রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১৭
ফারহানা চৌধুরী
-“এরিনা, ডিয়ার, হোয়াট আ সারপ্রাইজ! আই ডিডেন্ট এক্সপেক্ট ইয়্যু হেয়ার।”
স্বল্প পরিচিত কন্ঠস্বর কর্ণধার হওয়া মাত্রই এরিনা পাশ ফিরে চাইল। সুনিপুণ ভ্রু জোড়া আগুন্তককে দেখার উদ্দেশ্যে উঁচিয়ে ফেলতেই নজর কাঁড়লো পরিচিত সেই সুঠাম দেহের অধিকারী সুদর্শন পুরুষটি। এরিনা চমকে গেল। লোকটাকে এগিয়ে আসতে দেখে চটপট জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। আশ্চর্য হয়ে বলল,
-“আপনি?”
নিকোলাস দীর্ঘ হাসে,
-“ইয়েস!”
-“কিন্তু কেন?”
নিকোলাস একদম তার সামনে দাঁড়ায়,
-“ইট ইজ আ পাবলিক প্লেস। আমিও তো আসতেই পারি।”
এরিনা অপ্রস্তুত হয়। লোকটা হাসে। এরিনার বসা টেবিলের ফাঁকা চেয়ারের দিকে চেয়ে বলে,
-“মে আই?”
এরিনা চমকে তাকায়,
-“হোয়াট?”
নিকোলাস কপালে হাত রেখে শ্বাস ফেলল। চেয়ার উদ্দেশ্য করে বলে,
-“মে আই সিট হেয়ার? উইদ ইয়্যু?”
এরিনা লজ্জিত হলো। ত্বরিতে সরে এসে বলে,
-“ইয়াহ, প্লিজ।”
নিকোলাস বসে। এরিনা বসলে ওয়ের্টার ডেকে কফি অর্ডার করে। ওয়েটার অর্ডার ঠুকে চলে যেতেই নিকোলাস মুড়লো এরিনার মুখোমুখি। ক্যাপেচিনোর কাপে ছুঁয়ে রাখা হাত দু’টো আচমকা নিকোলাস নিজের দিকে টেনে ধরলো। এরিনা চমকে তাকালো। চোখ বৃহৎ আকার ধারণ করলেও নিকোলাসের কাছে তা বিশেষ পাত্তা পেল না। সে এরিনার হাত ধরে রেখেই জিজ্ঞেস করে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“তোমার ফেন্ড অরুনিকার ফোন নাম্বার হবে তোমার কাছে?”
সহসা কপাল কুঁচকে এলো এরিনার। হাস্যহীন শুধায়,
-“কেন?”
-“আমার দরকার। কিছু—”
নিকোলাসের কথায় দাঁড়ি খানা বসানোরও ধৈর্য্য এরিনা দেখালো না। বরং রাতের কুচকুচে আঁধারে পাখি ধরার জন্য ঢিল ছুঁড়লো,
-“ডু ইউ লাইক হার?”
নিকোলাস থেমে গেল। সময় নিয়ে মাথা দোলায়। লাজুক মুখে চাইলেও দৃঢ় গলায় জানায়,
-“আই ডু। আই লাইক হার।”
এরিনার মুখের সৌজন্যের হাসিটুকু এখন আর নেই। নিকোলাস তা লক্ষ করে। জিজ্ঞেস করে,
-“কোনো সমস্যা?”
এরিনা তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়ে। আশ্চর্য ভাবে কন্ঠনালি রোধ হয়ে আসছে। কথা বলার শক্তিটুকুও যেন খুইয়েছে সে। তবুও বিড়বড় করে তার প্রশ্নের প্রত্যুত্তর করে,
-“না, না।”
সেদিনের পর আবারও অরু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলছে। শুভ্রকে এড়িয়ে চলা৷ তবে তা খুব একটা প্রকাশ্যে নয়। কাউকে এড়িয়ে গেলে, তা তাকে জানতে দেওয়া উচিত নয়। একদমই নয়। কারণ সামনের ব্যক্তিটি যদি ঘুনাক্ষরেও টের পায় তা, তখন সে উঠে পড়ে লাগবে মান ভাঙাতে। এজন্যই বলা হয়, প্রকাশ্যে এড়িয়ে না চলাই ভালো। হুট করে দূরে না গিয়ে ধীরে ধীরে সরে এসো। একদিন না একদিন সে তোমার শূন্যতা অনুভব করবেই। তখন ছটফটিয়ে তোমায় চাইবে। তবে তুমি? বহু দূরে….
অরু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে কথাগুলো। শুভ্রকে এড়িয়ে চলা নিতান্তই তার পূর্বে করা ব্যবহারের জন্য। আরো একটা কারণ আছে। শুভ্রর ব্যবহার রীতিমতো তার প্রবল আত্মসম্মানে ঘা করছে প্রতিনিয়ত। সে অদ্ভুত রকমের বিরক্ত নিজেকে নিয়ে।
তখন রাত। অরু ঘরে বসে এসাইনমেন্ট করছিলো। তখন টেবিলে রাখা সেলফোন বেজে উঠলো। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা বই-খাতা রেখে অরু সরে আসে। হাত বাড়িয়ে টেবিল হাতড়ে ফোন তুলে নিলো। সামনের নোটবুক থেকে চোখ সরিয়ে ফোনে চায়। অপরিচিত নাম্বারে কপাল কুঁচকে এলো। ভেবে-চিন্তে ফোন তুলল। কানে গুঁজতেই পরিচিত স্বর পেল,
-“অরু? আমি মিশমি।”
অরু অবাক হয় খানিকটা। ফোন নাম্বার কোথায় পেলো মিশমি? বহুদিন পর কথা হওয়ায় খানিক অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে বসলো মেয়েটা। মিনমিনে গলায় জবাব দিলো,
-“হ্যাঁ, মিশমি। বলো।”
-“বিজি আছো?”
-“না না, তুমি বলো।”
মিশমি চুপ থাকে। সময় নিয়ে বলে,
-“এখন বের হতে পারবে? আই নিড ইয়্যু রাইট নাও।”
অরু কপাল কুঁচকালো,
-“সব ঠিক আছে? তুমি ঠিক আছো তো?”
-“ইয়াহ, ইয়াহ আ’ম ফাইন। তুমি একটু দেখা করো প্লিজ।”
-“এখন, এতে রাতে?”
-“প্লিজ, এসো।”
অরু ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখে। মুখবিবরে চিন্তা, শঙ্কা লেপ্টে আছে। মিশমি ডাকে,
-“অরু? আছো?”
ধ্যান ভাঙে। অরু উঠে বসে বলে,
-“হ্যাঁ— হ্যাঁ। আচ্ছা আমি আসছি। কোথায় দেখা করবে?”
মিশমি থুঁতনিতে হাত চেপে ধরলো। ভেবে-চিন্তে বলল,
-“এক কাজ করো। আমাকে তোমার এড্রেসটা মেসেজ করো, আমি তোমাকে পিক করে নিব।”
-“না!”
আচমকা চেঁচালো অরু। মিশমি হকচকি গেল। অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
-“আচ্ছা, ঠিকাছে। সে না হয় গেলাম না। তুমি এসো তাহলে।”
অরু নিজ ব্যবহারে লজ্জিত খুব। বেচারি লজ্জায়, অস্বস্তিতে ঠোঁট ভিজিয়ে কোনোমতে বলে উঠল,
-“না না, তেমন কিছু না মিশু। ভুল ভেবো না। আসলে… আসলে, আমি বাড়ি নেই। বাইরে, একটা ফ্রেন্ডের বাসায়।”
-“ফ্রেন্ড?”
-“হ্যাঁ, ফ্রেন্ড। মিশু শোনো, তুমি বরং আমাকে তোমার এড্রেসটা এসএমএস করে পাঠাও। আমি পৌঁছে যাবো নিজের মতো।”
-“শিওর তো?”
অরু মাথা দোলায়,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ, শিওর।”
-“আচ্ছা, এক মিনিট।”
অরু সময় দেয়। সেকেন্ডের ব্যবধানে ফোন ভাইব্রেট হলো নোটিফিকেশনে। অরু ফোন কান থেকে নামিয়ে চঞ্চল হাতে ঘেঁটে দেখলো, এড্রেস পাঠিয়েছে মিশমি। এড্রেস দেখেই মেয়েটার কপাল কুঁচকে এলো সহসা। ফোন আবারও কানে তোলে অরু। মিশমি জিজ্ঞেস করল,
-“পেয়েছো?”
-“হ্যাঁ, দেখলাম কেবল, তবে ওখানে কেন?”
-“আগে এসো তো, বুঝবে। আচ্ছা, তুমি পৌঁছাতে পারবে তো ঠিকঠাক? অরু আমি চাইছি না একা এসে তুমি কোনো বিপত্তি বাঁধাও। যেহেতু আমার কথায় আসছো, তোমার রেসপনসেবলিটি আমার।”
অরু আশ্চর্য হলো,
-“আরে বাবা, তুমি এতো কেন ভাবছো? তুমি এতো চিন্তা কেন করছো? আচ্ছা বাই এনি চান্স তোমার কি মনে হচ্ছে, আমি রাস্তা-ঘাট চিনবো না? পথে হারিয়ে যাবো?”
-“তেমন না। আমি—”
-“এতো চিন্তা কোরো না। নতুবা এই বয়সেই চুল পেকে যাবে। তখন তোমার বরের কি হবে?”
আচমকা রসিকতায় মিশমি হেসে ফেলল। অরু প্রশ্ন করল,
-“উম্… কয়টায় যেতে হবে? মানে, কখন?”
-“যত তাড়াতাড়ি পসিবল।”
অরু হাসে,
-“ভেবো না। আ’ল বি দেয়ার অন টাইম।”
রেজিস্ট্রি অফিসের দোরগোড়ায় অরু এসে থামলো। আশপাশ চেয়ে ওভার-কোটের পকেট হাতড়ে ফোন বের করল। মিশমিকে ফোন করতেই ভেতর থেকে সে বাইরে এলো। অরুকে দেখে আচমকাই উচ্ছ্বাস নিয়ে লাফিয়ে-ঝাপিয়ে এলো কাছে। অরু তার হাত ধরে থামায় সামনে এনে। মিশমি হেসে ফেলে। অরু হাসে। সময় বাদে চিন্তিত স্বরে সে জিজ্ঞেস করে,
-“এবার তো বলো, এখানে কেন? তাও এমন সময়?”
কেমন ছলচাতুরী করে জবাব এলো,
-“লোকে যা করে তাই করতে।”
অরু কপাল কুঁচকালো,
রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১৬
-“মানে?”
মিশমি হাসে। অরুর হাত টেনে, তাকে একপ্রকার বগলদাবা করে নিয়ে যেতে লাগল ভেতরে। যেতে যেতেই বলে উঠল,
-“বিয়ে করবো, তাই।”
