Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৮

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৮

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৮
সিমরান মিমি

ভোররাতের বৃষ্টির পর আকাশটা পরিস্কার হয়ে গেছে। কোথাও কোনো মেঘ নেই। সূর্য নিদারুণ হাসছে। মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে দিয়েছে ধরণীতে। ভেজা ঘাস, পাতা দিয়ে শিশিরের ন্যায় টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা এবং রৌদ্রজ্জ্বল সূর্য — সব মিলিয়ে আজকের সকালটা বেশ চমৎকার। পূর্বাকাশে সূর্যের উপর হালকা রঙধনুর আবির্ভাবও দেখা যাচ্ছে। হয়তো সরদারের বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে উপলক্ষেই ধরণী এমন রুপে সেজেছে।
স্পর্শীয়া এক ঝাঁক তরুণের মধ্যখানে বসে আছে সোফায়। সামনেই এডভোকেট কাগজ উলটাচ্ছেন। পাশে বসে আছেন বয়স্ক একজন কাজী। পরিবার না থাকলেও কাছের বেশ কয়েকজন বন্ধু এবং দলের ছেলেরা আছে। তবে কোথাও পাভেলকে দেখা যাচ্ছে না। সে এতোক্ষণ এখানেই ছিলো। সবটা ভাইয়ের নির্দেশ মতো গুছিয়ে দিয়ে মিষ্টি আনার অজুহাতে সরে পড়েছে। এই দহন যে সহ্য করতে পারবে না।

পরশের সিগনেচার করা শেষ। সে রেজিস্ট্রার পেপারটা স্পর্শীর সামনে দিলো। মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড চোখ বুলিয়ে পরশের কাছ থেকে ফোন নিলো। সোভামের নাম্বার তুলে নিমিষেই কল করে বসলো। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে শুনেছে, তার জন্য নতুন ফোন কিনতে সোভাম শোরুমে গেছে। কিন্তু এতেই কি সবটা মুছে যায়? কাল গলা টিপে ধরেছে, রাতে ফোন ভেঙে গুড়োগুড়ো করে দিয়েছে। এমনকি স্পর্শীর প্রেমে সবথেকে বড় ভিলেন হবার ইচ্ছে পোষণ করেছে। এতোগুলো দোষ এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে? একটুও না। স্পর্শী কি ভীতু নাকি, যে ভাইয়ের ভয়ে গর্তে গিয়ে বিয়ে করবে! সে তো উলটো জ্বালাবে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে সোভাম সরদারকে।
ওপাশ থেকে ফোন রিসিভড হলো। স্পর্শী গলা পরিস্কার করে হাস্যোজ্জ্বল কন্ঠে বললো,

– ভাইয়া, আমি চড়ুই।
সোভাম জ্যামে পড়েছে। আশপাশ থেকে প্রচন্ড হর্ণের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সে কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললো,
– হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু এ নাম্বারটা কার?
স্পর্শী ভণিতা করলো না। বললো,
– পরশ শিকদারের। শোন না, মেয়ে পক্ষ থেকে তিনটে সিগনেচার লাগবে সাক্ষী হিসেবে। তুই কি রাজসাক্ষী হবি? জায়গাটা কি খালি রাখবো? আচ্ছা সেসব ছাড়! তুই বরং কাজীর সাথে কথা বলে মুখে বয়ান দে। বল — আমি মেয়ের বড় ভাই, এই বিয়েতে রাজী।
সোভাম স্তব্ধ হয়ে গেলো। চিৎকার করে বললো,
– না না না, চড়ুই আমার কথা শোন। এমনটা কিচ্ছু করবি না তুই। কোথায় আছিস আমায় বল!
স্পর্শীয়া আর কোনো উত্তর দিলো না। আগুন লাগানো শেষ। এরপর বাকিটা নিজে নিজেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে।
সোভাম তড়িঘড়ি করে কয়েকবার ফোন করলো। কিন্তু সিম বন্ধ। দিশা হারিয়ে রওনা দিলো পিরোজপুরের উদ্দেশ্যে। এক হাতে বাইকের ব্রেক, অন্যহাতে হাতে কল করলো শামসুল সরদারের ফোনে। রিসিভড করতেই উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
– স্পর্শীয়া কোথায়?
শামসুল ভড়কে গেলেন। থেমে থেমে বললেন,
– তুমি বের হওয়ার পর পরই বেরিয়েছে। কেনো?
– আরে ও ওই শিকদারকে বিয়ে করছে। দ্রুত লোক লাগান। কাছের রেজিস্ট্রি অফিস গুলোতে খোঁজ নিন।
কল কাটার সময় পেলো না। ওভাবেই পকেটে ভরলো ফোন। এরপর স্পিড বারিয়ে দিলো। ভাগ্যিস আজ রিহানের বাইক নিয়ে বেরিয়েছিলো।

রেজিস্ট্রি ম্যারেজ সম্পুর্ণ। এবার ধর্মীয়ভাবে বিয়ে হবার পালা। কাজি একমনে মোনাজাত করছে। তার চারপাশে সকলে গোল হয়ে দুহাত তুলে দোয়া করছে। স্পর্শীয়ার আলাদা কোনো অনুভূতি হচ্ছে না। জেদ এবং একরোখামির আড়ালে সব ধামাচাপা পড়ে গেছে। সে স্থির চোখে সকলকে দেখে নিচ্ছে। একটা ছেলে একহাতে মোনাজাত ধরে অন্যহাতে একটা মিষ্টি মুখে পুড়লো। বোধহয় আর তির সইছিলো না। স্পর্শী তা দেখে ফিক করে হেঁসে দিলো। মুহুর্তেই হাত চেপে ধরলো পরশ। চোখ রাঙিয়ে থামার ইশারা করলো।

স্পর্শী থেমে গেলো। মাথার কাপড় আরেকটু টেনে নিয়ে দরজার দিকে তাকালো। পাভেল এখনো ফেরেনি। অন্য আরেকটা ছেলের হাতে মিষ্টি পাঠিয়ে দিয়েছে। হয়তো ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। স্পর্শীয়ার খারাপ লাগলো। মা-বাবা, ভাই, পরিবার, বেস্টফ্রেন্ড কেউই খুশি নয়। সকলেই নিজ নিজ মনোভাব থেকে বাধা দিচ্ছে। বিয়ের মতো একটা পরিবেশে আপন বলতে কেউ নেই। এটা একটা মেয়ের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। এই মানুষটার প্রতি মায়া পড়ে গেছে। আলাদা টান জন্মেছে, ভালোবেসেও ফেলেছে। তাই নিজের মতকে গুরুত্ব দিয়ে বিয়ে করে খুব একটা ভুল করেনি। আজ নয় কাল তো করতেই হতো। নিমিষেই এক জনকে ভুলে অন্যকাউকে জীবনে বেছে নেওয়া তো সম্ভব নয়। দু পরিবারের যা বিশেষত্ব, তাতে পারিবারিক ভাবে কখনো বিয়ে হবে — এটা ভাবা বোকামি।

তারচেয়ে এখন, এই মুহুর্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই সমুচিত। অন্তত রাগ, জেদ, ক্ষোভের অজুহাত তো দেওয়া যাবে। পরবর্তীতে যদি এমন পরিস্থিতিও না পায়? এছাড়াও রয়েছে শত্রুতার বিষয়। দু পরিবার একে-অন্যকে যতটা বিষচোখে দেখে, তাতে যেকোনো সময় একে অপরের বাড়ি পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেও ক্ষান্ত হবে না। এই বিরোধিতা টুকুকে কমাতে হবে। অন্ততপক্ষে বিয়ের পর ক্ষতি করতে গেলেও দু পরিবার একবার করে ভাববে। সরদার’রা ভাববে, মেয়ের শশুরবাড়ি। আর শিকদার’রা ভাববে ছেলের শশুরবাড়ি।
বিয়ে সমাপ্ত। পরশকে ছেলেদেরকে নিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসের নিচে নামলো। সকলের কি নিদারুণ আমোদ, উৎফুল্লতায় আশপাশে ভিড় জমে গেছে। স্পর্শীয়া গাড়ির মধ্যে ঢুকলো। ছেলেগুলো প্রায় মিছিল দিচ্ছে। পরশ শিকদার অবশেষে ট্রফি ছিনিয়েই নিলো। সরদারকে শশুর বানিয়েই ছাড়লো।
আশপাশের লোকেরা এই খবর শুনে প্রায় হতভম্ব। একজন মধ্যবয়স্ক লোক টিটকারি মেরে আরেকজনকে লোককে বললো,
– এ আর নতুন কি? নেতা ধরে সম্পর্কের হাল। পাতি নেতার নাই পাছার ছাল। যা আছে তাও সব লাল।

বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরমুহূর্তেই পরশকে নিয়ে সরদার বাড়িতে পৌঁছালো স্পর্শীয়া। দুজনের গলায় ফুলের মালা। আপাতত এটাই নব্য বিবাহিত দম্পতির চিহ্ন। শামসুল সরদার পাথরের মূর্তির ন্যায় ড্রয়িংরুমে বসেছিলেন। এতো এতো মেসেজ, কল পাওয়ার পরেও তিনি অবিচল ছিলেন নিজের সিদ্ধান্ত। মন তবুও বলেছিলো – এসব ভুল। তার মেয়ে এরকম করতেই পারে না। কিন্তু যখন পরশ এবং স্পর্শী জোড়ায় এসে দুয়ারে দাঁড়ালো — তখন তিনি নিষ্পলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলেন। এরপর নিস্তব্ধতায় মুড়িয়ে ধীর পায়ে চলে গেলেন দোতলায়। নিজের কক্ষে ঢুকে ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো দরজা।
খলিলুর সরদার ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। সোনালী মুহুর্তেই ইশারা দিলেন থামতে। যেখানে স্পর্শীর মা – বাবা উপস্থিত, সেখানে তাদের কিছু না বলাই সমুচিত। তবুও নিজেকে শান্ত রাখতে পারলেন না খলিল। হাহাকার করে বললেন,

– বংশের কলংক!
ব্যাস! আর কিচ্ছু নয়। এরপর তিনিও চলে গেলেন। নিজের কক্ষে। বাইরে কি করেই বা এগোবেন? মুখ দেখাবেন কি করে জনগণকে? সবাই আঙুল তুলবে। বলবে – ভোটে হেরে ভয় পেয়েছে সরদার রা। নিজেরা নিরাপদে থাকার কারনে শত্রুর কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছে। যেনো করুণা করে বিপদে না ফেলে।
পিপাসা ছলছল চোখে চেয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। কিছু বলার মুখ নেই তার। না জানি ছেলেটা ফিরলে কি হবে! সোভাম কি সহ্য করতে পারবে এসব?

– আমি কখনো ভাবিইনি তুই এতো স্বার্থপর হবি। কি করে পারলি?
স্পর্শী এতোক্ষণে উত্তর দিলো। মায়ের নিকটে হেঁটে এসে বললো,
– এ কথা তুমি বলছো আম্মু? কই, আমি তো সারাজীবন দেখেছি তুমি নিজের সিদ্ধান্তে অটল। বাইরে কি হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত নিলে বাকিদের কেমন লাগবে এসব ভাবোইনি। আমাকেও তুমি নিজে শিখিয়েছো। বলেছো, তোর যেটা নিজের জন্য ভালো মনে হবে সেটাই করবি। অন্যকেউ তোর ভালোটা তোর মতো করে উপলব্ধি করতে পারবে না।’ তবে আজ কি হলো?
পিপাসা কথা বললেন না। শামসুলের মুখের দিকে তাকাতে তার মায়া হচ্ছে। এই লোকটার এতোটা কষ্ট কি করে তৃষ্ণা সহ্য করবে? হাজার হোক, ভালো তো বেসেছিলো! আজ আলাদা থাকে বলে কি পাষাণ হতে পারছে?
সোভাম হতদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকলো। তার চোখ দুটো লাল। মাথার চুল এলোমেলো। দেখে পুরোপুরি বিধ্বস্ত মনে হচ্ছে। সে বড় বড় পা ফেলে ভেতরে ঢুকে এক সময় থমকে গেলো স্পর্শীকে দেখে। রাগে, দুঃখে ড্রয়িংরুমের কাচের টেবিলটার উপর স্বজোরে লাথি মারলো। এরপর ক্ষিপ্ত পায়ে এসে স্পর্শীর হাত চেপে ধরলো । টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যেতে যেতে বললো,

– যাহ! এই মুহুর্তে এই বাড়ি থেকে বের হবি। বিয়ে করেছিস না, তো আবার এখানে কেনো এসেছিস? তোর স্বামীর সাথে চলে যা। তুই মরলে তোর লাশটাও আমি সরদার বাড়িতে ঢুকতে দেবো না। মরিস, পঁচিস সব এই এরিয়ার বাইরে। বাহাদুর কাকা, ওরা বের হলে গেট আটকে দেবে। আর কখনো ঢুকতে দেবে না ভেতরে!
স্পর্শীর অপমান গুলো একদমই সহ্য হচ্ছে না পরশের। তবুও সে ঠায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলো। শেষমেশ নিজেকে সংযত করতে না পেরে চোয়াল শক্ত করে বললো,
– ওর হাত ছাড়ো। নিয়ে যাচ্ছি আমি। আর কখনো ফিরবে না এ বাড়িতে।
স্পর্শী মোটেও অপমানিত হলো না। বরং হাসলো। সোভামের জ্বলন টা নিজ চোখে দেখে সে তৃপ্ত। এইতো সেদিনই শাসিয়ে বলেছিলো, সোভাম বেঁচে থাকতে কখনোই পরশের সঙ্গে বিয়ে হতে দেবে না। অথচ, আজ তার সামনে বসে, তাকে জানিয়ে স্পর্শীয়া বিয়ে করেছে। এতো এতো চোটপাট নিমিষেই শেষ। সোভামকে আরেকটু জ্বালাতে স্পর্শীয়া বলে উঠলো,
– হুদাই আমার থেকে চার বছর আগে জন্মেছিস। কিন্তু বিয়ে তো আগে আমি করলাম। তুই শুধু দিশা হারিয়ে দিশেহারা হয়ে অন্যের বিয়েতে বাগড়া দিচ্ছিস।
পরশ মুহুর্তেই মুখ চেপে ধরলো স্পর্শীর। এরপর জোর করে নিয়ে যেতে লাগলো বাইরে। বললো,
– তুমি ইচ্ছে করে তোমার ভাইকে রাগিয়ে দিচ্ছো।
সোভামের সহ্য হলো না। তার বোনকে বাইরের একটা ছেলে ছুয়েছে! মুখ চেপে ধরেছে! আর সে কিছুই করতে পারলো না? বিষয়টা কাটার মতো সারাগায়ে বিধছে। রেগেমেগে স্বজোরে সদর দরজা বন্ধ করে দিলো। এরপর ছন্নছাড়া হয়ে দেয়ালে ঘুষি মারতে লাগলো।

শিকদার বাড়ির বিশাল সদর দরজার সামনে যখন পরশ আর স্পর্শী এসে দাঁড়ালো, তখন পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলোয় চারপাশটা এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ডুবে আছে। আকাশের কোণে সামান্য লালিমা থাকলেও বাতাসের আর্দ্রতা জানান দিচ্ছিলো যে, কিছুক্ষণ আগেই কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর পাখিদের নীড়ে ফেরার কিচিরমিচির ডাক মিলে এক থমথমে পরিবেশ।
সরদার বাড়ি থেকে ওতো ঝামেলা করে বের হওয়ার পর সরাসরি শিকদার বাড়িতে ফেরেনি পরশ। স্পর্শীয়াকে নিয়ে গাড়ি করে খোলা আকাশের নিচে গন্তব্যহীন ছুটেছে সারাদিন। হয়তো স্ত্রীর মন ভালো করার খানিক চেষ্টা। দুপুরে বাইরেই খেয়েছে। কোনো রকম জামাকাপড় -জিনিসপত্র সাথে আনেনি স্পর্শী। অবশ্য আনতেই পারেনি। হঠাৎ সোভাম এসে টেনে হিঁচড়ে বের করে দিলো। বাবার সঙ্গে একাকী একটু কথাও বলতে পারলো না। সেজন্যই পরশ সরাসরি শিকদার বাড়িতে যায় নি। স্পর্শীয়ার জন্য কেনাকাটা করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিলো।

​স্পর্শীর পরনে সাধারণ একটা সুতির থ্রিপিস, মাথায় টেনে দেওয়া ঘোমটা আর গলায় শুকিয়ে আসা ফুলের মালা। পরশের অবস্থাও এলোমেলো। দিনভরের ঝামেলা আর উত্তেজনায় তার পাঞ্জাবিটা কুঁচকে গেছে। তার মুখে এক চিলতে হাসি থাকলেও ভেতরে ভেতরে হিমশিম খাচ্ছে। সরদার বাড়িতে তো ততটা অশান্তি পোহাতে হয়নি। কয়েক মিনিটের জন্য ঝামেলা জড়িয়ে বউয়ের হাত ধরে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু আসল যুদ্ধই তো বাকি। এই বাড়িটাতে তো স্পর্শীয়াকে থাকতে হবে। যদি উঠতে বসতে একে অপরের গম্ভীর মুখশ্রী দেখতে হয়, তবে মেয়েটাতো ভেতর থেকে ভেঙেচুরে যাবে। এমনিতেই অচেনা পরিবার।
পরশ স্পর্শীর হাতের আঙুলের ভাঁজে আঙুল গুঁজে শক্ত করে ধরলো। নিজের বাড়িতে ঢোকা আজ রণক্ষেত্রে প্রবেশ করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সে স্পর্শীকে আশ্বস্ত করলো। বোঝানোর প্রয়াস করে বললো,
– পরিবারের অমতে বিয়ে করেছি। সকলে নিশ্চয়ই এতো তাড়াতাড়ি তোমায় মেনে নেবে না। একটু গম্ভীর থাকবে, কথাও শুনিয়ে ফেলতে পারে। প্লিজ, তুমি কিছু মনে করো না। একটু ধৈর্য ধরো। ঠিক হয়ে যাবে। আর মাথাটা একটু ঠান্ডা রেখো। যা রাগ, জেদ সব আমার উপর দেখিয়ো। মাথা পেতে নেবো।
স্পর্শীয়া খিলখিল করে হেসে দিলো। বললো,

– আরে, আপনি তো ভয় পাচ্ছেন আমায়। একটু বিশ্বাস রাখুন। আমি বাচ্চা নই।
সদর দরজা পুরোপুরি খোলা। পরশ স্পর্শীয়াকে সাথে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ড্রয়িংরুমে বিরাট এক বিচার সভা বসেছে। বড় সোফাটায় গাম্ভীর্য নিয়ে বসে আছেন আমজাদ শিকদার। পাশে তার ছোট ভাই আলতাফ শিকদার দাঁত দিয়ে নখ কাটছেন, যেনো তিনি চরম বিরক্ত । পিয়াসা শিকদার কপালে হাত দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছেন। দেখে মনে হচ্ছে বিশাল শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছেন।
​তিনি যখন পরশের পাশে স্পর্শীয়াকে দেখলেন, তখন শিউরে উঠলেন। যেন কোনো অপ্রয়োজনীয় বস্তু ঘরে ঢুকে পড়েছে। চিৎকার করে বললেন,

— আল্লাহ! যে মেয়ে তোকে খুন করতে গেছিলো, সেই মেয়েকেই শেষ পর্যন্ত ঘরে তুললি? ও যে তোকে ঘুমের ঘোরে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলবে না, তার কি নিশ্চয়তা!
স্পর্শী বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে শাশুড়ীর দিকে তাকালো। এটা কি বলছে? সে তার স্বামীকে মেরে বিধবা হবে! শাশুড়ীর কথার উত্তর দিতে মুখ খুলতেই পরশ হাত চেপে ধরলো। বিরবির করে বললো,
– প্লিজ! আজকের জন্য চুপ থাকো। আমি সামলে নিচ্ছি সবটা।
​আমজাদ শিকদারের ইচ্ছে করলো স্ত্রীকে কঠিন একটা ধমক দিতে। কিন্তু তা করলেন না। ঘটনা তখন অন্যদিকে মোড় নিবে। ছেলে তার ক্ষেপে যাবে। কিন্তু এসব হতে দেওয়া যাবে না। তিনি চিৎকার করে বললো,
– ঘুমানো তো দূর, এই কালসাপ আমি আমার বাড়িতেই ঢুকাবো না। এই মেয়ে, বের হও!
পরশ চোয়াল শক্ত করলো। স্পর্শীর হাত আরেকটু শক্ত করে ধরে বললো,
– স্পর্শীয়া আমার স্ত্রী। ও এই বাড়িতেই থাকবে। যতক্ষণ আমি থাকবো!
আমজাদ শিকদার খানিকটা ভড়কে গেলেন। চোখ রাঙিয়ে তাকালেন ছেলের দিকে। বললেন,

– বাহ! বিয়ে করতে না করতেই বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিচ্ছো? ভালোই ব্রেনওয়াশ করেছে দেখছি। আমার আর কি! এ বাড়িতে আমার কথার কি কোনো মূল্য আছে?
তিনি হতাশ হয়ে চলে গেলেন। আলতাফ শিকদার নিজেও ক্ষেপে আছেন। পরশ প্রেম করে পরিবারের বিরুদ্ধে বিয়ে করেছে, এতে সে একটুও রেগে নেই। কিন্তু আসল বিষয় হচ্ছে মেয়েটা শামসুল সরদারের। তার আদরের বোনের সতীনের মেয়ে। তিনি অভিমান জড়িত কন্ঠে বললেন,
– আজকের দিন দেখার জন্যই হয়তো দেড় টা মাস নির্ঘুম কাটিয়েছি। হস্পিটালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ছুটেছি।
পরশ স্পর্শীর হাত ছেড়ে চাচার কাছে গেলো। দুহাতে আলতো জড়িয়ে ধরে বললো,
– প্লিজ চাচ্চু, তুমি অন্তত এমন কোরো না।
– কেমন করছি আমি? রাস্তাঘাটে মুখ দেখানো যাচ্ছে না। লোকজন নিদারুণ ক্ষেপেছে। তাচ্ছিল্য করে বলছে – শামসুল সরদারের সাহায্য ছাড়া এই আসন শাসন করা যাবে না। সেজন্যই তার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখার জন্য মেয়ে বিয়ে করেছে পরশ শিকদার। ছিহ!
আলতাফ আর দাঁড়ালেন না। বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। সবাই চলে যাওয়ার পর পিয়াশাও ফোঁপাতে ফোপাঁতে চলে গেলেন। পরে রইলো শুধু প্রেমা। সে তো অত্যধিক খুশি। তবে কি এবার দু পরিবারের শত্রুতা কমে যাবে। সে নাগাল পাবে সোভাম সরদারের। উফফফ! ভাবতেই হেসে ফেললো।
পরশ ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৭

– কি? এবার শুধু আপনি বাকি আছেন। কিছু বানী শোনান, নাহয় মুখ ঝামটা দিয়ে চলে যান।
বড় ভাইয়ার কথা শুনে প্রেমা আরো জোরে হেসে দিলো। ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো স্পর্শীকে। বললো,
– আমি ভীষণ খুশি হয়েছি ভাইয়া। ভাবীকে আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।
বিপরীতে স্পর্শী মৃদু হাসলো। প্রেমার গাল টিপে দিয়ে বললো,
– যাক! অন্তত কেউ তো মেনে নিলো।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৯