রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫১
সিমরান মিমি
বাবার সঙ্গে কথা বলার পর মনটা ফুরফুরে হয়ে গেলো স্পর্শীর। সমস্যার মূল কারন বুঝতে পারলো। তার আপত্তি পরশ শিকদার নয়, বরং মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে। ভীষণ ঘাবড়ে আছেন তিনি। হয়তো ভাবছেন, তার প্রতি থাকা আক্রোশের প্রতিফলন স্পর্শীর উপর দেখানো হবে। এ জন্যই যাবতীয় অভিমান। স্পর্শী ডিভোর্সের কথা বলে বাবার মনটাও পড়ে নিয়েছে। তিনি শঙ্কায় আছেন। ভালো, খারাপ বুঝে উঠতে পারছেন না। এই মুহুর্তে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় স্পর্শীর ভালো থাকা।
সরদার বাড়ির প্রধাণ হিসেবে বাবার মতামত টাই সবচেয়ে প্রধাণ। তিনি সম্মতি দিলে বাকিরাও একমত। তবে এর মধ্যেও যিনি সবচেয়ে বেশি ঘাড়ত্যাড়া, তিনি হলেন সোভাম। অর্থাৎ ছোটো সরদার। যার নাকের আগায় জেদ। তার কথা অমান্য করে স্পর্শী পরশকে বিয়ে করেছে — এটাই গায়ে লেগেছে। রাজনীতি তার খুব একটা পছন্দ নয়। এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেও অনিচ্ছুক। এই শত্রু শত্রু খেলাটাও আপত্তির। তবুও কিন্তু থেকে যায়। বাবার অতীতের কথা জানার পর স্পর্শী যেমন প্রতিশোধ নেওয়ার খেলায় মেতেছিলো। সোভামের দশাও একই। সে প্রতিশোধ না নিতে চাইলেও ভেতরটা স্ফুলিঙ্গের মতো ফুটছে। যত যাই হোক, রক্ত তো। তার বাবাকে এতো টা কষ্ট দিয়েছে, সেই লোকগুলো তো তার’ই শত্রু। জেনেশুনেও সেখানে যাওয়া মানে স্বেচ্ছায় বিপদে ঝাঁপ দেওয়া।
কেটে গেলো প্রায় দুদিন। এরমধ্যে স্পর্শী সকলের সাথে একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়ে গেলো। পিপাসা এই সম্পর্কে আপত্তি করেছিলো নিজের কথা ভেবে। তিনি চান না আবারো রাজনৈতিক পরিবারে জড়িয়ে তার মতো স্পর্শীয়াও কষ্ট পাক। এছাড়াও এই হঠকারী সিদ্ধান্তে তিনি রাগ করেছেন। কিন্তু স্পর্শীয়া তাকেও নানা কথা বলে এলোমেলো করে দিয়েছেন। এবার বাকি আছে শুধু সোভাম। বাড়ির কেউ এখনো এই বিয়ে মানে না। আবার ঘোরতর বিরোধীতাও করছে না। তারা সবটা ছেড়ে দিয়েছে স্পর্শীয়ার হাতে। কিন্তু সোভাম! তাকে মানানো কার সাধ্যি? ঘরেই ঢুকতে দিচ্ছে না বোনকে। এদিকে অসুস্থ বলে জোর করাও যাচ্ছে না।
গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটায় প্রায় বারোটা। স্পর্শীয়ার চোখে ঘুম নেই। বারান্দায় বসে খোলা হাওয়া গায়ে মাখছে। সঙ্গে নানা পরিকল্পনা করতেও ব্যস্ত। সোভামের জ্বর কমেছে। তবে শরীর এখনো ক্লান্ত। অথচ হুটহাট হাতির মতো চিৎকার মারে স্পর্শীকে দেখলে। বিষয়টা এখন চরম বিরক্তিকর ঠেকছে। রুমেই ঢুকতে দিচ্ছে না। এমন করলে স্পর্শীয়া বোঝাবে কি করে!
সরদার বাড়ির পেছনের বাউন্ডারিতে গোল করে কলা গাছ লাগানো। সেখান থেকে বাদুরের পাখা ঝাপটানোর আওয়াজ এলো। স্পর্শীয়া সাময়িক ভাবে ঘাবড়ে গেলো। এতো রাতে আকস্মিক ডাক ভয় পাইয়ে দিলো। দ্রুত ফোন হাতে রুমের মধ্যে ঢুকে ঘুমানোর প্রয়াস করতেই রিংটোন বেজে উঠলো। পরশ কল করেছে। স্পর্শী ভ্রুঁ কুঁচকালো। এইতো ঘন্টাখানেক আগেও তাদের মধ্যে কথা হয়েছে। বলেছে, তাড়াতাড়ি ঘুমাবে। নাহলে মাথা ব্যথা হয়। তাহলে এখন ফোন করছে কেনো? সে কল রিসিভড করে বললো,
– এখনো ঘুমাননি?
– এক্ষুণি গেটের সামনে এসো। আমি অপেক্ষা করছি৷
পরশ একপ্রকার তাড়া দিয়ে বললো। যেনো এক্ষুণি সে শ্বাসবন্ধ হয়ে মরে যাবে। এক মুহুর্তের জন্য স্পর্শী থমকে গেলো। এরপর গেটের চাবি এবং ফোন হাতে নিয়ে ছুটে গেলো বাইরে। বাহাদুর নিজের ঘরেই আছেন। রাতে কারোর আসার কথা নেই। তাই গেটে তালা দিয়ে ঘুমিয়ে গেছেন। কেউ না ডাকা পর্যন্ত উঠবেনও না। স্পর্শী খুব সাবধানে গেট খুললো। যেনো আওয়াজ কম হয়। এরপর ধীর কদম ফেলে অন্ধকারের মধ্যে ডাকলো,
– কোথায় আপনি? দেখতে পাচ্ছি না তো।
হঠাৎ পেছন থেকে পুরুষালি এক দেহ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো স্পর্শীকে। খানিকটা ঘোর লাগানো কন্ঠে বললো,
– তোমায় মিস করছিলাম।
স্পর্শী তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। আশেপাশে তাকিয়ে তাড়া দিয়ে বললো,
– কি করছেন? ছাড়ুন। আরে এটা রাস্তা। কেউ দেখে ফেলবে তো।
– দেখুক। অন্যকারো বউ তো না, আমার বউ। আমি যা খুশি করবো।
স্পর্শী ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
– আচ্ছা, বুঝলাম। এবার বলুন, ঘুম রেখে এখানে কেনো এলেন?
হঠাৎ সবকিছু ছেড়ে পরশ স্পর্শীর হাত ধরলো। উল্টোপিঠে চুমু খেয়ে বললো,
– প্লিজ বাড়ি চলো। আর কতদিন থাকবে?
– ইয়া আল্লাহ! মাত্র দুদিন হলো এসেছি।
– তাতে কি? কাল তো তিন দিন হয়ে যাবে।
পরশের বাচ্চামিতে স্পর্শীয়া কপালে হাত দিলো। একটু কঠোর হওয়ার চেষ্টা করে বললো,
– পাগলামি বাদ দিয়ে চুপচাপ বাড়ি যান, পরশ। কাল বিকেলের দিকে চলে আসবো।
শুনলো না পরশ। কিছুক্ষণ কাতর চোখে বউয়ের দিকে তাকালো। এরপর আচমকাই দুহাত ধরে টেনে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। অবাধ্য হয়ে ছুয়ে দিলো ঠোঁট। জোর করে লম্বা চুম্বন করলো। স্পর্শী ছাড়াতে সক্ষম হলো না। লোকটা অধৈর্য হয়ে পড়েছে। একসময় আবারো অনুরোধ করলো পরশ। বেহায়ার চরম পর্যায়ে পৌছে আবদার করলো। বললো,
– প্লিজ, সাথে চলো। আমি ঘুমাতে পারছি না। একদম মরে যাবো কিন্তু। এইই চলো না!
স্পর্শী অসহায় হয়ে তাকালো। আপত্তি করে বললো,
– অনেক রাত হয়েছে। সবাই কি ভাববে? কাল সকালে যাই, প্লিজ!
পুরোপুরি বিরুদ্ধে গেলো পরশ। খামখেয়ালি কন্ঠে বললো,
– না, এখন চলো। প্রয়োজনে কাল সকালে দিয়ে যাবো।
অবশেষে হার মানলো স্পর্শী। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললো,
– আসছি। পাঁচ টা মিনিট সময় দিন।
পরশকে রেখে চঞ্চলা পায়ে পুণরায় গেটের ভেতরে ঢুকলো স্পর্শী। নিঃশ্বব্দে রুমের মধ্যে ঢুকে গায়ের ওড়না ঠিক করে ফোনের চার্জার সাথে নিলো। এরপর বাবার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো — তিনি গভীর ঘুমে। জাগাতে ইচ্ছে করলো না। সোজা চলে গেলো মায়ের কাছে। পিপাসা সদ্য বিছানায় গা এলিয়েছে। পেছনে দাঁড়িয়ে অসস্তি নিয়ে বললো,
– আম্মু, আমি ও বাড়িতে যাচ্ছি।
– এখন!!!
পিপাসার অবাক চাহনি। স্পর্শী মিথ্যে সাজালো। বললো,
– আমার শাশুড়ী একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। যেতে হবে। পরে আসবো।
এই বলে সে বেরিয়ে এলো। পিপাসা শোয়া থেকে উঠে সদর দরজা পর্যন্ত পিছু নিলো। হাঁক ছেড়ে বললো,
– এই এই স্পর্শী। এতো রাতে একা যাবি?
– নাহ, তোমার জামাই এসেছে।
লজ্জায় আর পিছু ঘুরলো না মেয়েটা। সোজা গেটের তালা খুলে, বাহির থেকে লক করে দিলো। এরপর এগিয়ে গেলো অভদ্র লোকটার দিকে। তিনি বাইকে বসে ঠোঁট কামড়ে হাঁসছেন। স্পর্শী নাকের পাটাতন ফুলিয়ে বকে হাত বাঁধলো। অন্যদিকে তাকিয়ে ফুলে রইলো কিছুক্ষণ। হঠাৎ বাইক দেখে কৌতূহলী হলো। বললো,
– এটা কার?
– পাভেলের।
শিকদার মঞ্জিলে পৌঁছানোর পর আরো অধৈর্য হয়ে উঠলো পরশ। রুমের সামনে যেতেই কোলে তুলে নিলো স্পর্শীকে। কেউ জেগে নেই বাড়িতে। অথচ সে জানলো না, কেউ একজন বুক ভাঙা যন্ত্রণা নিয়ে তাদের দরজা বন্ধ করা দেখছে। পাভেল চোখ বন্ধ করে ফেললো। এ দুদিন তো ভালোই ছিলো। কিন্তু এখন কি করে সহ্য করবে। ওদের খুনশুটি, হাঁসি, তামাশা তো কাঁটার মতো বিধবে। পাভেলের এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো — সে পরশকে সহ্য করতে পারছে না। ভীষণ রাগ হচ্ছে। জেদ বাড়ছে। ইচ্ছে করছে সামনে গিয়ে চেঁচিয়ে বলতে, তুই আমার ভালোবাসা ছিনিয়ে নিয়েছিস। এতোদিন ধরে লালন করা অনুভূতি নিমিষেই ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিস! কেনো করলি? পৃথিবীতে মেয়ের কি অভাব ছিলো? তবে চড়ুই’ই কেনো?
হঠাৎ কোলে নেওয়ায় স্পর্শীয়া ভড়কে গেলো। গোল গোল চোখ করে পরশের দিকে তাকালো। তার চাহনি সম্পুর্ণ অবজ্ঞা করে টুপ করে বুকের তিলটাতে চুমু খেলো বেহায়া পুরুষ। মুহুর্তেই শরীরের সকল ভর ছেড়ে দেয়ে নিজেকে আত্মসমর্পণ করলো স্পর্শীয়া। শব্দহীন হেসে লজ্জালু কন্ঠে বললো,
– আপনি এতো অসভ্য কেনো?
পরশ পুণর্বার একই জায়গায় চুমু খেয়ে বললো,
– স্বামীরা অসভ্যই হয়!
আজ সারা রাত ধরে বর্ষণ হলো। মৃদু ফোঁটার ঝুম বৃষ্টি। যেনো সদ্য একে অপরকে চিনতে চাওয়া কপোত-কপোতী আরেকটু
গভীর থেকে অনুভব করতে পারে। চাঁদটাও পুরোপুরি ম্লান হয়নি। এখনো সামান্য জ্যোৎস্না দিয়ে যাচ্ছে।
আজ ঠান্ডাও পড়েছে বেশ। এতো সময় ধরে বর্ষণ হওয়ার জন্যেই। রুমে মৃদু আলো জ্বলছে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করতে করতে ভোর চারটা বাজার অস্তিত্ব জানান দিলো। এরইমধ্যে রুমে প্রবেশ করলো একজোড়া কপোত-কপোতী। পরশের কোলে গভীর তৃপ্তি নিয়ে গলা জড়িয়ে আছে স্পর্শীয়া। ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসি। পরশ সেই ঠোঁটের মাদকতায় আবার আসক্ত হলো। মাথা নুইয়ে টুপ করে চুমু খেলো। এরপর আলগোছে শুইয়ে দিলো বিছানায়। বললো,
-চুলটা মুছে নাও।
স্পর্শীয়া অলসতায় হামি দিলো। আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
– উমমম! পারবো না।
– ঠান্ডা লেগে যাবে তো।
– তুমি মুছে দাও।
আবারো সেই বাচ্চামো কন্ঠ। আহ্লাদে আপনি থেকে দু ঘন্টায় তুমিতে চলে গেছে। পরশ পাশে বসলো। আলতো হাতে চুলগুলো মুছে দিয়ে কপালে চুমু খেলো।
স্পর্শীর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। সে আর চোখ খুলে রাখতে পারলো না। হাই তুলে শুয়ে পড়লো বিছানায়। পরশ ও আর দেরি করলো না। লাইট নিভিয়ে স্ত্রীকে টেনে বুকের কাছে আনলো। এরপর কোমড় জড়িয়ে তলিয়ে গেলো গভীর ঘুমে।
ভোর সাড়ে চারটার দিকে ঘুমানোর কারনে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলো স্পর্শীয়ার। পাখির কিচিরমিচির ডাক কানে আসলেও ইচ্ছে করে ঘুমিয়েছিলো। রাতে ঘুমায়নি, এর মানে সারা সকাল ঘুমাবে। অথচ সে ভুলেই গেছিলো শশুরবাড়িতে আসার কথা। যখন জাগলো, তখন ঘড়ির কাটায় সাড়ে আট’টা। শাড়ি – টাড়ি সব খুলে পেঁচিয়ে আছে পরশের গায়ে। স্পর্শী দ্রুতপায়ে বিছানা থেকে নামতেই পেঁচিয়ে পড়লো ফ্লোরে। সেই শব্দে পরশের ঘুম ভেঙে যায়। বললো,
এতো তাড়াতাড়ি উঠেছো কেনো? ঘুমাও!
স্পর্শী নাক কুচকালো। ধমক মেরে বললো,
– হ্যাঁ, তারপর শাশুড়ী ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পাড়ায় বলুক – বউ দশটা অবধি জামাই নিয়ে ঘুমায়।
পরশ মুখ কুচকে নিলো। বললো,
– আমার মা মোটেও এমন না।
ড্রয়িংরুম থেকে আওয়াজ আসছে। বোধহয় ব্রেকফাস্টের জন্য আয়োজন চলছে। স্পর্শীয়া দ্রুত ওয়াশরুমে গেলো। ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে ব্যস্ত হাতে শাড়ি পড়লো। তারপর পরশকে ফেলেই চলে গেলো নিচে। আমজাদ শিকদার এবং প্রেমা নাস্তা করছে। পিয়াশা পাশে দাঁড়িয়ে তাদের বেড়ে দিচ্ছে। স্পর্শী কি করবে ভেবে পেলো না।এখনো তিনটে চেয়ার খালি। সে কি সেখানে বসে যাবে, নাকি দাঁড়িয়ে থাকবে শাশুড়ীর মতো।
পিয়াশা আড়চোখে স্পর্শীয়াকে দেখলো। বিরবির করে বললো,
– কখন যায়, কখন আসে — কোনো তালগোল নেই। আল্লাহ এসব রেখেছিলো আমার কপালে।
কথাটা শুনতে পেলো স্পর্শী। তবে জবাব দিলো না। ছোটো ছোটো পা ফেলে শাশুড়ীর পাশে দাঁড়ালো। মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
– আমি কি করবো?
ফের একঝলক তাকালো পিয়াশা। মেয়েটা দেখতে মন্দ নয়। তার ছেলের পাশে ভালোই মানাচ্ছে। কিন্তু এই মেয়ের যা আচার-আচরণ শুনেছে, তাতে কি সংসারে শান্তি থাকবে। তিনি মুখ বাকালেন। রান্না ঘরে যেতে যেতে বললেন,
– নাহ! এই নয়টার সময় উঠে তোমায় কিচ্ছু করতে হবে না। সব কাজ শেষ। চুপচাপ স্বামীর সাথে খেতে বসো।
স্পর্শী সিঁড়ির দিকে তাকালো। পরশ নেমে আসছে। তার পিছনে পাভেলও রয়েছে। ছেলেটার চোখদুটো টকটকে লাল। চুলগুলো উস্কোখুস্কো। যেনো কত রাত ঘুমায় না। পরশ চেয়ার টেনে বসতেই আমজাদ শিকদার উঠে দাঁড়ালেন। তার খাওয়া শেষ। যেটুকুও বা বাকি ছিলো, তা ফেলেই উঠলেন। ছেলের প্রতি অত্যধিক অভিমান থেকেই হয়তো। পরশ মাথা নিচু করে মৃদু হাসলো। বাবার সঙ্গে তার আলাদা করে কথা বলতে হবে। তাকে কৌশলে বোঝাতে হবে।
স্পর্শীয়ার ভীষণ খিদে পেয়েছে। সে পরশের দিকে চাইলো। লোকটা নিমিষেই ধরে ফেললো এই চাহনির মানে। সে ইশারা দিলো পাশে বসার। এই ইশারা টুকু চোখ এড়ালো না পাভেলের। এমনকি খাবার সময়ে সদ্য বিবাহিত স্বামী- স্ত্রীর খুনসুটি পূর্ণ ইশারাও নজরে পড়লো। এগুলো স্বাভাবিক হলেও বড্ড অস্বাভাবিক লাগলো পাভেলের। তার বুক ফুলে উঠলো। বিরক্ত লাগছে ভাইকে। মুখটা তেতো হয়ে আসছে কিছু বলার জন্য। অত্যন্ত চেষ্টা করলো নিজেকে সামলানোর। তড়িৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। খাবার গলা থেকে নামছে না। এক্ষুণি এই স্থান ত্যাগ করা প্রয়োজন। বাড়িতে থাকা যাবে না। এখানে টেকা মুশকিল। একাকীত্বের স্বাদ খুব বাজেভাবে ধরা দিচ্ছে। ভাইয়ের সাথে দুরত্ব বাড়ছে। এটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না। সামান্য একটা বাইরের মেয়ের জন্য ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক খারাপ করবে পাভেল? কিছুতেই না। স্পর্শীয়ার সাথে সম্পর্ক তিন বছরের। অথচ পরশ! চোখ মেলেই তো পাভেল ভাইকে দেখেছে। তার কাধে চষে ছোটোবেলা কাটিয়েছে। নাহ! এই বিরক্তি আর বাড়ানো যাবে না। সে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। পেছন থেকে পরশ, পিয়াশা অজস্রবার ডাকলেও উত্তর দিলো না।
গেটের বাইরে বেরিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো পাভেল। এভাবে আর কতদিন সে পালিয়ে বেড়াবে? নিজের বাড়ি ছেড়ে বাইরে বাইরে থাকবে? অসম্ভব! পাভেল সমাধান খুজতে লাগলো। কে বাঁচাবে তাকে এই অনুভূতি থেকে? তবে কি অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াবে? কিন্তু তবুও তো সমস্যা থেকেই যায়। সারাদিন কথা বলে চোখের সামনে যখন স্পর্শীকে ভাইয়ের সঙ্গে দেখবে, তখন তো সারারাত বুকের ভেতরটা ছটফট করবেই।
পাভেল দুহাতে মাথার চুল খামচে ধরলো। কি করবে ভেবে পেলো না। হঠাৎ বিয়ে করার কথা মনে এলো। তবে কি সে বিয়ে করবে? হ্যাঁ, বিয়ে হলে স্পর্শীয়ার অনুরুপ আরেকজন তার কাছে থাকবে। তাকে ভালোবাসবে, সময় দেবে। সারারাত, দিন, ঘুম, জেগে থাকা প্রতিটা সময়ে সঙ্গ দেবে। এতে নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে সবটা ভুলে যাবে পাভেল। সে হঠাৎ সমাধান খুঁজে পেয়ে শান্তি অনুভব করলো। তখনই মনে পড়ে যায় আর্শিয়ার কথা। মেয়েটা তাকে অসম্ভব ভালোবাসে। সেদিনের পর আর একটা মেসেজও দেয় নি। নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছে। পাভেল চোখ বন্ধ করে ভাবলো। আর্শিকে বিয়ে করাটা খুব একটা ভুল হবে না। বাবার চিন্তা কমবে ভাগনীকে কাছে পেয়ে। বোনের অভাব মিটে যাবে। আর অন্যদিকে পাভেলও একটু শান্তি খুঁজে পাবে। কোথাও একটা পড়েছিলো, “ তুমি যাকে ভালোবাসো, তাকে নয়। বরং যে তোমায় ভালোবাসে তাকে গুরুত্ব দাও। ” পাভেল মৃদু হাসলো। বিরবির করে বললো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫০
“আমি তোমায় না’ই বা পেলাম, কিন্তু যে আমায় চায় – তাকে বরং জিতিয়ে দেই। ক্ষতি যা হওয়ার আমারই হোক। তবুও তো আমায় পেয়ে অন্যকেউ জেতার আনন্দ পাবে। এটাই বা কম কিসে! ”
