Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১০

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১০

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১০
অধরা মিনহা

সাফিন আর কয়েকজন মিলে গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই, তাদের চোখে পড়ে সামনে ইফরাদ আর আনতারার চোখে চোখ রাখার সেই মুহূর্তটা। অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙতে সাফিন হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
— স্যার, জিনিসপত্র গুলো নিয়ে এসেছিলাম।
কথাটা কানে যেতেই ইফরাদ চোখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায় এবং ওদের দেখতে পায়। সাফিনের কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই আনতারা দ্রুত কালো কাপড়টা চোখের ওপর টেনে দেয়, মুহূর্তেই নিজের চোখজোড়া আড়াল করে ফেলে। তারপর আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে বেলকনির দিকে হেঁটে যায়। ইফরাদ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকায়। দেখে, আনতারাকে আর দেখা যাচ্ছে না, আনতারা বেলকনিতে চলে গেছে। তারপর সাফিনদের দিকে ফিরে আঙুল দিয়ে চেয়ার টেবিলের পাশে থাকা খালি জায়গাটা দেখিয়ে বলে,

— রাখো ঐখানে।
ওরা জিনিসপত্রগুলো ইফরাদের দেখানো জায়গায় রেখে চলে যায়। ওরা চলে যেতেই ইফরাদের চোখে আবার ভেসে ওঠে আনতারার নিকাবের ফাঁক দিয়ে দেখা সেই চোখদুটো। যেন তীরের মতো এসে সরাসরি ইফরাদের বুকে বিঁধেছে। জীবনে সে অনেক চোখ দেখেছে, কিন্তু কোনো চোখ এমনভাবে মনে দাগ কাটেনি। আজ সে বুঝতে পারছে, কেন আনতারা নিজের চোখও কালো পাতলা কাপড়ে ঢেকে রাখে। চোখদুটো সত্যিই ভীষণ আকর্ষণীয়। এতটাই যে, কেউ তার মুখ না দেখেও শুধু ওই চোখের দিকেই তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইফরাদ পা ফেলে বেলকনির দিকে এগিয়ে যায়। বেলকনির গ্লাসের দরজাটা খুলে বাইরে তাকায়। দেখে, আনতারা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
ইফরাদ ডাক দেয়,

— রুমে এসো। ওরা চলে গেছে।
ইফরাদের কণ্ঠ শুনে আনতারা পেছন ফিরে তাকায়। আবারও দুজনের চোখাচোখি হয়। তবে এবার ইফরাদ বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকে না, দ্রুত চোখ সরিয়ে রুমে চলে আসে। ইফরাদের পেছন পেছন আনতারাও ভেতরে আসে। রুমে ঢুকেই আনতারার চোখে পড়ে মেঝেতে রাখা জিনিসগুলো। সে নিকাবটা মাথার ওপর তুলে নেয়। মুখটা উন্মুক্ত করে। অনেকক্ষণ ঢাকা থাকায় তার ভীষণ গরম লাগছে, ঘেমেও গেছে। সে এগিয়ে গিয়ে প্রথমেই নিজের বইয়ের ব্যাগ খুলে নিশ্চিত হয়, ভেতরে বই-ই আছে। ব্যাগটা বেশ ভারী। দুই হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেও ঠিকমতো তুলতে পারে না।
ইফরাদ উল্টো দিকে মুখ করে ছিলো। হঠাৎ ঘুরে তাকাতেই দেখে, আনতারা ভারী ব্যাগটা তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। ইফরাদ এগিয়ে গিয়ে আনতারার হাত থেকে ব্যাগটা ছাড়িয়ে নেয়।

— এতো ভারীটা তুলছো কেন?
— এগুলো কি মাটিতে পড়ে থাকবে?
— আমাকে বললেই তো আমি তুলে দেই।
আনতারা দ্বিধা মেশানো বলে,
— আপনার কষ্ট হবে না?
ইফরাদ বাঁকা হেসে বলে,
— ব্যাগ তো সামান্য, আমি তোমাকে সহ তুলে নিতে পারি, তাও এক হাত দিয়ে!
কথাটা শুনে আনতারা মুহূর্তেই থতমত খেয়ে যায়। চোখ বড় হয়ে ওঠে। তারপরই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। তার গাল হালকা লাল হয়ে ওঠে। মনে মনে ভাবতে থাকে, লোকটা কি কথা বলার আগে একটুও ভাবে না? এমন লাগামছাড়া কথা এত সহজে, এত স্বাভাবিকভাবে কীভাবে বলে! ইফরাদ ততক্ষণে বইয়ের ভারী ব্যাগটা তুলে বেডের ওপর রেখে দেয়। ইফরাদের এমন ভাব যেন কথাটা তেমন কিছুই না। আনতারা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ইফরাদের পাশে দাঁড়ায়। সে ব্যাগ খুলে একে একে বই বের করতে শুরু করে। বইগুলো হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আনতারার মুখে ফুটে ওঠে উজ্জ্বল, নির্মল এক হাসি। হাসিটাই বলে দেয় বই তার কত প্রিয়।

ইফরাদ চুপচাপ সেই হাসিটা খেয়াল করে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা কাপড়ের ব্যাগগুলোর দিকে নজর দেয়। সাধারণত মেয়েরা নতুন ড্রেস দেখলে খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, কিন্তু আনতারার সেদিকে কোনো আগ্রহই নেই। তার সমস্ত মনোযোগ বইয়ের দিকেই। ইফরাদ বুঝে যায়, আনতারা বইপাগল মেয়ে। তবে সাধারণ উপন্যাস না, বরং ইসলামিক বইয়ের প্রতিই তার বেশি ঝোঁক।
ইফরাদ একটু ভেবে স্বাভাবিক গলায় বলে,

— বইগুলোর জন্য একটা বুকস্ট্যান্ড লাগবে।
আনতারা মাথা হালকা নেড়ে শান্ত গলায় বলে,
— হুম।
ইফরাদ আবার বলে,
— আচ্ছা, সাফিনকে দিয়ে আনিয়ে দিবো কাল।
— আচ্ছা।
ঠিক তখনি দরজায় নক করার শব্দ হয়। ইফরাদ দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলতেই দেখে মেইড দাঁড়িয়ে আছে।
মেইড নিচু স্বরে, বিনয়ের সঙ্গে বলে,

— আপনাকে ডাকছে ইখতিয়ার স্যার।
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় পাপা?
— লিভিং রুমে অপেক্ষা করছে সবাই।
— আসছি।
মেইড চলে যায়। ইফরাদ আর ভেতরে ঢোকে না, বেরিয়ে আসে রুম থেকে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে লিভিং রুমে ঢুকতেই দেখে, ইখতিয়ার চৌধুরী, ইফতিন, ইরাইনা, শার্লিন ইমরোজ সবাই সেখানে উপস্থিত।
চারপাশের পরিবেশ ভারী। সবার মুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ।
ইখতিয়ার চৌধুরী অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করছেন। ওনার মুখ গম্ভীর, চোখে দমন করা রাগ। ইফরাদকে দেখামাত্র তিনি থেমে যান। চোখ স্থির করে, চাপা কিন্তু কঠিন গলায় বলেন,

— একটু আগে তুমি বাইরে কি করে এসেছো?
ইখতিয়ার চৌধুরীর প্রশ্নে ইফরাদের মুখের অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন আসে না। সে শান্ত, স্থির। সে আগেই বুঝে গেছে, তাকে কেন ডাকা হয়েছে। বুঝবে নাই বা কেন? বাইরে সে যা করে এসেছে, তাতে আবারও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠবে, এটা জানা কথাই। যেখানে তার সামান্য একটা পোস্ট নিয়েই নিউজ হয়ে যায়, সেখানে আজ সে যা করেছে। কত বড় সিনক্রিয়েট করে এসেছে, তা ভাইরাল না হয়ে যায় কোথায়! তার ওপর, একবার না পরপর দুই জায়গায় ঝামেলা করেছে সে। প্রথমে সাধারণ একজন মানুষের সঙ্গে, যার ফোন ভেঙেছে। তারপর একজন সাংবাদিকের সঙ্গে, যাকে সে সরাসরি হুমকিও দিয়ে এসেছে।
ইখতিয়ার চৌধুরী আবার জিজ্ঞেস করেন,

— তোমার মাথা কি পুরোপুরি গেছে? কিছুদিন আগে একটা কন্ট্রোভার্সিতে জড়ালে! সেটা নাহয় যেমন তেমন করে সামলানো গেল, কিন্তু এটা? এখন একটু নিজেকে কন্ট্রোল করে রাখলে কি হতো?
ইখতিয়ার চৌধুরীর চোখে বিরক্তি, ভ্রু কুঁচকে আছে। তবুও ইফরাদ একটুও দমে না। উল্টো দৃঢ় এবং ঠান্ডা গলায় বলে,
— সংযত কিভাবে করতাম? ওরা আনতারার ভিডিও করছিলো! আর এতে আনতারা ভয় পাচ্ছিলো! তারপরও আমি নিজেকে কন্ট্রোল করে ভিডিও ডিলিট করতে বলি। কিন্তু মেয়েটা শুনেনি, তাই এমন করেছি! আর ঐ সাংবাদিক আমার বউকে হোটেলের মেয়ে বলছিলো!
‘আমার বউ’ এই শব্দটায় বেশ জোর ছিলো। একটা অধিকারবোধ আর দায়িত্ব প্রকাশ পাচ্ছিলো। ইফরাদের মুখে এই কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই কিছুটা থমকে যায়। সবার মুখে হালকা বিস্ময়ের ছায়া পড়ে। ইখতিয়ার চৌধুরীর মুখের রাগও খানিকটা স্তিমিত হয়ে আসে। তিনি পুরো ঘটনাটা জানতেন না, শুধু ভাইরাল হওয়া ছোট্ট একটা ক্লিপ দেখেছেন, যেখানে ইফরাদকে ভাঙচুর আর হুমকি দিতে দেখা গেছে। এখন পুরো ব্যাপারটা শুনে তিনি বুঝতে পারেন, ঘটনাটা একপাক্ষিক না। সাংবাদিকের কথাও এমন ছিল, যা শুনে শান্ত থাকা কঠিন।
ইফতিন ভ্রু উঁচিয়ে, একটু অবাক আর খানিকটা কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে,

— বউ?
ইফরাদ তাকায় ইফতিনের দিকে। চোখে কঠিন স্থিরতা। দৃঢ় কন্ঠে বলে,
— হ্যাঁ, বউ! তোমার সামনে কবুল পড়েছি, ভুলে গেছো?
ইফতিন হালকা হাসে। শান্ত গলায় খোঁচা মেরে বলে,
— সেই কবুল পড়ে তুমি বলেছিলে তুমি বউ মানো না, এটা মনে আছে।
এই কথায় ইফরাদের চোখমুখ আরও শক্ত হয়ে যায়।চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর ও কঠোর গলায় বলে,
— তাহলে এটাও সবাই মনে গেঁথে নাও, এখন আমি বউ মানছি আনতারাকে। আনতারা আমার বউ। তাকে যথাযথ সম্মান দিবে, আমার বউ আর ভাবি হিসেবে। আনতারা ইফরাদ রিদান চৌধুরীর বউ হিসেবে হিউজ পরিমাণ রেসপেক্ট ডিজার্ভ করে। আনতারাকে যে অসম্মান করবে, খারাপ কথা বলবে কিংবা তার সাথে খারাপ করতে চাইবে, তার সাথে সবচেয়ে খারাপটা আমি করবো!
এবার শার্লিন ইমরোজের মুখ শক্ত হয়ে যায়। চোখে ক্ষোভ জমে ওঠে। কড়া গলায় বলেন,

— তুমি কি আমাকে হুমকি দিচ্ছো?
ইফরাদ তাকায় না শার্লিন ইমরোজের দিকে। ইফতিনের দিকে তাকিয়ে থেকেই কঠোর গলায় বলে,
— সবাইকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিচ্ছি। তোমাকেও বলছি। আজ যা করেছো, করেছো! আর কখনো আনতারার সাথে এমন করবে না।
ইখতিয়ার চৌধুরী বিস্মিত হয়ে তাকান। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন,
— কি করেছে আজ?
ইফরাদ এবার মাথা ঘুরিয়ে তার মায়ের দিকে তাকায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— আমার রোজাদার বউয়ের সামনে থেকে খাবার সরিয়ে বাসি পানি ভাত এনে দিয়েছে আমার বউকে খেতে!
ইখতিয়ার চৌধুরী আর ইফতিন দুজনেই বিস্ময়ে তাকায় শার্লিন ইমরোজের দিকে। শার্লিন কিছুটা থমকে যান। ধরা পড়ে যাওয়া স্পষ্ট মুখে ভাসে। তারপরও নিজেকে সামলে নিয়ে দোষটা অন্যদিকে ঠেলে দিতে বলেন,

— এই জন্যই তুমি বউকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেছো? কিন্তু কার জন্য? যে মেয়ে তোমাকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করেছে, তার জন্য নিজের মাম্মার বিপক্ষে চলে গেলে?
ওনার কথায় আবারও সবাই চমকে ওঠে। ইফরাদ অবিচল গলায় বলে,
— বিয়ে যেভাবেই হোক, এখন আনতারাকে আমি আমার বউ হিসেবে মেনে নিয়েছি। অতীত নিয়ে আর ভাবতে চাই না।
শার্লিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন,
— স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছো ঠিক আছে, কিন্তু তার সম্পর্কে সব জানো? ওর পরিবার, বংশ সব জানো তো? তোমার শ্বশুর কিন্তু নামকরা ইটভাটা ব্যবসায়ী! আর ইট ব্যবসায়ীর মেয়ে কতটুকু বংশীয় হবে সেটা তো জানোই!
ইফরাদ আগের মতোই বলে,

— আমি আনতারার অতীত কিংবা বংশ নিয়ে জানতে চাই না, মনে রাখতে চাই না। আর তোমাদেরও এসব মনে রাখতে হবে না। শুধু একটা কথা মনে রাখবে, আনতারা আমার বউ।
ছেলের এমন দৃঢ়তা দেখে শার্লিন ইমরোজ স্তব্ধ হয়ে যান। তিনি ভেবেছিলেন, আনতারার পরিবারের কথা শুনলে ইফরাদ হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। কিন্তু হলো উল্টোটা। কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে আনতারাকে গ্রহন করে নিয়েছে। নিজের ছেলেকে যেন নতুন করে চিনতে হচ্ছে। যে ছেলে সবসময় ক্লাস ক্লাস করতো, সেই ছেলেই আজ এত সহজে সবকিছু মেনে নিচ্ছে! ইখতিয়ার চৌধুরীও বিস্মিত হন, তবে নিজেকে সামলে নেন। এই মুহূর্তে বিষয়টা বাড়ালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। মা ছেলের মাঝে বিরাট বড় দন্ড হবে। আর ইফরাদও দূরে সরে যাবে তাদের থেকে। তাই ইখতিয়ার চৌধুরী প্রসঙ্গ বদলানোই ভালো মনে করলেন। সামনে বড় একটা ইভেন্ট, এখন কোনো ঝামেলা হলে সেটা সামলানো কঠিন হবে।
তিনি শান্ত স্বরে বলেন,

— যদি তোমার বউয়ের ক্যামেরা বা মিডিয়ার সামনে আসতে না চায়, তাহলে তাকে নিয়ে বাইরে গেলে কেন? তুমি তো জানো, তোমাকে দেখলেই মানুষ ভিডিও করতে শুরু করবে!
ইফরাদ আগের মতোই বলে,
— প্রয়োজন ছিল বলেই নিয়ে গিয়েছিলাম। আনতারার কিছু দরকারি জিনিস কেনার ছিল।
ইখতিয়ার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
— এখন একটু সংযত হওয়া দরকার ছিল। কাল এত বড় একটা ইভেন্ট, আর এর মাঝেই এই ঝামেলা! এখন কয়েকদিন ধরে তোমাদের এই ঘটনাই সব জায়গায় ঘুরবে। আমাদের পারফিউমের ইভেন্টটাই চাপা পড়ে যেতে পারে।
ঠিক তখনি বাড়ির দরজার কলিংবেল জোরে জোরে বাজতে শুরু করে। অধৈর্য হয়ে বেল বাজাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখনি দরজা না খুললে ভেঙে ফেলবে! সবাই সেদিকে তাকায়। মেইড দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দেয়। হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ঢোকে সাফিন। সে দৌড়ে ইফরাদের দিকে এগিয়ে এসে থেমে যায়। কিছু বলতে চায়, কিন্তু দম নিতে পারছে না ঠিকমতো। শেষমেশ কষ্ট করে বলে,

— স্যার… সর্বনাশ…হয়ে……
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— জানি আমি! তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না।
সাফিন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— জানেন… আপনি? তাহলে… বললেন না… কেন আগে! কখন করলেন এই কাম?
ইফরাদ কড়া স্বরে ধমকে উঠে।
— চুপ থাকো। আর যত ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় আছে, সব ডিলিট করো। এখনই। আজ রাতের মধ্যেই যেন পুরো সোশ্যাল মিডিয়া ক্লিন থাকে।
সাফিন ভয় পেয়ে দ্রুত মাথা নেড়ে বলে,

— ওকে স্যার, হয়ে যাবে।
এবার ইফরাদ ইখতিয়ার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
— ক্লিয়ার, পাপা? আর কোনো সমস্যা আছে?
ইখতিয়ার চৌধুরীর বলার মতো কিছু থাকে না। ওনার যেটা নিয়ে চিন্তা সেটার সমাধান তো ইফরাদ করেই দিচ্ছে। কিই বা বলবে? ইফরাদ আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় ইফরাদ। তারপর সাফিনও সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। তার এখন অনেক কাজ। আজ রাতের মধ্যে সব ভিডিও নিউজ সরাতে হবে। লেইট করলে চলবে না।
এখন লিভিং রুমে শুধু চারজন। ইখতিয়ার চৌধুরী, ইফতিন, শার্লিন ইমরোজ আর ইরাইনা। ইরাইনা এতোক্ষণ ধরে চুপচাপ সোফায় বসে সবকিছু শুনছে।
থমথমে পরিবেশে হঠাৎ ইফতিন সবার দিকে একবার তাকিয়ে তীর্যক হাসে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলে ওঠে,

— ভালোই হয়েছে আজকে তাড়াতাড়ি বাসায় এসে পড়েছি। নয়ত এন্টারটেইনমেন্ট মিস করে ফেলতাম!
তারপর শরীরটা টান টান করে বলে,
— তাহলে আজকের জন্য যাই। রাতে যদি আবার এমন এন্টারটেইনমেন্ট থাকে, ডাক দিও। ভালোই লেগেছে।
বলেই ইফতিন চলে যায়। এবার ইখতিয়ার চৌধুরী সরাসরি শার্লিন ইমরোজের দিকে তাকান। কড়া গলায় বলেন,
— তোমাকে আমি সবসময় বুদ্ধিমতি ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তুমি আসলে একটা মাথামোটা।
শার্লিন ইমরোজ কন্ঠ চড়িয়ে বলেন,
— ইখতিয়ার! তুমি আমাকে এভাবে বলতে পারো না। আমি কি করেছি?
ইখতিয়ার চাপা রাগে বলেন,
— কী করেছো? মেয়েটার সাথে খারাপ ব্যবহার করে নিজের ছেলেকেই দূরে ঠেলে দিচ্ছো! দুই দিনের মধ্যে যদি সে বউয়ের জন্য তোমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখে, তাহলে ভবিষ্যতে সে তোমার সাথে সম্পর্ক রাখবে কিনা, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
শার্লিন ইমরোজ জোর গলায় বলেন,

— আমার ছেলে আমারই থাকবে!
— এখন সে শুধু তোমার ছেলে না। সে এখন একজনের স্বামী। আর বিয়ের পর ছেলেরা বউয়ের কথায় চলে, মায়ের কথায় না। তুমি একটা এনজিও চালাও অথচ এই সাধারণ বিষয়টা বুঝতে পারছো না!
— কই, তুমি তো বিয়ের পর আমার কোনো কথা শোনোনি!
ইখতিয়ার চৌধুরী বিরক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,
— কথা শোনা মানে সব কথায় জি হ্যাঁ করা না!
ইখতিয়ার চৌধুরী এবার ধৈর্যহারা হয়ে ইরাইনাকে বলেন,
— তোমার মাকে বুঝাও তো! আমি তাকে বুঝিয়ে পারছি না।
বলেই তিনি সেখান থেকে চলে যান। শার্লিন ইমরোজ রাগে দাঁড়িয়ে থাকেন। ওনার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি আর ক্ষোভ।
ইরাইনা এতোক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো শার্লিন ইমরোজের দিকে। ইখতিয়ার চৌধুরী চলে যেতেই ইরাইনা উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে এসে শার্লিন ইমরোজের মুখোমুখি দাড়িয়ে শান্ত গলায় বলে,

— আমি তোমাকে আর বুঝাচ্ছি না। আই নো তুমি বুঝবে না। তুমি শিক্ষা পেয়ে তারপর বুঝবে।
বলে ইরাইনা সেখান থেকে চলে যায়। শার্লিন একা দাঁড়িয়ে থাকেন থমথমে মুখে। ভেতরে ভেতরে রাগে তিনি ফুঁসছেন। আনতারার ওপর ওনার ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। আজ ইফরাদ ওনাকে অপমান করেছে, ইখতিয়ার চৌধুরীও কথা শুনিয়ে গেছে, আর এখন নিজের মেয়েও ওনার বিপক্ষে। সবকিছুর পেছনে দায়ী আনতারা। ওনার নিজের মানুষগুলোই ওনাকে ছেড়ে আনতারার পাশে দাঁড়াচ্ছে। আনতারাকে ওনার একদম সহ্য হচ্ছে না।

ইফরাদ রুমে এসে দেখে আনতারা ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছে। আনতারার মুখ আর হাত ভেজা। দেখেই বোঝা যায় সে ওযু করে এসেছে। আনতারা জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। ইফরাদ কোনো কথা না বলে বিছানায় শুয়ে পড়ে। সারাদিনের চাপ আর মানসিক ক্লান্তি তাকে একেবারে ক্লান্ত করে দিয়েছে। সে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। নামাজ শেষ করে আনতারা জায়নামাজের ওপর বসে কিছুক্ষণ ইফরাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। বোঝার চেষ্টা করে সে জেগে আছে নাকি ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারে না।
তাই জায়নামাজ ভাঁজ করে পায়ের নিচের দিকের টেবিলটায় রেখে বিছানায় এসে বসে। ইফরাদ উপলব্ধি করে কেউ পাশে বসেছে। সে চোখ খুলে তাকায়। আনতারা বুঝে যায় ইফরাদ ঘুমায়নি। ইফরাদের মুখ আগের মতোই গম্ভীর। ইফরাদ আবার চোখ বন্ধ করে নেয়। কিছুক্ষণ ঘরটা নিস্তব্ধ থাকে।
নিরবতা ভাঙে আনতারার কন্ঠে। আনতারা নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,

— আপনার কি মাথা ব্যথা করছে?
ইফরাদ চোখ বন্ধ রেখেই উত্তর দেয়,
— না।
আনতারা একটু দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— একটু সময় হবে? কথা বলতাম?
ইফরাদ এবার চোখ খুলে তাকায়। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দেখে আনতারাকে। তারপর বলে,
— কী কথা?
আনতারা ঠোঁট চেপে ধরে ধীরে ধীরে বলে,

— প্রয়োজনীয় কথা। একটু সময় দেবেন?
ইফরাদ সংক্ষেপে বলে,
— আচ্ছা, তাড়াতাড়ি বলো।
— মনোযোগ দিয়ে শুনবেন কেমন?
ইফরাদ কিছু বলে না। আনতারা গভীর শ্বাস নিয়ে বলা শুরু করে,
— অনেক আগে, বনী ইসরাঈলের যুগে জুরাইয নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন ইবাদতে মগ্ন, মানুষের ভিড় থেকে দূরে নিজের জন্য একটি ইবাদতের জায়গা বানিয়ে সেখানে থাকতেন।
তখনি আনতারার কথা মাঝপথে কেটে ইফরাদ বিরক্ত মুখে বলে ওঠে,
— তো এটা আমাকে বলছো কেন?
আনতারা শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,
— আগে শুনুন? বেশি সময়ও তো নিচ্ছি না।
ইফরাদ ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলে,
— আচ্ছা বলো।
আনতারা আবার বলতে শুরু করে,

— একদিন তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠিক তখনি ওনার মা ডাকলেন “হে জুরাইয!” জুরাইয চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি কি নামাজ ভাঙবেন, নাকি মায়ের ডাকে সাড়া দেবেন? অতপর তিনি নামাজ চালিয়ে গেলেন। দ্বিতীয়বারও মা ডাকলেন, কিন্তু তিনি সাড়া দিলেন না। তৃতীয়বার ডাকলেও তিনি নামাজেই রইলেন। এতে ওনার মায়ের মন ভেঙে গেল। কষ্ট পেয়ে তিনি দোয়া করলেন “হে আল্লাহ! তাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলো, যেখানে সে খারাপ নারীর দ্বারা পরীক্ষিত হয়।” এই দোয়া ছিল কষ্ট থেকে বের হওয়া এক আহাজারি। আর সেটাই কবুল হলো। এরপর এক খারাপ চরিত্রের নারী তাকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করল। সে দাবি করল “এই সন্তানের পিতা জুরাইয!” মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তারা জুরাইযকে ধরে মারধর করল, তার ইবাদতের স্থান ভেঙে দিল। তখন জুরাইয বললেন “আমাকে একটু সুযোগ দাও।” সবাই সুযোগ দিলো। তিনি শিশুটির কাছে গিয়ে বললেন “বল, তোমার বাবা কে?” তখন মহান আল্লাহর কুদরতে নবজাতক শিশুটি কথা বলল “আমার বাবা একজন রাখাল।” সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সত্য প্রকাশ পেল। জুরাইয নির্দোষ প্রমাণিত হলেন। মানুষ লজ্জিত হয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইলো এবং আগের চেয়েও সুন্দরভাবে তার ইবাদতের স্থান আবার গড়ে দিতে চাইল।
আনতারা কথা থামিয়ে ইফরাদের দিকে তাকায়।
ইফরাদ এতক্ষণে পুরো মনোযোগ দিয়ে বসে গেছে। তার চোখে কৌতূহল।
আনতারা এবার শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,

— এই ঘটনাটা থেকে কি বুঝলেন?
ইফরাদ কপালে ভাঁজ ফেলে ধীর গলায় বলে,
— মায়ের দোয়া বিফলে যায় না?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— ঠিক বলেছেন। মা খুশি হয়ে দোয়া করলে সেটা বিফলে যায় না। আবার মা কষ্ট পেয়ে বদদোয়া করলেও সেটাও বিফলে যায় না। এমনকি শুধু মুখে বলা দোয়া বা বদদোয়া না, মায়ের অন্তরের কষ্ট বা খুশিও আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়।
একটু থেমে আনতারা আবার বলে,
— ইফরাদ, আপনি আমার কথা ভেবেছেন, এতে আমি সত্যিই খুব খুশি। কিন্তু আমি চাই না, আমার জন্য আপনার জান্নাত নষ্ট হোক। আমি কখনোই চাই না আল্লাহ আপনার ওপর অসন্তুষ্ট হন। মনে রাখবেন, সন্তানের ওপর যদি মায়ের সন্তুষ্টি না থাকে, তাহলে আল্লাহও সেই সন্তানের ওপর অসন্তুষ্ট হন। আল্লাহ মায়ের পায়ের নিচেই জান্নাত রেখেছেন। আপনি যদি জান্নাতের পথকে কষ্ট দেন, তাহলে জান্নাতে জায়গা পাবেন কিভাবে? আপনি আজ আমাদের সবকিছু আলাদা করে দিয়েছেন, এতে আমরা জান্নাত থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমি কিছুই মনে রাখিনি। আপনিও দয়া করে কিছু মনে রাখবেন না।

আনতারার কথা শুনে ইফরাদ গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। তার মনে হতে লাগল, সে কি ভুল করেছে? তার মাম্মা তার জন্য কত কিছু করেছেন, কত ত্যাগ স্বীকার করেছে! অথচ সে রাগের মাথায় কত কঠিন করে কথা বলেছে। সে চাইলে কথাগুলো নরমভাবেও বলতে পারত। নিশ্চয়ই তার মাম্মা অনেক কষ্ট পেয়েছেন। এটা তো স্বাভাবিক।ইফরাদের মনে অদ্ভুত এক অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল। তখন রাগের কারণে সে নিজের আচরণ ঠিক মনে করলেও, এখন আনতারার কথা শুনে বুঝতে পারছে, সে ঠিক করেনি। হয়তো কথাগুলো ভুল ছিল না, কিন্তু বলার ভঙ্গিটা ভুল ছিল। তার বুকটা ভারী হয়ে উঠল।
আনতারা ইফরাদের হাত শক্ত করে ধরে বলে,

— যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন আপনি গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিন। এতে আপনার কথায় যে কষ্টটা আপনার আম্মুর মনে লেগেছে, তা কিছুটা হলেও কমে যাবে। আপনার মনও হালকা হবে, আর আপনার আম্মুর মনও ভালো লাগবে।
হঠাৎ ইফরাদের মাথায় প্রশ্ন বাড়ি খায়। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কিন্তু তুমি কীভাবে জানলে যে আমি আম্মুর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— আমি ওপরতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে দেখেছি, আপনি আপনার আম্মুর সাথে উঁচু গলায় কথা বলছিলেন।
আনতারা একটু থেমে আবার বলে,

— যান এখন ক্ষমা চেয়ে নিন। মায়ের কাছে ক্ষমা চাইলে সম্মান কমে না বরং ভালোবাসা আরও বাড়ে। আল্লাহর রহমতও বাড়ে। মায়ের সাথে কখনো উঁচু স্বরে কথা বলবেন না। সবসময় বিনয়ী হবেন। মা আল্লাহর অনেক বড় নিয়ামত। যতদিন আছেন, যত্ন করে রাখুন।
ইফরাদ মাথা নাড়িয়ে বলে,
— ঠিক বলেছো। আমার মাম্মার কাছে সরি বলা উচিত।
আনতারার মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সে ভেতরে ভেতরে স্বস্তি পায়। ইফরাদকে সে বোঝাতে পেরেছে।
সে মনে মনে ভয় পাচ্ছিল। কারণ এই কদিনে সে বুঝেছে, ইফরাদ নিজের মতো চলে, কারও কথায় সহজে নড়ে না। উল্টো কেউ বোঝাতে গেলে ধমক খাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। তাই সে আগেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল, ইফরাদের রাগ বা প্রতিক্রিয়ার জন্য।
আনতারা নরম গলায় বলে,

— যান, দেরি করবেন না। যত দেরি করবেন, তত কষ্টটা বাড়বে।
ইফরাদ ছোট করে বলে,
— হুম।
বলেই ইফরাদ উঠে দাঁড়ায় এবং রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
ইফরাদ তিনটা রুম পেরিয়ে তার মা-বাবার রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজায় নক করে। কিছুক্ষণ পর দরজা খোলে শার্লিন ইমরোজ।
দরজায় হালকা নক করতেই কিছুক্ষণ পর দরজা খুলেন শার্লিন ইমরোজ। ভেতরে বিছানায় শুয়ে ছিলেন ইখতিয়ার চৌধুরী, হাতে একটা ট্যাব ফোন। সেটায় কালকে ইভেন্টের সবকিছু দেখছিলেন। তিনি ইফরাদকে দেখে ট্যাব ফোনটা পাশে রেখে বসেন।
ইফরাদ নরম স্বরে বলে,

— ভেতরে আসবো, মাম্মা?
শার্লিন ইমরোজ শান্তভাবে মাথা নেড়ে বললেন,
— হ্যাঁ, এসো।
বলেই শার্লিন ইমরোজ সরে দাড়ান দরজা থেকে।
ইফরাদ ভেতরে ঢুকতেই ইখতিয়ার চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন,
— কিছু বলবে?
ইফরাদ তার মাম্মার দিকে তাকায়। শার্লিন ইমরোজ একটু দূরেই মুখ ভার করে দাড়িয়ে আছেন। একটু আগে ইফরাদের করা ব্যবহারেরই মনটা খারাপ। ইখতিয়ার চৌধুরী ইফরাদের তাকানো দেখেই বুঝতে পারেন ইফরাদ ওনার কাছে না বরং শার্লিন ইমরোজের কাছে এসেছে। ইফরাদ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে হঠাৎ পিছন থেকে শার্লিন ইমরোজের গলা জড়িয়ে ধরে। আচমকা এমন আচরণে শার্লিন ইমরোজ চমকে উঠেন, সাথে ইখতিয়ার চৌধুরীও বিস্মিত হলেন।
মায়ের কাঁধে মুখ রেখে ইফরাদ বলে,

— সরি, মাম্মা। তোমার সাথে উঁচু স্বরে কথা বলার জন্য।
শার্লিন ইমরোজ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। অবাক গলায় বলেন,
— কী বললে?
ইফরাদ আগের তুলনায় আরো নরম স্বরে বলে,
— আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি শান্তভাবে কথা বলতে পারতাম। তখন আমার মেজাজটা খারাপ ছিল। সত্যিই সরি। তুমি কষ্ট পেও না, আমার ওপর রাগ করে থেকো না।
ইফরাদের কন্ঠে অপরাধবোধ। ছেলের কথায় মুহূর্তেই শার্লিন ইমরোজের মন নরম হয়ে গেল। মনটা খুশি হয়ে গেলো। ওনার ছেলে ওনার কাছে এসেছে। ভালোভাবে কথা বলছে। আবার সরিও বলছে। কোনো মা তার সন্তানের কাছ থেকে এর থেকে বেশি কিই বা চায়? ছেলের কাছ থেকে ভালোবাসা, সম্মানই চায়।
শার্লিন ইমরোজ মমতাভরা কণ্ঠে ইফরাদের পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন,

— আমার ছেলে এত আদর করে ক্ষমা চাচ্ছে, আমি কিভাবে রাগ করে থাকি? আমি রাগ করিনি।
ইফরাদ মাকে ছেড়ে তার কপালে চুমু দিয়ে বলে,
— থ্যাংকস মাম্মা। আই লাভ ইউ।
— আই লাভ ইউ টু বেটা।
ইফরাদ একটু থেমে বলে,
— আমি আর কখনো তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করব না। আর যদি ভুল করে কিছু হয়ে যায়, আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আর আমরা আলাদা হচ্ছি না।
শার্লিন ইমরোজের চোখে আনন্দ ঝলমল করে উঠে,

— সত্যি?
— হ্যাঁ।
— থ্যাংকস, বেটা। তুমি জানো না, আমি কতটা কষ্ট পেয়েছিলাম।
— সরি, মাম্মা। আর এমন হবে না।
— ঠিক আছে, যেন আর না হয়। তাতে আমি খুব কষ্ট পাব। তোমাকে মাম্মা অনেক ভালোবাসি।
— আমিও তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি। আর তোমাকে আর কষ্ট দেব না।
শার্লিন ইমরোজ ছেলের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিলেন। মনটা এখন ওনার ভালো হয়ে গেছে। হালকা লাগছে মনটা।
— আচ্ছা মাম্মা, আমি যাই? একটু রেস্ট নেব।
— ঠিক আছে, যাও।
ইফরাদ চলে যায়। শার্লিন ইমরোজের মুখে খুশির হাসি ফুটে উঠে। তিনি ইখতিয়ার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
— দেখলে, আমার ছেলে আমাকে কত ভালোবাসে? একটু উঁচু স্বরে কথা বলেছিল, তাই নিজেই এসে ক্ষমা চাইল।
ইখতিয়ার চৌধুরী শান্ত গলায় বলেন,

— হুম। তাহলে মেয়েটা এত খারাপ না।
শার্লিন ইমরোজ ভ্রু কুঁচকে বলেন,
— কোন মেয়ে?
— ইফরাদের বউ।
— তার কথা এখানে আসছে কেন?
— কারণ, সেই ইফরাদকে বুঝিয়ে পাঠিয়েছে তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে।
শার্লিন ইমরোজ একটু বিরক্ত হয়ে বলেন,
— ঐ মেয়ের বুঝিয়ে পাঠাতে হবে কেন? ঐ মেয়ে কে? আমার ছেলে নিজে বুঝতে পেরেছে ও একটু ভুল করেছে, সেজন্য ক্ষমা চেয়েছে!
ইখতিয়ার চৌধুরী বলেন,

— হঠাৎ করেই তোমার ছেলের মধ্যে এত বুঝ এসে পড়েছে? কই, আজ প্রথমবার না তোমার ছেলে তোমার সাথে বেয়াদবি কিংবা উঁচু গলায় কথা বলেছে। আগে তো কখনো ক্ষমা চাইনি। আজকে কেন চেয়েছে? কারণ আজ তাকে বুঝানো হয়েছে যে সে ভুল করেছে। সেজন্যই এসে ক্ষমা চেয়েছে!
শার্লিন দৃঢ় গলায় বলেন,
— একদমই না! অযথা ঐ মেয়েকে ক্রেডিট দিবে না।
ইখতিয়ার চৌধুরী আর তর্ক না বাড়িয়ে বলেন,
— আচ্ছা, আমি কিছু বলছি না। তুমি খুশি থাকো। অযথা চিল্লাপাল্লা করে রুম গরম করো না।
আনতারা বসে ইফরাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পরই ইফরাদ রুমে ঢোকে। তার মুখে তখন স্পষ্ট খুশির ছাপ। আনতারা উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
— ক্ষমা চেয়েছেন?
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— হুম।
আনতারা খুশি হয়ে যায়। হাসি দিয়ে বলে,
— এখন মনটা খুশি খুশি লাগবে। মনটা শান্তি শান্তি লাগবে।
ইফরাদও হাসে। সত্যিই তার ভেতরের অস্থিরতা আর বিরক্তি যেন মিলিয়ে গেছে। মনটা এখন ফুরফুরে।
আনতারা আবার বলে,

— এখন শুয়ে থাকুন। আমি এই বাজারের জিনিসগুলো শাহানারা আপুর সাথে নিচে রেখে আসি।
বলেই আনতারা চলে যেতে চাইলে ইফরাদ আনতারার হাত ধরে ফেলে। আনতারা ফিরে তাকালে ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— থ্যাংকস।
আনতারা হালকা হাসে,
— হুম?
ইফরাদ স্মিত হেসে বলে,
— আমাকে বুঝানোর জন্য।
আনতারা মৃদু হেসে বলে,
— মা বকবে, মা ভালোবাসবে। দুনিয়াতে মায়ের থেকে বেশি কেউ ভালোবাসতে পারে না। মায়েরা ৯ মাস গর্ভে রেখে যত্ন করে, আবার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আমাদের জন্ম দেয়। এই যে আমার মা, আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা গেছে। সন্তানের জন্য নিজের জীবনকেও তোয়াক্কা করে না।
শেষের কথাটা বলতে বলতে আনতারার মুখটা চুপসে যায়। ইফরাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— তোমার মা নেই?
— আমার জন্মদাতা মা আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা গেছেন। আর আমার পালিত মা আছেন।
ইফরাদ ধীর স্বরে বলে,
— ওহ।
আনতারা একটু থেমে আবার বলে,
— ইফরাদ, জানেন? আমার মায়ের যখন অবস্থা খুব খারাপ ছিল, ডাক্তার বলেছিল, যেকোনো একজনকে বাঁচানো যাবে। তখন আমার মা ডাক্তারকে বলেছিলেন আমাকে বাঁচাতে। ডাক্তারও তাই করেছিল। আমাকে বাঁচিয়েছে আর আমার আম্মুকে আল্লাহ তার কাছে নিয়ে গেছেন।
কথাগুলো বলতে বলতেই আনতারার চোখ থেকে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়ে। ইফরাদ তা দেখে দ্রুত আনতারার কাছে এগিয়ে আসে। খুব আলতো করে বুড়ো আঙুল দিয়ে আনতারার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,

— উহু! আজকে শুধু কাঁদছো তুমি। এতো কেঁদো না।
আনতারা কিছুই বলে না। তার চোখদুটো আবারও জলে ভরে ওঠে। মায়ের কথা মনে পড়েছে তার। যদিও মায়ের চেহারায় মনে নেই। জন্মের পর তো সে মাকে দেখতে পারেনি। শুধু একটা ছবি আছে তার মায়ের। তবে এটাও এখন সাথে নেই।
ইফরাদ আবারও তার চোখের পানি মুছে দিয়ে আগের তুলনায় আরো নরম স্বরে বলে,
— মানা করেছি। আর কাঁদবে না।
আনতারা নাক টেনে মাথা নেড়ে ধীর গলায় বলে,
— আচ্ছা।
ইফরাদ হালকা সায় দিয়ে বলে,
— হুম।
ইফরাদ একটু দূরে সরে আসে। আনতারাও হালকা অস্বস্তি নিয়ে চারপাশে তাকায়। তারপর নিজেকে সামলে গ্রোসারির জিনিসগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৯

— ফ্রিজটা রুম থেকে সরিয়ে কিচেনে রাখার ব্যবস্থা করে দিন। আর এটার জায়গায় আমার বইগুলো রাখার জন্য……
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইফরাদ মাঝপথে কথাটা কেটে দিয়ে বলে,
— একটা বুকসেল্ফ এনে দিবো কালকে সাফিনকে দিয়ে।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১১