রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৪
অধরা মিনহা
— হেই, ইউ! সাহস হলো কিভাবে রাইনা ম্যামের চেয়ারে বসার? অফিসে নতুন এসেছো নাকি? জানো না এটা কার কেবিন?
ইরাইনার কেবিনে ঢুকেই ইরাইনার চেয়ারে কালো বোরখা পরা এক তরুণীকে বসে থাকতে দেখে রাগে ফেটে পড়ে মেঘলা। শুধু এতটুকু কথাতেই থেমে থাকল না। ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে মেয়েটার হাত শক্ত করে টেনে ধরে বলে,
— ওঠো এখান থেকে! সাহস তো কম না তোমার…
ইরাইনা গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা ফাইল পড়ছিল।হঠাৎ নিজের এসিস্ট্যান্ট মেঘলার ঝাঁঝালো কণ্ঠ শুনে মুখ তুলে তাকায়। মেঘলার একের পর এক কথা শুনে কিছু বলার আগেই মেঘলা এসে তার হাত টেনে ধরতেই ইরাইনা এবার ধমকে উঠে,
— হাত ছাড়ো আমার! জ্বর কি এখনো পুরোপুরি নামেনি?
পরিচিত কণ্ঠ শুনে মেঘলা হঠাৎ থেমে গেল। তড়িঘড়ি করে হাত ছেড়ে দিয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল।
— ম্যামের গলা? ম্যাম কোথায়?
ইরাইনা দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— তোমার সামনেই।
এই বলে ইরাইনা নিজের নিকাব তুলে ফেলে। মুহূর্তেই মেঘলার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মুখ হা হয়ে রইল। ভয়, রাগ সব ভুলে অবাক হয়ে বলে,
— ম্যাম…..আপনি?
— হ্যাঁ, আমি।
কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মেঘলা বলে,
— এসব…….. কি পরেছেন আপনি?
ইরাইনা ভ্রু তুলে তাকায়।
— তোমাকে জিজ্ঞেস করে পরতে হবে?
— না…. মানে, এমনি জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু একটা কথা বলি? আপনাকে বোরখাতেও অনেক সুন্দর লাগছে।
ইরাইনা প্রশংসার কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে উল্টো প্রশ্ন করে,
— আর তুমি এটা কী পরেছো?
মেঘলা নিজের পোশাকের দিকে তাকায়। কালো রঙের একটা স্কিনি শর্ট ড্রেস পরে এসেছে।
— কেন ম্যাডাম? এটা তো স্কিনি ড্রেস।
— আজকের পর থেকে এসব পোশাক পরে অফিসে আসবে না।
মেঘলা অবাক হয়ে বলে,
— কেন ম্যাডাম? আমি তো সবসময় এমন ড্রেসই পরি। শুধু আমি না, অফিসের অন্য মেয়েরাও তো এমন ড্রেস পরেই আসে।
ইরাইনা দৃঢ় স্বরে বলে,
— তাহলে আজ থেকে নতুন নিয়ম চালু করলাম। কোনো নারী কর্মী শর্ট বা অশালীন পোশাক পরে অফিসে আসতে পারবে না। কেউ নিয়ম না মানলে তার চাকরি থাকবে না।
মেঘলা এবার দ্বিধায় পড়ে গেল।
— কিন্তু ম্যাডাম, আমাদের প্রায় সব লেডিস এমপ্লয়িই এমন পোশাক পরে। তারা হয়তো এটা মানতে চাইবে না।
— যে মানবে না, তার চাকরি থাকবে না। প্রয়োজনে সবাইকে বাদ দিয়ে নতুন কর্মী নিয়োগ দেব। আমাদের অফিসে কাজ করার মতো মানুষের অভাব হবে বলে আমি মনে করি না। আর যদি তোমারও এই নিয়ম মানতে সমস্যা হয়, তাহলে বলো, তোমার জায়গায় নতুন একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগের ব্যবস্থা করি।
এই কথা শুনে মেঘলা একেবারে ঘাবড়ে গেল।
— না, না ম্যাডাম! আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনি যেমন বলবেন, ঠিক তেমনই হবে। আমি কাল থেকে এমন পোশাক পরে আসব না।
— কাল থেকে না, এখনই যাও। বাসায় গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে শালীন ড্রেস পরে অফিসে আসো।
মেঘলা অবাক হয়ে বলে,
— এখনই চেঞ্জ করে আসব?
— হ্যাঁ। তোমাকে এই ড্রেসে দেখে আমি আনকম্ফোটেবল ফিল করছি।
মেঘলা চুপচাপ ইরাইনার কথা মেনে বেরিয়ে যেতে লাগল। দরজার কাছে গিয়ে আবার থেমে ইতস্তত করে বলে,
— ম্যাডাম… একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
— বলো।
— আপনি হঠাৎ এতটা বদলে গেলেন কখন?
ইরাইনা চোখ সরু করে তাকাতেই মেঘলা দ্রুত বলে,
— না না, আমি অন্যভাবে বলিনি। শুধু কৌতূহল থেকে জানতে চেয়েছিলাম…
ইরাইনা সংক্ষেপে উত্তর দেয়,
— ধরে নাও গতকাল থেকে।
— ওহ…. কাল তো আমি অফিসেই আসিনি। জ্বরের জন্য ছুটি নিয়েছিলাম। তাই কিছুই জানতাম না।
— হুম। এখন তাড়াতাড়ি যাও। আর ফিরে এসে আজই সবার কাছে নতুন নিয়মগুলো এনাউন্স করে দেবে।
মেঘলা ইতস্তত করে বলে,
— ম্যাম আজই?
— কোনো আপত্তি?
— না, ম্যাম।
আর কোনো কথা না বলে মেঘলা কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। ইরাইনাও আবার শান্তভাবে ফাইলের দিকে মনোযোগ দেয়।
ইফরাদ খালি গায়ে, শুধু একটা ট্রাউজার পরে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাড়ে ঝুলছে একটা সাদা তোয়ালে। আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলে,
— স্টাইল শুধু পোশাকে না….. চুলেও থাকে।
এরপর হাতে থাকা শ্যাম্পুর বোতলটা ক্যামেরার সামনে তুলে ধরে বলে,
— যখন চুল থাকে সফট আর সিল্কি…..তখন আত্মবিশ্বাস নিজেই কথা বলে।
তারপর হালকা হেসে বলে,
— Head & Shoulders. স্মুথ চুল, স্মার্ট লুক।
কথা শেষ করেই ঘাড়ে ঝুলে থাকা তোয়ালেটা হাতে নিয়ে হাসিমুখে চুল মুছতে শুরু করে। হঠাৎ সেটজুড়ে ডিরেক্টরের কণ্ঠ ভেসে আসে,
— Cut!
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে চুল মোছা থামিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ে। সাফিন এগিয়ে এসে তার হাত থেকে তোয়ালেটা নেয়। ডিরেক্টর ক্যামেরার মনিটরে শটটা আরেকবার দেখে সন্তুষ্টির হাসি দিয়ে বলেন,
— Nice shot.
ইফরাদও এগিয়ে এসে মনিটরে শটটা দেখে। কয়েক সেকেন্ড দেখে মাথা নেড়ে বলে,
— Yeah, it’s perfect.
ডিরেক্টর হাসিমুখে সকলের উদ্দেশ্যে বলে,
— That’s a wrap!
শুটিং শেষ হওয়ায় ইফরাদ ড্রেস চেঞ্জ করার জন্য চেঞ্জিং রুমে চলে যায়। শুটিংয়ের জন্য পরা ট্রাউজার বদলে নিজের অফ-হোয়াইট ফর্মাল প্যান্ট পরে নেয়। এরপর কালো শার্ট গায়ে দিয়ে ইন করে নেয়। শেষে মুখ ধুয়ে চুল ঠিক করে বাইরে বেরিয়ে আসে। এদিকে শুটিং সেটের সবাই সব সরঞ্জাম গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। প্রায় সবকিছুই গুছিয়ে ফেলা হয়েছে। ইফরাদ বেরিয়ে এসে ডিরেক্টর ও উপস্থিত সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেটের বাইরে চলে আসে। তার পেছন পেছন বেরিয়ে আসে সাফিনও।
বাইরে তখন দুপুর দুইটার তীব্র রোদ। চোখে রোদের ঝলক না লাগার জন্য ইফরাদ সানগ্লাস পরে নেয়। সাফিন গিয়ে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দেয়। ইফরাদ পিছনের সিটে বসে আর সাফিন সামনের সিটে বসে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। গন্তব্য অফিস। গাড়িতে বসে ইফরাদ বেশ অনেকক্ষণ ফোন স্ক্রল করে। একবার ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করছে তো আরেকবার সেখান থেকে বের হয়ে টুইটারে।
এই অ্যাপ আবার সেই অ্যাপে স্ক্রল করছে, কিন্তু কোথাও মনোযোগ বসছে না। কোনো পোস্টেই তার আগ্রহ হচ্ছে না।
হয়তো সত্যিই তেমন ইন্টারেস্টিং কিছু সামনে আসছে না কিংবা তার নিজেরই এখন এসব আর ভালো লাগছে না। তাই যতই স্ক্রল করুক, কিছুতেই মন টিকছে না। ইফরাদ বিরক্ত হয়ে স্ক্রিন বন্ধ করে দেয়। ফোন চালাতে একদমই ভালো লাগছে না। আবার কোনো কিছুতেই আগ্রহ পাচ্ছে না। ফোনটা পকেটে রাখতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গতকাল আনতারার গাওয়া সেই নাশিদের কথা। মুহূর্তেই সেই সুর আবার শুনতে ইচ্ছে হলো।
ইফরাদ ফোনে নাশিদটা চালিয়ে দুই কানে এয়ারপড গুঁজে চোখ বন্ধ করে। আহা, এবার মনটা শান্ত হয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে যে অস্থিরতা আর ভালো না লাগার অনুভূতি তাকে ঘিরে ছিলো, মুহূর্তের মধ্যেই তা মিলিয়ে গিয়ে জায়গা করে নেয় এক গভীর প্রশান্তি। কি অপূর্ব, কি মিষ্টি সেই কণ্ঠ! ইফরাদও চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়াতে নাড়াতে মনে মনে নাসিদের সঙ্গে গলা মেলাতে লাগল।
এদিকে চলন্ত গাড়িতে সাফিন নিজের হাতে থাকা ট্যাবের স্ক্রিন অন করে একটা পিডিএফ ফাইল খুলে। পিডিএফ টায় কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর ইফরাদের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করে,
— স্যার, একটা ব্র্যান্ড অফার এসেছে। অফিসিয়াল টিম থেকে পাঠানো। ম্যানেজার দেখে শর্টলিস্ট করে দিয়েছে।
ইফরাদ কিছুই শুনে না। সে পুরোপুরি নাশিদে ডুবে আছে।
সাফিন ট্যাবের স্ক্রিনে চোখ রেখেই বলতে থাকে,
— এক বছরের গ্লোবাল ক্যাম্পেইন, স্যার। ইউরোপ আর এশিয়া মিলিয়ে শুট। ব্র্যান্ডটা বড়, লাক্সারি ক্যাটাগরি। প্রপোজালটা স্ট্রং।
একটু থেমে আবার বলে,
— আগামী মাস থেকে কিক-অফ করতে চাচ্ছে। ডেডলাইন টাইট, তাই দ্রুত রেসপন্স চাইছে।
কথা শেষ করে সাফিন ঘাড় ঘুরিয়ে ইফরাদের দিকে তাকায়। দেখে, ইফরাদ সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। দুই কানে এয়ারপড লাগানো। সাফিন ডাকে,
— স্যার?
কোনো সাড়া নেই। সাফিন এবার একটু জোরে ডাকে,
— স্যার?
চোখ বন্ধ করে নাশিদ শুনতে শুনতেই ইফরাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানিয়ে দেয়, কেউ হয়ত তাকে ডাকছে। ইফরাদ চোখ খুলে তাকায়। দেখে, সাফিন তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ইফরাদ এক কানের এয়ারপড খুলে ফেলে। নাসিদের সুরে ডুবে থাকায় ইফরাদের চোখে তখন ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত কোমলতা। দেখেই বোঝা যায়, তার চোখ দুটো কোনো কিছুর ঘোরে ডুবে আছে ভীষণভাবে।
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— কী?
সাফিন ট্যাবটা একটু ইফরাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— একটা ব্র্যান্ড অফার এসেছে। অফিসিয়াল টিম থেকে পাঠানো। ম্যানেজার শর্টলিস্ট করেছে। আপনার শুধু একবার দেখে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
ইফরাদ কয়েক সেকেন্ড ট্যাবের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,
— একটু পরে দেখব।
কথা শেষ করেই সাফিনের উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার কানে এয়ারপড লাগিয়ে নাশিদ শুনতে শুরু করে।
আনতারার কণ্ঠে গাওয়া এই নাশিদ তাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করে। আনতারার কণ্ঠে আর নাশিদটাতে যেন এক অদৃশ্য জাদু লুকিয়ে আছে। যেটা তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর গাড়ি এসে অফিসের সামনে থামে। কিন্তু সেদিকে ইফরাদের কোনো খেয়াল নেই। সে এখনো নাশিদ শুনছে। মাত্র বিশ সেকেন্ডের রেকর্ডিং নাশিদটা গত এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে প্রায় ৩১৫ বার শুনে ফেলেছে।
তবুও তার একটুও বিরক্ত লাগছে না। বরং মনে হচ্ছে, আরো একবার….তারপর আরেকবার শুনতে। সাফিন গাড়ি থেকে নেমে ইফরাদের পাশের দরজাটা খুলে ইফরাদকে ডাক দেয়,
— স্যার?
ইফরাদের কিছু একটা অনুভব হলো। সে চোখ খুলে তাকায়। দেখে, গাড়ি থেমে গেছে আর সাফিন দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইফরাদ ফোনে চলতে থাকা রেকর্ড করা নাশিদটা বন্ধ করে। তারপর এক কানের এয়ারপড খুলে পকেটে রেখে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে।
সামনে স্থাপিত আধুনিক নকশার বারোতলা একটা বাণিজ্যিক ভবন। কালো রঙের মেটাল ফ্রেম আর বিশাল কালো গ্লাস প্যানেলে নির্মিত ভবনটা দূর থেকেই নজর কাড়ে। সাধারণ কংক্রিটের দেয়ালের বদলে পুরো বাইরের অংশজুড়ে রয়েছে কাচের প্যানেল। যা ফলে ভবনটা অভিজাত ও আধুনিক এক সৌন্দর্য। স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে প্রতিটা তলার লম্বাটে, হালকা হলুদ রঙের সিলিং লাইট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভবনের নিচতলাটা কিছুটা ভেতরের দিকে ঢোকানো। আর পুরো বিল্ডিংটা দাঁড়িয়ে আছে প্রশস্ত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাথরে বাঁধানো একটা চত্বরে।
সামনে সারিবদ্ধভাবে লাগানো ছোট ছোট গাছগুলো ফলে সামনের জায়গাটা আরো বেশি সুন্দর লাগে। ইফরাদ অফিস বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকে সোজা লিফটের সামনে এসে দাঁড়ায়। সাফিন বাটনে চাপ দিতেই সঙ্গে সঙ্গে লিফটের দরজা খুলে যায়। এই লিফটটা শুধু অফিসের মালিকদের ব্যবহারের জন্য । কর্মচারী ও অন্যান্য স্টাফদের জন্য আলাদা লিফটের ব্যবস্থা রয়েছে।
ইফরাদ আর সাফিন দুজনেই লিফটে উঠে। সাফিন এইট ফ্লোরের বাটনে চাপ দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা নাইন ফ্লোরে পৌঁছে যায়। লিফট থেকে বের হতেই ওপেন প্ল্যান অফিসে উপস্থিত সবাই ইফরাদকে দেখে সম্মান জানিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারা তখন লাঞ্চ করছিল। তবুও ইফরাদকে দেখেই সবাই সালাম দেয়। অন্য সময় ইফরাদ কখনোই সেই সালামের উত্তর দিত না। কিন্তু আজ কি মনে করে, কিংবা হয়তো অজান্তেই সে সালামের জবাব দিয়ে ফেলে।
তার সালামের উত্তর শুনে শুধু কর্মচারীরাই না, সাফিনও অবাক হয়ে গেল। এমনকি ইফরাদ নিজেও কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে রইল তার কাজে।
সাফিন বিস্মিত চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে রইল। ইফরাদ হঠাৎ এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর পরিস্থিতি ঠিক করতে কিছুই হয়নি এমন ভান করে ইফরাদ আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটা শুরু করে। পেছন পেছন সাফিনও দৌড় দেয়। একটু সামনে এগোতেই ইরাইনার অ্যাসিস্ট্যান্ট মেঘলার সঙ্গে দেখা।
মেঘলাকে দেখে সাফিন আবারো বিস্মিত হয়ে গেল।
পাঁচ বছর ধরে ইরাইনার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছে মেঘলা। কিন্তু এত শালীন পোশাকে তাকে কখনো দেখা যায়নি।
আজ সে আকাশি রঙের একটা কামিজ, সাদা প্যান্ট আর গলায় সাদা স্কার্ফ পরে এসেছে। তাকে আগের যেকোনো দিনের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর আর মিষ্টি লাগছে। সাফিন বিস্মিত হলেও ইফরাদ এমন স্বাভাবিক। ইফরাদকে দেখেই মেঘলা ভদ্রভাবে বলে,
— গুড আফটারনুন স্যার।
ইফরাদও শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
— গুড আফটারনুন।
বলেই ইফরাদ নিজের কেবিনের দিকে হাঁটা দেয়। সাফিন অবশ্য ইফরাদের সঙ্গে গেল না। মেঘলার দিকে তাকিয়ে নিজের বিস্ময় আর চেপে রাখতে পারল না। হেসে বলে,
— এই ব্যাপার কী? হঠাৎ এমনভাবে? কোনো সুদর্শনের প্রেমে পড়লে নাকি?
কথাটা বলেই মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। মেঘলা বিরক্তি আর ভয় মিশ্রিত মুখে বলে,
— ধুর! কী প্রেমে পড়ব! জান বাঁচিয়েই কুল পাচ্ছি না।
সাফিন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কেন? কী হয়েছে?
মেঘলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— রাইনা ম্যামের জানি কী হয়েছে!
— উনি আবার কী করেছেন?
— আমি রাইনা ম্যামের কেবিনে একটা বোরখা পরা মেয়ে দেখে ইচ্ছেমতো বকাঝকা করলাম। পরে গিয়ে দেখি, ওইটাই রাইনা ম্যাডাম!
সাফিন বিস্ময়ে চোখ বড় করে বলে,
— আরে না! এটা কীভাবে সম্ভব? রাইনা ম্যাডাম আর বোরখা?
মেঘলা একটু ঝুঁকে নিচু গলায় বলে,
— সম্ভব হয়েছে। উনিই আমাকে শর্ট ড্রেস বদলিয়ে এসব পরিয়েছেন।
মেঘলার ভঙ্গি নকল করে সাফিনও নিচু গলায় বলে,
— একটু আগে ইফরাদ স্যারও অফিসের স্টাফদের সালামের উত্তর দিয়েছেন!
মেঘলার চোখ বিস্ময়ে ছোট হয়ে গেল।
— বলো কিহ!
— সত্যি বলছি!
মেঘলা কিছুক্ষণ ভেবে বলে,
— ইফরাদ স্যার নিশ্চয়ই কোনো হুজুরনির প্রেমে পড়েছেন!
সাফিনও তাল মিলিয়ে বলে,
— আর রাইনা ম্যাডাম কোনো হুজুরের প্রেমে পড়েছেন।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যাঁ, তাই হবে হয়তো! না হলে হঠাৎ এমন পরিবর্তন হলো কীভাবে?
হঠাৎ পেছন থেকে ঠান্ডা, গম্ভীর একটা কণ্ঠ ভেসে আসে,
— ওহ তাই নাকি প্রেম দূত রা?
সাফিন আর মেঘলা দুজনেই ইরাইনার কন্ঠ শুনপ চমকে পেছনে ফিরে তাকায়। দেখে, ইরাইনা ঠিক তাদের পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তেই দুজনের মুখের রং উধাও হয়ে গেল। ভয়ে তড়িঘড়ি করে মেঘলা বলে উঠে,
— ম্যাম, আমি না! এই সাফিন বলছিল, আপনি নাকি কোনো হুজুরের প্রেমে পড়েছেন। তাই নাকি এমন চেঞ্জ হয়েছে।
মেঘলা নিজের কথা ফাঁস করে দিয়েছে দেখে সাফিনও আর চুপ থাকে না। সে দ্রুত বলে উঠে,
— আর ম্যাডাম, এই মেঘলা বলেছে ইফরাদ স্যার নাকি কোনো হুজুরনির প্রেমে পড়েছেন। তাই প্রথমবার স্টাফদের সালামের উত্তর দিয়েছেন।
ইরাইনা দুজনের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— অফিসের কাজ বাদ দিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে অফিসের ওনারদের গসিপ হচ্ছে?
দুজনেই সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে একসঙ্গে বলে,
— সরি।
ইরাইনা এবার সাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
— তুমি এখনই জিরো ফ্লোর থেকে ২১ সালের দুটো ফাইল নিয়ে আসবে। সময় দশ মিনিট। আর হ্যাঁ, লিফট ব্যবহার করবে না। করলে…..
বাকিটা আর বলে না। শুধু চোখ দুটো তীক্ষ্ণ করে সাফিনের দিকে তাকায়। সাফিন ভয়ে ঢোক গিলে বলে,
— না ম্যাডাম। লিফট ছাড়াই যাচ্ছি।
এদিকে মেঘলা ভয়ে ইরাইনার সামনে হাত জোড় করে কাঁদো কাঁদো মুখে বলে,
— ম্যাম, আমাকে মাফ করে দেন। আমি আপনার অনেক ভালো অ্যাসিস্ট্যান্ট। আমি যে এই কথাটা বলেছি, এটা ইফরাদ স্যারকে বলবেন না। বললে উনি আমার চাকরিটা খেয়ে দেবেন।
ইরাইনা একদম নির্বিকারভাবে বলে,
— আমার আলাদা করে বলতে হবে না। ব্রো অলরেডি শুনে নিয়েছে।
এই বলে ইরাইনা মেঘলা আর সাফিনের পেছনে তাকায়।
ইরাইনার দৃষ্টি অনুসরণ করেই দুজন বুঝে গেল, তাদের পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাতেই দেখে, ইফরাদ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে, এখনই দুজনকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। মেঘলা প্রায় কেঁদে ফেলে।
— উমম… সরি স্যার। চাকরিটা খাবেন না, প্লিজ।
ইফরাদ কটমট করে বলে,
— দুজনেই আমার কেবিনে আসো। ইমিডিয়েটলি।
এই বলে ইফরাদ নিজের কেবিনের দিকে চলে যায়। ইফরাদ চলে যেতেই সাফিন অসহায় চোখে ইরাইনার দিকে তাকায়। ইরাইনা গম্ভীর গলায় বলে,
— ব্রোর কাছ থেকে এসে আমার পানিশমেন্টও কমপ্লিট করবে।
এই বলে ইরাইনাও গটগট পায়ে হেঁটে নিজের কেবিনের দিকে চলে গেল। উপায় না পেয়ে সাফিন আর মেঘলা দুজনেই ভয়ে ভয়ে ইফরাদের কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ায়।
সাফিন ইতস্তত করে দরজায় নক করে,
— মে আই কাম ইন, স্যার?
ভেতর থেকে ভেসে আসে সংক্ষিপ্ত উত্তর,
— ইয়েস।
অনুমতি পেয়ে দুজন একবার একে অপরের দিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে কেবিনে ঢুকে। ইফরাদ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। হাতে একটা পেপারওয়েট নিয়ে ঘুরিয়ে চলেছে। চোখমুখ শক্ত হয়ে আছে। এসি চলা কেবিনেও সাফিন আর মেঘলার কপাল দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। প্রায় দুই মিনিট নীরব থাকার পর ইফরাদ পেপারওয়েটটা টেবিলে রেখে তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
— আমি হুজুরনির প্রেমে পড়েছি, তাই না?
সাফিন সঙ্গে সঙ্গে দুই দিকে মাথা নেড়ে আঙুল তুলে মেঘলার দিকে দেখিয়ে বলে,
— স্যার, আমি বলিনি। মেঘলা বলেছে।
— কিন্তু মজা তুমিও নিয়েছো সঙ্গে!
সাফিন তাড়াতাড়ি বলে,
— স্যার, মজা কোথায় নিলাম? তাছাড়া আপনার বউ তো হুজুরনিই। আর নিজের বউয়ের প্রেমে তো পড়তেই পারেন। এটা তো স্বাভাবিক, তাই না?
ইফরাদ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
— আমার লাভ লাইফ নিয়ে কথা বলতে বলেছি?
সাফিন ভয়ে কাঁপা গলায় বলে,
— সরি স্যার, সরি।
ইফরাদ এবার মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলে,
— মিস মেঘলা, একে দুটো ঠাস করে থাপ্পড় মারো। এটাই ওর শাস্তি। আমাকে নিয়ে মজা নেওয়ার ফল।
মেঘলা মুহূর্তেই খুশি হয়ে বলে,
— ওকে, স্যার।
সাফিন চোখ বড় বড় করে বলে উঠে,
— এই ডাইনী…..
এর বেশি আর কিছু বলার সুযোগ পেল না সাফিন। ঠাস! ঠাস! মেঘলা পরপর দুইটা জোরালো থাপ্পড় বসিয়ে দেয় সাফিনের গালি। তারপর নির্বিকার মুখে বলে,
— স্যারের হুকুম।
সাফিন গাল ঘষতে ঘষতে দাঁত চেপে বলে,
— তোকে দেখে নেব, ডাইনী।
ইফরাদ এবার শান্ত গলায় বলে,
— মিস মেঘলা, তোমার শাস্তি হলো আজ তুমি সাফিনের সঙ্গে ডেটে যাবে।
কথাটা শুনতেই সাফিনের চোখ আনন্দে চকচক করে উঠে। সে অনেক দিন ধরেই মেঘলাকে পছন্দ করে। কিন্তু মেঘলা তাকে কখনোই পাত্তা দেয়নি। অন্যদিকে কথাটা শুনেই মেঘলা নাক ছিটকে সাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
— এই আঙুরের সঙ্গে ডেটে যাব আমি? তার চেয়ে কোনো ল্যাংড়ার সঙ্গে ডেটে যাওয়াও ভালো।
ইফরাদ একদম স্বাভাবিক গলায় বলে,
— ওকে, ফাইন। যদি এটা ভালো না লাগে, তাহলে আরেকটা অপশন আছে।
বলে ইফরাদ একটু থেমে আবার বলে,
— তুমি যেমন সাফিনকে দুটো থাপ্পড় মেরেছ, সাফিনও তোমাকে দুটো থাপ্পড় মারবে।
কথাটা শুনেই মেঘলার মুখ হাঁ হয়ে গেল। আর সাফিন শয়তানি হেসে নিজের ডান হাতটা ঘষতে ঘষতে মেঘলার দিকে তাকিয়ে দেখালো। বোঝালো থাপ্পড় দিলে কতটা ঠাটিয়ে দেবে। সেই হাতের দিকে তাকিয়েই মেঘলা ঢোক গিলে বলে,
— আমি…. প্রথমটাতেই রাজি।
সাফিন খুশি হয়ে বলে,
— ইয়েস! থ্যাংক ইউ, স্যার।
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই মেঘলাকে বলে,
— এখন যাও।
মেঘলা মাথা নেড়ে দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।সাফিনও বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই ইফরাদ ডাকে,
— তুমি কোথায় যাচ্ছ?
সাফিন থমকে গিয়ে বলদের মতো মুখ করে বলে,
— অ্যাঁ… স্যার?
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— তুমি আমার বউয়ের দিকে তাকালে কেন?
সাফিন হতভম্ব হয়ে বলে,
— কোথায় তাকিয়েছি, স্যার?
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— তাহলে তুমি জানলে কিভাবে আমার বউ হুজুরনি?
সাফিন স্বাভাবিকভাবেই বলে,
— সেদিন তো দেখলাম, আপনার সঙ্গে বোরখা পরে ছিল।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে,
— তাহলে মাত্রই অস্বীকার করলে কেন? তুমি তাকাওনি?
সাফিন তোতলাতে তোতলাতে বলে,
— মানে… স্যার… আমি সেভাবে তাকাইনি।
ইফরাদ তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করে বলে,
— তাহলে আমার বউয়ের দিকে তুমি কিভাবে তাকাতে চাও?
সাফিন ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায় বলে,
— না স্যার, ভুল বুঝছেন। আমি ওভাবে তাকাতে চাই না।
ইফরাদ ঠান্ডা ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে,
— তুমি আমার বউয়ের দিকে তাকাতেই চাও কেন?
সাফিন দুই হাত জোড় করে বলে,
— সরি স্যার। আর জীবনে কখনো তাকাব না। এবারের মতো মাফ করে দিন।
— কিন্তু সেদিন তাকালে কেন?
সাফিন অসহায় মুখ করে বলে,
— সরি, স্যার।
— পঞ্চাশবার উঠবস করো।
সাফিন কাতর গলায় বলে,
— স্যার, কোমর ভেঙে যাবে!
ইফরাদ কলমদানী থেকে একটা সাইনপেন তুলে দেখিয়ে দাঁত চেপে বলে,
— উঠবস না করলে চোখ দুটো খুলে ফেলব।
উপায় না দেখে সাফিন হাতে থাকা অফিস ব্যাগটা চেয়ারের ওপর রেখে উঠবস শুরু করে। একদিকে উঠবস করছে, অন্যদিকে গুনছে। ইফরাদও গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইল, যেন সাফিন কোনো চালাকি করে কম উঠবস করতে না পারে। ত্রিশটা উঠবস করতেই সাফিনের অবস্থা একেবারে খারাপ হয়ে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
— স্যার, আর উঠবস করলে সন্ধ্যায় মেঘলার সঙ্গে ডেটে যেতে পারব না।
ইফরাদ নির্বিকার মুখে বলে,
— কফি ডেটে যাচ্ছো, রুম ডেটে না।
কথাটা শুনে সাফিন লজ্জায় আর কিছু বলে না। বহুকষ্টে বাকি উঠবসগুলোও শেষ করল। পুরো পঞ্চাশটা পূর্ণ করেই দাড়িয়ে হাঁপাতে থাকে। এতগুলো উঠবস করে বেচারার অবস্থা সত্যিই নাজুক।
ইফরাদ বলে,
— এবার যাও।
সাফিন মাথা নেড়ে বলে,
— ওকে, স্যার। আর আপনি ব্র্যান্ডের অফারটা একটু দেখে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলে ভালো হতো।
— টেবিলে রেখে যাও।
— আচ্ছা, স্যার।
কথা শেষ করে সাফিন চেয়ারের ওপর রাখা ব্যাগটা তুলে নেয়। ব্যাগ থেকে ট্যাব বের করে ব্র্যান্ড অফারের পিডিএফটা খুলে ইফরাদের টেবিলের ওপর রেখে দেয়। তারপর আবার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। সাফিন চলে যাওয়ার পর ইফরাদ অনিচ্ছাসত্ত্বেও টেবিলে রাখা ট্যাবটা হাতে তুলে নিল। এই মুহূর্তে তার একটুও কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। তবুও নিজের অনীহাকে জোর করে চাপা দিয়ে পিডিএফটায় চোখ বুলাতে শুরু করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
একটা লাইন দুই-তিনবার পড়ার পরও মনে রাখতে পারছে না। আসলে মনোযোগের অভাব আর কাজ করার অনিচ্ছায় এমন হচ্ছে। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে নিজেকে জোর করে মনোযোগী করার চেষ্টা করে ইফরাদ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত না পেরে হাল ছেড়ে দেয়। ট্যাবটা আবার টেবিলের ওপর রেখে চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেটাকেই প্রাধান্য দেয়। এতক্ষণ ধরে তার মন বারবার শুধু একটাই জিনিস চাইছিল, আনতারার গাওয়া সেই রেকর্ড করা নাশিদটা শুনতে।
সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, তার মন কেন বারবার সেই নাসিদটাই শুনতে চাইছে। কেন এই নাসিদের প্রতি এমন টান, এমন নেশা কাজ করছে, তা তার নিজের কাছেও অজানা। গতকাল থেকে কম শোনা হয়নি এই একটাই নাসিদ। তবুও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এতে কোনো বিরক্তি আসছে না। সাধারণত কোনো জিনিস বারবার শুনলে একসময় ক্লান্তি চলে আসে, বিরক্তি ধরে।
কিন্তু এখানে উল্টো। যতবার শুনছে, ততবারই আবার শুনতে ইচ্ছে করছে। মন মানতেই চাইছে না, থামতে চাইছে না। একই সুর, একই কণ্ঠ, তবুও প্রতিবারই নতুন কিছু টানে। মনটা বারবার শুধু এই নাসিদের দিকেই ফিরে যাচ্ছে।
যখন বুঝল, কোনোভাবেই কাজে মন বসছে না, তখন মনে হলো, এর চেয়ে নাশিদটাই শোনা ভালো। এমনিতেও তো কাজ করছে না। ইফরাদের বাঁ কানে আগেই এয়ারপড লাগানো ছিল। এবার ডান কানে এয়ারপডটা পরতে যাবে, ঠিক তখনি কেবিনের দরজা খুলে ইরাইনা ভেতরে উঁকি দিয়ে বলে,
— আসব, ব্রো?
ইফরাদ আর এয়ারপডটা কানে পরে না। সেদিকে তাকিয়ে বলে,
— আসো।
ইরাইনা ভেতরে ঢুকে। তার হাতে তিনটা ফাইল। সে এসে ফাইলগুলো ইফরাদের টেবিলের ওপর রাখে। ইফরাদ ফাইলগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কী?
ইরাইনা প্রথম ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
— অ্যানুয়াল বাজেট আর গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি প্ল্যান। ফাইন্যান্স টিম সব কনসোলিডেট করেছে। তোমার ফাইনাল অ্যাপ্রুভাল পেলেই বোর্ডে যাবে।
ইফরাদ শুনে। কিছু বলে না। ইরাইনা প্রথম ফাইলটা রেখে দ্বিতীয় ফাইলটা তুলে ধরে,
— ইতালি এক্সপ্যানশন প্রজেক্ট। নতুন প্রোডাকশন লাইন আর অটোমেশন ইনভেস্টমেন্ট। ক্যাপেক্স বড়, তাই ফাইনাল সাইন-অফ তোমার।
ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট?
— লাস্ট সেকশনে।
— ওকে।
এরপর ইরাইনা তৃতীয় ফাইলটা হাতে নেয়। এটা আগের দুইটার চেয়ে একটু মোটা। ফাইলটা দেখিয়ে বলে,
— জাপানের একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সঙ্গে ফাইভ-ইয়ার গ্লোবাল সাপ্লাই এগ্রিমেন্ট। লিগ্যাল আর কমপ্লায়েন্স ক্লিয়ার করেছে। সাইন করার আগে একবার দেখে নিও।
ইফরাদ ফাইলটা নিয়ে সেটার মলাটে আঙুল দিয়ে হালকা টোকা মেরে জিজ্ঞেস করে,
— পেনাল্টি ক্লজ?
— হাইলাইট করে দিয়েছি।
— ওকে, আমি দেখছি।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইরাইনা আবার জিজ্ঞেস করে,
— লাঞ্চ করেছো?
— না। খেতে ভালো লাগছে না।
— জুস খাবে?
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— না, চকলেট জুস খাব না এখন। সুগার বেড়ে যাবে।
ইরাইনা অবাক হয়ে বলল,
— তুমি কিভাবে জানলে চকলেট জুস?
— একটু আগে দেখলাম আইজিতে দুটো জুস আর লাঞ্চ প্লেটারের ছবি পোস্ট দিয়েছো। একটা চকলেট জুস, আরেকটা স্ট্রবেরি। স্ট্রবেরিটা অর্ধেক খাওয়া ছিল। দ্যাট মিনস, চকলেটটাই বাকি আছে।
ইরাইনা হেসে বলে,
— ওকে আমি গেলাম।
ইরাইনা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। সে চলে যেতেই ইফরাদ একবার টেবিলের ওপর রাখা তিনটা ফাইল আর পাশে রাখা ট্যাবের দিকে তাকায়। তারপর গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলে,
— কত কাজ বাকি! অথচ এখন আমার বেহায়া মন শুধু আনতারা গাওয়া নাশিদটাই শুনতে আকুল হয়ে আছে। এই বেহায়া মনটাকে যদি ফেলে দিতে পারতাম! না হলে এমন মন নিয়ে অন্তত কাজ করা যাবে না।
কথা শেষ করেই আরেকটা কানে এয়ারপড লাগায়। রেকর্ডিং অন করে চোখ বন্ধ করে। তারপর চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আবার নাশিদ শুনতে শুরু করে। নাসিদটা শুনতে শুরু করলে আর বন্ধ করতে ইচ্ছে করে না।নাশিদটার মধ্যে এমন এক শান্তি, এমন এক প্রশান্তি আর আরাম লুকিয়ে আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।ইফরাদের মনে হয়, সারাদিন, সারাক্ষণ, শুধু এই নাশিদটাই শুনে যেতে পারবে। কিন্তু কেন এত ভালো লাগে? নাশিদের কথাগুলোর জন্য? নাকি যার কণ্ঠে গাওয়া, সেই কণ্ঠের জন্য?
যে কারণই হোক, এখন এই নাশিদটা শোনা তার এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়েছে। এখন আর তার একটুও গান শুনতে ইচ্ছে করে না। বরং তার কাছে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সব গান একদিকে আর আনতারার গাওয়া এই বিশ সেকেন্ডের নাশিদটা একদিকে। চোখ বন্ধ করে পরম আরামে নাশিদ শুনে যাচ্ছে ইফরাদ। অথচ অফিসে এসেছিল কাজ করতে। কিন্তু সব কাজ ফেলে রেখে সে শুধু নাশিদই শুনছে। তার মন কোনো কাজেই বসতে চাইছে না। এই বেহায়া মন বারবার শুধু আনতারার গাওয়া সেই নাশিদটাই শুনতে চাইছে।
ওপেন-প্ল্যান অফিসের পরিবেশটা বেশ শান্ত। চারদিকে এসির শীতল বাতাসে পুরো ফ্লোরজুড়ে আরামদায়ক একটা আবহ বিরাজ করছে। সবাই নিজ নিজ ডেস্কে বসে কাজে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ আগেই লাঞ্চ ব্রেক শেষ হয়েছে, তাই সবাই আবার কাজে ফিরে এসেছে। ঠিক তখনি অফিসের প্রত্যেক কর্মীর ইমেইলে একটা নতুন অফিস নোটিশ এসে পৌঁছায়। সবার কাছে একই সঙ্গে নোটিশটা পৌঁছানোয় প্রায় সবাই নিজের কম্পিউটারে সেটি খুলে দেখতে শুরু করে। এমন সময় মেঘলা ওপেন-প্ল্যান অফিস এরিয়ায় প্রবেশ করে। এসে হাতে থাকা মাইক্রোফোনে বলে উঠে,
— অ্যাটেনশন প্লিজ, এভরিওয়ান।
মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি মেঘলার দিকে ঘুরে যায়। মেঘলা বলে,
— আপনাদের প্রত্যেকের ইমেইলে একটা নোটিশ পৌঁছে গেছে। নোটিশটা কোম্পানির সিওও ইরাইনা ম্যামের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে। যদিও এটা সবার ইমেইলে পৌঁছে গেছে, তারপরও যেন কারো কোনো ভুল বা ভুল বোঝাবুঝি না হয়, সে জন্য আরেকবার জানিয়ে দিচ্ছি।
একটু থেমে মেঘলা স্পষ্ট কণ্ঠে নোটিশটা পড়তে শুরু করে,
— Effective from tomorrow, a new office dress code will be implemented. Sleeveless clothing, overly tight-fitting attire, and overly revealing outfits will no longer be permitted in the workplace. Any clothing that is not aligned with the company’s standards of professionalism and modesty is also prohibited. All employees are expected to strictly comply with the prescribed dress code at all times.
নোটিশ পড়া শেষ হতেই হঠাৎ এক তরুণী নিজের ডেস্ক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
— এটা কেমন কথা? আমরা তো এত বছর ধরে এসব ড্রেসই পরে আসছি। তাছাড়া ইরাইনা ম্যামও এত দিন আমাদের মতোই ড্রেস পরতেন। হঠাৎ কাল বোরখা পরে এসে আজ আমাদের ড্রেস কোড সেট করতে পারেন না।
মেয়েটার নাম অর্ষা। তার পরনে ছিল একটা স্লিভলেস ক্রপ টপ, যা নাভির ওপর পর্যন্ত, সঙ্গে একটা ট্রাউজার। ফ্যাশন সচেতন এবং আত্মবিশ্বাসী স্বভাবের মেয়ে সে। অর্ষার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই করিডোর থেকে হাই হিলের টকটক শব্দ ভেসে আসে। সেই শব্দের সঙ্গে ভেসে আসে আরেকটা দৃঢ় কণ্ঠ,
— এত বছর এসব পরলেও এখন সঠিক বুঝ আসায় এসব পরা ছেড়ে দিয়েছি। অ্যান্ড দিস অফিস ইজ মাইন। দ্যাটস হোয়াই আই ক্যান সেট অফিস ড্রেস কোড।
কথা বলতে বলতেই ইরাইনা সবার সামনে এসে দাঁড়ায়। অর্ষা এবার ইরাইনাকে দেখে কিছুটা নরম স্বরেই বলে,
— ম্যাম, এখানে অনেক হিন্দু এমপ্লয়িও আছি। আমরা তো মুসলিমদের মতো বোরখা পরব না, তাই না?
ইরাইনা অবিচল কন্ঠে বলে,
— নোটিশে কিংবা এই অ্যানাউন্সমেন্টে কেউ কি শুনেছে, আমি বোরখা পরার কথা বলেছি?
ইরাইনা চারদিকে একবার তাকিয়ে আবার বলে,
— অফিসে যেহেতু হিন্দু কর্মীরাও আছেন, তাই বোরখার কথা বলিনি। কিন্তু এই অফিসে মুসলিম কর্মীও আছেন। আর এসব পোশাক আমাদের ধর্মে এলাউ নযা। সো, এজ এ মুসলিম আই কান্ট অ্যালাউ দিস টাইপ অফ ড্রেস ইন মাই অফিস।
একটু থেমে আরো দৃঢ় স্বরে বলে,
— কিন্তু যদি কারো কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে মেঘলার কাছে একটা লেটার জমা দিয়ে দেবেন।
অর্ষা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কী লেটার?
ইরাইনার তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে,
— রিজাইন লেটার।
রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩ (২)
এই একটা মাত্র উত্তরেই পুরো অফিস নিস্তব্ধ হয়ে গেল।অর্ষার আর কিছু বলার রইল না। শুধু অর্ষা না, উপস্থিত আর কারো মুখেই কোনো কথা রইল না। তবে ভেতরে ভেতরে অর্ষা ব্যাপারটা মানতে পারলো না। এত বছর ধরে যেসব ড্রেস পরে আসছে, আজ হঠাৎ শুনতে হচ্ছে, সেইসব ড্রেস আর পরে অফিসে আসা যাবে না। কে কি পড়বে সেটা তাদের নিজস্ব ইচ্ছা। অফিস সেটা ডিসাইড করতে পারে না। তার মনে হচ্ছে ইরাইনা ইচ্ছে করে মুসলিম কালচার হিন্দুদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
