন,
-ধন্যবাদ!
– আপনাকে এখন একটা সিগারেট খাওয়াতে ইচ্ছে করছে।
অপ্রস্তুত হয়ে কেশে উঠলেন ভদ্রলোক। গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে রইলেন স্পর্শীয়ার দিকে। বললেন,
– সুন্দর হওয়ার সাথে সিগারেট খাওয়ানোর কি সম্পর্ক?
-উহু! সম্পর্ক আছে। আমি তো খাওয়াই। আমার যাকে পছন্দ হয় – তাকে আমি সিগারেট খাওয়াই। আমি নিজেও তার সাথে বসে খাই।
কপালের দুপাশ থেকে ঘাঁম টপটপ করে পড়ছে। নিরিবিলি, উত্তাপহীন বিকেল টাকেও গ্রীষ্মের কড়া দুপুর মনে হচ্ছে। মাছুদ এখনো নিস্তব্ধ ভঙ্গিতে চেয়ে আছে। তার মুখের আকৃতি স্বাভাবিক নয়, বিকৃত দেখাচ্ছে। সে যে বিষয় টাকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে নি তা বুঝতে পারলো স্পর্শীয়া। প্রশ্নবোধক চাহনিতে বললো,
-কেনো, ভালো লাগছে না? ব্যাকডেটেড মনে হচ্ছে? ভাবছি আপডেট হবো। এখন থেকে সিগারেট বাদ, সোজা মদ নিয়ে বসে যাবো। আচ্ছা, আপনি কি খাবেন? মদ না সিগারেট!
কণ্ঠনালী বসে গেছে। কথা বের হচ্ছে না। যেনো একটানা সাড়ে চার ঘন্টা বৃষ্টিতে ভিঁজেছে মাছুদ। একটু চা বা গরম পানি হলে ভালো হতো। পরক্ষণেই এক ফোঁটা ঘাম পড়লো কপাল বেয়ে। মুহুর্তে ’ই সিদ্ধান্ত বদলালো সে। নাহ, চা নয়। এই মুহুর্তে তার পানি খাওয়া প্রয়োজন। সদ্য ফ্রিজ থেকে বের করা বরফ-ঠান্ডা পানি। আর দাঁড়াতে পারলো না ছাদে। ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছে। দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
– চলুন স্পর্শীয়া, আমরা নিচে যাই।
ড্রয়িংরুমের স্বল্প জায়গার একপাশে রাখা হয়েছে একটা ডাবল সোফা। তার সামনে সুন্দর একটা টেবিল। এপাশে দুটো কাঠের চেয়ার ও রাখা আছে, যেটা কিছুক্ষণ পূর্বেই আনা হয়েছে বসার জন্য। লোকসংখ্যা বেশি, তাই বাধ্য হয়ে ছেলেমেয়ে দুটোর পড়ার চেয়ার এনে রেখেছে পিপাসা। রুমে এই মুহুর্তে মৃদু স্বরে আলাপ আলোচনা হচ্ছে। মাঝে মাঝে হাসির শব্দ ও শোনা যাচ্ছে। পাত্রের বড় ভাবি দেবরের গুণ, টাকা-পয়সা, সরকারি চাকরি ইত্যাদি নিয়ে বড়াই করতে ব্যস্ত। পিপাসা মনোযোগ দিয়ে তা শুনছে। শুনতেই হবে, একমাত্র মেয়ের জামাই বলে কথা।
– এমা! আপনারা তো এখনো কিছু ছুঁয়েই দেখেননি। ভাবী, মিষ্টি খান।
এতোক্ষণ নিরব হয়ে শুনতে থাকা বিপাশা কথা বলে উঠলেন। পাত্রের মায়ের উদ্দেশ্যে মিষ্টি এগিয়ে দিলেন। তারা প্রত্যেকেই কিছু না কিছু খেলেন। এরইমধ্যে নতমুখে প্রবেশ করলেন মাসুদ। তার পিছনে স্পর্শীয়া ও দাঁড়িয়ে। সেদিকে তাকিয়ে পাত্রের ভাবী মশকরা করে বলে উঠলেন,
-বাব্বাহ! এতো অল্প সময়েই হয়ে গেলো? আমি তো ভাবলাম আরো ঘন্টা খানেক বসতে হবে।
কোনো উত্তর দিলেন না মাসুদ। এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসে মায়ের দিকে তাকালেন। এখান থেকে বের হওয়ার ইশারা দিতেই নড়েচড়ে উঠলেন তিনি। ঘটনার কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। সব কিছু ঠিকই তো ছিলো। ছেলে নিজেই তো পছন্দ করেছে দেখার পর। তাহলে আলাদা কথা বলার পরেই কেনো বের হওয়ার জন্য তাড়া দিবে? তারা পিপাসার প্রতিবেশীর আত্মীয়। মেয়ের খোঁজ,ছবি পেয়ে পছন্দ করে একবারেই আংটি নিয়ে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো অর্ধেকটা কাজ আজই সেরে রাখবেন। ছেলের মত ও ছিলো তাতে। কিন্তু কি এমন হলো হঠাৎ!
ছেলেমেয়ে আলাদা কথা বলতে গিয়ে মত পাল্টেছে। তাহলে কি মেয়ের কোনো ছেলের সাথে সম্পর্ক আছে? সেটা খুলে বলাতেই কি পিছপা হয়েছে মাসুদ। হতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। পাত্রের মা উঠে দাঁড়ালেন। স্পর্শীয়ার হাতে দু হাজার টাকা দিয়ে বললেন,
– আম্মু, এটা রাখো। তোমার সালামি।
এরপর পিপাসার দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় একটা হাসি দিলেন। শান্ত স্বরে বুঝিয়ে বললেন,
– ভাবী, আজ তাহলে আসি। মাসুদের বড় চাচা ফিরবেন পরশু। উনি মেয়ে দেখতে চেয়েছেন একবার। এরপরই সমন্ধ টায় আগাবো আমরা। বুঝেনই তো বড় পরিবার। সবার মন রাখতে হয়।
আপত্তি করলো না পিপাসা। সম্মতিসূচক হাসি দিয়ে তাদেরকে বিদায় দিলেন। অতিথি বিদায় হতেই গায়ের ওড়না ছুঁড়ে ফেলে দিলো স্পর্শী। ধপাধপ পায়ে রুমের দিকে হেঁটে যেতে যেতে কঠোর গলায় সুধালো,
– দু বোন মিলে আমার অজান্তে এই আকাম টা ঘটালে না? ওকে, ফাইন। প্রস্তুত থাকো, পস্তাবে!
আছরের আযান শেষ হয়েছে প্রায় এক ঘন্টা। পশ্চিমাকাশে সূর্য ডুবেছে সেই কখন। শুধুমাত্র লাল আভা গুলো রয়ে গেছে এখনো। রেস্টুরেন্টের এক কোনায় বেশ ফাঁকা জায়গা দেখে বসেছে সোভাম। পড়নের শার্ট ঘামে ভিঁজে একাকার। শ্যামবরণ মুখ খানি রোদে পুড়ে তামাটে বর্ন ধরেছে। সারা মুখশ্রী জুড়ে ক্লান্তির ছাপ। তার সামনে গালে হাত দিয়ে ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এক অতিব সুন্দরী নারী। স্লিম ফিগারের লম্বাটে ফর্সা মুখ তার। তবে ত্বকের রঙ বাংলাদেশী মেয়েদের চেয়ে তুলনামূলক উজ্জ্বল। মেয়েটার নাম দিশা। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের সম্পর্ক তাদের। ব্যাচমেট হওয়ায় পরিচয় বেশ অনেকদিনের। সোভাম স্মিত হাসলো। মাঝেমধ্যে দিশার পাশে বেশ বেমানান লাগে নিজেকে। অর্থ – সম্পত্তি, সৌন্দর্য্য, পারিবারিক সম্মান, সব কিছুতেই দিশা অনেক এগিয়ে। তবে এসব বৈষম্য কখনোই প্রেমিকার সামনে করেনি। তুলনা করা মানে নিজেকে ছোট করা। আর একবার এই পথ ভাঙিয়ে দিলে প্রেমিকা নামক অগ্নিপিন্ড গুলো রেগে গেলেই খোটা দেবে। এতোটা বোকামি তো আর সে করতে পারে না।
-চাকরি হয়েছে?
চাকরির কথা তুলতেই সোভাম মাথা নত করলো। টেবিলের কোণায় সিভিটা পড়ে আছে অযত্নে। সেই ন’টার সময় বেরিয়েছিলো ইন্টারভিউ দিতে। সেখান থেকে বেরিয়ে ব্যস্ত শহরে হেঁটে বেকারত্বের হতাশা মেটানোর চেষ্টা চালিয়েছে। এরপরই দেখা করতে এসেছে দিশার সাথে। খানিকক্ষণ চুপ থেকে নিভে যাওয়া কন্ঠে বললো,
-না।
টেনে সময় নিয়ে লম্বা একটা শ্বাস ফেললো দিশা। এই উত্তর তার পরিচিত। দীর্ঘ দু বছর ধরে শুনে আসছে। তারপরেও নতুন করে কারন জানতে চাইলো। সোভাম রগচটা কন্ঠে দাম্ভিকতার সুরে বললো,
– গিয়েছি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। ওরা আমার যোগ্যতা দেখবে, তা না করে সিজি নিয়ে কথা শুনিয়েছি। তোমার কি মনে হয় এতো অপমানের পরেও ওই কোম্পানি তে চাকরি করবো আমি? আর… বাই দ্যা ওয়ে, ওরা আমাকে সিলেক্ট ও করেনি।
এবারে হেঁসে ফেললো দিশা। দুহাত বাড়িয়ে মুঠোয় সোভামের এক হাত নিলো। আস্থা দিয়ে বললো,
– আচ্ছা, চাকরি নিয়ে এতো মন খারাপ করতে হবে না। তোমাকে তো আগেই বলেছি। আব্বু দেখতে চায় তোমায়। একবার যাও, গিয়ে কথা বলো। চাকরির ব্যবস্থা আব্বু করে দিবে।
অপ্রস্তুত হয়ে সোভাম বললো,
– আমার কেমন লাগছে যেতে….ভাবছি আম্মুকে জানাবো। প্রস্তাব নিয়ে পাঠাবো।
নড়েচড়ে বসলো দিশা। গলা ঝেড়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো। সোভামের মেজাজ বোঝার প্রয়াস চালিয়ে বলে উঠলো,
– একটু সমস্যা আছে। সোভাম, প্লিজ আন্টিকে পার্লার টা ছেড়ে দিতে বলো। আব্বু যদি জানে আমার শাশুড়ী পার্লার চালায়, তাহলে কখনোই রাজি হবে না। আত্মীয়রা হাসাহাসি করবে। বলবে জাকির তালুকদারের একমাত্র মেয়ের শাশুড়ী অন্যের বডি, হাত,পা, চুল, বডি ম্যাসাজ… পেডিকিউর-ম্যানিকিউর, এই এইসব করে ইনকাম করে। ব্যাপারটা খুবই লজ্জাজনক। আর তুমি চাকরি নিয়ে কনফার্ম থাকো। একবার চাকরি পেয়ে গেলে আন্টিকে দিয়ে এই বয়সেও কেনো কাজ করাবে?
কিছু একটা ভাবলো সোভাম। কিন্তু তা প্রকাশ করলো না। মাথা ঝুলিয়ে শুধু সায় জানালো। সোভামের সম্মতি আছে দেখে উৎফুল্ল হয়ে গেলো দিশা। পুণরায় রয়েসয়ে বলে উঠলো,
– দেখো, তোমার বোনের তো বয়স কম হয় নি, তাই না? অলরেডি থার্ড ইয়ার শেষ। তোমার বাবা নেই, এবারে তো বিয়ে দিয়ে দাও। সত্যি কথা বলতে ওর স্বভাব আমার মোটেও ভালো লাগে না। তুমি রাগ করো না প্লিজ! আমার মনে হয় এই উড়নচণ্ডী স্বভাব বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। আর, আর যদি বিয়ে দিতেও না চাও তাহলে আমার সোজাসাপটা কথা শোনো। আব্বু তার একমাত্র মেয়েকে কখনোই ননদের সংসারে দেবে না। ওদের মনে হয় ননদ মানেই ভীষণ অত্যাচার করবে। যদি ও বিয়ে না করে তাহলে আন্টিকে নিয়ে সাভারেই থাকুক। মাসে মাসে তুমি টাকা পাঠিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করবে। আর আমরা আব্বুর কাছে মোহাম্মদপুরে থাকবো। আমাদের বাড়িতে। ভালো হবে না?
চট করে উঠে দাঁড়ালো সোভাম৷ তার মুখ চোখ শক্ত। সেকেন্ড সময় ব্যয় না করেই এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো দিশা। তার পিছু পিছু বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলো। বললো,
– তুমি কি রাগ করলে? আমি মোটেও সেভাবে বলি নি। শোনো?
– তুমি চড়ুই কে চিনে উঠতে পারো নি। ওর সাথে এক ঘন্টা থাকলেই বুঝতে পারবে আমার বোন কেমন।
কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো দিশা। আক্রোশে চোখে ফুটে উঠলো ক্রোধ। সেটাকে আড়াল করে বললো,
– আচ্ছা, বেশ। একদিন আলাপ করবো। এখন তো আসো। কতগুলো খাবার অর্ডার দিয়েছি।
সোভাম পায়ের কদম থামালো না। বললো,
– তুমি খাও। আমি বাসায় গিয়ে খাবো। আম্মু ওয়েট করছে।
ক্রোধ টা আর সংবরণ করতে পারলো না দিশা। চেতনা হারিয়ে বলেই ফেললো,
– এতো মা-বোন ভক্ত হলে বউ রাখা যায় না, সোভাম।
-মা-বোনের সাথে সারাক্ষণ তুলনা করবে – এমন বউ আমি রাখবোও না। আর বিয়ে কিন্তু করিনি এখনো।
হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে গেলো দিশা। আক্রোশে ফেঁটে পড়ে বললো,
– মানে? কি বলতে চাইছো কি তুমি? সোভাম, দাঁড়াও।
কদম থামিয়ে পিছু ফিরলো। দিশার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
– আমি ক্লান্ত দিশা। রাতে কল করছি।
এরপর আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ালো না সে। ধপাধপ পায়ে উঠে গেলো সাভারের লোকাল বাসে। বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। বেল বাজতেই ছুটে এলেন পিপাসা। ছেলেটা তার সারাদিন না খেয়ে ছিলো। এই চড়া রোদে না জানি কোথায় কোথায় ঘুরেছে। দরজা খুলতেই ক্লান্ত পায়ে ভেতরে ঢুকলো সোভাম। মুখটা যেনো আজকে বেশিই কালো লাগছে। বিপাশা এগিয়ে এসে বললো,
– কিরে? চাকরি কি হয়েছে? এতো দেরি হলো কেনো? নাকি প্রথম দিনেই কাজ করিয়ে রেখেছে!
সোফায় পা তুলে বসে আয়েশ করে কমলা খাচ্ছে স্পর্শীয়া। এগুলো বিকেলে পাত্রপক্ষ’রা এনেছিলো। যেহেতু পাত্রী সে, তাই যা কিছু এনেছে সবকিছুতেই একমাত্র অধিকার তার। কত কষ্ট করেই না থ্রিপিস পড়ে সং সেজে সামনে গিয়ে বসে ছিলো। সেকি পরিশ্রমের কথা! ভাবলেই ক্যালরি লস হয়ে যায়। বড় ভাইয়ের দিকে কপাল ঘুচিয়ে তাকিয়ে বলে উঠলো,
– ওর কপাল দেখে তো মনে হচ্ছে না চাকরি জুটেছে। ব্যাপার টা কি সরদারের পুত?
সোভাম কলার ঝাকিয়ে আয়েশ করে বোনের পাশে বসে। দু টুকরো কমলা নিয়ে খেতে খেতে বলে,
– ওসব গোলাম খাটার জন্য সোভাম সরদারের জন্ম হয় নি। ভবিষ্যতে নিজেই একটা কোম্পানি খুলবো। তারপর তোর মতন অসহায় বিধবা নারীদের চাকরি দেবো।
ক্ষেপে গেলো স্পর্শী। ভাইয়ের হাত থেকে কমলা কেড়ে নিয়ে বললো,
– আমার জামাইকে তুলে কথা বলবি না। আর আমি বিধবা মানে? খবরদার জীবিত লোকটাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলবি না। কোথায় না কোথায় আছে। ইয়া আল্লাহ! তুমি দেখো, এই শকুনের যেনো নজর না লাগে।
বিপাশা নিজেও ক্ষুদ্ধ হলেন। সোভাম কে শাসিয়ে বলে উঠলেন,
– এসব অলুক্ষণে কথা আর দ্বিতীয়বার বলবি না। এগুলো কি মজা করার মতো কিছু? ওকে পাত্রবক্ষ দেখে গেছে বিকালে। আল্লাহ চাইলে খুব শিগগিরই বিয়ে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সোভাম। বললো,
– ও বসেছিলো পাত্রপক্ষের সামনে?
নিজেকে বেশ বড় মনে হলো বিপাশার। বুক ফুলিয়ে বললো,
– হ্যাঁ, আমি না থাকলে কি আর বসাতে পারতো আপা? আমি ধমক দেওয়ার পরেই তো বসলো।
– পছন্দ করেছে?
চোখ দুটো ছোট ছোট করে ফেললো বিপাশা। বললো,
– এমা পছন্দ কেনো করবে না? স্পর্শী কি অসুন্দর নাকি?
সোভাম হাসলো। নিজের রুমে যেতে যেতে বললো,
– ওকে পছন্দ করেছে মানে ছেলের চোখ নষ্ট। আর এমন অন্ধ ছেলের সাথে আমি আমার বোনকে বিয়ে দেবো না।
জানালা খুলে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে স্পর্শীয়া। রুমের ইলেকট্রিক ফ্যান বন্ধ। আজকাল এই কৃত্রিম হাওয়া আর ভাল্লাগে না। সন্ধ্যার পর পূব দিকের জানালা থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়া নিমিষেই প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। মা, ছোট খালামনি দুজনেই ড্রয়িং রুমে। হয়তো সিরিয়াল দেখতে ব্যস্ত। সোভাম নিশ্চয়ই বাড়িতে নেই, কোচিং এ গেছে। সন্ধ্যার সময়টা একদমই একা লাগে। কেমন মন খারাপেরা হানা দেয়। কিছু অদ্ভুত ভাবনা জাগে মনে। তবে এই ভাবনা গুলো ঘন্টাখানেকের মধ্যেই মুছে যায়। পরক্ষণেই মস্তিষ্ক, মন প্রবল বিরোধিতা করে বলে, ‘ইশশ! স্পর্শীয়া এগুলো ভাবতেই পারে না।’
ফোনটা থেমে থেমে বাজছে। কিন্তু রিসিভড করতে ইচ্ছে করছে না। আজ কেনো যেনো নিত্যদিনের রিং টোন টাও ভালো লাগছে। শুনতে ইচ্ছে করছে বারবার। সে চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে লাগলো টোন। ওপাশের ব্যক্তিও হয়তো তার মনে আশা পূরণে উঠে পড়ে লেগেছে। নাহলে কোনো রেসপন্স ছাড়া এভাবে একটানা ফোন কেই-বা দেয়।
এতোক্ষণে মোবাইল তুলে সামনে আনে স্পর্শীয়া। স্ক্রিনের উপরে ‘পাভেল শিকদার’ নামটা ভেসে উঠেছে। স্পর্শী মৃদু হাসলো। রিসিভড করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি কন্ঠে ধমক এলো।
– কার শ্রাদ্ধ খাচ্ছিলি এতোক্ষণ?
স্পর্শীয়া একই টোনে উত্তর দিলো। বললো,
– তোর টা খাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা টা পূর্ণ করে দে।
চোখমুখ বিকৃত করে ফেললো পাভেল। সিরিয়াস কন্ঠে বললো,
– ফোন রিসিভড করছিলি না কেনো?
– অনুভব করছিলাম।
-কিইই?
-উহু! রিংটোন টা অনুভব করছিলাম। কেনো যেনো খুব ভালো লাগছে।
পাভেল বিরক্ত হলো। সুর টেনে বললো,
– তা আপনার অনুভব করা শেষ হয়েছে ম্যাডাম? এবারে একটু দয়া করে ডেইরি গেটে আসুন।
-উহু পারবো না।
পাভেল অবাক হয়ে গেলো। বললো, কেনো?
স্পর্শী সময় নেয়। দুষ্টুমি করে বললো,
– ভাবছি এখন থেকে আর রাতে বের হবো না। জানিস, আজ পাত্রপক্ষ এসেছিলো। আমায় আংটি পড়িয়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে। ভাবলাম, জামাইয়ের বাধ্যগত বউ হবো। তাই এখন থেকেই চেষ্টা চালাচ্ছি।
পাভেলের কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো নিস্তব্ধতাউ ঘেরা সময়টা। স্পর্শী ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে হাসলো। বললো, – কিরে?
– তুই মজা করছিস, তাই না?
-উহু, মজা না তো। সত্যিই এবার বিয়ে করবো ভাবছি। লাইফে এবার একটু ভিন্নতা প্রয়োজন।
পাভেল সময় নিয়ে চুপ থাকে। কিছুক্ষণ পর মজার ছলে বলে,
– তোকে আরো আগেই বলেছিলাম। এভাবে একা থাকার মানে হয়? চল না চড়ুই, আমরা বিয়ে করে ফেলি।
স্পর্শী শব্দ করে হেসে উঠলো। পরক্ষণেই শক্ত কন্ঠে বললো,
– তোকে বিয়ে করতে যাবো কোন দুঃখে? দুদিন পর পর তো তোকেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এসে নির্লজ্জের মতো হলে উঠিস। লজ্জা করে না আমাকে রাস্তায় থাকার জন্য অফার করতে?
